Magic Lanthon

               

অনিক ইসলাম

প্রকাশিত ২২ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ইনসেপশনকে সঙ্গে নিয়ে নোলান-এর আঁতুড়ঘর থেকে বলছি

অনিক ইসলাম


The purpose of art is washing the dust of daily life of our souls.

Pablo Picasso.

 

যেকোনো কিছু সৃষ্টি করাই কঠিন; সত্যিকার অর্থে আরো কঠিন অর্থবহ কোনো কিছু সৃষ্টি করা। সে কারণেই বোধহয় সব স্রষ্টাকে মনে রাখার তাগিদ আমরা অনুভব করি না। কারণ দিন শেষে মানুষ আসলে অর্থ খুঁজে ফেরে, বাদবাকি সবকিছু তার কাছে অনর্থক হয়ে যায়। তাহলে মানবজীবনকে অর্থ দান করে কী, তার সৃষ্টিশীলতা? আর নিকষ কালো আঁধারে আলো ফেলার ইচ্ছে তো তার জন্মবাহিত। তার আছে আলোকে আরো আলোকিত করার মানবিক গোঁয়ার্তুমি, কারণ সৃষ্টির এই শুদ্ধ অনুপ্রেরণাই তাকে তার পরিচয় দেয়। সীমাহীন এই মহাবিশ্বের ডাকহরকরা যদি হয় মহাকাল, তবে মানবজাতির ঠিকানা হলো তার সৃষ্টিশীলতা। ক্রিস্টোফার অ্যাডওয়ার্ড নোলান এমনই এক মানুষ, একজন স্রষ্টা, যিনি সৃষ্টির তুলি স্বরূপ বেছে নিয়েছেন ক্যামেরাকে; আর চলচ্চিত্র হয়েছে তার ক্যানভাস।

চলচ্চিত্র হলো একটি গ্র্যান্ড আর্ট, এখানে একাধিক শিল্পের উপস্থিতি থাকে। তাই চলচ্চিত্রে গল্প বলার জন্য অন্যান্য শিল্পের সাহায্য যেমন নেওয়া যায়, তেমনই অন্তর্নিহিত কোনো একটি শিল্প ব্যর্থ হলেই তা গোটা চলচ্চিত্রের শৈল্পিক সত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। ঠিক এইখানটাতেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন নোলান। কারণ একজন ব্যতিক্রমী নির্মাতা হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন অসাধারণ কল্পনাশক্তির লেখকও। এর একটা বড়ো কারণ বোধহয় তার সাহিত্যে পড়ার অভিজ্ঞতা। যেটি তাকে মানব চরিত্রের নানা উপাদান নিয়ে নাড়াচাড়া করতে শিখিয়েছে, সম্পর্কের একাধিক স্তরে ওঠানামা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। নোলান বুঝে গিয়েছিলেন প্রতিটা মানব সম্পর্কই আসলে একাধিক স্তরে বিন্যস্ত; সম্ভবত তাই তার চলচ্চিত্রগুলো একটার পর একটা সিঁড়ি ভেঙে মানব মনের কেন্দ্রের দিকে ফিরতে চেয়েছে; কোনো একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় আটকে থাকেনি কখনো। তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো আসলে এই অনুভূতি দেয় যে, চলচ্চিত্র বানানোর জন্য কোনো গল্প তৈরি করেননি নোলান; বরং গল্পগুলো বলার জন্যই চলচ্চিত্র তৈরি করেন তিনি। এই ছোটো বৈপরীত্যই আসলে বিরাটাকার পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে ক্রিস্টোফার নোলানের সঙ্গে সমসাময়িক মূলধারার নির্মাতাদের।


২.

ব্রিটিশ বাবা আর আমেরিকান মায়ের কারণে নোলানের শৈশব বিভক্ত ছিলো লন্ডন আর শিকাগোতে। যে কারণে সম্ভবত সংস্কৃতি, মূল্যবোধ আর ফ্যান্টাসির এক বুদ্বুদময় মেল্টিং পট হয়ে উঠেছিলো তার মনস্তত্ত্ব। স্বাভাবিকভাবেই যেটার প্রভাব নোলানের কাজের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুলাই জন্ম নেওয়া লেখক-নির্মাতা নোলানের প্রথম চলচ্চিত্র টারানটেলা (১৯৮৯)। আট মিলিমিটারে নির্মিত টারানটেলা একটি পরাবাস্তববাদী কাজ। একই বছর নোলান নির্মাণ করেন তার প্রথম কাহিনিচিত্র ফলোয়িং (১৯৮৯)। যেটি সেসময় অনেকের মনোযোগ কাড়ে। কিন্তু তার বক্স অফিস হিট প্রথম চলচ্চিত্র মেমেন্টো (২০০০)। এটি সেসময় বেশ আলোড়ন তোলে চলচ্চিত্র জগতে। কারণ মেমেন্টো শুধু বাণিজ্যিকভাবে সফলই ছিলো না বরং তা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং গল্প বলার অভিনবত্বে হতবাক করে সেসময়ের তাবৎ চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের।

মেমেন্টোর সাফল্য শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেয় নোলানকে, ফলস্বরূপ নিজের শর্ত মতেই বড়ো বড়ো সব প্রযোজকদের তিনি পাশে পেতে থাকেন। এর দুই বছর পর আল-পাচিনোকে নিয়ে নোলান নির্মাণ করেন সাইকোলজিকাল থ্রিলার ইনসমনিয়া। এর পাশাপাশি তিনি এখন পর্যন্ত লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন দ্য ডার্ক নাইট ট্রিলজি (২০০৫-২০১২), দ্য প্রেস্টিজ (২০০৬), ইনসেপশন (২০১০) ও ইন্টারস্টেলারসহ (২০১৪) আরো কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র। আশ্চর্যজনকভাবে নোলানের প্রতিটি চলচ্চিত্র ব্লকবাস্টার হিট, দু-একটি তো আয়ের অনেক রেকর্ড ভেঙেচুরে নতুন মাইলফলক তৈরি করেছে!

৩.

আজকের চলচ্চিত্র বাস্তবতায় নোলান গুরুত্বপূর্ণ কেনো, তার চলচ্চিত্রের ক্রমাগত অর্থনৈতিক সাফল্যের ভারী ওজনের কারণে? সবার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, সেরকম সাফল্য তো কতো নির্মাতারই আছে। তাহলে নোলান আলাদা করে মনোযোগ কেনো কাড়ছেন? কারণ অবশ্যই আছে; নোলানই বোধহয় সেই বিরল প্রজাতির নির্মাতাদের একজন, যিনি দেখিয়েছেন কীভাবে দর্শন-সৃষ্টিশীলতা-বিজ্ঞান-অভিনবত্ব ও জটিল মনস্তত্ত্বকে একটি এনভেলাপের মধ্যে আটকানো যায়। যে এনভেলাপ খুলে চিঠিটি পড়ার জন্য পাগলের মতো অপেক্ষা করতে থাকে দর্শক।

আগ্রহ জাগে কেমন সেই সুতা, যার সাহায্যে এতো বৈচিত্র্যময় সব অভিজ্ঞতার সঙ্গে দর্শককে বাঁধেন নোলান? উত্তরটা সম্ভবত লুকিয়ে আছে নোলানের চলচ্চিত্র-নির্মাণের অ্যাটিটিউডে। যেটা খেয়াল করলে বোঝা যায়, নোলানের মতো এতো সম্মান সিনেমার দর্শকের বোধহয় খুব কম নির্মাতাই দিয়েছেন। মানুষকে বিনোদন দেওয়ার জন্য সস্তা, স্থূল, চটকদার উপাদানের পরিবর্তে নোলান বেছে নিয়েছিলেন কঠিন, জটিল, নিগূঢ় সব বিষয়। যেখানে সমসাময়িক পৃথিবীর বাস্তবতার সঙ্গে দেনদরবার করতে করতে এগিয়েছে তার জটিল মনস্তত্ত্বের চরিত্রেরা। অনেকে আশঙ্কা করেছিলো, দর্শক নিশ্চিত সেগুলো প্রেক্ষাগৃহে একবারের দেখায় বুঝতে পারবে না, তারা হতাশ হবে। কিন্তু মানুষ পাগলের মতো ছুটেছে প্রেক্ষাগৃহে, কারণ নোলানের চলচ্চিত্র দেখার সময় তারা সম্মানিত বোধ করে। মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে ডুব দিয়ে যে অন্তর্লীন মণিমুক্তো নোলান তুলে আনেন, যেগুলোর অর্থ উদ্ধারের চ্যালেঞ্জ তিনি তার দর্শককে ছুড়ে দেন, সেই চ্যালেঞ্জ নিতে, সেই আস্থার প্রতিদান দিতে, সেই সম্মানটুকু পাওয়ার আশায় মানুষ বারবার ছোটে প্রেক্ষাগৃহে।

নোলান আসলে চলচ্চিত্রপ্রেমীদেরকে তাদের হারিয়ে ফেলা আত্মমর্যাদার খোঁজ দিয়েছেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর, বোধহীন যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দিয়ে নোলান চলচ্চিত্রকে তার ইন্টেলেকচ্যুয়ালিটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, দর্শক যখন পয়সা খরচ করে নোলানের কোনো চলচ্চিত্র দেখতে যায়, তখন তারা কখনো প্রতারিত বোধ করে না। এর একটা বড়ো কারণ তো বটেই, নোলান তার দর্শককে কখনো আন্ডারএস্টিমেট করেন না। এছাড়াও আরেকটি কারণ হলোচলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্য সাক্ষ্য দেয় যে, নির্মাতা ও তার দল, তাদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন প্রতিটি প্রজেক্টের পিছনে। নির্মাতার দর্শক সত্তাই বোধহয় তাকে এমন নিবেদিত হতে শিখিয়েছে। এটা নোলানের চলচ্চিত্র-নির্মাণের দর্শনও বটে। এক সাক্ষাৎকারে নোলান বলেন,

আমার কাছে সেটাই পয়সা উসুল, যখন আমি দেখি কোনো নির্মাতা ও তার দল তাদের চলচ্চিত্রটিকে বিশ্বসেরা ভাবে, তাদের সৃষ্টিকে নিয়ে ভীষণ প্যাশনেট থাকে, গর্ব অনুভব করে। কারণ সেটাতে তারা তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্যটুকু ঢেলে দিয়েছে। হতে পারে তারা যা বলতে চাইছে তার সঙ্গে দর্শক হিসেবে আমি একমত হতে পারলাম না, কিন্তু তাতেও আমার যায় আসে না। কারণ সে যা বলতে চায়, তা সে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও সততা নিয়ে বলছে কি না সেটাই আমার ম্যাটার করে।

৪.

দেখা গেছে, নোলান নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর প্রোটাগনিস্টরা (প্রধান চরিত্র) কমবেশি কোনো না কোনো মনস্তাত্ত্বিক ট্রমায় আক্রান্ত থাকে। তাদের সবার একটি ভুলে যাওয়ার মতো অতীত থাকে, যা তারা চলচ্চিত্র জুড়ে মনে করে বেড়ায়। যার ফলে নোলানের চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্টকে আসলে একাধিক সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়। একটি সংগ্রাম সে করে বাস্তবতার সঙ্গে, আরেকটি নিজের সঙ্গে। এই দ্বৈত সংগ্রামই নোলানের প্রধান চরিত্রগুলোকে বহুমাত্রিক করে তোলে, তার চরিত্রদের এক অদ্ভুত গভীরতা দেয়। দর্শক তখন চেনা কোনো চরিত্রের মধ্যে সম্পূর্ণ অচেনা কাউকে খুঁজে পায়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দর্শক চরিত্রদের আবিষ্কার করতে থাকে। নোলানের আমলনামা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি তার প্রতিটি চলচ্চিত্রেই মানুষের অভ্যন্তরীণ মাল্টি-লেয়ার্ড বাস্তবতার খোঁজ করে গেছেন। কখনো সেটি প্রোটাগনিস্টের আদর্শের রূপে, কখনো সেটি তার স্বপ্নের মধ্যে, কখনোবা তার অচেতনে।

সে কারণেই সুপারম্যান সিরিজের খোল নলচে বদলে দেওয়া ব্যাটম্যান ট্রিলজির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র দ্য ডার্ক নাইট-এ দর্শক অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেযার সঙ্গে লড়ে গোথাম সিটিকে রক্ষা করতে চায় ব্যাটম্যান, সেই জোকার নিজেও ব্যাটম্যানের চেয়ে খুব আলাদা কিছু নয়। তারা দুজনেই প্রচলিত নষ্ট, পঁচে যাওয়া সমাজকে বদলাতে চায়। যা চলচ্চিত্রের প্রথাগত প্রোটাগনিস্ট, অ্যান্টিগনিস্ট ধারণায় বড়ো ধাক্কা হয়ে আসে। কারণ দর্শক তথাকথিত নায়ক ও খলনায়কের মধ্যে স্পষ্ট দেয়াল দেখতে চায়, যেনো সে সহজেই চিহ্নিত করতে পারে, কে শুভ আর কে অশুভ। কিন্তু লড়াইটা যখন একই আদর্শের দুটো সূক্ষ্ম পার্থক্যের মধ্যে হয়, তখন তা থেকে এতোদিনের অভ্যাস মতো পক্ষ বাছতে গিয়ে নিউরনে আলোড়ন ওঠে দর্শকের, প্রচুর অ্যাড্রেনালিন খরচ হয়, কিন্তু সে এই ঝঞ্ঝা উপভোগ করে। এ যেনো দুটো আলোর পরস্পর লড়াই করতে করতে টানেলের শেষ মাথায় পৌঁছানোর রেশ।

তবে নোলানের লেখা-নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে পছন্দের ইনসেপশন। এর বড়ো কারণ বোধহয় এই যে, চলচ্চিত্রটির কিছু বিষয় আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ইনসেপশন-এ অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, জোসেফ গর্ডন-লেভিট, ম্যারিওন কতিলার্দ, অ্যালেন পেজ, টম হার্ডি, কেন ওয়াটানাবি ও সিলিয়ান মারফি প্রমুখ। এখানে একটা কথা মনে করে দেওয়া জরুরি, ইনসেপশন কিন্তু নোলানের আশৈশব লালিত এক প্রজেক্টের নাম। এক সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্রটির অন্যতম প্রধান চরিত্র লিওনার্দো বলেন, শুধু ইনসেপশন-এর স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ করতেই নোলানের লেগেছে পাক্কা আট বছর।

৫.

ইনসেপশন-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে রিয়ালিটি, ড্রিম ও আনকনসাস নিয়ে; নোলান অবশ্য এটাকে বলেছেন ভার্চুয়াল রিয়ালিটি। এখানে বাস্তবতা, স্বপ্ন ও অচেতন মন এতো অবলীলায় একে অন্যের সঙ্গে ওভারল্যাপ করেছে যে, দর্শকের পক্ষে গভীর মনোযোগ ব্যতীত বোঝা মুশকিল, তারা এখন ঠিক কোন পর্যায়ে আছেস্বপ্ন না বাস্তবতায়। যদি স্বপ্ন হয়, তবে তা স্বপ্নের কোন স্তরে। কারণ চরিত্ররা একটি স্বপ্নের ভিতরে অবস্থান করে সেখান থেকে আবার আরেকটি স্বপ্ন দেখতে পারে।

চলচ্চিত্রটি মূলত একজন স্থপতি ডমিনিক কবকে (লিওনার্দো) নিয়ে। যিনি তার স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ মাথায় নিয়ে স্বদেশ থেকে ফেরারি হন। ফলে দুই সন্তানকেই দেশে ফেলে আসতে হয় তাকে এবং তাদের কাছে ফেরার কোনো উপায় থাকে না। অত্যন্ত মেধাবী ডমিনিক কব নির্বাসিত জীবনে পেশাদার চিন্তা চোর-এ পরিণত হন। এক বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে কব কোনো টার্গেটকে (ব্যক্তি) তার স্বপ্নের অংশীদার করতে পারেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে একাধিক মানুষ মিলে কোনো একজনের স্বপ্নে অংশ নিতে পারে, অবস্থান করতে পারে। স্বপ্নটি মূলত যার থাকে বা যিনি দেখেন, তিনি তার স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এবং সেই স্বপ্নের মধ্যে থেকে ড্রিমার কৌশলে টার্গেটের অচেতন থেকে গুরুত্বপূর্ণ আইডিয়া হাতিয়ে নিতে পারেন। টার্গেট বুঝতে পারেন না, তিনি আসলে কারো স্বপ্নের মধ্যে আছেন।

নিজের কাজে অত্যন্ত দক্ষ কবকে সন্তানদের কাছে ফেরার ব্যবস্থা করে দেওয়ার বিনিময়ে অভিনব এক প্রস্তাব দেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর জাপানি ব্যবসায়ী সাইটো। অচেতন থেকে আইডিয়া বা চিন্তা চুরির পরিবর্তে, সাইটো তার প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী ফিশার মরো অ্যানার্জি কংগ্লোমারেট-এর ভাবী উত্তরাধিকারী ফিশারের অচেতনে নতুন একটি চিন্তা রোপণ করতে বলেন কবকে। সেটা এমন এক চিন্তা হতে হবে, যার মাধ্যমে ফিশার নিজ থেকেই তার বাবার গড়া ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেবেন। নোলান আসলে সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার খুব গুরুত্বপূর্ণ এক উদাহরণ এই চলচ্চিত্রে প্রতীকায়িত করেন। বর্তমান বিশ্বে পুঁজির প্রাধান্যশীলতা এমন একপর্যায়ে গেছে, যেখানে সব সম্পদ গিয়ে জমছে হাতে-গোনা কিছু ব্যক্তি, পরিবার, করপোরেশনের কাছে। তারাই নির্ধারণ করছে এই গ্রহের আকাশ, বাতাস, পর্বত, সাগরের দিনকাল। উল্টোভাবে সমাজের বৃহৎ অংশ দাসত্ব করতে বাধ্য হচ্ছে তাদের। চলচ্চিত্রে সাইটোকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলতে শোনা যায়, শীঘ্রই অ্যানার্জি দুনিয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে চলেছে ফিশার মরো অ্যানার্জি কংগ্লোমারেট, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও যা প্রতিরোধ করার সামর্থ্য আমার কোম্পানির নেই। ওরা পৃথিবীর অর্ধেক অ্যানার্জি সরবরাহ করার মধ্য দিয়ে নতুন এক সুপার পাওয়ারে পরিণত হবে। ফিশার মরো অ্যানার্জির ভেঙে যাওয়ার মধ্যেই আছে এই পৃথিবীর মঙ্গল। নোলান কিন্তু কোনো রাখঢাক না রেখেই চলচ্চিত্রে তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেন।

৬.

মানব মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপ্রণালী মাথায় রাখলে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, সেখানে বহিরাগত কোনো চিন্তা বা ধারণা রোপণ করা কোনোভাবেই সহজ নয়। কারণ মানব মন সবসময় তার চিন্তার উৎস সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে। তাই কারো অচেতনে কোনো ধারণা রোপণ করা হলে, সে ঠিকই ট্র্যাক ডাউন করে ফেলে এই চিন্তা তার ভিতরে কেউ স্থাপন করেছে। এই বিষয়টা দর্শক নিজেরা একটু ভাবলেই টের পাবেএমন কোনো চিন্তা বা আইডিয়া কি মনে করতে পারি, যা কোথা থেকে মাথায় এসেছে তা স্মরণ করতে পারি না? আর ঠিক এখান থেকেই চলচ্চিত্রের নাম নেওয়া হয়ইনসেপশন। অর্থাৎ কোনো কিছুর শুরু, মানে ব্যক্তির অচেতনে কোনো চিন্তা রোপণ করা। এক প্রকার অসাধ্য জেনেও ফিশারের অচেতনে এই কাজটি করার ঝুঁকি নেন কব; যদিও তার সঙ্গী আর্থার তাকে এই অসম্ভব বিপজ্জনক কাজটি থেকে বিরত থাকতে বলেন। কিন্তু কব ভাবেন, এটা সম্ভব; কারণ এই ইনসেপশন তিনি আগেও একবার করেছেন। কব অতীতে একটি আইডিয়া প্ল্যান্ট করেছিলেন তার স্ত্রী ম্যাল-এর অচেতনে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কব জানতেন, একটি ইনসেপশন কেবল তখনই সফল হতে পারে, যদি টার্গেট মনে করে চিন্তাটি সে নিজেই ভেবেছে; অর্থাৎ চিন্তাটি তার নিজের, অন্য কেউ তাকে এটা দেয়নি। সেক্ষেত্রে তার আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকবে না চিন্তাটি সম্পর্কে; সেটি তখন স্বাভাবিকভাবেই আর দশটা চিন্তার মতো মস্তিষ্কের ভিতরে বাড়তে থাকবে। এই অ্যাসাইনমেন্টকে সফল করতে কব একটি দল বেছে নেন। যে দলে থাকে একজন স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থী আরিয়াডনে, একজন বিশেষজ্ঞ জালিয়াত এইমস, একজন কেমিস্ট ইউসুফ এবং অবশ্যই আর্থার ও সাইটো।

চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ইনসেপশনটি বাস্তবায়নের জন্য বেছে নেওয়া হয় ১০ ঘণ্টা দীর্ঘ এক বিমান যাত্রা। যেখানে সাইটোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফিশারকে কৌশলে অচেতন করার মাধ্যমে শুরু হয় দীর্ঘ, ভয়ানক ও রোমাঞ্চকর এই অ্যাসাইনমেন্ট। অভিযান যতো এগোয়, সেখানে বাস্তবতা, অচেতন ও স্বপ্নের এক জটিল সহাবস্থান দেখা যায়। ইনসেপশন-এর শেষ এক ঘণ্টা ছিলো নিগূঢ় চিত্রনাট্যের কঠিন বুননি দিয়ে সংঘটিত এক নিরবচ্ছিন্ন অ্যাকশনের সমাবেশ। যেখানে এক সেকেন্ডের অমনোযোগিতাতেই দর্শক গল্পের ট্র্যাক হারিয়ে ফেলতে পারেন।

যেহেতু কব ও তার দলকে একদম নতুন একটি আইডিয়া ফিশারের অচেতনে রোপণ করতে হবে, তাই ফিশারের অচেতনের গভীরতর স্তরে যাওয়া ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকে না। তাই কব ও তার দল প্রথমে ফিশারকে নিয়ে স্বপ্নের প্রথম স্তরে প্রবেশ করে; যেখানে তারা আইডিয়াটি রোপণের জন্য প্রস্তুত করে ফিশারের অচেতন মনকে। তারপর সেখান থেকে আবার স্বপ্ন দেখার মাধ্যমে দ্বিতীয় স্বপ্ন স্তরে প্রবেশ করে, যে স্তরে তারা আইডিয়াটি সম্পর্কে একটা ক্লু রোপণ করে ফিশারের মনে। সেখান থেকে আবার স্বপ্ন দেখার মাধ্যমে তৃতীয় স্বপ্ন স্তরে যায়, যে স্তরে আইডিয়া রোপণটি পূর্ণতা পায়; ফিশার ভাবতে থাকে চিন্তাটি আসলে তার মাথা থেকেই এসেছে। এভাবে অন্য কারো চিন্তাকে ফিশার নিজের ভাবতে থাকেন, যে চিন্তা তার পরবর্তী জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে। আর এই গোটা প্রক্রিয়াটা ঘটে স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন দেখার মাধ্যমে। ভাবতে অবাক লাগে এমন জটিল এক গল্প বিন্যাস নিয়ে এতো নিখুঁত স্ক্রিপ্ট কী করে লেখা সম্ভব! যেখানে স্বপ্ন ও মানুষের মনস্তত্ত্বের এই দুর্বোধ্য জগতের এক বিস্ময়কর ডিটেইল করেছেন লেখক-নির্মাতা। যা সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের পর্যন্ত তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

৭.

ইনসেপশন-এর প্রোটাগনিস্ট কব-এর একটি অস্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক অতীত আছে। যা ড্রিম শেয়ারিং টেকনোলজি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি এবং তার স্ত্রী ম্যাল-এর জীবনেই তৈরি হয়েছিলো। একটা পর্যায়ে কোনটা বাস্তব আর কোনটা স্বপ্ন তা আর আলাদা করতে পারতেন না ম্যাল, যার কারণে একপর্যায়ে তিনি আত্মঘাতী হন। দার্শনিক প্রশ্ন তৈরি হয়, এখানে ম্যাল এই পরিস্থিতিকে আসৃলেই আলাদা করতে পারতেন না, না কি চাইতেন না? কে জানে হয়তো তিনি এই অনিশ্চিত বাস্তবতায় ফিরতে চাইতেন না, যেখানে স্বপ্নে তিনি নিয়ন্ত্রণ ও নির্মাণ করতে পারতেন তার পৃথিবী।

এই যে স্বপ্নের ভিতরে আরেকটি স্বপ্ন, কিংবা বাস্তবতার ভিতরে আরেক প্রস্থ বাস্তবতাএটি নির্মাতার মস্তিষ্ক প্রসূত কোনো ফিকশন নয়। আসলে যে পৃথিবীতে নোলান ও তার পূর্বপুরুষেরা বেড়ে উঠেছেন, সেখানেই আছে এমন একাধিক স্তরের বাস্তবতা। সেটাও একধরনের ভার্চুয়াল রিয়ালিটি-ই। বিশেষ করে ২১ শতকের প্রজন্মের আছে সীমাহীন অন্তর্জালের এক অন্য পৃথিবী, যাকে তারা বলছে সামাজিক যোগাযোগের সেতু। যে পৃথিবীর নিয়মকানুন, অনুভূতি, আবেগগুলো একেবারেই আলাদা। যেখানে ব্যক্তি তার স্বতন্ত্র একটি পরিচয়ে হাজির থাকে। সেই পরিচয়ে তার বন্ধু গড়ে, ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, আবার শত্রুও হয়। এ যেনো এক প্যারালাল পৃথিবী। ইনসেপশন-এর মতোই এই পৃথিবীর সম্পর্কগুলোর কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। এগুলোকে ছোঁয়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। এখানেও ইনসেপশন-এর মতো এক বাস্তবতা গড়ে ওঠে কেবল মনস্তত্ত্বে। ফলে কখনো কখনো এর ব্যবহারকারীরাও গুলিয়ে ফেলে বাস্তবের দুনিয়া ও ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য। তখন ম্যালকে আর অচেনা ঠাওর হয় না, মনে হয় তাকে তো চারপাশে প্রতিদিনই দেখি। এই ম্যালদের অনেক আগেই খুঁজে পেয়েছিলেন নোলান।

ইনসেপশন-এ একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে ফিশারের অচেতনের গভীরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে গোটা দল একে অন্যের এবং স্বভাবতই কবের অচেতনের গভীরেও প্রবেশ করে। তাই শেষ পর্যন্ত এটা শুধু আর ফিশারকেন্দ্রিক অভিযান না হয়ে একই সঙ্গে কবের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ ও লড়াইয়ে পরিণত হয়, যেখানে কবের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ায় তরুণ স্থপতি আরিয়াডনে। কব সফল হন কি না; নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর কারণে তৈরি হওয়া অপরাধবোধ থেকে নিজের অচেতনকে মুক্তি দেওয়ার সংগ্রামে তিনি বিজয়ী হয়ে ফিরতে পারেন কি নাসেটা চলচ্চিত্রের শেষে উন্মোচন হয়।

৮.

ইনসেপশন-এর শেষটা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিতর্কিত চলচ্চিত্র সমাপ্তি বোধ হয়; যার নাম দ্য স্পিনিং টপ এন্ডিং। বাস্তবতা আর স্বপ্নের মধ্যে ট্র্যাক রাখার জন্য কব একটি লাটিম ব্যবহার করতেন। তিনি স্বপ্নের মধ্যে থাকলে লাটিমটা ঘুরতেই থাকতো, আর বাস্তবে থাকলে লাটিমটা স্বভাবতই একসময় থেমে যেতো। তাই সবশেষে নিজের বাড়িতে যখন কব ফেরেন, সেটা বাস্তব না স্বপ্ন, বোঝার জন্য তিনি লাটিমটা ঘুরিয়ে দেন। ঠিক এই সময় উঠোনের দিকে তাকিয়ে কব তার দুই সন্তানকে দেখতে পান এবং তিনি সন্তানদের দিকে পাগলের মতো ছুটে যান। এরপর লাটিমটা ঘুরতেই থাকলো না পড়ে গেলো, তাতে তার আর কিছুই যায় আসে না। কব লাটিমের দিকে আর ফিরেও তাকান না। জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনকে ফিরে পেয়েছেন কব, এটা স্বপ্ন না বাস্তবতা তা আর তিনি জানতে চান না।

কব এই অনুভূতিতেই বাঁচতে চান, সেটা বাস্তবই হোক বা স্বপ্ন। ক্যামেরা আস্তে আস্তে লাটিমের উপর এসে থামে। লাটিমটা যখন একটু টালমাটাল হয়, তখনই পর্দা অন্ধকার হয়ে আসে। শেষ হয় ইনসেপশন, কিন্তু একজন দর্শক হিসেবে আমার মননে বরং যাত্রা শুরু করে এটি। এই ধরনের সমাপ্তির কারণে ইনসেপশন শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রের বাউন্ডারি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে নিজের সত্যিকার চেহারায় হাজির হয়। তখন বোঝা যায়, গোটা চলচ্চিত্রই আসলে মানবীয় আবেগকে ঘিরে, মানুষে মানুষে সম্পর্কের গল্প নিয়ে। গল্পটি সব থেকেও একা ফিশারের, যে শৈশব থেকে বাবার একটু মনোযোগের কাঙাল হয়ে বসে আছে। গল্পটি স্বামী-স্ত্রীরও, যেখানে স্ত্রী মৃত জেনেও স্বামীর অচেতন মন তার স্মৃতিকে মমি করে রেখেছে। আর সর্বোপরি এটি একজন নিঃস্ব বাবার তার সন্তানদের কাছে ফেরার গল্প।

এই মানবতার গল্পটাই হয়তো নোলান বলতে চেয়েছিলেন, যে জন্য তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ইনসেপশন-এর। যেহেতু নোলান দেখাতে চেয়েছেন মানুষের মনের বহু স্তরীকৃত, বহুমাত্রিক রূপটি; তাই তাকে সাহায্য নিতে হয়েছে স্বপ্নের। যার সাহায্যে তিনি পাড়ি দিয়েছেন বিপুল সম্ভাবনাময় মানব মনের একটার পর একটা ধাপ। তাই শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র ইনসেপশন একটি মানবিক কল্পকাহিনি-ই।

 

লেখক : অনিক ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন।

anikislam.ru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. http:/ww/w.villagevoice.com/film/with-inception-can-christopher-nolan-save-the-summer-6394200; retrieved on 10.06.2016

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Inception; retrieved on 10.06.2016

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন