Magic Lanthon

               

বিজয়া রায়

প্রকাশিত ০২ মে ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

শেষ তিনটে ছবি করেছিল বলে মানিক আরও আট বছর বেঁচেছিল

বিজয়া রায়

আগামী অক্টোবরে বিজয়া রায়ের আশি বছর পূর্ণ হবে। আশি বছরে অগুন্তি স্মৃতির ভিড়, খণ্ড খণ্ড স্মৃতি চিত্র, সময়ের পূর্বাপর হয়তো কখনও অজান্তে ওলট-পালট হয়ে গেছে তাঁর সাবলীল কথা বলার ভঙ্গিতে। আমি সেই অগোছালোভাব ইচ্ছে করেই রেখে দিলাম কারণ স্মৃতি তো কেবলমাত্র ঘটনার তালিকা নয়, অনুভূতিও বটে।

ঋতুপর্ণ ঘোষ : সত্যজিতবাবুর ছবির কোনও দৃশ্য, কোনও ঘটনা, বা কোনও চরিত্র কি ওঁর নিজের জীবন থেকে নেওয়া?

বিজয়া রায় : ফেলুদা অনেকটা ওর মতো। মানিকের সঙ্গে অনেক মিল আছে। ওই বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে নখটা ও কাটত না, ফেলুদারও সেটা ছিল। তাছাড়া, অনেক অনেক কিছু সিমিলারিটিও ওর ফেলুদার সঙ্গে পাওয়া যায়। শুধু Western Classical Music-এর প্রতি টানটা রাখেনি ইচ্ছে করে। তাহলে বড্ড বেশি মিল হয়ে যেত। কিন্তু আরও অনেক ব্যাপারে ফেলুদার সঙ্গে মিল।

ঋতুপর্ণ : বই পড়া?

বিজয়া রায় : বই পড়া, সব ব্যাপারে উৎসাহ, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাপার যেটা, সেটা, সবই মানিকের ভিতর ভীষণ আছে।

ঋতুপর্ণ : না এত গেল একটা চরিত্র, কোনও দৃশ্যের বা মুহূর্তের কথা বলতে গেলে?

বিজয়া রায় : সেটাতো জানো একজন ডিরেক্টর, তিনি যখন ডিরেক্ট করছেন, তুমি নিজেও বেশ বুঝতে পারবে, সে তো ন্যাচারালি তার ভিউ পয়েন্ট থেকে করবে তো, কাজেই কিছু কিছু জায়গায় নিশ্চয়ই, নিজের মতো হয়ে যায়। কিন্তু পারটিকুলারলি কোথায় এসেছে, কোন জায়গায় সেটা আমি এখন বলতে পারব না, এতগুলো ছবি করেছে, মনে করা একটু মুশকিল।

ঋতুপর্ণ : পথের পাঁচালী-র অপু তো আপনার আবিষ্কার, তাই না?

বিজয়া রায় : আমাদের পাশের বাড়িতেই অপু পাওয়া গেল। এত রাজ্যি খুঁজে, কত কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে, কত কি করে, হাজার হাজার লোক এসেছে বাড়িতে ইন্টারভিউ দিতে, তারপরে সে পাশের বাড়িতে ...। তাকে আমি বাঙালি ভাবিনি। আমি প্রথমে দেখেছি খেলা করছিল নিচে, আমি আমার শাশুড়ির ঘরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, জানলা থেকে দেখলাম, নিচে খেলা করছে কতগুলো ছেলে। তার মধ্যে একটা ভীষণ ফুটফুটে ছেলে, আমি ভাবলাম এ নিশ্চয়ই বাঙালি নয়। তখন ওই অঞ্চলে অনেক সাউথ ইন্ডিয়ান পরিবার ছিল, পঞ্জাবি পরিবার ছিল, নর্থ ইন্ডিয়ান লোকও ছিল। কাজেই আমি ভাবলাম এতগুলো বাচ্চা খেলা করছে, এত সুন্দর দেখতে, একি আর বাঙালি হবে? নিশ্চয়ই না, আমাদের কাজের মেয়ে ছিল, আমি তাকে নিচে পাঠালাম, এক্ষুনি গিয়ে খবর নিয়ে এসো, এসে বলল, না বৌদি, বাঙালি। আমি বললাম এক্ষুনি ডেকে নিয়ে এসো। সুবীর এল সঙ্গে ওর বড় ভাই। দু তিন বছরের বড়। তাকে জিজ্ঞেস করলাম। বলল, আমরা তো আপনাদের পাশের বাড়িতেই থাকি। এগজ্যাক্টলি পাশের বাড়ি। মানে ওদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির জানলা দিয়ে সব কথা বলা যায়। এত কাছে, কিন্তু কোনওদিন চোখে পড়েনি, আশ্চর্য।

ঋতুপর্ণ : দুর্গাকে কিভাবে পাওয়া গেল?

বিজয়া রায় : উমাকে স্কুলে। আশিস বর্মণের কিছুটা অবদান আছে এখানে। বেলতলা স্কুলে তখন উমা পড়ত, আশিস কোনও একজন টিচারের সঙ্গে কোনও কাজে দেখা করতে গিয়েছিল, তখন এই মেয়েটিকে চোখে পড়ে। তখন ও মানিকের সঙ্গে কাজ করছিল, অ্যাসিসটেন্ট হিসাবে। এসে মানিককে বলল, দুর্গার জন্য একটা মেয়েকে, আমার মনে হল বেশ প্রমিসিং, তো আমি একবার ... আনব? মানিক বলল, নিশ্চয়

কিন্তু সে দুর্গা যখন এলো, আমার তো দেখে চক্ষু চড়কগাছ, এই মেয়ে যে দুর্গা হতে পারে, ভীষণ সেজেগুজে এসেছিল। চক্চকে ফ্রক পরা, পার্ল স্ট্রিং পরা সে খুব কায়দা করে চুল টুল করে ... আমার তো একদম ভাল লাগল না, আমি তো মানিককে বললাম, কি করে, এ দুর্গা করবে? মানিক বলল, ঠিক করবে, তুমি ওর চুলটা টেনে বেঁধে দাও। একটা ডুরে শাড়ি পরিয়ে আনো। তক্ষুনি ওকে সাজিয়ে দেওয়া হল, আর একদম সত্যি দুর্গা হয়ে গেল। মানিকের চোখটাই একটু আলাদা ছিল, আমাদের চোখে পড়ত না যেটা, সেটা ওর চোখে পড়ত।

ঋতুপর্ণ : অনেক সময় হয় তো আপনার চোখে পড়েছে উনি খেয়াল করেননি¾এরকম আর কোনও কাস্টিং-এর কথা মনে পড়ে আপনার?

বিজয়া রায় : রীনা। ওতো খেয়ালই করেনি, চিতুর মেয়ে রোজ দেখছে অথচ খেয়ালই করেনি, অথচ রীনা চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  আমি বললাম, দেখো তুমি তো খুঁজছো, মৃন্ময়ীর জন্য, কিন্তু চিতুর মেয়েকে, রীনাকে দেখ না, মিষ্টি দেখতে, ভারি মিষ্টি মুখটা। তখন, ও বলল সত্যিই তো। আমি কোনওদিন ভাবিইনি, চিতু রাজি হবে? আমি বললাম, কেন রাজি হবে না, তোমার এত বন্ধু। তুমি বললে নিশ্চয় রাজি হবে। হয়ে গেল।

ঋতুপর্ণ : সৌমিত্রদাকে খুঁজে বের sport করাটা মনে আছে?

বিজয়া রায় : সেটা নিতাই বলে, আমাদের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ছিল, সেই সৌমিত্রকে নিয়ে এসেছিল। অপরাজিতর জন্য। মানিক বলল, অপরাজিতর জন্য একটু বেশি বড় হয়ে গেছে। হবে না, কিন্তু আমি মনে রাখব তোমাকে। তারপরে যখন অপুর সংসার করল, তক্ষুনি নিতাইকে বলল, ‘অপুকে নিয়ে এসো, ওকে মানাবে বেশ।’

ঋতুপর্ণ : আমরা শুনেছি যে মানিকবাবু স্ক্রিপ্ট লিখে যে অল্প কজনকে শোনাতেন তার মধ্যে প্রথমে ছিলেন আপনি।

বিজয়া রায় : শোনাতো না, আমাকে পড়তে দিত। বলত ‘যদি কোনও ভুল নজরে পড়ে, তাড়াতাড়ি লিখতে গেলে অনেক সময় একটু ভুল ত্রুটি থেকেই যায়, তো ভাল করে দেখো; কোনও ভুল ত্রুটি যদি থাকে, পাশে ছোট্ট মার্ক দিয়ে দিও। আমি যাতে বুঝতে পারি।’ আমি সেটা করতাম, ভীষণ মন দিয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে কারেক্টও করতাম, মনে আছে। বলত, ‘ঠিক আছে, দেখে নেবো, এটা ঠিক আছে কি না। মাঝে মাঝে আমার ভুল চোখে পড়ত, আর বেশির ভাগ সময় ওরই ঠিক থাকত। আমার যা মনে হত সোজা বলতাম।

আমার মনে হচ্ছে, এটা ঠিক হচ্ছে না, এটা ভুল হচ্ছে। ‘গণশত্রু'তে যেমন, ও সৌমিত্রর রোলটা নাস্তিক করেছিলো, তা আমি বললাম, ‘যে দেখো, আমাদের ভারতবর্ষে ৯৯.৯% মানুষ ভগবানে বিশ্বাস করে, তুমি যদি ওকে নাস্তিক কর, তাহলে কোনও সিম্প্যাথি ওর দিকে যাবে না। এটা এমন কর যে, ওপেন রাখো, ঠিক আছে, থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে।’ তক্ষুনি রাজি হল। শুধু চিত্রনাট্যই নয়, গল্প ইংরিজি [ইংরেজি] বাংলা যা কিছু লিখত, সব সময় আমি আগে পড়তাম। তবে চিত্রনাট্য তুমি যে বলছিলে, যে লোকের সামনে পড়া, সেটা উনি যখন সমস্ত রেডি হয়ে যেত, তার মেন আর্টিস্ট যারা তাদের ডেকে, একদম পুরো অ্যাকটিং করে, চিত্রনাট্য পড়ে যেতেন, আর ওদের খুব সুবিধে হত।

ঋতুপর্ণ : শিল্পীরা অ্যাকটিংটা পেয়ে যেতেন, একটা মডেল পেয়ে যেতেন?

বিজয়া রায় : সবসময় তাই করতেন, সব্বাইকে ডেকে, একটা বিরাট আসর বসত, আমি চা জলখাবার-টাবার সার্ভ করার জন্য থাকতাম। একটা আধ ঘণ্টার ইন্টারভ্যাল হত। বিশেষ করে অসুখের পর। অসুখের পরে, ওই যে অতখানি পড়া, অতক্ষণ ধরে, মাঝখানে কিছুক্ষণ ব্রেক করে।

ঋতুপর্ণ : অসুখের পরে কী ধরনের রেস্ট্রিকশনে ছিলেন?

বিজয়া রায় : অনেক রেস্ট্রিকশন্ ছিল, খাওয়া দাওয়ার তো প্রচণ্ড, আর কী ওষুধ, অসম্ভব ওষুধ খেতে হত, আর যেটা আগে কোনওদিন করত না, দুপুরবেলা একটু বিশ্রাম নিত।

ঋতুপর্ণ : আগে করতেন না সেটা?

বিজয়া রায় : নেভার।

ঋতুপর্ণ : আগের রুটিনটা কি ছিল?

বিজয়া রায় : হি ওয়াজ আর্লি রাইজার, সাতটা সাড়ে সাতটা, উঠে ভোরে, সকালে ব্রেক ফাস্ট করে, সোজা কাজের ঘরে গিয়ে বসত, বসে সমানে কাজ, আর কিছু না। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস ছিল, এটা আমি খুব অবাক হয়ে যেতাম, সবাই অবাক হয়ে যেত, ওরই বন্ধুবান্ধব, ন্যাচারালি ওর কাছে তো লোকজন আসবেই, লোকজন আসত, তখন ও, ওদের সঙ্গে, খুব ভদ্র ছিল, হি ওয়াজ আ ভেরি সিম্পল ম্যান, ওদের নিজে দরজা খুলে ভেতরে বসাত, গল্প করত, সবই করত সঙ্গে সঙ্গে কাজও করত। এটা পিকিউলিয়ার।

ঋতুপর্ণ : কী কাজ করতেন, ছবি আঁকতেন?

বিজয়া রায় : ছবি আঁকা, গল্প লেখা, সব করতে পারত, করতে পারত কিন্তু, কোনও অসুবিধে হত না। এই যে বাড়িতে গণ্ডগোল, হৈ চৈ হচ্ছে, তার মধ্যে নিঃশব্দে বসে কাজ করছে, আমি বলতাম, ‘তোমার ডিসটার্বেন্স কিছু হয় না’? ‘আমার কিছু হয় না, আমি দিব্বি কাজ করি।’ একলা বসে চুপচাপ কাজ করার ব্যাপারটা পরের দিকে একটুখানি হয়েছিলো। যখন ওকে ডাক্তারের নিষেধ মেনে চলতে হত। তখন ও বলত ‘আমি একদিন দুদিনের জন্য এই কোনও একটা কাছের হোটেলে গিয়ে ... ’ একবার তাজ-এ ছিল, একবার কেনেলওয়ার্থ-এ ছিল। একদিন হোটেলে থেকে খালি স্ক্রিপ্টটা তৈরি করে ফেলত। আমি যেতাম খাবার টাবার নিয়ে, কিন্তু অসুখের আগে গণ্ডগোল, গোলমাল, বন্ধুবান্ধব সক্কলের সঙ্গে বসে, বিশেষ করে রোববার দিন, বিরাট আড্ডা বসত সকালে, ওর কাছে অনেক পুরনো বন্ধু, তারা সবাই আসত। খুবই মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আছে তার মধ্যে, কিন্তু সক্কলের সঙ্গে সমান ব্যবহার, সব্বাইকে ভীষণ ... এসব দিকে কোনও রকম ছোট বড় নয়, যে একে বেশি খাতির করতে হবে, ওকে কম, সবাই সমান, এসে বসত, সক্কলের সাথে কথা বলত। আর সমানে কাজ করে যেত।

ঋতুপর্ণ : চিত্রনাট্য লিখতেন? ওরকম ভিড়ের মধ্যে? ওই ভাবে।

বিজয়া রায় : হ্যাঁ, সব সময়, তবে মিউজিক-এর সময় ... কারণ মিউজিকটা খুব কনসেনট্রেট করে করতে হত বলে। এটা বলত, ‘আমি এই সময় কোনও ডিসটার্বেন্স চাই না, আমি তাহলে খেই হারিয়ে ফেলব।’ এই নিয়ে কতগুলো মজার ব্যাপার আছে, এটা আমি আমাদের জীবনীতে লিখব। লিখতে আরম্ভ করেছিও অনেকটা হয়ে গেছে যে মিউজিক-এর সময় ও ভীষণ বেশি কনসেনট্রেট করত পাছে গণ্ডগোল হয়ে যায়, আর সমস্তটা নিজে নোটেশন করে রাখত, করে রেখে হঠাৎ রাত্রে কোনও সুর মনে এসেছে, ‘শিগ্গিরি একটা কাগজ কলম দাও তো’, তক্ষুনি নোটেশনটা লিখে রাখত, অনেক বার এরকম হয়েছে। একবার হয়েছিল, সেটা অসুখের পরে, ‘গুপি বাঘা ফিরে এল’-র সময় তাতে ও একটা সাউথ ইন্ডিয়ান সুর টিউন করেছিল। তো রাত্তিরবেলা এসে শুতে এসে আমাকে বলত, ‘জান একটা ভারি সুন্দর একটা সুর মনে এসেছে’, বলে আমাকেই গুনগুন করে গেয়ে শুনিয়ে দিলো, আমি বললাম, ‘বাঃ খুব ভাল হয়েছে।’ তারপর দিন সকালবেলা, আমি অনেক ভোরে উঠে চানটান করে নিতাম, তারপরে ও উঠে চান করত। স্নান সেরে বেরিয়ে আমি ঘরে ঢুকছি, হঠাৎ দেখলাম মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কি হল? হলটা কি’? ‘এই জান কালকে তোমায় যে সুরটা শোনালাম, আমি একদম ভুলে গেছি, কিছুতেই মনে করতে পারছি না’, আমি বললাম, ‘সেকি আমার মনে আছে তো’। ‘এ্যাঁ মনে আছে?’ ‘হ্যাঁ মনে আছে’, তক্ষুনি আমি গেয়ে শুনিয়ে দিলাম। তখন বলল, ‘ভাগ্যিস তোমাকে শুনিয়েছিলাম’।

ঋতুপর্ণ : আচ্ছা, ওঁর কি কান্না সম্পর্কে একটা এমব্যারসমেন্ট ছিল? ওঁর ছবিতে কেউ জোরে কাঁদে না, কাঁদলেও মুখ ঢেকে, বা ব্যাক টু ক্যামেরা।

বিজয়া রায় : কোনও কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা, কোনও ইমোশনের আতিশয্যাই ওর পছন্দ ছিল না। বেশি শো অফ করার টেনডেনসিটা একদম ছিল না কোনওদিন। এমনিতেও, হি ওয়াজ বেসিকালি আ ভেরি সিম্পল ম্যান। আর পোশাক-আশাক-এ ভীষণ সিম্পল ছিল। অত্যন্ত সিম্পল, খাওয়া দাওয়ার দিক থেকেও খুব একটা ভীষণ সাংঘাতিক রকম বিলাসী ছিল না। খাওয়ার দাওয়ার পিছনে ও সময় নষ্ট করতে চাইত না, খেতে কেউ বেশি টাইম নিচ্ছে, তাতে ওর একটু অসুবিধে হত। আমাকে জিজ্ঞেস করত, ‘তোমরা খাবার টেবিলে বসে এত গল্প কর কী করে?’ খাওয়া শেষ হলে, সেই মুহূর্তেই উঠে পড়ত।

ঋতুপর্ণ : কিন্তু ওর ছবিতে তো খাবার টেবিলে বা খেতে খেতে গল্প করার প্রচুর দৃশ্য আছে!

বিজয়া রায় : সেটা আছে, কারণ সেটা বাঙালিদের স্বভাব। সেটা রাখার জন্য ও ওরকম করেছে, ও নিজে একদম ছিল না। খাওয়া শেষ হলেই উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে ফেলত। গেস্টরা এলে, আমি বলে রাখতাম, ‘দেখো গেস্ট আসছে, তুমি খেয়ে উঠে পড়বে না, দ্যাটস ভেরি ব্যাড ম্যানার্স, গেস্টদের আগে তুমি উঠ না, তুমি হাত ধুতে চাও তো তুমি এক্সকিউজ করে হাত ধুয়ে এসো, কিন্তু ...’

ঋতুপর্ণ : এরকম একটা মানুষকে নিয়ে ঘর করার থ্রিলটাই বা কোথায় আর অসুবিধেই বা কোথায়?

বিজয়া রায় : আমার কোনও অসুবিধে হয়নি।

ঋতুপর্ণ : সংসারে তো ওঁকে পাননি কোনওদিন!

বিজয়া রায় : কোনও অসুবিধে হয়নি, কারণ আমি কোনও ব্যাপারে ওকে ইন্টারফেয়ার করতাম না, ও কোনওদিন আমার ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার করত না। পুরো সংসারটা আমার ওপর ছাড়া, টাকা পয়সা কোনওদিন হাতে ধরেনি, (একটু হেসে) এটা প্রায় পরমহংসদেবের মতো বলা যেতে পারে। আমার ওর সঙ্গে অনেকবার কথা কাটাকাটি হয়েছে, ‘যে তুমি ফ্রম দ্য বিগিনিং, কাস্টিং তুমি কর, ড্রেস ডিজাইনিং তুমি, মেক আপ কে কিরম করবে প্রত্যেকটা সবসময় দেখিয়ে দাও, ক্যামেরার ব্যাপার তো প্রত্যেকটা শটের আগে লাইট সোর্চ এবং কোথায় ক্যামেরা প্লেস করবে, সবই তুমি কর।’ তারপর ডায়লগ লেখা, স্ক্রিপ্ট করা, এভরিথিং, গল্পও নিজের থাকে মাঝে মাঝে। আর্ট ডিরেকশনে তো সমস্ত করত বিরাট বিরাট ছবি এঁকে, প্রত্যেক ডিটেল কোথায় কোন জিনিসটা থাকবে। আর্ট ডিরেক্টর-এর কাজ খুব সহজ হয়ে যেত। আর মিউজিকও তো ওই করত, আমি বলতাম, ‘তুমি এত কাজ করছ, তুমি টাকা শুধু ডিরেকশনের নেবে কেন? অন্তত মিউজিক-এর জন্য নাও, যে লোকটা তোমার প্রোডিউসার সে যদি মিউজিক ডিরেক্টর রাখত, পয়সা তাকে তো দিতে হত।’ বলত, ‘আমি নিতে পারব না, আমার ভীষণ লজ্জা করে। আমাদের বাংলা ছবির এত লিমিটেড টাকা, টাকার দিক থেকে গরিব বলা যেতে পারে, সেজন্য এর চেয়ে বেশি টাকা আমি নিতে পারব নাআমার লজ্জা করে। তোমার অসুবিধে কি? বেশ তো আছ, আমরা খুব ভাল আছি, আমাদের কোনও ট্যাক্স-এর প্রবলেম নেই, ব্ল্যাক মানি নেই, দিব্যি আছি, সংসার চলে যাচ্ছে।’ বলতাম, ‘সে তো বইয়ের টাকায় চলছে, ছবির টাকায় না, শুধু ছবির টাকা হলে দুমাসেও চলবে না।’

ঋতুপর্ণ : যদ্দিন অবধি বইয়ের টাকা আসেনি তদ্দিন কি করে চলেছে?

বিজয়া রায় : তখন তো অনেক শস্তা [সস্তা] ছিল সব। তখন ছবির টাকাতেই সব হত।

ঋতুপর্ণ : তখন বছরে তো একটার বেশি ছবি করতেন না।

বিজয়া রায় : একটাও করতেন, দুটো করতেন, তাতে চলে যেত। একবার হয়েছিল কী, খুব মজার ব্যাপার, যেবার ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড পেল, সেবার ওর পায়ের খুব গণ্ডগোল হয়ে ছিল, ডেঙ্গু হবার পর থেকে, ডান পাটা একটুখানি মাঝে মাঝে গণ্ডগোল করত।

ঋতুপর্ণ : কবে ডেঙ্গু হয়েছিল?

বিজয়া রায় : ছোটবেলায়। সেইজন্য একটু লিম্প করে চলত, বোঝা যেত না, অত লম্বা মানুষ তো। কিন্তু, সেবার পায়ের গণ্ডগোলে অনেকদিন ওকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল। তখন আমাদের একটাও পয়সা ছিল না, সেই সময় ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড পাওয়াতে আমরা স্বচ্ছল হলাম, ভাগ্যিস অ্যাওয়ার্ডটা পাওয়া গেল, নইলে কার কাছে হাত পাততাম?

ঋতুপর্ণ : বাড়িঘর সাজানোটাজানোর ব্যাপারে ওর কোনও রকম ইন্টারেস্ট ছিল?

বিজয়া রায় : কোনও ইন্টারেস্ট ছিল না।

ঋতুপর্ণ : কিন্তু যাঁর ছবিতে অত ভাল আর্ট ডিরেকশন, তাঁর নিজের পরিবেশের ডেকর সম্পর্কে কোনও উৎসাহ ছিল না?

বিজয়া রায় : না। অথচ সেটে একটা জিনিস এদিক থেকে একবার ওদিক কর, তক্ষুনি চোখে পড়বে, ‘এটা কেন সরানো হয়েছে?’ ঠিকঠাক ফুল সাজানো চাই। সেটা আমিই করতাম, পরে বুনিও (ললিতা, ওঁর পুত্রবধূ) করে দিত, বুনি ভাল ফুল সাজাতে পারে। কিছু কিছু জিনিস ভারি অদ্ভুত। নিজের ঘর যেমন রেখে দিত বইয়ে বইয়ে বোঝায়, বসবার জায়গা নেই, লেক টেম্পল-এ তো বিশেষ করে, ছোট ঘর ছিল। তাতে একটা ডিভান ছিল, যাতে লোকে বসতে পারে, ডিভানে কোন বসার জায়গা ছিল না, সব বই, সমস্ত স্তূপীকৃত বই সোফার ওপর। আমি বলতাম, ‘লোক বসবে কোথায়?’ বলত, ‘ঠিক ম্যানেজ হয়ে যাবে’।

ঋতুপর্ণ : কী করে ম্যানেজ হত ফাইনালি?

বিজয়া রায় : ফাইনালি বইগুলো মাটিতে নামিয়ে নামিয়ে ...। আমি বলতাম, ‘এতরকম লোকজন বিদেশ থেকে আসেন, ওঁরা কী ভাবেন তোমার ঘরটা দেখে, এ রকম অগোছালো! আমার চোখে অন্তত বিসদৃশ তো বটেই, আমি এসব পছন্দ করি না।’ ও বলত, ‘তুমি কি বলছ, যাঁরা আসেন, বিদেশি লোকজনেরা, তাঁরা আমার ঘর দেখে অ্যাপ্রিশিয়েট করেন, জান? কেউ কিছু মনে করেন না, তুমি প্লিজ আমার ঘরটা গুছিও না, তোমার সারাবাড়ি আছে, গুছোও।’

ঋতুপর্ণ : উনি অত বইয়ের মধ্য থেকে দরকারি বইটা খুঁজে পেতেন?

বিজয়া রায় : ঠিক পেতেন, বরং আমি গোছালেই পেতেন না, আর যখন একেবারে অগোছালো অবস্থায় একটু রাতে হয়তো গুছিয়েছি, ‘কেন তুমি গুছিয়েছ, আমি বই খুঁজে পাচ্ছি না। বেশ তো ছিল আমি যেটা চাইছি সেটা পেয়ে যেতাম, আমি জানি কোনটা কোথায় আছে, এখন খুঁজেই পাচ্ছি না। বার কর, তুমি বার কর।’ আমাকেই খুঁজে খুঁজে বার করতে হত।

ঋতুপর্ণ : আচ্ছা সত্যজিৎ রায়কে কখনও খুব অসহায়, ভালনারেবল কখনও মনে হয়েছে আপনার?

বিজয়া রায় : যেমন ধর, যেদিন প্রথম দিন গণশত্রুর শুটিং হল। অসুখের অতদিন বাদে একটু নার্ভাস ছিল, কি হবে না হবে, সেদিন একটুখানি থতমত খেয়েছিল, শুটিংয়ের সময়, বাবু হেল্প করেছিল খানিকটা, সৌমিত্রও বুঝতে পেরেছিল, শুটিং সেরে মানিক বাড়িতে এলো। লেফট ব্রনকিয়াল ফেলিওর। সেদিনই রাত্তিরে সব ডাক্তাররা এলেন। বললেন টেনশন থেকে হয়েছে। তখন আমার ছেলে এসে বলল, ‘প্রথমত এখন শুটিং ক্যানসেল যদি করা হয়, সকলের ডেট নেওয়া রয়েছে, কেউ পরে আর ডেট দিতে পারবে না, ছবিটা বন্ধ হয়ে যাবে তাহলে, বাবা ছবি করবে বলে অস্থির হয়েছিল।’ ছবি করতে পারছে না, এটা যে ওর কাছে কতবড় একটা ট্রাজেডি সেটা আমি বলতে পারব না। পাঁচ বছর ছবি করেনি, কেবল একটা আধঘণ্টার ডকুমেন্টারি ছাড়া, সুকুমার রায়, ওর বাবার ওপর। তা সেটা তো বাড়িতেই হয়েছিল, খালি একটা সিন বাইরে। কিন্তু ছবি করতে না পারার যন্ত্রণা, সেটা আমি বুঝতে পারতাম, সেই সময়টা, ও যে কি গভীর যন্ত্রণার মধ্যে আছে, এ রকম অবস্থা আমি কক্ষনো দেখিনি।

ঋতুপর্ণ : সেটা কি প্রকাশ করতেন?

বিজয়া রায় : না কক্ষনও বলত না। আমি বুঝতে পারতাম, বলতাম, ‘তুমি তো ছবি করতে পারবে, এত ভাবছ কেন, একটু, শরীরে একটু জোর কর এখন।’ তারপর ডাক্তারা [ডাক্তাররা] যখন পারমিশন দিলেন, অ্যাট লাস্ট, কি খুশি হয়েছিল। তবে ভীষণ কষ্ট যে, আউটডোর শুটিং-এ যেতে দেবে না, সেজন্য খালি ঘরের মধ্যে। বলল ‘যে আমি এত আউটডোর শুটিং করতে ভালবাসি, আমাকে আউটডোর করতে দেবে না।’ বললাম ‘কি করে করবে তুমি, তুমি আউটডোর করতে গেলে তোমার সঙ্গে ডাক্তার যেতে হবে, নার্স যেতে হবে, অ্যাম্বুলেন্স যেতে হবে।’ বলল, ‘সত্যিই তো কি করে হবে, সেজন্য এমন কিছু বাছতে হবে যেটা যদিও আমার মনের মত নয়, কিন্তু শুটিং না করলে আমি আর পারব না।’ ছবি করাটা ওর কাছে, একদম। ...

ঋতুপর্ণ : জীবন ধারণের মতো?

বিজয়া রায় : অ্যাবসোলিউটলি। ... শেষ তিনটে ছবি করেছিল বলে মানিক আরও আট বছর বেঁচে ছিল এক বছরও বাঁচার কথা না, যা কন্ডিশন হয়েছিল।

ঋতুপর্ণ : হিউস্টন থেকে আসার পর?

বিজয়া রায় : আসার পর, কতবার। লেফট ভেন্ট্রিকিউলার ফেলিওর হয়েছে। পাঁচ বার।

ঋতুপর্ণ : পাঁচ বার?

বিজয়া রায় : হ্যাঁ। কিন্তু ও ছবি করেছে বলে বেঁচেছে, তা না হলে বাঁচত না। হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, গণশত্রুর প্রথম দিন শুটিং-এর, সেদিন যেমন ভেন্ট্রিকিউলার ফেলিওর হল, বাবু, আমাদের ডাক্তার-টাক্তার সবার সঙ্গে বসে গেল, তক্ষুনি ইনজেকশন দেওয়া হল, চেক আপ করা হল, ডা. বক্সি বললেন ‘শুটিং বন্ধ করুন, ক্যানসেল করে দিন।’ আমাদের যে হাউজ ফিজিশিয়ান ডা. মৌলিক বললেন, আপনি বুঝতে পারছেন না, যদি উনি শুটিং বন্ধ করে দেন তাহলে কিন্তু ভীষণ সেট ব্যাক হবে।’ ‘কিন্তু এই কনডিশন-এ করবেন কি করে?’ বাবু বলল, ‘দেখুন উনি কিরকম থাকেন সকাল বেলা। আমি কিছু বলছি না এখন। ক্যানসেলও করছি না, সকালবেলা, দেখা যাক যদি পারেন যাবেন, যদি না পারেন যাবেন না।’ পরদিন সকালবেলা মানিক বলল, ‘আমি অলরাইট, আমি শুটিং করব।’ তখন ডা. মৌলিক হাউস ফিজিশিয়ান বটেই, ভীষণ বন্ধুও ছিলেন, ওর জন্যই বিশেষ করে ডা. বক্সি রাজি হলেন। ডা. মৌলিক বললেন, ‘আপনি করতে দিন শুটিং, না করলে ভীষণ সেট ব্যাক হবে,’ তারপর ডা. বক্সি রাজি হলেন, কিন্তু তখন সবসময় দুজন ডাক্তার ... অ্যাম্বুলেন্স ...

ঋতুপর্ণ : টেনশন হয়নি আপনার তখন?

বিজয়া রায় : না জান, এটা কিন্তু আশ্চর্য! ও যখন শুটিং করত আমি দেখতাম, ও তো ভাল আছে, আমার কোনও টেনশন হত না। ও না করলেই আমার ভয় করত। তারপর দিন থেকে আবার শুরু, তারপরে কোনও গণ্ডগোল হয়নি। তারপর দিন থেকেই কনফিডেন্স পেয়ে গেল।

ঋতুপর্ণ : প্রথম দিনের কাজটা কি আছে ছবিতে?

বিজয়া রায় : পরের দিন আছে। সৌমিত্র আমায় বলল। ‘বৌদি কালকে মানিকদার এরকম হল, শুধু তাই নয়, লেফট ভেন্ট্রিকুল্যার ফেলিওর হল, তাও দেখ আজকে শুটিং করছে, আজকে হি ইজ, ভেরি ভেরি কনফিডেন্ট। কোনওরকম কিছুই বুঝতেই পারছি না, যে মানিকদা এত দিন শুটিং করেননি।’

ঋতুপর্ণ : আচ্ছা এতগুলো ছবির মধ্যে আলাদা করে বলা সত্যিই ডিফিকাল্ট তবে আমি আউটডোরগুলোই ধরি, কোন আউটডোরটা আপনার কাছে, ইন্টারেস্টিং মনে আছে?

বিজয়া রায় : ইন্টারেস্টিং মানে যদি বল কোনটাতে এনজয় করেছি, তাহলে এনজয় করেছি ভীষণ সোনার কেল্লা আর কাঞ্চনজঙ্ঘা নিঃসন্দেহে।

ঋতুপর্ণ : কেন, একটু বলুন।

বিজয়া রায় : সোনার কেল্লাতে যোধপুর, যেখানে ছিলাম, সার্কিট হাউস [হাউজ], ভীষণ ভালো জায়গাটা, আর সবাই এক সঙ্গে ছিলাম, কাজেই খুব এনজয় করেছি, তবে ভীষণ ঠাণ্ডা, তাছাড়া গল্পটা আমার ভীষণ ফেবারিট গল্প ছিল। আর দারুণ ভাল মুকুল পাওয়া গিয়েছিল, তাই জন্য খুব ভালো লেগেছিল, আর মসৃণভাবে শুটিং হয়ে গিয়েছিল। জয়পুর, যোধপুর, জয়সলমীর, বিকানীর। সব জায়গাতে ভীষণ এনজয় করেছি। আর কাঞ্চনজঙ্ঘাতে, দার্জিলিং প্রথমত অত সুন্দর জায়গা, আর পাহাড়ীদা মাতিয়ে রেখে ছিলেন। পাহাড়ীদা মানে সাচ এ নাইস ম্যান। অসম্ভব ভাল লোক। এত বড় মন, সবাই ওঁকে, ওঁর ঘাড় ভেঙে খাচ্ছে, আর উনি সবাইকে খাওয়াচ্ছেন সমানে। আমরা ভীষণ এনজয় করেছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছবি বিশ্বাস ছিলেন, ওঁকে একটু দূর থেকে খুব রেসপেক্ট করতাম। করুণা ছিল, বিশ্বনাথন ছিল, অলকানন্দা ছিল, অনুভা ছিল।

ঋতুপর্ণ : অরণ্যের দিনরাত্রির আউটডোর-এ বোধহয় আপনি যাননি?

বিজয়া রায় : ওটায় আমি যাইনি, বাবুর কোনও পরীক্ষা টরীক্ষা কিছু একটা ছিল। বাবুর জন্য আমি অনেক শুটিং মিস করেছি। ওই যেমন গুপী গাইন-এ আমি যেতে পারিনি।

ঋতুপর্ণ : সেটা কোথায় হয়েছিল?

বিজয়া রায় : জয়সলমীরে হয়েছিল।

ঋতুপর্ণ : অসুবিধে হয়নি ওঁর আপনি ছাড়া।

বিজয়া রায় : না, অসুবিধে হলেও উপায় ছিল না। বাবুকে ছেড়ে আমি তো তখন যেতে পারব না। সেটা ও বুঝেছিল।

ঋতুপর্ণ : এমনি উনি মানুষ হিসেবে সেল্ফ-সাফিশিয়েন্ট ছিলেন? নিজের কাজ-টাজগুলো নিজে করতে পারতেন? না আপনি করে দিতেন?

বিজয়া রায় : একটা কাজও করতে পারত না। সংসারের কোনও কাজ ও করতে পারত না। সব আমি ...

ঋতুপর্ণ : রান্না করতে পারতেন?

বিজয়া রায় : রান্নাঘরের দিকে কোনও দিন যেত না। রান্না? ভাল রান্না পছন্দ করত কিন্তু।

ঋতুপর্ণ : জামার বোতাম ছিঁড়ে গেলে বসাতে পারতেন, জামাকাপড় ইস্তিরি করতে পারতেন?

বিজয়া রায় : না, না একদম না, একদম না।

ঋতুপর্ণ : আউটডোরে গেলে আপনি না থাকলে কে দেখাশোনা করত?

বিজয়া রায় : তখন সমস্ত গুছিয়ে দিতাম, যাতে কোনও গণ্ডগোল [গণ্ডগোল] না হয়, কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট, তাকে আবার সব বুঝিয়ে দিতাম। যখন জয়বাবা ফেলুনাথ হল, ও বলল যে, ‘একটা গণেশের মূর্তি চাই, কোথাও পাচ্ছি না, যার কাছে আছে সে আমায় দেবে না।’ আমি নামটা বলছি না, তোমরা সবাই চেনো, আমরাও চিনি। তার কাছে প্রচুর গণেশের মূর্তি আছে।

ঋতুপর্ণ : বসন্ত চৌধুরী?

বিজয়া রায় : হ্যাঁ, ও শতরঞ্জ-এর সময় শাল দেয়নি, মানিক চেয়েছিল, কিছুই দেয়নি। কিন্তু ঠিক পেয়ে গেল, এত বন্ধু-বান্ধব ওর, বড়লোক সব ছিল, তাদের কাছে, কী দামি দামি শাল পেয়েছিলাম ভয় করছিল, সেগুলোকে আমায় সামলাতে হত তো। কত লক্ষ লক্ষ টাকা দাম সেসব শালের। দারুন [দারুণ] পুরনো সব। তারপরে এই গণেশ পাচ্ছে না। আমি বললাম, ‘তুমি গণেশ পাচ্ছ না? তোমার চেস্ট অফ ড্রয়ার্সে কী ওটা?’ ‘কোথায়?’ ‘এই যে সামনে, এইটে দিয়ে চলবে না?’ ‘বাঃ এতো দারুণ’। তারপর সেটাকে একটু সাজিয়ে টাজিয়ে দিল, স্টোনস বসিয়ে দিল, পেন্ট করে দিল।

ঋতুপর্ণ : এরকম আরও কিছু ঘটনা মনে আছে?

বিজয়া রায় : আরও একটা ছিল, মনে পড়ছে না, দুবার এরকম হয়েছিল, বাড়ির জিনিস, সামনেই রাখা। আগন্তুক-এর সময়, মমতার মাথায় [মাথার] কাছে যে ঘড়িটা ছিল। সুইস ক্লক, ‘ও রকম একটা ঘড়ি যদি পেতাম বড় ভাল হত।’  আমি বল্লাম ‘কী রকম ঘড়ি’; ‘ওই যে সুইস, এরকম ঘোরে ঘোরে’। আমি বললাম, ‘এটা কী দেখছ তুমি? এটা আমাদের বাবুর বিয়েতে, আমার বোন এই ঘড়িটা প্রেজেন্ট করেছিল, বিউটিফুল। সামনেই রাখা আছে’। ও বলে, ‘সেকি’! কোনও জিনিস লক্ষই করত না, কিচ্ছু লক্ষ করত না।

ঋতুপর্ণ : এমনিতে এত অবসার্ভেন্ট!

বিজয়া রায় : ওরে ব্বাবা, পান থেকে চুন খসলেই ...

ঋতুপর্ণ : ইভেন কোথাও গেলেও সেটা এত গভীর ভাবে মনে রাখতেন!

বিজয়া রায় : হি ওয়াজ ভেরি পার্টিকুলার অ্যাবাউট হিজ সেটস্, কিন্তু বাড়ির জিনিস ...

ঋতুপর্ণ : যখন প্রসঙ্গটা খুব ডেলিকেট, যখন হাসপাতালে গেলেন, তখন কি উনি বুঝতে পারছিলেন তার দিন শেষ হয়ে আসছে?

বিজয়া রায় : না।

ঋতুপর্ণ : উনি কোন জিনিসটায় মন দিতেন? আপনি এতদিন ধরে তো দেখেছেন, কোন জিনিসটা প্রথম স্ট্রাইক করত কাস্টিং-এর সময়ে?

বিজয়া রায় : কথা বলার ধরন। সেটা ভীষণ বেশি রকম। উচ্চারণ। তাছাড়া ক্যারেক্টরটা মানিয়ে যাচ্ছে কিনা।

ঋতুপর্ণ : ফিজিকাল ফিচার্সে কোন জিনিসটা দেখতেন আগে?

বিজয়া রায় : চোখ, প্রথমেই চোখ, ওই যে শর্মিলাকে চোখ দেখেই বলল। ওই যে ওই রকম ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, বব করা চুল আর ফ্রক পরা এসেছিল, দেখতে মিষ্টি খুবই, কিন্তু কিছুতেই আমি অপর্ণা হিসেবে ভাবতে পারছিলাম না। মানিক বলত, ‘চোখ দেখো, ওর চোখ দেখো, এক্ষুনি ওকে নিয়ে যাও, টেনে চুল বেঁধে দাও, আর একটা সাধারণ শাড়ি পরিয়ে দাও। একটা টিপ সিন্দুর দিয়ে দাও, দেখবে তুমি চেঞ্জ দেখবে।’ সত্যিই তাই হল, একেবারে শি ওয়াজ টোটালিট্রান্সফর্মড।

ঋতুপর্ণ : এরকম আর কাকে কাকে করেছিলেন?

বিজয়া রায় : উমাকে, মাধবীকে চারুলতার সময়, চারুলতার সময় থাকতাম, বাবু যখন একটু বড় হয়ে গেল, বিএ পাশ করার পর, ও জয়েন করল বাবার সঙ্গে, চারুলতার সময় কিন্তু বাবু স্কুলেই ছিল। আমি তাও যেতাম বাবু যখন স্কুলে যেত, বাবুকে আনবার জন্য, বাবু এলে পরে ওকে নিয়ে আবার স্টুডিও চলে আসতাম। বাবু ভীষণ ভালবাসত ছবিগুলোর শুটিং দেখতে। আমাদের নাতিটা কিন্তু ভীষণ দুষ্টু, বাবু যে রকম লক্ষ্মী ছিল, ও ভীষণ দুষ্টু। ভীষণ সুইট হয়েছে, ওকে নিয়ে আমার সময় কেটে যায়। ওই হয়েছে আমার অবলম্বন।

ঋতুপর্ণ : চারুলতার সময় শাড়িগুলো কি আপনি বাছলেন?

বিজয়া রায় : মেয়েদের ব্যাপারে শাড়ি কিনবার জন্য, কে কী ব্লাউজ পরবে, আমাকেই কিনতে পাঠাত, কিন্তু ডিজাইন ও করে দিত। পিরিয়ড ছবি হলে বিশেষ করে ও গিয়ে এডনা লরেঞ্জ থেকে নিয়ে আসত বড় বড় ছবি। এখনও সব রাখা আছে। সেখান থেকে ব্লাউজ তৈরি হত। মাধবী একটা যেখানে তোমার দুই হাতে ... শুটিং হয়েছিল সমুদ্রের ধারে।

দায়স্বীকার : বিজয়া রায়ের এই সাক্ষাৎকারটি ঋতুপর্ণ ঘোষ সম্পাদিত ‘আনন্দলোক’ পত্রিকার বর্ষ ২৪, সংখ্যা ৯, ২ মে ১৯৯৮ থেকে নেওয়া।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন