পলাশ খান
প্রকাশিত ১৯ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সুর ও শব্দের অনন্যতায় মেঘে ঢাকা তারা
পলাশ খান
1755595406.jpg)
ঋত্বিকের সঙ্গীত ভাবনা, চলচ্চিত্রের সঙ্গীত ও শব্দ
মানুষের কল্যাণ চিন্তা ছাড়া শিল্প কতোটা স্বয়ংসম্পূর্ণ তা বলা মুশকিল। যিনি শিল্প তৈরি করেন, তার মধ্যে সেই দায়বদ্ধতা না থাকলে তা শিল্প হয়ে ওঠা কঠিন। সেই জায়গা থেকে শিল্প হিসেবে ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের ব্যবহার কেমন? তার চলচ্চিত্র-নির্মাণের কারুকাজ বিশেষ করে চিত্রনাট্য ও সঙ্গীত—এই দুইয়ের ওপর ভিত্তি করে মেঘে ঢাকা তারার আবহসঙ্গীত নিয়ে লেখার আগ্রহ অনেক দিনের। কিন্তু মনে সংশয়, কী জানি কী ভয়! যাহোক, মেঘে ঢাকা তারা ১৪ এপ্রিল ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায়। ‘চিত্রকল্প কাহিনী’ প্রযোজিত শক্তিপদ রাজগুরু’র ছোটোগল্প অবলম্বনে ঋত্বিকের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় এর সঙ্গীত ও শব্দগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও সত্যেন চট্টোপাধ্যায়।
ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠত্ব তার নির্মিত প্রথম কাহিনিচিত্র নাগরিক থেকেই লক্ষণীয়। যদিও তার মুক্তি পাওয়া প্রথম চলচ্চিত্র অযান্ত্রিক। তার চলচ্চিত্র বরাবরই মাটি ও মানুষের কথা বলেছে। মাটি ও মানুষের কথা বলতে গিয়ে তার চলচ্চিত্রে লোকসঙ্গীতের ব্যবহারও হয়েছে অনেক। ঋত্বিকেরও যে লোকসঙ্গীতের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিলো, তার চলচ্চিত্র দেখে সহজেই তা উপলব্ধি করা যায়। লোকসঙ্গীতের পাশাপাশি আধুনিক ও শহুরে বিষয়েও তিনি সতর্ক ছিলেন। তবে লোকসঙ্গীত নিয়ে ঋত্বিকের নানা নিরীক্ষা রয়েছে। মাটি থেকে উঠে আসা এই গান তিনি গাইয়েছেন একেবারে মাটি থেকে আসা গায়ককে দিয়ে।
লোকসঙ্গীতের প্রতি তাঁর এই আগ্রহের ফলে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিতেও রণেন রায়চৌধুরী নামে একেবারে অপরিচিত ও নবাগত একজন গায়ককে সুযোগ করে দেন ঋত্বিক। তাঁকে দিয়ে গাইয়েছিলেন, ‘কান্দিয়া আকুল হইলাম বব নদীর ফাঁড়ে’। পুরোপুরি সিলেটি উচ্চারণে ‘কান্দিয়া আকুল হইলাম ভব নদীর পারে’ গানটির মধ্যে ‘ভব’ হয়েছে ‘বব’, ‘পাড়ে’র বদলে ‘ফাঁড়ে’।১
সঙ্গীত নিয়ে তার ভাবনা-চিন্তাও ছিলো সুদূরপ্রসারী। ঋত্বিক নিজে বলতেন,
সংগীত। এটি ছবিতে একটি বিপুল অস্ত্র। সময় সময় ব্রহ্মাস্ত্র। সংগীতের মধ্য দিয়ে আমরা অপর একটি স্তরের সমান্তরালভাবে ছবির বক্তব্যকে প্রকাশ করার চেষ্টা করি। নানারকম আছে। যেমন ধরুন, সমস্ত সংগীতের পুরো ছকটিতে মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে, তবে, প্রথম সুরটিকে বসানো হয়। গোড়াতে পরিচয়-লিপিতেই সমস্ত ছবিটার একটা overture তৈরী করার চেষ্টা। তারপর বিভিন্ন চরিত্র, বিভিন্ন মন্তব্যের জন্যে বিশেষ বিশেষ সুর বা কম্পজিসন আসে, শেষ পরিণতিতে সেই বিশিষ্ট সুরটিই বক্তব্যের দ্যোতকরূপে কীভাবে ব্যবহার করা হবে সেটা ভেবেই সুর তৈরী করা। সংগীত অত্যন্ত সংকেতবহ। সেই সংকেত স্বাভাবিকভাবেই চিত্র স্রষ্টার। কাজেই তা ব্যবহৃত হয় বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। তার পেছনে একটা বিশেষ নকশা থাকে।২
এই নকশাকে ঋত্বিক সবসময় মাথায় রাখতেন বলে তার কাছে সঙ্গীতের ব্যবহার অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতো।
ঋত্বিক তার চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের পাশাপাশি শব্দের ব্যবহারও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করতেন। মেঘে ঢাকা তারাতে নানারকম শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এ ব্যাপারে নাকি ঋত্বিক তার সহযোগীদের মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তার অন্যতম সঙ্গীত পরিচালক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র এ প্রসঙ্গে বলেন,
ঋত্বিকের ছবিতে কাজ করতে গিয়েই আমি এনভায়রনমেন্টাল ধ্বনি বেশি ব্যবহার করেছি যানবাহন চলাচলের শব্দ হকারদের ডাক। শহরের শব্দ, রাস্তার শব্দ ভায়োলেন্টলি এসে আছড়ে পড়ে— যেমন মুটের বস্তা পড়ার শব্দ। আমি ব্যবহার করেছি, ট্রেনের সাইডিং করতে করতে বাম্পারে ধাক্কা খাওয়ার শব্দ, চাবুকের শব্দ। যন্ত্রণার দৃশ্যে ককিয়ে ককিয়ে বেহালা না বাজিয়ে আমি দুটো বিকল্প প্রস্তাব করেছিলাম ঋত্বিকের কাছে, ধোপার কাপড় কাচার শব্দ, চাবুকের শব্দ। ঋত্বিক চাবুকের শব্দটা বেছে নিয়েছিল।৩
এ থেকে ঋত্বিকের ভালো শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা উপলব্ধি করা যায়। শব্দ, যা কিনা পর্দার অনেক অব্যক্ত কথাকে প্রকাশ করতে সক্ষম, এটি যদি সচেতনভাবে করা যায়, তাহলে তা একটা অর্থময় জায়গায় দাঁড়ায়। ঋত্বিক ও তার সঙ্গীত পরিচালক ধ্বনি ও শব্দ নিয়ে নানারকম নিরীক্ষা করতেন। জ্যোতিরিন্দ্র তার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলেন এভাবে—
একদিন ঋত্বিকের সঙ্গে ট্যাকসি করে রেড রোড ধরে ময়দানের পাশ দিয়ে আসছি। দেখি, মনুমেন্টের পাশে একদল ভুটিয়া নাকি তিব্বতি, বসে আছে, জামা-কাপড়ের বোঁচকা নিয়ে, তাদের মধ্যে কয়েকজন তিব্বতি সারিন্দা বাজিয়ে মঙ্গোলীয় ধাচের একটা গান গাইছে। ঋত্বিককে গাড়ি থামাতে বললাম। ওদের মধ্যে চারজনকে তুলে আনলাম। বাড়িতে এনে ওদের বলি, এটা বাজাও। দ্রুত ব্যবস্থা করে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়ে ওদের চার পাঁচটা সুর রেকর্ড করি; হালকা করতে করতে দূরগত ধ্বনির আমেজ দিই। কলকাতার জনকোলাহল থেকে সংগৃহীত এই সুর আমি ব্যবহার করেছিলাম ‘‘মেঘে ঢাকা তারা’য় শিলঙে নায়িকার সঙ্গে তার দাদার শেষ কথোপকথনের মধ্যে একটা নিরব মুহূর্তে। তখন দূরে একপাল ভেড়া চড়ছে। প্রায় ৬০০ গজ দূরে সেইখান থেকে একটা লিসকি সাউন্ড এসে টাচ করে, একটা ট্রিকলং সাউন্ড। অনেকে হয়তো ধ্বনিটা মিস্ করেছে। হয়তো আর একটু লাউড হলে লোকে ধরতে পারত। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, ওর চেয়ে বেশি লাউড হতেই পারে না।৪
ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের চমকপ্রদ বিষয় হলো, ধ্বনির একেকটা ‘ক্রিয়েটেড ক্যারেকটার’ হয়ে ওঠা, যা তিনি অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে করতেন বলে ইমেজ কথা বলতো। চলচ্চিত্রের সঙ্গীত ও শব্দের উভয় দিক ঋত্বিকের আয়ত্বে থাকায় তার চলচ্চিত্র জীবনমুখী বিষয়কে আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। এই লেখা মেঘে ঢাকা তারার সঙ্গীত ও শব্দকে খুঁজে দেখার একটি প্রয়াস মাত্র।
শব্দ ও সঙ্গীত : মেঘ এসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়
বড়ো বড়ো গাছ, তার নীচ দিয়ে নিতা হেঁটে আসছেন, আবহে সেতারের সুর সঙ্গে পাখির কিচিরমিচির। সেই সুরের রেশ ধরে দেখানো হয় নিতার দাদা শঙ্কর বিলের ধারে বসে রাগ ইমন গাইছেন। ইমন সঙ্গীতশিক্ষার একদম প্রথম পর্যায়ের রাগ। যা নতুন কিছুকে নির্দেশ করে। শঙ্করের স্বপ্ন তিনি বিরাট সঙ্গীতশিল্পী হবেন, তার সেই স্বপ্নকে নির্দেশ করেই হয়তো ঋত্বিক রাগটি বাজান। অন্যদিকে নিতা যাচ্ছেন টিউশনিতে, দাদার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে চলে যান তিনি। এমন সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে ট্রেন ছুটে চলে। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ, নিতার দাদার রেওয়াজ, সঙ্গে সেতারের সুর বাজতে থাকে। একটি সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় নিতার প্রতিদিনের ছুটে চলা এবং শঙ্করের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে নির্দেশ করে ওই ঝিকঝিক শব্দে ট্রেনের উপস্থিতি। সত্যজিৎ রায়ও কিন্তু তার পথের পাঁচালীতে (১৯৫৬) এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে ট্রেন হাজির করেছিলেন।
ঋত্বিক ট্রেনের এই ছুটে চলা পুরো চলচ্চিত্রটিতে তিন বার দেখিয়েছেন। দ্বিতীয় বার যখন ট্রেনের শব্দ শোনা যায় (৩৩ মিনিট ৪৯ সেকেন্ড) তখন সনৎ ও নিতা বিলের ধারে বসে আলাপ করছেন। আলাপ চলার একপর্যায়ে নিতা উঠে চলে যেতে চাইলে সনৎ তার হাত চেপে ধরেন। ঠিক এই মুহূর্তে ব্যাকগ্রাউন্ডে ছুটে চলে ট্রেন। হয়তো নিতার হৃদয়ের স্পন্দনকে ট্রেনের শব্দ হিসেবে তুলে ধরেন ঋত্বিক, সঙ্গে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন। এরপর এক ঘণ্টা ৩৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে নিতা অফিসে যাওয়ার জন্য গাছের নীচ দিয়ে হাঁটতে থাকেন আর সনৎ তার সামনে এসে দাঁড়ান। তাদের মধ্যে আগে যে সম্পর্ক ছিলো, এতোদিনে তা আর নেই। নিতার ছোটোবোন গীতার সঙ্গে সনৎ এখন সংসার করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সনৎ কথা বলতে চান নিতার সঙ্গে। কিন্তু নিতা তা না শুনে চলে যেতে চাইলে আবারও হাত চেপে ধরেন সনৎ; সঙ্গে সঙ্গে হুইসেল দিয়ে সেই ট্রেন হাজির। ঘটনার আকস্মিকতায় নিতার হৃদয়ের তোলপাড় ট্রেনের হুইসেল হিসেবে দর্শকের কানে বাজে।
মেঘে ঢাকা তারায় প্রাকৃতিক শব্দের প্রাধান্যতা লক্ষণীয়— পাখির কিচিরমিচির, ঝিঝির ডাক, বিড়ালের মিউমিউ, পাতিহাঁসের ডাক, শিয়ালের ডাক, বাজারের হট্টগোল, স্টেশনের হইচই কিংবা হাসপাতালে রোগীদের কোঁকানো। ঋত্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাকৃতিক শব্দ ব্যবহার করেছেন চলচ্চিত্র জুড়ে; কৃত্রিম আবহসঙ্গীতের আবরণে দৃশ্যের ‘বিশুদ্ধতা’ নষ্ট করেননি। প্রথম শটে শঙ্কর গলা সাধা শেষে পাখির কিচিরমিচির শোনা যায়। যা বিলের ধারের পরিবেশকে জীবন্ত করে দর্শককে তার কাছাকাছি নিয়ে যায়। এছাড়া বাজারের দোকানে শঙ্কর বাকি নিতে গেলে দোকানদারের সঙ্গে আলাপের সময় বাজারের হট্টগোল আবহসঙ্গীতের আবরণে ঢেকে যায়নি, বরং চলচ্চিত্রের পরিবেশকে ধরতে তা অত্যন্ত কার্যকর মনে হয়েছে।
মেঘে ঢাকা তারায় প্রাকৃতিক শব্দ হিসেবে ঝিঝির ডাক ঘুরেফিরেই শোনা যায়। নিতা টিউশনির সব টাকা খরচ করে ভাই-বোনদের জামাকাপড় কিনে দিলে মা রুষ্ট হন বাবার বেতনের অল্প টাকায় সংসার চলবে কীভাবে! এতে কষ্ট পেয়ে নিতা ঘরে বসে থাকেন, ঝিঝির ডাক কানে আসে। সাধারণত ঝিঝি রাতে ডাকে, যা নির্জনতা, একাকিত্ব, গম্ভীর ভাব নির্দেশ করে। ঋত্বিক হয়তো এ দিয়ে নিতার একাকিত্ব, তাকে বুঝতে না পারার কষ্টকে ধরতে চেয়েছেন। এর পর আবার সনৎ ও নিতা বিলের ধারে বসে কথা বলছেন, তখনো ঝিঝি ডাকতে থাকে। প্রেমিক-প্রেমিকার একান্ত নির্জন সময়কে তুলে ধরতেই হয়তো ঋত্বিকের এই আয়োজন।
সংসারের জন্য খাটতে খাটতে নিতা নিজের দিকে তাকানোর সময়-সুযোগ পাননি। নিজের অসুস্থতাকে আমলে না নিয়ে কাজ করে গেছেন। যেদিন কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত আসে, সেদিনই প্রথম বুঝতে পারেন শরীরে বাসা বেঁধেছে ‘‘মরণব্যাধি’’ যক্ষ্মা। তবুও এ কথা কাউকে জানতে দিতে চান না তিনি। বরং কারো মধ্যে যাতে এ রোগ ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য নিজের জিনিসপত্র নিয়ে বাইরের ঘরে চলে যান তিনি; আবহে শিয়াল ডেকে ওঠে। সেই ডাক ভীতি ছড়ায়। দর্শক বুঝতে পারেন নিতার জীবন বিপদাপন্ন।
নিতাদের বাড়ির পাশের স্কুল থেকে বারবার ছেলে-মেয়েদের নামতা পাঠের শব্দ শুনিয়েছেন ঋত্বিক। মেঘে ঢাকা তারায় মোট চার বার নামতা পাঠের শব্দ শোনা যায়। যা হয়তো পরিবারটির দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে দিন গোনার ইঙ্গিত বহন করে। সংখ্যাবাচকতা হয়তো নির্দেশ করে জীবনের হিসাব মেলানোর কথাও। কিন্তু জীবনের সব হিসাব তো মেলে না, কিছু অধরাই থেকে যায়। প্রথমবার যখন ছেলে-মেয়েরা স্কুলে নামতা পাঠ করে, তখন (সাত মিনিট ২২ সেকেন্ড) সনতের পাঠানো একটি চিঠি নিতার হাতে দিয়ে যান ছোটোবোন গীতা। নিতার মুখে-চোখে তখন সনতের জন্য ভালোবাসা ও লজ্জা প্রকাশ পায়। নিতা ঘরের দিকে দৌড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। এই নামতা পাঠ হয়তো সনতের সঙ্গে সংসারী হওয়ার দিন গণনার ইঙ্গিত দেয়। যদিও এই সংসারী হওয়ার স্বপ্ন নিতার সত্যি হয় না। আবার একই সময় ছোটো ভাই মন্টুও কলেজে না গিয়ে বালিশ দিয়ে মুষ্টিযুদ্ধের চর্চা করে, স্বপ্ন খেলোয়াড় হওয়ার। সেখানেও স্বপ্ন স্বপ্নই থাকে; শেষ পর্যন্ত তাকেও কারখানায় চাকরি নিতে হয়।
শঙ্কর শিল্পী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকেন। তাই তিনি চাকরির কোনো চেষ্টাই করেন না। চুল-দাড়ি কাটানোর সামান্য টাকাও তাকে পরিবারের কাছ থেকে হাত পেতে নিতে হয়। বেকার শঙ্কর যখন নিতার কাছে টাকা চান (১০ মিনিট ৩০ সেকেন্ড), তখন আবার স্কুল থেকে নামতা পড়ার শব্দ ভেসে আসে। শঙ্করের শিল্পী হতে চাওয়ার স্বপ্ন এবং সেই দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতই মনে হয় এ নামতা পাঠ তুলে ধরে। বেকার শঙ্করকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়। একদিন তার মা তাকে কাজ না করলে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেন। শঙ্কর মায়ের কথায় রাগ করে বাড়ি থেকে চলে যেতে চান। কিন্তু বাইরে যেতেই নিতা তাকে আটকিয়ে বলেন, রাগ না করে আরো কিছুদিন সহ্য করে সঙ্গীতচর্চা করতে। যাতে তার স্বপ্নটা পূরণ হয়। এ রকম পরিস্থিতে (২২ মিনিট আট সেকেন্ডে) আবারও নামতার শব্দ ভেসে আসে।
শেষ বার যখন স্কুল থেকে নামতার শব্দ ভেসে আসে তখন (এক ঘণ্টা নয় মিনিট পাঁচ সেকেন্ড) মা উঠোনে কাপড় তুলছেন। কাপড় তোলা হয়ে গেলে ঘরে আসেন। স্বামীর কাছে গীতার বিয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। কিন্তু তাতে তিনি আপত্তি জানান। স্বামী চান বড়ো মেয়ে নিতার বিয়ে আগে হোক। মা এতে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, নিতার বিয়ে দিলে সংসার কোথায় গিয়ে ঠেকবে। এ রকম পরিস্থিতিতে স্কুল থেকে নামতা পড়ার শব্দ ভেসে আসে। যা সেই জীবনের হিসাব মেলানোর ইঙ্গিতই দেয়।
চলচ্চিত্রের ৩৪ মিনিটের দিকে নিতার বাবা হঠাৎ রেললাইনে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। আবহে গম্ভীর শব্দের আবেশ ওঠে। বাড়িতে চিকিৎসক দেখতে আসেন, সবার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে কী জানি কী হয়! আবহে ঢাকঢোলের শব্দ তাতে বাড়তি মাত্রা দেয়। চিকিৎসকের কথায় স্পষ্ট হয়, বাবা আর কাজ করতে পারবেন না। সংসারের দায়িত্ব এবার বাড়ির অন্যদের নিতে হবে বলে চলে যান তিনি। এ কথা শুনে মা চিৎকার দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিন্তু নিতার চেহারায় দৃঢ় প্রত্যয় ভেসে ওঠে। নিতাকে লো অ্যাঙ্গেল শটে দেখানো হয় এবং আবহে ঢাকের বাদ্য রণসঙ্গীত হয়ে বাজতে থাকে। বোঝা যায়, নিতা সংসারের ভার বহনের চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। পরক্ষণেই তাকে শহরে চাকরিতে যেতে দেখা যায়।
সনৎ এসেছেন নিতাদের বাড়ি। তারা দুজন কথা বলছেন ঘরে বসে। মা জানালার আড়াল থেকে সনৎ ও নিতাকে ঘরে বসে থাকতে দেখেন (২৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ড)। এ সময় আবহে ভাত রান্নার পুটপুট শব্দ শোনা যায়। মায়ের মুখ ও আবহের পুটপুট শব্দে বুঝতে কষ্ট হয় না তিনি শঙ্কায় আছেন— ভাতের পুটপুট শব্দ যেমন রান্নার সমাপ্তি ঘোষণা করে, তেমনি নিতার বিয়ে হলে সংসারে আয়েরও ইতি ঘটবে। এরপর হয়তো আর চুলা জ্বলবে না এ বাড়িতে! এই ধরনের দৃশ্যে যন্ত্রসঙ্গীত ব্যবহারের বিপরীতে প্রাকৃতিক শব্দের ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত ঋত্বিক খুব চমৎকারভাবেই তার নিজস্বতার ছাপ রাখেন।
অন্যদিকে সনৎ চাকরি পেয়েছে শুনে নিতা তার সঙ্গে দেখা করতে যান। গিয়ে দেখেন কপর্দকশূন্য বিজ্ঞান-গবেষক সনৎ চাকরি নিয়ে ‘‘ফুলবাবু’ সেজে বসে আছেন; ঠোঁটে দামি সিগারেট, পায়ে দামি চটি ও সাদা ধুতি। নিতাকে ভিতরে এসে বসতে বলেন সনৎ। এমন সময় ভিতরের ঘর থেকে চুড়ির আওয়াজ শোনা যায় এবং দরজার পর্দায় নারীর হাত দেখা যায়। বাড়িতে অন্য নারীর অস্তিত্ব টের পান নিতা। ভালোবাসার মানুষের প্রতি যে অগাধ বিশ্বাস ছিলো তা টলে যায়; নিতা নীরবে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। আবহে চাবুকের শব্দ শোনা যায়। নিতার হৃদয়ের অন্তর্দহনই চাবুক হয়ে আঘাত করতে থাকে।
সনতের স্বপ্ন ছিলো গবেষণা করে একদিন বড়ো বিজ্ঞানী হবেন। কিন্তু অর্থকষ্টে সে স্বপ্ন বিসর্জন দেন তিনি। কেরানির চাকরি নেন, নিতার ছোটো বোন গীতাকে বিয়েও করেন। কিন্তু মোহ কাটতেই নিতার সামনে এসে দাঁড়ান সনৎ; ভুল বুঝতে পেরে আগের জীবনে ফিরে যেতে চান। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সনতের এসব কথা নিতার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। সম্পূর্ণ কথা না শুনে তাই চলে যান নিতা। সনৎ নিতার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তার মনের মধ্যে অনুশোচনা চাবুকের আওয়াজ হয়ে কানে বাজতে থাকে। আবহসঙ্গীতের বিপরীতে আবহ শব্দের ব্যতিক্রমী এই ব্যবহার নিঃসন্দেহে ঋত্বিকীয় নতুন চলচ্চিত্রভাষার ইঙ্গিত দেয়।
এই আলোচনা শেষ করছি একটা খারাপ লাগা দিয়ে। কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আহত মন্টুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিতা তাকে দেখতে যান। এ সময় আবহে রোগীদের কোঁকানোর শব্দ শোনা যায়। হাসপাতালে রোগীরা হয়তো কোঁকায়, তবে ঋত্বিক এখানে যে পরিমাণ কোঁকানোর শব্দ শুনিয়েছেন, তা একটু বাড়াবাড়িই মনে হয়েছে।
অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে
মেঘে ঢাকা তারার নানা পরিস্থিতিতে ঋত্বিক যেমন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের রাগ ও তানের ব্যবহার করেছেন, তেমনই ব্যবহার করেছেন লোকসঙ্গীত, পাহাড়ি গান ও রবীন্দ্রসঙ্গীত। চলচ্চিত্রের শুরুতে শঙ্করের রাগ ইমন থেকে শেষে নারীকণ্ঠে গাওয়া সিলেটি অঞ্চলের লোকসঙ্গীত ব্যবহারে ঋত্বিক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
চলচ্চিত্রের ৪০ মিনিটে শঙ্করকে হেঁটে হেঁটে রাগ হংসধ্বনি গাইতে দেখা যায়। হংসধ্বনি বিকেলে গাওয়া চঞ্চল প্রকৃতির রাগ। শঙ্করের চঞ্চলতাও দেখানো হয় রাগটি দিয়ে। বিলের ধারে শঙ্কর গলা সাধার সময় গ্রামের এক মেয়েকে পিছন থেকে দেখে নিতা মনে করে তিনি থামান, পরে বুঝতে পারেন তিনি নিতা নন; শঙ্করের হাসিতে তখন চঞ্চলতা ধরা পড়ে। মেয়েটি চলে গেলে আবার শুরু করেন রাগ হংসধ্বনি। এরপর শঙ্কর শহরে গিয়ে সঙ্গীতে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গ্রামে ফিরলে আবারও রাগ হংসধ্বনি নিয়ে হাজির হন। তবে এবার খালি আলাপে নয়, তা ‘‘লগ পতি পতি’’ গানে রূপ নেয়। শঙ্করের ফিরে আসার আনন্দ এবং শিল্পীর মনের চঞ্চলতা গানের মধ্য দিয়ে উঠে আসে।
সনৎ স্টেশনে দাঁড়িয়ে নিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সংসার ও সবার কথা ভেবে তিনি তাতে রাজি হন না। এর পরের দৃশ্যে মুদি দোকানে ব্লেড কিনতে এসে শঙ্করকে কথা শোনায় দোকানদার— কেনো তিনি নিজে কিছু না করে বোনের টাকায় টোটো করে ঘুরে বেড়ান। ছোটো বোনের এমন কষ্টের কথা শুনে শঙ্করও উদাস হন। ঠিক এই সময়ে কাট ওভার সাউন্ডে (৪৫ মিনিট সাত সেকেন্ড) বাউল গান শুরু হয়। ‘‘দুঃসময়ে দিন গুয়াইয়া/ অসময়ে রইলাম নদীর পাড়ে/ মাঝি তোর নাম জানিনে/ আমি ডাক দিমু কারে’— গানের কথাগুলো নিতার অসহায় অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়। সামান্য পরে অবশ্য পর্দায় সেই বাউলকে দেখা যায়। আবহে বাউল গান চলছে; নিতা তার বাবার ঘরে ঢোকেন, সেখানে মাও ছিলেন; ভয়ে ভয়ে তিনি তাদেরকে মন্টুর চাকরি পাওয়ার কথা জানান এবং প্রথম মাসের বেতনের টাকা বাবার হাতে তুলে দিতে চান। না জানিয়ে মন্টু পড়াশোনা ছেড়ে চাকরি নেওয়ায় নিতাকে বকাবকি করেন মা। আবহে তখনো বাউল গান চলছে। একদিকে সংসারের টানাপড়েন, প্রেমের সম্পর্ক, অন্যদিকে মায়ের ভুল বোঝা—সবমিলিয়ে নিতা যেনো অসময়ে ঘাটে এসে পড়েছেন।
নিতাকে নিয়ে মায়ের মনে সংশয় কাজ করে—তিনি যদি বিয়ে করে চলে যান তাহলে সংসার কোথায় গিয়ে ঠেকবে। ঘরের বারান্দায় মা ও নিতা বসে আছেন (৪৯ মিনিট থেকে), সংসারের অবস্থা নিয়ে মা কথা বলছেন তার সঙ্গে। একপর্যায়ে নিতাকে বিয়ে না করার ইঙ্গিত দেন মা। নিতাও মাকে এ নিয়ে আশ্বস্ত করেন। তখন কাট ওভার সাউন্ডে শঙ্করের কণ্ঠে মিয়া মলহার বা মিয়াকি রাগের আলাপ ভেসে আসতে থাকে। পরে অবশ্য শঙ্করকে রেওয়াজ করতে দেখা যায়। সাধারণত বর্ষাকালের গম্ভীর প্রকৃতির নির্দেশ করে এই রাগ। মেঘে ঢাকা তারায় সংসারের ঝিম ধরা পরিস্থিতি বোঝাতে হয়তো এর ব্যবহার করেন ঋত্বিক।
সনতের বাড়িতে অন্য কোনো নারীর উপস্থিতি টের পেয়ে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়িতে ফেরেন নিতা। কিছুক্ষণ পর গীতা বাড়ি আসলে তাকে তিনি সবকিছু বাদ দিয়ে সামনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে বলেন (এক ঘণ্টা ১০ মিনিট ৪৩ সেকেন্ড)। গীতা উত্তর দেন, তিনি পড়ালেখা করবেন না, বিয়ে করবেন। পাত্র কে—এ কথার উত্তরে সনৎ বাবুর নাম বলেন গীতা। কথা শুনে নিতা স্তব্ধ হয়ে যান। নিতার নীরবতা ও আবহে রাগ বৈরাগীর তান এক অসাধারণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। করুণ রসাত্মক বৈশিষ্ট্যের রাগ বৈরাগী নিতার কষ্টের সঙ্গে দর্শককে যেনো একাত্ম করে। ঋত্বিক এখানে চাইলে হয়তো আলাপ দিয়ে রাগটি শুরু করতে পারতেন, কিন্তু তিনি সরাসরি তান বাজিয়েছেন। নিতার মনের অবস্থা যে চরম পর্যায়ে তা বোঝানের জন্য হয়তো আলাপের কোনো সুযোগ ছিলো না, সরাসরি তানে যেতে হয়েছে ঋত্বিককে। অবশ্য শুধু তানেই থেমে থাকেননি তিনি; তান শেষে (এক ঘণ্টা ১১ মিনিট ২৪ সেকেন্ড) ঢাকঢোলের বাজনা দিয়ে নিতার মনের অবস্থাকে ঋত্বিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেখিয়েছেন। যে ঢাকঢোলের বাজনা পরের দৃশ্যে গীতার বিয়ের আয়োজনের আবহসঙ্গীত হয়ে ওঠে। সঙ্গে দেখানো হয় বাড়ির উঠোনে ছেলে-মেয়েরা খেলা করছে, শঙ্খ বাজছে।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১৫ মিনিটে এক রাতে শঙ্কর গানের স্কুলে চাকরি নেওয়ার কথা জানান নিতাকে। একই কথা মাকে জানাতে নিষেধ করেন তিনি। এছাড়া তিনি প্রাইভেটে এম এ পরীক্ষা দেবেন বলেও জানান। এসব কথা কাটাতে শঙ্করকে উদ্দেশ্য করে নিতা বলেন, ‘‘দাদা আমাকে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাবি।’ এ কথা শুনে রেগে যান শঙ্কর; নিতাকে ধমকের সুরে কথা বলেন। নিতাও তার কষ্টের কথা, অসহায়ত্বের কথা বলেন। একপর্যায়ে শঙ্কর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলেন নিতাকে। দুই ভাই-বোনের চরম আবেগী সেই মুহূর্তে শঙ্কর বলেন, ‘‘গান শিখবি?’ চরম কষ্ট বুকে চেপে নিতা বলেন, ‘‘বাসরে গাইতে হবে না।’ চরম পর্যায়ের এই দৃশ্যের ঠিক পরের শটে শঙ্কর গাইতে শুরু করেন—‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে’। যদিও মূল কণ্ঠ দেবব্রত বিশ্বাসের, তার পরও শঙ্করের লিপে আর পরিস্থিতির ব্যঞ্জনায় তা যেনো জীবন্ত হয়ে ওঠে। শঙ্কর গান থামাতেই নিতাকে লো আঙ্গেল শটে দেখিয়ে আবহে আবার সেই চাবুকের শব্দ শোনানো হয়।
নিতাকে দেখতে শঙ্কর পাহাড়ের হাসপাতালে গেলে আবহে পাহাড়ি গান শোনা যায়। সেখানে নিতার সঙ্গে সনৎ পরিবার নিয়ে আলোচনা করার সময় তার মুখে বারবার বাঁচার আকুতি ফুটে ওঠে। একপর্যায়ে নিতা চিৎকার করে তার বাঁচার আকুতি জানান। সেই সময় পাহাড়ে ক্যামেরা প্যান করে, চিৎকারের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। চারিদিকের এই আর্তনাদ নিতার অসহায়ত্বকে এমনভাবে তুলে ধরে, যা দেখে দর্শকের মন ক্ষণিকের জন্য খারাপ না হয়ে পারে না। নিতাকে দেখে শঙ্কর গ্রামে ফেরেন। স্থানীয় বাজারের এক দোকানদার তাকে নিতার কথা জিজ্ঞেস করেন। ঠিক সেই সময় শঙ্করের পাশ দিয়ে নিতার মতোই এক নারীকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। শঙ্কর তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই মেয়েটির চটি ছিঁড়ে যায়, চলচ্চিত্রের শুরুতে নিতারও ঠিক এভাবেই একবার চটি ছিঁড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে আবহে নারী কণ্ঠে করুণ এক লোকসঙ্গীত শোনা যায়। গানটি বিয়ে সম্পর্কিত—মায়ের বাড়ি থেকে মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার সময়ের বিষয়গুলো এ গানে উঠে আসে। মেয়েটির যখন চটি ছিঁড়ে যায়, তখন শঙ্করের দিকে তাকিয়ে তিনি মুচকি হাসেন; কিন্তু শঙ্কর তার দিকে মন খারাপ নিয়েই তাকিয়ে থাকেন—তিনি হয়তো বোন নিতার মতোই এক নারীকে দেখতে পান।
‘যদি জানতেম, তাহার কীসেরও ব্যথা’
চলচ্চিত্র শুধু চলমান চিত্র নয়। চলমান এই চিত্রকে প্রাণ দেওয়াই এর সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। এখানেই প্রয়োজন পড়ে শব্দ ও সঙ্গীতের। যদিও সঙ্গীত ও শব্দ ব্যবহারের সেই চ্যালেঞ্জকে অনেক নির্মাতাই এড়িয়ে যান। তারা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত ব্যবহার করেন, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা ব্যবসার জন্য, চলচ্চিত্রকে আরো জীবন্ত করার জন্য নয়। এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে যে দু-চার জন নির্মাতা শব্দ ও সঙ্গীত ব্যবহারে চলচ্চিত্রে অনন্যতা এনেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ঋত্বিক। শুধু মেঘে ঢাকা তারা দেখেই এ ধরনের মন্তব্য করলে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। চলচ্চিত্রটিতে শব্দ ও সঙ্গীতের ব্যবহার দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, এ নিয়ে তার সম্যক জ্ঞান ছিলো অসাধারণ। বর্তমান প্রজন্মের যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন ঋত্বিকের সঙ্গীত ভাবনা থেকে তাদের মনে হয় অনেক কিছু শেখার আছে।
লেখক : পলাশ খান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা করেন।
polashkhan2020@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. সেনগুপ্ত, বাঁধন (২০১৩ : ১১১); ঋত্বিক চলচ্চিত্র কথা; পুনশ্চ, কলকাতা।
২. প্রাগুক্ত; সেনগুপ্ত (২০১৩ : ১১১)।
৩. প্রাগুক্ত; সেনগুপ্ত (২০১৩ : ১১৩)।
৪. প্রাগুক্ত; সেনগুপ্ত (২০১৩ : ১১৪)।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন