Magic Lanthon

               

প্রদীপ দাস

প্রকাশিত ২৮ জুলাই ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আনফ্রিডম : বন্দি রাজ্যে অপরের হালচাল

প্রদীপ দাস


পৃথিবীতে যে যুদ্ধ আজ নিত্যসঙ্গী, তার প্রভাবে প্রতিদিন শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, হাজারও মানুষ হচ্ছে শরণার্থী। এই অরাজক পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিশ্বনেতাদের কর্মতৎপরতারও যেনো কমতি নেই। যেসব অপশক্তির কারণে এই যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, তাদের দমনে এই হর্তাকর্তারা পেন্টাগন প্রতিষ্ঠা করেছে। এই অপশক্তিগুলো যাতে কোনোভাবেই সহিংসতা করতে না পারে সেজন্য গঠন করেছে এন এস এ, এফ বি আই, সি আই এ, , আই এস আই-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থা। এর বাইরে বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাত যাতে না বাধে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন-নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সামাজিক অগ্রগতি-মানবাধিকার রক্ষায় তারা প্রতিষ্ঠা করেছে জাতিসংঘ; আরো কতো কি!

বিশ্বের হর্তাকর্তারা এতো কিছু করার পরও কেনো যেনো সঙ্কট কাটছে না, বরং বাড়ছেই। এদিকে ‘অপশক্তি’, ‘জঙ্গি’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘চরমপন্থি’, ‘সন্ত্রাসী’, ‘অস্বাভাবিক’দের দমনের নামে নির্বিচারে সামরিক সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারিতে রাখছে বিশ্ববাসীকে। অন্যদিকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাহায্যে জায়েজ করা হচ্ছে সবকিছু। এর মধ্য দিয়ে চলছে পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। তাহলে এ রকম প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া কি অবান্তরহর্তাকর্তাদের এতো আয়োজন এই উদ্ভূত পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে নাকি টিকিয়ে রাখতে? স্বার্থ যদি টিকিয়ে রাখাই হয়, তবে সেই স্বার্থের উৎপত্তি কোথায়?

এর উত্তর খুঁজতে আমাদের একটু পিছনে ফিরতে হবে। পশ্চিমে শিল্পবিপ্লব শুরু হলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল যেতো। সেই সঙ্গে জাহাজে করে আরো একটি জিনিস নেওয়া হতো, সেটা শ্রমিক। যারা ওই কাঁচামালকে কারখানায় পণ্যে রূপান্তর করবে, আবার সেই পণ্য অর্থের বিনিময়ে এই শ্রমিকরা ও যেসব দেশ থেকে শ্রমিক/কাঁচামাল নেওয়া হতো তারাই ব্যবহার করবে। তাই পশ্চিমে পুঁজির পাহাড় আকাশচুম্বী রূপ নিতে থাকে; অন্যদিকে প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলো হয়ে পড়ে সম্পদ শূন্য। বর্তমানে এই উৎপাদন ধরনের রূপ কিছুটা পরিবর্তন করে পুঁজি আরো স্ফীত হচ্ছে। এদিকে পুঁজির স্ফীতিতে মাংস লাগাতে লাগাতে সাধারণের চামড়া-হাড্ডি ছাড়া কিছুই থাকছে না।

উত্তর থেকে দক্ষিণ কিংবা পূর্ব থেকে পশ্চিম মেরু, এর মধ্যে কোনো কিছুই পুঁজির শিকারের বাইরে থাকার কথা নয়। স্বাভাবিকভাবেই মানব শরীরও এর অন্তর্ভুক্ত। পুঁজি এই শরীরকে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে জন্ম দেয় যৌনতা। যেখানে তাদের নির্ধারিত বিপরীতকামিতা ব্যতীত সমকামিতা কিংবা উভকামিতা নিষিদ্ধ। ফলে সমকামি বা উভকামিরা বরাবরই হয়ে থাকে নিগ্রহের শিকার। কখনো কখনো তা রূপ নেয় ভয়াবহ সহিংসতায়। একই সঙ্গে পুঁজির শিকার হয়ে জন্ম নিচ্ছে আই এস আই এস-আল কায়েদা-বোকো হারাম-এর মতো নতুন নতুন মুসলিম জঙ্গি সংগঠন। পুঁজিপতিরাই আবার এদের লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে বৈধ করে নেয় ভয়াবহ নিষ্ঠুরতাকে। তাই শরীরের রাজনীতি, অস্ত্রের রাজনীতি, ভৌগোলিক রাজনীতি কিংবা ধর্মের রাজনীতিযাই বলা হোক না কেনো, সবকিছুতেই রয়েছে সহিংসতা। সারা দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত এই রক্তে রক্তে লাল হওয়া বা সহিংসতাকেই প্রতিপাদ্য করে নবীন নির্মাতা রাজ অমিত কুমার নির্মাণ করেছেন আনফ্রিডম (২০১৫)। আলোচনা এগিয়ে যাবে আনফ্রিডমকে ঘিরেই। 

আনফ্রিডম সংক্ষেপ

পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুটি শহরনিউইয়র্ক ও নয়া দিল্লি। দুই শহরের দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে আনফ্রিডম। পাকিস্তানি মুসলিম মৌলবাদী মোহাম্মদ হুসেইন। যার রয়েছে ভয়াবহ, নিষ্ঠুর এক অতীত। হুসেইনের সামনেই সন্ত্রাসীরা তার পরিবারের সদস্য ও তাদের বাড়িতে আশ্রিতদের ধর্ষণ-নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করে। একপর্যায়ে কৈশোরের ওই ঘা নিয়ে হুসেইন নিউইয়র্কে যান। কিন্তু হুসেইন আবার সন্ত্রাসীদের দ্বারাই প্ররোচিত হয়ে অপহরণ করেন অ্যাক্টিভিস্ট ও শান্তিপ্রিয় মুসলিম ফরিদ রহমানিকে। হুসেইন তার অতীতের মতোই অমানুষিক নির্যাতন চালায় ফরিদ রহমানি ও তার পরিবারের ওপর। ফরিদ রহমানি ও ছেলে জর্ডানের সামনেই হত্যা করে স্ত্রী জানাকে। পরে হুসেইনের মতোই জর্ডানও তুলে নেয় অস্ত্র।

অন্যদিকে লিলা সিং, তিনি ভালোবাসেন উভকামি-চিত্রশিল্পী-অ্যাক্টিভিস্ট সাখি টেইলরকে। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তা বাবা দেবরাজের মতো এই রাষ্ট্র-সমাজ তার ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দেয় না। তাই আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ লিলা সিদ্ধান্ত নেন ভালোবাসার মানুষটিকে অপহরণ করার। অপহরণ করতে ব্যর্থ হলেও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তারা চলে যান সমাজ-রাষ্ট্র থেকে অনেক দূরে। কিন্তু সমাজ-রাষ্ট্রের চোখ তারা এড়াতে পারেন না। দেবরাজ মেয়ের এই কর্মকাণ্ডকে মেনে নিতে না পেরে, নিজে বসে থেকে থানার হাজতে পুরুষ-পুলিশ দিয়ে লিলাকে ধর্ষণ করান। সমাজ-রাষ্ট্র্রের এই দীর্ঘদিনের চর্চায় লিলা-সাখিদের ভিন্নতা যেনো এখন স্বাভাবিক! একই সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে গেছে লিলা-সাখিদের ওপর রাষ্ট্রের সহিংসতা। আনফ্রিডম যেনো এই বিষয়গুলোকেই উসকে দেয়।

ধারণা হিসেবে সমকামিতা ও জঙ্গিবাদ

সমকামিতা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নির্মিত কোনো ধারণা কিংবা অস্বাভাবিক বা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কিছু নয়। এটি মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। মানুষের যৌন প্রবৃত্তি মস্তিষ্ক থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এটি নিয়ন্ত্রণ করে হাইপোথ্যালামাস নামক একটি গ্রন্থি। এই হাইপোথ্যালামাসের interstitial nucleus of the anterior hypothalamus  (INAH3) অংশটি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আকারে ভিন্ন হয়। যাদের INAH3 অংশটি আকারে ভিন্ন, তারাই সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন ও সমকামি হন। সমলিঙ্গের প্রতি এই আকর্ষণ বোধ শিশুকালের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে কৈশোরেই অনুভূত হতে থাকে। ধীরে ধীরে সমকামিরা বুঝতে পারেন, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ না করলেও সমলিঙ্গে তারা স্বাচ্ছন্দ্য। সমকামিদের নিয়ে এমন ধারণাই পোষণ করে বিজ্ঞান।

এদিকে সমকামিতা-উভকামিতাকে অশুভ, অশুচি, অস্বাভাবিক কিংবা বিকৃত মানসিকতা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে নারাজ ধর্ম। তাই ধর্মে এদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ইসলাম ধর্ম মতে,

পুরুষ কোন পুরুষের সাথে অথবা জন্তুর সাথে অপকর্ম করলে তা ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা এবং এর শাস্তিও ব্যভিচারের শাস্তি কিনা, এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সূরা নিসার তফসীরে করা হয়েছে। তা এই যে, অভিধানে ও পরিভাষায় যদিও একে ব্যভিচার বলা হয় না, তাই হদ প্রযোজ্য নয়; কিন্তু এর শাস্তিও কঠোরতায় ব্যভিচারের শাস্তির চাইতে কম নয়। সাহাবায়ে কিরাম এরূপ ব্যক্তিকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার শাস্তি দিয়েছেন।

এছাড়া খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মেও সমকামিদের জন্য এ রকম কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ও হিন্দুধর্মে সমকামিতা নিয়ে সরাসরি কোনো কিছুর উল্লেখ না থাকলেও তা মেনে নেওয়া হয় না; দণ্ড দেওয়া হয়।

তবে বোধগম্য কোনো একটা শব্দ শোনার পর স্বাভাবিকভাবেই ওই সম্পর্কিত কিছু ধ্যানধারণা আমাদের চিত্রপটে ভেসে ওঠে। ওই শব্দ সম্পর্কিত ধারণা কিন্তু একদিনে বা হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না। অর্থাৎ আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে ওই শব্দ সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। তবে কিছু কিছু শব্দের অর্থ বা ধারণা সমাজ-রাষ্ট্র স্বার্থগত কারণে সচেতনভাবে নির্মাণ করে থাকে। যৌনতা ধারণাটি এমনই একটি নির্মাণ বলে মনে করেন মিশেল ফুকো। আর সমকামিতা যৌনতার একটি ধরন মাত্র। এই যৌনতার মধ্যে আরো রয়েছে উভকামিতা, বিষমকামিতা। এছাড়াও রয়েছে আরো বেশকিছু শাখা-উপশাখা।

তবে যৌনতা ও শরীরের সুখের (যৌন সঙ্গম) মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সেটা হলো বর্তমানে শরীরের সুখ অনেকটা পরিবারের মধ্যেই আবদ্ধ। যেখানে রাষ্ট্র-সমাজ-ধর্মের সব নিয়ম অনুযায়ী থাকবে শুধু বিবাহ, বৈধ সঙ্গম, সঙ্গম-সংঘর্ষে উৎপন্ন সন্তান। সেই সন্তানের কাছে হস্তান্তর করা হবে এইসব নিয়মকানুন-নিয়ন্ত্রণ, সম্পত্তি ও ক্ষমতা; পরে সেও বজায় রাখবে এর ধারাবাহিকতা। আর এই যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে তৃপ্তির জায়গায় কেউ যাবে না, এটাই যেনো নিয়ম! তাই একে শরীরের সুখ না বলে যান্ত্রিক সুখ বললে হয়তো ভুল হবে না। বিপরীতে যৌনতা একেবারেই ব্যক্তিগত বিষয়। যার সঙ্গে গোপন কামনা-বাসনা জড়িত। তাই এ ব্যাপারে সবসময় চুপচাপ থাকাই শ্রেয়। সেজন্য বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীরা যতোই মানসিক দুশ্চিন্তায় পড়ক না কেনো, গোপন জায়গায় যে জটিল রোগই হোক না কেনো, তা কিছুতেই প্রকাশ করা যাবে না! কারণ এগুলো যৌন বিষয়।

বর্তমানে সারাবিশ্বে যৌনতা প্রায় একই অর্থে ব্যবহার হলেও এর নির্মাণ কিন্তু প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে একভাবে হয়নি। তবে এই যৌনতা নির্মাণের ক্ষেত্রে দুই জায়গাতেই মূল খুঁটি হিসেবে যে বিষয়টি কাজ করেছে, সেটি হলো ক্ষমতা। প্রাচ্যে যৌনতা নির্মাণের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা বা সত্য নেমে আসে উপর থেকে। অর্থাৎ দীক্ষার পরম্পরায়। ভারতীয় উপমহাদেশে শরীরের জৈবিক সুখ নিয়ে যে বইটি পাওয়া যায় সেটি হলো কামসূত্র। এই প্রামাণ্য যৌনাচার সম্পর্কিত গ্রন্থটি পণ্ডিত মল্লনাগ বাৎস্যায়ন সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন। এটিকে এখনো কামের জন্য অন্যতম প্রধান বই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার মানে এই বইটি ছাড়া কাম নিয়ে খুব বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ভারতবর্ষে হয়নি। তাছাড়া বইটি সংস্কৃত হওয়ায় সাধারণের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্যতাও পাওয়ার কথা নয়।

তাই এখানে কাম সম্পর্কে যেকোনো জ্ঞানই নিতে হয়েছে বড়োদের কাছ থেকে। অনেকটা আদিকালে বেদ যেভাবে বংশ পরম্পরায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা (সেসময় লিখিত বেদ না থাকায় বড়োদের কাছ থেকে ছোটোরা শুনে শুনে মনে রাখতো। বংশ পরম্পরায় এভাবেই চলতো।) মনে রাখতো। আর কামজ্ঞান লাভের চর্চা গোপনেই হতো। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে পশ্চিমাদের উপনিবেশ স্থাপনের পর থেকে যৌনতা বা সমকামিতার ধারণা অনেকটা পশ্চিমের মতো করেই গড়ে উঠতে থাকে। আর পশ্চিমে মধ্যযুগে যৌনতার

সত্য উন্মোচন হত দুটি পর্যায়েপ্রথম, রোগীর বয়ানে, যদিও রোগী জানে না তার এই বয়ান কেনদ্বিতীয়, বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যার মাধ্যমে যা আবার রোগীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই দ্বৈত সম্পর্কের মধ্যেই যৌনতা সম্পর্কিত সত্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং এইভাবেই তা বৈজ্ঞানিক বৈধতাও অর্জন করছে। ... কীভাবে যৌনতা ব্যক্তির সত্তা এবং তার আইডেনটিটির এক মূল উৎস হয়ে উঠল তার দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে ফুকো ... অতীতেও অনেক সময় সমলিঙ্গের মধ্যে যৌন সম্পর্ক সমর্থন পায়নি, কিন্তু তখন যেটা নিন্দিত হয়েছে তা হল যৌন সম্পর্কের ক্রিয়াটি। উনিশ শতকে এই প্রশ্নটি আর ক্রিয়ার মধ্যে সীমিত রইল না, হয়ে উঠল ব্যক্তির আইডেনটিটির, ব্যক্তিসত্তার। ব্যক্তিটি নিষিদ্ধ কাজটি করেছে কিনা তার বদলে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠল ব্যক্তিটি সমকামী কিনা।

সমকামিতার এই নির্মাণের পর থেকে সারাবিশ্বেই চলছে এর চর্চা। সমকামিরা যে আলাদা কিছুসত্য ধরে রাখার চেষ্টাও কম হচ্ছে না। তাইতো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সুকৌশলে বলে চলেন, সমকামী হওয়া কোনভাবেই অপরাধ হতে পারে না। এর মাধ্যমে হিলারি সমকামিতা যে আলাদা কিছুতার যেমন বৈধতা দেন, একই সঙ্গে তার রাষ্ট্র যে অন্য আর দশটা রাষ্ট্রের মতো কূপমণ্ডূক নয়, তাও প্রমাণ করেন।

কর্তারাষ্ট্র হওয়ায় অন্যদের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমকামিদের নিয়ে চিন্তাও যেনো একটু বেশিই। তাইতো রাষ্ট্রটি সম্প্রতি সমকামি বিয়ের বৈধতা দিয়েছে। এর ফলে সারাবিশ্বের সাধারণসহ প্রগতিশীলদের যেনো এ নিয়ে রাষ্ট্রটির প্রতি কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। তবে বাস্তবতা হলোরাষ্ট্রটি সমকামিদের বিবাহের বৈধতা দিয়ে কাঠামোর মধ্যে ফেলে নিয়ন্ত্রণের পথকে যেমন প্রসারিত করেছে, একই সঙ্গে বৈধতা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ করেছে, সমকামিতা অবৈধ কিছু। তা না হলে বৈধতার প্রয়োজন পড়বে কেনো? তাইতো আজও সমকামিতা-উভকামিতা একটি বিদঘুটে যৌন-প্রপঞ্চ এবং এই প্রপঞ্চকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্র অবিরত মত্ত।

এবারে জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি একটি ঘড়ি তৈরি করেন এক মার্কিন কিশোর। কৌতূহলবশত কিশোর ঘড়িটি দেখান তার শিক্ষককে। কিন্তু ঘড়িটি দেখেই শিক্ষক আঁতকে ওঠেনবোমা নয়তো! তাড়াতাড়ি পুলিশে খবর দেন তিনি। কারণ ঘড়িটি কোনো জ্যাকসন, মাইকেল কিংবা টম তৈরি করেননি, করেছেন মুসলিম আহমেদ মোহাম্মদ। এ থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না মুসলমানদের নিয়ে আমেরিকানদের কতো ভয়! তাহলে মুসলমানরা কি দুপা-লম্বা দাড়িওয়ালা কোনো পশু প্রজাতি, নাকি ভিনগ্রহের কোনো প্রাণি কিংবা মনুষ্য রক্ত খেকো কোনো অশুভ শক্তি? বাস্তবে এসবের কোনোটাই না হলেও বর্তমানে যে প্রপঞ্চ দাঁড়িয়ে গেছে তাতে মুসলমান মানেই বোমাবাজ, ভয়ঙ্কর, জঙ্গি কিংবা মৌলবাদী। সোভিয়েত ইউনিয়নবিহীন এককেন্দ্রিক বিশ্বে মুসলমানভীতির জন্ম বেশ আগের না হলেও তা বদ্ধমূল হয়েছে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে টুইন টাওয়ার হামলা বা ৯/১১র পর। এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম আল-কায়েদাকে দায়ী করে যে ঢাক-ঢোল পেটাতে থাকে, তাতে তারা বিশ্ববাসীর মনে মুসলমানকে ভয়ঙ্কর, মৌলবাদী, জঙ্গি হিসেবে নির্মাণে সফলও হয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, মুসলমানদের এই ভয়ঙ্কর, জঙ্গি করে নির্মাণের প্রয়োজন কেনো? এর উত্তর নানাভাবে দেওয়া গেলেও, মূলটা হচ্ছে পুঁজি ও তার নিয়ন্ত্রণ। পুঁজির থাবা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রে পড়লে সেখানে যে চরম ভয়াবহতার সৃষ্টি হবে, তা পুঁজিওয়ালা রাষ্ট্রের বেশ ভালোভাবেই জানা ছিলো। আর এই ভয়াবহতাকে জায়েজ করতে মুসলমানদের হিংস্রতা সারাবিশ্বে তুলে ধরার প্রয়োজন পড়ে। তাই ইরাক-আফগানিস্তান-সিরিয়ায় হাজার হাজার মুসলমান পুঁজিপতি রাষ্ট্রের লুণ্ঠন-হত্যাযজ্ঞের শিকার হলেও পুঁজি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে তা যথাযথভাবে উঠে আসে না। বিপরীতে উঠে আসে পুঁজির শিকার হয়ে জন্ম নেওয়া মুসলিম জঙ্গিরা কতো জনের শিরশ্ছেদ করলো, এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে কতো জনকে হত্যা করলো, কতোগুলো মসজিদে হামলা করলোএসব। তাই পুঁজি না হয়ে ত্রাসের নাম এখন মুসলমান!

স্বাধীনতা-পরাধীনতার ধন্দ

মধ্যযুগে ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন রাজা। রাজার ইচ্ছা-অনিচ্ছাই ছিলো নিয়ম। তাই রাজার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করা ছিলো গর্হিত অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি স্বরূপ নিয়মভঙ্গকারীকে জনসমক্ষে আগুনে পুড়িয়ে, ফাঁসি দিয়ে, গলা কেটে, পাথর মেরে, মাটিতে শরীরের অর্ধেক অংশ পুঁতে হত্যা করা হতো। কখনো কখনো হাত-পা ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে পশুগুলোকে দৌড়িয়ে অপরাধীর শরীরকে টুকরো টুকরো করে শাস্তি দেওয়া হতো। এ রকম ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখার পর প্রজাদের আলাদা করে কিছু বলার প্রয়োজন পড়তো না রাজাদের। এরপর ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন হলে প্রতিষ্ঠা হয় প্রজাতন্ত্রের। বিজিত প্রজা-পতিরা স্বপ্ন দেখালেন, মানুষ এখন সব রকম রাজ শোষণ-শাসনের পরাধীনতা থেকে মুক্ত, স্বাধীন।

ওই যে স্বাধীনতার মানদণ্ড দাঁড় করানো হলো, এখনো চলছে সেই চর্চা। প্রজা-পতিদের দাঁড় করানো এই স্বাধীনতার নমুনাটা একটু দেখে নেওয়া যাক।

যখন কোনো ব্যক্তি কর রিটার্ন করে বা ক্রেডিট কার্ড ও জীবন বিমার আবেদন করে, সরকারি সেবাপ্রাপ্তি ও চাকরির আবেদন করে, তখন তার নামে একটি তথ্যসারণি খোলা হয়, তার জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে। ব্যাপারটি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, কোনো বিমান সংস্থার টিকিট কাটলে বা জাতীয় হোটেল চক্রের কোথাও ঘর ভাড়া করলে বা গাড়ি ভাড়া করলে সেই ব্যক্তির তথ্য কম্পিউটারে জমা হয়ে যায়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ ও সারণি করলে সেই ব্যক্তির তৎপরতা, অভ্যাস ও সম্পৃক্ততা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব। খুব কম মানুষই আছে, যারা আধুনিক প্রযুক্তির এই নজরদারির ক্ষমতাবিষয়ক ধারণা রাখে। ফলে এমন ভীতির সম্ভাব্যতা অমূলক নয় যে প্রত্যেক মার্কিনের ভ্রূণ থেকে কবর পর্যন্ত তথ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে রয়েছে।

এই চিত্র শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। পুরো পৃথিবীতেই স্বাধীনতার এই অবস্থা বিরাজমান। কারণ স্বাধীনতার নামে ক্ষমতাবান প্রজা-পতিরা শরীরের সঙ্গে মানুষের মনকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাই এখন আর রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের যুদ্ধ হয় না, হয় মতাদর্শের সঙ্গে। আর এই যুদ্ধ অর্থনীতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ক্ষমতাবান প্রজা-পতিদের মাজেজা। আর ক্ষমতাবানদের স্বাধীনতার নামে নিয়ন্ত্রণের এই কৌশল খুব ভালোভাবেই উঠে এসেছে আনফ্রিডম-এ। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে শুরু হওয়া দৃশ্যে দেখা যায়, লিলা-সাখি এই সমাজ থেকে অনেক দূরে গিয়ে ঘর বাঁধেন। যেখানে নেই কোনো শাসন-নিয়ম। আর বন্ধনমুক্ত এই জীবনেই তারা খুঁজে পান জীবনের সার্থকতা। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রের নজরদারি এতোটাই প্রকট যে, মানুষ যাই করুক না কেনো সব তথ্যই পৌঁছে যায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাছে। তাইতো লিলা-সাখি সমাজ-রাষ্ট্র থেকে যোজন যোজন দূরে গেলেও তাদের ধরে এনে পুরে রাখা হয় কারাগারে।

রাষ্ট্রের নজরদারির এই তীব্রতা আরো স্পষ্টভাবে ধরা দেয় চলচ্চিত্র শুরুর চার মিনিট ১৬ সেকেন্ড থেকে। মার্কিন মুলুকে হুসেইন যখন গাড়িতে করে চলতে শুরু করেন, তখন তাকে অনুসরণ করতে থাকেন মিচ। পরে পুরো সময় ধরে মিচ নজরদারির মধ্যে রাখেন হুসেইনকে। হুসেইন কখন কী করছে সব তথ্যই মিচ দিতে থাকেন মালিককে। শুধু তাই নয়, ওই ক্ষমতাবানরাও এই নজরদারির বাইরে নয়। তাই আনফ্রিডম-এর এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের দৃশ্যে হুসেইন যে ঘরে রহমানির ওপর অত্যাচার চালায়, সেখানে নাজিবের যাওয়ার তথ্যও চলে যায় মালিক-এর কাছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নজরদারির মূল এতোটাই গভীরে যে, সেখানে কেউ এর থেকে রক্ষা পায় না।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ থেকে প্রীতি গুপ্তা

স্বেচ্ছাসেবী গণমাধ্যম সংস্থা হিসেবে উইকিলিকস-এর পুরো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় সামাজিকভাবে সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে। এই নতুন ঘরানার সাংবাদিকতার ফলে ফাঁস হয়ে যায় সাম্রাজ্যবাদীদের লক্ষ লক্ষ গোপন দলিল। ফলে আধিপত্য বিস্তারকারী ক্ষমতাসীনদের মুখোশ খুলে যায়। আবার ক্ষমতাসীনদের প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বর্তমান তরুণ সমাজ যদি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেএই আশঙ্কাও কাজ করতে থাকে তাদের মনে। এসব বিবেচনায় নিয়ে পুরো বিশ্বেই শুরু হয় উইকিলিকসের সম্পাদক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে পাকড়াও করার কূটকৌশল। যদিও অ্যাসাঞ্জের সাংবাদিকতা নিয়ে কোনো অভিযোগ তোলার জায়গা ছিলো না তাদের। কিন্তু তাতে কী! ক্ষমতা তো আছে, তাই ওঠে সুইডিশ নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ।

অ্যাসাঞ্জ হয়ত একজন দুইজন সুইডিশ নারীকে ধর্ষণ করেছেন কিংবা করেন নি (যেটা জানার জন্য হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মেরুদণ্ডহীন সরকার), কিন্তু এ নিয়ে কোনো প্রশ্নই নাই যে তিনি স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে (ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার প্রতীক) বিবস্ত্র করে ফেলেছেন এবং সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন, কেমন বেশ্যা [দেউলিয়া] সে হয়েছে ইদানীং।

একইভাবে চিন্তার কাঠামো ঠিক রেখে আনফ্রিডমও আমাদের বিবস্ত্র করে দেয়। তাই বিকৃত প্রেম, দাঙ্গা বাধার আশঙ্কাসহ নানা অজুহাতে অ্যাসাঞ্জের মতো আনফ্রিডমকেও নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে। সেজন্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও চলচ্চিত্রটি ভারতের কোনো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিতে পারেন না রাজ অমিত কুমার। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলসে মুক্তি দিয়েই ক্ষান্ত থাকতে হয় বড়ো বাজেটের এই চলচ্চিত্রটিকে।

নবীন নির্মাতাকে এর মাধ্যমে রাষ্ট্র জানিয়ে দেয়তার ক্ষমতার ভীতে আঘাত হানে সমাজের এমন কোনো সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে কোনো কথা না বলাই ভালো; বললে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। এর মধ্য দিয়ে শুধু অমিত নয়, সতর্ক করে দেওয়া হয় চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সবাইকে। যেনো কেউ এ রকম দুঃসাহস না দেখায়। শুধু যে নির্মাতারা রাষ্ট্রের এই কৃতকর্মের শিকার, তা নয়। এর কলাকুশলীরাও বাদ যান না। তাইতো আনফ্রিডম-এ লিলা চরিত্রে অভিনয় ও স্ক্রিন টেস্ট করার সময় প্রীতি গুপ্তার যে নগ্ন দৃশ্য ধারণ করা হয় তা ইন্টারনেটে ফাঁস হয়ে যায়। প্রীতি গুপ্তার মতো আর কেউ যেনো কখনো এ রকম চরিত্রে অভিনয়ের সাহস না দেখায়, সমাজ-রাষ্ট্র নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখে এ বার্তাই দেয়। তাই হয়তো সাত-পাঁচ ভেবে সমাজ-রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া নিয়মকানুন ভাঙার সাহস অনেকেই দেখাতে যান না। কিন্তু জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, রাজ অমিত কুমার ও প্রীতি গুপ্তার মতো স্বাধীনতাপ্রিয় কিছু মানুষ সবসময়ই থাকেন।

প্রত্যেক মানুষই রাষ্ট্র!

মনুষ্যকূলে জন্মগ্রহণ করলেই কেউ মানুষ হয় না। তাকে মানুষ হয়ে উঠতে হয়। এজন্য দরকার স্বাধীনতা, সুষ্ঠু পরিবেশ ও মনুষ্যত্বের বিকাশ। একটি শিশু যখন জন্ম নেয় তখনো সে স্বাধীনই থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন সে বড়ো হতে থাকে রাষ্ট্র তাকে গ্রাস করতে থাকে। প্রথমে পরিবারের অনুশাসনে শিশুটি সমাজ-রাষ্ট্রের নিয়মকানুন মেনে ভালো হয়ে চলে। পরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য শিশুটি বিদ্যালয়ে গেলে এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে পরিবার-সমাজ একসঙ্গে রাষ্ট্রের মতো করে চলার শিক্ষা দিতে থাকে। অর্থাৎ শিশুটির হাত-পা বাড়তে থাকলেও মনুষ্যত্বের বিকাশ আর ঘটে না। নিয়মকানুনের বেড়াজালে শিশুটি হয়ে পড়ে পরাধীন। তাই যাদেরকে সাধারণ বলা হয়, অর্থাৎ যারা রাষ্ট্রের শিখিয়ে দেওয়া নিয়মকানুনের বাইরে ভাবে না, তারা হয়ে ওঠে একেকটি রাষ্ট্র।

আনফ্রিডম-এর দেবরাজ পুলিশ কর্মকর্তা হলেও আর দশজনের মতো তিনিও সাধারণ বাবা। যিনি রাষ্ট্রকে নিজের অজান্তেই লালন করেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেমন তার শিখিয়ে দেওয়া নিয়মকানুন ভঙ্গ করলে হয়ে ওঠে সহিংস, তেমনই মেয়ে লিলা রাষ্ট্রের নিয়মকানুন ভঙ্গ করে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিলে বাবা-দেবরাজ তা মেনে নিতে পারেন না। তাই তিনি মেয়ে লিলার মঙ্গলের স্বার্থেই তাকে ধর্ষণ করান। ভারতে সংশোধনমূলক ধর্ষণ নামে সমকামি সন্তানদের স্বাভাবিক করতে বাবা-মারা মাঝে মাঝেই নিকট আত্মীয়স্বজন দিয়ে এ কাজ করান। পাঠক, এখন একটু বোঝার চেষ্টা করুন, রাষ্ট্র যে কাজটা করতো তা তাকে আলাদা করে করতে হয় না। আর এভাবেই বাবা-দেবরাজরা নিজেই হয়ে যান একেকটি রাষ্ট্র। তবে ব্যক্তি-রাষ্ট্রের মধ্যেও নানান রকমের পরাধীনতা আছে।

চলচ্চিত্রে হুসেইনের ক্ষেত্রে এই পরাধীনতা বা রাষ্ট্র হয়ে ওঠা একটু ভিন্ন রকমের। হুসেইন রাষ্ট্রের সহিংসতার কাছে পরাধীন। অর্থাৎ শুধু নিয়মকানুন নয়, রাষ্ট্রের সহিংসতা তাকে করে তোলে সহিংস। হুসেইনের বেড়ে ওঠা সেই সহিংসতার মধ্যে। যেখানে তাদের বাড়িতে আশ্রিতদের গুলি করে, মাকে ধর্ষণ ও বাবা-ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আর এই সহিংস স্মৃতি তাকে সবসময় তাড়া করে। আনফ্রিডম-এর ১৫ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে মালিক শান্তিপ্রিয় রহমানির ফটো দেখিয়ে তাকে মিথ্যাবাদী ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে তুলে ধরেন। পরে তিনি হুসেইনকে নির্দেশ দেন রহমানিকে হত্যা করার। হুসেইন কোনো বাছবিচার না করে তার পরিবারের ওপর যেভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছিলো, সেভাবেই রহমানি ও তার পরিবারের ওপর সহিংসতা চালান বা চালাতে বাধ্য হন। অর্থাৎ তাড়া করে বেড়ানো সেই সহিংস আচরণই হুসেইন অন্যের ওপর করতে থাকেন। এভাবেই রাষ্ট্রের সহিংসতা মানুষকে করে তোলে সহিংস। অর্থাৎ কিছু মানুষ রাষ্ট্রের এই সহিংসতার কাছে পরাধীন। যারা সহিংসতা করতে, অনেক সময় দেখতে ভালোবাসেন। এই সহিংসতার প্রকারান্তরে তারা রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের কাজই করেন।

 

পুঁজি থেকে গণহত্যা

ক. সহিংসতা

ফরিদ রহমানি ও এক শ্বেতাঙ্গ যুবককে অপহরণ করেন হুসেইন। রহমানিকে চেয়ারে বেঁধে আর শ্বেতাঙ্গ যুবককে ঝুলিয়ে হুসেইন শুরু করেন নির্মম সহিংসতা। হুসেইন প্রথমে শ্বেতাঙ্গ যুবকের হাতে লোহার পাত ঢুকান হাতুড়ি দিয়ে ঠুকিয়ে ঠুকিয়ে। তারপর শুরু করেন রহমানির ওপর নির্যাতন। রহমানির চোখে ক্ষুর বসিয়ে দেন হুসেইন; কাঁচি দিয়ে কেটে নেন তার ডান হাতের আঙুল। আনফ্রিডম-এর ৫৬ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে শুরু হয়ে দৃশ্যটি চলে এক ঘণ্টা চার মিনিট পাঁচ সেকেন্ড পর্যন্ত। হুসেইনের পরিবার ও আশ্রিতদের ওপর যেভাবে ঘরে ঢুকে নির্যাতন করা হয়, ঠিক একইভাবে প্রায় একই রকম ঘরে হুসেইন তাদের ওপর চালান এই সহিংসতা।

কারাগারে বন্দি লিলা ও সাখি। এ সময় কারাগারের দরজা খুলে প্রবেশ করেন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। সেখানে বাবা দেবরাজকে দেখে লিলা আশা নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু বাবা কারাগার থেকে মুক্ত করার পরিবর্তে মেয়েকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে থাকেন। হতাশ হন মেয়ে-লিলা। মেয়েকে যখন বাবা দেবরাজ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতেও ব্যর্থ হন, তখন তিনি বেছে নেন আরো ঘৃণ্য পথ। বাবা দেবরাজের নির্দেশে চার পুলিশ কর্মকর্তা প্রথমে মেয়ে-লিলা ও তার সঙ্গী সাখিকে উলঙ্গ করে ফেলে। তবুও বাবা দেবরাজ তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। পরে তারা লিলাকে ধর্ষণ করে। বাবা-দেবরাজ সেটাও বসে বসে দেখেন, সমর্থন দেন! লিলা-সাখির অপরাধ, তারা মেয়ে হয়ে একে অপরকে ভালোবাসেন। আনফ্রিডম-এ এই সহিংসতা দেখা যায় এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট ৪০ সেকেন্ড থেকে এক ঘণ্টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত। 

খ. হত্যা

আনফ্রিডম-এর ৫৫ মিনিটে শুরু হওয়া দৃশ্যে দেখা যায়, বাড়িতে ঢুকে হুসেইনকে চেয়ারে বেঁধে তার হাতে অ্যাসিড ঢেলে দেয় সন্ত্রাসীরা। পরে তারা বাড়িতে আশ্রিতদের নির্বিচারে কোপাতে থাকে। সন্ত্রাসীরা হুসেইনের মাকে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে তারা হত্যা করে পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আশ্রিতদের। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান হুসেইন। হুসেইনের বাবা ওই আশ্রিতদের আশ্রয় দিয়েছিলো বলেই হয়তো তাদের ওপর এই সহিংসতা।

এক ঘণ্টা ২৮ মিনিটের দৃশ্যে দেখা যায়, হুসেইন চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন জানাকে। মাকে এমন নির্মমভাবে খুন হতে দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় তার সন্তান। হুসেইন পরে জানার সন্তানকে মুক্ত করে দিলে সে বাবা রহমানির হাত থেকে অস্ত্র বের করে নিয়ে গুলি করে হুসেইনকে।

গ. আত্মহত্যা

আনফ্রিডম-এর আট মিনিট ৪২ সেকেন্ডের দৃশ্যে দেখা যায়, বাড়িতে লিলাকে দেখতে এসেছে বরপক্ষ। বরপক্ষকে দেখানোর জন্য লিলাকে সাজিয়ে দিচ্ছেন মা। হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠলে তা ধরতে মা অন্য ঘরে চলে যান। এমতাবস্থায় লিলা আত্মহত্যা করতে আলমারিতে রাখা পুলিশ-বাবার প্যান্ট থেকে বের করেন পিস্তল। পিস্তলটি ঘুরিয়ে নিজের মাথা, গলায় তাক করেন। শেষ পর্যন্ত লিলা পিস্তলটি মুখের ভিতরে পুরেন, যাতে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া নিয়ে তাকে ভাবতে না হয়। পিস্তলের ট্রিগার চেপেও বসলেন। কিন্তু গুলি না থাকায় এ যাত্রায় বেঁচে যান তিনি। লিলার এই আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার কারণ, সমাজের বেঁধে দেওয়া নিয়ম তার শরীর-মন মেনে নিতে পারে না। তাই সমাজ-রাষ্ট্রের চোখে লিলা একটু অন্যরকম। নিয়ম না মানতে পারা ও অন্যরকম হওয়ার গ্লানিই তাকে এ পথ বেছে নিতে বাধ্য করে।

চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে শুরু হওয়া দৃশ্যে দেখা যায়, হুসেইন অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন রহমানির হাতে। যেনো রহমানি নিজ হাতে হুসেইনকে হত্যা করেন। কিন্তু শান্তিকামী রহমানির হাত থেকে অস্ত্র পড়ে যায়। তাতেও যেনো ছাড় নেই রহমানির। শেষমেষ হাতে স্কচটেপ দিয়ে অস্ত্রটি বেঁধে দেন হুসেইন। কিন্তু তাতেও কাজ হয় না। কারণ হুসেইনের বাবার মতো তিনিও জানেন, অস্ত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না।

পুঁজি-রাষ্ট্র = সহিংসতা + হত্যা + আত্মহত্যা

পৃথিবীর সবচেয়ে গতিশীল প্রপঞ্চটির নাম পুঁজি। তাই যে পুঁজির আঁতুড়ঘর ছিলো কুটিরশিল্প, তা ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে দৈত্যাকৃতি/বৃহদায়তন শিল্পে। একপর্যায়ে পুরো বিশ্বই চলে আসে পুঁজির অধীনে। পুঁজির এই জয়জয়কারকে ধরে রাখতে সবসময়ই সমর্থন দেয় রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্র যে ক্ষমতা কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাতে আঘাত হানলে বেরিয়ে আসে তার ভালোর মুখোশের আড়ালে থাকা নগ্ন রূপ। তাই সহিংসতা অংশে দেখা যায়, রহমানি ওয়াল স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে নির্যাতিত-শোষিতদের পক্ষে কথা বললে তার ও শ্বেতাঙ্গ যুবকের ওপর নেমে আসে ভয়ঙ্কর সহিংসতা। কারণ এতে পুঁজি-রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে যায়।

অন্যদিকে লিলা-সাখি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত অনুশাসনকে ভেঙে দিলে, তাদের ওপরও নেমে আসে বর্বর নির্যাতন। এতে রাষ্ট্রের ভীষণ ভয়, কারণ সমাজে অনুশাসন না থাকলে রাষ্ট্র থাকবে না। আর রাষ্ট্র না থাকলে পুঁজির টিকে থাকা সহজ হবে না। তাই পুঁজি-রাষ্ট্র যতোদিন থাকবে ততোদিন থাকবে এই সহিংসতা। তাই বলাই যায়, সিরিয়া-ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যে যে সহিংসতা চলছে তা দৃশ্যত থামার নয়। বরং তা চালু থাকবে, প্রয়োজনে পরিসর বাড়বে, হয়তো অন্য কোনো রূপে বা অন্য কোনো মোড়কে।

এদিকে পুঁজি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের রহমানি-হুসেইন-লিলা-সাখিদের ওপর ভয়ঙ্কর নৃশংসতা দেখে তাবৎ বিশ্বের মানুষ আগে থেকেই সতর্ক। তা সত্ত্বেও যখন কেউ বা কোনো গোষ্ঠী এমন নৃশংসতাকেও তোয়াক্কা না করে পুঁজি-রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে মুক্তির কথা বলেন কিংবা খোদ পুঁজিপতি রাষ্ট্রেরই যখন যুদ্ধ বা লুটপাটের প্রয়োজন পড়ে, তখন রাষ্ট্র তাদের জাতে ফেলতে শুরু করে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তথ্য-প্রযুক্তি-গণমাধ্যমের সাহায্যে পুঁজি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র তাদের জাতে তোলে, অর্থাৎ শিয়া-সুন্নি-কুর্দি-তালেবান-আই এস আই এস-জঙ্গি-সন্ত্রাসী-হিন্দু-মুসলিমের নির্মাণ হয়। তারপর রাষ্ট্র নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়। আর হিন্দু মারে মুসলিমকে, শিয়া মারে সুন্নিকে। তাইতো হত্যা অংশে দেখা যায়, হুসেইনের পরিবার ও আশ্রিতদের ওপর প্রথমে নির্যাতন, পরে হত্যা। হুসেইনও আরেক মুসলিম রহমানি ও তার পরিবারের ওপর প্রথমে নির্যাতন করেন, পরে হত্যা। এরপর রহমানির ছেলে তুলে নেয় অস্ত্র। এভাবেই চলে হত্যা আর হত্যা। তাই আই এস-তালেবান-বোকো হারাম কিংবা জঙ্গি গোষ্ঠী ছাড়াও পৃথিবীতে যে হত্যাযজ্ঞ চলছে তা থামে না। বরং উত্তরোত্তর বাড়ে।

মানুষের মধ্যে মানবিকতা বা মনুষ্যত্ব থাকায়, সে যন্ত্রের মতো অনবরত হত্যা চালিয়ে যেতে পারে না। একপর্যায়ে ভিতরের মনুষ্যত্বের দংশনে নিজের বেঁচে থাকাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই আত্মহত্যা অংশে দেখা যায়, হুসেইনের অপরাধবোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে নির্যাতিত রহমানির হাতেই মৃত্যু প্রত্যাশা করেন তিনি। অন্যদিকে সমাজ-রাষ্ট্রের মতো করে চলতে না পারায় লিলা-সাখি ঘৃণ্যপ্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয়, অর্থাৎ তারা ভিন্ন। একসময় তাদের ভিন্ন জীবনের গ্লানি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যা অনেক সময় বয়ে বেড়ানো সম্ভব হয় না। তাই পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র-ধর্ম থেকে দূরে অনেক দূরে চলে যেতে চান লিলা। আনফ্রিডম-এর লিলা-হুসেইন আত্মহত্যা করতে না পারলেও ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের খরা-ঋণ-অভাব-অনটন-গ্লানির তাড়নায় চারশো কৃষককে ঠিকই তা পারতে হয়।১০ এভাবে পুঁজি-রাষ্ট্র শত শত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়। তাই এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, পুঁজি যতো স্ফীত হবে ততোই বাড়বে সহিংসতা-হত্যা-আত্মহত্যার মিছিল।

ছকে বাঁধা রাজ অমিত কুমার

আনফ্রিডম শুরুর মাত্র এক মিনিট ১২ সেকেন্ডের মাথায় দেখা যায়, লিলা উলঙ্গ শরীরে ঘরের এক কোণে বসে আছেন। তার শরীর-মুখাবয়বে রাগ-দুঃখ-কষ্ট স্পষ্ট। চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ১৫ সেকেন্ডে দেখি, সাখি টেইলর উলঙ্গ শরীরে ছবি আঁকছেন। এ সময় তাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতেও দেখা যায়। শুধু উলঙ্গ শরীর আর রাগ-দুঃখ-কষ্ট নয়, এই দুই জন মানুষের মেলবন্ধনের মূল জায়গা তারা একে অপরকে ভালোবাসেন। তবে নির্মাতা এই দুই জনের মধ্যে যে পার্থক্য করেছেন সেটা হলো, লিলা ভারতীয় আর সাখি আমেরিকান। এখানে লক্ষণীয় যে, নির্মাতা ভারতের নয়া দিল্লির সমকামিদের কাহিনি বলার জন্য উভকামি চরিত্র নিয়ে আসলেন আমেরিকা থেকে! যৌন বিভাজন না করলে বা যৌনতাকে না আনলে এই ঘরানার মানুষ সৃষ্টির আদি থেকেই পৃথিবীর সব জায়গাতেই থাকার কথা। তাহলে আমেরিকা থেকে এই উভকামি চরিত্র আমদানির প্রয়োজন পড়লো কেনো?

শুধু তাই নয়, সাখি মুক্ত চিন্তা করেন, অ্যাক্টিভিস্ট, লৈঙ্গিক বৈষম্য বিরোধী একই সঙ্গে খ্যাতনামা চিত্রশিল্পীও। অর্থাৎ প্রগতিশীলতার সব ধরনের বৈশিষ্ট্যই তার মধ্যে বিদ্যমান। অন্যদিকে একই সঙ্গে অ্যাক্টিভিস্ট ও শান্তিপ্রিয় মুসলিম ফরিদ রহমানি। তিনি সঙ্গীত ভালোবাসেন। কোনো ধরনের গোঁড়ামি তার মধ্যে নেই। অর্থাৎ ফরিদ রহমানিও আধুনিক এক মানুষ। তারও বাস পাশ্চাত্যের আধুনিক রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে।

এসব থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না, নির্মাতা রাজ অমিত কুমার পশ্চিমাদের নির্মিত সভ্য-অসভ্যের ফাঁদে আটকা। তাইতো তিনি দেখান, আধুনিক মানুষ হলেই তাকে হতে হয় পশ্চিমের কিংবা থাকতে হয় পশ্চিমের সংশ্লিষ্টতা! তারই ফসল ফরিদ রহমানি কিংবা সাখি টেইলর। বিপরীতে প্রাচ্য যেনো প্রতিক্রিয়াশীলদের ভাগাড়। এখানে থাকেন মুসলমান হুসেইনরা। যারা আধুনিক রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নৃশংসভাবে মানুষের হাত-চোখ-গলা কাটে। অর্থাৎ পুরো পৃথিবীকে শাসন-শোষণ করার জন্য পশ্চিমারা যে সভ্য-অসভ্য, ভালো-মন্দের মানদণ্ড দাঁড় করেছিলো, এখনো করছে; তার বাইরে বেরোতে পারেন না নির্মাতা রাজ অমিত কুমার। সভ্য-অসভ্যের মানদণ্ডকে ভাঙতে গিয়ে বরং তিনি সেই কাঠামোতেই আবদ্ধ হয়ে পড়েন!

ইষ্টে অনিষ্ট লাভ!

রাষ্ট্র আগাগোড়াই বৈচিত্র আর বর্ণিলতাকে বিবর্ণ করে তোলে ... গাছের গোড়া চুনকাম থেকে শুরু করে আদিবাসীদের মেইনস্ট্রিমিং পর্যন্ত সবকিছুর গোড়াতেই তার এই প্রমিতকরণ বা স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন চলে। যে বৈচিত্রকে ম্যালা জোর খাটিয়েও বিবর্ণ করা যায় না, তাকেও বিবশ করা হয় প্রতিষ্ঠানের খাঁচায় পুরে, মানে স্বীকৃতি দিয়ে।১১

অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো কিছুকে স্বীকৃতি বা বৈধতা দিলে স্বাভাবিকভাবেই প্রমাণ হয়ে যায়, বিষয়টি আগে অবৈধ ছিলো। একইভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে যে কাঠামোটি দাঁড়িয়ে যায় সেটাও যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আরেক রূপ তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদিকে সাধারণ থেকে বেরিয়ে সমকামি বা উভকামিরা যখন নিজেদের অধিকার আদায়ে শোভাযাত্রা করেন, তখন তারাও নিজেদের ভিন্ন হিসেবে তুলে ধরেন। সাধারণ থেকে আলাদা হয়ে কখনো অধিকার আদায় করা যায় না। এতে মূলত সমকামি-উভকামিদের সমাজে ভিন্ন হিসেবে তুলে ধরার যে চর্চা তা আরো বদ্ধমূল হয়।

আনফ্রিডম-এর এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে দেখা যায়, সমকামিরা শোভাযাত্রা করছে। রঙধনুর সাত রঙের মিশেলে বাদ্য বাজিয়ে তারা নিজেদের অধিকারের কথা জানান দিচ্ছেন। এছাড়াও চলচ্চিত্রে বিভিন্ন অংশে লিলা-সাখিকে দেখানোর সময় ওই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত আবহসঙ্গীতের সুরকে মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ এই মোটিফ-রঙধনুর সাত রঙ ও শোভাযাত্রা চলচ্চিত্রে ব্যবহার করে নির্মাতা তা সমকামি-উভকামিদের জন্য অনেকটাই নির্ধারণ করে দেন। অর্থাৎ চলচ্চিত্রে এসবের ব্যবহার প্রমাণ করে, সমকামিরা সাধারণ থেকে আলাদাই। সমাজ-রাষ্ট্র সমকামি-উভকামিদের আলাদা নির্মাণের যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে, নির্মাতা রাজ অমিত কুমারও সেই পথকে সমর্থন করেন।

স্ত্রী, সন্তান ও নিজের জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ

আনফ্রিডম-এর ৫৫ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে হুসেইনের বাবা আনিসের হাতে পিস্তল তুলে দেয় দুর্বৃত্তরা। তারপর এলোপাতাড়ি চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে আশ্রিতদের। কিন্তু দুর্বৃত্তদের দেওয়া পিস্তলের ব্যবহার করেন না হুসেইনের বাবা। একপর্যায়ে হুসেইনের মাকে তারা ধর্ষণ করতে থাকে। তবুও অস্ত্রের ব্যবহার করেন না তিনি। চোখের সামনে সহধর্মিণী ধর্ষিত হওয়ার ঘটনার একপর্যায়ে দুঃখে-কষ্টে তার হাত থেকে পিস্তলটা পড়ে যায়। এমন দৃশ্যের স্মৃতিচারণ করে হুসেইন বাবাকে প্রশ্ন করেন, কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে আব্বু? এর উত্তরে দৃঢ় কণ্ঠে হুসেইনের বাবা বলেন, সেদিন আমি ঠিক কাজই করেছিলাম। আমি এমন কিছুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম যেটা তুমি, আমি ও তোমার মার জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

আবার এক ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে হুসেইন পিস্তল তুলে দেয় রহমানির হাতে; তিনি যেনো তাকে হত্যা করেন। কিন্তু রহমানি গুলি করতে নারাজ। নাছোড়বান্দা হুসেইনও ছাড়ার পাত্র নন। তিনি চাপ দিতে থাকেন রহমানিকে। একপর্যায়ে রহমানির হাত থেকে পিস্তল পড়ে গেলে হুসেইন তা তুলে হাতের সঙ্গে স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে দেন। তার পরও রহমানি গুলি করতে রাজি না হলে, স্ত্রী জানাকে হত্যা করেন হুসেইন। এ রকম মুহূর্তে রহমানি গুলি করতে হাত তুললেও তা করেন না। কিন্তু রহমানির ছেলে জর্ডানকে মুক্ত করে দিলে সে ঠিকই গুলি করে। এই জর্ডানই হয়তো পরবর্তী সময়ে হবে আরেক হুসেইন।

জীবনের এ চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে অর্থাৎ স্ত্রী, সন্তান ও নিজেকে বাঁচাতে শত্রুকে হত্যা করতে, এমনকি হাতে অস্ত্র তুলে নিতেও নারাজ হুসেইনের বাবা ও রহমানি। অথচ আজ সারাবিশ্বেই চলছে অস্ত্রের রাজনীতি, হত্যার রাজনীতি। যেখানে মানুষ এতোটা মানবিক সেখানে নিশ্চয়ই এমন হত্যার মহাযজ্ঞ চলার কথা নয়। কিন্তু হত্যাযজ্ঞ তো সংঘঠিত হচ্ছে, আর সেই কাজটিই করছে মানবিকতা বিবর্জিত পুঁজিতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রযন্ত্র। আগে বিশাল জনসমাবেশে আসামির দেহকে ক্ষতবিক্ষত, খণ্ডবিখণ্ড করা হতো, রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো সেই কাজটাই করেএকটু রেখে-ঢেকে অশুভ শক্তিকে নির্মূলের নামে, আবার কখনো কখনো সংশোধন বা কল্যাণের স্বার্থে। 

তাই কৌশলে ক্ষমতাবানদেরই গড়ে তোলা সন্ত্রাসীরা হত্যা করলে, রাষ্ট্র ক্রসফায়ারে কিংবা গর্হিত কাজের জন্য ফাঁসির নির্দেশ দিলে হুসেইনের বাবা ও রহমানির মতো মানুষেরা বাধ সাধেন। কারণ তারা জানেন, অপরাধী যতো বড়ো অপরাধই করুক না কেনো, হত্যা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। তাহলে হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে, কেউ যদি অনবরত হত্যা করে চলে তার কি কোনো শাস্তি হবে না? উত্তরে হয়তো হুসেইনের বাবা ও রহমানিরা বলবেন, সব অপকর্মের আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রযন্ত্র যদি না থাকে, তাহলে হয়তো অনেক অপরাধই কমে যেতো। তার পরও যে অপরাধগুলো হবে তা দূর করার জন্য দেশে দেশে এমন সংশোধন বা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে অপরাধী সমাজে মানুষ হয়ে ফিরতে পারে। তাহলেই হয়তো আর কাউকে হত্যার শিকার হতে হবে না। আর এমন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন বলেই হয়তো হুসেইনের বাবা ও রহমানির কাছে স্ত্রী-পুত্র ও নিজের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অন্য কাউকে গুলি করে হত্যা না করা।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন উঁকি দিতে পারে, আনিস-রহমানির মতো আদর্শবান বাবার সন্তান হয়ে হুসেইন-জর্ডান কেনো হত্যাকারী হয়ে ওঠে? এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, একটি মানুষের জীবনে বাবা-মার চেয়ে আপন অন্য কেউ হওয়ার কথা নয়। তাই সন্তান যখন সেই আপন মানুষটিকে নিজের সামনে খুন হতে দেখে, তখন সে আর নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তেমনই পারেননি হুসেইন-জর্ডান। দুনিয়ার রীতিনীতি বুঝে ওঠার আগেই তারা হয়ে যায় হত্যাকারী।

এটা আবেগের কথা, এই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে হত্যাকারী উৎপাদন করা হয়তা আনফ্রিডম-এ পরিষ্কারভাবে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন নির্মাতা। লক্ষণীয় যে, একদল সন্ত্রাসী হুসেইনের মাকে ধর্ষণ, বাবাকে কুপিয়ে জখম ও আশ্রিতদের গুলি করে হত্যা করে। সর্বশেষ গুলিটা ক্ষমতাসীন শ্বেতাঙ্গদের একজনকে করতে দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, এই সন্ত্রাসী কারা। পরে হুসেইন নিউইয়র্কে গিয়ে এই সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে নির্মম নির্যাতন চালান হুসেইনের ওপর আর হত্যা করেন জানাকে। পরে তাদের সন্তান জর্ডান মুক্ত হয়ে গুলি করে হুসেইনকে। এভাবেই হুসেইনের মতো জন্ম হয় আরেক হত্যাকারী জর্ডানের। হয়তো এই সন্ত্রাস উৎপাদনকারী সিস্টেমের বিরুদ্ধেই আনিস-রহমানির অবস্থান। তাইতো হুসেইনকে গুলি করতে জর্ডান উদ্যত হলে রহমানিকে বলতে শোনা যায়, গুলি করো না। না বাবা, গুলি করো না।

নিজে ভালো হলেই কি

জগৎ ভালো হয়?

এমন একটা সময় ছিলো যখন ইথিওপিয়া ছিলো বিশ্বের সব থেকে ধনী দেশ। তারা কালো বর্ণের হওয়ায় তখন সৌন্দর্যের প্রতীক ছিলো কালো। এই কালো ইথিওপিয়ানরা যেভাবে সাজতো, যে ঢঙের পোশাক পরিধান করতো, তাদের জীবনাচরণ; মোদ্দা কথা তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সবকিছুই বিশ্বের অন্যান্যদের কাছে ছিলো আদর্শ, সুন্দর। বিশ্ববাসী তখন এই কালো ইথিওপিয়ানদের মতো করে সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করতো। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, হয়েছে ক্ষমতার হাতবদল। বিশ্বকে এখন শাসন করছে পুঁজিপতি শ্বেতাঙ্গরা। তাদের সবকিছুই মানুষকে বিমোহিত করে। তাই তাবৎ বিশ্বের মানুষ শ্বেতাঙ্গদের মতো করে সুন্দর হওয়ার চেষ্টায় অবিরত মত্ত। বিপরীতে, ক্ষমতাহীন কালোরা সমাজে যেমন হেয় প্রতিপন্ন, তেমনই তাদের সবকিছুই মানুষকে আজ বিকর্ষণ করে, অর্থাৎ তারা অসুন্দর

তবে প্রকৃত অবস্থা হলো, সমাজে সুন্দর-অসুন্দর নির্ধারণের ক্ষমতা কিন্তু শ্বেতাঙ্গ বা কৃষ্ণাঙ্গ কারোরই নেই। কারণ এরা নয়, ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে তারাই দিগ্বিদিক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নির্ধারণ করে থাকেন এর মাপকাঠি। অর্থাৎ যারা ক্ষমতায় তারাই সুন্দর। অনুরূপভাবে ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক কিংবা উচিত-অনুচিতও নির্ধারণ করে দেয় ক্ষমতাবানরা। ক্ষমতাবানদের করে দেওয়া এই ভালো-মন্দের মধ্যে মন্দের তালিকায় স্থান হয়েছে তাদেরই নির্মিত যৌনতা-সমকামি-উভকামি ও মুসলমানদের। তাই এই মন্দ বা দুষ্টদের দমনের নামে সাখি-লিলা-রহমান-হুসেনইনদের ওপর সমাজ-রাষ্ট্র ধ্বংস-হত্যাযজ্ঞ চালালে সাধারণের মনে কোনো প্রশ্নের উদ্রেক হয় না! এতে সাধারণের যেমন থাকে একধরনের নীরব সমর্থন, তেমনই তারা যেনো হাঁফ ছেড়েও বাঁচে!

তবে করুণ নির্মমতা হলো, যে সাধারণ আজ মনে করছে তারা নিরাপদ, বস্তুত তারাও নিরাপদ থাকে না। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যেকোনো সময় তাদেরকেও দেওয়া হয় সমকামি, ভয়ঙ্কর মুসলমান-এর মতো তকমা। তাই দেবতুল্য রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো কিছু বললেই তাতে আনন্দে আত্মহারা হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। বরঞ্চ কেবল বেঁচে থাকার স্বার্থেই দেবতুল্য রাষ্ট্রযন্ত্রের শিখিয়ে-পড়িয়ে দেওয়া চিন্তা-চেতনার বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে সবাইকে। মানুষ হিসেবে সবার মাঝে যে মানবিকতা রয়েছে তার আলোকেই করতে হবে সবকিছুর বাছবিচার। যেখানে সমাজ-রাষ্ট্র-ধর্ম, যশ-প্রতিপত্তি সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান পাবে মানুষ। তাহলেই হয়তো সম্ভব হবে প্রভুদের দাঁড় করানো প্রপঞ্চগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়ে মানবিকতার জয়।

 

লেখক : প্রদীপ দাস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি নিউজ পোর্টাল এন টি ভি অনলাইন-এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

pradipru03@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. https://mukto-mona.com/Articles/avijit/shomokamita1.htm; retrieved on 27.10.2015

২. মুফতি মুহাম্মদ শফী (র) (২০০৯ : ৩৭৬); মাআরেফুল-কোরআন (৬ষ্ঠ খণ্ড); অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান; ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা।

৩. বসু, প্রদীপ (২০০৫ : ৬৯); যৌনতা ও সংস্কৃতি; সমীক্ষা ও সন্ধান : ভাষা দর্শন সংগীত; ২ই নবীন কুণ্ডু লেন, কলকাতা।

৪. প্রাগুক্ত; বসু, প্রদীপ (২০০৫ : ৭০-৭১)।

৫. https://tinyurl.com/2r8yxypw; retrieved on 16.09.2015

৬. http://goo.gl/A5x3Ls; retrieved on 18.09.2015

৭. ফস্টার, জন বেলামি ও রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেনজি; নজরদারির পুঁজিবাদ : একচেটিয়া-ফিন্যান্স পুঁজি, সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স ও ডিজিটাল যুগ; ভাষান্তর : প্রতীক বর্ধন; প্রতিচিন্তা; সম্পাদনা : মতিউর রহমান; ঢাকা, জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫, পৃ. ৫২।

৮. নিউটন, সেলিম রেজা (২০১১ : ১); উইকি-উন্মোচন : প্রযুক্তি, প্রতিরোধ ও সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত : জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কি খ্যাপা বিজ্ঞানী, বিন লাদেন, নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী?; ছোটকাগজ নেটওয়ার্ক, ফকিরাপুল, ঢাকা।

৯. http://goo.gl/WBO76w; retrieved on 10.10.2015

১০. http://goo.gl/h0naUI; retrieved on 10.09.2015

১১. ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুন যুক্তরাষ্ট্রে সমকামিদের বিবাহের বৈধতা দিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে তা ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে থাকে। বিষয়টিকে প্রগতিশীলরা যখন খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন এমন সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক বখতিয়ার আহমেদ তার ফেইসবুক ওয়ালে এই মন্তব্য করেন। https://www.facebook.com/Bokhtiar.Badal; retrieved on 12.10.2015

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন