এ কে এম কৌশিক আহমেদ
প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারী ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
একজন এন্ড্রু কিশোর
‘কী সুন্দর এক গানের পাখি মন নিয়ে সে খেলা করে’
এ কে এম কৌশিক আহমেদ

‘আমার বুকের মধ্যেখানে’
বারো মাসে তেরো পার্বন, এমন সাঙ্গীতিক আবহে বেড়ে ওঠা আমার শৈশব-কৈশোর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিতেই সঙ্গীতের প্রতি প্রগাঢ় আগ্রহ জন্মে ছিলো। আর চারপাশের সাংস্কৃতিক পরিবেশ আমাকে দিয়েছিলো বিশেষ প্রণোদনা। যা আমার সাঙ্গীতিক মনন গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলো। কিন্তু তখনো সঙ্গীতে পদ্ধতিগত তালিম শুরু হয়নি। শুধু কখনো কাছ থেকে আবার কখনো দূর থেকে ভরাট আওয়াজে ভেসে আসা সুর আমাকে আন্দোলিত করেছিলো। খোলা গলার এক আওয়াজ আমাকে বার্তা দিয়েছিলো খোলা মনের বাঁধাহীন সুর তরঙ্গের। তখন ভাবতাম কে এমন আশ্চর্য কণ্ঠের জাদুকর? তখনো নাম জানা হয়নি, শুধু গান শুনি আর গলা মিলাই। অবশেষে জানলাম তিনি এন্ড্রু কিশোর। একদিন দেখেও ফেললাম পাশের বাড়ির টেলিভিশনে! শুধু কণ্ঠে নয়, সেই চেহারায় কী অসাধারণ ব্যক্তিত্ব! সেই থেকে শুরু, তার সুরের ওপর ভর করে পথ চলার সাহসিকতা। অন্ধকার ঝোঁপের ভিতর দিয়ে গ্রামের হাঁটাপথে গলায় ধরি এন্ড্রু কিশোরের গান আর তালের আশ্রয় নেই হাতে থাকা কেরোসিন তেলের প্লাস্টিকের জারকিন-এ। সেই সঙ্গে কৈশোরের বিচিত্র মনের বহুমাত্রিক রোমান্টিক ভাবনায় আশ্রয় হয় এন্ড্রু কিশোরের গান। ফলে শৈশব-কৈশোর থেকেই ভাবনার মননে এক বিশাল জায়গা জুড়ে স্থায়ী হতে থাকেন তিনি।
দর্শনের আত্মিক স্মৃতি
সেই বয়সে এন্ড্রু কিশোর আমার কাছে ছিলেন একজন পরম শিল্পী। কোনোদিন সেই পরমের এতো কাছাকাছি আসার সুযোগ হবে, সেটা কল্পনাতেও ছিলো না। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত বিভাগে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সব ভুলে গিয়ে সাধনায় ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করি। এর মধ্যে কোনো একদিন শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক আলমগীর পারভেজ১ আমাকে বললেন, নাহিয়ানকে গান শেখাতে হবে। আমিও না করতে পারিনি। নাহিয়ান এন্ড্রু কিশোরের বন্ধু টরিক ভাইয়ের ছেলে। টরিক ভাইয়ের বাসায় এন্ড্রু কিশোরের নিয়মিত যাওয়া আসা। আমারও আসা যাওয়া চলতে থাকে। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন টরিক ভাইয়ের বাসায় শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের আগমন।
সাঙ্গীতিক মানসপটে শৈশব-কৈশোরের সেই স্বপ্নের শিল্পীর দর্শন এভাবে পাবো ভাবিনি, তাই কীভাবে সেই আনন্দ প্রকাশ করবো বুঝতে পারছিলাম না! কেমন জানি লাগছিলো! নাহিয়ানকে সারগাম করাচ্ছিলাম ঠিক সেই সময় ঘরে ঢুকে পড়েন তিনি। তাকে দেখে আমার আর নাহিয়ানের সারগাম এমনই বন্ধ হয়ে যায়। আমার অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে নাহিয়ানের মা নাজু ভাবি আমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেন। শিল্পী কিশোর বললেন, আপনি কন্টিনিউ করেন; থামালেন কেনো? আমি শুনবো তো। আমি তখন নাহিয়ানকে একটা সারগামই দুইগুণ, তিনগুণ, চারগুণ লয়ে স্বর এবং আকারসহ অভ্যাস করাচ্ছিলাম। সেটাই নাহিয়ান ওনাকে শোনালো। উনিও খুব মনোযোগ সহকারে শুনলেন এবং শেষে নাহিয়ানের গানের খাতায় মন্তব্য লিখলেন ‘নাহিয়ানকে দিয়ে গান হবেই’। আর আমাকে বললেন, আপনার শেখানোর কৌশল ভালো। এভাবে সঙ্গীতের সুর, চর্চা, সুরের আদান-প্রদান—এমন পরিবেশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তির সামনে এসেছিলাম আমি! সেটাও আবার একজন সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে। তাতে অবশ্য আমি একটু ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়েছিলাম ঠিকই; আবার বিস্ময়ী এক আনন্দেও উদ্বেলিত হয়েছিলাম। সেই দিন থেকে এন্ড্রু কিশোর হলেন আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন কিশোর দা।
আধুনিক বাংলা গানের শিল্পী হলেও মার্গ সঙ্গীতের প্রতি কিশোর দার গভীর আগ্রহ ছিলো এবং নিজেও নিয়মিত চর্চা করতেন। মার্গ সঙ্গীতে গুরু পরম্পরায় তালিমও পেয়েছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি সঙ্গীত গুরু ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর কাছে। গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, জনসাধারণের কাছে ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর স্মৃতি ধরে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে মার্গ সঙ্গীতে উদ্বুদ্ধ করার তাগাদায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চু স্মৃতি সংসদ’। মার্গ সঙ্গীত বা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চায় তিনি এই সংসদের মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি যেমন পর্দার আড়ালের মানুষ ছিলেন; তেমনই আধুনিক গানের শিল্পী কিংবা প্লেব্যাক সিঙ্গারের আড়ালে তিনি ছিলেন একজন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সাধক। তার রেওয়াজের নির্দিষ্ট ঘর ছিলো; সেখানেই একাগ্রচিত্তে নিয়মিত সাধনা করতেন। যা হয়তো অনেকেরই অজানা। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ধারায় প্রধান দুইটি শৈলী ধ্রুপদ ও খেয়াল। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিল্পী থেকে সাধারণ মানুষ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বলতে খেয়ালকেই বুঝে থাকে। ধ্রুপদ শৈলী যে একদম আদি এবং কঠিন মেহনত ও সাধনা সাপেক্ষ তা অনেকেরই অজানা। কিন্তু কিশোর দা এ বিষয়ে ভালো ধারণা রাখতেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে আমি তখন স্নাতকোত্তর পর্বে ধ্রুপদ শাখায় অধ্যয়ন করছি; নিষ্ঠার সঙ্গে সাধনাও করছি প্রতিনিয়ত। তবু মাঝে মধ্যে ভয় হয়; কী হবে? কাকে শোনাবো কে বুঝবে? সাধনা অব্যাহত রাখার পরিবেশটাইবা কোথায় পাবো? কিশোর দার সঙ্গে এমন আলাপচারিতায় দাদা একদিন আমাকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন—‘যা মানুষ বোঝে না তাই তো বোঝাতে হবে। যা মানুষ করে না তাই তো করে দেখাতে হবে। এখানেই তো সার্থকতা কৌশিক। কোনো কথা নয় ধ্যানছে রেওয়াজ করো।’ দাদার কথা এখনো কানে বাজে। স্মৃতির মানসপটে দাদার এই বাক্যগুলোর সঙ্গে তার মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে রেওয়াজে বসলেই।
দাদার সঙ্গে এমন কথোপকথন হওয়ার মাসখানেক পর সঙ্গীতশিল্পী কাজী সুলতান মাহমুদ মন্টু ও টরিক ভাই ফোনে জানালেন ওস্তাদ আব্দুল আজিজ স্মৃতি সংসদের ধ্রুপদী সন্ধ্যায় কিশোর দার আমন্ত্রণে তোমাকে ধ্রুপদ গাইতে হবে। আমি সেদিন বিস্মিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি ভয়ও পেয়েছিলাম। তবে ভিতরে ভিতরে কেমন জানি একটা অন্যরকম আনন্দও লাগছিলো। সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছিলাম ধ্রুপদের সেই আসরে গিয়ে। আমার মতো ছোট্ট একজন মানুষকে যে গুণিজন সংবর্ধনা দেওয়া হবে সেটা দেখে আমি যেমন বিব্রত বোধ করছিলাম, সঙ্গে ভীত-সন্ত্রস্তও। এতো বড়ো সম্মান পাওয়ার যোগ্য আমি নই, তারপরও দাদা এটা কেনো করলেন! মাথায় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এমন সময় অনুষ্ঠান শুরু হলো। আলোচনা পর্ব শেষে দাদা মাইক্রোফোন হাতে ঘোষণা করলেন, ‘কৌশিক অনেক ছোটো মানুষ কিন্তু অনেক গুণী। তার সাধনার পথ প্রশস্ত হোক, সে উৎসাহিত হোক এটাই আমাদের উদ্দেশ্য।’ তারপর বাংলাদেশের আরেক কিংবদন্তি সুরকার, শিল্পী প্রয়াত লাকী আখন্দ আমাকে গুণিজন সম্মাননার লিখিত উত্তরীয় পরিয়ে দিয়েছিলেন। আমি এখনো ভাবি আর বিস্মিত হই দাদা এটা আমার জন্য কী করেছিলেন! সত্যি আমি এটার যোগ্য তখনো ছিলাম না, এখনো নই। কিন্তু সেই থেকে সাহস পেয়েছিলাম, উৎসাহ পেয়েছিলাম। এই সম্মান আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছিলো। আজও চর্চা করে যাচ্ছি কিন্তু দাদা রঙ্গিন ফানুসের মতো দম ফুরিয়ে আমাদের এতিম করে চলে গেছেন। হতভাগা আমরা কিছুই করতে পারিনি। তাই স্মৃতিময় কথনের আত্মার উদ্রেক থেকে কিশোর দার বিশাল সঙ্গীত জীবন নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করে, লিখতে ইচ্ছে করে। এ একদমই আত্মার তাগাদা।
‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’
সবুজ শহর রাজশাহীতে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর এন্ড্রু কিশোরের জন্ম। পারিবারিক সাঙ্গীতিক পরিবেশ তার সঙ্গীত শিক্ষার অবারিত পথ রচনা করে দেয়। বাবা ক্ষীতিশ চন্দ্র বাড়ৈ ও মা মিনু বাড়ৈয়ের জীবনাভিজ্ঞতা এবং অর্জিত শিক্ষার আদলে সাংস্কৃতিক চেতনার মধ্য দিয়ে তার বেড়ে ওঠা। সেই সুবাদে সঙ্গীতের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং আগ্রহের উদ্রেক থেকে শুরু হয় সাঙ্গীতিক পথচলা। প্রথাবদ্ধ নিয়মে প্রয়াত ওস্তাদ মোজাম্মেল হোসেনের সুযোগ্য শিষ্য প্রয়াত ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর সান্নিধ্যে যা বাস্তবায়ন হতে থাকে। তার সান্নিধ্যেই শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা পথ কাটিয়েছেন কিশোর। বাচ্চু ছিলেন উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের একজন স্বনামধন্য কলাকার। উপমহাদেশের প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী প্রয়াত ওস্তাদ নাজাকাত আলী ও সালামাত আলী রাজশাহী বেতারের পর্যবেক্ষণ অডিশনে বাচ্চুর সাঙ্গীতিক পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। সেই বাচ্চুর স্নেহধন্য শিষ্য হিসেবে এন্ড্রু কিশোর পেয়েছিলেন সঙ্গীতের অনবদ্য জ্ঞান। যা তার সঙ্গীত জীবনের দক্ষতা, পারঙ্গমতা এবং মৌলিকত্বকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে। ওস্তাদ বাচ্চুর কাছে সঙ্গীতের দীর্ঘ সময়ের পথচলাই তার শিক্ষাজীবনে অনেকটা পাথেয় হয়েছিলো।
এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় মূলত তার বড়ো বোন শিখা বাড়ৈয়ের সাহচার্যে; যিনি ওস্তাদ বাচ্চুর কাছে তালিম নিতেন। একসময় ছোট্ট কিশোরও বোনের সঙ্গে সঙ্গীতের ক্লাসে মন দেয়। ধীরে ধীরে সঙ্গীতের প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। এটা বুঝতে পারেন ওস্তাদজি। শুরু হয় কিশোরের নতুন পথচলা। এরপর যৌবন অবধি বাচ্চুর একনিষ্ঠ তালিমেই সঙ্গীতে সমৃদ্ধ হতে থাকেন কিশোর। রাজশাহীর আরেক সঙ্গীতশিল্পী কাজী সুলতান মাহমুদ মন্টু এ বিষয়ে বলেন,
কিশোর দা ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন। একাগ্র সাধনা এবং গুরুর অনবদ্য তালিম তাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছিলো। বর্তমান প্রজন্ম তাকে বাংলা আধুনিক গান এবং চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সম্রাট হিসেবে জানলেও; ৭০-এর দশকে তিনি একজন ভালো মানের উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে তথ্য হয়তো অনেকেরই অজানা।২
কিশোর দার প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি কেটেছে রাজশাহী শহরেই। ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা ছিলো অনবদ্য। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বর্তমানে গাইবান্ধা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক প্রমোতোষ সাহা বলেন, ‘কিশোর আমার এক বছরের জুনিয়র ছিলো। তবে আমাদের সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো। আমরা একসঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সবসময় ব্যস্ত থাকতাম। ১৯৭২ সালে অধ্যাপক রুহুল আমিনের নেতৃত্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক সংসদ প্রতিষ্ঠা হয়। সেই সংসদের সভাপতি ছিলেন হান্নু ভাই আর কিশোর ছিলো সাংস্কৃতিক সম্পাদক।’৩
তাদের কথায় এটা স্পষ্ট যে, এন্ড্রু কিশোর কালের স্রোতে ভেসে আসা হঠাৎ খ্যাতিমান হয়ে ওঠা কোনো শিল্পী ছিলেন না। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সঙ্গীতের এই ইমারত গড়ে ওঠে।
ব্যক্তি ও সঙ্গীত জীবনের বন্ধন
সঙ্গীতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন। সঙ্গীত জীবনের পথচলায় সৃজনশীল ও স্থির মনন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সঙ্গীতের সুর মানুষের মধ্যে আনন্দ নিয়ে আসে, স্থিরতা নিয়ে আসে, তথা সুন্দর মনন গঠনে অনবদ্য ভূমিকা রাখে। তেমনই শৈশব থেকে পারিবারিক ও সঙ্গীত শিক্ষা এন্ড্রু কিশোরকে শৈল্পিক মননে সমৃদ্ধ করে। তিনি ছিলেন নিরহংকারী ও খোলা মনের মানুষ। যার সামগ্রিক নির্যাস তার সুর ও সঙ্গীত। অনেকে মনে করে, কণ্ঠ দিয়ে গান হয়। আসলে কণ্ঠ তো আওয়াজের পথ মাত্র। মনের মোশন, ইমোশন ছাড়া তো গানের সুর নির্গত হয় না। সাধ করে গান করলেই দরাজ আওয়াজের গান হয় না। খোলা গলার গানের সঙ্গে খোলা মন-মানসিকতার চর্চা খুব বেশি জরুরি। গানের জন্য মনের প্রভাব এতো বেশি প্রয়োজন যে, ভালো মনের চর্চা ব্যতীত ভালো গান করা প্রায় অসম্ভব। ব্যক্তি এন্ড্রু কিশোর সেই ধাপ অনেক আগেই অতিক্রম করেছিলেন বলে মনে হয়। এন্ড্রু কিশোরের স্মৃতিচারণ করে তার বন্ধু ইত্যাদিখ্যাত জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেত বলেন,
১৯৮৮ সালের একটি ঘটনা। আমরা চট্টগ্রাম যাচ্ছিলাম একটা অনুষ্ঠানে। পথে যাত্রাবিরতি। একটি হোটেলের সামনে আমাদের মাইক্রোবাস থামল। হঠাৎ দেখি একটি ছেলে কিশোরের গান গাইছে, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়, কেউ পায় কেউবা হারায় ...’। আমরা থমকে দাঁড়ালাম। ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলো, হাত মেলাল। কিশোর নির্বাক তাকিয়ে থাকল ছেলেটির দিকে, কিশোরকে চিনল না। কারণ টিভিতে গান না গাওয়ায় তাকে কখনো দেখেনি। আমি বললাম—‘বাঃ, চমৎকার গাও তো তুমি। এটা কার গান জানো?’ এন্ড্রু কিশুরের (তার উচ্চারণে) ছেলেটি উত্তর দিল। কিশোরকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—‘ওনাকে চেনো? দেখেছো কখনো?’ না, জবাব দিল ছেলেটি। আমার এতসব প্রশ্নে কিশোরের মধ্যে কোনো ভাবান্তর ছিল না। হাসি হাসি মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। পরে আমি কিশোরের পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘তুমি যার গান গাইলে, ইনিই হচ্ছেন সেই এন্ড্রু কিশোর।’ আমার এ কথা শুনে ছেলেটি ‘থ’ হয়ে গেল। অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল কিশোরের দিকে। ঘোর কেটে যেতেই ছেলেটি কিশোরের পা ছুঁয়ে সালাম করল। কিশোরও ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরল। এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে।৪
বর্তমানে যারা গান করে, তাদের সিংহভাগের মধ্যেই খ্যাতি-যশের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ার জোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। রেডিও, টেলিভিশনে দু-চারটি অনুষ্ঠান করলে মিডিয়ার কল্যাণে হয়ে যায় স্টার! অথচ এন্ড্রু কিশোর ছিলেন একেবারে বিপরীত। তার ছিলো না কোনো অহংকার। যাপন করতেন অত্যন্ত সাদামাটা জীবন। টেলিভিশনের রুপালি পর্দায় নিজেকে মেলে ধরার কোনো মোহই তার ছিলো না। খ্যাতি, যশের ঊর্ধ্বে থেকেও বছরের পর বছর পর্দার আড়ালে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। শৈশবেই বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রে নজরুল, রবীন্দ্র ও আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী ছিলেন তিনি। তারপরও নিজেকে মেলে ধরতে তিনি টেলিভিশন, রেডিও’র বারান্দায় পা বাড়াননি। চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক করেও পর্দার আড়ালেই কাটিয়েছেন অনেকটা বছর। এমনকি প্লেব্যাক করার ১৫ বছর পর ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে তিনি টিভি পর্দায় আসেন। সেটাও একপ্রকার বন্ধুর জোরাজুরিতে। এ বিষয়ে হানিফ সংকেত বলেন,
দেখ দোস্ত! তোর গান মানুষ শুনছে ঠিক আছে কিন্তু তারা তাদের প্রিয় শিল্পীকে দেখতেও চায়। তুই তাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারিস না।’ আমার নাছোড়বান্দা মনোভাব দেখে বলত, ‘বন্ধু! আমি যদি আবার কখনো টিভিতে গাই তবে তোর অনুষ্ঠানেই গাইব।’ অবশেষে একসময় কিশোর টিভিতে গাইতে রাজি হলো। ১৯৯৯ সালে আমার অনুরোধে ঈদের বিশেষ ‘ইত্যাদি’তে আবার পুরনো এন্ড্রু কিশোরের নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটল দর্শকদের সামনে। গাইল ‘পদ্ম পাতার পানি নয়, দিন যাপনের গ্লানি নয়, জীবনটাকে বুঝতে হলে, জীবন ভালোবাসতে হয় ...।৫
এন্ড্রু কিশোরের হয়তো খ্যাতির মোহ ছিলো না। তবে সঙ্গীতের প্রতি তার যে কিছুটা হলেও ত্যাগ রয়েছে তা উঠে আসে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার নন্দীগ্রামে একটি কনসার্টে তাকে করা প্রশ্নের উত্তরে। জানতে চাওয়া হয়,
এত দীর্ঘ সময় রাজত্ব করার রহস্য কী? সেখানেও তাঁর উত্তর ছিল, ‘রহস্য-টহস্য কিছুই না। আমি গান ছাড়া কিছুই পারি না। গান গাই। আমার সামনে যে গান আসে চেষ্টা করি যতটুকু ভালো করে গাওয়া যায়। তবে একটা কথা বলি আমরা—যেকোনো কাজের পেছনে যদি ত্যাগ থাকে, তাহলে ফল আসে। ত্যাগ না থাকলে হয় না। হয়তো আমার কিছু ত্যাগ আছে সেজন্য এতদূর আসতে পেরেছি।’৬
‘আমি যে এক গানের পাখি’
বাংলা চলচ্চিত্রে শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের আগমন এক বিস্ময়ী ধুমকেতুর মতো। তার কণ্ঠ, গায়কি বৈচিত্র্যতা চলচ্চিত্রের গানে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিলো। কণ্ঠের পারঙ্গমতা, সিকোয়েন্সের সঙ্গে সাঙ্গীতিক টোনের বৈচিত্র্যতা—সবমিলিয়ে তিনি তার সময়ের অদ্বিতীয়। চলচ্চিত্রে পুরুষ কণ্ঠ বলতে এন্ড্রু কিশোরের নাম নির্দ্বিধায় চলে আসতো। চলচ্চিত্রের গানে ছিলো তার একচ্ছত্র আধিপত্য।
১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মেইল ট্রেন এ আলম খানের সুরে ‘অচিনপুরের রাজকুমারী, নেই যে তার কেউ ...’ গানের মাধ্যমে শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের চলচ্চিত্রের গানে আবির্ভাব। এরপর তাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। অনেকক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের গল্প, অভিনয় দুর্বল হলেও কেবল এন্ড্রু কিশোরের গানই দর্শকচিত্ত জয় করেছে। চলচ্চিত্রের পথচলায় তার অধিকাংশ গানই জনপ্রিয়তা পায়। এমনও কিছু গান রয়েছে, যেগুলো নবীন থেকে প্রবীণ, সাধারণ মানুষ থেকে বিজ্ঞজন, সবার মুখে মুখে ছিলো। যেমন, মহিউদ্দিন বাদল নির্মিত বড় ভালো লোক ছিল-তে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কথায় ও আলম খানের সুরে ‘হায়রে মানুষ, রঙ্গিন ফানুস, দম ফুরালেই ঠুস ...’ গানটি। যার মাধ্যমে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গীতে নয়নের আলোতে তিনি তিনটি গানে কণ্ঠ দেন—‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি ...’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান ...’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে মন যেখানে হৃদয় সেখানে ...’। তিনটি গানই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। ১৯৮৭ তে সারেন্ডার-এ আবারো আলম খানের সুরে কিশোরের গাওয়া ‘সবাই তো ভালোবাসা চায় ...’ গানটিও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এ গানের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছিলেন। এছাড়া ভেজা চোখ-এ ‘জীবনের গল্প, আছে বাকি অল্প ...’, বেদের মেয়ে জোস্নাতে ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে ...’ ইত্যাদি গানগুলো জনসাধারণের মুখে মুখে স্থান করে নিয়েছে। এতো বছর পরেও সেসব গানের আবেদন একটুও কমেনি। পরবর্তী সময়ে তিনি আরো ছয়বার সঙ্গীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন—ক্ষতিপূরণ (১৯৮৯), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১), কবুল (১৯৯৬),আজ গায়ে হলুদ (২০০০), সাজঘর (২০০৭) ও কি যাদু করিলা (২০০৮)।
৯০ দশকে চলচ্চিত্রশিল্পে ‘অশ্লীলতা’ চলে আসলে গানের বাণী এবং সুরে স্থূলতা চলে আসে। চলচ্চিত্রের গানে ব্যবহৃত হতে থাকে নগ্নতা, ‘অশ্লীলতা’। যা অনেক নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীকেই হতাশ করে। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেওয়া থেকে তাদের অনেকে বিরত থাকে। এমন পরিস্থিতিতেও এন্ড্রু কিশোর ছিলেন যুগসারথি। এককথায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান আর এন্ড্রু কিশোর এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা।
বাণী ও সুরে কণ্ঠের খেলা
যেকোনো গানে বাণী ও সুরের সমন্বয় একটি বিশেষ দিক। বাণীর সঙ্গে সুরের সাদৃশ্য না থাকলে ভাবের ব্যত্যয় ঘটে। এই বাণী ও সুরে কণ্ঠযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত এই তিনের সহযোগে একটি গান পূর্ণতা পায়। আর পূর্ণতা পেতে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয়। যার মাধ্যমে গানের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। তা হলো স্বরলিপি। আবার একজন কণ্ঠশিল্পী শুধু স্বরের ছক পূরণ করলেই গানে প্রাণ সঞ্চারিত হয় না। তার জন্য শিল্পীর আবেগ-অনুভূতি-ব্যক্তিত্বও প্রয়োজন। শিল্পী কিশোরের গানে সেই প্রাণ সঞ্চারের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যার গান শুনে শ্রোতার মনে অনুরণন ঘটতো। বলা যেতে পারে, যে গান শ্রোতার মনে অনুরণন সৃষ্টি করতে পারে না, সেটি প্রাণহীন গান। আর যে গানে শিল্পীর সঙ্গে শ্রোতার মনেও গাওয়ার উদ্রেক আসে সেটাই তো গান হয়ে ওঠে। যা এন্ড্রু কিশোর উতরে গেছেন খুব সহজেই। তার গান শ্রোতা-চিত্ত জয় করেছে বিস্ময়ী রূপে। যুগের পর যুগ অনুরণিত হয়েছে চলচ্চিত্রের লাখো দর্শকশ্রোতা। এন্ড্রু কিশোরের গানে এই সাফল্যের পিছনে সুরের বিশেষ এক ধরন উত্তরাঙ্গ প্রবলই প্রধান কারণ হিসেবে লক্ষ করা যায়। মনে হয়, তার কণ্ঠের মেজাজের প্রতি খেয়াল রেখেই বুঝি সুরকার সুর করেছিলো। গানের বাণীর সঙ্গে সুরের সাদৃশ্য, সঙ্গে কণ্ঠের ব্যাপ্তি; এই তিনের সমন্বয়েই এন্ড্রু কিশোর জনপ্রিয় শিল্পীর আসন অর্জন করেছেন। তার জনপ্রিয় কয়েকটি গানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার হবে আশা করছি। একই সঙ্গে তার সামগ্রিক সাঙ্গীতিক প্রতিভা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে।
এক. ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গীত ও বেলাল আহমেদ নির্মিত নয়নের আলো দর্শক মনে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এতে অভিনয়-কাহিনি-সংলাপ সবকিছু ছাপিয়ে নেপথ্যের কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর বিশেষভাবে অগ্রগণ্য হয়েছিলেন। ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি ...’ গানটি নয়নের আলোতে চারবার ব্যবহার করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের কাহিনি আকর্ষণীয় ও অর্থবহ করে তুলতে গানটির ব্যবহার বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে হয়েছে। গানটির বাণীর সঙ্গে রয়েছে সুরের বিশেষ ধরন; যা সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়াস রাখে।
আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি
ও ও ও ও
এই চোখ দুটো মাটি খেয়ো না
আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ
মিটবে না গো মিটবে না।
তারে এক জনমে ভালোবেসে
ভরবে না মন ভরবে না ॥
ও রে ইচ্ছে করে বুকের ভেতর
লুকিয়ে রাখি তারে।
যেনো না পারে সে যেতে আমায়
কোনো দিনও ছেড়ে।
আমি এই জগতে তারে ছাড়া
থাকবো না গো থাকবো না ॥
গানটিতে এক বিরহী মনের আর্তনাদ প্রকাশ হয়েছে। সর্বাঙ্গ পচে-গলে-ধ্বংস হয়ে গেলেও চোখ দুটো অক্ষত রাখার আকুতি রয়েছে। যে চোখ দিয়ে মরে যাওয়ার পরেও প্রিয় মানুষকে দেখার সাধ থেকে যায়। গানের এমন অভিব্যক্তির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ সুরে অভিব্যক্তির উদ্বেগ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। গানটির স্বরলিপি এমন—
স্থায়ী
গরা
আমার
সা রা গা পা ধা র্সা র্রা র্গা র্মা -া -া গারা র্সা -া -া পাধা
সা রা দে হ খেয়ো গো মা টি ও -০ -০ ও ও ও -০ -০ এই
ধর্সা র্সা র্সা র্সা র্সা নাধা পা গমা পগা -া -া গমা মা দা দা পামা
চো খ দুটো মাটি খে ও০ না ০০ ০০ -০ -০ আমি ম রে গে লেও
মা পা দা পমা মগা -া -া -া মা গা রা সা সা সা সা পাপা
তা রে দে খার সাধ -০ -০ -০ মিট বে না গো মিট বে না তারে
পা র্গার্গা র্গা র্রর্সা র্সা না ধা -া ধা র্রা র্রার্গা র্রর্সা র্সা র্সা -া গারা
এক জন মে ভালো বে সে -০ -০ ভর বে নামন ভ রবে না -০ আমার
অন্তরা
পার্সা
ওরে
-র্রা র্গা র্গা র্গা গা গমা গা রা র্রার্গা র্রার্সা ধা -া ধা র্সা র্সা র্সা
ইচ্ছে ক রে বু কের ভেত ০ র লুকি য়েরা খি -০ তা রে -০ যেন
-ণা ণা ণা ণা ণা ণা ণা ণা ধা ণা র্সণধা পা পা -া গা মা
না পা রেসে যে তে আ মা -য় কো নো দিন ০ ছে ড়ে -০ আ মি
মা দা পা মা পা দা মাপা মাগা -মা গা রা সা সা সা -া পাপা
সেই নাঘ রে ০ থা কতে এ০ কা০ পা র বো নাগো পার বনা -০ তারে
উপরের স্বরলিপির সুর লক্ষ করলে দেখা যায়, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’ সুরটি ভূপালি রাগের ভাবের চরম পর্যায়ে তার সপ্তকের গান্ধার স্বরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ও ও ও ও বাণীতে যখন পুকার (ভাবের চরম উদ্রেক প্রকাশ) করছে তখন তার সপ্তকের মধ্যম স্বর থেকে অবরোহী গতিতে ফিরছে। আরোহী গতিতে ভূপালির রেশ থাকলেও গানটিতে অবরোহন গতিতে মধ্যমের ব্যবহার অন্যরকম এক নান্দনিকতা প্রকাশ করেছে।
দুই. জহিরুল হকের সারেন্ডার (১৯৮৭)-এ মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন দর্শক নন্দিত অভিনয়শিল্পী শাবানা-জসিম। মর্মস্পর্শী সব সিকোয়েন্সে সঙ্গীতের ব্যবহার চলচ্চিত্রটির সার্থক ভাব ফুটিয়ে তুলেছে। মেধাবী ছাত্র, ঘরে অসুস্থ মা; বাড়ি ভাড়া, খাবার, ওষুধ কেনার মতো টাকা নেই! এমন জীবনে প্রণয়ের ভাব উদ্বেলিত হলেও আর্থিক দীনতায় অপমান অপদস্ত হতে হয়। শেষ পর্যন্ত মায়ের শেষ কার্যেও ব্যর্থ সন্তান। মেধাবী ছাত্র হয়েও জীবনের উল্টো পথে চলা। যখন হারিয়ে যায় ভালোবাসার মানুষ, হারিয়ে যায় সততা-মূল্যবোধ-সামগ্রিক সত্তা। এমন মুহূর্তগুলোতে ভালোবাসা নামের হৃদয়িক বস্তুটির জন্য বুক ভরা প্রত্যাশা থাকলেও তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। চলচ্চিত্রের এমন হৃদয় বিদারক গল্পে সঙ্গীতই সেই আবেদনকে আরো বেশি উসকে দিয়েছে। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের রচনায় ‘সবাই তো ভালোবাসা চায় ...’ গানটির সঙ্গীতে ছিলেন আলম খান। সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে ছাড়াও গানটিতে একক কণ্ঠ দিয়েছেন কিশোর। কথা ও সুরের সঙ্গে কিশোরের দরাজ কণ্ঠ চলচ্চিত্রে এক অন্যরকম প্রণোদনা সৃষ্টি করে। যা চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে একদম মিশে গিয়েছে। সারেন্ডার-এর মাধ্যমে গানটি সাধারণ মানুষের মনে যেভাবে সাড়া জাগিয়েছে তার পিছনে কিন্তু গায়কিরও কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে। গানটি নিচে স্বরলিপিসহ তুলে ধরা হলো।
সবাই তো ভালোবাসা চায়
কেউ পায় কেউবা হারায় তাতে
প্রেমিকের কী আসে যায় ॥
ঐ ফুল চায়
গানে গানে ফাগুন আসুক
ওলি চায় রঙে রঙে ফুলেরা হাসুক
আমি চাই তুমি আসো
চুপি চুপি ভালোবাসো
এই নিরালায় ॥
স্থায়ী
গা গা গমা -া পা ধা না ধপা না নধা -া -া না না র্সা র্সা
স বা ইতো -০ ভা লো বা সা-০ চা য়০ -০ -০ কে উ পা য়
র্সা -া -া -া না না ধা পা না না না না গা মা পা ধা
০ -০ -০ -০ কে উ বা হা রা য় তা তে প্রে মি কে র
না ধপা ধপমা -া পাপা মগা মাগা ররা গা -া -া -া
কী ০০ আসে -০ যা০ ০০ ০০ ০০ য় -০ -০ -০
অন্তরা
ধা না র্সা না ধা না র্সা না ধা না র্সা র্রা র্সা র্সা না র্সা
ঐ ০ ফু ল চা য় গা নে গা নে ফা গু ন আ সু ক
র্সা -া র্রা র্সা না র্সা র্রা র্সা না র্সা -র্গা র্রা র্সানা ধা না র্সা
০ -০ ও লি চা য় র ঙ্গে র ঙ্গে ফু লে রা০ ০ হা সুক
না না র্সা র্সা না না ধা পা না না না র্সা না না ধা পা
আ মি চা ই তু মি আ সো চু পি চু পি ভা লো বা সো
না ধপা ধা পমা পামা গারা গা -া
এ ই ০ নি রা০ লা০ ০০ ০ য়
এই গানে সব শুদ্ধ স্বরের ব্যবহার থাকলেও স্বরের গাঁথুনিতে সুরের হৃদয়স্পর্শী আবহ সৃষ্টি হয়েছে। তবে স্বরের সঙ্গে গলা মেলানোর সমন্বয় প্রধান একটি বিষয়। স্বরের সঙ্গে গলার সমান্তরাল সমন্বয়কে পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় স্বর ও কণ্ঠের কম্পাঙ্ক বলতে পারি। যা এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠের মাধ্যমে সমভাবে ব্যবহার হয়েছে। গানটির স্থায়ী এবং অন্তরা অংশে ‘... কী আসে যায়’ এবং ‘... এই নিরালায়’ বাণীর সুরে সাঙ্গীতিক স্বরের বিশেষ ক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। খানিকটা ধ্রুপদ শৈলীর স্বর প্রক্ষেপণের হরকত। খুব সূক্ষ্মভাবে স্বরগুলোর সামগ্রিক প্রকাশ হয়েছে যেখানে সপাটের কোনো অস্তিত্ব নেই। শুদ্ধ বিলাবল রাগ আঙ্গিকে গানটি গীত হলেও; কণ্ঠের দরাজ আওয়াজ শ্রোতা এবং দর্শক চিত্তকে আপ্লুত করেছে।
তিন. প্রখ্যাত সাংবাদিক ও নির্মাতা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন নির্মাণ করেন বড় ভালো লোক ছিল (১৯৮২)। চলচ্চিত্রটির সবকটি গানের কথা লিখেছেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। এর মধ্যে ‘হায়রে মানুষ, রঙ্গিন ফানুস ...’ ও ‘তোরা দেখ, দেখরে চাহিয়া ...’ গান দুটিতে কণ্ঠ দেন এন্ড্রু কিশোর। দুটি গান জনপ্রিয়তা পেলেও আলম খানের সুরে ‘হায়রে মানুষ, রঙ্গিন ফানুস ...’ গানটি অপেক্ষাকৃত একটু বেশি দর্শকের নজর কাড়ে। চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে গানটির সামঞ্জস্যতা থাকায় এবং কথা ও সুরের সঙ্গে কণ্ঠের মেলবন্ধনে গানটি দর্শক মনে আসন করে নেয়। গানটিতে কণ্ঠের কিছু ব্যবহারিক বিষয়ও রয়েছে। স্বর-স্বরলিপি ও তালের গতির মাধ্যমে গানটি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যেতে পারে।
হায়রে মানুষ, রঙ্গিন ফানুস
দম ফুড়াইলেই ঠুস!
তবু তো ভাই কারোরই নাই
একটুখানি হুশ।
পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া
সোনার পিনিশ বানাইছিলা যতন করিয়া ॥
চ্যাল চ্যালাইয়া চলে পিনিশ
ডুইবা গেলেই ভুস!
তাল : দ্রুত দাদরা
স্থায়ী
র্সা র্সা র্সা না না না ধা পা পা ধা পা পা
হা য় রে মা নু ষ র ঙ্গি ন ফা নু স
গা গা রা গা ধা ধা পা -া -া -া -া -া
দ ম ফু ড়া ই লেই ঠুস -০ -০ - ০ -০ -০
র্সা র্সা র্সা না না না ধা পা পা ধা পা পা
ত বু ০ তো ভা ই কা রোর ই না ই ০
গা গা রা গা ধা ধা পা -া -া -া -া -া
এ ক টু খা নি -০ হুশ -০ -০ -০ -০ -০
অন্তরা
পা পা পা ধা ধা র্সা র্রা র্রা র্রা র্গা -া -া
পূ র ণি মা ০ তে ভা ই ০ সা -০ -০
র্রর্সা ধা -া -া -া -া ধা পা পা ধা পা পা
গে ছে -০ - ০ -০ -০ নী ল ০ দ রি য়া
ধা -া -া -া -া -া ধা ধা ধা ধা ধা ধা
-০ -০ -০ -০ -০ -০ সো না র পি নি শ
পা ধা পা গা রা -া -া -া -া -া -া -া
বা না ই ছি লা -০ -০ -০ -০ -০ -০ -০
সা ধ্া ধ্া সা রা রা গা -া -া -া -া -া
য ত ন ক রি ০ য়া -০ -০ -০ -০ -০
পা পা পা পা পা পা পা পা -া ধা পা পা
চ্যা ল চ্যা লা ই য়া চ লে -০ পি নি শ
গা রা রা গা ধা ধা পা -া -া -া -া -া
ডু ই বা গে লে ই ভুস -০ -০ -০ -০ -০
গানটির দুটি অন্তরার সুরই সমান স্বরলিপিতে নিবদ্ধ। স্থায়ী এবং অন্তরার স্বরলিপিতে দেখা যাচ্ছে স্থায়ীর শুরুতেই ‘হায়রে মানুষ’ বাণীতে মানুষ শব্দটিতে কেবল নিষাদ স্বর ব্যবহৃত হয়েছে। পুরো গানের স্বরলিপিতে স্বরের যে গাঁথুনি তা ভূপালি রূপের ভাব প্রকাশ করে। ভূপালি রাগ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পীদের কাছে খুব একটি জনপ্রিয়। এন্ড্রু কিশোরের রাগ-রাগাঙ্গের অভিজ্ঞতা গানের নোটগুলোর ব্যবহারকে বেশ আন্দোলিত করেছে। রাগ ও বাণীর ভাবদ্বয়ের সমন্বয় ধারণ করে শিল্পী দ্রুত দাদরা তালের পাহাড়ি দোলায় এক অন্যরকম নান্দকিতা প্রকাশ করেছে। যা শ্রোতার মনকে স্পর্শ করেছে।
চার. ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তোজাম্মেল হক বকুল নির্মাণ করেন বেদের মেয়ে জোস্না। ব্যবসায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা এই চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে এক প্রেমের উপাখ্যান। এই অঞ্চলের মানুষের যাপিত জীবনস্পর্শী গীতির ব্যবহারই চলচ্চিত্রটির সাফল্যের পিছনে অন্যতম কারণ বলা যেতে পারে। যেখানে ১১টি গানের সুর ছন্দে আপ্লুত হয়েছে দর্শক। এর মধ্যে ১০টি গানের কথা লিখেছেন নির্মাতা নিজেই। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন আবু তাহের। লৌকিক যাত্রাপালার আঙ্গিকে সংলাপ এবং গানের সুর সব শ্রেণির দর্শকের চিত্তজয়ে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রুনা লায়লা ও কিশোরের দ্বৈত কণ্ঠে ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে ...’ গানটি। গানটি লৌকিক সুর সহজ-সরল হলেও রাগ-ভাবের ছকে পরিবেশিত হয়েছে। রাগ বলতেই রঞ্জিত হওয়া, ব্যাপারটা একেবারই তা নয়। রাগ বলতে ভাব। গানটি মূলত কাফি রাগের ভাবে গীত হয়েছে। কাফি রাগের বিশেষত্ব হলো শুদ্ধ স্বরের ভিতর কোমল গান্ধার এবং কোমল নিষাদের ব্যবহার। যা পুরো গানকে কাফি ভাবে আচ্ছন্ন করে শ্রোতা মনকে আন্দোলিত করেছে। অনবদ্য তালিমপ্রাপ্ত গুণী শিল্পী ছাড়া সচেতনভাবে রাগ-ভাবে নিবিষ্ট এ ধরনের গানে কণ্ঠ দেওয়া খুব একটা সহজ নয়। গুণী এন্ড্রু কিশোর ও রুনা লায়লার মধ্যে রাগ-রাগাঙ্গ জ্ঞানের সেই বোধ স্পষ্ট। স্বরলিপিসহ এন্ড্রু কিশোর গীত গানের স্থায়ী অংশটি হলো,
বেদের মেয়ে জোসনা
আমায় কথা দিয়েছে
আসি আসি বলে জোসনা
ফাঁকি দিয়েছে ॥
তুমি জোসনা হেথা
দিয়েছিলে কথা
তোমারে না দেখলে আমার
প্রাণে লাগে ব্যথা ॥
স্থায়ী
প্া প্া সা সা সা রা সা ণা সা রা জ্ঞা রা মা -া জ্ঞা -া
বে দের মে য়ে জোস না আ মায় ক থা দি য়ে ছে -০ ০ -০
পাপা মামা জ্ঞাজ্ঞা রারা মজ্ঞা রারা সা -া পা ধাধা ণাণা র্সার্সা ণাণা ধাপা ধাধা ণাণা
আসি আসি বলে জোসনা ফাঁকি দিয়ে ছে -০ তুমি জোসনা হে০ থা০ দিয়ে ছেলে ক০ থা-০
ণাণা ণাণা ধাধা পাপা মাপা মাগা মা পা
তোমারে না দেখলে আমার প্রাণে লাগে ব্য থা
গানটির স্বরলিপি খেয়াল করলে দেখা যায় কোমল গান্ধার এবং কোমল নিষাদের ব্যবহারে কাফি রাগের স্বরমালিকা। যা সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও কাফি ভাবের ভাব সঞ্চার করে।
একজন শিল্পী এন্ড্রু কিশোর
বাংলা গানের এক ঐশ্বর্যের নাম এন্ড্রু কিশোর। যার কণ্ঠের নির্যাস শ্রোতাকে কখনো করেছে পুলকিত, কখনোবা বেদনাবিধুর। আবেগের মিশ্রণে জীবনভর ছড়িয়েছেন দ্যুতি। যেকোনো গানই যেনো তার কণ্ঠের ছোঁয়ার এক আলাদা রকমের আবেদন তৈরি করতো। তার গায়কি সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ণ ধারা। সূক্ষ্ম স্বরে সমতা রেখে এতো ধীর-স্থির লয়ে গায়কির এমন শিল্পী বাংলা গানে মেলা ভার। তার গানে স্বরের যে প্রক্ষেপণ তা ধ্রুপদ শৈলীর মতোই মনে হয়। এন্ড্রু কিশোর গাওয়া গানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, গানের কোনো স্থানে সপাট তান (একসঙ্গে অনেকগুলো স্বরের দ্রুত চলা) করে যাওয়ার বিষয়টি একেবারেই নেই। বরং স্বর লাগানোর ক্ষেত্রে নিখুঁত নোট-কম্পাঙ্কের নিখুঁত প্রক্ষেপণ তার একটি অসাধারণ সাঙ্গীতিক কৌশল। জীবনের সমস্ত সাঙ্গীতিক বৈভব তিনি ঢেলে দিয়েছেন বাংলা গানের রাজ্যে। জাদুময় কণ্ঠে ধারণ করেছেন প্রায় ১৫ হাজার গান। বহুমাত্রিক গানে ঠাঁই করে নিয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কোটি ভক্তের হৃদয়ে। বাংলা চলচ্চিত্রের গানে সমৃদ্ধি আনতে তার অবদান খুব কম নয়; বরং অগ্রগণ্য। দেহের মরণ হলেও এন্ড্রু কিশোর বেঁচে থাকবেন তার গানে, নিজের কণ্ঠ গুণে; বাংলা চলচ্চিত্রে গানের আলোকবর্তিকা হয়ে।
লেখক: এ কে এম কৌশিক আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে পড়ান।
koushikrubl99@gmail.com
https://www.facebook.com/kaushikahmedru
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. আলমগীর পারভেজ; সহকারী অধ্যাপক, সঙ্গীত বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
২. এ সংশ্লিষ্ট রেকর্ড লেখকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
৩. এ সংশ্লিষ্ট রেকর্ড লেখকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
৪. https://rb.gy/lzbqxo; retrieved on: 22.11.2020
৫. https://rb.gy/lzbqxo; retrieved on: 22.11.2020
৬. https://rb.gy/6obzio; retrieved on: 22.11.2020
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন