Magic Lanthon

               

মো. ওয়ালিদ হাসান

প্রকাশিত ১৪ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্রে খলচরিত্র : অভিনয়শিল্পী নাকি ‘খলনায়ক’

মো. ওয়ালিদ হাসান

এই ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে

 

নায়ক বনাম খলনায়ক

ইতালির মাফিয়া ডন ভিত্তো কর্লিওন। অপরাধ সাম্রাজ্যকে যিনি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। মার্কিন মুল্লুকে বাস করে, পুলিশ তথা রাষ্ট্রের সব নীতি-নৈতিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের আইনকানুন চালু করেন কর্লিওন। এ রকম এক মাফিয়ার জীবনকাহিনিনির্ভর মারিও পুজোর উপন্যাস অবলম্বনে আমেরিকান নির্মাতা ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র দ্য গড ফাদার। মূলত এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই মাফিয়া বা কসানোস্ট্রা ব্যাপারটির সঙ্গে গোটা বিশ্বের দর্শক পরিচিত হয়। আমেরিকান প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট নাকি সেসময় মাফিয়া ডনের এই চরিত্রটির জন্য আর্নেস্ট বোর্গাইন, অ্যাডওয়ার্ড জি গিবসন, অরসন ওয়েলস, ডেনি টমাস, আন্থনি কুইন ও জর্জ সি স্টকের মতো বাঘাবাঘা সব অভিনেতার কথা ভেবেছিলো। কিন্তু কপোলা বলেছিলেন, লরেন্স অলিভার অথবা মার্লোন ব্রান্ডোকেই তিনি ডনের চরিত্রে চান। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা-ই হয়েছিলো।

নায়ক হিসেবে আগে থেকে পরিচিতি পাওয়া মার্লোন ব্রান্ডো দ্য গড ফাদার-এ খলচরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য এক উচ্চতায়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করা মার্লোন ব্রান্ডো এর আগে প্রায় তিন দশক ধরে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেন হলিউডে। দীর্ঘ এই সময়ে চলচ্চিত্রে নায়কের পাশাপাশি বিভিন্ন চরিত্রেও অভিনয় করতে দেখা গেছে কিংবদন্তি এই অভিনেতাকে। শৈশব থেকে অভিনয়ের প্রেমে পড়া ব্রান্ডো অভিনেতার পাশাপাশি ছিলেন নির্মাতাও। অন দ্য ওয়াটার ফ্রন্ট-এ (১৯৫৪) টেরি মালোয় চরিত্রের জন্য তিনি প্রথমবার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তার ক্যারিয়ারে যোগ হয় আরো বিখ্যাত কিছু চলচ্চিত্র, যেগুলো ব্রান্ডোকে সেরাদের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলো। এসব চলচ্চিত্রের বেশিরভাগেই ব্রান্ডো ছিলেন মূল চরিত্রে মানে নায়ক হিসেবে। অথচ দ্য গড ফাদার-এ সেই ব্রান্ডো নায়কের বেড়াজাল ভেঙে হয়ে গেলেন চলতি ভাষায় খলনায়ক

কপোলা তার চলচ্চিত্রের জন্য কিন্তু নায়ক খোঁজেননি, খুঁজেছিলেন একজন অভিনেতা। কপোলার সেই একগুঁয়েমিতে যে এতোটুকু ভুল ছিলো না তার প্রমাণ মেলে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের অস্কারে। দ্য গড ফাদার ১০টি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়ে পুরস্কার জিতে নেয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য শাখায়। খলচরিত্র নিয়ে এতো কথার অবতারণা এই কারণে যে, মার্লোন ব্রান্ডো নায়ক, খলনায়ক কিছুই ছিলেন না, ছিলেন অভিনেতা। তাই হয়তো তাকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে একটুও বাধেনি কপোলার। এই হলো হলিউডের অভিনেতা, খলঅভিনেতা কাহিনি। কিন্তু এই আলোচনা মোটেও হলিউডের চলচ্চিত্র নিয়ে নয়, এর বিষয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও তার অভিনেতা, বিশেষ করে খলঅভিনেতা, খলনায়কদের নিয়ে। যারা অভিনেতা নন, খলনায়ক হিসেবে পরিচিত। নীচের আলোচনা এই খলনায়কদের নিয়েই।

নায়কের বিপরীতে খলনায়কের চর্চা

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে হাজির থাকেন খলঅভিনেতা। এই খলচরিত্রের শুরু ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে, সেই মার্কিন মুল্লুকেই। সেসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পত্রপত্রিকায় চলচ্চিত্র কেবল আকর্ষণীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপন শুরু হয়েছে। তারকাভিত্তিক ম্যাগাজিন ফটোপ্লে মূলত ওই সময়ই প্রকাশ হয়। সেখানেও খলচরিত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম যে, ভালোর বিপরীতে মন্দ কোনো শক্তিকে দাঁড় করানো এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভালো-মন্দের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ভালোকে এগিয়ে নেওয়া। পরবর্তী সময়ে হলিউডে খলচরিত্র নানা মাত্রা পেলেও, ভারতীয় উপমহাদেশে মন্দ চরিত্রের উপস্থাপন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাঁধা পড়ে যায় মন্দের জালেই।

আপাত ভালো ও মন্দের সমন্বয়ে যেহেতু মানুষ তার জীবন অতিক্রান্ত করে এবং মন্দ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চায়, সেহেতু চলচ্চিত্রের পর্দায়ও মন্দের পরাজয় দর্শককে আনন্দিত করে। ফলে চলচ্চিত্রে খলচরিত্র না থাকলে নায়কের নায়কত্ব ফুটে ওঠে না। চলচ্চিত্রের যে ন্যারেটিভ, সেখানে আদিতে ঘটনার শুরু হয়ে মধ্যে বিস্তার ঘটে; আর অন্তে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সবকিছু মাড়িয়ে নির্মাতা ও দর্শক উভয়েই নায়কের জয় দেখাতে ও দেখতে চায়এই চর্চা চলতে থাকে।

যেকোনো চরিত্রকে ধারণ করে অভিনেতা; সে খল কিংবা নায়ক যাই হোক না কেনো। তার মানে অভিনেতার জন্য চরিত্র আর চরিত্রের জন্য অভিনেতা প্রয়োজন। কোনো চরিত্র কিংবা অভিনেতা তখনই সমস্যায় পড়ে, যখন তা কোনো একটি ছাঁচে পড়ে যায়। ফলে চরিত্র হিসেবে সেটি যেমন তার বৈচিত্র্য হারায়, তেমনই অভিনেতাও ঘেরাটোপে আটকে যান। এসব ক্ষেত্রে অভিনয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ওই চরিত্রের ছাঁচ কী বলে তা।  ফলে নির্মাতা আর অভিনেতা খোঁজেন নাযেমনটি ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা খুঁজেছেনযাকে-তাকে পেলেই তার ওপর কোনো চরিত্রের বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ঘটে খলচরিত্রের ক্ষেত্রে। একই বিষয় যদিও অন্যান্য চরিত্রের ক্ষেত্রেও (নায়ক-নায়িকা) ঘটে, কিন্তু খলচরিত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি হয়। ফলে চরিত্রের জন্য প্রয়োজন হোক আর না হোক নানাধরনের বীভৎসতা এসব চরিত্রের শরীরে হাজির করা হয়।

ফলে নায়ক মানেই যতোটা সুন্দর-সাবলীল, খলনায়কের ক্ষেত্রে একেবারে তার উল্টো। চরিত্রের প্রয়োজনে পোশাক ও প্রপস-এর নানাধরনের পরিকল্পনা হতেই পারে। কিন্তু এই পোশাক-প্রপস যখন চরিত্রটিকে ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সেই অভিনেতা ও চলচ্চিত্র উভয়েরই মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অধিকাংশ দেশীয় চলচ্চিত্রে প্রয়োজনের তুলনায় নায়ক-নায়িকা বা খলচরিত্রকে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হয় পর্দায়। চলচ্চিত্রে নায়িকা বিপদে পড়লে সুদর্শন-শক্তিশালী কোনো পুরুষ এসে তাকে উদ্ধার করে। তখন দর্শকের বুঝতে কষ্ট হয় না উনি নায়ক। একইভাবে নায়িকার আবির্ভাবের সময় ক্লোজ-মিড-লঙ শটে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখানো হয়। নায়ক-নায়িকার বাইরে গালে কাটা দাগ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, গলায় মোটা চেইন, হাতে ব্রেসলেট, লম্বা চুল, এক চোখ কানা, বিকৃত মুখাবয়ব, কুৎসিত ভাষায় কথা বলা নিয়ে পর্দায় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি তাকে খলনায়ক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। নির্মাতারা কোনোভাবেই বুঝতে চান না, কোনো ব্যক্তির মধ্যে ইতিবাচক-নেতিবাচক যাই থাকুক না কেনো, তা মনের মধ্যে থাকে শরীরে নয়। অথচ শরীর আর ক্যামেরার ভাষা যখন গুরুত্বপূর্ণ হয়, তখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে অভিনয়। আর এই ঝুঁকি স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ করে ফেলেছে।

অভিনেতা, নায়ক-নায়িকা ও খলনায়ক

নানাধরনের নারী-পুরুষ রুপালি পর্দায় নানা স্বপ্নে বিভোর হয়ে কাজ করতে আসেন। দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, যারাই চলচ্চিত্রে অভিনয় করার জন্য আসেন, তাদের অধিকাংশই নায়ক বা নায়িকা হতে চান। চলচ্চিত্রের সামগ্রিকতায় এর প্রতিটি চরিত্র যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অভিনয়ে আগ্রহীরা বুঝতেই চান না। অথচ পরিস্থিতির ফেরে পড়ে স্বপ্নবান এই নারী-পুরুষদের কেউ কেউ খলঅভিনেতা, কমেডিয়ান আর বেশিরভাগই হয়ে যান সহযোগী শিল্পী বা এক্সট্রা।

অধিকাংশ সাধারণ দর্শকের মধ্যে চর্চা আছে, চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। ফলে বাকিরা আলোর বাইরে চলে যায়। অভিনয়ের ক্ষেত্রে ধারণাগত এই সমস্যা চলচ্চিত্রের পেশাদারিত্বকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে দিনের পর দিন বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকা-খলনায়ক-খলনায়িকা-কমেডিয়ান-এক্সট্রা জন্ম নেয় ঠিকই, কিন্তু কেউ আর অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠে না! অথচ একজন অভিনেতার যেকোনো চরিত্রে অভিনয় করার অঙ্গীকার নিয়ে চলচ্চিত্রশিল্পে পা দেওয়ার কথা। দেশীয় চলচ্চিত্রে যারা নায়ক-নায়িকা কিংবা খলচরিত্রে অভিনয় করেন, তাদের প্রায় সবাইকে একই ধরনের চরিত্রে বার বার অভিনয় করতে দেখা যায়। ফলে তেমন কোনো ভিন্নতাও দেখা যায় না তাদের অভিনয়ে। সাধারণভাবে অভিনেতা হচ্ছেন তিনিই, যিনি সব চরিত্রে অত্যন্ত সাবলীলভাবে অভিনয় করার ক্ষমতা রাখেন।

বাংলাদেশের খলনায়ক-নায়িকারা

চলচ্চিত্রের কাহিনি অনুযায়ী নায়ক-নায়িকা নেচে-গেয়ে বেড়ায় আর খলঅভিনেতা সেই কাহিনিতে ব্যঞ্জনা যোগ করেবিষয়টি সত্যজিৎ রায়ও গুরুত্ব দিয়েই দেখতেন। তার মতে, ছবিতে খলনায়কই মুখ্য ভূমিকা পালন করে; যে কিনা গল্পকে শ্বাসরুদ্ধকরভাবে এগিয়ে নেয় এবং ছবিতে গতি এনে দেয়। ঢাকাই চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। সেখানেও নায়ক-নায়িকার সঙ্গে সমগুরুত্বপূর্ণ খলঅভিনেতা। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই এই তিন ধরনের চরিত্র পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের সূচনালগ্ন থেকেই যারা ধীরে ধীরে খলঅভিনেতার চরিত্রগুলো সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের তালিকা অবশ্য খুব একটা দীর্ঘ নয়। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত প্রথম দেশীয় সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর মূল চরিত্র ছিলো একজন ডাকাতের। সেই চরিত্রে অভিনয় করেন ইনাম আহমেদ। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা ইনাম আহমেদ মাত্র আট বছর বয়সে প্রথম অভিনয় করেন নাটকে। নিয়মিত নাটকে অভিনয় করা ইনাম, অরুণ চৌধুরী ছদ্মনামে প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে, কলকাতায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের সমাধান-এ। এরপর ১৯৫৬-তে মুখ ও মুখোশ

১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে সালাহউদ্দিনের যে নদী মরু পথেতে খলচরিত্রে অভিনয় করে ইনাম ব্যাপক প্রশংসিত হন। এরপর হারানো দিন (১৯৬১), সূর্যস্নান (১৯৬২), জোয়ার এলো (১৯৬২), কাচের দেয়ালসহ (১৯৬৩) বেশকিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে কাজী জহিরের ময়নামতিতে অত্যাচারী জমিদারের ভূমিকায় অভিনয় করেন ইনাম। পরের বছর পারিবারিক সম্পর্কের টানাপড়েনের গল্প নিয়ে নির্মিত টাকা আনা পাই-এ (১৯৭০) ইনাম মহাজনের ভূমিকায় অভিনয় করেন। প্রায় পাঁচ দশক উর্দু ও বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করা ইনাম নায়কের চেয়ে খলনায়ক’ চরিত্রেই বেশি পরিচিতি পান। ইনামের মতো আরো অনেকেই নায়ক-খলনায়ক উভয় চরিত্রে কাজ করেছেন। আবার অনেকে অন্য মাধ্যম থেকে এসে চলচ্চিত্রে ‘খলনায়ক হিসেবে নিজের জায়গা পোক্ত করেছেন। এমন দিক বিচারে ঢালিউডের ‘খলনায়ক’দের তিনটি আলাদা গোত্রে ভাগ করা যায় :

ক. ঢাকাইয়া ‘খলনায়কেরা

ঢাকার চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের খলঅভিনেতাদের একজন কাজী খালেক। তার জন্ম ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে মুন্সিগঞ্জে। তিনি মূলত স্বপন কুমার নামে কলকাতার চলচ্চিত্রে অভিনয় করতেন। এরপর ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে এ জে কারদার নির্মিত উর্দু ভাষার জাগো হুয়া সাভেরাতে অভিনয় করেন তিনি। পরের বছর ফতেহ লোহানী নির্মিত আসিয়াতে (১৯৬০) অভিনয়ের মাধ্যমে তার কাজ শুরু বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে। অভিনয় জীবনে তিনি মোট ২৮টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। খলঅভিনেতার বাইরে চলচ্চিত্রে অন্য কোনো চরিত্রে অভিনয় করেননি রাজু আহমেদ। কুষ্টিয়ার ছেলে রাজুর সেখানকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ৫০-এর দশকেই আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা এটিএম শামসুজ্জামানের পুরো নাম আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। কৌতুক অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করা শামসুজ্জামানের চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে। আমজাদ হোসেন নির্মিত নয়নমণিতে (১৯৭৬) খলচরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন তিনি। মূলত খারাপ গ্রাম্য মোড়লের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রশংসিত হন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রে গ্রাম্য মোড়ল চরিত্রটি শামসুজ্জামানের পরিপূরক হয়ে ওঠে। কৌতুক অভিনেতা হিসেবে তিন বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া শামসুজ্জামান খলঅভিনেতা হিসেবেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

একই সময়ে খলচরিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন মায়া হাজারিকা। চলচ্চিত্রে তার হাতেখড়ি ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে সাত রং-এর মধ্য দিয়ে। মায়া হাজারিকা শুরু থেকে পুরো সময় খলচরিত্রেই অভিনয় করেন। ঢাকার বিক্রমপুরের ছেলে সিরাজ হায়দার চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন নারায়ণ ঘোষ মিতার সুখের সংসার-এ। প্রথম চলচ্চিত্রে খলঅভিনেতা হিসেবেই তিনি পর্দায় আসেন। এ পর্যন্ত প্রায় চারশো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন সিরাজ হায়দার; এর মধ্যে বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে তাকে খলচরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে। সিরাজ হায়দারের মতো কেবলই খলচরিত্রে অভিনয় করেছেন ঢাকার ছেলে বাবর। তার আসল নাম আবু মো. খলিলুর রহমান। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে রংবাজ-এর মাধ্যমে বাবরের চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ বাবর অভিনয়ের পাশাপাশি বেশকিছু চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেন। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স ফেলো ফিল্মস

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট কুষ্টিয়ার বানিয়াপাড়া গ্রামে আহমেদ শরীফের জন্ম। তার পুরো নাম শরীফ উদ্দিন আহমেদ। খোকন মাসুদ ছদ্মনামে স্বরলিপি (১৯৭২) চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হয় আহমেদ শরীফের। প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেই তিনি খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা আহমেদ শরীফ বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে অভিনয় করেন। বর্তমানেও তিনি খলচরিত্রে অভিনয় অব্যাহত রেখেছেন। এক মুঠো ভাত-এর (১৯৭৬) মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয় বডি শো প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন জাম্বুর। তার আসল নাম বাবুল গোমেজ। ঢাকার ছেলে জাম্বু ছিলেন মূলত ফুটবলার ও বডি বিল্ডার। চলচ্চিত্রে কম কথা বলা, বিশাল শরীরের সঙ্গে ন্যাড়া মাথা ছিলো জাম্বুর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। জাম্বু প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রেই নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন।

জুনিয়র শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করা মাহবুব খান গুঁইও অবশ্য অভিনয় জীবনের পুরোটা সময় খলচরিত্রেই কাজ করেছেন। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করা গুঁই চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু করেন হাসমতের এখানে আকাশ নীল (১৯৭৩) দিয়ে। গুঁইয়ের সঙ্গে একই চলচ্চিত্রে কাজের মাধ্যমে পথচলা শুরু  আদিলের। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট জন্ম নেওয়া আদিলের আসল নাম এ কে এম রেজাউল করিম ভূঁইয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক আদিল ৮০ ও ৯০ দশকে খলচরিত্রে অভিনয় করে বেশ আলোচিত হন। সবমিলিয়ে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। অধিকাংশ চলচ্চিত্রে আদিল খলচরিত্রে অভিনয় করেন। কোটি টাকার কাবিন (২০১১) আদিল অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র।

বরিশালের মো. নাসির দুলাল চলচ্চিত্রে এসে হয়ে যান নাসির খান। সরাসরি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের হাতেখড়ি নাসির খানের। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র চোর (১৯৮৫)। তিনিও বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে অভিনয় করেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে এম কম সম্পন্ন করা ড্যানি সিডাক তরুণদের জনপ্রিয় খলঅভিনেতাদের একজন। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে শহীদুল ইসলাম খোকনের লড়াকুতে তিনি প্রথমবারের মতো অভিনয় করেন। ৮০ ও ৯০ দশকের অন্যতম প্রধান এই খলঅভিনেতা পরবর্তী সময়ে বেশকিছু চলচ্চিত্রে নায়কের চরিত্রেও রূপদান করেন। ড্যানির সমসাময়িক আরেক খলঅভিনেতা কাবিলার আসল নাম মো. নজরুল ইসলাম শামীম। চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু যন্ত্রণার (১৯৮৮) মাধ্যমে। কাবিলা অন্ধকার-এ পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ক্রীড়া জগতেও কাবিলা ছিলেন অত্যন্ত উজ্জ্বল। জাতীয় বক্সিং প্রতিযোগিতায় জয়ী কাবিলা ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে ফুটবলও খেলেছেন। সম্প্রতি কাবিলাকে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দেখা গেলেও আগের সব চলচ্চিত্রে তাকে খলঅভিনেতা হিসেবেই দেখা গেছে। মার্শাল আর্টের ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইলিয়াস কোবরার জন্ম ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি, টেকনাফে। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মাকড়শায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হয় তার। পরে নায়ক রুবেলের বিপরীতে খলচরিত্রে মার্শাল আর্টে অংশগ্রহণ করে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা পান। খলঅভিনেতাখ্যাত কোবরা অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে মারপিটও পরিচালনা করেন।

চলচ্চিত্রে সরাসরি খলঅভিনেত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন নাগমা। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জে জন্ম নেওয়া নাগমার আসল নাম রিনা। প্রথম চলচ্চিত্র খুনের বদলা (১৯৯৩)। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে এফ ডি সি আয়োজিত নতুন মুখ কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সানু শিবার আসল নাম চৌধুরী আজহার আলী। তরুণ খলঅভিনেতাদের মধ্যে তিনি বেশ আলোচিত। মাতৃভূমির মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি। তার অভিনীত সব চলচ্চিত্রেই তিনি খলচরিত্রে অভিনয় করেন।

খ. টিভি-মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রের খলনায়ক

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা ফতেহ লোহানীর পুরো নাম আবু নজীর মোহাম্মদ ফতেহ আলী খান। মাত্র আট বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। কিশোর বয়সে কলকাতায় মুকুন্দ দাসের ‘স্বদেশী’ যাত্রা দেখে তিনি অভিনয়ের প্রতি অনুরাগী হন। কলেজে পড়ার সময় ফতেহ বেশকিছু বাংলা ও ইংরেজি নাটকে অভিনয়ও করেন। পরে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা করা ফতেহ লোহানীর চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি বিমল রায়ের হিন্দি চলচ্চিত্র হামরাহিতে (১৯৪৫)। দেশভাগের পর অবশ্য তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ফতেহ লোহানী অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করে গেছেন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করেন আসিয়া। ঢাকার চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে ফতেহ লোহানীর অভিষেক মহিউদ্দিন নির্মিত রাজা এলো শহরের (১৯৬৪) মাধ্যমে। এতে খলচরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি।

নিয়মিত নাটকে অভিনয় করা আরেক খলঅভিনেতা গোলাম মুস্তাফা। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করা গোলাম মুস্তাফার চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হয় ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত রাজধানীর বুকেতে অভিনয়ের মাধ্যমে। দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা মুস্তাফা প্রথম চলচ্চিত্র থেকেই খলচরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত নাচঘর-এ নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তবে খলঅভিনেতা হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত।

মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে আসা আরেক খলঅভিনেতা দারাশিকোর জন্ম ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি, পাবনায়। তার আসল নাম লুৎফে আযম। দারাশিকো অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাতা, প্রযোজক, পরিবেশক ও কাহিনিকার ছিলেন। খ্যাতিমান অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী রওশন জামিলের আসল নাম ফিরোজা। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে ঢাকায় জন্ম নেওয়া রওশন জামিলের প্রথম চলচ্চিত্র আলী বাবা চল্লিশ চোর (১৯৬৫)। দুইশো ৭৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা রওশন জামিলকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খলঅভিনেত্রী হিসেবে দেখা গেছে; তবে মায়ের চরিত্রেও তিনি ছিলেন অনবদ্য। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশনেও রওশন ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত মুখ। আমজাদ হোসেন রচিত রক্ত দিয়ে লেখা’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে টেলিভিশনে তার যাত্রা শুরু ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে। জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়ায় খলচরিত্রে অভিনয় করে রওশন প্রশংসিত হন। গ্রামের কুটনি বুড়ি, দজ্জাল শাশুড়ি, অত্যাচারী জা ইত্যাদি চরিত্রের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন রওশন জামিল।

কুষ্টিয়ার ছেলে মিজু আহমেদ; আসল নাম মিজানুর রহমান। তরুণ বয়সে স্থানীয় নাট্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত মিজুর চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে নারায়ণ ঘোষ মিতার তৃষ্ণার মাধ্যমে। প্রথম চলচ্চিত্র থেকেই খলচরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। বর্তমানেও খলচরিত্রের দাপুটে এ অভিনেতা প্রায় চারশো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। মঞ্চ, টেলিভিশনের শক্তিমান অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির খলচরিত্রে অভিনয়ের শুরু বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক সংশপ্তক-এর মাধ্যমে। এই নাটকে কান কাটা রমজান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পান। ফরীদি এরপর টেলিভিশন ছেড়ে চলচ্চিত্রে নিয়মিত হন। যদিও এর আগে চলচ্চিত্রে ফরীদির হাতেখড়ি তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়ার মাধ্যমে। চলচ্চিত্রে এসে ঢাকাই খলচরিত্রের বৈশিষ্ট্য অনেকখানি পাল্টে ফেলেন ফরীদি। একটি চলচ্চিত্র শুধু যে নায়ক-নায়িকার ওপরই নির্ভর করে না, খলচরিত্রে অভিনয় করে ফরীদি সেটাও প্রমাণ করেছিলেন। ফরীদির সমসাময়িক আরেক শক্তিমান অভিনেতা সাদেক বাচ্চু; পুরো নাম মাহবুব আহমেদ সাদেক বাচ্চু। মঞ্চ ও টিভি নাটক থেকে চলচ্চিত্রে আসা সাদেক বাচ্চু অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র রামের সুমতি (১৯৮৫)। তার অভিনীত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে তিনি খলচরিত্রে কাজ করেছেন। একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করা আরেক অভিনেত্রী রিনা খান। মঞ্চ নাটক থেকে আসা সেলিনা সুলতানার চলচ্চিত্রে এসে নাম হয় রিনা খান। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র সোহাগ মিলন (১৯৮২)। মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে আসা ডনের আসল নাম মো. আশরাফুল হক। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট বগুড়ার কাটনা পাড়ায় ডনের জন্ম। কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩) ডন অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র। সালমান শাহ্র বিপরীতে খলচরিত্রে অভিনয় করে প্রথম চলচ্চিত্রেই ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন তিনি।

নুরুল আলম আতিকের হাত ধরে গণমাধ্যম জগতে আসেন বর্তমান ঢাকাই চলচ্চিত্রের আলোচিত খলঅভিনেতা টাইগার রবি। শুরুতে তিনি টিভি নাটক ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে রবি প্রথম কাজ করার সুযোগ পান ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সামুরাই মারুফের পারলে ঠেকাতে। তবে তার মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম চলচ্চিত্র মোস্ট ওয়েলকাম ২। সম্প্রতি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তিনি খলচরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছেন।

গ. নায়ক যখন ‘খলনায়ক

মঞ্চ থেকে আসা খলিল উল্যাহ খানের চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত সোনার কাজল-এ নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এরপর প্রীত না জানে রীত (১৯৬৩), সংগম (১৯৬৪), কাজল (১৯৬৫), ভাওয়াল সন্ন্যাসি (১৯৬৫), জংলী ফুল-এ (১৯৬৮) তিনি নায়কই ছিলেন। জংলী ফুল ছিলো নায়ক হিসেবে খলিলের শেষ চলচ্চিত্র। এরপর এস এম পারভেজের বেগানায় (১৯৬৬) খলঅভিনেতা হিসেবে তার পথচলা শুরু। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া অভিনেতা খলিল পরবর্তী সময়ে খলঅভিনেতা হিসেবে সমধিক পরিচিতি পান।

ঢাকার চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন খলঅভিনেতা হিসেবে রাজত্ব করেন ওয়াসীমুল বারী রাজীব। তার জন্ম ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি, পটুয়াখালীতে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার রাজীব তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি করা অবস্থায় চলচ্চিত্রে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত রাখে আল্লাহ মারে কে রাজীব অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে অবশ্য তিনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। পরবর্তী সময়ে খলঅভিনেতা হিসেবে রাজীব ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এই অভিনেতা ৮০-৯০ দশক জুড়ে খলঅভিনেতা হিসেবে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন।

হাজারের বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান পাকা করা বর্তমানের জনপ্রিয় খলনায়ক’ মিশা সওদাগরের জন্ম ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে, ঢাকায়। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে এফ ডি সি আয়োজিত নতুন মুখ কার্যক্রমের মাধ্যমে মিশার চলচ্চিত্রে আগমন। এরপর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে ছটকু আহমেদ পরিচালিত অত্যাচার-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। পরের বছর ওই নির্মাতারই চেতনায় মিশা সওদাগর অভিনয় করেন নায়ক হিসেবে। একই বছর নির্মিত অমরসঙ্গীতেও মিশা নায়কই ছিলেন। তবে দুটো চলচ্চিত্রই বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি খলচরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে তমিজ উদ্দিন রিজভীর আশা ভালোবাসার মধ্য দিয়ে খলচরিত্রে অভিনয়ের হাতেখড়ি মিশার। তারপর আর মিশাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক তিনি খলচরিত্রে অভিনয় করে চলেছেন।

খলঅভিনেতা হিসেবে শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা ডিপজলের পুরো নাম মনোয়ার হোসেন ডিপজল। চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে ডিপজলের আত্মপ্রকাশ ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে মনতাজুর রহমান আকবরের টাকার পাহাড়-এর মাধ্যমে। এরপর আবিদ হাসান বাদলের হাবিলদার-এ নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ৯০ দশকের শেষের দিকে কাজী হায়াৎ পরিচালিত তেজীতে তাকে প্রথমবারের মতো খলচরিত্রে দেখা যায়। টানা কয়েক বছর খলঅভিনেতা হিসেবে আধিপত্যের পর বিরতি নেন তিনি। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে এফ আই মানিকের কোটি টাকার কাবিন-এ আবারও নায়ক হিসেবে দেখা যায় ডিপজলকে। চলচ্চিত্রটি সুপার-ডুপার হিট হলে নায়ক হিসেবে তিনি একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। যদিও কথা বলার ধরন, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, চোখের ভাষা থেকে তিনি কখনোই খলচরিত্রের বৈশিষ্ট্য বাদ দিতে পারেননি। এমনিতেও অবশ্য ডিপজলের অভিনয়ে তেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই। এছাড়াও আলী রাজ, অমিত হাসান, ওমর সানি ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে পরিচিত হলেও ইন্ডাস্ট্রিতে সাম্প্রতিক নানা টানাপড়েনের কারণে এদের খলচরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাচ্ছে।

আমাদের খলনায়ক, আমাদের অভিনেতারা

মুখে ছাগলা দাড়ি, পরনে পাঞ্জাবি-লুঙ্গি, কখনো বগলে, কখনো নিজের আবার কখনো অন্য কারো মাথায় ছাতা ধরাএমন চরিত্রে হরহামেশাই দেখা যেতো তাকে। গ্রামের অত্যাচারী মোড়ল কিংবা মোড়লের সহযোগী, স্বার্থপর বড়ো ভাই, কুচক্রী দুলাভাই, এক কথায় যাকে বলে খারাপ মানুষ রূপে পর্দায় বারবার হাজির হয়েছেন তিনি। চরিত্রের প্রয়োজনে কখনো মানুষকে হাসিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাতে দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়নি, ছুঁয়েছে হাসির আড়ালের ভয়ঙ্কর চেহারায়। তিনি একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। প্রবীণ এই অভিনেতা বর্তমানেও সমান তালে অভিনয় করে যাচ্ছেন নানা চরিত্রে। তবে এখন আগের মতো খারাপ চরিত্রগুলো তাকে কমই ছুঁয়ে যায়। শামসুজ্জামানের অভিনয়শৈলী চিরচেনা ছাঁচিকৃত। একই ভাষায়, অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গিতে নিজেকে বারবার উপস্থাপন করেছেন তিনি। বিষয়টা এতোই পুনরাবৃত্তি হতো যে, কোন সংলাপে কী ধরনের অভিব্যক্তি করবেন তা শামসুজ্জামানের কয়েকটা চলচ্চিত্র দেখা দর্শক সহজেই বলে দিতে পারতো। আগেই বলেছি, তিনি এসব চরিত্রের পরিপূরক হয়ে ওঠেন, যা যেকোনো অভিনেতার জন্যই খুব বেশি স্বস্তিকর নয়। তার পরও একের পর এক সেই একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন তিনি। ফলে যেটা হয়েছে একদিকে ওই ধরনের চরিত্রে নতুন মুখ আসেনি, অন্যদিকে দর্শক একঘেয়েমিতে ভুগেছে। শামসুজ্জামানের মতো ঢাকাই চলচ্চিত্রের অধিকাংশ খলঅভিনেতা দর্শককে একঘেয়েমিতে ফেলেছে।

এটিএম শামসুজ্জামান যেমন গ্রামভিত্তিক চলচ্চিত্রে খারাপ চরিত্রের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন, ঠিক তেমনই শহরের সন্ত্রাসী গডফাদার, চাঁদাবাজ, ভাড়াটে খুনি, রাজনীতিবিদ চরিত্রের পরিপূরক হয়ে ওঠেন রাজীব। গম্ভীর কণ্ঠস্বর ও অভিনয় দক্ষতা দিয়ে তিনি নিজেকে অন্য রকম উচ্চতায় নিয়ে যান। এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা গডফাদার, ক্যাডার হিসেবে এলাকাতে একচেটিয়া রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে বারবার পর্দায় হাজির হয়েছেন রাজীব। পেশাদার খুনি কিংবা ছিনতাইকারী চরিত্রেও অনেক চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। খলচরিত্রগুলোতে অভিনয়ে রাজীব নিজেকে এতোটাই স্বাভাবিক করে তুলেছিলেন যে, কালেভদ্রে দু-একটা ইতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করলেও তার কথা বলার ধরন, মুখভঙ্গি, চোখের ব্যবহার একই রকম থাকতো। ফলে ইতিবাচক ওই সব চরিত্রে কোনোভাবেই রাজীব তার অভিনয়ের দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেননি। রাজীব খলচরিত্রে এতোই সাবলীল ছিলেন যে, এসব চরিত্রে অভিনয় করলে তা অভিনয়ই মনে হতো। ফলে বড়ো অভিনেতা রাজীব আটকা পড়েন নির্দিষ্ট একটা চরিত্রের ভিতরে। রাজীব তার অভিনয় দিয়ে চরিত্র নির্মাণ করেননি বরং চরিত্র একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে রাজীবকে নির্মাণ করেছে।

রাজীবের সমসাময়িক আরেকজন, আহমেদ শরীফও খলচরিত্রের আরেক শক্তিমান অভিনেতা। রাজীবের মতো শহরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলোতেই বেশি দেখা যেতো তাকে। চিকন গোঁফ, সামনে-উপরের দাঁতে ফাঁক, ভয়ঙ্কর চোখের চাহনি তাকে এসব চরিত্রে অনবদ্য করে তোলে। বিগ ক্লোজ শটে যখন এই তিনের সমন্বয়ে আহমেদ শরীফ পর্দায় হাজির হতেন, তখন তিনি ভয়ঙ্কর থেকে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই অনবদ্যতা তাকে অভিনেতা করে তোলেনি, খলনায়ক’ করেছে। আহমেদ শরীফ পোশাকি-ফ্যান্টাসি ধারার প্রচুর চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। সেখানেও একই ধরনের অভিনয় নিয়ে নেতিবাচক চরিত্রে দেখা যেতো তাকে। আবার অভিনেতা আদিলেরও অধিকাংশ চলচ্চিত্র ছিলো পোশাকি-ফ্যান্টাসিধর্মী। রাজীব, আহমেদ শরীফের মতো আদিলকেও শহুরে নানা নেতিবাচক চরিত্রের বাইরে পোশাকি-ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রগুলোতে ষড়যন্ত্রকারী উজির, সেনাপতি কিংবা রাজার ছোটোভাই, শ্যালক ইত্যাদি চরিত্রে বেশি দেখা যেতো। তার হাসি ও চোখের চাহনিতে একধরনের নিষ্ঠুরতা ছিলো। নির্মাতারা বারবার সেই নিষ্ঠুরতাকে চলচ্চিত্রে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। ফলে নির্মাতা নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রে সেটা করতে সফল হলেও আদিল অভিনেতা হিসেবে নির্দিষ্ট জায়গায় আটকা পড়েন।

অন্যদিকে দৈত্যাকৃতি দেহ সঙ্গে ন্যাড়া মাথা নিয়ে পর্দায় হাজির হতেন বাবুল গোমেজ ওরফে জাম্বু। বক্সার ছিলেন কারণেই হয়তো কেবল তার শরীরটাকেই ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন নির্মাতারা। তাই বেশিরভাগ চরিত্রে তাকে তেমন কোনো সংলাপ বলতে দেখা যেতো না। অধিকাংশ সময় তিনি অনেকটা রোবোটিক ভঙ্গিতে প্রধান খলচরিত্রের অধীনস্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকতেন; আর তার আদেশ পালন করতেন। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ডাকাতের চরিত্রেও তাকে অভিনয় করতে দেখা গেছে। বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে জাম্বু প্রধান খলঅভিনেতার নির্দেশে বিভিন্ন রকম অসৎ কার্য সম্পাদন করতেন। তবে সংলাপ কম থাকলেও, কাহিনির প্রয়োজনে মানুষ হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণে জাম্বুকে প্রায়ই ব্যবহার করা হতো। মোটকথা অভিনেতা হিসেবে কোনো অবস্থানেই নিজেকে দাঁড় করাতে পারেননি জাম্বু।

কৃষ্ণবর্ণ মোটা শরীর, টর্চলাইটের মতো গোল গোল চোখ সঙ্গে বাড়াবাড়ি রকমের অশ্লীল’ ভাষার ব্যবহার দিয়ে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ডিপজল। তাকে রাজীব, আহমেদ শরীফের উত্তরসূরি বলা যেতে পারে। তবে খলচরিত্র ভেদে রাজীব, আহমেদ শরীফ প্রত্যেকটি চরিত্রে বড়ো ধরনের পার্থক্য নিয়ে হাজির থাকলেও ডিপজল চরিত্র ভেদে অভিনয়ে সেই পার্থক্য আনতে পারেননি। চোখের একই চাহনি, সংলাপ বলার ধরন অল্প সময়ে তার অভিনয়ে একঘেয়েমি নিয়ে আসে। পরে কিছু চলচ্চিত্রে তিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করলেও খল ও নায়ক চরিত্রের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য আনতে পেরেছেন বলে মনে হয়নি।

ডিপজলের আগে চলচ্চিত্রে নাম লেখানো মিশা সওদাগর বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় খলঅভিনেতা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক খলচরিত্রের অভিনেতাও তিনি। এক কথায় বললে বর্তমানে ঢালিউডের খলচরিত্রে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছেন মিশা সওদাগর। এ মানুষটি খলঅভিনেতা হিসেবে যে অনেকটাই সফল’ সেটা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। কারণ সহস্রাধিক চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে অভিনয় করা মিশা সওদাগর একই সঙ্গে বাংলা ভাই, ঢাকাইয়া মাস্তান কিংবা লাল চোখ-এর মতো প্রায় ৫০-এর অধিক খলনায়ক-প্রধান চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। যা রাজীব ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনো খলনায়কের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা গেছে। কিন্তু তার পরও তার অভিনয়ে একধরনের গতানুগতিকতা রয়েছে। কথা বলার ধরন, হাসির আওয়াজ, চোখের চাহনি কিংবা দাঁত কিটমিট করে নিজেকে খারাপভাবে উপস্থাপন করার যে প্রবণতা, চরিত্র ভেদে সেটার খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারেননি মিশা। ফলে পরিমাণগত দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে অভিনয়ে এগিয়ে থাকলেও গুণগত দিক দিয়ে উল্লেখ করার মতো আহামরি কিছু তার ক্ষেত্রেও অনুপস্থিত।

আবার বর্তমানে নতুনদের মধ্যে হাতে-গোনা যে কয়েকজন খলচরিত্রে অভিনয় করছেন তাদের মধ্যে টাইগার রবি অন্যতম। অধিকাংশ সময় গলায় লকেটসহ অসংখ্য ছোটো চেইন, হাত ভর্তি ব্রেসলেট, থুঁতনি ছুঁই ছুঁই গোঁফ আর শক্তপোক্ত শরীরে চলচ্চিত্রে দেখা যায় তাকে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত কুস্তিগীর জলিল টাইগারের সন্তান টাইগার রবি অভিনয়ে অনুসরণ করেন বলিউডের অভিনেতা সঞ্জয় দত্তকে। ফলে অনুসরণের পাল্লা ভারী হওয়ায় কোথায় যেনো খলঅভিনেতার অভাববোধটা রয়েই যায়। অথচ টাইগার রবিই আবার বলেন, ‘একটা ছবি কতটুকু উপভোগ্য হবে তার সিংহভাগ নির্ভর করে ভিলেনদের ওপর। ছবির চালিকাশক্তিই ভিলেন। ভিলেন যত রুষ্ঠ, ভয়ঙ্কর হবে নায়ক তখন তার ভূমিকা ফুটিয়ে তুলতে পারেন। কথা হয়তো সত্য। তবে ভিতর থেকে রুষ্ট, ভয়ঙ্কর না হয়ে অন্যকে দেখে অভিনয় করায় টাইগার রবির কথা বলা, অঙ্গভঙ্গিতেও অভিনয়ের ছাপ রয়েই যায়।

আসলে একজন গুণী অভিনেতার সব ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার দক্ষতা থাকা আবশ্যক। এককভাবে কেউ নেতিবাচক কিংবা ইতিবাচক চরিত্রে দীর্ঘদিন অভিনয় করতেই পারেন। কিন্তু সেই অভিনয়েও যদি বৈচিত্র্য না থাকে তাহলে অভিনয়শিল্পী-দর্শক সবার মধ্যেই একধরনের একঘেয়েমি চলে আসে। আর এই কাজটিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে দিনের পর দিন চলে এসেছে। হ্যাঁ, চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে হয়তো অভিনেতাদের তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকে না। কিন্তু তাকে যে চরিত্রেই অভিনয় করতে হোক না কেনো, সেটা সাবলীল হওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে নির্মাতাদের যে কোনো দায় নেই, সেটা নয়। কারণ কোনো চলচ্চিত্রের যেকোনো নেতিবাচক সমালোচনার দায় অবশ্যই অভিনেতা নয়, নির্মাতার ওপরেই বর্তায়। চলচ্চিত্রে ভালো কাহিনির অভাববোধ হয়তো বরাবরই ছিলো, এখনো আছে। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো অনুকরণে। কারণ অনুকরণে আর যাই হোক স্বতন্ত্র হওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে যখনই কোনো একটি চলচ্চিত্র একটু ব্যবসাসফল কিংবা প্রশংসা কুড়িয়েছে, তখনই অন্য নির্মাতারা সেটা অনুকরণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সেটা রাজা-রানি, নাগ-নাগিনী, প্রেম-ভালোবাসা, রাজনীতি, সহিংসতা যাই হোক না কেনো। অনেক ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ চলচ্চিত্রে খলঅভিনেতার কোনো সংলাপ কিংবা কাহিনিতে তার জীবনের শেষ পরিণতিও অনুকরণ করা হয়েছে। যেমন : ৯০ দশকের একটি চলচ্চিত্রে খলঅভিনেতা রাজীবকে প্রতিটি সংলাপের আগে-পরে ‘কুতু-কুতু’ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। আবার চলচ্চিত্রের শেষে নায়কের আঘাতে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও ‘কুতু-কুতু’ শব্দটি উচ্চারণ করেন তিনি। হুমায়ুন ফরীদি, মনোয়ার হোসেন ডিপজলসহ হালের মিশা সওদাগরকেও প্রায় অধিকাংশ চলচ্চিত্রেই ওরকম একটি করে সংলাপ বলতে দেখা যায়। যেটা বলতে বলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের শেষে তারা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন।

যদিও হুমায়ুন ফরীদির ‘আমি সত্য বলি না, আমি মিথ্যা বলি না; আমি কুলু কুলু,ওই ওই’; মনোয়ার হোসেন ডিপজলের সান্ডে মান্ডে কোলোজ কইরা দিমু’; মিশা সওদাগরের ‘হেসে খেলে নেবো জান, নাম আমার দাউদ খান ইত্যাদি সংলাপ দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিলো, কিন্তু সেটাও একধরনের একঘেয়েমি ছাড়া কিছুই নয়। কারণ দর্শক-শ্রোতা খলঅভিনেতার মুখে এমন কোনো সংলাপ চলচ্চিত্রের শুরুতে শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বলে দিতে পারতো শেষেও ওই একই সংলাপ বলে তিনি বিদায় নিবেন। আসলে চলচ্চিত্রের অন্যান্য সমস্যার মতো এগুলোর মূল কারণও হয়তো এই মাধ্যমটিকে শিল্পমাধ্যম হিসেবে না দেখা। প্রযোজক, নির্মাতা, অভিনেতারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়তো এই মাধ্যমটিকে কেবল ব্যবসায়িক আধেয় হিসেবেই দেখেন! কিন্তু এই দুইয়ের সমন্বয়েই তো চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে।

অভিনেতা চাই

প্রকৃতির নিয়মে নাকি কখনো শূন্যস্থান শূন্য থাকে না। যেকোনোভাবেই হোক প্রকৃতি নাকি একজনের শূন্যস্থানে অন্যকে বসিয়ে দেয়। কিন্তু ঢাকাই চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কেনো জানি তেমনটি ঘটছে না। যদিও ঢাকাই চলচ্চিত্রে ইন্ডাস্ট্রি বলে বর্তমানে তেমন কিছু নেই, তার পরও অবশিষ্ট বলে যা আছে, তাও দিন দিন অভিনয়শিল্পীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অভিনয় নিয়ে নানা নেতিবাচক সমালোচনা থাকলেও অনেকদিন পরও একজন ইনাম, দারাশিকো, রাজীব, হুমায়ুন ফরীদি, খলিল, রওশন জামিল, মায়া হাজারিকার খুব অভাব ইন্ডাস্ট্রিতে। তাই এখনো ভরসা সেই আহমেদ শরীফ, মিশা, মিজু কিংবা সাদেক বাচ্চুই। এর ফলে যেটা হচ্ছে, একই রকম অভিনয় দেখতে দেখতে দর্শক ঝিমিয়ে পড়েছে। এদিকে খলচরিত্রে অভিনয়ে বৈচিত্র্য না থাকার জন্য একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করেন খলঅভিনেতা ডন। তার ভাষ্য, ‘ইন্ডাস্ট্রিতে সিনিয়ররা জুনিয়রদের সুযোগ দিতে চান না। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারের লোকজনই কাজ করছে। মেধা থাকা সত্ত্বেও দলীয়করণের জন্য অনেকেই কাজ করতে পারছেন না। মেধাহীনরা সুযোগ পাচ্ছে। তাই সিনেমার মানও নামছে।’৬ কিন্তু চলচ্চিত্রনির্মাতা সোহানুর রহমান সোহান আবার ভিন্ন কথা বলেন। তার মত এ রকম,

সবাই চায় চলচ্চিত্রে এসে নায়ক নায়িকা হতে। কেউ খলনায়ক বা খলনায়িকা হতে চায় না। কিন্তু তারা যদি এ চরিত্রে এসে ভালো অভিনয় করে তাহলে দর্শকতো তাদেরকেও চিনবে। তাদের নামের উপর ভিত্তি করে দর্শকরা হলে গিয়ে ছবি দেখবে। নতুন যারা আসবে তারাতো একদিনে এসে এ জায়গা দখল করতে পারবে না। সময় নিয়ে তাদের কাজ করতে হবে। এ ধরনের মনোভাব নিয়ে অভিনয়ে এসে কাজ করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, আসলে সমস্যাটা কী? এটা এক কথায় বলা মুশকিল। কারণ এর পিছনে অনেকগুলো সমস্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকাই চলচ্চিত্রে অভিনেতা তৈরি না হওয়ার পিছনে দক্ষ নির্মাতা ও চলচ্চিত্রবিষয়ক শিক্ষার অভাব, প্রযোজকের অপেশাদারিত্ব, দুর্বল কাহিনি-চিত্রনাট্য যেমন দায়ী, ঠিক তেমনই দিনের পর দিন পুরনো অভিনেতাদের একই ধরনের অভিনয়ের উপস্থাপনও দায়ী। এই দুই পক্ষের চাপে তাই অনেকে নায়ক-নায়িকা-খলনায়ক হয়তো হচ্ছে, কিন্তু অভিনয়শিল্পী হচ্ছে না।

আসলে একজন প্রকৃত অভিনেতাই গল্পের হিরোভারতের প্রখ্যাত অভিনেতা ইরফান খানের মন্তব্য এটি। আপনাকে সবাই অভিনেতা মনে করে, হিরো মনে করে না। আপনি নিজেকে কোন দলে রাখতে চান’এমন প্রশ্নের জবাবে ইরফান এমনটি বলেছিলেন। ইরফান হিরো নয়, অভিনেতা হতে চেয়েছেন এবং অভিনেতা হওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে হিরো বানাতে চেয়েছেন। তার মানে আগে অভিনয়, তারপর হিরোগিরি। আর অভিনেতা হওয়ার আগেই যদি কেউ ‘খলনায়ক’ হয়ে যায়, তাহলে নানা বিপত্তিতো ঘটবেই।

 

লেখক : মো. ওয়ালিদ হাসান, তিনি রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী।

walidhasants@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. হায়াৎ, অনুপম (২০০৪ : ২১); চলচ্চিত্রবিদ্যা; বাংলাদেশ চলচ্চিত্র অধ্যয়ন কেন্দ্র, ঢাকা।

২. ‘খলনায়ক সংকটে ঢাকার ছবি’; বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৫।

৩. http://goo.gl/p0UWPy; retrieved on 26.05.2016

৪. http:/ww/w.bmdb.com.bd/person/1898/; retrieved on 26.05.2016

৫. http:/ww/w.bmdb.com.bd/person/1898/; retrieved on 26.05.2016

৬. http://bangla.bdnews24.com/glity/article889185.bdnews; retrieved on 27.05.2016

৭. http:/ww/w.banglamail24.com/news/2015/05/11/id/210793; retrieved on 27.05.2016

৮. খান সাহেবের বয়ান ...; বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ এপ্রিল ২০১৬।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন