Magic Lanthon

               

মাজিদ মিঠু

প্রকাশিত ২৮ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আহমেদিনেজাদের কাল ও ইরানি চলচ্চিত্রের উদ্ভট সময়

মাজিদ মিঠু


বিপ্লব পরবর্তী শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই পরিবর্তন যতোটা না স্বতঃস্ফূর্ত, তার চেয়ে অনেক বেশি রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগের ফল। জীবনাচরণসহ সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে এই পরিবর্তনটাই সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। দেশটির সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে তার চলচ্চিত্র। বিষয়বস্তুর কাব্যময়তা, আবেগ প্রবণতা ও রাজনৈতিক রূপকাশ্রয়ী কাহিনির বোধগম্য দৃশ্যরূপ উপস্থাপনের জন্য ইরানের চলচ্চিত্র আজ প্রশংসিত; সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণশীল সরকারের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার জন্য চলচ্চিত্রের সৃজনশীল ও প্রতীকাশ্রয়ী প্রকাশভঙ্গিও প্রসিদ্ধ। মানুষের অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো তুলে ধরার জন্য ইরানি নির্মাতারা নিজেদের মতো করে বিকল্প নানা পন্থা উদ্ভাবন করেছেন। কেননা ইসলামি প্রজাতন্ত্রে চলচ্চিত্রে যৌনতা নিষিদ্ধ। মজার বিষয় হলো, ইরানি চলচ্চিত্রের যেগুলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে, তার বেশিরভাগই শুধু ইরানের কালোবাজারে পাওয়া যায়। আর যেগুলো ইরানের প্রেক্ষাগৃহে চলে, তা জনপ্রিয় হয় যতো দ্রুত, নিষিদ্ধ হয় তার চেয়েও কম সময়ে।

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইরানের চলচ্চিত্রে সেন্সর প্রথা চালু হয়। অবশ্য এর জন্য তখন নির্দিষ্ট কোনো আইন বা অধ্যাদেশ ছিলো না। সরকারের স্বার্থে আঘাত লাগেএমন কিছু চলচ্চিত্রে থাকলে তা বাদ দেওয়া হতো। নির্বাক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ক্যাপশন বা সাবটাইটেল পড়ার জন্য ব্যাখ্যাকারী ভাড়া করে আনা হতো। এমনও হয়েছে সরকার চলচ্চিত্রের এসব সাবটাইটেল পরিবর্তন করে, এর মাধ্যমে প্লট পর্যন্ত পরিবর্তন করেছে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এসে সরকারের পক্ষ থেকে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়; যাতে খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়, কর্তৃপক্ষকে না দেখিয়ে কোনো চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা যাবে না। তখন থেকেই ইরানে মূলত চলচ্চিত্রের জন্য প্রি-রিভিউ প্রক্রিয়া চালু হয়।

১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম চার বছরে ইরানে নির্মিত বিপ্লব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের দুই হাজার দুইশো আটটি চলচ্চিত্রের মধ্যে এক হাজার নয়শো ৫৬টিই নিষিদ্ধ করা হয়। বিপ্লব পরবর্তী সরকার দ্রুত চলচ্চিত্র ইসলামিকরণ শুরু করে। এ সময় তারা চলচ্চিত্রকে ইরানের জনসাধারণের মনে বিপ্লবের বীজ বপনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। এদিকে চলচ্চিত্র সেন্সরের জন্য লিখিত কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় তা অনেকাংশে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। প্রথম দিকে ইসলামের নিয়মনীতিকে ছোটো কিংবা বিশ্বাসে আঘাত করে এমন বিষয়ে সেন্সর বোর্ড নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতো। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে একটি নির্দেশনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নারীদের চাপা পোশাক, মুখমণ্ডল ও হাত ছাড়া শরীরের অন্য অঙ্গ প্রদর্শন, নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ধরনের শারীরিক স্পর্শ বা স্পর্শকাতর শব্দ ব্যবহার, পুলিশ, সামরিক বাহিনী বা পরিবারের ঐক্য সম্পর্কে কোনো প্রকার ঠাট্টা-কৌতুক প্রদর্শন, বিদেশি বা উত্তেজনামূলক সঙ্গীত এবং দাড়িওয়ালা কোনো নেতিবাচক চরিত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ আহমেদিনেজাদ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই নির্দেশনা আরো কঠোর হয়। ২০১৩ পর্যন্ত দুই দফায় আহমেদিনেজাদের টানা আট বছরের শাসনামলে ইরানের চলচ্চিত্রাকাশে কালো মেঘ জমে। এ সময় স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতাদের যেমন কোণঠাসা করা হয়, তেমনই বিভক্ত করা হয় দর্শকদেরও। এ আলোচনায় মূলত সেই সময়ের কথাই উঠে এসেছে।

.

ইসলামি বিপ্লবের পর প্রায় সব ধরনের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা থেকে গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রই প্রথম কার্যক্রম চালানোর অনুমোদন পায় এবং রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এর উৎকর্ষ সাধন চলতে থাকে। সেসময় আগের প্রাধান্যশীল পশ্চিমা চলচ্চিত্রের প্রভাব এড়িয়ে সমান্তরালে একটা নতুন চলচ্চিত্র ধারা গড়ে উঠতে থাকে ইরানে। কেবল চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তখন রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রণ খানিকটা শিথিল ছিলো। তবে সামগ্রিক চলচ্চিত্রশিল্পের ওপর সরকার শক্তি খাটাতে না পারলেও স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণে তারা পিছপা হতো না। শিল্পের অন্যান্য ক্ষেত্রের চেয়ে তা অনেকাংশে প্রবলই ছিলো। এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সরকার সমর্থিত নির্মাতা হাবিবুল্লাহ বাহমানি দাবি করেন, রক্ষণশীল সরকারের মানদণ্ড পূরণ করতে ইরানের চলচ্চিত্র সক্ষম নয়। তবে এই মানদণ্ড বলতে তিনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন তা ব্যাখ্যা করেননি। কিন্তু তার কথার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার চলচ্চিত্রশিল্পের ওপর তাদের রক্ষণশীল মতাদর্শ পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

রক্ষণশীল গোষ্ঠীর দ্বারা চলচ্চিত্রের সমালোচনা ইরানে নতুন কিছু নয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই তা চলেছে, চলছে। চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ, শিল্পীদের কাজে বাধা এবং জাফর পানাহিসহ প্রখ্যাত নির্মাতাদের আটকের মাধ্যমে সেই সময় থেকে আজ অবধি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের ওপর সরকারের ব্যক্তিগত আক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েই চলেছে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন, ইরানের পুনর্গঠন অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট খাতামির আট বছর ছিলো দেশটির চলচ্চিত্রের জন্য সোনালি অধ্যায়। এ সময় নির্মাতা ও অভিনেতাদের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি করা হয়েছিলো। তবে এর উলটো কথাও আছে। আহমেদিনেজাদের শাসনামলের রক্ষণশীলদের মতে, খাতামির সেই বছরগুলো ছিলো ‘মূল্যবোধের অবক্ষয় কাল’। এবং সেই সময় নির্মাতাদের জন্য দেওয়া সুবিধাগুলোকে তারা নেতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করেন।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চলচ্চিত্রের অবস্থা নিয়ে ইরান সরকার ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কেউই সন্তুষ্ট নয়। এ অসন্তুষ্টি প্রথম প্রত্যক্ষ হয় ২০১১ খ্রিস্টাব্দে ২৯তম আন্তর্জাতিক ফজ্র চলচ্চিত্র উৎসবকে ঘিরে। এ উৎসবের মাধ্যমেই মূলত ইরানি চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক প্রবণতা বোঝা যায়। কিন্তু ইরানের গণমাধ্যমগুলোতে ২৯তম ফজ্র চলচ্চিত্র উৎসবের ফল নিয়ে ইতিবাচক কোনো কিছু উঠে আসেনি। উৎসবে চলচ্চিত্র নির্বাচন ও বাছাই প্রক্রিয়া অতিরিক্ত রক্ষণশীল হওয়ায় অনেক নির্মাতা তাদের চলচ্চিত্র মনোনয়ন তালিকা থেকে সরিয়ে নেন। ফলে পরিস্থিতি এমন হয় যে, পুরস্কৃত করার জন্য উৎসবে কোনো চলচ্চিত্রই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। পরে বাধ্য হয়ে সরকারি মদদে ইরানের বিপ্লবী নেতা ইমাম খোমেনি’র জীবনীনির্ভর একটি চলচ্চিত্রকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ঘোষণা করা হয়।

মজার ব্যাপার হলো, চলচ্চিত্রটির নির্মাতা বেহরুজ আফখামি প্রতিযোগিতা থেকে এটি বাদ দেওয়ার জন্য উৎসব পরিচালক মাসুদ শাহী’র কাছে চিঠি লিখেছিলেন। কারণ তিনি নাকি ওই চলচ্চিত্রে ইমাম খোমেনির ছোটোবেলা থেকে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রযোজক উৎসবে জমা দেওয়ার সময় কেবল ইমাম খোমেনির জীবনের বিপ্লবকালীন অংশটুকুই রেখেছিলেন। উৎসব পরিচালক অবশ্য আফখামির সেই অনুরোধ না রেখে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করেন এবং সেটি বেশ কয়েকটি বিভাগে পুরস্কারও পায়। আফখামির জোরালো অভিযোগ, ‘চলচ্চিত্রটি আমি দেখিইনি এবং আমি নিজেকে এর নির্মাতা মনে করি না। প্রযোজক এখানে আমার নাম চুরি করেছেন।

তবে এ উৎসবে অনেকেই এ ধরনের রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। জর্ম নামের চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে ক্রিস্টাল সিমর্গ জয়ী হামেদ বেহদাদ তার বক্তব্যে আরো একটু স্বস্তিতে ও স্বাধীনভাবে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জর্ম-এর নির্মাতা মাসউদ কিমিয়াই উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রীর সম্মুখে জাফর পানাহির শাস্তি পুনরায় বিবেচনার দাবি জানান। অবশ্য এর জন্য রক্ষণশীল কর্তৃপক্ষের আক্রমণের শিকারও হতে হয় কিমিয়াই’কে।

.

রক্ষণশীল শাসকগোষ্ঠীর আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় ইরানি চলচ্চিত্র অঙ্গন যখন অন্ধকার সময় পার করছে, তখন আশার আলো ফুটিয়ে ৬১তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সফলতা পায় আসগার ফারহাদি’র অ্যা সেপারেশন (২০১০)। কিন্তু ইরানি শাসকগোষ্ঠী চলচ্চিত্রটিকে প্রথমে নাকচ করে দেয়। দেশটির রক্ষণশীল গণমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হন ফারহাদি। অ্যা সেপারেশন ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু এর চলচ্চিত্রিক মান এতোই উন্নত যে তা সরকারকে এর পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য করে। অ্যা সেপারেশন ফজ্র উৎসবে অংশ নিলে, তা বেশ কয়েকটি বিভাগে পুরস্কার পায়; অন্যভাবে বললে, সরকার অনেকটা বাধ্য হয়।

চলচ্চিত্রটির বিপুল সাফল্য প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদের সমর্থকদের রাগান্বিত করে। তারা মত দিতে থাকেন, স্বাধীনভাবে যেসব চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়, সেগুলো আন্তর্জাতিক উৎসবে ইরানি চলচ্চিত্র হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না। মূলত ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনের পরে আহমেদিনেজাদ বিরোধী যে ‘গ্রিন মুভমেন্ট হয়, তাতে অংশ নেওয়ায় ফারহাদির ওপর তাদের আগে থেকেই রাগ ছিলো। তার ওপর ‘গ্রিন মুভমেন্ট সমর্থনকারী জাফর পানাহিকে বার্লিন উৎসবের একটি ইভেন্ট উৎসর্গ করেন ফারহাদি। যা আহমেদিনেজাদ সমর্থকদের আরো বেশি রাগান্বিত করে।

ফারহাদির ওপর রক্ষণশীলদের রাগ আরো বেড়ে যায়, যখন তিনি ঘোষণা দেন, দেশ ছেড়ে জার্মানিতে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি চাপ ও সেন্সর এড়াতে অনেক বিখ্যাত নির্মাতাই ইরান ছেড়ে বিদেশের মাটিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। আব্বাস কিয়োরোস্তামি ও বাহমান ঘোবাদি তাদের মধ্যে অন্যতম। তখন মনে করা হচ্ছিলো, আহমেদিনেজাদ সরকার ক্ষমতায় থাকতে তাদের জন্য ইরানে ফেরা প্রায় অসম্ভব।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনিসহ তার রক্ষণশীল শাসকগোষ্ঠী প্রায়ই দেশটির নির্মাতাদের বিরুদ্ধে দেশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ তুলে উচ্চবাচ্য করেন। শিল্পী ও নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনায় স্বয়ং খোমেনি সবসময়ই চলচ্চিত্রে ইরানের নেতিবাচক চিত্রায়ণ নিয়ে কথা বলেন। তিনি মনে করেন, এই নেতিবাচক চিত্রায়ণ ইরানের শত্রুদের’ কাছে দেশটিতে আক্রমণ চালানোর কারণ সরবরাহ করে। তার মতে, এই নেতিবাচক চিত্রায়ণ কেবল ইরানি সমাজের অসহায়ত্বই ফুটিয়ে তোলে।’ অন্যদিকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন উৎসবে অংশ নেওয়া চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশটির বিখ্যাত নির্মাতা সিরুজ আলভান বলেন, ‘নির্মাতারা অনেক সময় ইরানের সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণ সঠিকভাবে তুলে আনেন না। তবে ফারহাদি তার চলচ্চিত্রে কোনো প্রকার ভুল ইঙ্গিত ছাড়াই তা তুলে ধরেছেন।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ইরানি রক্ষণশীলদের কাছে ‘স্নায়ুযুদ্ধ ধারণাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারা মনে করেন, স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রে ইরানের নেতিবাচক উপস্থাপন এই স্নায়ুযুদ্ধেরই অস্ত্র। রক্ষণশীলরা সবসময়ই অভিযোগ করতে থাকেন, স্বাধীন ধারার নির্মাতারা আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে চলচ্চিত্র পাঠিয়ে ইরানের ‘শত্রুদের কাছ থেকে নানাধরনের সুবিধা নিচ্ছে। ৯০ দশকের শুরুর দিকে এ ধরনের অভিযোগ প্রথম আনেন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মর্তেজা আভিনি। তিনি ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ইরাক-ইরান যুদ্ধে নিখোঁজ সৈনিকদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সময় ভূমি মাইন বিস্ফোরণে নিহত হন। তার এই অভিযোগ ছিলো মূলত মহসিন মাখমালবাফের প্রতি। সেসময় তার চলচ্চিত্র নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরস্কৃত হচ্ছিলো। মর্তেজা আভিনির অভিযোগকে পুঁজি করে আহমেদিনেজাদের রক্ষণশীল সমর্থকরা এই তালিকাকে দীর্ঘ করে। তারা দাবি করে, স্বাধীন ধারার নির্মাতা, যেমন : কিয়োরোস্তামি, পানাহি, মাখমালবাফ, ফারহাদিসহ অন্যান্যদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর আধেয় ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’। তাই এসব চলচ্চিত্রকে ‘কালো’ তালিকাভুক্ত করতে হবে।

এদিকে রক্ষণশীল গণমাধ্যমে ইরানের নেতিবাচক উপস্থাপন বিষয়ে বলা হয়, পশ্চিমা বিশ্বের তথাকথিত মানবাধিকার কর্মীরা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এসব চলচ্চিত্রকে উৎসাহ দিচ্ছে। কারণ তারা এগুলোকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে। 

.

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে আহমেদিনেজাদ দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে গ্রিন মুভমেন্টে অংশগ্রহণকারীদের ওপর চাপ বাড়তেই থাকে। বিশেষ করে যেসব চলচ্চিত্রশিল্পী ওই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন তাদের ওপর সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ স্পষ্ট হয়। গ্রিন মুভমেন্টের প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন নির্মাতা ইব্রাহিম হাতামি কিয়া। ২৯তম ফজ্র উৎসবে কোনো পুরস্কার পায়নি তার গোজারিশ ইয়েক জাশন (২০১১) চলচ্চিত্রটি। অথচ বিগত এমন কোনো উৎসব নেই, যেখানে তার চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতেনি। হাতামির এই চলচ্চিত্রে ইরানি সমাজের বিতর্কিত বেশকিছু বিষয় উঠে আসে। বিশেষ করে যা তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে তিনি মূলত ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের বিতর্কিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি দরিদ্র এলাকার অবস্থা তুলে ধরেন। ফলে রক্ষণশীল শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সমর্থক সমালোচকরা শক্তভাবে এর বিপক্ষে অবস্থান নেন।

তারা মত দেন, গোজারিশ ইয়েক জাশন-এর শেষ দৃশ্যে হাতামি এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ক্রমবর্ধমান সামাজিক দমনপীড়নের ফলেই গত বছরের রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটেছে। সরকার সমর্থক সমালোচক মাসউদ ফারাসাতি বলেন, মূলত এই চলচ্চিত্রে বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। হাতামি এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সময় থেকে পিছিয়ে গেছেন; এটিতে কোনো পরিষ্কার বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই। তিনি হাতামির কঠোর সমালোচনা করে আরো বলেন, ‘ব্যক্তির নিজের মতাদর্শই যখন পরিষ্কার নয়, তখন তার নির্মিত চলচ্চিত্রের দশাও তো তেমনই হবে। দেখে মনে হচ্ছে এটি ২০ বছর আগের বাস্তবতায় নির্মিত কোনো চলচ্চিত্র। রক্ষণশীল গণমাধ্যমগুলোও এ চলচ্চিত্রের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তবে মজার বিষয় হলো, হাতামির আগের চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে এগুলোর কোনোটাই কখনো কোনো কথা বলেনি, বরং প্রশংসা করেছে। অন্যদিকে সংস্কারবাদী গণমাধ্যমে তার গোজারিশ ইয়েক জাশনকে উত্তরণের কাল্পনিক ভাষ্যহিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে হাতামি তার পুরনো গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন এক গণ্ডিতে চলে এসেছেন, যা তার আগের সঙ্গীদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, চলচ্চিত্রটি একটি প্রহসন। হাতামি কিয়া পরিষ্কারভাবে বোঝাতে চেয়েছেন, কীভাবে রক্ষণশীল শাসকগোষ্ঠী তাদের ব্যক্তিগত বিবেচনা বোধ ইরানি সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জোর করে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তবে রক্ষণশীলদের এ আক্রমণ শুধু আসগার ফারহাদি ও হাতামি কিয়ার মতো নির্মাতাদের ওপরেই থেমে নেই, তা বিস্তৃত হয়েছে প্রেক্ষাগৃহের আসনেও।

তবে চলচ্চিত্র নিয়ে রক্ষণশীল সরকারের এমন সব সিদ্ধান্তই যে সাধারণ দর্শক মেনে নিয়েছে, তা নয়। ২৯তম ফজ্র উৎসবে রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো দেখার সময় দর্শক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মিত পায়ান নামেহতে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। উৎসবে এর প্রদর্শনীতে দর্শক প্রকাশ্যে সিটি বাজিয়ে, অবজ্ঞাসূচক ‘বু ধ্বনি তুলে এর বিরোধিতা করতে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকারপক্ষের কয়েকজন সমালোচকসহ দেশটির বৃহত্তর সমালোচক গোষ্ঠীর মূল্যায়নে পায়ান নামেহ বছরের সবচেয়ে খারাপ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়। অথচ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ হয়েছে সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের অনুদানে এবং মিনিস্ট্রি অব ইন্টেলিজেন্স থেকে একটি সাংস্কৃতিক কমিটিকে চলচ্চিত্রটির উপদেষ্টা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে সমালোচক ও দর্শকের এই প্রতিক্রিয়ার পরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষক দপ্তরের প্রধান আলী রেজা সাজাদপুর বলেন, ‘শুধু ব্যক্তি মতাদর্শের বিপক্ষে যাওয়ার কারণেই কিছু সমালোচক চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে অসহিষ্ণু হয়ে অশিক্ষিত বেকুবদের মতো ঝোঁকের মাথায় মন্তব্যগুলো করেছে। আমার মনে হয়, চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব এটাই প্রমাণ করে যে, ইরানের চলচ্চিত্র সমালোচকরা অন্ধকার সময়ের মধ্যে রয়েছে। আজ আমরা দেখছি, আমাদের চলচ্চিত্র সমালোচকরা দর্শক ও নির্মাতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘সমালোচকরা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছেন না। তারা চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে যে বমি উদ্রেক করা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছে তাতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকরাও চোখ-কান বন্ধ করে সাজাদপুর-এর বক্তব্য মেনে নেননি। কড়া জবাব দিয়েছেন সমালোচক কেভান কাসিরিয়ানমিস্টার সাজাদপুর, এবার অন্তত চোখটা খুলুন! নীতিহীনতারও একটা সীমা থাকে; যখন দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের একজন ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তির মতামত অনৈতিক ও অস্বচ্ছ হয়, তখন তিনি কীভাবে জনগণের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন!

সম্প্রতি ইরানের স্বাধীন নির্মাতা ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের সংগঠন ‘হাউজ অব সিনেমা ও এর সদস্যদের ওপর রক্ষণশীল সরকারের চাপ বহুগুণে বেড়ে গেছে। সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস থেকে এ চাপ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে যখন সরকার সমর্থক নির্মাতা ফারাজুল্লাহ সালাহশোর হাউজ অব সিনেমা সম্পর্কে বলেন যে, ‘এর বিরাট এক অংশ দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় এবং তারা সার্বভৌমত্বের সম্মানও রক্ষা করছে না। ... হাউজ অব সিনেমার সদস্যরা নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। ইসলামের নীতি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি এ সংগঠনের সদস্যদের আচরণ বিরোধপূর্ণ। এমনকি হাউজ অব সিনেমার সদস্যদের আঁতাত এমন লোকদের সঙ্গে, যারা পরিষ্কারভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বিরোধী।’ এছাড়া কিছু চলচ্চিত্র নির্বাচনের জন্য হাউজ অব সিনেমার আমন্ত্রণে অস্কার প্যানেলের কিছু সদস্যের ইরানে আগমন সম্পর্কে সালাহশোর বলেন, আমি বিশ্বাস করি, হাউজ অব সিনেমার পক্ষ থেকে অস্কার কমিটির সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে পর্দার আড়ালে অন্য কেউ আছে, তারা চেষ্টা করছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও পশ্চিমাদের মধ্যে একধরনের পুনর্মিত্রতা প্রতিষ্ঠার।’ নির্মাতাদের নিয়ে সালাহশোরের এ ধরনের মন্তব্যের পিছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও আছে। আহমেদিনেজাদের সমর্থক হওয়ার কারণে ‘ফ্রাইডে প্রেয়ার্স কমিটি সালাহশোরকে নির্মাতা হিসেবে বিশেষভাবে সম্মানিত করে। এছাড়া ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং থেকে তিনি একটি টিভি সিরিজ নির্মাণের জন্য আর্থিক অনুদানও পান।

তবে সালাহশোরের এসব কথার প্রতিবাদ জানিয়ে হাউজ অব সিনেমা ২০১০ খ্রিস্টাব্দের শীতকালে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। সংগঠনটি নিয়ে বিষোদগার করার দায়ে আদালত সালাহশোরকে ৪০ হাজার ইরানি মুদ্রা জরিমানা করেন। হাউজ অব সিনেমা এর বিরুদ্ধে আপিল করলে আদালত সালাহশোরের ওই মৌখিক বিবৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিবেচনা না করে, আগের রায়ই বহাল রাখেন। হাস্যকর হলেও সত্য, যে আদালত তার এই মৌখিক বিবৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিবেচনা না করেই মামলাটির নিষ্পত্তি করেন। সেই আদালতে একই সময়ে সালাহশোরের বিরুদ্ধে অন্যের ভাব ও শব্দ নিজের বলে ব্যবহারের অভিযোগে আরেকটি মামলার শুনানি চলছিলো।

হাউজ অব সিনেমার আইনজীবী জামাল খানদান কোচাকি রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, হাউজ অব সিনেমার নির্মাতাদের বিরুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণের যে অভিযোগ সালাহশোর করেছেন তা মোটেও সত্য নয়। কেননা এমন অনেক চলচ্চিত্রই তারা নির্মাণ করেছে, যেগুলো সরাসরি ইসলামি বিপ্লবকে সমর্থন করে। আইনজীবী জামাল আরো বলেন, সালাহশোর ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি একজন বিত্তশালী লোক। তাকে মাত্র ৪০ হাজার ইরানি মুদ্রা জরিমানা করা হাস্যকর। দেখে মনে হচ্ছে, সরকার, বিচার বিভাগ ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হাউজ অব সিনেমাকে দমন ও বাকরুদ্ধ করতে একযোগে কাজ করছে।

এদিকে ২০১১র ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংস্কৃতি ও ইসলামি গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের উপবিভাগ ‘কাউন্সিল অব সিনেমার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপমন্ত্রী জাভেদ সামাগদারি ইরানের স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতা ও হাউজ অব সিনেমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে হাউজ অব সিনেমা একটি অবৈধ সংগঠন। এটি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যা গুটিকয়েক লোক নিয়ন্ত্রণ করে। আগামী বছর আমরা এমন একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করবো, যার মাধ্যমে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সব লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘যারা যা-ই করুক, আমিই হবো ইরানি চলচ্চিত্রের শেষ আশ্রয়।

এ সময় কিছু মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, সরকার হয়তো হাউজ অব সিনেমা বন্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। কেননা এই স্বাধীন নির্মাতাদের মাধ্যমে সরকার নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারছিলো না। অন্যদিকে সরকার একটি পক্ষকে লক্ষ লক্ষ ডলার ভর্তুকি দিয়ে তাদের মতাদর্শে চলচ্চিত্র-নির্মাণে সহযোগিতা করছে। যারা তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নে কাজ করছিলো। এই বিষয়টি সংস্কারবাদী অনেক দর্শককে হতাশায় ফেলে। তারা আশঙ্কা করে, যদি হাউজ অব সিনেমা সত্যি সত্যি বন্ধ হয়ে যায়, তবে ইরানি চলচ্চিত্রে আর কোনো বিকল্প কণ্ঠস্বর থাকবে না।

তবে কিছু মানুষের এই আশঙ্কা অল্প সময়ের মধ্যে সত্যি হয়। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ৩ জানুয়ারি আহমেদিনেজাদ সরকার এক সমন জারি করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাউজ অব সিনেমার সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। এ ব্যাপারে হাউজ অব সিনেমা কর্তৃপক্ষ আইনের আশ্রয় নিলেও তাতে কোনো কাজ হয় না। এর মাধ্যমে ইরানের প্রায় পাঁচ হাজার স্বাধীন চলচ্চিত্রকর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আহমেদিনেজাদ ক্ষমতায় থাকা কালে হাউজ অব সিনেমা আর কার্যক্রম চালাতে পারেনি। অবশেষে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগস্ট হাসান রুহানি নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করলে, তার নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী সে বছরের ১২ সেপ্টেম্বর এক আদেশে তা পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে। 

.

২০১০ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় মোহসেন আমির ইউসুফিফায়ার কিপার। সঠিক জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি যখন তেহরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখানো হয়, তখন সেখানে কোনো নারী শিক্ষার্থীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। কেননা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ ইরানে জনপ্রিয় হলেও তা এখনো ট্যাবু। এর কড়া সমালোচনা করে আমির ইউসুফি একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে ইরানের সেন্সরশিপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাকে বিস্মিত করেছে, আমি মনে করতাম এ সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু বিখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন এমন ঘটনা ঘটেছে, তখন মনে হচ্ছে এটা একা কারও সিদ্ধান্তের বিষয় নয়।

২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ফায়ার কিপার ভারতের কেরালা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম দেখানো হয়। এরপর ইরানে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে ইউসুফিকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। মূলত মিনিস্ট্রি অব কালচার অ্যান্ড ইসলামিক গাইডেন্স-এর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতেই ইউসুফির এই তিন বছর কেটে যায়। এতো কিছুর পরও সেন্সর বোর্ড নির্দেশ দেয় যে, ১৬ বছরের নীচে কেউ এ চলচ্চিত্রটি দেখতে পারবে না। তার পরও অবশ্য আমির ইউসুফি বেশ আনন্দিত। কারণ চলচ্চিত্রটি নিয়ে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত আগ্রহ দেখিয়েছে। এসব দেখে তাকে জোর গলায় বলতে শোনা গেছে, চলচ্চিত্র নিয়ে এ লৈঙ্গিক বিভাজন আমরা রুখবোই। যদিও লৈঙ্গিক বিভাজন ইরানে নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে আহমেদিনেজাদ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে চাপ বাড়তে থাকে। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ বিভাজন নিশ্চিত করতে উঠে পড়ে লাগে তারা। উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্থান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও লৈঙ্গিক বিভাজন করা হয়। এরপর তারা উঠে পড়ে লাগে চলচ্চিত্র দর্শকের মধ্যে লৈঙ্গিক বিভাজন আনতে।

তবে এ কথা ঠিক যে, শুধু কথা বলে এ লৈঙ্গিক বিভাজন ঠেকানো সম্ভব নয়। কেননা এটা আহমেদিনেজাদ সরকারের সাংস্কৃতিক কৌশলের অংশ। তারা যেকোনো উপায়ে এটি আইনসম্মত করে সব স্থানে নারী-পুরুষের মধ্যে বিভাজন আনবেই। তবে ইরানের সংস্কারবাদীরা মনে করেন, আইন করে নারী-পুরুষকে আলাদা না করে, একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সম্পর্কের সম্মান বজায় রাখার চর্চা করতে হবে। তবেই সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব।  

দায় স্বীকার : ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ইরানে নতুন সরকার গঠনের পর রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রণ সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে জরুরি অবস্থায় নিয়ে এসেছে বলে মনে করছে ‘স্মল মিডিয়া ফাউন্ডেশন’। বেসরকারি এ সংগঠনটি ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেন্সরশিপের বিষয়টি নিয়ে কাজ করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১১’র জুলাই মাসে তারা ‘কালচারাল সেন্সরশিপ ইন ইরান : ইরানিয়ান কালচার ইন অ্যা স্টেট অব ইমারজেন্সি শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে তাদের অনলাইন সংস্করণে। মোস্তফা খালাজি, ব্রনওয়েন রবার্টসন ও মারিয়ম আখদামির লেখা এ প্রবন্ধে বিশদভাবে ইরানের সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র ও থিয়েটারের ওপর যে সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে, তার তৎকালীন প্রবণতা তুলে ধরা হয়। সেখান থেকে ইরানের চলচ্চিত্রের ওপর সেন্সরশিপ অংশটি এ প্রবন্ধের মূল উৎস। প্রবন্ধটি এই লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন :

http://issuu.com/smallmedia/docs/culturalcensorshipiniran; retrieved on 15.11.2015

লেখক : মাজিদ মিঠু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

mazid.mithu@gmail.com

টীকা

১. ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে আহমেদিনেজাদ দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে এর ফলাফলকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে তার পদত্যাগের দাবিতে যে আন্দোলন হয় তাকে ‘গ্রিন মুভমেন্ট নামে আখ্যায়িত করা হয়। সবুজ রঙ মূলত আহমেদিনেজাদের প্রতিপক্ষ মির হোসেইন মুসাভি’র রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনের প্রতীক ছিলো। কিন্তু নির্বাচনের পর তা সাধারণ জনগণের আশা-আকাক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৭৯র বিপ্লব পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে এটাই ছিলো ইরানের বৃহত্তম গণআন্দোলন। পরবর্তী সময়ে এ আন্দোলন ঝিমিয়ে গেলেও এর সমর্থকদের ওপর আহমেদিনেজাদ সরকারের দমনপীড়ন চলতেই থাকে।

২. ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে গঠিত ‘হাউজ অব সিনেমা ইরানের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের অধিকার আদায় ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করা অন্যতম সংগঠন। ইরানের চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়ন ও প্রায় ৯৫ শতাংশ শিল্পী-কলাকুশলীর অধিকার আদায়ের এ সংগঠনটি আহমেদিনেজাদ সরকারের কুদৃষ্টিতে পড়ে। কেননা সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে এ সংগঠনটি স্বাধীন ধারার নির্মাতা-শিল্পী-কলাকুশলীদের আস্থার জায়গায় পরিণত হয়।

৩. প্রতি শুক্রবার তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে জুম্মার নামাজের জন্য যে জমায়েত হয়, তা অনেকটাই উৎসবের মতো। প্রতি সপ্তাহের এই দিনে কর্তৃপক্ষ সিটি সেন্টারকে ট্রাফিকমুক্ত রাখে এবং ফ্রি বাস সার্ভিস চালু করে, যেনো শুক্রবারের নামাজে অধিক সংখ্যক মানুষ একত্রিত হতে পারে। বিশাল এই আয়োজনে কাজ করে ‘ফ্রাইডে প্রেয়ার্স কমিটি। এ কমিটির বর্তমান (২০১৫) নেতা আয়াতুল্লাহ সাইদ আহমাদ খাতামি। এ প্রার্থনা উৎসবে ইরানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যোগ দেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন