Magic Lanthon

               

আসাদ লাবলু

প্রকাশিত ১৬ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বাংলাদেশের সিনেমা বলে আলাদা কোনো সিনেমা নেই

আসাদ লাবলু

এই ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে

মানুষ লুকাল কোন শহরে।

এবার খুঁজে মানুষ পাইনে তারে ॥


ব্রজ ছেড়ে নদে এল

নদে ছেড়ে কোথায় গেল

যে জান সে বলো মোরে ॥

স্বরূপে এই রূপ দেখা

যেমন হয় চাঁদের আভা

তেমনি মত দেখলো কেবা

ক্ষণেক ক্ষণেক বারাম দেয় রে ॥

 

কেউ বলে তার নিজ রূপ ভজন

লয়ে নিজ দেশে গমন

মনে মনে ভাবে লালন

সেই নিজ দেশ বলি কারে ॥


সাধারণ অর্থে এই নদে কিংবা নদীয়া একটি অঞ্চলের নাম। কিন্তু লালনের নদে তার চেয়েও বেশি কিছু।


বাংলার ভাবান্দোলনের সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র কুষ্টিয়া ও তার সন্নিহিত অঞ্চল, ১৯৪৭ সালের আগে সীমান্তের দুইপাশের ভূখণ্ড নিয়ে যা নদিয়া নামে খ্যাত ছিল। নদিয়ার ভাবের কথা, অধীন লালন জানে কি তা? এই প্রশ্ন ও আকুতির ওপর ভাবচর্চার যে পরিবেশ এই অঞ্চলে সাধুগুরুরা সারাজীবনের ত্যাগ ও তিতীক্ষার বিনিময়ে গড়ে তুলেছিলেন তার কিছুই প্রায় আর অবশিষ্ট নাই।


এই উপলব্ধি ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের; কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের; যখন নদের কিছুই আর প্রায় অবশিষ্ট নাই। ক্ষয় কি শুরু লালনের বর্তমানে; যখন মানুষ নদে ছেড়ে শহরে লুকানো শুরু করলো? আমার বিশ্বাস, নদে ছেড়ে যাওয়া বলতে লালন কেবল স্থানিক বিচ্যুতি বোঝাননি। কারণ, নদের জনসংখ্যা কমেনি, বেড়েছে। যে বিচ্যুতির কথা তিনি বলেছেন, সেই বিচ্যুতি নিয়েই আমি কথা বলতে চাই। তবে তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আলোকে।


আমি বন্দি কারাগারে, আমি কেমন করে পত্র লিখি রে বন্ধু, কান্দিস না রে বিন্দিয়া কিংবা সাদা দিলে কাদা লাগাই দিলি রে বন্ধুয়াএই গানগুলো যারা শুনেছেন তারা মুজিব পরদেশীর নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। নাম শুনে না থাকলেও গান শুনেছেনএ কথা একটি নির্দিষ্ট বয়সিদের ক্ষেত্রে হলফ করে বলা যায়। টেপরেকর্ডারের সেই যুগে এই কণ্ঠশিল্পীর প্রথম অ্যালবামের নাম আমি বন্দি কারাগারে (১৯৮৬)। ৮০র দশকে এই ক্যাসেটটি বিক্রি হয়েছিল ৬০ লাখ কপি। আর নকল করে আরও প্রায় ২৫/৩০ লাখ কপি, যা হয়ে গেলো অডিও ইন্ডাস্ট্রির সর্বাধিক বিক্রিত ক্যাসেটের রেকর্ড।বাংলাদেশের এমন কোন শ্রোতা পাওয়া যায়নি তখন, যার ঘরে এই অ্যালবামটি ছিল না। কিন্তু এই মুজিব পরদেশীকে এখন খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। সত্যি কথা বলতে কী, তার সম্পর্কে জানতে গিয়ে গুগলে সার্চ দিয়েও তেমন কোনো তথ্য পাইনি বললেই চলে, যা দিয়ে মুজিব পরদেশীকে মোটামুটি পাঠ করা সম্ভব। অথচ তার গান অনেক শিল্পী এখনো গাইছেন। আমার দৃষ্টিতে এও এক বিচ্যুতি। পথের পাঁচালী আছে, অথচ সত্যজিৎ নেই; দেবদাস উপন্যাস আছে, কিন্তু শরৎ না থাকলে ব্যাপারটা যেমন দাঁড়াবে, এই বিচ্যুতিও তেমনই।


বাংলাদেশের নায়করাজ রাজ্জাককে এখনো দু-একটি চলচ্চিত্রে দেখা যায়। কিন্তু পর্দা কাঁপানো অভিনয়শিল্পী আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, নাঈম, আমিন খান, শাকিল খান, শাবানা, সুচরিতা, অঞ্জু ঘোষ, নূতনএ রকম অনেকেই হারিয়ে গেছেন। যারা রুপালি পর্দায় এসে এদের মতো জনপ্রিয় হতে পারেনি, তারাও হারিয়ে গেছেএ কথা মানতে খুব বেশি বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রচণ্ড জনপ্রিয় হওয়ার পরও কেনো আলমগীর-শাবানারা হারিয়ে যায়, সে প্রশ্নের জবাব খোঁজা জরুরি। কারণ, এটাও একধরনের বিচ্যুতি।

 

যখন বুঝতে শিখেছি, নায়ক চিনতে শুরু করেছি, তখন দেখেছি বলিউডে আমির খান, শাহরুখ খান ও সালমান খানের রাজত্ব চলছে। আজ দুই-তিন দশক পরে এসেও দেখছি এদের রাজত্ব আর শেষ হয় না। একই দাপট নিয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। ভাবনা সরিয়ে আনি ঢালিউডের দিকে। খুঁজে বেড়াই এমন কেউ আছেন কি না, যারা বাংলা সিনেমায় দুই-তিন দশক আগেও জনপ্রিয় ছিলেন, এখনো আছেন; খুঁজে পাই না। প্রশ্ন জাগে, তারা লুকালো কোন শহরে? প্রশ্ন জাগে, এও কি তবে বিচ্যুতি নয়?

 

সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লাএরা একসময় ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন (এখনো নিশ্চয়ই, তবে তা হালযুগের কোনো গানের কারণে নয়)। সত্যি বলতে কী, এরা সবাই আধুনিক গান (সচরাচর অর্থে) গেয়েছেন ঠিকই; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এদের চেনে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমেই। এদের কাউকেই এখন আর সে অর্থে চলচ্চিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না। বয়সের কারণে এদের এই অনুপস্থিতিএটা আমি মানতে নারাজ। কারণ আমার সামনে বলিউডের আশা ভোসলে, লতা মঙ্গেশকর, উদিত নারায়ণের সক্রিয়তার নজির আছে। তাহলে কি বলবো, সাবিনা ইয়াসমিনদের গান এখন আর কেউ খায়’ না? আমরা কি তাহলে সঙ্গীতে এতোই অগ্রসর হয়েছি যে, সাবিনা ইয়াসমিনদের মতো শিল্পী সেকেলে হয়ে গেছে! নাকি এও এক বিচ্যুতি?

 

উপরের বিষয়গুলোর মতো চলচ্চিত্রনির্মাতা, চিত্রনাট্য, আবহসঙ্গীত, শিল্প-নিদের্শনা, কাহিনি ইত্যাদির বিচ্যুতিও হাজির করা যেতে পারে। কিন্তু বিচ্যুতি প্রমাণ করা এ লেখার মূল প্রয়াস নয়। বরং এর কারণ অনুসন্ধানই আমার লক্ষ্য।


বাংলা চলচ্চিত্রের ‘গোমর ফাঁস

বাংলা চলচ্চিত্রের যে জনপ্রিয়তা এখন নেই, আগে ছিলো; সেই জনপ্রিয়তার একটা বড়ো অংশই টিকে ছিলো তুলনার অভাবে। এমন মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি। সিরাজগঞ্জ সদরের মৌলবীপাড়া আমার গ্রাম; ৯০-এর দশকে এখানে টেলিভিশন ছিলো মাত্র দুটি। সাদাকালো সেই টেলিভিশনে চ্যানেল ছিলো কেবল বিটিভি। অধিবেশন শুরু হতো বিকেল তিনটায়; রাত ১২টার মধ্যেই বন্ধ। শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একটা অধিবেশন চলতো। প্রথম দিকে মাসে চলচ্চিত্র দেখানো হতো একটা। পরে তা প্রতি সপ্তাহে করা হয়। তখন ডিশ-অ্যান্টেনার নামও শুনিনি।

 

ওই সময়ে চলচ্চিত্র দেখার আরো দুটি উপায় ছিলো। এক. ভি সি আর, দুই. সিনেমাহল। গ্রামে ভি সি আর আনা হতো বছরে একবার কি দু’বার। ভি সি আর আনার দিন পুরো গ্রামেই কেমন একটা উৎসব-উৎসব ভাব। তবে ভি সি আর খুব সহজলভ্য ছিলো না। অর্থাৎ, একজন মানুষের চলচ্চিত্র দেখার জন্য টেলিভিশন ও সিনেমাহল ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩) কিংবা স্বজন (১৯৯৫) বলিউডের নকলতৎকালীন চলচ্চিত্র বুঝনেওয়ালা বড়োদের কাছ থেকে তা জানতে পারলেও বলিউডের আসল’’ চলচ্চিত্রটি দেখার সুযোগ ছিলো না। ফলে মাধুরীর মতো মৌসুমী নাচতে না পারলেও আমাদের কাছে একশো-তে সে একশো-ই পেতো।

১৯৯৮-৯৯ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। বিদেশফেরত কিংবা টাকাপয়সাওয়ালা লোকজনের বাড়িতে তখন সিডি’র আবির্ভাব ঘটতে থাকলো। ডিশ লাইন তখনো শহরকেন্দ্রিক। এ অবস্থায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মান যে ভালো না, তা মাঝে মধ্যে ডিশ কিংবা সিডিওয়ালারা বলতেন। ভাষাটা ছিলো এ রকম—‘আরে মৌসুমী তো মাধুরীকে নকল করেছে। মাধুরীর নাচের সঙ্গে কি আর মৌসুমী পারে! এভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে সিডি আর ডিশ লাইনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে মৌসুমীর ‘গোমর ফাঁস’ হতে শুরু করে।

 

প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি ওই সময় বাংলা চলচ্চিত্র, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি টিকেই ছিলো নকল কিংবা অনুসরণ করে? না, মোটেও নয়। শতে চার-পাঁচটা চলচ্চিত্র হয়তো নকল হতো (এ বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন)। কিন্তু মুশকিলটা হলো অন্য জায়গায়। ঐতিহাসিক নানা কারণে ভারত ও বাংলাদেশের সামাজিক গঠন-গড়ন অনেকটা একই। ধর্মের পার্থক্য একপাশে রেখেও সাংস্কৃতিক কিংবা অর্থনৈতিক দিক থেকে দুই ভূখণ্ডের সাদৃশ্য অনেক। এই কারণে ঠিক নকল না করলেও বলিউড কিংবা টালিগঞ্জের চলচ্চিত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মিল পাওয়া যায়। দুই দেশের চলচ্চিত্রেই গান একটা অপরিহার্য বিষয়। পারিবারিক কাহিনির বেশ কদর। রাজনীতির উপস্থিতিও একই কারণে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ।

এই এক হওয়াটাও সমস্যা নয়। কিন্তু একই বিষয়ের মানের হেরফের নিয়ে দেখা দেয় সমস্যা। ভারতের পাইপলাইন দিয়ে একের পর এক কণ্ঠশিল্পী বের হচ্ছে। তাদের ওখানে প্রতিযোগিতাটা অনেক বেশি। সেই প্রতিযোগিতা আবার ‘ক্লোজ-আপ ওয়ান’-এর মতো নয়। সেখানে পারিবারিকভাবে শিশুদের নাচগান শেখানোর সংস্কৃতিটা এদেশের তুলনায় অনেক বেশি; হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, তাদের সঙ্গীতের যে ইতিহাস; তা অনেক অনেক পুরনো। সেই বৈদিককালে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা শুরু হয় সেখানে।

 

আদিকাল থেকে খ্রিস্টপূর্ব দশম শতক পর্যন্ত এই কালের সময়সীমা ধরা হয়। এই সময় কালে হিন্দুদের প্রসিদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থ ‘বেদ’ রচিত হয় বলেই একে বৈদিককাল আখ্যা দেওয়া হয়। চারি বেদের মধ্যে সামবেদ আদ্যন্ত সঙ্গীতময়। সামবেদের মন্ত্রগুলি সুর করে গাওয়া হতো বলেই সেগুলিকে বলা হত সামগান। ... বৈদিককালের মধ্যেই সাতটি স্বরের প্রয়োগ দেখা যায়।

এ কথাও সবাই জানেন, আমরা যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা করি, তা মূলত ওই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতই। সেই হিসেবে, আমরা তাদের মতো করে গান করতেই পারি কিংবা তাদের অনুসরণ করতেই পারি। কিন্তু সেই অনুসরণ কিংবা একাত্মতার মধ্যে ছেদ ঘটানোর মতো বহু ঘটনা ঘটে গেছে। ধর্ম, শাসক, শাসন, রাজনীতি, যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ ইত্যাদি উপকরণের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে সেই ছেদ। আর এই ছেদ আমাদের কেবল বিচ্ছিন্ন করেনি, সঙ্গীতের ব্যাকরণ শেখার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। এই সময়ে এসে এই পিছিয়ে পড়ার নজির দেখি শিশু কণ্ঠশিল্পীদের তারকা বানানোর প্রতিযোগিতাতেও। যদিও সঙ্গীতে মানদণ্ড নিরুপণ করা কঠিন, তবে বুঝতে কষ্ট হয় না, দেশের প্রতিযোগীরা সঙ্গীতের কতো কম ব্যাকরণ জানে।

 

সঙ্গীত নিয়ে এতো কথা বলার কারণ, চলচ্চিত্রে এর ব্যাপক প্রভাব। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, গান করতে হলে কি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভালো জানতেই হবে? না, না জানলেও চলবে। ইতিহাসও তাই বলছে। সেই ইতিহাস হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতের ধারা থেকে আলাদা কিছু নয়। তবে কিছু স্বকীয়তার কারণে আমাদের সঙ্গীতকে আলাদাভাবে দেখানোর উপায় আছে বৈকি। পল্লিগীতি, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, মুর্শিদি ইত্যাদি তার উদাহারণ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতনির্ভর না হলেও এসব গান সহজ কথা আর সরল সুরের কারণে আলাদা একটা জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু আমরা সেই জায়গার দখল ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো ভালো লাগায়, অন্য কোনো দিকে রওনা হয়েছি। যে যাত্রায় লালনের গান বাণীনির্ভর থেকে হয়েছে বাজনানির্ভর। লালন এখন ব্যান্ডের নামও!


বলছিলাম বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘গোমর ফাঁস’-এর কথা। এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসআজো যদি প্রযুক্তির বিকাশ না ঘটতো, ঘরে-ঘরে ডিশ লাইন, কম্পিউটার, সিডি না থাকতো; যদি সব দেশের চলচ্চিত্র দর্শকের সামনে সহজলভ্য না হতো; তবে বাংলাদেশের সিনেমাহলের দশা এতো করুণ হতো না। বন্ধ হয়ে যেতো না শত-শত সিনেমাহল। কিন্তু এ কেবল কল্পনা। প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে চলচ্চিত্র বাঁচানোর প্রস্তাব পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। বরং কী করলে প্রযুক্তি-বিপ্লবের মধ্যেও দেশের চলচ্চিত্রকে একটা জায়গায় দাঁড় করানো যায়, সেই উপায় অনুসন্ধানই এখনকার জন্য কাজের কাজ হতে পারে।


এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, এই প্রযুক্তির মধ্যেও ভারতের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু দুর্বল হয়নি। অবশ্য তাকেও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ধরনের দিক থেকে সে যে গ্রুপে পড়েছে, সেই গ্রুপেই পড়েছি আমরা। ফলে গ্রুপ পর্বেই বাতিল হয়ে আমরা আজ হতাশায় ভুগছি। অন্যদিকে গ্রুপ-চ্যাম্পিয়ন হতে বলিউডকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। এ জয়ের’ মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলোআমরা যে চলচ্চিত্র দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি চালিয়ে আসছিলাম; সে চলচ্চিত্রের শিকড় বলিউডেই। অর্থাৎ, ওই চলচ্চিত্রকে বলিউড নিজের স্বকীয়তা বলে দাবি করতে পারে। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো, গত এক দশক ধরে বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে টালিগঞ্জ বলিউডের পিছন-পিছনই হেঁটেছে। দূরত্বও খুব একটা তৈরি হয়নি। কিন্তু টালিগঞ্জের সবচেয়ে বড়ো অর্জন হলো, মূলধারার বাইরে তাদের চলচ্চিত্রের আলাদা একটা ঘরানা আছে, সেই সত্যজিৎ-ঋত্বিক থেকে হালের অপর্ণা, সৃজিত, মৈনাক বিশ্বাসরা তার নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্যারালাল এই চলচ্চিত্রগুলোই টালিগঞ্জের একটা স্বকীয়তা তৈরি করেছে।


স্বকীয়তা বলি কাকে

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রধান সঙ্কটের জায়গা হলো, তার কোনো স্বকীয়তা নেই। তার আপনি’ বলে আপনার কিছু নেই। তার আরশিনগর বলে কিছু নেই। কোনো দৃষ্টি নেই বারামখানার দিকে। সে আপনাকে আপনি চিনে না। এই যে ইরানি চলচ্চিত্র বলতে আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য, তা বলিউডের চলচ্চিত্রের মতো নয়এ কথা কাউকে তত্ত্ব দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় না। একইভাবে কোরিয়ান চলচ্চিত্র ইরানের মতো নয়, কোরিয়ার মতো নয় আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্রও। হলিউডও একটা ঘরানা। এভাবে প্রান্তিক হলেও কেবল নিজস্ব অবয়ব থাকলে বিশ্ব দরবারে যেকোনো দেশের নামই উচ্চারণ হতে পারে, ইরানের চলচ্চিত্রই তার সবেচেয়ে বড়ো প্রমাণ। স্বকীয়তার মানে সহজ হলেও একে ধরাটা কিন্তু কঠিন। যেমন, প্রথমেই বোঝা দরকার, স্বকীয়তা গড়ে উঠবে কীসের ভিত্তিতে। এই যে আমাদের-আমাদের করছি, তার ভিত্তিতে। আমাদের চলচ্চিত্র বলতে কী বোঝায়? তবে কি জাতীয় চলচ্চিত্রের কথা বলা হচ্ছে? অর্থাৎ, আমরা যে একটা জাতি, আমাদের চলচ্চিত্র সেই জাতির চিহ্ন বহন করবে? হ্যাঁ, ব্যাপারটা সেরকমেরই। এই পর্যন্ত বুঝতে এবং এই পর্যন্ত এগোনোর চেষ্টায় আমাদের কোনো ঘাটতি নেই। আন্তরিকতারও অভাব নেই। কিন্তু জাতীয় চলচ্চিত্র বানানোর জন্য জাতি চিহ্নিত করার কোনো কাজ আজ অবধি এদেশে হয়েছে বলে মনে হয় না। আর এদেশে কেবল চলচ্চিত্র নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রে, জাতীয়তার প্রশ্নেও ‘জাতি’ শব্দটার মীমাংসা হয়নি।


এবার জাতি (Nation) নির্ধারণের চেষ্টায় আসা যাক। এক্ষেত্রে আমার বোঝাপড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারা প্রভাবিত। নেশন কথাটার আলাদা কোনো বাংলা প্রতিশব্দ নেই। আমরা জাতি শব্দটাকেই ব্যবহার করি। যদিও হিন্দু জাতি, মুসলমান জাতি বলে থাকি; কিন্তু জাতি, সেই জাতি নয়। পরবর্তী আলোচনায় জাতি শব্দটাকে নেশন অর্থে বিবেচনা করতে হবে। তাহলে জাতি আলাদা হবে কীসের ভিত্তিতে? নিশ্চয়ই কোনো ঐক্যের ভিত্তিতে। কিন্তু কী সেই ঐক্য, সেটিই সবচেয়ে বড়ো তর্ক। ধর্মের ঐক্যকখনোই হতে পারে না। এই যে আমরা বলি ভারতীয় জাতি; তা কি কেবল হিন্দুদের বোঝায়? সেখানে অন্যান্য কতো ধর্মই তো ভারতীয় জাতির মধ্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সেই হিসেবে আমাদের জাতি বলতে কি কেবল মুসলমান বোঝায়? নিশ্চয়ই না। কারণ, এই বাংলাদেশের মধ্যেও কতো ধর্মের বাস এবং তাদের নিয়েই একটা জাতি।

 

তাহলে কি ভাষার ঐক্য, না; সে কথাও বলার জো নেই। ফের ভারতীয় জাতিকে দিয়েই সেই উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ভাষা জাতির ঐক্যের ক্ষেত্রে সহায়তা করে বটে, তবে তা জাতি গঠনের শর্ত নয়। ভাষা আলাদা, জাতি একএমন নজির যেমন আছে; তেমনই একই ভাষা হওয়ার পরও ভিন্ন-ভিন্ন জাতির নজিরও আছে। আমরা ইংরেজি ভাষাভাষী সবাইকে নিশ্চয়ই এক জাতি বলতে পারবো না। আবার হিন্দি, উর্দু, গুজরাটি ভাষার ভিন্নতায় ভারতীয় জাতিকেও আলাদা করা সম্ভব নয়। একইভাবে ভৌগোলিক সীমারেখাও জাতি নির্ধারণ করে না। এই যে ভারতের কলকাতার সঙ্গে আমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক দাবি করি, ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে তা কি আটকে রাখা গেছে? যুদ্ধ কিংবা রাজনীতির মারপ্যাঁচে ভূখণ্ড আলাদা হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু জাতি হিসেবে এক আছেএমন নজিরের অভাব নেই। তাহলে জাতি কী? রবীন্দ্রনাথ বলছেন


নেশন একটি সজীব সত্তা, একটি মানস পদার্থ। দুইটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে। সেই দুটি জিনিস বস্তুত একই। তাহার মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর একটি বর্তমানে। একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছাযে অখণ্ড উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্ত ভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা। মানুষ উপস্থিতমত নিজেকে হাতে হাতে তৈরি করে না। নেশনও সেইরূপ সুদীর্ঘ অতীত কালের প্রয়াস, ত্যাগস্বীকার এবং নিষ্ঠা হইতে অভিব্যক্ত হইতে থাকে। আমরা অনেকটা পরিমাণে আমাদের পূর্বপুরুষের দ্বারা পূর্বেই গঠিত হইয়া আছি। অতীতের বীর্য, মহত্ত্ব, কীর্তি, ইহার উপরেই ন্যাশনাল ভাবের মূলপত্তন। অতীত কালে সর্বসাধারণের এক গৌরব এবং বর্তমান কালে সর্বসাধারণের এক ইচ্ছা, পূর্বে একত্রে বড়ো কাজ করা এবং পুনরায় একত্রে সেইরূপ কাজ করিবার সংকল্পইহাই জনসম্প্রদায়-গঠনের ঐকান্তিক মূল। আমরা যে পরিমাণে ত্যাগস্বীকার করিতে সম্মত হইয়াছি এবং যে পরিমাণে কষ্ট সহ্য করিয়াছি আমাদের ভালোবাসা সেই পরিমাণে প্রবল হইবে। আমরা যে বাড়ি নিজেরা গড়িয়া তুলিয়াছি এবং উত্তরবংশীয়দের হস্তে সমর্পণ করিব সে বাড়িকে আমরা ভালোবাসি। প্রাচ প্রাচীন স্পার্টার গানে আছে, ‘তোমরা যাহা ছিলে আমরা তাহাই, তোমরা যাহা আমরা তাহাই হইব’। এই অতি সরল কথাটি সর্বদেশের ন্যাশনাল গাথাস্বরূপ।


তোমরা যাহা ছিলে আমরা তাহাই, তোমরা যাহা আমরা তাহাই হইব’—এই চেতনা আজ আমাদের মধ্যে নেই। আমরা পূর্বপুরুষদের আসনে অন্য কোনো পুরুষকে বসিয়েছি। তুমি (পূর্বপুরুষ) নিজের স্বকীয়তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পল্লিগীতি রচনা করেছো; আমিও চলচ্চিত্র বানানোর সময় স্বকীয়তার বিষয়টি মাথায় রাখবোএই কথা আজ অবধি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বাহ্যিক লক্ষণ হিসেবে ধরা দেয়নি।


তাহলে আমাদের দেশে যে চলচ্চিত্রগুলো এখন হচ্ছে, সেগুলো কি জাতীয় চলচ্চিত্র নয়? তা কি আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না? জাতির সমার্থক হিসেবে ‘আমাদের শব্দটা প্রতিনিধিত্ব করলে বলতে হয়প্রতিনিধিত্ব করে না। আর কেনো করে না, তা বোধ হয় উপরের আলোচনা থেকে আন্দাজ করা যায়।


তাহলে আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের নামে কী হচ্ছে? আমাদের দেশে আরেকটি বড়ো বিপদের জায়গা হলো, এখানে ভালো চলচ্চিত্র বানানোর কথা বলা হচ্ছে। চলচ্চিত্র ভালো, আবার চলচ্চিত্র মন্দব্যাপারটাই আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। ভালো চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা কী, কেউ বলতে পারবে? আমাদের চারপাশের তরুণ সমাজের অধিকাংশ বলে, লালন ফকিরের ওপর নির্মিত গৌতম ঘোষের মনের মানুষ দারুণ হয়েছে। আবার শিক্ষক ও সমালোচক আ. আল মামুন চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করতে গিয়ে শিরোনাম লিখেছেন বেশরা ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে ভদ্দরলোকদের সূক্ষ্ম প্রেমের মর্ম বোঝা ভার!! তাহলে এই চলচ্চিত্রটি ভালো না মন্দ, সে রায় কে দেবে? এছাড়া আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অপেক্ষাকৃত ভালো সময়ে যেসব চলচ্চিত্র দেখতে মানুষ সিনেমাহলে হুমড়ি খেয়ে পড়তো, সেগুলো কি ভালো চলচ্চিত্র ছিলো? এর সর্বজনীন উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন।


ভালো চলচ্চিত্রের কথা যারা বলে, তারা নিজেরাই এর মানে খুঁজতে হয়রান। আমাদের এখানে ভালো চলচ্চিত্রের কথা বলে নানা জন নানারকম চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। মূলধারা আর বিকল্প ধারা বলেও দুটি পক্ষের কথা শোনা যায়। মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নিজেকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পেরে উঠছে না। বলা হচ্ছে, ভালো ক্যামেরাসহ অন্যান্য প্রাযুক্তিক সুবিধা, সিনেমাহল ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চলচ্চিত্রশিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। আর বিকল্প ধারা তো ধুয়ে-মুছে এমনভাবে শুরু করতে চায় যাতে মূলধারার কোনো চিহ্ন না থাকে। তাইতো মোরশেদ, তানভীর ও হালের ফারুকীর চলচ্চিত্রে চলচ্চিত্রের লোক’ থাকে না বললেই চলে; টিভি নাটকের লোকজনের ওপরই ভরসা করতে হয়।


গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উদ্ধার প্রকল্পে নানান গবেষণা চলছে। কিন্তু দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। ভবিষ্যতেও উন্নয়নের পথে হাঁটা বেশ কঠিন; যতোদিন না বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বলতে আলাদা কোনো চলচ্চিত্র এখানে দাঁড়ায়। আর দাঁড়াতে হলে নীচের মাটির দিকে তাকাতে হবে। নদীয়া ছেড়ে কোনো কারণ কিংবা বোঝাপড়া ছাড়াই শহরে লুকানো যাবে না। নিজেদের প্রতি নিজেদের ভক্তি থাকতে হবে। জাতির চিহ্ন খুঁজে বের করে, সেই চিহ্ন চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তবেই আর্জেন্টাইন কিংবা ইরানি চলচ্চিত্রের মতো একদিন শোনা যাবে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের কথাও।

 

লেখক : আসাদ লাবলু, কালের কণ্ঠ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

asadmcru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. ‘মানুষ লুকাল কোন শহরে লালন সাঁইয়ের এ গানটির কথা আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত লালনসমগ্র (২০০৮ : ৫৭৫) থেকে নেওয়া। এটি প্রকাশ করেছে ‘পাঠক সমাবেশ’, ঢাকা।

২. http://chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/341/bangla; retrieved on 10.06.2016

৩. http://mediakhabor.com/?p=12591; retrieved on 08.06.2016

৪. http:/ww/w.abasar.net/Unibibidh_bharatsangititihasa.html; retrieved on 10.06.2016

৫. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০১১ : ৬২১); আত্মশক্তি; রবীন্দ্রসমগ্র খণ্ড ২; পাঠক সমাবেশ, ঢাকা।

৬. মামুন, আ. আল; মনের মানুষ : বেশরা ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে ভদ্দরলোকদের সূক্ষ্ম প্রেমের মর্ম বোঝা ভার!!; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১১, পৃ.৬৯।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন