নাজমুল আরেফিন
প্রকাশিত ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
প্রসঙ্গ ‘হাওয়া’, ‘সুড়ঙ্গ’ এবং ‘তুফান’
পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক রাজনীতি আমাদের যা শেখায়
নাজমুল আরেফিন

লেখার সূত্রপাত
রায়হান রাফী’র তুফান নানা কারণে বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি মাইলফলক চলচ্চিত্র। দক্ষিণ ভারতীয় ‘মাসি’ ও মসলা চলচ্চিত্রের প্রভাবের যুগ এখন এই উপমহাদেশে। এই প্রভাবের হাইপ কতোখানি তা আমাদের চলচ্চিত্রপাড়া তুফানকে ঘিরে ভালোই টের পেয়েছে। চলচ্চিত্রজগতের এই হাইপার পপুলিজমের সময়ে তুফান একটা লার্জার দ্যান লাইফ ‘সোয়াগি’ চলচ্চিত্র। কিন্তু আমি এটাও মনে করি, তুফান রায়হান রাফীর দুর্বলতম চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য দীর্ঘমেয়াদে একটি ক্ষতিকর চলচ্চিত্র বলেও আমি মনে করি। কেনো তা নিয়ে এই লেখার শেষ অংশে লিখবোও। তবে তুফান চলচ্চিত্র হিসেবে কেমন, তা নিয়ে আলাপ করা মোটেও এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তুফান মুক্তির পর শুধু বাংলাদেশে রেকর্ড ব্যবসার পর মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে—যেখানে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আছে—সেখানেই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে বক্স অফিসে। প্রচণ্ড ব্যতিক্রম শুধু পশ্চিমবঙ্গ।
পশ্চিমবঙ্গে তুফান-এর মুখ থুবড়ে পড়াটা সহজে হজম করতে পারেনি চলচ্চিত্রের প্রযোজক, কলাকুশলী এবং শাকিব খানের আপামর ভক্তকূল। কিন্তু হজম করতে পারাটা কেনো এতো কঠিন? এটাই কি অনুমেয় ছিলো না? হাওয়া ও সুড়ঙ্গর মতো চলচ্চিত্র প্রশংসিত হলেও কলকাতায় ব্যবসা করতে পারেনি একদমই। তাই তুফান মুক্তির আগে যখন সাংবাদিকরা শাকিব খানকে জিজ্ঞেস করে—‘তুফান নিয়ে আপনি কতোটা আশাবাদী?’ শাকিব খান খুব ইন্টারেস্টিং একটা উত্তর দেন—‘উত্তম কুমারের শহরে কেনো বাংলা ছবি চলবে না? এ তো লজ্জার!’ শাকিব খানদের সাংস্কৃতিক ভুলটা এখানেই। তারা কলকাতার বাজারে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রকে ‘বাংলা’ চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা চালায়। হাওয়া ও সুড়ঙ্গর মতো চলচ্চিত্রগুলো মুখ থুবড়ে পড়া দেখেও এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করে না যে, উত্তম কুমারের শহরে বাংলা চলচ্চিত্র চলবে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নয়। দুটো জিনিস আলাদা। তুফান চলচ্চিত্র হিসেবে কেমন তা নিয়ে আলাপ করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, আগেও বলেছি। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে হাওয়া, সুড়ঙ্গ এবং তুফান পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক-রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের কী শিক্ষা ও বার্তা দেয় তা নিয়ে আলোচনা করাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
দুই বাংলার সংস্কৃতি এক, ভাষা এক—শুধু একপাক্ষিক কথার কথা?
কানাডায় সমাজবিজ্ঞানে পিএইচ ডি করতে আসার পর কলকাতা থেকে মাস্টার্স করতে আসা একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ক্রমেই আমরা খুব কাছের বন্ধুতে পরিণত হই। দূর প্রবাসে আমরা বাংলা ভাষায় ক্রিটিকাল নানা বিষয়ে আলাপ করতে থাকি। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে থাকি। একদিন আমাদেরই একজন কানাডিয়ান বন্ধু বাংলায় কথা বলতে দেখে জিজ্ঞেস করেন—‘এই তোমাদের দেশ আলাদা জানি, কিন্তু ভাষা কি একই নাকি!’ আমার ওপার বাংলার বন্ধু সঙ্গে সঙ্গে হেসে উত্তর দেন, কাইন্ড অব। ঠিক পুরোপুরি এক না, তবে অনেক মিল ...। আমি সেদিন আমার সেই বন্ধুর উত্তরে প্রথম প্রাকটিকালি বুঝতে পারি—যদি আমার দেখা সবচে মননশীল বাঙালির মনের ভেতরই এমন একটা ডিপ সিটেড ধারণা থাকে যে, আমাদের ভাষা এক না, তাহলে কলকাতার যেকোনো সাধারণ বাঙালি বাংলাদেশের মানুষের মুখের ভাষাকে আদৌ বাংলা কিংবা আমাদেরকে বাঙালি হিসেবে মনে করে? মনে করলেও কতোটুকু মনে করে? এই প্রশ্নটা মূলত ব্যক্তিগত ডাউট আকারে আমার মধ্যে হাজির হয়। কিন্তু এই প্রশ্নটাকে সামাজিক বিজ্ঞানের থিসিস আকারে আমায় নতুন করে ভাবিয়েছে, কলকাতায় হাওয়া ও সুড়ঙ্গর পর তুফান-এর ভরাডুবি।
আপনি বাংলাদেশ থেকে যতো ভালো কনটেন্ট বানান না কেনো; আপনি আপনার চলচ্চিত্রে যতোই ওদের থেকে কলাকুশলী টেকনিশিয়ান নেন না কেনো—এমনকি নিজের দেশের ‘ভাষা ব্যবহারে' কম্প্রোমাইজও যদি করেন, তাও কোনো লাভ নেই। চঞ্চল চৌধুরী, জয়া আহসান’রা সারাবছর কলকাতায় গিয়ে যতোই ইনিয়ে-বিনিয়ে ‘দুই বাংলার সংস্কৃতি এক, ভাষা এক’ বলে সাংস্কৃতিক ডিপ্লোমেসি করুক না কেনো। আলফা আই, ‘চরকি’, এস ভি এফ যতোই জয়েন্ট ভেঞ্চার বানাক। যতোই অনন্য মামুন এস কে মুভিজ-এর অশোক ধানুকাদের ‘আব্বা আব্বা’ করে ডাকুক; কোনো লাভ নাই! আমাদের দেশের চলচ্চিত্র ওরা সিনেমাহলে গিয়ে টাকা দিয়ে দেখবে না। লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। বর্তমান সময়ের এই বাস্তবতাটুকু আমি বুঝতে পেরেছি, কিন্তু আমাদের আর্ট-কালচার পাড়ার লোকজন এখনো সেটা বোঝে নাই। বুঝলেও না বোঝার ভান করে যাচ্ছে মূলত একটা কারণে।
এপার বাংলা ও ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ব্যাপারটার যে সেক্যুলার ন্যারেটিভ মানুষের সামনে হাজির আছে, তা যে মূলত একপাক্ষিক। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের নামে আমরাই যে শুধু ওপার বাংলা থেকে নিয়েছি; এবং যেটুকু নিয়েছি সেটুকুকেই যে শুধু বাঙালিপনা হিসেবে অনুশীলন করে আসছি। নিজেদের সাংস্কৃতিক জিনিসপাতি সাবস্ট্যানশিয়ালি কিছুই যে অন্য পাশ থেকে গ্রহণীয় হয়নি, সে সত্যটাকে আমাদের আর্ট-কালচার পাড়ার লোকজন এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। এপার বাংলা ও ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ব্যাপারটা যে আদতে এক ভীষণ শ্যালো এবং অভারসাম্যপূর্ণ ঐতিহাসিক পরম্পরা, তা নিয়ে জাতিগত ডিনায়াল তৈরি করতে পারলে অনেক সাংস্কৃতিক মোকাবিলার ঝামেলা ও দায়িত্ব কমে যেতো।
ছোটো দেশের সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে পড়ে থেকে ছোটো ‘সাংস্কৃতিক মানস’ নিয়েই খুশি থাকা যায়। পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদকে বিনা জবাবে মেনে নিয়ে ‘ন্যায্যতা’ দেওয়াটা সহজ হয়। অনেকেই বলতে পারে, তাই যদি হয় তাহলে নায়ক ফেরদৌস থেকে শুরু করে জয়া আহসান কিংবা চঞ্চল চৌধুরীরা কীভাবে ওপার বাংলায় কাজ করছে? উত্তরটা খুব সোজা। এটাও একটা কালচারাল হেজিমনি প্রাক্সিস-এর অংশ। ফেরদৌস-জয়া আহসানরা কলকাতায় কাজ করার সুযোগ বজায় রাখার জন্য যতোটা না বেশি কলকাতায় বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর, তার চেয়ে তারা ঢাকায় অনেক বেশি পশ্চিম বাংলার তথা ভারতের অ্যাম্বাসেডর। ছোটো দেশের সাংস্কৃতিক বলয়কে নিয়ন্ত্রণের এটা একটা দুনিয়াব্যাপি পরীক্ষিত কৌশল।
পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক ইমাজিনেশন-এ ‘আমরা’ কারা?
আমাদের চেনা-জানা রাজনৈতিক প্রতর্কে বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছিলো ‘ভারত এবং বাংলাদেশের একে অপরের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে’। এটা শুধু নিছক ‘রাষ্ট্রীয়’ দাবি কিংবা প্রতর্কে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ‘মূলধারা’র সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেরও চর্বিতচর্বণ হলো ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হচ্ছে’। কিন্তু বাস্তবতা আসলেই কি তা বলে? আমাদের স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের চেহারা দিনে দিনে আসলেই কেমন রূপ নিয়েছে? বাংলাদেশের মানুষ, আমাদের সংস্কৃতি এখনো ভারত তথা ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক মানসপটে কেমন? ভারতের সাংস্কৃতিক বলয়ে কাঠামোগতভাবে প্রেম নয়, যৌনতা নয়, সাসপেন্স নয় বরং ‘মুসলিম-বিরোধী জাতীয়তাবাদ' চলচ্চিত্রিক কনটেন্ট হিসেবে এক নম্বর জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। সমসাময়িক ভারতীয় চলচ্চিত্রিক ইউনিভার্সে প্রদর্শিত সবচাইতে বড়ো সামাজিক সমস্যার নাম ‘মুসলমান’ অথবা পাকিস্তান। প্রতিবেশী মুসলমান দেশ পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানকে ‘সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র’ এবং এই দুই দেশের মুসলিমদের জাতিগতভাবে ‘খারাপ অপর’ (Evil Other) হিসেবে চিত্রিত করার মধ্য দিয়ে ভারতের সাংস্কৃতিক-রাজনীতির ‘Monsterization of Muslim' প্রজেক্ট ১৬ আনা পূর্ণতা পায় না। আরেক মুসলিম প্রতিবেশী দেশ বাকি থাকে—বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এবং এই দেশের মানুষকে ব্যাকওয়ার্ড ‘অপর’ করে দেখানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে পিছিয়ে থাকা জাতি হিসেবে উপস্থাপন করা—এমনকি টেরোরিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করে তোলার প্রয়াসকে এখন আমরা ভারতের প্রাত্যহিক সাংস্কৃতিক এজেন্ডা ও অনুশীলন বলতে পারি।
সেই বাস্তবতাকে এম্পিরিকালি বোঝার জন্য চলচ্চিত্র খুব সম্ভবত সবচাইতে জুতসই মাধ্যম। সেই বাস্তবতা বোঝার জন্য কোন চলচ্চিত্রগুলো ভারতে কিংবা সো-কল্ড সেক্যুলারদের রাজ্য পশ্চিম বাংলার সিনেমাহলে পর্যন্ত প্রচুর দর্শক টানছে, বক্স অফিসে মেগা হিট দিচ্ছে, সেটাও একটা নিক্তি তো বটেই। উদাহরণ হিসেবে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নির্মিত গত পুজোতে মুক্তি পাওয়া রক্তবীজ (২০২৩) চলচ্চিত্রের কথা বলা যেতে পারে। সত্য ঘটনার ছায়া নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের নামে রক্তবীজ নামে নন্দিতা-শিবপ্রসাদ মুসলিম বিদ্বেষী যে রেসিস্ট বয়ান হাজির করেছে, তা মুসলমানদের প্রতি ‘জাতিগত ঘৃণা’ নির্মাণের ক্ল্যাসিকতম উদাহরণ হিসেবে পরিগণিত হবে। রক্তবীজ ভারতের কেনো জঘন্যতম রেসিস্ট চলচ্চিত্র এবং কীভাবে এই চলচ্চিত্রের বয়ান উপমহাদেশের মুসলমানদের নারী-শিশু নির্বিশেষে ‘সন্ত্রাসী জাতির বীজ বহনকারী’ রেস (race) হিসেবে পরিচয় নির্মাণ করার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মতলবে নির্মিত, তা নিয়ে বিস্তারিত লিখবো অন্য কোনো লেখায়। বর্তমান লেখায় শুধু একটি প্রশ্ন করতে চাই—কীভাবে গোটা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গাঁটের টাকা খরচ করে এ রকম পাড় হিন্দুত্ববাদী রেসিস্ট উসকানিতে ভরা চলচ্চিত্রকে ব্লকবাস্টার হিট বানায়? কিন্তু সেই একই দর্শক শ্রেণির কাছে হাওয়া, সুড়ঙ্গ এবং তুফান মুখ থুবড়ে পড়ে? এটা কি কনটেন্টের মানের জন্য নাকি কনটেন্টের ‘পরিচয়ে’র জন্য! উত্তম কুমারের শহরে ইসলামোফোবিক ঘৃণায় ভরা রেসিস্ট বাংলা চলচ্চিত্রেও চলতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সিনেমাহলের টিকিট কেটে চলবে না। শুধু হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ নয়, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদও এখানে বড়ো একটা কারণ। হাওয়া, সুড়ঙ্গ এবং তুফান পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক-রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের এই বার্তাটা আরো বেশি পরিষ্কার করে দেয় বৈকি।
কথায় কথায় ওপার বাংলা, ওপার বাংলা বলা বন্ধ করার সময়ও এসেছে। দুইটা দেশ আলাদা। এইটাই বড়ো সত্য। আমরা হাজার চেষ্টা করলেও ওদের সাংস্কৃতিক ইমাজিনেশনে কোনো দিন ‘বাঙালি’ হতে পারবো না। সকালবেলা যতোই আমাদের মা-বোনেরা রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে দিন শুরু করে শাড়ির সঙ্গে বড়ো একটা টিপ দিয়ে স্লিভলেস ব্লাউজ পরুক না কেনো, সেই শাড়ির ব্লাউজের নিচে ওরা চিরন্তনভাবে একটা ‘বোরখা’ খুঁজবেই। ওদের সাংস্কৃতিক ইমাজিনেশনে আমাদের নারীরা আজও ‘এজেন্সিহীন দাস’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ। আর পুরুষ মানেই দাড়ি-টুপির অনগ্রসর মুসলমান। না, আমি বঙ্কিম, শরৎচন্দ্রদের সময়ের কালচারাল কনস্ট্রাকশন নিয়ে বলছি না। এই সময় নিয়েই বলছি। আমাদের নিয়ে ওদের প্রিডমিনেন্ট সাংস্কৃতিক ইমাজিনেশন এখনো এটাই। বিশ্বাস না হলে খুব খেয়াল করে ভারতের নাটক, চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের মানুষের রিপ্রেজেন্টেশনগুলো দেখুন।
সংস্কৃতির সঙ্গে আর একটা জিনিস ওতপ্রোতভাবে জড়িত—ইকোনমি। কালচারাল-ইকোনমিক সম্পর্কটা ভারতের সঙ্গে কোনো প্রতিবেশীরই বন্ধুত্বের নয়—আধিপত্যের। এবং এই ঐতিহাসিক সত্যটাকে আমলে না নিয়ে এই আর্ট-কালচারের ব্যবসা ওদের সঙ্গে যারাই করতে গেছে, ধরা খেয়েছে। বই ব্যবসায়ীরাও খেয়েছে, চলচ্চিত্রে জাজ মাল্টিমিডিয়াও খেয়েছে এবং লিখে রাখেন আলফা আই-‘চরকি’ এরাও খাবে। ঠিক যে কারণে ভারতে একটা ‘বাতিঘর’-এর মতো বইয়ের দোকান নাই, ঠিক একই কারণে আপনার চলচ্চিত্রের দোকানদারি ওদেশে হবে না। এই সহজ হিসাবটা না বুঝলে আর্ট-কালচার নিয়ে ব্যবসা করতে নামবেন না। আর্ট-কালচার নিয়ে লিখবেনও না প্লিজ!
ওপার বাংলায় তুফান ফ্লপ হবার পর, কলকাতার চলচ্চিত্র সমালোচক অরিত্র খুব ফ্লেক্স করে বলেছিলেন, আমাদের এখানে অনেক অপশন তাই আমাদের দর্শক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখে না। হিন্দি, ওদের বাংলা, সাউথ ইন্ডিয়ান, হলিউড, কোরিয়ান এসবের মধ্যে যেটা বেস্ট, সেটাই দেখে। এটা দেখার পর হা হা করে হেসেছি অনেকক্ষণ। কলকাতার রুচির টেস্টবাড-এ এখন রক্তবীজ-এর মতো চলচ্চিত্রিক কনটেন্টই ‘বেস্ট’ তাহলে? বুঝলাম তুফান একটা কপি করা এভারেজ চলচ্চিত্র। কিন্তু অরিত্রদের কাছে আমার প্রশ্ন, এতো বেস্ট জিনিসই যদি দেখবেন আপনারা, তাহলে হাওয়া দেখেন নাই কেনো! সুড়ঙ্গ কেনো দর্শক পেলো না। ফ্যামিলি ড্রামার এতো জয়জয়কার ওখানে, কিন্তু আমাদের ফারুকীর ডুব-ও তো দেখেন নাই আপনারা। ক্রিটিক হিসেবে এই সত্যিটা বললেও ভালো হতো না যে এগুলো ‘বাংলাদেশি’ চলচ্চিত্র? এবং সেটাই বড়ো কারণ।
কেনো রায়হান রাফীদের পাখা গজায় মরিবার তরে?
রায়হান রাফীদের পাখা গজায় মরিবার তরে। রাফীকে আমি বাংলাদেশে আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমার্শিয়াল নির্মাতা বলেছিলাম বহু আগেই। কিন্তু উনি করলেন কী তুফান-এ? তুফান নিয়ে উনি অহেতুক বহুত লাফিয়েছেন শুধু বক্স অফিসের ব্যবসা দেখে। কিন্তু তুফান যে রায়হান রাফীর সবচেয়ে দুর্বল চলচ্চিত্র এটা বোঝার মতো ঘিলু ওনার আছে ভাবতাম আমি। তুফান ওনার পারিশ্রমিক কোটি টাকার দিকে নিতে পারে। কিন্তু নির্মাতা হিসেবে ওনার নিজস্বতাকে মাটিতে নামিয়েছে। পোড়ামন ২, পরাণ থেকে সুড়ঙ্গ সব রাফীর নিজের চলচ্চিত্র। আমাদের গল্প। অন্য দেশের ডমিনেন্ট কালচারাল কনটেন্টের কাছে নিজের মেধা বিক্রি করলে যা দাঁড়ায় সেটার নাম তুফান। নিজস্বতাহীন চলচ্চিত্র।
রাফীর দেখাদেখি সবাই এখন ট্রেন্ডের দিকে ঝুঁকবে। সিয়াম অভিনীত জংলির পোস্টারও আভাস দিচ্ছে পুষ্পা লাইট বানাতে যাচ্ছেন নির্মাতা এম রাহিম। সামনে হয়তো আরো দেখতে পাবো এই সিমুলাক্রা উৎপাদনের ভিড়। চলচ্চিত্রপাড়ায় নিজেই একটা নতুন প্যারাডাইম তৈরি করে সেটাকে পুনরায় রিভার্সড-প্যারাডাইমে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী হয়ে থাকবে রাফীর তুফান। টেকনিকাল দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও তাই হিমেল আশরাফ-এর প্রিয়তমা ও রাজকুমার আমার কাছে বেটার বাংলাদেশি কনটেন্ট তুফান-এর চাইতে।
নিজস্বতাকে ভুলে গিয়ে টাকা আর গ্ল্যামারের কাছে এভাবে মাথা নত করলে, যে রায়হান রাফী ডেভেলপ হচ্ছিলো একটু একটু করে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর আর কপিবাজের মতো অচিরেই তিনিও হারিয়ে যাবেন। শাকিব, চঞ্চল কিংবা মিমি চক্রবর্তীর কোনো স্টারডমেই কোনো কাজ হবে না। তাই সময় থাকতে কনটেন্টে ফিরে যাওয়াটা তার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ, বাংলাদেশি কনটেন্ট। প্যান ইন্ডিয়া চলচ্চিত্র তো দূরের কথা। ‘প্যান বাংলা’ চলচ্চিত্র বানাতে যাওয়াটাও নিরেট গাধামি। অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দুই দিক থেকেই। সেটা শাকিবকে নিয়েই হোক কিংবা জিৎ’কে নিয়ে।
ফলে অরিজিনাল-নিজেদের চলচ্চিত্র বানান। সারা দুনিয়া এমনিতেই দেখবে—ভারত এবং ওপার বাংলা ছাড়া। এই নির্মম সত্যটাকে মেনে নিয়ে চলচ্চিত্র না বানালে কী হয়, তা অনন্য মামুন পরিচালিত শাকিব খান ও সোনাল চৌহান-এর দরদ/Dard আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো অতি সম্প্রতি। রায়হান রাফী নায়ক জিৎ-এর সঙ্গে লায়ন নামের যে আপকামিং মেগা প্রজেক্ট নির্মাণ নিয়ে লাফঝাঁপ করছেন, সেই প্রজেক্টও এই সত্যতা আরো একবার প্রমাণ করবে। লিখে নিতে পারেন।
লেখক : নাজমুল আরেফিন, পিএইচ ডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা, কানাডা।
https://www.facebook.com/narefin.du
Marefin1@ualberta.ca
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন