Magic Lanthon

               

নাঈম মোহায়মেন

প্রকাশিত ২৬ জানুয়ারী ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘ফিকশন ও ডকুমেন্টারির সংঘাত এবং মোলাকাত’

নাঈম মোহায়মেন

২ জানুয়ারি ২০২৩, সোমবার; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর একটি বিশেষ আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত’। এখানে একজন নির্মাতা তার চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে তিনি বাতচিতে অংশ নেন দর্শকের সঙ্গে। তৃতীয়বারের এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্রনির্মাতা ও যুক্তরাষ্ট্রে দৃশ্যকলা শিল্পের শিক্ষক নাঈম মোহায়মেন তার জলে ডোবে না (২০২০) নিয়ে। — সম্পাদক]

রীতা জান্নাত : শুভেচ্ছা সবাইকে। ইতোমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকালীন ছুটি শুরু হয়েছে। অনেকে হয়তো বাড়িতে চলেও গেছে। তা সত্ত্বেও আপনারা যারা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে আজকের এই আয়োজনে উপস্থিত হয়েছেন তাদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।  চলচ্চিত্রনির্মাতা নাঈম মোহায়মেন আজকের এই আয়োজনে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন তার চলচ্চিত্র নিয়ে।

এই আয়োজনের প্রথম পর্বে থাকবে নাঈম মোহায়মেনের চলচ্চিত্র জলে ডোবে না-এর প্রদর্শনী। চলচ্চিত্রটি এর আগে জাপান, সুইডেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রিমিয়ার হয়েছে। বাংলাদেশে এটাই প্রথম প্রদর্শনী। চলচ্চিত্রের গল্পে হাসপাতাল, যন্ত্র, বিবাহ ও ধর্মের সন্ধিক্ষণে এক যুগলের শেষ মুহূর্ত উঠে এসেছে। প্রদর্শনী শেষে আপনাদের জন্য থাকবে প্রশ্নোত্তর পর্ব। সেখানে নাঈম মোহায়মেন ‘ফিকশন ও ডকুমেন্টরির সংঘাত এবং মোলাকাত’ বিষয়ে কথা বলবেন। তার কথা শেষে চলচ্চিত্র নিয়ে প্রশ্ন আপনারা তা জিজ্ঞাসা করতে পারবেন।

এ পর্যায়ে নির্মাতা নাঈম মোহায়মেন সম্পর্কে আপনাদের একটু জানিয়ে রাখি। তিনি বড়ো হয়েছেন বাংলাদেশে। বর্তমানে তিনি শিক্ষকতা করেন। তার লেখা কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘সঠিক ইতিহাসের বন্দী’ (২০১৪) ও ‘মধ্যরাতের তৃতীয় সন্তান (২০২৩) এবং সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে আছে ‘বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের অন্ধ গুলিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ (২০১০)।

এ পর্যায়ে নির্মাতাকে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পক্ষ থেকে স্মারক উপহার তুলে দিচ্ছেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সহকারী সম্পাদক সোহাগ আব্দুল্লাহ। বাংলাদেশে যেহেতু এটা জলে ডোবে না-এর প্রথম কোনো প্রদর্শনী, তাই চলচ্চিত্র শুরুর আগে আমরা নির্মাতার সংক্ষিপ্ত অনুভূতি জানতে চাই।

নাঈম মোহায়মেন : ধন্যবাদ সঞ্চালককে।  আমার বন্ধু মানস চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্ববিদ্যা পড়ায়; এখানে বক্তৃতা দিয়েছে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর মাধ্যমে।  বেশ কয়েক বছর ধরেই সে আমাকে বলে আসছে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর কথা। আমি ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর জার্নালটা ঢাকার বইমেলায় কিনেছি, যোগাযোগ করেছি, ভালো লেগেছে। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন’-এর তিনটা বইও কিনেছি।  অনেকদিন ধরে মানস বলছে আমাকে—রাজশাহীতে গিয়ে কাজ করো।  ঢাকার ব্যাপারে আমাদের নানা সমালোচনা আছে—অনেক বেশি যান্ত্রিক হয়ে গেছে শহরটা, ইত্যাদি।  মানস চৌধুরীকে ধন্যবাদ, আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলো এখানে আসার জন্য; এবং মামুন (কাজী মামুন হায়দার) ও তার পুরো দলকে ধন্যবাদ গত দুই-তিন দিনে যে পরিমাণ কাজ করেছে এই আয়োজনের জন্য। আমি সিনেমাটি সম্পর্কে পারিপার্শ্বিক কিছু কথা বলবো এবং মূল কথাগুলো প্রদর্শনীর শেষে বলবো। আমি ২০০১ সাল থেকে চলচ্চিত্র বানাচ্ছি। প্রধানত প্রামাণ্যচিত্র, ডকুমেন্টারি। এগুলোর বিষয় বাংলাদেশের ৭০ ও ৬০ দশকের ইতিহাস; বিশেষ করে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস।  বাংলাদেশের বামদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্রোতের সংমিশ্রণ নিয়ে আমি কাজ করি।  যেমন আমার যে প্রামাণ্যচিত্রটা অনেক মানুষ দেখেছে—সম্মিলিত লাল বাহিনী (২০১১)। ১৯৭৭ সালে জাপান এয়ারলাইন্সের একটা বিমান ছিনতাই হয়েছিলো বাংলাদেশে।  সেই ছিনতাইয়ের মধ্যে জাপানি অতি বাম দল জাপানিজ রেড আর্মি, ফিলিস্তিনি আন্দোলন এবং বাংলাদেশের বাম স্রোতের সংমিশ্রণ ছিলো। আমি যখন বাংলাদেশের বামের ইতিহাস নিয়ে কাজ করি, আন্তর্জাতিকতা নিয়েও কাজ করি। আমার সিনেমাগুলো বাংলাদেশ দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু দেখা যায় শেষে অন্যান্য দেশ ঢুকে গেছে।  বলাই যায় বাংলাদেশের ইতিহাস একটা বৈশ্বিক ইতিহাস; সেটা নিয়েই আমি কাজ করি।

প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যেই আছি বহু বছর ধরে। আমার পড়াশোনা নৃতত্ত্ববিদ্যায় এবং সেখানেও বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছি। আমার ফিকশনে যাবার একটা কারণ প্রামাণ্যচিত্র ফরমেটের কিছু সীমাবদ্ধতা।  কিছু বিষয় থাকে যা খুবই আপন আবার খুবই কষ্টকর—আমার জন্য বা যাদেরকে নিয়ে কাজ করি তাদের জন্য। তাই অনেক সময়—প্রামাণ্যচিত্রে কাজ করা কষ্টকর হয়ে যায়। এমনও হয় লোকজন হয়তো দুই বছর আগে একটা কথা বলতে চেয়েছিলো, কিন্তু এখন আর সেটা জনসম্মুখে বলতে চায় না।

আমরা বাংলাদেশের পারিপার্শ্বিক জানি, একেক দশকে একেক ধরনের কথা বলা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এসব পরিবর্তন সারাক্ষণ হতে থাকে।  আজকের এই বিষয়টি হচ্ছে আমার দ্বিতীয় ফিকশন ছবি এবং একটা কষ্টকর অধ্যায়। হাসপাতালের অভিজ্ঞতা এবং হাসপাতালে মৃত্যু—যে অভিজ্ঞতাটা করোনার আগের সময়ে অনেকের হয়েছিলো, আর করোনাকালে মহামারি আকারে হয়। অনেকেই হয়তো বাবা-মা বা নিকট মানুষকে হারিয়েছে, যে বয়সে হারাবার কথা তার অনেক আগেই! অনেকে একসঙ্গে অনেক আত্মীয়স্বজন হারিয়েছে।  যেখানে হয়তো একজনের মারা যাওয়ার কথা! অনেক সময় কোনো হাসপাতাল যদি ভালো করে, তার সুনাম করি, ডাক্তারদেরকে বাহবা দিই।  আবার যদি ঘটনা অন্যদিকে চলে যায়, তখন আবার হাসপাতালের কঠিন সমালোচনা করি।

হাসপাতালের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য খুবই ইমোশনাল একটা ব্যাপার! অনেক উত্থান-পতন হয়।  আমার বাবা, দুই ফুফু, চাচি—চারজনই মারা গেছে হাসপাতালে।  এমনভাবে মারা গেছে যে, মনে হয়েছে এটা কি অন্যভাবে হতে পারতো! সেসব অভিজ্ঞতার কারণেই আমি অনেক বছর ধরেই ভাবছি—সবসময় হাসপাতালে যাওয়া উচিত কিনা, বা কোনো সময় হাসপাতাল থেকে ফিরে আসা উচিত কিনা। আরো একজন নৃতত্ত্ববিদ যিনি আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন—রেহনুমা আহমেদ—আমাকে একবার বলেছিলেন, ‘আগেকার দিনে মানুষ বাসায়ই মারা যেতো, কিন্তু এখন শুনি না কেউ বাসায় মারা যায়!’ সবাই হাসপাতালেই মারা যায়। ফলে ওটা নিয়েও আমাদের চিন্তা ছিলো, মানুষ অসুস্থ হলেই আমরা সবসময় হাসপাতালে নিই এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাসপাতালে রাখি। ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে ‘বিটার এন্ড’ অর্থাৎ তিতাশেষ। একদম শেষ মুহূর্তে এসে মানুষের নানা চিন্তা হয়—এ রকম কথাও বলে, চলে গেলেই ভালো, অনেক ব্যথা পাচ্ছেন, দোয়া করি যেনো কষ্ট লাঘব হয়, ইত্যাদি। সুতরাং হাসপাতালের ভেতরের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে নাড়িয়ে তোলে। আমার পরিবারের অভিজ্ঞতা এবং অন্যদের অভিজ্ঞতা আমি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে দেখাতে চাইনি। সেটা অতিরিক্ত কষ্টকর হতো এজন্যই ফিকশন ফিল্ম করেছি। আমার অধিকাংশ সিনেমা ইংরেজিতে। ইংরেজি ভাষায় হওয়ার কারণ হলো, যেহেতু আন্তর্জাতিকতা নিয়ে কাজ করি, অনেক সময় বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন মানুষ চলে আসে পর্দায় যারা শুধু ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। কিন্তু এই সিনেমার সবাই বাংলাভাষী, কলকাতায় শ্যুট করা। একটা পরিত্যক্ত হাসপাতালে পুরো সিনেমাটা করা। ঋত্বিক ঘটকের একটা প্রভাব আছে সেটা হয়তো দেখতে পারবেন।

দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, কিছু ডায়ালগ করোনার অভিজ্ঞতায় লেখা। আসলে পুরো সিনেমাটার শুটিং জানুয়ারি ২০২০ সালে শেষ হয়েছে। আমি তখন হার্ডড্রাইভ নিয়ে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলাম একটা রাফকাট করবো এবং তারপর ফিরে আসবো। এসে আবার শুটিং করবো। ঠিক সেই সময়ে লকডাউন শুরু হলো। এপ্রিল মাসের দিকে আমার সিনেমাটোগ্রাফার বললো, ‘এখন আর কলকাতায় এসে কোনো লাভ নাই। কারণ আমার টিমের সবাই এখন গ্রামে চলে গেছে এবং ফিরবে না এখন কেউ। তোমার ছবির জন্য তো অবশ্যই না।’ তখন সেই কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেই আমার ছবিটার এডিট শেষ করেছি। এটাও একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, একদিকে একটা ছবি আমরা বানাতে চেয়েছি, যেখানে বলতে চেয়েছি সবসময় হাসপাতালে যাওয়া উচিত কিনা বা ‘হাসপাতাল থেকে প্রস্থান’ বলেও একটা অধিকার থাকতে পারে কিনা! কিন্তু কোভিডের মধ্যে আমরা হাসপাতালকে কোনো ব্যাপারে না বলার মতো পরিস্থিতিতে ছিলাম না। বরং তখন আমরা ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসাবিদ্যা, ভ্যাকসিন চাচ্ছি; কেবল তা না, অন্যের আগে চাচ্ছি। আমি তালিকায় আগে যেতে পারি কিনা, বয়স্করা ভ্যাকসিন আগে পাবে কিনা, ইত্যাদি।

একসময় ভ্যাকসিনের তালিকা নিয়ে কথাবার্তাও হয়েছিলো বিশ্বব্যাপী। কোন দেশ আগে পাবে, কোন দেশ পরে পাবে, এসব রাজনীতিও ছিলো। ছবিটা তার আগেই শেষ করা। সঞ্চালক বলেছেন অনেকগুলো দেশের কথা, যেখানে দেখানো হয়েছে। তবে সেই দেখানোটা একটু অদ্ভুত ‘দেখানো’। জাপানে দেখানো হয়েছে প্যানডেমিকের মাঝখানে তিন মাস। প্রতি সপ্তাহে হয়তো দুই-তিনজন দর্শক হয়েছে, সবাই মুখোশ পরা। এমন একটা পরিস্থিতি, যেই ইয়োকোহামা শহরে দেখানো হচ্ছে, আমার বন্ধুরা টোকিও থেকে ট্রেনে করে আসতে সাহস পাচ্ছিলো না! কারণ একদম প্যানডেমিকের পিক সময়। সুইডেনে দেখানো হয়েছে জানুয়ারি ২০২১-এ, দুই মাসের জন্য। সুইডেনে তখন শুরু হয়েছে লকডাউন, ফলে খুব কম লোকই আসতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ক্লিভল্যান্ড হাসপাতালে দেখানো হচ্ছে, আর ভারতে দেখানো হয়েছে কলকাতায় একবার। সুতরাং বলতে পারি অনেক জায়গায় ছবিটা দেখানো হয়েছে, আবার দেখানো হয়নি। মানে দর্শকবিহীন দেখানো, আমি বলবো। সঞ্চালকরা অনুষ্ঠানের ছবি ঠিকই পাঠাচ্ছে, কিন্তু একটা অ্যাঙ্গেল থেকে ছবিটা দিচ্ছে। বুঝতে পারছি, পুরো ঘরটা দেখাতে চাচ্ছে না আমাকে। কারণ ঘরের মধ্যে আসলে মাত্র দুইজন মানুষ বসে আছে। ফলে রাজশাহীতে এই প্রথম ঘরভর্তি দর্শক দেখে আমি খুশি হলাম। আরো অনেক কিছু বলার আছে, সেটা পরে। এখানে আমি শুধু একটা জিনিস বলে রাখি—একটা জিনিস হয়তো মনে হতে পারে এখানে বই পড়ার দৃশ্য কেনো? সৈয়দ মুজতবা আলী আমার নানার ছোটোভাই। ফলে তিনি আমার অনেক কাজের মধ্যেই এসেছেন এবং এখানেও আসবেন। কী কারণে আসবেন সেটা ছবি দেখতে দেখতে হয়তো বোঝা যাবে। এই বলেই শেষ করছি, সিনেমাটা শুরু করি।

রীতা জান্নাত : এতোক্ষণ আপানারা উপভোগ করলেন নাঈম মোহায়মেনের চলচ্চিত্র জলে ডোবে না। আয়োজনের এ পর্যায়ে আমরা সরাসরি নির্মাতার সঙ্গে বাতচিত ও প্রশ্নোত্তর পর্বে চলে যাবো।

নাঈম মোহায়মেন : সবাইকে অনেক ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য। বিশেষ করে মাঝে বিদ্যুৎ চলে গেলেও ধৈর্য সহকারে আপনারা ছিলেন। এটাই প্রথম প্রদর্শনী লাইভ দর্শকের সামনে যেখানে আমি আছি। জাপান, সুইডেন ওসব জায়গাতে যাইনি প্যানডেমিকের কারণে। আর কলকাতার স্ক্রিনিংয়েও যাইনি, কারণ আমি সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছিলাম। এই প্রথম দর্শকের মুখোমুখি। আমি আমার ছোটো একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি। বলেছিলাম ডকুমেন্টারির সঙ্গে ফিকশনের সংঘাত ও মোলাকাত। কিছু জায়গায় বিরোধ আবার কিছু জায়গায় একত্রীকরণ। প্রথমে বলেছিলাম এমন কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে যেগুলো আসলে আমি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে দেখাতে চাই না। অর্থাৎ ‘জীবন থেকে নেয়া’ নামটা দিতে চাই না। এটা আমার ফুফুর ক্ষেত্রে হয়েছে, আমার চাচির ক্ষেত্রে হয়েছে, শেষে তো আমার বাবার ক্ষেত্রেও হয়েছে! যদিও আমার বাবা মারা গেছেন ২০২১ সালের আগস্টে। এই ছবি শেষ করার পরে।


নাঈম মোহায়মেন, জলে ডোবে না, ৬৪ মিনিট, ২০২০

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাগুলো যখন হয়েছিলো—এতোই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা—যখন মানুষের জীবন-মরণ আমাদের হাতে, শুধু ডাক্তারের হাতে না। এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘আউট অব বডি এক্সপেরিয়েন্স’; মানে নিজের শরীর পেরিয়ে উপর থেকে নিজেকে দেখছি, আমি কী করছি এবং মনে মনে ভাবছি, পরে যখন এগুলো সব শেষ হবে তখন এই মুহূর্তটা মনে রাখবো। পরিবারের কারো মৃত্যু, মৃত্যুটা কীভাবে হলো, সেখানে হাসপাতালের কী ভূমিকা, ডাক্তারের কী ভূমিকা, আমাদের কী ভূমিকা—অধৈর্য আত্মীয়স্বজন হিসেবে বা ধৈর্যবান সেবক হিসেবে। একটা পর্যায়ে সেটা নিয়ে আমি প্রামাণ্যচিত্র বানাতে চাইনি। কিছু কিছু অভিজ্ঞতা খুবই ভয়ঙ্কর; অনেকেরই হয়তো সে অভিজ্ঞতা আছে। ছবির মধ্যে একটা ডায়ালগ আছে, ‘মরলে বলে ডাক্তার মেরেছে, আর বাঁচলে বলে আল্লায় বাঁচাইছে’। অভিনয়শিল্পী সাগনিক যেহেতু কলকাতার ছেলে, সেহেতু শুদ্ধভাবে বলেছে ‘আল্লায় বাঁচিয়েছে’। কিন্তু আমার মূল ডায়ালগ ছিলো আল্লায় বাঁচাইছে। এটা আমার এক আত্মীয় বলেছিলেন, যিনি ঢাকার এক হাসপাতালে কাজ করেন। চা খেতে খেতে বিষয়টা তিনি আমাকে বলেছিলেন। ওনার কাছে যে রোগীরা আসে তারা ভালো কোনো খরব নিতে আসে না। কারণ এম আর আই করতে মানুষ আসে, যখন একটা ভয়ঙ্কর কিছু সন্দেহ করা হচ্ছে—সাধারণত ক্যান্সার। ওনার দৈনন্দিন জীবনে প্রায় সবসময়ই উনি খারাপ খবর বহন করছেন। এম আর আই দেখার পরে উনি বলছেন, আপনার পেশেন্ট এরকম সিরিয়াস! গ্রেড এক, গ্রেড দুই, গ্রেড তিন, গ্রেড চার—ক্যান্সারের চারটা গ্রেড থাকে। আমাকে একবার উনি বলেছেন, এটা তো ডাক্তারের ভালো বিভাগ না। কারণ আমি তো মানুষকে সবসময় ভালো খবর দিতে পারি না!

আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার। পরিবারে আরো কয়েকজন ডাক্তার ছিলো। হাসপাতালের মধ্যেই আমার জীবনের অনেক সময় কাটানো। ডাক্তারের ছেলে হিসেবে আমি ডাক্তারের জিনিসপত্রের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। বাবা নিজে যখন অসুস্থ হওয়া শুরু করলেন, ওনার প্রথম হাসপাতাল অভিজ্ঞতা ২০১০ সালে। একটা বেশ ভয়াবহ হার্ট অ্যাটাক হলো; মাঝরাতে দুইটার দিকে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া। গাড়ির মধ্যেই ওই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম প্রাইভেট হাসপাতাল—যেটা ওখান থেকে তিন মিনিট দূরে—নাকি সরকারি হাসপাতাল—যেটা ৪৫ মিনিট বা আধা ঘণ্টা দূরে—সেখানে নিয়ে যাবো। ওই মুহূর্তে এইসব ডিসিশন নিতে মানুষ ভুল করলে রোগী কিন্তু গাড়িতেই অক্কা পেতে পারে। আমার অনেক সময় মনে হয়েছে এতো বড়ো দায়িত্ব আমার ওপর থাকা উচিত না। মানে আমাদেরকে মানুষের জীবন-মরণ সিদ্ধান্ত এভাবে নিতে হয়েছে। যখন এই অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিলাম, তখন মনে হতো কখন হাসপাতাল থেকে আমরা সবাই বাড়ি ফিরবো!

সিনেমাটার মধ্যে একটা স্ট্রাকচার আছে। প্রথমে বলে নিই; হয়তো বলা উচিত নয়, তাও বলি। আমি যেভাবে স্ক্রিপ্টটা লিখেছি—তার স্ত্রী কিন্তু বহু আগেই মারা গেছে। তার শেষদিনের স্মৃতির মিশেল কেবলই স্বামীর মাথার মধ্যে ঘুর ঘুর করে। পুরো ছবিতে যেটা খুব স্পষ্ট না তাই শেয়ার করছি—পুরো কাহিনি কিন্তু তার মাথার মধ্যে। মানে তার মাথাটাই হচ্ছে হাসপাতালের একটা গোলক ধাঁধা যেটার মধ্যে সে ঘুর ঘুর করতে থাকে। যে কারণে একই জায়গায় সে বার বার যায়। এবং পাঁচ-ছয় মিনিটের মধ্যে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে সেখানে অন্য কোনো মানুষ নাই। টাইপিস্টের ভূমিকাতেও কিন্তু সেই, তারই গলা, যে বলছে ‘ভুলের কী আছে?’ ডাক্তারটাও কিন্তু সেই। এভরি ক্যারেক্টার—পেশেন্ট, ডাক্তার, সবাই; মানে একটা বহু চরিত্র নাটক তার নিজের মাথার মধ্যে ঘুরছে। শেষের দিকে সে বলে, প্রত্যেকটা পরিবার দুই ভাগ হয়ে যায়, যারা ভগবান বা খোদার নাম বলে, আর যারা বৈজ্ঞানিক জিনিসপত্র নিয়ে ভাবে। তার পর জায়নামাজ, তসবির কথা বলে। ওটা আমার ২০১০ সালের অভিজ্ঞতা; আমার আব্বাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, যে হাসপাতালে উনি চাকরিরত ছিলেন অবসর গ্রহণ করার আগে। আমি তো ডাক্তার না, আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, কিছু একটা ঠিক মতো হচ্ছে না; মানে ঝামেলা দেখতে পাচ্ছি। আবার আমার তো ঝামেলার কথা বলার কথা না। আমাদের তো ওই অভিজ্ঞতা আছে, ডাক্তারের সামনে গিয়ে নত হয়ে খুব ভদ্র হয়ে কথা বলবো; ডাক্তারকে ক্ষ্যাপানো যাবে না। হাসপাতালকে ক্ষ্যাপানো যাবে না। দেখতে পাচ্ছি কিছু একটা ঝামেলা হচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছি না কী করবো। রাত তিনটা/চারটা বাজে। তখন আমি ওয়েটিং রুমে গেলাম, ওখানে ছোট্ট একটা ডেক্সের মতো ছিলো। ড্রয়ারটা খুললাম, ড্রয়ারের মধ্যে দেখি একটা ভাজ করা জায়নামাজ এবং তসবি। তখন আমার মাথার মধ্যে এই একটা বিষয়, জায়নামাজ রেখে গেলো কে! তখন কিন্তু অন্য কোনো পেশেন্ট নেই আমার বাবা ছাড়া। এবং সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, আচ্ছা জায়নামাজ যেহেতু আছে একটু নামাজ পড়া দরকার। নফল নামাজ পড়লাম। চাইলে কিন্তু দুই-তিন ঘণ্টাও নামাজ পড়া যায়। তখন ভাবলাম, নামাজ তো পড়লাম, আমি এবার একটু গবেষণা করে দেখি কী কী হচ্ছে আব্বার। সেই মুহূর্তে আমার একটা অভিজ্ঞতা যে, নামাজ পড়ার পরে মনে হলো, ডাক্তারের জিনিসটাও বোঝা দরকার। আমাদের এখন এক জটিল পৃথিবী, যেখানে ডাক্তার একদিকে ত্রাণকারী, একদিকে ভীতির বস্তু! হাসপাতাল, একদিকে ওখানে গিয়ে আমরা বাঁচবো, আবার মরতেও পারি। হাসপাতালের মিসম্যানেজমেন্ট আমাদের কাছে খুবই ফেমিলিয়ার। আবার হাসপাতালের ওপর বিশ্বাসও করতে হয়। প্রত্যেক পরিবারে একধরনের ডায়ালগ থাকে, ‘ঠিকই আছে’, ‘অনেক কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে’; ‘আল্লাহ বা ভগবান তার প্রিয় বান্দাকে নিয়ে গেছে’—এ ধরনের ডিসকোর্সও আছে। অভিজ্ঞতাগুলো খুবই জটিল এবং স্ববিরোধী!

সে কারণে মানুষ যখন মারা যায়, এর চাইতে কঠিন অভিজ্ঞতা বোধহয় আর হতে পারে না—সারাক্ষণ ভাবা, ভুল করলাম কিনা। আমার পরিবারে এই বিষয়গুলো আছে। ওই হাসপাতালে নিলেন কোনো, প্রাইভেট হাসপাতালে নিলেন কেনো, ওরা তো গলা কাটা, ইত্যাদি। আবার সরকারি হাসপাতালে নিলেন কেনো, আপনার মাথা খারাপ নাকি! আমাদের অনেক আত্মীয়ই হাসপাতালের এই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। মানুষ মারা যাওয়ার পরে ওটা নিয়ে অনুতাপ—ভুল করলাম কিনা। এই জিনিসগুলো নিয়েই আমি কাজ করতে চাচ্ছিলাম। আবার যেহেতু জিনিসটা স্পষ্টও না, খুবই অস্পষ্ট একটা ছবি বানিয়েছি; যেখানে কোনো কিছুই শেষ হয় না। আরেকটা জিনিস হলো, ছবি বানানোর পরে যখন এডিট করছি, ঠিক সেই সময় মহামারি। সেই সময় ডাক্তার বা হাসপাতালের সঙ্গে আমাদের একটা পরিত্রাণকারীর সম্পর্ক। কীভাবে ভ্যাকসিন আগে পাওয়া যাবে। কোন লাইনে দাঁড়ালে আগে পাওয়া যাবে। তার পর লাইনে গিয়ে দেখা গেলো পাওয়া যাবে না। এই যে একটা উন্নত চিকিৎসার জন্য দৌড়ে যাওয়া, অ্যাট দ্য সেইম টাইম চিকিৎসার ব্যাপারেও প্রশ্ন ছিলো। এই পুরো ঘোলাটে জিনিসটা ছবিতে কিছুটা হলেও ছিলো, যে কারণে অনেক অর্থে ঘোলাটে একটা ছবি। আমি বলবো, আমার অন্যান্য অনেকগুলো ছবি স্পষ্ট, দর্শকের ভালো লেগেছে। এই ছবিটায় আমি যেটা শুনেছি, অনেক অস্পষ্ট রেস্পন্স।

তানভীর শাওন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : ধন্যবাদ, আসলে আপনার কাজটা দেখতে দেখতে আমার টেরেন্স মালিক-এর দ্য ট্রি অব লাইফ (২০১১) সিনেমার কথাটা মনে পড়ছিলো। ওইটাতে যেভাবে মহাবিশ্ব কিংবা সোলার সিস্টেম তারপর জীবন-মৃত্যু দেখানো হয়েছে। মানে কিছু একটা দার্শনিক বয়ান আছে ওই ফিল্মটাতে। দার্শনিকতা, একটা জীবন; জীবনের সহজ স্বাভাবিক বয়ে যাওয়া সে বিষয়গুলো ভাবাতে পারে। এমন একটা বোঝাপড়া আপনার সিনেমাতেও আছে। আপনার কাজ দেখে আমার যেটা মনে হলো, জীবন-মৃত্যু, আমাদের জীবনযাপন এগুলো নিয়ে নতুন করে ভাববার আছে। নতুন করে ভাবালো আমাদের সবাইকে। এই সিনেমাটা যখন দেখছিলাম তখন আমার বাবার মৃত্যুর কথা মনে হলো। কিংবা মনে হলো, আমার বাবার কথা কিছু বলে নাকি! আরেকটা বিষয় বলে রাখি, আমার বাবা বাড়িতেই মারা গেছেন; ক্যান্সারের পেশেন্ট ছিলেন। আমার বাবাকে হাসপাতালের অতো সব জটিল জটিল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি।

এই সিনেমাটা দেখে আমার তিনটা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আসলে ঠিক প্রশ্ন না, আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি। আপনার কাজে হাসপাতালের যে রিপ্রেজেন্টেশন মানে আপনি কিন্তু কোনো ডাক্তার দেখাচ্ছেন না; আপনি কোনো নার্স দেখাচ্ছেন না। জায়গাটা কী রকম, অনেকটা বাড়ির মতো দেখতে একটা জায়গা। তার পর আপনি কিছু কাটাছেঁড়ার যন্ত্র, টুলস দেখালেন। রোগীর সেবা করলো—নার্সের যে কাজগুলো তার হাসবেন্ডই করছে। ধরে নিলাম তার হাসবেন্ড-ই। আমি জানি না তারা কী ধরনের সম্পর্কের মধ্যে আছে প্রেমিক-প্রেমিকা নাকি হাসবেন্ড-ওয়াইফ। আমার কাছে কেনো জানি মনে হলো, হাসপাতালের যে রিপ্রেজেন্টশন তাতে হাসপাতালটা অনেকটাই যান্ত্রিক। হাসপাতালের মানবিক যে একটা দিক আছে—চিকিৎসা বলতে তো আর কেবল কাটাছেঁড়া, অস্ত্রোপচার নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেকটা অংশজুড়েই আছে স্পিচ থেরাপি, পাশে দাঁড়ানো আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়াও তো চিকিৎসা হতে পারে, তাই না। রোগীর সঙ্গে কথা বলাও তো এক ধরনের চিকিৎসা। সেই হাসপাতালের কোন রিপ্রেজেন্টেশনটা আপনি এখানে দেখালেন? এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে শত শত বছর ধরে আমাদের যে জ্ঞানকাণ্ড গড়ে উঠলো, এইটা আপনার কাজে মনে হয় বলতে চাচ্ছেন—অনেকটা অ্যাবসার্ড। অবশ্যই আমি স্বীকার করি, চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যাবসার্ডিজম আছে। এবং তার কিছু একটা আমাদের কাছে ধরা পড়েছে। এ ব্যাপারেও আপনার মতামত জানতে চাই? তৃতীয়ত যেটা, মৃত্যু তো অবধারিত, তাই না! কিন্তু আপনি দেখাতে চাচ্ছেন—ইন অ্যা লিনিয়ার ওয়ে কিংবা নন-লিনিয়ার ওয়ে—ধরেন একটা মানুষের রোগ ডিটেক্ট করছে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং তার আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাওয়া। মানে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মানুষটা আস্তে আস্তে মৃত্যু নামক গলির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। পুরো একটা জার্নি আপনি দেখাচ্ছেন। আমার কাছে যেটা মনে হয়, এই যে দেখানোটা আপনার কাজে মানে আপনি কি এখানে প্রিমিটিভিজমকে ইঙ্গিত করছেন? মানে আমাদেরকে আবার যেনো সেই আদিমতাবাদ, আবার সেই সবুজায়ন; আবার আমরা যে কাটাছেঁড়ার চিকিৎসার গল্প সৃষ্টি করলাম সেখান থেকে পিছিয়ে এসে চিকিৎসার বিকল্প কিছু করা যায় কিনা। যেমন, আমি একটা ভারতীয় বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম। ওখানে একটা ডায়ালগ ছিলো—এখন আমার নামটা মনে নেই—আমরা কীভাবে মারা যাবে, কীভাবে জন্ম নিই, তাতে আমাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু আমার কথা হলো, আমি কীভাবে মরে যাবো সেটা কিন্তু ঠিক করতে পারি। ধরেন, আমার একটা রোগ হলো, ক্যান্সার, আমি তিন মাস বাঁচবো। এখন এই তিন মাস আমি কী করতে পারি, হাসপাতালের বেডে শুয়ে মরবো নাকি প্রিয় কোনো জায়গায় গিয়ে মরবো—এই ডিসিশন তো আমার। এই কথাগুলোই আমার মনে পড়লো সিনেমাটা দেখে। ভালো লেগেছে বিষয়টা!

নাঈম মোহায়মেন, জলে ডোবে না, ৬৪ মিনিট, ২০২০

নাঈম : অনেক ধন্যবাদ নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য। অনেকগুলো প্রশ্ন আপনি তুলেছেন। আমি সিকোয়েন্সে না গিয়ে একটু এলোমেলোভাবে বলি। প্রথমত, আমার বাবা সার্জন ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেন। তারপরে ইংল্যান্ড থেকে সার্জারি পড়ে এসে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে সি এম এইচ-এ সারাজীবন কাজ করেছেন। আমি সারাজীবন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে গিয়েছি। তখনকার হাসপাতাল খুবই ইনোসেন্ট, মানবিক ছিলো। আমার বাবা একতলায় থাকতেন, দোতলায় যাবার কোনো লিফট ছিলো না। আমার বাবা রিটায়ার করেন ১৯৯৬ সালে। হাসপাতালে ওনার স্বর্ণযুগ ছিলো ৬০, ৭০ ও ৮০’র দশক। আমার মনে আছে, বাবার যখন রিটায়ার করার কথা, তার এক বছর আগে আমাকে একদিন বললেন এই প্রথম হাসপাতালে লিফটের টেন্ডার হলো। আমার আব্বা বললেন, লিফট কেনো থাকবে বুঝলাম না! রোগীরা তো সিঁড়ি দিয়েই উঠতে পারে। মানে হাসপাতালে একটা যন্ত্র লাগানোর ব্যাপার একজন ডাক্তার এভাবে বলছেন! তখন সেই হাসপাতাল বোধ হয় মাত্র দুই তলা। মানে খুব ইনোসেন্ট একটা টাইম! সেসময়ে প্রাইভেট প্রাকটিস সেভাবে শুরুই হয়নি। সো, আমি কিন্তু মোটামুটি ইনোসেন্ট একটা টাইমের মধ্য দিয়ে হাসপাতালে বাবার অ্যাকটিভ ডাক্তারি জীবনটা দেখেছি। বাবার ৯০’র দশকে রিটায়ারের পরে আমরা আধুনিক মেডিকেল জীবন বুঝেছিলাম, যখন উনি পেশেন্ট হলেন। ওনার প্রথম হার্ট অ্যাটাক হলো ২০১০ সালে। তখন কিন্তু আধুনিক হাসপাতাল চলে এসেছে। আমি মনে করি, মর্ডান অনেকভাবে অমানবিক। আমি যে সময়টাতে হাসপাতালে যাওয়া শুরু করি বাবাকে নিয়ে এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে, তখন কিন্তু হাসপাতালও বদলে গেছে। আসলে আমার হাসপাতালের অভিজ্ঞতা অতোটা ভালো না। হ্যাঁ, বেঁচে গেছে কেউ কেউ। আমার কাছে মনে হয়েছে, একটা ঝামেলা হয়েছে কোথাও। আবার সব দেশের হাসপাতালেই আছে, বাংলাদেশের হাসপাতালেও আছে—ডাক্তার আর পেশেন্টের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা কনফ্লিকচুয়াল। পেশেন্টও ডাক্তারকে ভয় পায়, ডাক্তারও পেশেন্টকে ভয় পায়! যে কারণে ডাক্তারদের মধ্যেও চারদিকে দুর্গ গড়ে তোলার একটা টেন্ডেন্সি আছে। এবং একটা নাম্বনেসও চলে এসেছে তাদের মধ্যে—এগুলো সব আমি দেখেছি।

আমার বাবার কিছু ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছে ডাক্তার হয়েও। আমার বার বার মনে হচ্ছিলো, পুরো ব্যাপারটাতে পেশেন্টের পরিবারের কিন্তু ফ্রি উইল নাই। আমরা কিন্তু একটা স্ক্রিপ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেবো এবং সেখানে সবকিছু করবো। আব্বা বলতো, প্রয়োজন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক দেয় আজকাল। অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স তো ১৪ দিনের। মর্ডান মেডিকেল সিস্টেমে না বলার কোনো পদ্ধতি নাই, কোনো ধাপ নাই। এ রকম কোনো কিছু নাই যেখানে বলবো, এইটা করতে চাই না। সো এইটা কিন্তু আমার খুবই কঠিন অভিজ্ঞতা। আমি আমার গত ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় বার বার শুধু ভাবছিলাম, হাসপাতাল নিয়ে অন্য ধরনের একটা ডায়ালগ করতে চাই। যেটা আসলে কোনো সংঘাত না, বাট হাসপাতালে পেশেন্টের ভূমিকা নিয়ে ওটা হবে।

ওই যে বললাম, প্রামাণ্যচিত্র একটু ব্যালান্সড হতে হয়; একজন ন্যারেটর থাকতে হয়। শেষে একটা ডিসক্লেইমার থাকবে, আমরা কোনো জীবিত হাসপাতাল নিয়ে কথা বলছি না এবং কোনো ডাক্তার নিয়ে কথা বলছি না। কাজেই প্রামাণ্যচিত্র বানাতে চাইনি; আমি চেয়েছি অন্তত নিজেকে একটা ধাক্কা দিতে। আমার নিজেরও অনেক প্রশ্ন আছে, পরিবারের কঠিন সময়ে আমরা কী করলাম, আর কীভাবে কী করা উচিত ছিলো। অ্যাকচুয়াল যে হাসপাতাল তার একটা সিম্পল কাহিনি আছে। আমি চাচ্ছিলাম গল্পের মধ্যে আমার বাবার কথাই বলি। ওই সময়ের বাবারা যেমন হন, শাসন করতেন। সব সময় তাকে ভয় পেতাম! ওনার সঙ্গে ভয়ের সম্পর্কটা ভেঙে যায় ২০১০ সালে; যখন তার হার্ট অ্যাটাকটা হয়। উনি কিন্তু—অতো ডিটেইল না বলি—৬০ দিন হাসপাতালে ছিলেন! ৬০ দিন কিন্তু স্বাভাবিক নয়, অনেক ঝামেলা হয়েছিলো। সেই ৬০ দিন ওনার সঙ্গে থাকা—আমার একপর্যায়ে মনে হলো, উনি সন্তান হয়ে গেছেন আর আমি বাবা! ওনার যত্ন নিচ্ছি এবং খুব ফ্রাজাইল হয়ে গিয়েছিলেন উনি। মনে হতো পড়ে যাবেন, যেকোনো মুহূর্তে পড়ে যাবেন। সম্পর্কটা পুরো বদলে গেলো সেই সময়ে।

বাতচিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকের একাংশ

সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমার একটা চিন্তা ছিলো, বিবাহিত কোনো সম্পর্ক যদি ভালো না থাকে, সেটা কীভাবে একটা ক্রাইসিসের সময় ভালো হয়ে যেতে পারে। আমার গল্পে ওরা কিন্তু সুখী দম্পতি না। কিন্তু ওই বিপদের সময়, মানে লম্বা বিপদে মানুষ ওগুলো সব ভুলে যায়। ভুলে গিয়ে একটা নতুন সম্পর্ক তৈরি করে, যা হাসপাতালের মধ্যের সম্পর্ক। ওইটার মধ্যে মাথায় একটা চিন্তা ছিলো, আন্তঃধর্মীয় একটা বিবাহ। ছেলেটা হিন্দু আর মেয়েটা মুসলমান। কিন্তু তাদের উৎপত্তি উল্টো। অর্থাৎ, মেয়েটি কলকাতার আর ছেলেটি এসেছে ইস্ট বেঙ্গল থেকে ৪৭-এর সময় রিফিউজি হিসেবে। ওই ধরনের আন্তঃধর্মীয় বিবাহে হাসপাতালে গেলে কী ধরনের ঝামেলা হবে, যখন মৃত্যুর প্রসঙ্গ আসবে; মানে মারা গেলে শেষকৃত্য কী হবে? কবর দেওয়া হবে নাকি চিতায় দাহ? নাকি দুইটার একটাও না। এমন কিছু পরিবারের মানুষ আছে যাদের এই ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি এটাও দেখাতে চাচ্ছিলাম।

এই আন্তঃধর্মীয় বিবাহ দেখানোর জন্য আমার মাথায় একটা বিষয় ছিলো, এটা কলকাতায় হবে। কারণ ৪৭ পরবর্তী সময়ে আমাদের এখানে কিন্তু খুব একটা মানুষ আসেনি। রাজশাহী, খুলনার কয়েকটা জায়গা ছাড়া ইস্ট বেঙ্গলে লোক ঢোকেনি; ইস্ট বেঙ্গল থেকে লোক গেছে। এটা ৪৭-এর একটা বড়ো জিনিস, যেটা আমরা সবসময় পুরোপুরি বুঝি না। ওয়েস্ট বেঙ্গলে গেলে কিন্তু শোনা যাবে, আমার অমুক আত্মীয় ছিলেন তোমাদের ময়মনসিংহে। কারণ তাদের আত্মীয় এখানে থেকে গেছে, আমাদের এইখানে আসেনি। ওই যাওয়ার ব্যাপারটা দেখানোর জন্য আমি কলকাতায় ছবি করতে চেয়েছিলাম। কলকাতায় গিয়ে হাসপাতাল খুঁজতে লাগলাম। একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম, ‘জীবিত’ হাসপাতালে আমি শ্যুট করতে পারবো না। কারণ কোনো জীবিত হাসপাতাল আমাকে অনুমতি দেবে না।

হাসপাতালে একটা প্রচণ্ড নার্ভাসনেসের ব্যাপার আছে। বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডগুলো আছে না? জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডগুলোতে কিন্তু গত ১০ বছরে কোনো আলোকচিত্রশিল্পীকে সহজে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। জাহাজ ভাঙার ইন্ডাস্ট্রি ধরেই নেয় কেউ যদি আমাদের জাহাজ ভাঙার ছবি তোলে তাহলে সেটা ভালো কিছু হবে না। হাসপাতালের বেলাতেও কিন্তু ওইরকমই একটা ধারণা। একজন ফিল্মমেকার একটা ফিল্ম বানাবে সেখানে নিশ্চয় ভালো কিছু হবে না, এটা এক ধরনের সংশয়। যখন শুটিং করবো ২০১৯ সালে, তখন ভারতে এনআরসি/সিএএ নাগরিকত্ব বিল নিয়ে আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে কিনা। তখন বাংলাদেশি কোনো আগন্তুক ভারতের রাজনীতির জন্য ফুটবল খেলার মতো! আমাদেরকে নিয়েই সে খেলা হচ্ছে। যদিও সেই খেলার মধ্যে আমরা অনুপস্থিত। সেই সময় বাংলাদেশি হিসেবে কলকাতার হাসপাতালে শুটিং করা আরো অসম্ভব!

তাই এতোকিছুর মধ্যে এই ‘মরা’ হাসপাতালই সম্বল। একসময় এটা একটা মাতৃসদন ছিলো—লোহিয়া মাতৃসদন। এটা বন্ধ হয়ে গেছে। দালানটা দেখলেই বোঝা যায় খুব উঁচু। মানে পুরনো ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের দালান, যেটাকে পরে হাসপাতাল বানানো হয়েছে। এক অর্থে ভালো, উঁচু ছাদে বাতাসের অনেক সার্কুলেশন হয়। আবার এক অর্থে ভালো না, কারণ ‘সিল অফ’ করা যায় না। আধুনিক হাসপাতালগুলোর যুক্তি সব ‘সিল অফ’ করে। কোনো জার্ম ঢুকবে না; সব এয়ার কন্ডিশনিং হবে। হাসপাতালটা আস্তে আস্তে একসময় মরে যায়। কারণ ওখানকার ডাক্তাররাই ওই হাসপাতালে না দেখিয়ে রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালে দেখাতে বলছে। আমি এমনটাও শুনেছি, ওখানকার ডাক্তাররা নাকি বলতো—এখানে এসেন না, আমি প্রাইভেট হাসপাতালে বসি, সেখানে দেখান! এভাবে হাসপাতালটা ভেতর থেকেই মারা যায়! মানে ডাক্তাররাই সাবোটাজ করে হাসপাতালটাকে মেরে ফেলে এবং এখন মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। যখন আমি হাসপাতালটা পেলাম, তখন আমার পুরো স্ক্রিপ্টটাই বদলে ফেললাম। আচ্ছা ঠিক আছে এইভাবে লিখবো যে, মেয়েটা অ্যাকচুয়ালি মারা গেছে বহু আগেই এবং সে খালি ভূতের মতো ঘুরছে হাসপাতালের ভেতরে।

তানভীর : আপনার এই চলচ্চিত্রটি কী কোনোভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অ্যাবসার্ডিজম দিয়ে প্রভাবিত?

নাঈম : অ্যাবসার্ডিজমের একটা বড়ো অংশ হলো, যখনই খানিকক্ষণ ধরে মোলায়েম দৃষ্টির মধ্যে আছি হঠাৎ করে ছেদ পড়ে ওই ১৬ মি মি ফুটেজে। আমেরিকায় একটা প্রকল্প ছিলো ৫০-৬০ এর দশকে, মেডিকেল বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ফিল্ম বানিয়ে পুরো পৃথিবীতে পাঠানো হতো ক্লাসরুমে দেখাবার জন্য—দূতাবাসের মাধ্যমে। ওই যে সাদাকালো একটা সিকোয়েন্স আছে নার্স সাহায্য করছে, ডায়ালগ একদমই বোঝা যায় না, কারণ পুরনো ফুটেজ। এর পরের সিকোয়েন্সটা হচ্ছে আমেরিকার ওই মেয়েটাকে জ্বর থেকে সুস্থ করে—সে আফ্রিকায় যায় নার্স হিসেবে। ওই যে মিশনারি সিনড্রোম, আমরা পুরো পৃথিবীকে বাঁচাবো! এই অ্যাবসার্ড প্রকল্প আমি একটু দেখাতে চাচ্ছিলাম; আমি এটাকে বিজ্ঞান বিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখাতে চাচ্ছি না। আমি কিন্তু বিজ্ঞানের ভেতরেই আছি। মেডিকেল শাস্ত্রের প্রতি মানুষের একটা বিশ্বাস—আছে সেটা দরকার। কিন্তু একটা ডায়ালগ দরকার, একমুখী স্রোত যেনো না হয়। আমার কাছে মনে হয়, একটা ওয়ান ওয়ে জ্ঞান হয়ে আছে; আর আমরা খালি প্যাসিভলি গ্রহণ করছি। কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

এজন্য আমি ওই সিকোয়েন্সগুলো দিয়েছিলাম, একটা ছেদ ঘটাবার জন্য। তাই বার বার ছবির স্রোত আমি ভাঙি, যাতে লোকে অস্বস্তি পায়। সুতরাং একটা অ্যাবসার্ডিজম তো আছেই। অ্যাবসার্ডিজম তো তাদের অভিজ্ঞতাতেও আছে। হাসপাতালে মানুষ না থাকাতে সুবিধা হয়েছে, অ্যাবসার্ডিজমটা ক্লিয়ার হয়। হ্যাঁ, একটা লোহার ঘণ্টা আছে যেটা আমরা বার বার দেখি; সেটা কোনো সময় বাজে না। তারা একটা চেয়ারে বসে থাকে, বেল বাজলে পরের চেয়ারে যায়। আবার অনেকক্ষণ পর আরেক চেয়ারে যায়। অন্য কোনো পেশেন্ট কিন্তু নাই, তারা চেয়ার টু চেয়ার মুভ করে। তারা তর্ক করছে কী নিয়ে—আরবি-ফারসি নামের বানান নিয়ে। আমার নামের শেষে মোহায়মেন; কলকাতায় লোকজন সবসময় আমার নামের বানান ভুল করে। এবং এটা নিয়ে আমি সবসময় বলি। মানে নামের উচ্চারণ একটা রাজনৈতিক ডিসকোর্স।

হাসপাতালে যে ঘোরাঘুরি করা এবং এটা সব হাসপাতালে, খালি বাংলাদেশে বলছি না। একটা টেস্ট করার পরে আরেক ডাক্তার আবার একই টেস্ট করতে বলবে। এবং ঘুণাক্ষরেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, এই টেস্ট কেনো? মানে আমাদের হাসপাতালের যে ডিসকোর্স, যদি কোনো পেশেন্ট প্রশ্ন করে, সেই পেশেন্ট ভালো ট্রিটমেন্ট পাবে না। কারণ ডাক্তারদের মধ্যে এক ধরনের বিরক্তি ভাব চলে আসে। আবার আমি ডাক্তারদের গোষ্ঠী উদ্ধারও করছি না, কারণ আমার পরিবারেও অনেকে ডাক্তার। ওদের দিকটাও বুঝি। ওই যে ছবির একটা ডায়ালগ আছে, ডাক্তারদের থেকে বেশি আশা করি। একটা ডায়ালেক্টিক তৈরি করতে চাচ্ছি, যেটা ব্যাক অ্যান্ড ফোর্থ হবে। সেজন্য অ্যাবসার্ডিজমটা দরকার ছিলো।

(চলবে)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন