পলাশ খান
প্রকাশিত ১০ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
থার্ড পারসন-এর পিঠে চড়ে আবহসঙ্গীত দর্শন
পলাশ খান

সঙ্গীতে ইমেজের বয়ান
অনেক শিল্পের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে যেমন উপন্যাসের বর্ণনা, নাটকের সংলাপ আছে, তেমনই অভিনয়, সঙ্গীতের ছন্দ, আলোকচিত্রের বাস্তবতা, চিত্রকলার কম্পোজিশন-টোন-রঙ ও স্থাপত্যের গঠনশৈলী রয়েছে। শুরুতে নির্বাক ছিলো চলচ্চিত্র। সময়ের প্রবাহে জাদুময়তাকে ছাড়িয়ে চলচ্চিত্রের নির্বাক ইমেজ একসময় দর্শকের কাছে আগ্রহ হারাতে থাকে। ঠিক সেই সময় চলচ্চিত্রে সঙ্গীত ও শব্দ যোগ হয়। এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে সংযোজন হয় এক নতুন মাত্রার। মানবীয় আবেগ প্রকাশ ও চলচ্চিত্রের ইমেজগুলোকে প্রাণবন্ত করে তোলাই হয়ে ওঠে আবহসঙ্গীতের কাজ। অন্যভাবে বললে, আবহসঙ্গীত ইমেজকে পূর্ণতা দান করে। এজন্যই বলা হয়,“চলচ্চিত্র যেখানে ক্যামেরার ভাষা-সংলাপ-অভিনয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে না, সঙ্গীত সেখানেই তার অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশে এগিয়ে আসে।”১ আর সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব সেখানেই বেড়ে যায়।
তবে এর বিপরীত ঘটলে বিপত্তি বাধে অর্থাৎ, ঘটনার মেজাজ অনুযায়ী না হলে আবহসঙ্গীতটি কোনো কাজেই আসে না। তখন এটি অযথাই পরিস্থিতিটাকে আরো মন্থর করে তোলে। সঙ্গীতের একধরনের সম্মোহনী শক্তি আছে; সে কারণে কোনো চলচ্চিত্রে সঙ্গীত যদি দর্শকের মনকে অতিমাত্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন খোদ চলচ্চিত্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীতের ভূমিকা নিয়ে কথা বলার অবকাশ আছে। এটা মাথায় রেখেই প্রবন্ধটি লেখার চেষ্টা করা হয়েছে। এজন্য ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনা, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১১ ডিসেম্বর মুক্তি পাওয়া থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার সেসময় যৌগিক শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রের সবকটি শাখায় বেশ আলোচিত হয়। বিশেষ করে এর সঙ্গীত সাধারণ থেকে বোদ্ধা সব মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
স্তব্ধতা থেকে শব্দের দিকে
চলচ্চিত্রের আদিতে আবহসঙ্গীত বলে কিছু ছিলো না। সেই সময়টা ছিলো নির্বাক, অর্থাৎ শব্দ ও সঙ্গীতবিহীন। তখন চলচ্চিত্র দেখার সময় দর্শক প্রজেক্টরের ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া আর হয়তো কিছুই শুনতে পেতো না। একপর্যায়ে সেই শব্দকে ছাপিয়ে প্রেক্ষাগৃহে বিভিন্ন রকমের যন্ত্র বাজানোর প্রচলন করে সংশ্লিষ্টরা। ফলে চলচ্চিত্র দেখায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। পর্দায় দেখানো ইমেজের সঙ্গে মিল রেখে সেসময় যন্ত্রসঙ্গীত করা হতো। প্রেক্ষাগৃহ কর্তৃপক্ষের মাইনে দেওয়া পিয়ানো বা অর্গান বাদক পালন করতো এসব দায়িত্ব। তবে সব চলচ্চিত্রে ইমেজের সঙ্গে বাজনা বা সঙ্গীত সুনির্দিষ্ট ছিলো না। বড়ো বড়ো প্রযোজনা কোম্পানিগুলো অবশ্য নিজেরাই এসব অর্কেস্ট্রার ব্যবস্থা করতো; তাই তাদের চলচ্চিত্রে কোনটার পর কোন যন্ত্রসঙ্গীতের কম্পোজিশন বাজবে তা সুনির্দিষ্ট ছিলো। কিন্তু ছোটো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের একই চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতের ব্যবহার হতো।
এছাড়াও নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে জাপানে অদ্ভুত পেশার একশ্রেণির লোক ছিলো। তাদের বলা হতো বেনশি (Benshi)। যারা মূলত চলচ্চিত্রে সূত্রধরের কাজ করতো। কোনো চলচ্চিত্র দেখানোর আগে তার কাহিনি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনার পাশাপাশি তারা চলচ্চিত্র চলাকালীন ধারাবিবরণীও দিতো। চলচ্চিত্রের কাহিনি বোঝানোর জন্য এদের ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। দর্শককে কোনো নতুন ধারণা, যেমন অচেনা শহর বা কোনো প্রথা, আচার ইত্যাদি বোঝাতে বেনশিরা ভূমিকা রাখতো। কিন্তু এরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কথাও বলতো। যেমন ছবিতে আকাশ দেখানো হলে ‘এখন আপনারা আকাশ দেখছেন’ বলতেও তারা ছাড়তো না। ভাষার গুণের কারণে বেনশিদের অনেকেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কোনো বিশেষ বেনশির বর্ণনা শুনতে প্রেক্ষাগৃহে লোকও হতো অনেক বেশি। মজার ব্যাপার হলো, সবাক চলচ্চিত্র আসার পরেও বেনশিদের দাপটে অনেকদিন জাপানে সবাক চলচ্চিত্রই প্রদর্শন হয়নি ।
যাক সেসব কথা, অর্কেস্ট্রার যুগে—
গ্রিফিথই বোধহয় প্রথম পরিচালক যিনি এ রীতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে এক নতুন উপায় আবিষ্কার করলেন। গ্রিফিথ গান বুঝতেন; তবে তিনি সুরকার ছিলেন না। তাই মৌলিক রচনার দিকে না গিয়ে বেটোফেন-মোৎজার্ট প্রমুখ প্রখ্যাত সুরকারদের রচনা থেকে প্রয়োজন মত অংশ বেছে নিয়ে তাঁর ছবির সঙ্গে বাজানোর জন্য একটি গোটা স্বরলিপি গ্রিফিথ তৈরি করে দিতেন। এই স্বরলিপি যাতে অবিকলভাবে অনুসরণ করা হয় তার কড়া নির্দেশও তিনি দিয়ে দিতেন।২
নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রে বিখ্যাত সঙ্গীত সংযোজন হিসেবে ধরা হয় আইজেনস্টাইনের ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এর জন্য করা স্বরলিপিকে। স্বরলিপিটির রচয়িতা ছিলেন জার্মান সুরকার অ্যাডমুন্ড মাইজেল। ‘বার্লিন শহরে ‘পটেমকিন’-এর প্রথম প্রদর্শনীর সময় ছবি ও সঙ্গীতের জবরদস্ত সমাবেশ নাকি দর্শকের মধ্যে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিলো।’৩
তবে অ্যাডমুন্ড মাইজেল চলচ্চিত্রের জন্য সঙ্গীতের যে কম্পোজিশন করেছিলেন, তা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভের সুযোগ পায়নি। কারণ কম্পোজিশনটি ছিলো শুধু অর্কেস্ট্রার জন্য, এবং তা বার বার বাজানোর জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিলো না। পরবর্তী সময়ে সবাক যুগে এসে আবহসঙ্গীতে অর্কেস্ট্রার ব্যবহার চলচ্চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। হলিউডের প্রতিটি স্টুডিওতেই তখন সঙ্গীতায়োজনের জন্য অর্কেস্ট্রা থাকতো। ইউরোপের সেরা সেরা সুরকাররা নিজের দেশের চলচ্চিত্রে সঙ্গীতায়োজনের তাগিদে আবহসঙ্গীতের কায়দা-কানুন আয়ত্তে হলিউডে আসতে থাকেন। কারণ ইউরোপে তখনো সবাক চলচ্চিত্রের যথেষ্ট বিকাশ ঘটেনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে। যদিও ১৯২০-এর দশক থেকেই সের্গেই আইজেনস্টাইন, এফ ডব্লিউ মার্নো ও ফ্রিৎস ল্যাঙ-এর মতো ইউরোপিয় নির্মাতারা ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ, চার্লি চ্যাপলিন, বুস্টার কিটন প্রমুখ মার্কিন পরিচালক ও অভিনেতাদের সঙ্গে মিলে ইউরোপে চলচ্চিত্র-নির্মাণ শুরু করেন। এই দশকেই প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে চলচ্চিত্রের শটগুলির সঙ্গে ঐকতান রেখে শব্দ, সঙ্গীত ও কথোপকথন যুক্ত করা সম্ভব হয়। উদ্ভব হয় সবাক চলচ্চিত্রের। ইংরেজিতে এগুলোকে ‘টকিং পিকচার’ বা সংক্ষেপে ‘টকি‘ (talky) বলা হতো।
সবাক যুগের শুরু থেকে প্রায় বিশ বছর ধরে আবহসংগীতে অর্কেস্ট্রার ব্যবহার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। ক্রমে ক্রমে হলিউডেরই কোনো কোনো ছবিতে এ নিয়মের দু-একটি করে ব্যতিক্রম দেখা দিতে লাগল। Carol Reed-এর The Third Man ছবিতেও আবহসংগীতে শোনা গেল কেবলমাত্র একটি যন্ত্র : Zither High Noon ছবিতে শোনা গেল পুরুষ কণ্ঠে গীত লোকসংগীত । কোনও কোনও ছবিতে (Louis de Rochemont প্রযোজিত Boomerang, House on the 92nd Street, 31 Rue Madeleine) এমনও দেখা গেল যে আবহসংগীত সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা হয়েছে। ফরমুলার ভাঙন শুরু হল এইখানেই।৪
আরো পরে এসে চলচ্চিত্রের রীতি ও প্রকৃতির আমূল পরিবর্তনের ফলে বিষয়বস্তুর পরিধি অনেক বেড়ে যায়। ফলে তখন চলচ্চিত্রে কথা বলার ঢঙ, ক্যামেরার ব্যবহার, সম্পাদনার কায়দা-কানুন বদলে যায় সবই। এই বদলের সঙ্গে বদলাতে থাকে আবহসঙ্গীতের ঢঙও। চলচ্চিত্রের যে মেজাজ তার ওপর নির্ভর করে আবহসঙ্গীতের রূপ নির্ধারণ হতে থাকে। এখানে পুঁথিগত নিয়মের কোনো ব্যবহার নেই। এরপর চলচ্চিত্র সবাক থেকে রঙিন হয়; সম্পাদনার উৎকর্ষও পৌঁছে প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। বর্তমানে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিস্ময়কর সব ‘ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট’। কিন্তু সেই নির্বাক যুগে চলচ্চিত্রের সঙ্গে আবহসঙ্গীতের যে বন্ধন গড়ে উঠেছিলো, তা আজও অটুট রয়েছে।
শব্দ, সঙ্গীত ও আবহসঙ্গীত
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের পারি শহরে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় তাদের প্রথম দেখানো চলচ্চিত্রে একটি পিয়ানোর সুর শুনিয়েছিলেন। এ সময়ই চলচ্চিত্র প্রথম শব্দের অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত হয়। ক্রমান্বয়ে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন পরিবেশে কৃত্রিমভাবে শব্দ সংযোজনের মাধ্যমে এর ব্যবহার বিস্তৃতি পায়। চলচ্চিত্রে কথা আর গানবর্জিত এসব শব্দ বা ধ্বনির ব্যবহারকে সাউন্ড ইফেক্ট বলে। তার মানে চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগেও শব্দ ছিলো। কিন্তু তখনো চলচ্চিত্র সবাক হয়ে ওঠেনি। মানে চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো কথা বলতো না। ফলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি দেখা যায়, এসব চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ঠিক এ রকম একটি সময়ে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ওয়ার্নার ব্রাদার্স দ্য জ্যাজ সিঙ্গার চলচ্চিত্রে অ্যাল জনসন নামে তৎকালীন বিখ্যাত এক সঙ্গীতশিল্পীকে পর্দায় হাজির করেন। ফলে দর্শক প্রথমবারের মতো পর্দায় গায়কের মুখে গান শোনার অভিজ্ঞতা নেয়। এভাবেই চলচ্চিত্রে শুরু হয় সঙ্গীতের ব্যবহার।
‘চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের প্রয়োগকে দুইভাবে ভাগ করা যায়। এক. বাস্তব ঘটনার দ্বন্দ্ব-সংঘাত দৃষ্টিগ্রাহ্যের মাধ্যমে যা বর্ণনা দেয় তার সাঙ্গীতিক প্রকাশ অর্থাৎ ‘ইম্প্রেশনিস্টিক’ প্রয়োগ। দুই. ‘এক্সপ্রেশনিস্টিক’ অর্থাৎ মানসিক টানাপোড়েন, ভাবাবেগজাত বা অন্তরের ভাবকে যা প্রকাশ করে তার সাঙ্গীতিক প্রকাশ।’৫ এভাবেই সঙ্গীতের দুটি প্রধান ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায়—একটি বাস্তব, যেমন গায়কের গান বা নাচিয়ের নাচ; অন্যটি ব্যবহারিক, সঙ্গীত সংযোগে একটি প্রতিরূপ বা ইমেজের বর্ণনা বা পরিবর্ধন করা। যা একটি ইমেজকে সঠিক ভাব প্রকাশে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলে। এর বাইরে অবশ্য স্তব্ধতাও চলচ্চিত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেননা স্তব্ধতা সঙ্গীতের অনুপস্থিতি নয়, বরং সরব সঙ্গীতের উপস্থিতিকে আরো গভীরভাবে ব্যক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। চলচ্চিত্রের অনেক দৃশ্যকে স্তব্ধতা আরো তীব্রভাবে প্রকাশ করে, যা অনেক সময়ই শব্দের মাধ্যমে বোঝানো যায় না।
চলচ্চিত্র শুধু বাস্তব গতিই ধরতে চায় না, আরো অনেক অধরা বিচলনকে ধরতে চায়—আবেগজাত, ইন্দ্রিয়বোধজাত, বুদ্ধিজাত এমনকি কারো ব্যক্তিত্বও। যেমন : চলচ্চিত্রে শুধু সঙ্গীত ব্যবহারের মাধ্যমেও একজনের ব্যক্তিত্বের বিকাশ বা অবনমন দেখানো সম্ভব। সঙ্গীত যেমন বাস্তব গতি প্রদর্শনে সাহায্য করে, তেমনই মানসিক বা অন্তর্লীন বিবর্তনেরও আভাস দেয় বা তাকে আরো তীব্র করে তোলে।৬
রাতের শহরে একাকী মেয়েটি
অন্ধকার রাত, শহরের গলি দিয়ে একটি মেয়ে হাঁটছে—এমন দৃশ্য দিয়ে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার-এর শুরু। সেখানে একা একটি মেয়ে রাতের শহরে সম্ভাব্য বিভিন্ন বিপদের সম্মুখীন হয়। প্রথম শটে রাতের পরিবেশে ঝিঁঝি পোকা ও নাম না জানা প্রাণীর ডাক আর কিছুক্ষণ পর কি-বোর্ডের গৎ ও বাঁশির সুরের সঙ্গে ড্রামের ঢাক ঢাক শব্দ (০০:০১:০২); এর মধ্য দিয়েই থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার-এর আবহসঙ্গীতের শুরু। কি-বোর্ডের গৎ ও বাঁশির সুরের সঙ্গে ড্রামের ঢাক ঢাক শব্দের যে কম্পোজিশন তা রাতের অন্ধকারে মেয়েটির আশ্রয় খোঁজা, অসহায়ত্বকে আরো বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
রাতের অন্ধকারে অসহায়ত্ব ও ভয়াবহতা বোঝাতে যে আবহসঙ্গীতের শুরু, তা দিনের আলোতেও রুবার নানা কর্মকাণ্ডে পুরো চলচ্চিত্রে বিভিন্ন সময় ঘুরেফিরে পাঁচ বার এসেছে। ওভারব্রিজে রুবাকে যৌনকর্মী ভেবে গাড়ি নিয়ে আসা লোকটি যখন হাত ধরে টানাটানি করে চলে যায় সেই মুহূর্তে (০০:০৬:৩৬) দ্বিতীয়বার বাজতে থাকে আবহসঙ্গীতটি; তখন রুবাকে কাঁদতে দেখা যায়। এরপর টাইটেলকার্ড দেখানোর পুরো সময় ধরে তা চলে। আট মিনিট ১৪ সেকেন্ডে ব্রিজের উপর তিন জন পুলিশ রুবার কাছে আসলে আবহসঙ্গীত থেমে যায়। এরপর থানায় পুলিশ ইন্সপেক্টরের সামনে বসে রুবা যখন তার অতীতের ঘটনা বলে, তখন ফ্ল্যাশব্যাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে রুবার চলে যাওয়ার দৃশ্যে (০০:১২:৩০—০০:১২:৫১) আবহসঙ্গীতটির পুনরাবৃত্তি হয়। এরপর খালাতো বোনের বাসায় আশ্রয় পাওয়া; পরের শটে বাসা ভাড়ার লিফলেট দেখা এবং আরো পরে রুবাকে রাস্তায় হেঁটে বাসা খুঁজতে দেখা যায়। এই সময়ও (০০:১৫:১৮—০০:১৬:২২) আবহসঙ্গীতটি বাজতে থাকে।
রুবার এমন পরিস্থিতিতে বাঁশির সঙ্গে সেতারের যে কম্পোজিশনটি আবহে বাজে, তা নিঃসন্দেহে তার অসহায়ত্বকে দর্শকের কাছে আরো তীব্র করে। কিন্তু বোনের বাসায় আশ্রয় পাওয়ার পর যখন ওই একই আবহসঙ্গীতটি বাজানো হয়, তা কেনো জানি পরিস্থিতিকে তেমনভাবে স্পর্শ করে না। সঙ্গীত সংযোগে একটি প্রতিরূপ বা ইমেজের বর্ণনা বা পরিবর্ধনের যে কাজ আবহসঙ্গীত করে থাকে, সেটা এখানে অনুপস্থিত। বরং মনে হয় নির্মাতা বিনা কারণে এর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন।
এছাড়াও সেই রাতে বা পুরো চলচ্চিত্রে যখনই রুবা কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন, তখনই আরেকটি কম্পোজিশন বাজিয়েছেন নির্মাতা। ফোনে কথা বলা ছেলেটি যখন রুবার পিছু নেয় (০০:০৩:৫১—০০:০৪:৩৪), তখন তিনি দৌড়ে পালান এবং পরে কিছু ছেলে তার হাত ধরে টানাটানি করে এমন পরিস্থিতিতে ওই আবহসঙ্গীতের শুরু। পরে সবমিলিয়ে তা বিভিন্ন জায়গায় বেজেছে চার বার। রহমান চাচা যখন রুবাকে বিরক্ত করে (০০:৪৭:০০—০০:৪৭:২৩), বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রুবার দিকে রহমান চাচা কামুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে (০০:৪৭:০০—০০:৪৭:৩৯) কিংবা তার দোকানের কাছ দিয়ে হেঁটে গেলে রুবার সামনে পানের পিক ফেলে—তখন এই আবহসঙ্গীতের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই আবহসঙ্গীতটির এমন পুনরাবৃত্তি বিরক্তির উদ্রেক না করে একটি সামগ্রিকতা দিয়েছে, যা এখানে মোটিফ হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে হয়।
‘ও দিনমণিরে এমন আলো ফেলিস না
আর আমার উপরে’
কোনোখানে বাসা ভাড়া না পেয়ে খালাতো বোনের বাসায় সাময়িক আশ্রয় নেন রুবা। কিন্তু রুবার এ থাকা মেনে নিতে পারেন না বোনের শাশুড়ি। ফলে শুরু হয় নানা অপমান-লাঞ্ছনা। রুবাকে বার বার ওই বাড়ি থেকে চলে যেতে বলা হয়। অন্যদিকে একা একটা মেয়েকে বাসা ভাড়া দিতে চায় না কেউই। ফলে অপমান সহ্য করে থাকা ছাড়া রুবার আর কোনো উপায় থাকে না। রুবা যখন এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তখন একদিন সকালে নাস্তা করতে এসে বাধে বিপত্তি। নাস্তা নিয়ে রুবা খাবার টেবিলে বসতে যাবেন, এমন সময় বোনের শাশুড়ি সেখানে ঢুকে পড়ায় কৌশলে একটা রুটি-ভাজি নিয়ে বাইরে চলে আসতে হয় তাকে।
বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে অসহায় রুবা সেই ভাজি-রুটি রোল করে মুখে দেন, আর ঠিক সেই মুহূর্তে (০০:২৩:৩৩) আবহে বেজে ওঠে বাঁশির সুর। কিছু পরে বাঁশির এ সুর ধরে হাজির হয় লালন ব্যান্ডের সুমির কণ্ঠ। ‘‘ও দিনমণিরে এমন আলো ফেলিস না আর আমার উপরে’’ শিরোনামের ওই গানটি যেনো রুবার মনের কথাই বলতে থাকে। আবহে সেই গান আর অসহায়ের মতো শহরের রাস্তায় রুবার হাঁটতে থাকা। একপর্যায়ে, নদীর ধারে ক্রন্দনরত রুবাকে দেখা যায়, সেসময় নদী থেকে ভেসে আসে ট্রলারের শব্দ। তারপর মেঘের গর্জন, সঙ্গে আরম্ভ হয় বৃষ্টি। বৃষ্টি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে গান বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টা এমন, সুমির কণ্ঠ দিয়ে রুবা যেনো তার কষ্টের কথা প্রকৃতিকে বলেছেন, আর প্রকৃতি যখনই না সেই কথায় সাড়া দিয়েছে রুবা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। যথাযথ আবহে যথাযথ সঙ্গীতের এই ব্যবহার দর্শকের মনে নাড়া দিয়েছে; রুবার জন্য জাগিয়েছে কষ্ট; আর নির্মাতা হিসেবে ফারুকী ও তার সঙ্গীত পরিচালকের শিল্প সৃষ্টি সেখানেই সফলতার মুখ দেখেছে।
ভিতর বাহির প্রসঙ্গ
আশ্রয়ের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে রুবা যখন ক্লান্ত, রহমান চাচার বদৌলতে ভাড়া পাওয়া বাসাটিও যখন তাকে এক মাসের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে, তখন মহাচিন্তায় সময় যায় রুবার। দর্শকও শঙ্কায় থাকে, শেষ পর্যন্ত রুবার কি কোথাও আশ্রয় জুটবে না? একদিন অফিসে রুবা তার সহকর্মী স্বপ্নাকে হেডফোনে গান শুনতে দেখে জিজ্ঞাসা করেন—সে কী শুনছে? স্বপ্না রুবাকে বলেন, তপুর গান। তপুর সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কথা রুবা জানান স্বপ্নাকে। অফিসের বারান্দায় এসে তপুর নম্বর জোগাড় করে তাকে ফোন দেন রুবা। কথোপকথনের একপর্যায়ে রুবা তার বিপদের কথা তপুকে জানান। তার সঙ্গে দেখা করতে চান।
তপুর আগমনের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে নতুন এক মেজাজ যোগ হয়, তার হাওয়া লাগে আবহসঙ্গীতেও। থার্ড পারসন-এ ৫২ মিনিট ২৮ সেকেন্ড থেকে শুরু হয় একেবারে নতুন এক আবহসঙ্গীতের। রুবা ফোনে তপুর সঙ্গে কথা বলছেন, রাস্তা জেনে নিচ্ছেন, সেই মতো কাশবনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন রুবা। এদিকে আবহে কি-বোর্ডে বাজছে ‘বাহির বলে দূরে থাকুক, ভিতর বলে আসুক না’ গানটির কম্পোজিশন। দুধ-সাদা আকাশ, লাল শাড়ি পরা একা একজন মেয়ে, মুখে কৌতূহল-ভয়-মায়ার চিহ্ন, ক্যামেরা হাই-অ্যাঙ্গেল আর আবহে সেই কম্পোজিশন।
পরে কাশবনে কথা বলার সময় থেমে থেমে গানের কম্পোজিশনটি তিন বার বেজেছে। গায়ক হয়ে ওঠার আগে স্কুলের বন্ধু তপু পছন্দ করতেন রুবাকে, হয়তো ভালোও বাসতো। পাত্তা দেননি রুবা। অনেকদিন পর তাদের দেখা, তা নিয়ে দ্বিধা-ভয়-আনন্দ-কৌতূহল রুবার ছিলো। একেবারে কাশফুলের নরম ছোঁয়ার মতো করে পরিচালক বাজিয়েছেন কম্পোজিশনটি, যা রুবার না বলা দ্বিধা-ভয়ের কথা বলতে পেরেছে বলে মনে হয়েছে।
রুবার জন্য বাসা ঠিক করে দেন তপু। বাসায় ওঠার প্রথম দিন রাতে রুবা আর তপু এক বাসাতেই থাকেন। এক ঘণ্টা ১৯ সেকেন্ডে ক্লোজ শটে রুবার পা নাড়ানো দিয়ে ‘বাহির বলে দূরে থাকুক, ভিতর বলে আসুক না’ গানটি শুরু হয়। গান চলাকালীন রুবাকে দরজা দিয়ে উঁকি মেরে বাইরে আসতে দেখা যায়, পরে ড্রইংরুমে এসে পানি পান করে তপুর কক্ষের দিকে তাকিয়ে আবার ঘরে চলে আসেন তিনি। রুবাকে বিছানায় অস্থিরভাবে বসে থাকতে দেখা যায়। অন্যদিকে তপু পায়চারি করেন। পরে রুবার দরজার কাছে এসে উঁকিঝুঁকি মারেন, টোকা দেন তপু। রুবা দরজা খুললে এক ঘণ্টা দুই মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে হাবিব ও ন্যান্সির কণ্ঠের অসাধারণ মেলোডি মেশানো ‘দ্বিধা’ শিরোনামের গানটি থেমে যায়। কিন্তু দর্শক হিসেবে অস্থির লাগে, অসাধারণ এই গানটির চিত্রায়ণ যেনো হতাশ করে। মানুষের মনের চিরন্তন যে দ্বিধা, তার বহিঃপ্রকাশ নিয়ে চিত্রায়িত এই গানটিতে অকারণে তপুর নাচোন-কোদন নির্মাতার শিল্পবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভাবি, যা শুনছি, তারই তো পুনরাবৃত্তি দেখছি।
এ নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার সাফ কথা, ‘‘... দৃশ্য বস্তু, কথা ও ধ্বনির সাহায্যে ছবিতে যা বলা হল, তার উপরে সংগীতের প্রলেপ দিয়ে বক্তব্যকে আরও পরিস্ফুট, বা আরও আবেগময় করার প্রয়োজন যদি পরিচালক বোধ করেন, তবেই তিনি আবহসংগীতের আশ্রয় নেন। অযথা আবহসংগীতের ব্যবহার ছবির ক্ষতি বই উপকার করতে পারে না।’৭ অবশ্য অনেক আগে রুশ চলচ্চিত্রনির্মাতারা এই ত্রুটি সম্বন্ধে সাবধান করে দিয়েছিলেন। স্বয়ং আইজেনস্টাইনও এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি কখনোই দৃশ্যে যা দেখানো হচ্ছে শব্দে তার পুনরাবৃত্তি মেনে নেননি।
যৌন কামনা বনাম অস্থিরতা বনাম ‘‘যুদ্ধ’
খালাতো বোনের বাসা থেকে চলে গিয়ে রুবা তার বান্ধবীর বাসায় ওঠেন। বান্ধবীর বর কথায় কথায় রুবাকে থেকে যেতে বলেন তাদের বাসায়। এটি নিয়ে বান্ধবী তার বরকে ডেকে ঝগড়া শুরু করে দেন, যা দূর থেকে শুনতে পান রুবা। মুখে একটা শ্লেষের হাসি নিয়ে মুঠোফোন হাতে তুলে নেন রুবা, ফোন দেন বাড়িওয়ালা রহমান চাচাকে। ঠিক এই সময় (০০:৩৮:৪৭) রণসঙ্গীতের সুর ঢোলের কম্পোজিশনে বাজতে শুরু করে। বুঝতে সমস্যা হয় না, রুবার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
রহমান চাচার ঠিক করে দেওয়া বাসায় ওঠার মধ্য দিয়ে আবহে রণসঙ্গীতের বাদন প্রথমবারের মতো (০০:৪০:১০) শেষ হয়। পরে এই আবহসঙ্গীতটি বেশ কয়েকটি জায়গাতে শুনিয়েছেন নির্মাতা। আগেই বলেছি, তপুর সঙ্গে বাসায় ওঠার প্রথম দিন রাতে তারা দুজন একসঙ্গেই ছিলেন। রাতে রুবার দরজায় টোকা দিয়ে তার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন তুলে কথা বলেন তপু। কথা শেষে দরজা বন্ধ করে দেন রুবা। তপুকে মাথায় হাত দিয়ে অস্থিরভাবে দরজার সামনে পায়চারি করতে দেখা যায়। এই সময় মানে এক ঘণ্টা তিন মিনিট ১৪ সেকেন্ড থেকে ঢোলের সঙ্গে স্যাক্সোফোনের কম্পোজিশনে আবার বাজানো হয় রণসঙ্গীতটি।
এর কিছু সময় পর আবারও রুবার দরজায় টোকা দেন তপু। রুবা দরজা খুললে আবহসঙ্গীতটি বন্ধ হয়ে যায়। কথা বলা হয়ে গেলে রুবা দরজা বন্ধ করেন, ঠিক এই সময় (০১:০৪:২৯) থেকে একই কম্পোজিশন বাজতে থাকে। তপুকে বুকডন দিতে দেখা যায়। তিনি অস্থিরভাবে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করেন, ঘরে যান। অন্যদিকে রুবাকেও অস্থিরভাবে তপুর ঘরের দিকে যেতে দেখা যায়। পুরো সময় জুড়ে কম্পোজিশনটি বাজতে থাকে।
এছাড়া রুবা ফোন করে তপুকে ডাকলে (০১:২৯:২৯), তপু গাড়ি নিয়ে রুবার সঙ্গে দেখা করতে আসার মাঝপথে ওষুধের দোকানের সামনে কনডম কেনার জন্য পায়চারি করার সময় আবহে রণসঙ্গীতটি বাজতে থাকে। পরে রুবার বন্ধ দরজার সামনে তপু আসলে তা শেষ হয়। পুকুর পাড়ে রুবার সঙ্গে দেখা করার পর রাগান্বিত তপু ফিরে যাওয়ার সময় যখন কনডমের প্যাকেট ছুড়ে ফেলেন (০১:৩৫:৪৮), তখন শেষবারের মতো আবহে রণসঙ্গীতের কম্পোজিশনটা বাজে।
রুবা যখন জীবন সংগ্রামে হেরে নতুন একটা সংগ্রাম শুরু করেন, তখনো আবহে যা বাজে; একই ফ্ল্যাটে বন্ধুর সঙ্গে থেকে যখন শারীরিক চাহিদা অনুভব ও নিবারণের চেষ্টা করেন, তখনো একই কম্পোজিশন বাজে! এ কথা ঠিক, যুদ্ধ যে শুধু রণাঙ্গনে হয় তা নয়; সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধ হয়তো নিজের সঙ্গেই মানুষকে করতে হয়। কিন্তু কামে অস্থির তপুর বুকডন দেওয়া, বার বার পানি খাওয়ার সঙ্গে আবহে যখন রণসঙ্গীতের কম্পোজিশন বাজে, তখন তা কেনো জানি দর্শককে ঘটনার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে না। বরং অনেকখানি বাড়াবাড়ি মনে হয়। এছাড়া রুবার ফোন পেয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে তপুর সবার ফোন কেটে দেওয়া, দোকানের সামনে পায়চারি করা, কনডম কেনা—এসব ক্ষেত্রেও রণসঙ্গীতের ওই কম্পোজিশন ঠিক মানানসই মনে হয়নি। শারীরিক যুদ্ধের চেয়ে মানসিকভাবে কোনোকিছুকে প্রতিহত করা হয়তো কঠিন; তবে এটা মনে রাখতে হবে, দুটো যুদ্ধ কিন্তু আলাদা। একই মানুষ একই সঙ্গে যেমন দুই যুদ্ধে জিততে নাও পারেন, তেমনই একই আবহসঙ্গীত দুই যুদ্ধের জন্যও প্রযোজ্য নয়।
দেয়ালের ওপাশটা দেখা হলো না
রুবা স্বামীর সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে গেলে তার চাকরি পাওয়া ও বাসা ভাড়া নেওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে রুবা কারাগার থেকে চলে যান এবং গাড়িতে তাকে চোখে টলমল জল নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়, আর তখনই হারমোনিকার সুর দিয়ে শুরু (০১:১৩:৩৬) ‘‘দেয়ালের ওপারে আছে আকাশ/ খেয়ালের নানা রঙ আছে বাতাস/ সে আকাশ দেখা হয় না/ সে বাতাস এসে ছোঁয় না/ কেঁদে যায় কেঁদে যায়/ কেমন করে বলো ওইখানে যাই/ যেখানে তুমি আর তোমরা আছো সবাই’’ গানটি।
রুবার স্বামী মুন্না কারাগারের ভিতরে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তখনই গান শুরু হয়। আবহসঙ্গীতটি দিয়ে মুন্নার মনের অবস্থা ফুটে ওঠে। গানটি শুরুর সময় হারমোনিকা বাজার পর সেতারের সুর দিয়ে পরে যখন গান আসলো, তখন বুঝতে কষ্ট হলো না সুরটা আসলে কী বলতে চেয়েছিলো। কারাগার থেকে বের হয়ে রুবার স্বামী যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন, তখন আরেকবার বেজেছে সঙ্গীতটি। মুন্না রুবার সঙ্গে আগের মতো মানিয়ে নিতে না পারায় একসময় পাগলের মতো অবস্থা হয় তার। মুন্না চার দেয়াল থেকে বের হলেন ঠিকই কিন্তু ততোদিনে সব বদলে গেছে। চেনা মানুষ আর পৃথিবী তখন তার কাছে এক অন্য জগতে রূপ নিয়েছে। মুন্না রাস্তায় বসে আছেন এবং পাগলের মতো আচরণ করছেন। তখন আরেকবার বাজে গানটি (০১:৫৪:৩৯), ঠিক যখন কিনা তিনি আরেকটি দেয়ালের বাইরের খোঁজ করছেন, সেই দেয়ালটা হলো রুবার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। গানটি যখন আবহে শোনা যায়, তখন গানের কথার সঙ্গে কার্যকলাপের পুনরাবৃত্তি ঘটেনি তাই আবহে গানটি ভালো লেগেছে।
যেখানে এসে সব একাকার
যখন আমরা সঙ্গীত শুনি তখন আমরা আসলে এমন কিছু শুনি যা একটি শুরু থেকে একটা শেষের দিকে যাত্রা করেছে এবং যা সময়ের সাথে সাথে বিকাশমান। একটি সিস্ফনি [সিম্ফনি] শুনুন: এর শুরু আছে, মধ্যবর্তী অবস্থা আছে, শেষ আছে, কিন্তু সবসময় আগের মুহূর্তে কী শুনেছি এখন কী শুনছি এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগ সাধন করতে না পারলে এবং পুরো সিস্ফনিটির [সিম্ফনিটির] সামগ্রিকতা সম্পর্কে সচেতন না থাকলে আপনি এর কোন মজাই পাবেন না। যদি থিম ও ভ্যারিয়েশন, সঙ্গীতের এই দুটি ফর্মুলা নেন তবে দেখবেন আপনি সঙ্গীতটি ধারণ ও অনুভব করতে পারছেন শুধু যখন প্রত্যেক ভ্যারিয়েশনের জন্য প্রথমে যে থিম শুনেছেন সেটা মাথায় রাখতে পারেন। প্রত্যেক ভ্যারিয়েশনের একটা নিজস্ব সৌরভ আছে যেটা আরও বোঝা যায় যদি অবচেতনে আপনি আগের ভ্যারিয়েশনের ওপর পরেরটিকে বসাতে পারেন।৮
সঙ্গীত নিয়ে এ কথাগুলো ফ্রান্সের বিখ্যাত কাঠামোবাদী তাত্ত্বিক লেভি স্ত্রসের। তিনি মূলত মিথ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সঙ্গীতের এই গুরুত্বের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। লেভি স্ত্রস-এর এই আলোচনা আপাত শুদ্ধ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় বলে মনে হলেও চলচ্চিত্রের সমগ্রতায় সঙ্গীতের বিশ্লেষণও কিন্তু তাই। ‘‘মুড়িভাজা ভোর থেকে খই ভাজা গোধূলী’৯ পর্যন্ত সঙ্গীতের একটা গতিময়তা থাকতে হয়। আর এই গতিময়তাই একটি চলচ্চিত্রকে পূর্ণতা দেয়। থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার সেই গতিময়তা ধরেছে কিন্তু পূর্ণতা পায়নি বললেই চলে।
লেখক : পলাশ খান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা করেন।
polashkhan2020@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. আরজু, সৈয়দ সাবাব আলী; ‘চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীত’; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল; সম্পাদনা : মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ঢাকা, বর্ষ ১, সংখ্যা ১, ২০০৮, পৃ. ২৯।
২. রায়, সত্যজিৎ (২০১৫ : ৬৯); ‘‘চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীত’’; প্রবন্ধ সংগ্রহ; সম্পাদনা : সন্দীপ রায়; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., কলকাতা।
৩. প্রাগুক্ত; রায় (২০১৫ : ৬৯)।
৪. প্রাগুক্ত; রায় (২০১৫ : ৭০)।
৫. প্রাগুক্ত; আরজু (২০০৮ : ২৯)।
৬. রোবের্জ, গাস্তঁ (২০০৬ : ১৩৭); ‘‘শব্দ ও সংগীত’’; চলচ্চিত্রের টেকনিক ও টেকনোলজি; সম্পাদনা : ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।
৭. প্রাগুক্ত; রায় (২০১৫ : ৭১)।
৮. লেভি-স্ত্রস, ক্লদ (২০০৭ : ৫৫—৫৬); মিথ এন্ড মিনিং; অনুবাদ : প্রিসিলা রাজ; বাঙলায়ন, ঢাকা।
৯. লাইনটি নুসরাত নুসিন-এর ‘জলপাই সুখ’’ নামের অপ্রকাশিত কবিতা থেকে নেওয়া।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন