Magic Lanthon

               

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

প্রকাশিত ২৩ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধারাবাহিক পাঠ চলচ্চিত্রের কথা

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

এই ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে


চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিক যেভাবে গুরুত্ব বহন করছে, তাতে সাধারণ দর্শক-শ্রোতার মনোযোগ সেদিকে যেতেই পারে। জাতীয় চলচ্চিত্র থেকে বিশ্ব চলচ্চিত্র, যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র থেকে সামাজিক চলচ্চিত্র, আর্ট থেকে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রএ রকম বিভিন্ন অভিধায় চলচ্চিত্র অলঙ্কৃত হচ্ছে। তাছাড়া নির্মাণ-কৌশলের দিক দিয়েও বর্তমানে চলচ্চিত্র-শিক্ষণ অগ্রগতি লাভ করেছে। আর ফিল্ম, ডকুমেন্টারি, শর্ট ফিল্ম ইত্যাদি তো আছেই। ইদানীং ডিজিটাল ফরমেটে ফিল্মের যুগ শুরু হয়েছে। সুতরাং চলচ্চিত্র নিয়ে সামাজিক, ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি প্রভৃতি ধারার যে সহজ বিভক্তিকরণ হরহামেশা করা যেতো, তা আর যথেষ্ট নয়। তাই এখন চলচ্চিত্রকে সঠিকভাবে জানার প্রয়োজনে বহুদূর যেতে হবে।


চলচ্চিত্রের ইতিহাস আমাদের আকর্ষণ করে কেনো? স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে পরম্পরার কথা; কোথা থেকে শুরু করে কোথায় এসেছেএটা জানার আগ্রহ চিরন্তন। এ কারণেই বুদ্ধিমান মানুষ মানেই ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু মানুষ। ইতিহাসের নিজস্ব কোনো গতি নেই; যা আছে তা হলো মানুষের আন্তঃক্রিয়ার ফলাফলের ইতিহাস। সব মানুষ সফলভাবে ও একইভাবে সক্রিয় নয়। চলচ্চিত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে যায়। থমসন ও ব্রডওয়েল বলেন,


Film history encompases more than just films. By influencing hwo films were made and options available to filmmakers and film viewers. By studzing the social and cultural influences on films, we understand better the ways in which films may bear the traces of the societies that made and concernd them. Film history opens up a range of issues in politics, culture, and the arts— both high and popular.


অর্থাৎ চলচ্চিত্র সমাজের তৈরি সামাজিক ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ। আর তার নির্মাণের ধারাবাহিকতা সামাজিক ইতিহাসের উপাদান।

প্রথমে ১৯৩০-এর দশকে দেওয়া পল রোথার-এর সিনেমাবিষয়ক একটি বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে‘[Cinema] is the great unresolved equation between art and industry.’ নয়েল স্মিথ এ প্রসঙ্গে বলেন,

It was the first and arguiably still the greatest of the industriali“ed art forms which have dominated the cultured life of the twentieth century. From the humble beginnings in the fairground it has risen to become a billion dollar industry and the most spectacular and original contemporary art.


১৮৯০-এর দশককে সিনেমার প্রারম্ভকাল ধরলে তা শত বৎসর পেরিয়ে গেছে। সিনেমার শুরুটা যতোটা প্রযুক্তিগত সহযোগিতার, তার চেয়ে বেশি প্রযুক্তিগত গোপনীয়তার। যার ফলে বিভিন্ন দেশে এর আবির্ভাব সমকালে হলেও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি এই প্রযুক্তিগত গোপনীয়তার মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে উপরিউক্ত দশকেই সিনেমার আবির্ভাব ঘটে। তবে সে সিনেমা ছিলো নির্বাক ও সরল প্রযুক্তিনির্ভর।


এতো সব কারণেই চলচ্চিত্রের ইতিহাস লেখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে কেউ কেউ নিজস্ব একটি ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করে নিয়েছেন এবং সে দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনায় অগ্রসর হয়েছেন। বিষয়টি মন্দ নয়। এটি অনেকটা মূল্য-নিরপেক্ষতা না হলেও মূল্য-প্রকাশিত বিবেচনা। অর্থাৎ লেখক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখছেন তা প্রকাশ করে দেওয়া। এতে চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে পাঠকের কয়েকটি সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়ে থাকে। যেমন : (ক) সবই ফিল্ম, কিন্তু সব ফিল্মই সিনেমা নয়; (খ) সিনেমা একটি বড়ো প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে অনেক কিছু— কৃৎকৌশলগত, সৃষ্টিশীল ও নান্দনিক সংমিশ্রণ ঘটে। সিনেমা নিঃসন্দেহে একটি শিল্প; বিশেষ করে এর পিছনে যে সংগঠন কাজ করে, প্রযুক্তি ও শ্রম কাজ করে, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা কাজ করে তা ব্যাপক। আর শিল্পকলা তো বটেই, কারণ শিল্পের যেকোনো সংজ্ঞাই চলচ্চিত্রের ব্যাপারে প্রয়োগ করা যায়। (গ) কিছু দেশ জাতীয় পর্যায় অতিক্রম করে আন্তর্জাতিকভাবে চলচ্চিত্রের নেতৃত্ব দিতে পেরেছে— সেগুলোকে বিশ্বমানের চলচ্চিত্র বা বিশ্ব চলচ্চিত্র বলা যায়। এ রকম দেশের সংখ্যাও কম নয়; বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, ইরান, চিন, জাপান প্রভৃতি। (ঘ) জাতীয়ভাবে বা আঞ্চলিকভাবে বিশেষ করে ভাষাগত ঐক্য অনেক ধরনের চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে, যার নিজস্বতা ও শিল্পবস্তু নিঃসন্দেহে মূল্যায়নযোগ্য। (ঙ) চলচ্চিত্রের যেমন ইতিহাস আছে, তেমন ইতিহাসহীন চলচ্চিত্র নেই। চলচ্চিত্র গভীরভাবে তার সময়কে তুলে ধরে, সে কারণেই চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে গেলে সামাজিক ইতিহাস চলে আসে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল শুধু নয়, গভীরভাবে ক্রিয়াশীল সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাস চলে আসে; সেসময়ের রুচি, সংস্কার, বিশ্বাস, উৎসব, আনন্দ, বিনোদন ও সম্পূর্ণ সংস্কৃতির স্বরূপও চলে আসে। (চ) শেষ কথাটি হলো, কোনো দেশের সিনেমা, সে যতোই শিল্পোত্তীর্ণ হোক না কেনো, বুঝতে হলে দর্শক-শ্রোতাকে সে দেশের একজন সাংস্কৃতিক নাগরিক হতে হয়। তাদের একজন না হলে সংস্কৃতির চলচ্চিত্রায়ণকে ভালো লাগানো বড়োই কঠিন।


এখানে চলচ্চিত্রের বিবিধ প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা হবে, যা তরুণদের উৎসাহী মনকে কিছুটা হলেও তথ্য দেবে বলে আশা করি। ইতিহাস ছাড়াও প্রত্যেকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক চলচ্চিত্র-নির্মাণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। তবে হয়তো তা পূর্ণাঙ্গ হবে না, হওয়া সম্ভবও নয়। ধারাবাহিক এই লেখায় সিনেমাকে একটি জনপ্রিয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল গণমাধ্যম হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হবে এবং এর দার্শনিক ও তত্ত্বগত দিক নিয়েও আলোচনা আসবে।


নির্বাক চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্রের শুরু থেকে (১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ) প্রায় ৩৫ (১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ) বছর মূক ছায়াছবির এক অভাবনীয় সময় কেটেছে— এখন ভাবতেই অস্থির লাগে। কিন্তু আসল ব্যাপারটি ছিলো আরো হৃদয়বিদারক। নির্বাক চলচ্চিত্রের সময়ে সামান্য কয়েক মিনিটের ছবি থেকে কাহিনিচিত্রের যেমন উত্থান হয়েছে, তেমনই এর সঙ্গে অভিযোজিত শিল্পী, কলাকুশলী, নির্মাতা, বাজার ও দর্শকদের এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। বিনোদনের ক্ষেত্র হিসেবে তারা গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছিলো নির্বাক চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও শিল্পবস্তুকে। সে কারণেই ২০-এর দশকে যখন তার সমাপ্তিকাল ঘনিয়ে আসে, তখন অনেক আশার আলো জ্বলে উঠলেও সংশ্লিষ্ট সবাই দারুণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো। নির্মাতা গৌতম ঘোষ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে


গ্রিফিথ, আইজেনস্টাইন প্রমুখ এইসব নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তাভাবনা করেছিলেন এবং এসবের রূপ, রং, নন্দনতাত্ত্বিক উৎকর্ষ কী ধরনের হতে পারে তা নিয়েও অনেক মূল্যবান আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন। পাশাপাশি নির্বাক চলচ্চিত্রে কী করে আরও বিমূর্ত রূপ দেওয়া যায়অনেকটা সঙ্গীতের মতো, সেই মর্মে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন স্রষ্টারা। কিন্তু তারা কখনো ভাবতে পারেননি যে, কয়েক বছরের মধ্যেই নির্বাক চলচ্চিত্র নির্মাণ চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাবে। সত্যিই তাই হল, শব্দের আবির্ভাবের পর চলচ্চিত্র নির্মাণ চলে গেল থিয়েটার ও অপেরাওয়ালাদের হাতে। এতে চলচ্চিত্র ব্যবসার কোনও ক্ষতি হল না ঠিকই কিন্তু, এক অর্থে শিল্পের মৃত্যু হল। চলচ্চিত্রের সৃষ্টিশীল পরিচালক, আলোকচিত্র শিল্পী, সম্পাদক, অভিনেতা অভিনেত্রীর পায়ের তলার মাটি সরে গেল। চূড়ান্ত হতাশায় অনেকেই চলে গেলেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। কেউ কেউ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিলেন। শব্দ আসবার কয়েক বছর পরেও চ্যাপলিন ‘মডার্ণ টাইমস’ করলেন প্রায় নির্বাক ছবির মতো করে। তবে এরকম একটা ধাক্কা আর কোনও মাধ্যমে কখনও আসেনি। গদ্যে কবিতা লেখার শুরু হওয়ার পর কি সমিল পদ্যের নির্বাসন হয়েছে? আধুনিক সঙ্গীত সৃষ্টি হওয়ার পর কি ধ্রুপদী সঙ্গীতের চর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছে? চিত্রকলায় কিউবিজম আসবার পর কি মানুষ বাস্তবধর্মী চিত্রকলা বর্জন করেছে? কখনওই না। তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা বা ‘ট্রেন্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এই পর্যন্ত। চলচ্চিত্রে তাহলে কেন এমন হল? এর প্রধান কারণ বাজার-সর্বস্বতা। আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যা প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি তৈরি করছে। সেগুলোর বাজার চাই। দর্শক চাইছে চলচ্চিত্রে বাস্তবতার হুবহু অনুকরণ; চাই শব্দ, রং ও সম্ভব হলে গন্ধও (ভাগ্যিস সেটা সম্ভব হয়নি)। একটি ভাষা যখন অভিব্যক্তিকে প্রয়োগ করতে শুরু করেছে, সিনেমাটোগ্রাফি ও সম্পাদনা যখন শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, তখনই তাকে কান ধরে টেনে নামান হল রাস্তায়।


নির্র্বাক কালের একটি বড়ো ঘটনা হলো অ্যানিমেশন ফিল্মের আবির্ভাব। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দেই অ্যানিমেশন ফিল্মের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩০-এর আগেই তৈরি হয় প্রায় একশো ডিজনি ফিল্ম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেয় মার্কিন ‘অ্যানিমেটেড ফিল্ম’। বিশ্বযুদ্ধের পরে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন কাহিনিচিত্রের পাশাপাশি এসব চিত্রের সমান কদর লক্ষ করা যায়। এছাড়া ইউরোপেও একই ধরনের ফিল্ম তৈরি ও প্রদর্শন বৃদ্ধি পায়। সুতরাং নির্বাক যুগের কাহিনি কিন্তু সরল ও একরৈখিক নয়; সেখানেও বৈচিত্র্য ও সহাবস্থান ছিলো। কার্টুনের বাজার যেমন কাহিনিচিত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম জনপ্রিয় ছিলো না। বিষয়টিকে এভাবে বলা যেতে পারে

The animated films can be broadly defined as a kind of motion picture made by arranging drawings or object in a manner that, when photographed and projected sequentially on movie film, produces the illusion of controlled motion.


নির্বাক চলচ্চিত্রের নানারকম অবদান ছিলো কৃৎকৌশলগত উদ্ভাবন, ব্যবস্থাপনা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে। তাছাড়া দর্শক সৃষ্টির এক অবিশ্বাস্য কর্মযজ্ঞ সমাধা হয় এ সময়, যার ফল ক্রমাগত লাভবান করেছে চলচ্চিত্রের বিশ্ববাজার সৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের। সান্ধ্যকালীন বিনোদনের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা সম্পর্কে জন ব্যারি বলেন,

People come to the motion picture theater to live an hour or two in the land of romance. They seek escape there from the humdrum existence of daily life. Civili“ation has crowded from their lives other places wherever, people reali“e with gratitude that for a small change they can be picked up on a magic carpet and set down in a dream city amidst palatial surroundings where worry and care can never enter, where plaeasure hides in every colored shadwo and music scents the air.


এদিকে জগন্নাথ বাবু নির্বাক চিত্রের অবসান ও সবাক চিত্রের আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে তার এক প্রবন্ধে অনেকের মন্তব্য হাজির করেছেন, সেগুলো সত্যই চমকপ্রদ। জন স্পারগো’র মতে, দ্য জ্যাজ সিঙ্গার মূলত একটি মোশন পিকচার। যদি আরো সঠিকভাবে বলতে হয়, তাহলে এটা অনেকগুলো সঙ্গীতের এক বিকট চিৎকার। বেস্ট ইনিস বললেন, চলচ্চিত্রের এ রূপ যখন এলো তখন মনে হলো শক্তিশালী শব্দের সমাহার। পল রোথা বললেন, সবাক চিত্রে যে শব্দ ও সংলাপের আবির্ভাব ঘটলো তা ধারণের জন্য ভিজ্যুয়াল ফিল্মের চেয়ে বেশি সময় নেবে। অবশ্য ভিজ্যুয়াল ইমেজের ওপর একটা আবেগময় ইমেজের ছাপ পড়লো। পল আরো বললেন, কাটাছেঁড়ার শক্তিশালী সম্পাদনার উপযোগটি ভুলে যেতে হবে, পরিবর্তে সুদীর্ঘ ‘সিন’ আসবে দীর্ঘ সময় নিয়ে।১০


শব্দহীনতা ও সংলাপের অনুপস্থিতি সম্বলিত নির্বাক চিত্রের অবসান যেমন দুঃখজনক, তেমনই অবশ্যম্ভাবী ছিলো। এটি এখন প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য। তবুও নির্বাক চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনার অবসান হয়নি, এর কারণও অবশ্য অনেক। এর মধ্যে সংলাপ ও সঙ্গীতের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সে যুগের সিনেমা কী দিতে পেরেছিলো তা মনে হয় আরেকটু আলোচনার অবকাশ রাখে।


একবার নতুন করে ভাবা যেতে পারে যে, নির্বাক ছবি আসলেই নির্বাক কি না। শব্দ ও সঙ্গীত নেই, কিন্তু গতি আছে। গতি শব্দের চেয়ে কম কিসে? সমাজবিজ্ঞানে একটা বিষয় খুব গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়, মানুষের বাচনিক অভিব্যক্তির চেয়ে অবাচনিক বা আচরণগত অভিব্যক্তিই বেশি। চার্লি চ্যাপলিন কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কেনো যাচ্ছেন, কী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী আচরণ করছেন, তা বুঝতে কিন্তু দর্শকের অসুবিধা হয় না। এমন সিনেমায় অভিনয় করতে করতে অভিনয়শিল্পীর অভ্যস্ততা চলে আসতেই পারে। শব্দের আবির্ভাব আমাদের অভিনয় দক্ষতাকে শাণিত করেছে; আরো বাঙ্ময় করেছে; শিল্পকলার বহুমাত্রিক অভিব্যক্তি প্রকাশে সাহায্য করেছে।


মৃণাল সেন যে পরিবেশ-শাসিত প্রতিক্রিয়াকে১১ বুঝতে চেয়েছেন, সে পরিবেশের অর্থ কিন্তু নির্বাক যুগের শব্দহীনতার মধ্যেও সম্ভব। তবে শব্দ অনুষঙ্গে তা আরো শিল্পিত রূপ লাভ করতে পারে। দর্শক দেখেই সবকিছু বোঝে না। অনেকে হয়তো বোঝে, কিন্তু সবাই বোঝে না। এই না বোঝার কারণ হলো, অনুশীলনের অভাব। বাইরের বাস্তবকে বোঝার জন্য ভিতরের ভাবসম্পদ বা ফ্রেমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই ‘বোদ্ধা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মৃণাল বাবু ভিজ্যুয়াল পারসেপশন ও ইন্টেলেকচুয়াল পারসেপশনের সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন। শব্দ দর্শকের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রত্যক্ষণের বিরাট সহায়ক সমাহার। কিন্তু যার অন্তর্গত অভিজ্ঞতা নেই, সে শব্দ সত্ত্বেও যথাযথ প্রত্যক্ষণ করতে পারবে না।


অর্থনীতির শাস্ত্র পাঠ ও অনুশীলন একজন মানুষকে অর্থনীতিবিদ করে তোলে। আর সে কারণেই সাধারণের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি সে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার রাজনৈতিক অর্থনীতি বুঝতে পারে। সুতরাং নির্বাক চলচ্চিত্রের কলাকুশলী থেকে শুরু করে দর্শক পর্যন্ত সবাই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রত্যক্ষণের যে পর্যায় অর্জন করেছিলো, পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নতি তাকে আরো অগ্রসর হতে সাহায্য করেছে। তাছাড়া দর্শকের রুচিবোধের উৎকর্ষ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সঙ্গে তাল রাখার জন্য নির্বাক চলচ্চিত্রের চরিত্রে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। নির্বাক চিত্রের মধ্যে আবার সবাক চিত্রের সব সম্ভাবনাকে খুঁজতে যাওয়া ঠিক না; আর তা সম্ভবও না। এমন প্রত্যাশা সবাক যুগে বসে, নির্বাক যুগের কাছে অহেতুক দাবির মতো শোনাবে। ভারতের নির্বাক যুগের চিত্র সমালোচক নিরঞ্জন পাল বলেন,

Silent Films, or necessity, must be full of actions... scenario writer who believes in the psychological development of his plot in silent action picture, aû author who tries today stress on characteri“ation, aû story writer who attempts to mould his characters in human mouldsin other words make them act and behave in rational and ordinary human beings, should never attemt, to write for silent action pictures.১২


শব্দ ও দৃশ্যের সুষ্ঠু প্রয়োগে, সচেতন পুনর্যোজনায় প্রতিকেন্দ্রিক ধ্বনিকল্পের সৃষ্টিতে বা সুচিন্তিত অনুপস্থিতিতে চলচ্চিত্রের যে শিল্পগত প্রতিশ্রুতি বাড়ছে, তা নির্বাক যুগেই অনুভব করতে পেরেছিলেন আইজেনস্টাইন, পুদভকিন, আলেকজান্ডার দ্রাঙ্কভ-এর মতো যুগান্তকারী চলচ্চিত্রকাররা।১৩ আঁদ্রে বাঁযা আরো খানিকটা বাড়িয়ে বললেন, টকিজের আগমন নির্বাক চিত্রের মৃত্যু ঘণ্টাই বাজিয়েছে। সেখানে নির্বাক চলচ্চিত্রের গ্রাফিক ভাষা নিসৃত নান্দনিকতারও অবসান হয়েছে। মন্তাজের নতুন নান্দনিকতা চলচ্চিত্রকে বাস্তবতার নতুন দিগন্তে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।১৪


রুডলফ আর্নহেইম আরো তীর্যকভাবে বললেন, সবাক চিত্রের আগমন নান্দনিকতার সর্বস্বান্তকরণের সমার্থক হয়ে দাঁড়ালো।১৫ আর্নেস্ট লিন্ডগ্রো বললেন, শব্দ সংযোজন সত্ত্বেও চলচ্চিত্র প্রাথমিকভাবে ভিজ্যুয়াল আর্ট হিসেবেই থেকে গেলো। তবে এখন পর্যন্ত সবাই সিনেমা তৈরি করাকে বা নির্বাক চিত্রের গুণাগুণকে শব্দের বিশেষ গুণের সঙ্গে মেলাতে ব্যস্ত।১৬ জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের মূল্যায়ন হলো, বস্তুতপক্ষে চলচ্চিত্রের ছবি ও সঙ্গ এ দুটোকে (বাহ্যিক) আকারগত উপাদান হিসেবে গ্রহণ করার ফলেই যাবতীয় সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। বাঁযার মতাদর্শ অবলম্বন করে আমরা যদি চলচ্চিত্রকে মূলত বাস্তব অনুভূতির মাধ্যম হিসেবেও গ্রহণ করি, নির্বাক চলচ্চিত্র এক অসম্পূর্ণ মাধ্যম বলে পরিগণিত হয়।

(চলবে)


লেখক : অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসান ইমাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়ান।

himam_ru@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. Thomson, Krichi and David Bordwell (1985: 1); Film History: An Introduction; McGrow-hill, Nwe York Press.

২. Nowell-Smith, Geoffrey (1996: xix); `General Introduction'; The Oxford History of World Cinema; Geoffrey Nowell-Smith (ed.), Oxford University Press, Oxford.

৩. প্রাগুক্ত; Nowell-Smith (1996: xix).

৪. ঘোষ, গৌতম (১৯৯৮ : ৩); ‘স্বপ্নের শতবর্ষ’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা। 

৫. Crafton, Donald (1996: 71); `The Silent Film: Tricks and Animation'; The Oxford History of World Cinema; in Geoffrey Noyel-Smith (ed.), Oxford University Press, Oxford.

৬. Barry, John (1990: ?); `The Motion Picture Theater, Cited in History of the American Cinema 3'; An Evening's Entertaimen: The Age of Silent Feature Films; Nwe York Press.

৭. চট্টোপাধ্যায়, জগন্নাথ (২০১১ : ২৭-৩৯); নির্বাক থেকে সবাক বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৮. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১১ : ২৭-৩৯)।

৯. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১১ : ২৭-৩৯)।

১০. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১১ : ২৭-৩৯)।

১১. সেন, মৃণাল (২০১৫ : ৪৩-৫৩); আমি ও আমার সিনেমা; বাণীশিল্প, কলকাতা।

১২. নিরঞ্জন পাল, উদ্ধৃত; বিশ্বাস, মৈনাক (১৯৯৮ : ৩); ‘চলচ্চিত্রের প্রথম যুগ : আদির নতুন পাঠ; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

১৩. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১১ : ২৭-৩৯)।

১৪. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১১ : ২৭-৩৯)।

১৫. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১১ : ২৭-৩৯)।

১৬. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায় (২০১১ : ২৭-৩৯)।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন