Magic Lanthon

               

শিলু হোসেন

প্রকাশিত ২৮ জুলাই ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

লাবাকি’র চলচ্চিত্রজগৎ

শিলু হোসেন


গাহি সাম্যের গান

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান

যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।

 

ধর্ম হচ্ছে কিছু সুনীতিমালার সমষ্টি। পৃথিবীর নানা দেশে, নানাভাবে এই সুনীতিমালার মধ্যেই মানুষ শান্তি, মুক্তি খুঁজেছে। কিন্তু শান্তি-মুক্তির বদলে পেয়েছে পরাধীনতা আর সহিংসতার শিক্ষা। ফলে সারা দুনিয়ায় কোনো একটি বিশেষ ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করে যে রাষ্ট্রই গড়ে উঠেছে, সেখানে সংঘাত ঠেকানো যায়নি। কারণ তারা এই সুনীতিতে থেকেছে অনড়। ফলস্বরূপ দেশে দেশে প্রতিনিয়ত রক্ত দিতে হয়েছে মানুষকে। এমনকি স্বধর্মীদের প্রতি হিংস্র হয়ে উঠতেও তারা দ্বিধা করেনি। তবে ধর্মকে প্রতিনিধিত্বকারী দেশের নারীদের ওপর এই সুনীতি যেনো একটু বেশিই প্রভাব ফেলে। যদিও সুনীতির ফল, সহিংসতা নিয়ে নারীদের কাছে কেউ কখনো জানতে চায়নি; তবে এসব সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারাই। এই সংঘাতের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহসও তারা কখনো পায়নি। তবে আশার কথা হলো, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ পেলে তারাও যে কিছু বলতে পারে, তার প্রমাণ দিয়েছে ধর্মকে প্রতিনিধিত্বকারী মধ্যপ্রাচ্যের নারীরাই।

মুসলিম দেশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কারখানা বলা যায়। কারণ সেই শুরু থেকেই এখানে ধর্ম নিয়ে হানাহানি, রক্তের খেলা চলেছে। ধর্ম নিয়ে রক্ত ও স্বার্থপরতার খেলা খেলে অনেকেই বিশেষ করে পুরুষরা এর হিংস্র স্বাদ নিয়েছে, নিচ্ছে। বিপরীতে ধর্মীয় অনুশাসনে বাঁধা নারীরা এ নিয়ে কখনোই কথা বলার সুযোগ পায়নি। কারণ সেখানকার নারীরা একা বৈধ পথে নিজ দেশের সীমানা অতিক্রম করলে তার পুরুষ অভিভাবকদের (বাবা-স্বামী-ছেলে) কাছে সতর্ক বার্তা আসে। সে দেশে ভোরের আলো, দুরন্ত আকাশ, দস্যিপনা সবকিছুই কেবল পুরুষের জন্য। তবে সময় পালটেছে। নারীরা আজ ভোরের আলো, দুরন্ত আকাশ, দস্যিপনাকে ছুঁয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাতমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখছে। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে একেবারে ভিন্ন এক মাধ্যম চলচ্চিত্রকে। যাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ইরানের নারীরা। ইরানি নির্মাতা গ্রানাস মোসাভি, তাহমিনা মিলানি, আরিয়ানা ফারশাদ, মারজানে সাত্রাপি প্রমুখের সঙ্গে পিছিয়ে নেই সৌদি আরব, লেবানন, ইরাকের নারীরাও। লেবাননের নাদিন লাবাকিও তাদেরই একজন।

.

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দেশ লেবানন। দেশটি ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও সেখানকার মানুষ আজও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। যে কারণে হয়তো সংঘাত আজও তাদের পিছু ছাড়েনি। তবে সেখানে সংঘটিত অধিকাংশ সংঘাতের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে ধর্ম জড়িয়ে আছে। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে লেবাননে সংঘটিত গৃহযুদ্ধের কারণও ছিলো ধর্ম। দেড় দশক ধরে চলতে থাকা এ গৃহযুদ্ধে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়, মারাত্মকভাবে আহত হয় আরো প্রায় এক লক্ষ। তবে এগুলোই যে শেষ তা নয়। এর পরও ছোটো-বড়ো অনেক যুদ্ধই এখানে হয়েছে। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনে হিজবুল্লাহ ও দেশটির জনগণের সঙ্গে ইসরাইলি সেনারা যুদ্ধ শুরু করে। এ যুদ্ধে ইসরাইলি সেনারা ৩৩ দিনের মাথায় পরাজিত হয়। তবে আজও যে সময়ে-অসময়ে সেখানে মানুষ মরছে না, তা নয়।

সম্প্রতি লেবাননের সচেতন মানুষ এসব যুদ্ধ-সংঘাত থেকে বের হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বলছে, দেখছে শান্তির স্বপ্ন। সেখানকার অরাজকতা, দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে জনগণ ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে একসঙ্গে আন্দোলন করছে। মূলত লেবাননের লেভান্তে শহরে এ আন্দোলনের সূচনা। এর আগে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে জেগে উঠাদের ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয় তিউনিশিয়া। আন্দোলনের দ্বিতীয় দফার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে লেবানন ও ইরাক। তবে এবার তাদের ভাষা যেন অন্যরকম। যা সামাজিক ন্যায়বিচারের সঠিক রাজনৈতিক উপস্থাপন। ঠিক একইভাবে এ রকম ধর্মনিরপেক্ষতার কথা নাদিন লাবাকি বলেছিলেন পাঁচ বছর আগে তার হয়্যার ডু উই গো নাও? (২০১১) চলচ্চিত্রে।

.

জীবনের ৪১ বছর পাড়ি দেওয়া নাদিন লাবাকির দেশ লেবানন চলচ্চিত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুর্বর, একই সঙ্গে অনিরাপদও। কারণ এখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি। আর অনিরাপদ এ কারণে যে, তুচ্ছ ঘটনায় সেখানকার মাটি প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হয়। তবে এ রকম অনুর্বর-অনিরাপদ জায়গায় থেকেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন লাবাকি। একজন নারী হিসেবে, মা হিসেবে তার স্বপ্ন একটা সুন্দর, নিরাপদ এক কথায় বসবাসের উপযুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা। তার ভাষায়, আমি নারী। যে কারণে আমার ভিতর নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টিভঙ্গি থাকাটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া আমি একজন মা-ও। সে কারণে পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীটাকে সন্তানদের জন্য উপযুক্ত করে যাওয়ার একটা দায়িত্ব আমার আছে। চেষ্টা করলে প্রত্যেকেই পৃথিবীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, নিজেকে বোঝা এবং পৃথিবীতে নিজের একটা জায়গা করা। এ ব্যাপারে চলচ্চিত্র আমাকে সাহায্য করবে, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এবং মানুষ আমার চলচ্চিত্র যতো দেখবে পৃথিবীতে ততোই আমার স্বপ্নের জন্য জায়গা তৈরি হবে।

এ কথা বলার যথেষ্ট কারণও আছে লাবাকির; জন্মের পরই তিনি প্রায় দেড় দশক ধরে চলতে থাকা গৃহযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা দেখেছেন। সেই নির্মম বাস্তবতা থেকে যেকোনো মূল্যে পালাতে চেয়েছেন তিনি। তার কাছে সেই সময় পালানোর পথ ছিলো চলচ্চিত্র। লাবাকির ভাষায়, মানুষ যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো খারাপ পরিস্থিতি থেকে পালানোর জন্য মাঝে মাঝে চলচ্চিত্রকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয়। লাবাকি বিশ্বাস করেন, একজন মানুষ যদি হাসতে পারে, তাহলে সে যেকোনো সমস্যার সমাধানও করতে পারে। তাই তিনি কখনো চলচ্চিত্রকে গাম্ভীর্যপূর্ণ করতে চাননি, সহজভাবে হাস্যরস দিয়ে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।

লাবাকি কেবল নিজের দেশ নিয়েই চিন্তিত নন, আশেপাশের অনেক দেশ, যেমন : তিউনিসিয়া, সিরিয়াতে শরিয়া আইন ফিরে আসায় সেখানকার মেয়েরা আবারও পিছনে ফিরে যাচ্ছেএ নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। কারণ, এর ফলে নারীরা আবার সেই বন্দিদশায় ফিরে যাবে। সিরিয়ায় যা ঘটছে তা নিয়েও লাবাকি চিন্তিত। এর প্রভাব কেবল সিরিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, সব জায়গাতে ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও সরাসরি কোনো ধরনের, চলতি ভাষায় যাকে রাজনীতি বলে তার সঙ্গে জড়িত নন লাবাকি। কিন্তু তিনি অধিকার নিয়ে সবসময় সচেতন থেকেছেন। ফলে যেটা হয়েছে, না চাইলেও এসব বিষয় লাবাকিকে বিচলিত করেছে।

লাবাকির চলচ্চিত্র লেবাননসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখানো হচ্ছে। বিষয়টাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তিনি। অনেকে মনে করতে পারে, এটা হয়তো টাকার জন্য। কিন্তু লাবাকির কাছে বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়। বরং তিনি ভেবেছেন একেবারে উলটোটা। তার ভাষায়, মাঝে মাঝে মানুষ এখানকার যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক মিথ্যা তথ্য পাচ্ছে। কিন্তু যেটা সত্য, চলচ্চিত্র সেটাই তুলে ধরেছে। তাই তিনি নিজ দায়িত্ববোধ থেকে এ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন।

তাছাড়া লাবাকির সাফ কথা, তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন দর্শকের জন্য। মানুষ যদি তা না-ই দেখে তাহলে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে কী লাভ। একই সঙ্গে আধেয় নিয়েও বেশ শক্ত অবস্থান লাবাকির। তিনি সবসময় চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্য থেকে তার চলচ্চিত্রের উপাখ্যান খুঁজে নিতে চেয়েছেন। তবে নির্মাতা হিসেবে তার মুন্সিয়ানা হলো সেই কাহিনি উপস্থাপনার মধ্যে। সেখানে অবশ্যই আর দশটা চলচ্চিত্র থেকে ভিন্নতা আছে। তিনি চেষ্টা করেছেন চলচ্চিত্রে যা আছে, দর্শক সেটা বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। মানুষ হিসেবে তাদের অনুভূতি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কএসব বিষয় তারা মেলাবে। কারণ চলচ্চিত্রটির মূল বিষয় মানুষ ও মানুষে-মানুষে সম্পর্ক। আর লাবাকির লক্ষ্য এটাই।

.

রাজধানী বৈরুতের সেন্ট জোসেফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অডিও ভিজ্যুয়াল নিয়ে পড়াশোনা লাবাকির। আর এই পড়াশোনার অংশ হিসেবে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তাকে নির্মাণ করতে হয় প্রথম চলচ্চিত্র ইলেভেন রুই পাস্তার (11 Rue Pasteur)। স্বল্পদৈর্ঘ্যরে এই চলচ্চিত্রটি সেসময় প্যারিসের আরব ওয়ার্ল্ড ইন্সটিটিউট থেকে বিয়েনাল অব আরব সিনেমা(Biennale of Arab Cinema) নামে একটি খেতাবও পায়। তার পর প্রায় এক দশক অজানা কারণে চলচ্চিত্র থেকে দূরেই ছিলেন লাবাকি। এ সময়টাতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন শিল্পীর বেশকিছু গানের মিউজিক ভিডিও নির্মাণ ছাড়া তেমন কিছু করেছেন বলে জানা যায় না। তবে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া ক্যারামেল দেখে মনে হয়েছে, বিরতি দিয়ে খুব একটা খারাপ করেননি তিনি। যদিও এটিই ছিলো তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

অস্থির সময়ে লেবাননের নারীদের জীবন নিয়ে ক্যারামেল। সেখানে পাঁচ জন নারীর প্রেম, অবদমিত যৌনতা, বয়সের প্রাকৃতিক সমস্যাগুলো মেনে নেওয়ার লড়াইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে পদে পদে। তবে সঙ্গে সঙ্গে লেবাননের ঐতিহ্যও তুলে ধরতে ভুলেননি লাবাকি। কমেডি ধাঁচের ক্যারামেল দেখতে গিয়ে বার বার চ্যাপলিন-ভানুকে মনে পড়েছে। কারণ, হাসতে হাসতে কতোটা সিরিয়াস কথা বলে ফেলা যায়, লাবাকির এ চলচ্চিত্র না দেখলে তা বোঝা মুশকিল।

ক্যারামেল-এ কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা পাঁচ নারীর একজন লাবাকি নিজেই। শিল্প সৃষ্টির পাশাপাশি সেই শিল্পের উপাদান হিসেবে হাজির থাকা খানিকটা কঠিন হলেও, এ নিয়ে লাবাকির বয়ান একেবারেই উলটো। নিজে অভিনয় করার ব্যাপারটি নাকি পরিচালনার ক্ষেত্রে তাকে অনেক বড়ো সুবিধা দিয়েছিলো। লাবাকির ভাষায়, নিজে অভিনয় করার ফলে যেটা হয়েছিলো, আমি কেমন শট্ চাচ্ছি সেটা কাছ থেকে ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলাম। আরেকটি ব্যাপার খুব মজা করে বলেন লাবাকি, চলচ্চিত্রে অন্য নারীদের সঙ্গে যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক দেখানো হয়, সেটা নাকি বাস্তবে ওই নারীদের সঙ্গেও ঘটেছিলো তার। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক নাকি চলচ্চিত্র-নির্মাণ পরবর্তী সময়েও অব্যাহত আছে। যাই হোক, এতো চাপ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে মোটেও ব্যর্থ হননি লাবাকি। প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে ক্যারামেল আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সাড়া ফেলে। নির্মাতা হিসেবে লাবাকি নিজেও বোদ্ধামহলের নজরে আসেন। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্যারামেল-এর প্রথম প্রদর্শনীর পর এ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে প্রদর্শন হয়; পুরস্কারও জেতে বেশকিছু। সবমিলিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র ও নির্মাতা হিসেবে লাবাকিকে সফলই বলা যায়।

তবে সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো, চলচ্চিত্র-নির্মাণে নতুনদের জন্য বড়ো ধরনের উৎসাহের জায়গা হতে পারেন লাবাকি। কারণ তার চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অধিকাংশই অপেশাদার। অথচ কারো অভিনয় দেখে তেমনটি মনেই হয়নি! লাবাকির চলচ্চিত্র নির্মাণের এ ভিন্নতা দেখে ভিত্তোরিও ডি সিকার কথা মনে পড়ে। শিল্প সৃষ্টির অদম্য আকাক্ষা থেকে যিনি ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে নব্য-বাস্তববাদ ধারায় বাইসাইকেল থিভস্ নির্মাণ করেন। ডি সিকা সেসময় পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বাদ দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলেন কারখানার শ্রমিককে দিয়ে। এভাবে তিনি কিন্তু সফলও হয়েছিলেন! পরে অবশ্য অনেকেই সে পথে হেঁটেছেন, হাঁটছেন। লাবাকি আর ডি সিকার চলচ্চিত্র নির্মাণের বাস্তবতা দুটো ভিন্ন হলেও, তাদের স্বপ্ন, উদ্দেশ্য কিন্তু একইশিল্প আকাক্ষা থেকে মানুষের জন্য শিল্প সৃষ্টি।

তবে ডি সিকাতেই শেষ নন লাবাকি। তাকে ছুঁয়ে গেছে ইরাকি ও ইরানি নির্মাতারাও। ইরাকের বাহমান ঘোবাদি(Bahman Ghobadi) টারটলস ক্যান ফ্লাই তাকে মুগ্ধ করে। তাকে প্রভাবিত করে ইরানের নির্মাতাদের দারুণ দারুণ সব চলচ্চিত্র, যা সময়ের সঙ্গে থেকে সময়ের কথা বলে। এর বাইরে তাকে টানে পশ্চিমের নির্মাতারাও। তাদের মধ্যে মাত্র ১১ বছর বয়সে চলচ্চিত্র-নির্মাণ শুরু করা ডেনমার্কের লারস ভন ট্রিয়া(Lars Von Trier) যেমন আছেন, তেমনই আছেন স্পেনের পেড্রো আলমোদোভার (Pedro Almodovar), আমেরিকান অভিনেতা-নির্মাতা-নাট্যকার উডি অ্যালেন। এদের মধ্যে আলমোদোভার-এর সঙ্গে অবশ্য লাবাকির একটা অদ্ভুত মিল আছে, স্থানিক দূরত্বে দুজন ভিন্ন স্থানে থেকেও তারা নারীদের নিয়ে কথা বলেন একই সুরে।

.

আগেই বলেছি, চলচ্চিত্রে অভিনয় বলতে যেটা বোঝায়, লাবাকি অবশ্য তার কুশীলবদের কাছে কখনোই তা চাননি। তার ভাষায়, আমি কখনোই তাদের কাছে অভিনয় চাইনি। স্বাভাবিকভাবে দৈনন্দিন জীবনে তারা ঠিক যেভাবে কাজ করে, কথা বলে, আচরণ করে আমি ঠিক সে রকমটাই করতে বলি। যেটা নাকি ঘোবাদি করেছিলেন তার টারটলস ক্যান ফ্লাই-এ। যাহোক, ক্যারামেল-এর সফলতার পর আবার বিরতি দিয়ে সেলুলয়েডে নতুন চিন্তা গেঁথে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে লাবাকি হাজির হন হয়্যার ডু উই গো নাও? নিয়ে। সে বছরেই টরেন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড পায় এটি।

হয়্যার ডু উই গো নাও?-তেও লাবাকির সেই একই ঘটনা; কুশীলবদের প্রায় সবাই অপেশাদার। কিন্তু কারো অভিনয় দেখে তা মনে হয় না! তবে এবার চলচ্চিত্রের কাহিনি নিয়ে একটা মজার খেলা খেলেছেন তিনি। আনুষঙ্গিক (পোশাক, আবহসঙ্গীত, লোকেশন) কয়েকটি বিষয় বাদ দিলে, ওই কাহিনিকে আপনি সারা পৃথিবীর যেকোনো জায়গার বলে চালিয়ে নিতে পারবেন। এর কাহিনিদুইটা গোষ্ঠীর, দুইটা পরিবারের, দুই বন্ধু কিংবা দুইটা ধর্মের পরস্পর দ্বন্দ্বের। কিন্তু একই সঙ্গে এই কাহিনি অদ্ভুত এক সম্ভাবনারও। লাবাকি অবশ্য নিজেও এ কথাই বলেন, একই দেশে বসবাস করে, একই ছাদের তলায় থেকে কিংবা একই পরিবারের সদস্য হয়েও আমরা আমাদের ভিন্নতা মেনে নিতে পারি না। সমাজ, রাষ্ট্রে অনেক দ্বন্দ্ব-সমস্যা আছে, তবে অধিকাংশ সময়ে সেসব সৃষ্টি হয় ফালতু কিছু কারণে। এই ফালতু কারণগুলোই চোখে আঙুল দিয়ে হয়্যার ডু উই গো নাও?-তে দেখান তিনি।

.

চারপাশে গভীর খাদ, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে গ্রামটির যোগাযোগের উপায় একটিমাত্র সরু পথ। বিচ্ছিন্ন এই গ্রামে ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের বেশকিছু পরিবারের বাস। মজার ব্যাপার হলো, ওই গ্রামটি ছাড়া পুরো এলাকায় তখন চলছে সাম্প্রদায়িক সংঘাত। তা নিয়ে দৃশ্যত এখানকার অধিবাসীদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে সামান্য বিষয় নিয়ে এই গ্রামে দুই ধর্মের মানুষের সংঘাত যে একেবারে হয় না, তাও নয়।

সাধারণ রেস্তোরাঁ থেকে পানশালাসবই আছে ওই গ্রামে। অভাব ছিলো কেবল স্যাটেলাইট সংযোগের। গ্রাম-প্রধানের সহায়তায় স্থানীয় দুই কিশোর মিলে শেষ পর্যন্ত সে ব্যবস্থাও করে। সারাদিন কাজ শেষে গ্রাম-প্রধানের কাছ থেকে ধার করা টেলিভিশনে স্যাটেলাইটের সংযোগ দিয়ে বিনোদিত হয় পুরো গ্রাম। ভালোই চলছিলো, তবে প্রথম গোলটা বাধে গির্জার ক্রুশ ভাঙা নিয়ে। স্যাটেলাইটের সংযোগ ঠিক করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত ভেঙে যাওয়া ক্রুশের দায় পড়ে মুসলমানদের ওপর। উলটোদিকে অসাবধানতাবশত মসজিদে গবাদিপশু উঠে পড়লে খ্রিস্টানদের ওপর তার দায় বর্তায়। দুটো ঘটনাতেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও, শেষ পর্যন্ত তা সংঘাতে গড়ায় না। পুরুষদের নিবৃত্ত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে দুই ধর্মের নারীরা।

একপর্যায়ে উভয় ধর্মের নারীরা মিলে কৌশলে বাইরে থেকে কিছু নর্তকী ভাড়া করে আনে। উদ্দেশ্য, নর্তকীদের দিয়ে পুরুষদের বিনোদনের ব্যবস্থা করে গ্রামে থাকা অস্ত্রের মজুদ অন্যখানে সরিয়ে ফেলা, যাতে যে কোনো সংঘাতে সেই মারণাস্ত্র ব্যবহার না হয়। তবে এরই মধ্যে একদিন অঘটন ঘটে। দোকানের মালামাল আনতে গিয়ে গ্রামের বাইরে চলা সহিংসতায় খুন হয় এক খ্রিস্টান কিশোর। ঘটনা জানাজানি হলে পরিস্থিতি সংঘাতমুখী হওয়ার আশঙ্কায় নিজের সেই মৃত ছেলেকে কবর না দিয়ে একটি কুয়ায় লুকিয়ে রাখেন মা। তারপর গ্রামের নারীরা জোট বেঁধে নানাভাবে পুরুষদের অন্য কাজে ব্যস্ত রাখে। এর মাঝে একদিন সেই নর্তকীদের দিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেই সঙ্গে সেখানে উপস্থিত সব পুরুষের খাবারের সঙ্গে মেশানো হয় ঘুমের ওষুধ।

নাচ-গান, তার ওপর ঘুমের ওষুধ মেশানো খাবার খেয়ে ক্লান্ত পুরুষরা গভীর রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। এই সুযোগে নারীরা গ্রামের সব অস্ত্র গোপনে মাটিতে পুঁতে রাখে। একই সঙ্গে তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যারা যে ধর্মে আছে সেটা পরিবর্তন করবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে পুরুষরা নিজ নিজ বাড়ির পরিবেশ দেখে আশ্চর্য হয়। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী স্বামী দেখে তার স্ত্রী নামাজ পড়ছে, আর মুসলিম দেখে স্ত্রী যিশুর প্রার্থনা করছে। এসব দেখে একপর্যায়ে পুরুষদের ধর্ম-ধন্দ কেটে যায়, পরে সবাই মিলে মৃত কিশোরের দাফনের ব্যবস্থা করেমোটাদাগে এই হলো লাবাকিহয়্যার ডু উই গো নাও?

.

লাবাকির জীবনও চলচ্চিত্রের মতোই। টানা ৩০ বছর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যসব দেশের মতো তার জন্মভূমি লেবাননও যুদ্ধের মধ্যেই ছিলো। এখনো যে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এমন নয়। একটা সময় ছিলো যখন সামান্য রাজনৈতিক মতানৈক্যে সংঘর্ষ হতো, মুখোশধারীরা অস্ত্র উঁচিয়ে ঘুরে বেড়াতো। মুহূর্তের মধ্যেই স্বজন, প্রতিবেশী শত্রুতে পরিণত হয়ে যেতো। এই ধরনের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে লাবাকি স্বপ্ন দেখাতে ভুলে যাননি। যে নারী বাড়ির বাইরে বের হতে পারতো না, তাদের দিয়ে কৌশলে পুরুষদের গ্রামে বন্দি করিয়েছেন তিনি। সংঘাতের মধ্যে থেকে কীভাবে সংঘাত এড়ানো যায়, তিনি তার পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু কাউকে এক চুল সুযোগ দেননি প্রশ্ন তোলার। কোন স্থানের কথা বলছেনএমন প্রশ্নের জবাবে তার উত্তর ছিলো, যখনই ভৌগোলিকভাবে লেবাননের কোনো জায়গা বোঝানো হবে, তখনই প্রশ্ন উঠবেলেবাননের ঠিক কোন যুদ্ধের কথা বলা হচ্ছে? তাই এসব না দেখিয়ে, আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বগুলোকে।

কয়েক বছর আগে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে যখন গৃহযুদ্ধের দামামা বাজছিলো, লাবাকি তখন প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হন। চারপাশের এই অস্থিরতা হবু মায়ের জীবনে প্রভাব ফেলে, লাবাকির মননে পরিবর্তন আসতে থাকে। তিনি যেনো এ নিয়ে একটু বেশিই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তার ভাষায়, সন্তান নিয়ে সবসময় আমার একটাই চিন্তা হতো; আমি ভাবতাম, এ রকম একটা সমাজে সে বেড়ে উঠবে, যেখানে যুদ্ধ শুরু হয় একটা সামান্য অজুহাতে। তবে শুধু নিজের সন্তানের কথাই তিনি ভেবেছেন, এমন নয়। অদ্ভুত সব চিন্তা সেসময় ভর করতো লাবাকির ওপর। তিনি কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন; ভাবতেন, তার ১৮১৯ বছর বয়সি সন্তান যদি এই সংঘাতে অস্ত্র হাতে নিয়ে নেমে পড়ে? তখন মা হিসেবে তিনি কী করবেন? তাকে তিনি কীভাবে থামাবেন? তিনি উদ্বিগ্ন হতেন এটা ভেবে যে, এ তো শুধু লেবাননের ঘটনা নয়, সারা দুনিয়ার।

তবে সমাধানের পথ দেখাতে ভুলেননি লাবাকি; সন্তান পেটে নিয়ে সারা পৃথিবীর সন্তানদের কথা ভেবেছেন। চিন্তা করেছেন ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠার, মানুষকে সম্মান দেওয়ার। তাই হয়তো সবশেষে ভিন্ন দুই ধর্মের মানুষকে দিয়ে ধর্ম পরিবর্তন করিয়েছেন, সবাইকে ধর্মের ঊর্ধ্বে তুলে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছেন। বলেছেন, এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কে না জড়ানোর জন্য। কারণ, তার ভাষায়, শেষে এসে এই সমাধান অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতোই। আর বলুন তো কে-ইবা জীবনে অশান্তি চায়, রক্ত চায়? সবার মনে অগোচরে শান্তিই লুকিয়ে থাকে। সেই শান্তি নিয়ে এসেছে এই গ্রামের মানুষ। এই শান্তি বিশ্বজনীন। আর নির্মাতা হিসেবেও লাবাকির সাফল্যও ঠিক সেখানেই।

.

কোনো ঘটনায় ধর্মের সংশ্লিষ্টতা থাকা মানেই নির্দিষ্ট করে কেবল ধর্মকেই দায়ী করতে হবেএমনটা মনে করেন না লাবাকি। কারণ ধর্ম নয়, যারা ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে তারাই এটাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের মতো করে ব্যাখ্যা করে। লাবাকি ধর্মের এসব জায়গাকে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে খুবই মনোযোগী। তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে ধরার চেষ্টা করেছেন, কীভাবে ধর্ম নিয়ে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বড়ো ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে। তবে এ নিয়ে লাবাকিকে এমন ভুল বোঝার অবকাশ নেই যে, তিনি ধর্মকে খারাপ বলছেন। তার অবস্থান পরিষ্কার, একটা মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায় তা সে বিশ্বাস করতেই পারে। এ ব্যাপারটাকে আমি সম্মান করি। তবে তিনি অবশ্যই বিষয়গুলোকে পরিষ্কারভাবে বোঝার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এই যেমন আন্তঃধর্মীয় প্রেম ও বৈবাহিক সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সব দেশে, সব ধর্মেই নিষিদ্ধ। লেবাননে তো বটেই। এসব ক্ষেত্রে সবসময়ই মানবিক দিকটিকে বিবেচনায় না নিয়ে জটিল থেকে জটিলতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। লাবাকি বিষয়গুলো বুঝেছেন, চলচ্চিত্রে উপস্থাপনও করেছেন খুব খেয়াল করে।

আগেই বলেছি, নব্য-বাস্তববাদ ধারায় আস্থা রেখে তার সব চলচ্চিত্রের কাজ করেছেন লাবাকি। অপেশাদার অভিনেতাদের তো নিয়েছেনই, অনেক ক্ষেত্রে সামান্য বাছবিচারও করেননি। হয়্যার ডু উই গো নাও?-এর সময় যে গ্রামে শুট করেছেন, সেখানকার স্থানীয় কয়েকজনকে দিয়ে লাবাকি অভিনয় করান। শুটিংয়ের সময় আশপাশে ঘোরাঘুরি করেছে, যাদের লাবাকি অল্প সময় দেখেছেনএমন বেশ কয়েকজনকে তিনি নেন। এক্ষেত্রে তিনি নাকি অভিনয়ের অভিজ্ঞতা হিসেবে তাদের কাছ থেকে স্বল্প সময়ে দেখা তাদের ব্যক্তিত্বকে বিবেচনায় নিয়েছেন। এটা এভাবে করতে হবে, ওটা ওভাবে করতে হবেএমন কোনো কিছু তিনি কখনোই তাদের চাপিয়ে দেননি। বরং তাদের ওপরই ছেড়ে দিতেন সবকিছু। তাদের হাঁটা-চলা, কথা বলা সব ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের ওপর তিনি নির্ভর করতেন। অভিনয়ের ব্যাপারেও কখনোই কোনো কিছু তাদের মনে করিয়ে দিতেন না লাবাকি। তার ভাবনা ছিলো এ রকমযখনই এরা মুখস্থ সংলাপ বলবে তখনই সেটা কৃত্রিম মনে হবে। আর কৃত্রিমতা তার চিন্তার সঙ্গে বাস্তবের একটু হলেও দূরত্ব তৈরি করবে।

তবে নিজের মধ্যে এই সাহস নেওয়ার জন্য যে একেবারে কিছুই করেননি লাবাকি, বিষয়টা এমনও নয়। তিনি  ওই অভিনেতাদের দিয়ে মজার সব খেলা খেলতেন। নিজে থেকেই খুব সচেতনভাবে তিনি ওই অভিনেতাদের কিছু পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিতেন। তার উদ্দেশ্য ছিলো, এ রকম পরিস্থিতিতে তারা ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা বোঝা। অভিনয়ে, একজনকে অন্যজন হতে হয়। এই অন্যজনকে যেমন নিজের বিষয় বুঝতে হয়, তেমনই ওই চরিত্রটাওএটা লাবাকি বুঝতেন। তবে তার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক যেটা, সেটা হলো অভিনেতা যে অবস্থা থেকেই আসুন না কেনো, তার দক্ষতা ও কাজকে তিনি কোনোভাবেই অবজ্ঞা বা ছোটো করে দেখতেন না। তিনি এজন্য সবসময় সবাইকে নিয়ে একটা দল গড়ে তুলতেন। ফলে সেটা শুটিং ইউনিট না থেকে, হয়ে উঠতো একটা পরিবার। সেখানে সবাই কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত থাকতো, একজন এটা পারতো না তো আরেকজন সেটা করতো। এভাবে কোনো কিছুর অভাব ঠিক বোঝা যেতো না। তবে সবাই কোনো বিষয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে কুণ্ঠা বোধ করতো না।

.

লেবাননের যুদ্ধ শেষ হলেও শিল্পী লাবাকির যুদ্ধ কিন্তু সেখান থেকেই শুরু। কারণ, মিশরের কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান বাদে আরব বিশ্বের আর কোনো দেশেই চলচ্চিত্র-কারখানা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এই কারখানা গড়ে তুলতে সেখানে রয়েছে নানা ঝুঁকি, যে কারণে নির্মাতারা এ নিয়ে এগোনোর ঠিক সাহস করতে পারেন না। তার পরও লাবাকিদের হাত ধরে কিছু ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। ওই যে বললাম যুদ্ধের শুরু; ২০০৭-এ ক্যারামেল, ২০১১-তে হয়্যার ডু উই গো নাও? এবং ২০১২-তে সৌদি আরবে হাইফা আল-মনসুরের ওয়াজদা অনেক কিছুই বলার সুযোগ করে দিয়েছে এবং তারা বলছেও। আর লাবাকি তো সরাসরি বলেই দিয়েছেন প্রকাশ করার, বলার অনেক কিছুই এখনো বাকি আছে তার। তবে অভিযোগ আছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলচ্চিত্রের এই বিকাশের পিছনে নাকি পশ্চিমাদের মদদ রয়েছে অনেকাংশেই। আর থাকবেই না কেনো; লেবাননের কথাই ধরুন, সেখানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, যারা চলচ্চিত্র বানানোর জন্য একজন নির্মাতাকে আর্থিক সাহায্য দেবে। লাবাকি অবশ্য এটাকে স্বীকার করে নেন। তবে বিষয়টিকে তিনি মোটেও অন্য কোনোভাবে নেওয়ার পক্ষপাতী নন। কারণ পশ্চিমাদের এই সহযোগিতা তাদের অনেককেই আত্মবিশ্বাসী করছে। যা হয়তো চলচ্চিত্র-কারখানা প্রতিষ্ঠায় যে ঝুঁকি, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা করবে।

চলচ্চিত্রের জন্য লাবাকি আন্তর্জাতিক মহল থেকে সাড়া পেয়েছেন, পাচ্ছেনও। এতে তিনি দৃশ্যত খুশিও। তবে এই প্রশংসা তার কাছে শেষ কথা নয়। উলটোভাবে তার চলচ্চিত্রের মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তা নিয়েও চিন্তিত নন লাবাকি। কারণ তিনি মনে করেন, চলচ্চিত্র কেমন মানের সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং চলচ্চিত্রে কী বলা হচ্ছে সেটাই ভাবনার মূল জায়গা। দর্শক কীভাবে চলচ্চিত্রের সেই বিষয়গুলোকে নিতে পারছে, তা নিয়ে কথা বলছেএগুলো গুরুত্বপূর্ণ। লাবাকির ভাষায়, মাঝে মাঝে এই বিষয়গুলো নাকি চলচ্চিত্রকেও ছাড়িয়ে যায়।

 

লেখক : শিলু হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

shiluhossain40@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. এই লাইন কয়টি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী কবিতা থেকে নেওয়া।

২. রাকিব, রোকন; হাইফার আওয়াজ শোনা যায়; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ৬, বর্ষ ৩, জানুয়ারি ২০১৪, পৃ. ৭০।

৩.  http://goo.gl/8yImQb; retrieved on 04.09.2015

 

তথ্য সহায়িকা

http://moveablefest.com/moveable_fest/2012/05/nadine-labaki-interview-where-do-we-go-now.html; retrieved on 06.08.2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Lebanese_Civil_War; retrieved on 01.09.2015

http://www.viewlondon.co.uk/cinemas/nadine-labaki-interview-feature-2468.html; retrieved on 06.08.2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Lebanon#History; retrieved on 17.08.2015

http://www.ropeofsilicon.com/nadine-labaki-interview/; retrieved on 06.08.2015

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন