Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ১৩ জুন ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি থেকে ঋত্বিক বিপ্লবের দুই ধারা

ইব্রাহীম খলিল

বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় সাতশো কোটি! বাড়তে বাড়তে এ সংখ্যা হয়তো একসময় হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের সংখ্যা? এটা কি বাড়ছে? নাকি কমতে কমতে শূন্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে! যদি শূন্যের দিকেই ধাবিত হয়, তাহলে আমাদের অবস্থান কোন্‌দিকে? আচ্ছা, ধরে নিলাম আমরাও মানুষ; কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক উঁচিয়ে সে দাবি করতে পারবো তো? পারলে অস্বস্তির কোনো কারণ নেই; থাকার কথাও নয়। কারণ মানসিক শান্তিই তো মূল কথা! কিন্তু যদি না পারি? সেক্ষেত্রে এই খ্যাতি, প্রতিপত্তি দিয়ে কী হবে? আর নিজেকে ‘মানুষ’ দাবি করে অন্য মানুষকে যেভাবে প্রতারণা, অত্যাচার, নির্যাতন করেছি তার হিসাবই বা নিজেকে কীভাবে দেবো? আমরা হয়তো সংসারের ক্লেদ-কালিমা, মান-অপমানবোধ হাঁসের পাখার মতো ঝেড়ে ফেলার দুরূহ কৌশল শিখেছি, ফলে এর কিছুই আমাদের আর গায়ে লাগে না। কিন্তু তার পরও আমাদের মধ্যে ‘গোটা’ জীবনটা নিয়ে একটু হিসাবনিকাশ করে দেখার তীব্র আগ্রহ কি কখনো জেগেছে? যদি না জাগে তাহলে মৃত্যুর আগে আমাদের বোধশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হয়ে গোটা জীবনের ছবি চলচ্চিত্রের মতো চোখের সামনে অবশ্যই ভেসে উঠবে। সেটা নির্বান্ধবপুরী কিংবা জনসমাগমপূর্ণ কোনো ভূস্বর্গ যেখানেই থাকি না কেনো।

মেদিনীপুরের ক্ষুদিরাম বসুর কথাই ধরুন। ১৯০৮ সালে ১৯ বছর বয়সী এ তরুণ অত্যাচারী ব্রিটিশ বিচারক কিংস্‌ফোর্ড’কে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ ‘নির্বিকার’ মুখে স্বীকার করে নেন। বিচারের একপর্যায়ে দেশের তরুণদের উদ্দেশে কিছু বলতে চাইলে সন্ত্রস্ত বিচারক বলেন, ‘ওহ, নো, নেভার। তোমাকে কিছু বলতে দেওয়া হবে না।’ ক্ষুদিরাম শুধু মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘আমি আবার আসবো।’

ক্ষুদিরাম বসুরা যুগে যুগে তাই আসেন, আসতে থাকেন। কারণ পরাধীন-নিপীড়িত-শোষিত মানুষের মধ্যে তারা যে ফিরে আসার কথা দিয়েছিলেন। অনেক সময় তাদের এই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে লেখা হয় গান, কবিতা; নির্মাণ হয় নাটক-চলচ্চিত্র। যদিও এই গান, কবিতা, নাটক কিংবা চলচ্চিত্র-নির্মাণে তাদের কিছু যায় আসে না। কারণ তারা খ্যাতি বা যশ নয়, একান্তই স্বদিচ্ছায় আগুন নিয়ে খেলেছেন; সে আগুনের উত্তাপকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এ কারণেই হয়তো মানুষ তাদেরকে জানতে চায়, বুঝতে চায়; যে কর্ম করে তার সমর্থন চায়। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া এমনই দুটি চলচ্চিত্র সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের জাতিস্মর ও কমলেশ্বর মুখার্জির মেঘে ঢাকা তারা। যেখানে কেউ ভাষা, ধর্মকে ভালোবেসে সমতার কথা বলেছেন; কেউ ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শোষণ, দুঃখ, দুর্দশা দেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমতার জন্য গলা ফাটিয়েছেন। চিত্রায়িত দুই প্রধান চরিত্র দুই মেরুর ভিন্ন সময়ের হলেও তাদের লক্ষ্য ছিলো অভিন্ন। এদের একজন প্রথম ইউরোপিয় বাংলা ভাষার কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, অন্যজন আমাদের ঋত্বিক কুমার ঘটক। লেখা জাতিস্মরমেঘে ঢাকা তারাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি অ্যান্টনি ও ঋত্বিককে ধরে এগিয়ে যাবে।

চেনা সুরে অচেনা সব পথিক

১৮ শতকের শেষের দিকে শিল্পবিপ্লব শুরু হলে সারাবিশ্বে নতুন ধরনের পরিবর্তন আসে। সে পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সমাজজীবনেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন ইংরেজদের উপনিবেশ থাকায় শিল্পবিপ্লবটা এখানে ঠিক হয়ে ওঠেনি। তবে সমাজে সেটার একটা প্রভাব পড়েছিলো। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯ শতকে কলকাতায় পাশ্চাত্য-আদর্শ প্রসারের ফলে সমাজে নবীন তরুণদের মধ্যে একধরনের জাগরণ লক্ষ করা যায়। যারা কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই সময় তারা ইয়ংবেঙ্গল বা ইয়ংক্যালকাটা নামে পরিচিতি লাভ করেন। তখন এই তরুণদের যিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তিনি হলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও নামের এক পর্তুগিজ ফিরিঙ্গি। যদিও সেসময়ে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের হৃদ্যতা খুব কমই ছিলো। কিন্তু ডিরোজিও ব্যতিক্রম ছিলেন; জাতিতে পর্তুগিজ হলেও তিনি কিন্তু জন্মেছিলেন কলকাতার ধর্মতলায়। যে কারণে হয়তো এদেশকেই তিনি মাতৃভূমি মনে করতেন।

১৯ শতকের বঙ্গদেশে মুক্তবুদ্ধির যে চর্চা আরম্ভ হয়, হিন্দু কলেজ ছিলো তার সূতিকাগৃহ। আর সেই বুদ্ধিচর্চার প্রবর্তক ও গুরু ছিলেন ডিরোজিও’ই। আপ্তবাক্য ও পুরনো মূল্যবোধকে প্রশ্ন করা; যূথবদ্ধ বিশ্বাসকে অগ্রাহ্য করে নিজের দৃষ্টিতে জগৎ ও জীবনকে দেখা; প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সংজ্ঞা অনুসারে ভালো-মন্দের বিচার না করে যুক্তি ও উদারতা দিয়ে প্রতিটি জিনিসের মূল্যায়ন করা; প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস ও আচার-আচরণকে অগ্রাহ্য করা; এমনকি ঈশ্বর আছেন কি নেই, সেটি নিয়ে ১৮৩০-এর দশকে যে বিতর্কের সূচনা হয়, তা প্রবর্তনের কৃতিত্ব মাত্র ২৩ বছর বয়সে পরপারে চলে যাওয়া এই তরুণ শিক্ষক ডিরোজিও’র।

খুব কাছ থেকে ডিরোজিও প্রত্যক্ষ করেছিলেন এখানকার দরিদ্রতাকে, দেখেছিলেন এর কষাঘাতে কীভাবে মানুষ দাসে পরিণত হয়; ধর্মান্ধতার জন্য কীভাবে মানুষ অবলীলায় নিজেকে বিকিয়ে দেয়। এটা সহ্য করতে না পেরেই হয়তো

ব্রিটিশযুগে পরাধীন ভারতবর্ষে, কোম্পানির আমলও শেষ হয়নি যখন, কিশোর-কবি ডিরোজিও তখন ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন ও গান রচনা করেছিলেন। স্বাধীন ভারতের বেদনা ও কামনা তাঁরই কাব্যে স্বতঃস্ফূত ছন্দে সর্বপ্রথম মূর্ত হয়ে উঠেছিলো।

অবশ্য ডিরোজিওর সেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিলো প্রায় একশো বছর পর। কিন্তু স্বাপ্নিক সেই স্বাধীনতার নামে ভারত ভাগকে মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। তারা মনে করতেন, এটা স্বাধীনতা নয়,স্বাধীনতার নামে নতুনভাবে শোষণ। এমন মনে করনেওয়ালাদেরই একজন ঋত্বিক কুমার ঘটক, নিজেকে যিনি, ‘... একজন মাতাল। ভাঙা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল বলতেন। আর দেশভাগ নিয়ে বলতেন, ‘ওরা আমাদের মাতৃভূমিকে ভাগ করতে পেরেছে, কিন্তু আমাদের হৃদয়কে আলাদা করতে পারবে না।’ তার সামনে পশ্চিম বাংলা, পূর্ব বাংলার প্রশ্ন আসলে কড়া ভাষায় জবাব দিতেন— ‘বাংলার আবার এপার ওপার হয় নাকি মশাই?’

ডিরোজিও, ঋত্বিকের কেউই গতানুগতিক ধারায় ভাবতে পারেননি। বাংলার মানুষের দুঃখ, হাহাকার তাদেরকে যে অস্বস্তিতে রেখেছিলো, তা-ই হয়তো তাদেরকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফলে ধর্মও তাদের কাছে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ধর্ম নিয়ে তাদের মতাদর্শ ছিলো প্রায় একই রকম। ডিরোজিও বলতেন, ‘ধর্ম বা ঈশ্বর সম্বন্ধে চূড়ান্ত সত্য কি তা আমি আজও জানি না। আমার অনুসন্ধান শেষ হয়নি এখনো।’ তিনি আরো বলতেন, ঈশ্বর যদি কেউ থাকেন তো থাকুক, যাদের অফুরন্ত অবসর আছে তারা স্বর্গলোক কোথায় তার হদিস করুন, কিন্তু ইহজীবনে মানুষই ঈশ্বর, মানুষই সর্বময় প্রভু এবং মানব চিন্তাই ঈশ্বর চিন্তার নামান্তর। অন্যদিকে স্পষ্টবাদী ঋত্বিক একই কথা বললেন অন্যভাবে, ‘দেব-দেবী আমি মানি না, ভগবান আমার পোষায় না। আমার কথা আছে, বক্তব্য আছে, তা আমাকে বলতে হবে।’ তিনি হয়তো সেটা বলেওছিলেন, মানুষের জন্যই।

কলকাতায় ডিরোজিও’র সময়কালে আমরা হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি বা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি নামে আরেক পর্তুগিজকে দেখি। যিনি কর্মসূত্রে বাবার ব্যবসা দেখার জন্য এসে এদেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার বিশেষ করে সনাতন ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। বিয়ে করেন হিন্দু বিধবাকে। তবে বাংলার এতো সবের মধ্যে তার প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিলো কবিগান। এ নিয়ে তার আগ্রহ, সাধনা পরবর্তী সময়ে এমন উচ্চ পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, পরে তিনি ‘কবিয়াল অ্যান্টনি’ বলে পরিচিতি পান। নিজে অসংখ্য গান রচনা করে হারিয়েছিলেন বিখ্যাতসব কবিয়ালকে। এছাড়া ফিরিঙ্গি হয়েও করেছেন সনাতন ধর্মের কালী’র সাধনা। এজন্য তাকে অনেক অপমান সহ্য করে লড়তে হয়েছিলো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

অ্যান্টনি ও ডিরোজিওর সমকালীন প্রসিদ্ধ বাঙালিদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় অন্যতম। যিনি সেই শম্বুকগতির যুগেই ইউরোপ-আমেরিকার ভাবুকদের সঙ্গে চিন্তার আদান-প্রদান করেছিলেন। সুদূর ইউরোপের কোন্‌ দেশে কী ঘটলো, সেকালের দুরূহ যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও সেগুলোর খবরাখবর রাখতেন তিনি এবং সে সম্পর্কে নিজের প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করতেন। তিনি কেবল নিজেই আধুনিক ছিলেন না, গোটা ভারতবর্ষকেই মধ্যযুগীয়তা থেকে আধুনিকতার আলোকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। ভারতবর্ষে পুরুষরা স্ত্রীলোককে প্রতারিত করলে, সেটা যাতে দোষের মধ্যে গণ্য করা হয়, সেজন্য সমাজকে সজাগ হতে সর্বপ্রথম রামমোহনই প্রণোদিত করেন। তার বড়ো ভাই জগমোহন মারা গেলে বৌদি অলকামঞ্জরী দেবী সহমৃতা হয়েছিলেন স্বামীর জ্বলন্ত চিতায়। ঘটনাটি বেশ দাগ কেটেছিলো রামমোহনের মনে। মন কাঁদলেও বৌদির জন্য তখন কিছু করতে পারেননি তিনি। যদিও নারীর সহমরণে কোনো পুরুষের মন কাঁদা এই প্রথম নয়। এর আগে সতীদাহ নিয়ে প্রথম কথা বলেছিলো মিশনারিরা। তবে তারা তেমন কিছুই করতে পারেনি। কারণ ততোদিনে এটা ধর্মীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রীতি হয়ে গেছে। মিশনারিরা না পারলেও রামমোহন শেষ পর্যন্ত এ রীতি মেনে নেননি। ১৮২৯ সালে ইংরেজদের সহযোগিতায় রামমোহন সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করান। যে কারণে শত শত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রোষানলে পড়তে হয়েছিলো তাকে।

সতীদাহ রদে সহায়তা নিলেও ইংরেজদের ছেড়ে কথা বলেননি রামমোহন। দেশীয়দের প্রতি ইংরেজদের উদ্ধত আচরণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদে প্রকাশ করেছিলেন সংবাদপত্র ‘মিরাৎ-উল-আখবার’। এছাড়া সনাতন ধর্মে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করে একেশ্বরবাদী ধারণা, ধর্মীয় সংস্কার ও পুনর্জাগরণের পুরোধা ছিলেন তিনি। আর এ কারণেই তাকে বলা হয়, বাংলায় পুনর্জাগরণের জনক।

পর্তুগিজ অ্যান্টনি আর বাঙালি রামমোহনের ধর্মীয় আদর্শ ভিন্ন হলেও তারা কিন্তু উভয়ই ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চেয়েছিলেন। একজন বাংলা ভাষার জন্য ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ লিখেছেন, অন্যজন সে ভাষার প্রেমে পড়ে সব ছেড়েছেন। কেউ ধর্মীয় রীতিকে শৃঙ্খলে আনতে চেয়েছেন, আবার কেউ সেটাকে উন্মুক্ত করতে চেয়েছেন। তবে সবকিছুর মূলেই ছিলো মানুষ আর মানুষের মুক্তি।

প্রতিবাদের ভাষা : ‘আগুন-পাখি’

১৯৪৩ সাল। একদিকে রাজনীতি, আরেক দিকে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা। একটু খাবার আর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মানুষ ছুটছে দিগ্‌বিদিক। এই মানুষের একজন ঋত্বিক কুমার ঘটক। ‘হিন্দু-ঋত্বিক’কে পূর্ব বাংলা ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয়েছিলো পশ্চিম বাংলায়। তাই তিনি অন্য মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদনাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন খুব কাছ থেকে। তার ভাষায়—

বাংলা ভাগটা আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি, আজও  পারি না। ইতিহাসে যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো ভীষণ মুশকিল, সেটা আমার কাজও নয়। সাংস্কৃতিক মিলনের ক্ষেত্রে যে বাঁধা, যে ছেদ, যার মধ্যে রাজনীতি-অর্থনীতি সবই এসে পড়ে, সেটাই আমাকে প্রচণ্ড ব্যথা দিয়েছিলো।

ঋত্বিক দেশভাগের সময়টাতেই মূলত গল্প-কবিতা লিখে মানুষের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সচেতনতার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানো ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার জন্য তিনি এর বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। ১৯৪৮ সালে জড়িয়ে পড়েন কলকাতার ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। গণনাট্য সংঘ ছিলো ভারতের প্রথম সুসংগঠিত নাট্য আন্দোলন, যেখানে নাটকের মাধ্যমে সামাজিক অবিচার ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করা হতো। কিন্তু নাটকও খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি ঋত্বিককে, একপর্যায়ে নাটক ছেড়ে চলচ্চিত্রে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। মেঘে ঢাকা তারায় বিক্রম যখন নীলকণ্ঠকে (ঋত্বিক) তার ক্রমাগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনি বলেন, ‘আমি সিনেমার প্রেমে পড়িনি বিক্রম দা, আমি ওটাকে যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে দেখছি। কাল যদি সিনেমার চেয়ে আরো ধারালো কোনো অস্ত্র আসে তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাবো।’

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা কখনো ভুলে যাননি ঋত্বিক। একের পর এক চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি; হতাশ হয়েছেন কিন্তু দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাননি, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এ নিয়ে ঋত্বিক বলতেন—

প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। শিল্প ফাজলামি নয়। যারা প্রতিবাদ করছে না তারা অন্যায় করছে। শিল্প দায়িত্ব। আমার অধিকার নেই সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার। শিল্পী সমাজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সে সমাজের দাস। এই দাসত্ব স্বীকার করে তবে সে ছবি করবে।১০

প্রশ্ন ওঠে, কেনো চলচ্চিত্র বানাতেন ঋত্বিক, আর সে চলচ্চিত্র কেনোই বা শুধু দেশভাগ-ক্ষুধা-দারিদ্র নিয়ে? এতসব প্রশ্নের উত্তরও তিনি দিয়েছেন—

আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো যে, ইট ইজ নট এন ইমেজিনারী স্টোরী বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হাতুড়ি মেরে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা কিন্তু এর মধ্যে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি, সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যেই আমি আপনাকে এলিয়েনেট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন ছবি দেখে বেরিয়ে এসে বাইরের সেই সামাজিক বাধা দুর্নীতি বদলানোর কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।১১

অন্যদিকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি কলকাতায় আসেন ১৭৮৬ সালের দিকে লর্ড কর্নওয়ালিসের সময়কালে; পশ্চিমবঙ্গের ফরাসডাঙ্গার চন্দননগরে; উদ্দেশ্য বাবার লবণের ব্যবসা দেখাশোনা করা।১২ পরিবারের চাপ কিংবা নিজের প্রয়োজনে সে ব্যবসা হয়তো কিছুদিন করেছিলেন, তবে ধরে রাখতে পারেননি। কারণ ব্যবসার বদলে তার মন আকৃষ্ট হয়েছিলো বাংলার কবিগানের প্রতি। যখন যেখানে কবিগান, কবিয়ালের কথা শুনেছেন, ছুটে গিয়েছেন মুহূর্তের মধ্যে।


এরপর কবিগানের জন্য ব্রাহ্মণ গুরুর কাছে বাংলা ও সংস্কৃত শিখে আত্মস্থ করে ভাষাগত সঙ্কট দূর করতে থাকেন। ভাষা, ধর্ম, গানের বিষয় জানার পর, সে ভাষা গান হয়ে উঠছে কীভাবে সেটা জানার জন্য অ্যান্টনি বাংলার লোকগীতি শোনা শুরু করেন। প্রথম দিকে তাৎক্ষণিক গান লিখতে পারতেন না অ্যান্টনি, এ দায়িত্ব ছিলো তার দলের একজনের ওপর। হঠাৎই দল ছেড়ে চলে যায় ছেলেটি, বিপদে পড়ে যান অ্যান্টনি। পরে নিজেই গান রচনা শুরু করেন। আস্তে আস্তে ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের মর্মভেদ উদ্‌ঘাটন করে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি হয়ে ওঠেন কবিয়াল অ্যান্টনি। একে একে ফিরিঙ্গি কবিয়াল পরাজিত করেন বাংলার বিখ্যাতসব কবি যজ্ঞেশ্বরী, ঠাকুর সিংহ, ভোলা ময়রা ও রাম বসুদের।

অ্যান্টনির জন্য ‘স্ট্রাকচার অব ফিলিং’ বা ‘অনুভব কাঠামো’ ভেঙে বাংলার কবিয়াল হয়ে ওঠা এতো সহজ ছিলো না। ‘অনুভব কাঠামো’ নিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক রেমন্ডস উইলিয়ামস বলতেন—

বাইরে থেকে এসে যদি কোন ব্যক্তি গভীর পর্যবেক্ষণের পর কোন জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ সম্পর্কে বর্ণনা দেন কিংবা দীর্ঘদিন কোন জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে তাদের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়েও যান তবু সেই বর্ণনায় কিংবা আচার-আচরণের অভ্যস্ততার মধ্যে কোথায় যেন একটু ফারাক, একটু পার্থক্য থেকেই যায়। ... এই যে পার্থক্য, এটিই নির্দেশ করে ঐ জনগোষ্ঠীর অনুভব-কাঠামোর সাথে তার পার্থক্য।১৩

তার পরও রেমন্ডস-এর কথাকে দ্বিধায় ফেলে, অনুভব কাঠামো ভেঙে বাংলার কবিয়াল হয়ে উঠেছিলেন অ্যান্টনি। একজন মানুষের কোন্‌ পর্যায়ের ত্যাগ-ধৈর্য থাকলে সব কাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়া যায়, সেটা অ্যান্টনি দেখিয়েছেন। বুঝিয়েছেন কোনো ধারণাই সবার জন্য সঠিক বা চিরসত্য নয়।

শুধু কবিগান নয়, অ্যান্টনি যুক্ত হয়েছিলেন সনাতন ধর্মের সঙ্গে। জাতিস্মর-এ অ্যান্টনি যখন দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তখন কবিয়ালদের মতো হিন্দুরাও তাকে এ নিয়ে ভালো চোখে দেখেননি। বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী চড়াও হয়েছিলো তার ওপর। অ্যান্টনি ঠাণ্ডা মাথায় তার উত্তর করেছিলেন।

গ্রামবাসী : ... এ পূজা হবে না। ... দাঁড়কাক ময়ূরের পালক লাগালেই সে ময়ূর হয়ে যায় না। আর দাঁড়-কবি চারটি খেউর গাইলে সে বাঙালি হয়ে যায় না। আর দুর্গাপুজো? সে তো আমাদের বাঙালিদের উৎসব।

অ্যান্টনি : শোনেন ভাই সকল। কে বাঙালি আর কে বাঙালি নয়, তার বিচার করবেন দেবী মহামায়া। আমি তার ক্ষুদ্র ভক্ত মাত্র। আমার ধর্ম তার বন্দনা। আমি তা করবোই। আপনারা যথেচ্ছাচার করতে পারেন। আমার তাতে বিন্দুমাত্র কোনো আপত্তি নেই।

অ্যান্টনি শেষ পর্যন্ত তার দেওয়া কথা রেখেছিলেন। কিন্তু এর জন্য তাকে অনেক কিছু হারাতে হয়েছিলো। গ্রামবাসী তার বাড়িতে আগুন দিয়ে স্ত্রী সৌদামিনী ও দেবী দুর্গার মূর্তি পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু তারা অ্যান্টনির বাঙালি হওয়ার সাধ, কবিয়াল হওয়ার সাধনা এবং দেবী দুর্গার ভক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোড়াতে পারেনি। শেষ জীবনে কলকাতায় কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করে নিজেই দেবীর সেবক হয়ে উঠেছিলেন অ্যান্টনি। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যা ছিলো তার নীরব প্রতিবাদ।

কী সন্ধানে যায় সেখানে

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ যখন আশ্রয়ের সন্ধানে নীড়হারা পাখির মতো ছুটছে, তখন ৪৭-এর দেশহারা ঋত্বিক সমব্যথী হয়ে ওঠেন। মেঘে ঢাকা তারায় জন্মস্থান পূর্ব বাংলার প্রতি ঋত্বিকের ভালোবাসা প্রকাশ পায়, নীলকণ্ঠ যখন বঙ্গবালাকে বলেন, ‘আবার ৭১? আবার মিছিল? তুমি কে মা? তুমি কি আবার বাসা হারিয়ে, দেশ হারিয়ে এসেছো? আমার বাংলাদেশের আত্মা?’ এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ বঙ্গবালারা যখন জীবন বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো, তখন ঋত্বিক কেমন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে রোদ-গরমে জ্বলন্ত ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পূর্ব বাংলার শরণার্থীদের জন্য ভিক্ষা করেছেন।

কারণ এ মানুষদের দেখলে তার ‘৪৭ সালের কষ্ট জেগে উঠতো, নিজের কথা, পরিবারের কথা মনে পড়তো। প্রয়োজন পড়তো আবারও এ মানুষদের কষ্ট সেলুলয়েডে তুলে ধরার, রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার। ঋত্বিকের ভাষায়—

মানুষের অবক্ষয় আমাকে আকর্ষণ করে। তার কারণ এর মধ্য দিয়ে আমি দেখি জীবনের গতিকে,স্বাস্থ্যকে আমি বিশ্বাস করি জীবনের প্রবাহমানতায়। আমার ছবির চরিত্ররা চিৎকার করে বলে আমাকে বাঁচতে দাও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে বাঁচতে চায়- এ তো মৃত্যু নয়, জীবনেরই জয় ঘোষণা।১৪

ঋত্বিকের ব্যক্তিগত জীবন হয়তো অভাব-অনটন, ঝড়-ঝঞ্ঝায় পরিপূর্ণ ছিলো, কিন্তু তিনি নিজের দর্শনের সঙ্গে আমৃত্যু কোনো আপস  করেননি। সারাজীবন কাজ করেছেন মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবন, প্রান্তিক জীবনের প্রেম-ভালোবাসা, শরণার্থী জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা, যুবসমাজের বেকারত্ব নিয়ে। তার এ কাজের স্বীকৃতি সীমিত হলেও তিনি তার সৃষ্টির তাড়না থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। এক সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক বলেছিলেন,

আমি আজও  মরে যাইনি। আমি আজও  হার স্বীকার করিনি। আমি নীরবে সে সুযোগের অপেক্ষায় আছি। আজ না পারি কাল, কাল না পারি পরশু প্রমাণ করে দেব। আজ আমি সংগ্রামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখি। তাদের আমি ভুলে যাইনি। অভাব অনটন, অপবাদ কিছুই আমাকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না তার জন্য যে মূল্যই দিতে হয় আমি প্রস্তুত।১৫

বিষয়টি মেঘে ঢাকা তারায় স্ত্রী দুর্গার সঙ্গে নীলকণ্ঠের কথোপকথনে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

দুর্গা : আর কতোদিন তুমি বাস্তুহারা শরণার্থী সমস্যা নিয়ে কাজ করবে বলো তো?

নীলকণ্ঠ : একশো বার করবো, কারণ এই শব্দগুলোই আমি বিশ্বাস করি না। মানুষের গায়ে লেবেল মারাটা বন্ধ করো তো।

দুর্গা : কিন্তু কেউ তো দেখলো না সেসব।

নীলকণ্ঠ : তাতে এটা প্রমাণ হয় না যে, দুনিয়ায় দুঃখকষ্ট নেই।

দুর্গা : আর চলবে কী করে আমাদের? ধার-দেনা করে, চাঁদা তুলে ছবিটা করলে, রিলিজ করতে পারলে না। কেউ ছবি করছে না তোমার আশেপাশে? ... তুমি ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছো, সংসারে একটা টাকা নেই।

নীলকণ্ঠ : দুনিয়ায় টাকা থাকবে না দুগ্গা, কাজগুলো থেকে যাবে, দেখে নিও।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আজও  অবাক হতে হয়। দিনের পর দিন চরমভাবে নিগৃহীত হয়ে, ভয়ঙ্কর রকমের অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও, নিজের কাজের প্রতি কী পরিমাণ আত্মবিশ্বাস থাকলে একজন মানুষ এমন কথা বলতে পারেন। আসলে এটাই ঋত্বিকের বিপ্লব, ঋত্বিকীয় বিপ্লব। যিনি সবকিছুর বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে নিজের আদর্শে শোষিতদের জন্য দৃঢ় কণ্ঠে কথা বলেছেন। লেনিন, মাও সেতুং কিংবা চে গুয়েভারা যাদের কথাই বলি না কেনো, তারাও শোষণের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। কিন্তু লেনিন-মাও’রা যে রকম রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তনে কাজ করেছেন, তেমনটা ঋত্বিক করেননি। তিনি জোর দিয়েছিলেন ব্যক্তির ওপর; দায়িত্বের ওপর। তাই সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, তার বিশাল অংশই হয়তো ‘সুশীল সমাজ’-এর প্রচারণার আধিক্যে কেউ বুঝতেই পারেনি। এমনকি স্ত্রী দুর্গাও না। তাই হয়তো তিনি বার বার ঋত্বিকের কাছে পেটে খাবার নেই, টাকা নেই তার পরও কেনো চলচ্চিত্র বানান—সেটা জানতে চেয়েছেন।

আসলে ঋত্বিকের কাছে পেটে খাবার থাকা বা না থাকার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না! গুরুত্বপূর্ণ ছিলো বিপ্লবী হিসেবে তিনি যে জায়গাটা চিন্তা করছেন, সবাইকে সেখানে নিয়ে যেতে পারছেন কি না। হয়তো শেষ পর্যন্ত তিনি সেটা পারেননি; তবে এটা তার ব্যর্থতা নয়। হয়তো সেসময়ে তার চেয়ে ভিন্ন মতগুলো বেশি শক্তিশালী ছিলো। তবে এতো কিছুর পরও ঋত্বিক হাল ছাড়েননি; টিকে ছিলেন। আর এখানেই ব্যক্তি হিসেবে তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। ঋত্বিক নিজের কাজের প্রতি এতটাই বিশ্বস্ত ছিলেন যে, তিনি কাজ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। চারপাশের মানুষগুলোর সঙ্গে কেনো জানি তার মিলছিলো না। মেঘে ঢাকা তারায় নীলকণ্ঠকে উদ্দেশ্য করে তাই বিক্রমকে বলতে শোনা যায়, ‘সবাইকে চটিয়ে ফেলছিসরে ভবা, কি বন্ধুবান্ধব, কি প্রোডিউসর, কি সরকারি দপ্তর, কি খবরের কাগজের অফিস।’

আসলে ঋত্বিকের যে সময়ের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা—তাতে কি তার পক্ষে আপস করা সম্ভব ছিলো? আর তিনি যদি আপস করেই ফেলতেন তাহলে কি তার নিজের সত্তা বলে কিছু থাকতো? এ জন্যেই হয়তো উত্তরে নীলকণ্ঠের সেই সাহসী, আত্মবিশ্বাসী জবাব, ‘ ... আমি আর আমার কলমটা যে এক।’ তার মানে ঋত্বিক যা বলেছেন, তা-ই করে দেখিয়েছেন। তার ভাষায় তিনি সমাজের অসুখটা ধরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আর সেই অসুখটার নাম অভাব। যে অভাবের মূলে ছিলো কিছু মানুষের শাসন—রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব; আর সবশেষে দেশভাগ। যেটা আরেকটি শোষণ প্রক্রিয়ায় মানুষকে প্রবেশ করতে বাধ্য করেছিলো। এই শোষণ আর অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণেই তখন মানুষের জীবন দিন দিন নিঃশেষ হয়ে আসছিলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো বোমার আঘাত ছাড়াই ইংরেজদের সৃষ্ট খাদ্য সঙ্কটের কারণে প্রায় দুই লক্ষ মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছিলো। যাদের ক্ষুধার কষ্ট, কান্না কেউ না শুনলেও ঋত্বিক শুনেছিলেন। সে জন্যই তার নাটকের চরিত্ররা চিৎকার করে বলে উঠে, ‘কেউ কি আছো, যে আমার কান্না শুনতে পায়?’ প্রশ্ন ওঠে, অন্যরা সে কান্না না শুনলেও ঋত্বিক কেনো শুনতে পেলেন? আর শুনতে পেলেন ভালো কথা, অন্যরা ঋত্বিককে না বুঝে ছেড়ে চলে গেলেন কেনো? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরও মেঘে ঢাকা তারায় ডাক্তার আর নীলকণ্ঠের কথোপকথনে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে যায়—

ডাক্তার : আপনি (সে কান্না) বুঝতে পেরেছিলেন, তাইতো?

নীলকণ্ঠ : হ্যাঁ পেরেছিলাম, পেরেছিলাম। কারণ আমি একজন পিপলস্‌ আর্টিস্ট আর ওটাই আমার কাজ। বাকি সব তো শালা শুয়োরের বাচ্চা। হয় মিডিওকার, নইলে সি আই এ’র এজেন্ট হয়ে গেলো। ...

ডাক্তার : আপনার পার্টি তাহলে আপনার বিরোধিতা করলো কেনো? ... আপনি পি টি জি (গণনাট্য) ছাড়লেন, কেনো? আপনার আশেপাশে আজকে কেউ নেই, আপনার বন্ধুবান্ধব কেউ না, কেনো?

নীলকণ্ঠ : কারণ কেউ কেউ নাম, ধাম, গাড়ি, গয়না দেখলো। কেউ হতাশ হয়ে চোখ বুজলো, আর কেউ কেউ লড়তে লড়তে মরেই গেলো।

তবে এর কোনোটাই কিন্তু পর্তুগিজ ডিরোজিও কিংবা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি করেননি। তারাও অনেকটা ঋত্বিকের মতো নিজের মতো করে লড়াই করেছেন। ১৮ শতকে ইয়ংবেঙ্গলরা কলকাতায় যখন সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে যুক্তি ও জ্ঞানবিজ্ঞানের হাতুড়ি দিয়ে প্রথাবদ্ধতা, রক্ষণশীলতা, মনগড়া দেবদেবী ও অন্ধ আচারের দুর্গকে চূর্ণবিচূর্ণ করেছেন, তখন এর জন্য ডিরোজিও’দের অনেক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে; কিন্তু তারা মূল লক্ষ্য থেকে এতটুকু পিছপা হননি। অন্যদিকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিও তার সর্বস্ব দিয়ে কবিগানের জন্য লড়াই করেছেন। পাশাপাশি খেউর (দেবদেবীর ভজন, সাধন নিয়ে গান) গেয়ে ধর্মভীরুদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন, যদিও বিষয়টি তার জন্য সহজসাধ্য ছিলো না।

অ্যান্টনির এই ক্রমবর্ধমান সাফল্যকে তৎকালীন কবিয়ালরা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। তাই গানের লড়াইয়ে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়। অ্যান্টনি তার উপযুক্ত জবাবও দেন। জাতিস্মর-এ অ্যান্টনি প্রথমে কবি রাম বসুর সঙ্গে দেবীর বন্দনা গেয়ে জেতার পর তৎকালীন বিখ্যাত কবিয়াল ঠাকুর সিংহ অ্যান্টনিকে যখন প্রশ্ন করেন—পর্তুগিজ হয়েও কেনো তার দেশের কুর্দি, টুপি, বুট জুতা ছেড়ে তিনি এদেশের সাধারণ পোশাক পরছেন? অ্যান্টনি অনেকটা কৌতুকের মতো করে গানে গানে জবাব দেন—

                             এই বাংলায় বাঙালির বেশে আনন্দেতে আছি,

                             হই ঠাকরে সিংহের বাপের জামাই কুর্দি, টুপি ছেড়েছি।

                             শ্বশুরবাড়ি বাপের বাড়ি একই পোশাক একই বেশ,

                             এই দেশেরই ছেলে আমি, ফিরিঙ্গিরও বাংলাদেশ।

অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিরা পর্তুগাল থেকে এদেশে এসেছিলেন ব্যবসার নামে এদেশের মানুষকে শোষণ করতে। যাদের চিন্তাধারা কখনো এদেশের মানুষের সঙ্গে মেলানো সম্ভব ছিলো না। তবে অ্যান্টনি সেটা মিলিয়েছিলেন। তিনি এই দেশটাকে উপনিবেশ না ভেবে নিজের দেশ হিসেবে ভেবেছেন। শুধু তা-ই নয়, এদেশের ধর্মীয় গোঁড়ামিতেও তিনি আঘাত করেছেন। জাতিস্মর-এ দেখা যায়, তিনি তার গানে মানুষের সাম্যের কথা বলছেন, ধর্মের ভেদাভেদহীনতার কথা বলছেন—

                             খ্রিস্টে আর কৃষ্টে কিছু তফাৎ নাইরে ভাই,

                             শুধু নামের ভীড়ে মানুষ ফিরে কেউ কথা শুনি নাই

                             আমার খোদা যে হিন্দুর হরি সে,

                             ওই দেখো শ্যাম দাঁড়িয়ে আছে,

                             আমার মানব জনম সফল হবে যদি রাঙা চরণ পাই।

আসলে এটাই অ্যান্টনির বিপ্লব, ডিরোজিওর বিপ্লব। মহাত্মা গান্ধীর মতো ডিরোজিওর অনুসারীরা কখনো কখনো পরিস্থিতির কারণে সহিংস হয়ে উঠলেও অ্যান্টনি তার কোনোটাই গ্রহণ করেননি। তিনি হিংসার বিরুদ্ধে কথা, যুক্তি ও সাম্যের বাণী দিয়ে লড়াই করেছেন। অবশেষে কালী সাধনায় সমর্পণ করেছেন নিজের জীবনকে। কিন্তু কী ছিলো এই কবিগান কিংবা কালী সাধনায়, যার কারণে নিজের দেশ, জাতি ছেড়ে ভিন্ন জাতিকে বেছে নিলেন? আর কেনোই বা সহ্য করলেন বাঙালিদের এতো অত্যাচার? এর কোনো উত্তরই হয়তো যুক্তি কিংবা তর্কের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ আবেগ কখনো যুক্তিকে মানে না। এর পিছনে রয়েছে কোনো জিনিসের প্রতি ভালোবাসা, লক্ষ্য পূরণে একাগ্রতা। হয়তো সবার উপরে মানুষের জয়গান।

বিপ্লবে আগে ব্যক্তি নাকি কর্ম

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ যখন উপমহাদেশে এক বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তখন তা নিয়ে অনেক সাহিত্য, কবিতা, নাটক তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু ৪৭ সালের দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এদেশের গোটা সমাজব্যবস্থাকে উল্টে দিলেও অধিকাংশ সাহিত্যিকদের মর্মেই সেটা এতটুকু নাড়া দেয়নি। কেনো দেয়নি সেটা কাকতালীয়। তবে সর্বস্বান্ত এ মানুষের বেদনা, হতাশা,স্বপ্ন নিয়ে ঋত্বিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। তার অধিকাংশ চলচ্চিত্রের মূল বিষয়ই ছিলো দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

ব্যক্তিগত জীবনে অযান্ত্রিক নির্মাণের সময় ঋত্বিক অল্প অল্প মদ্যপান শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রগুলোর বাণিজ্যিক ব্যর্থতার কারণে বাড়তে থাকে হতাশা, মদ্যপানের মাত্রা। এমনকি একসময় গোসল করাও ছেড়ে দিলেন ঋত্বিক; কারণে-অকারণে গালমন্দ করতেন। একপর্যায়ে তার এমন জীবনযাত্রার ফলে অতিষ্ঠ হয়ে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন স্ত্রী দুর্গা। পরে ঋত্বিকের ক্রমাগত অসুস্থতা আর অতিরিক্ত মদ্যপানে শরীর ভেঙে পড়ে। এজন্য মেঘে ঢাকা তারার নীলকণ্ঠকে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মদ্যপান করে ফুটপাথে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে; পাগল মনে করে মানুষ তাকে অবহেলাও করে। প্রশ্ন ওঠে বিপ্লবী, মেধাবী এ মানুষটির এতো মদ্যপান, এতো অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন কেনো?

আসলে দেশভাগের পরও যখন ঋত্বিক দেখলেন মানুষের শোষণ কিংবা চিন্তার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না; তখন সেটা তাকে ভাবিয়েছে। তিনি চলচ্চিত্রে যা দেখাতে চেয়েছেন, অন্যরা সেটাকে অবহেলায় বার বার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মেঘে ঢাকা তারায় যেমনটি দেখানো হয় :

নীলকণ্ঠ : দেখলে? (প্রেক্ষাগৃহে সদ্য শেষ হওয়া শো)

জনৈক চলচ্চিত্রনির্মাতা ১ : দেখলাম। তুমি তো ভাই কলোনি, দর্মাবাড়ি আর টিনের চালের উপরে উঠতেই পারছো না।

নীলকণ্ঠ : (জনৈক চলচ্চিত্রনির্মাতা ২-কে লক্ষ্য করে) তোমারও কি তা-ই মনে হয়?

জনৈক চলচ্চিত্রনির্মাতা ২ : শিল্পে সংযমের দিকটা না খুবই জরুরি। তোমার এই সংলাপগুলো একটু বাড়তি বলে মনে হচ্ছে না? টু মেনি মোমেন্টস্‌, টু মেনি র ইন্সিডেন্টস্‌। ...

নির্মাতা ১ : আসলে তুমি নাটকের বাইরে বেরোতে পারছো না, নীলকণ্ঠ। গল্পের পদে পদে কো-ইন্সিডেন্স।

নীলকণ্ঠ : আর ন্যারেটিভটা?

নির্মাতা ১ : হচ্ছে না, হচ্ছে না।

নির্মাতা ২ : খুবই অমসৃণ ভাই, বার বার ধাক্কা খায়, এলোপাতাড়ি ভুলভাল ফ্রেম, এডিট জার্কস। নীলকণ্ঠ, কী হচ্ছে?

হয়তো তাদের এমন মন্তব্যে ঋত্বিক ক্ষণিকের জন্য ব্যথিত হয়েছেন, কিন্তু দমে যাননি। মেঘে ঢাকা তারায় নীলকণ্ঠ যখন বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি থেকে মন খারাপ করে তার চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পী মিনুর বাড়িতে যান; নীলকণ্ঠের বিমর্ষভাব দেখে মিনু বলেন— ‘আচ্ছা, তোমার খুব মন খারাপ হয়েছে না? এতো করে ছবিটা বানালে, আমরা সবাই কাজ করলাম; কিন্তু মানুষ দেখলো না।’ নীলকণ্ঠ উত্তরে বলেন, ‘এ সময় রবীঠাকুরের কথা ভাববি; মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ, বুঝলি? শালা ছবি আমি আবার বানাবো।’ বিপ্লবের জন্য ঋত্বিক আরো এগিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে অবিরাম কথা বলেছেন। মেঘে ঢাকা তারায় নীলকণ্ঠ বলেন, ‘রাষ্ট্র থাকলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা থাকবেই। দেশের মানুষের পিঠে ছুরি মেরে স্বাধীনতা তখনো মানিনি, এখনো মানি না।’ তাই সিসিফাসের মতো তাকে শাস্তি দেওয়া হয় ইলেক্ট্রিক শক্‌ দেওয়ার মাধ্যমে; যাতে তার শক্তির ক্ষয় হয়; যাতে তার তেজে বাকিরা পুড়ে না যায়। কিন্তু তার পরও কি ঋত্বিককে থামিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে? জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি কি বঞ্চিত, শোষিত মানুষের সমর্থনে হাল ছেড়েছেন?

এই হার না মানা ঋত্বিক তবু স্বপ্ন দেখেন, দেখান এক নতুন আরম্ভের। মেঘে ঢাকা তারায় দিনের পর দিন যখন নীলকণ্ঠকে হাসপাতালে আটকে রাখা হয়, তখন তিনি ডাক্তারকে বলেন, ‘আমার রোগটা ধরতে পারলে ডাক্তার?’ ডাক্তারের জবাব, ‘নাহ্‌, আপনি জীবনের কথা বলেন, সেখানে আলো। অথচ নিজের ব্যক্তিজীবনের প্রতি আপনি উদাসীন, সেখানে অন্ধকার।’ আসলে জীবন কি কখনো আলো আর আঁধারের হিসাব করে চলে? আর যে আলোকময় জীবনের কথা চিকিৎসক বলেন, সেটা কোন্‌ আলো? মদ্যপান ছেড়ে চারপাশের মানুষগুলোর দুঃখদুর্দশার কথা ভুলে নিজের মতো করে সুখে থাকার আপ্রাণ প্রচেষ্টার নামই কি আলোর মধ্যে জীবন যাপন? কিন্তু ডাক্তারের গতানুগতিক চিন্তার সে ‘আলো’ ঋত্বিক কখনোই চাননি। তিনিও আলোর ভিতর জীবন যাপন করতে চেয়েছিলেন, তবে তার স্বাপ্নিক সে ‘আলো’র জীবন অন্যের কাছে বরাবরই ছিলো অন্ধকার। ‘স্বার্থপর’-এর মতো তিনিও হয়তো কিছু না দেখে চোখ বুজে পরম সুখে সংসার করতে পারতেন, কিন্তু সেটা ঋত্বিকের কাছে কখনোই আলোর জীবন ছিলো না। যদি তা-ই হয়, তাহলে ডাক্তার আর ঋত্বিকের মধ্যে পার্থক্যের জায়গাটা কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের কাছে স্পষ্ট, কিন্তু অনুধাবনযোগ্য নয়!

অন্যদিকে অ্যান্টনি সমাজের চেয়ে নিজেকে বদলানোয় গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নিজেকে সন্ধান করেছেন বাঙালি, বাঙালির ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচরণের মধ্যে। পর্তুগিজ ধ্যানধারণা, উচ্চাশা ত্যাগ করে এসেছেন সাধারণ মানুষের কাতারে। অ্যান্টনি যেটা বলেছেন, সেটা পূরণে শত বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করেছেন। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ছাড়াও কীভাবে ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করা যায়, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হওয়া যায়। দিনের পর দিন অ্যান্টনিকে জাত তুলে গালি দেওয়া হলেও তিনি মানুষের সমতার অধিকার থেকে কখনো পিছিয়ে আসেননি। এর বিপরীতে তিনি শুধু অবজ্ঞা আর অবহেলাই পেয়েছেন। যার প্রমাণ এখনো কলকাতার রাস্তায় গেলে পাওয়া যায়। জাতিস্মর-এ রোহিত যখন পথচারীদের কাছে অ্যান্টনি সম্পর্কে জানার জন্য কথা বলছিলেন, তখন সাধারণ মানুষের মন্তব্য অনেকটা এ রকম—

১ম পথচারী : অ্যান্টনি? কোনো ফরাসি সাহেব হয়তো হতে পারে?

২য় পথচারী : নাহ্‌, চিনি না তো।

৩য় পথচারী : বাংলা বইয়ে (চলচ্চিত্রে) উত্তমকুমার, আর হিন্দি সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন অভিনয় করেছিলো।

৪র্থ পথচারী : সিরিয়ালের কোনো নায়ক হয়তো হবে।

৫ম পথচারী : ওই নামে বনেদি কোনো বাড়িতে খোঁজ নিন, পেয়ে যাবেন।

৬ষ্ঠ পথচারী : ভাই আমরা সাধারণ লোক, সকাল বেলা হলে আমরা কী খাবো সেটা নিয়েই চিন্তা করি, কোনো অ্যান্টনিকে চিনি না।

৭ম পথচারী : ওসব সমোজগায়া, লেকিন অ্যান্টনি কোন্‌ হে?

একবিংশ শতাব্দীতে এসে কেউ ১৮ শতকের অ্যান্টনিকে মনে রাখলো কি না সেটা হয়তো বড়ো প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, যাদের চোখের সামনে ‘ফিরিঙ্গি কালী মন্দির’ আজও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, সে ফিরিঙ্গিকে তারা কেউই চেনেন না। যেমনটা চেনেননি অ্যান্টনির সময়কার কবিয়াল কিংবা বাঙালিরাও।

ব্যক্তিগত জীবনে অ্যান্টনি ও ঋত্বিক সমজাতি না হলেও কর্মের দিক থেকে সমগোত্রীয়। যতোদিন তারা বেঁচে ছিলেন সজারুর কাঁটার মতো নিজেদের মেরুদণ্ড সোজা করে রেখেছিলেন। হয়তো সে কারণেই বিভিন্ন সময়ে বিপদে পড়েছেন, হতাশায় ভুগেছেন। কিন্তু নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে এতটুকু পিছপা হননি। স্ত্রীর প্রতি তাদের দুই জনের আচরণও ছিলো অভিন্ন। জাতিস্মরমেঘে ঢাকা তারায় দেখা যায়—স্ত্রীকে তারা নারী নয়, সবসময় ভেবেছেন সহযাত্রী হিসেবে। তাইতো শত বিপদেও তাদের ওপর ভরসা করেছেন, আস্থা রেখেছেন। বিপ্লবী হিসেবে কেউ নারী কিংবা পুরুষের কোনো ভেদাভেদ করেননি। যদি প্রশ্ন তোলা হয়, বিপ্লবে ব্যক্তিক দোষ-ত্রুটির চেয়ে বিপ্লবী হিসেবে ঋত্বিক কতোটুকু সার্থক, যিনি কথায় কথায় মানুষকে গালি দিয়েছেন, মদ্যপান করেছেন? তাহলে সেটার প্রশ্নোত্তর হয়তো চলতেই থাকবে। কিন্তু ঠিক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

হয়তো অনেকেই মনে করেন, ঋত্বিক ব্যক্তিগত জীবনে যেভাবে মানুষকে গালি দিতেন কিংবা মদ্যপান করে অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতেন, সেটা একজন বিপ্লবীর বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। কিন্তু ঋত্বিক যেভাবে সমাজের মানুষের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন, বিপ্লবী চিন্তার লড়াইয়ে বার বার পরাজিত হয়েছেন এবং যেভাবে এক এক করে স্বপ্নগুলো চোখের সামনে পুড়তে দেখেছেন; তাতে কি এটা তার জন্য অস্বাভাবিক ছিলো? একটি শব্দ তখনই গালি কিংবা অশ্লীল হয়, যখন সেটা মানুষের মর্যাদাহানি করে। কিন্তু যে ব্যক্তিক দোষ-ত্রুটি সাধারণ মানুষের আন্দোলন-সংগ্রামকে বিপথগামী না করে প্রতিনিয়ত সুবিধাবাদী, সংশোধনবাদীদের আক্রমণ করে; সেটা মেনে নেওয়ার একটি অবস্থা আমাদের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। যদি তা-ই হয়, তাহলে ঋত্বিকের এতো এতো অর্জন আমরা কেনো দেখি না? কেনো শুধু তার গালি দেওয়া দেখি?

মেঘে ঢাকা তারায় ঋত্বিক চোখের সামনে পুরো সমাজের একচ্ছত্র আধিপত্য স্বার্থলোভী কিছু মানুষকে গ্রহণ করতে দেখেছেন। সাধারণ মানুষকে শোষিত, বঞ্চিত ও ধর্ষিত হতে দেখেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখেননি। বরং সর্বদা রাষ্ট্র ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে মরিয়া; মানসিক হাসপাতালে আহত এক কমিউনিস্ট আশ্রয় নিলে, রাষ্ট্র তাকে খুঁজতে হন্যে হয়ে ওঠে। পুলিশ যখন হাসপাতালে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’কে খুঁজে না পেয়ে বার বার তার সন্ধান চালায়, তখন ঋত্বিক তার প্রতিবাদ করেন। পুলিশ রেগে গেলে ঋত্বিক তাকে ‘বানচোত’ বলে গালি দেন। এখন প্রশ্ন, ঋত্বিক যে পরিস্থিতিতে ‘রাষ্ট্র’, স্বার্থবাদী ও লোলুপশ্রেণিকে গালি দিয়েছেন, সেটার জন্য কি আসলেই ঋত্বিক ‘দোষী’?

ওরে অভিমানী, এমন করে বিদায় নিবি

জাতিস্মর-এ মায়া তার মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আচ্ছা মা, তুমি কবে বুঝতে পেরেছিলে যে বাবার ব্যাপারটা (মানে ভালোবাসাটা) আসল? ইটস নট অ্যা ইনফ্যাচুয়েশন, পাসিং ফেস, ইটস দ্য রিয়েল থিঙ্‌; সত্যিকারের ভালোবাসা ইত্যাদি।’ মা’র উত্তর ছিলো, ‘কেওড়াতলা (শ্মশান) থেকে ফেরার পথে।’ আসলে আমরা যখন কাউকে হারিয়ে ফেলি তখন মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে তিনি কেমন ছিলেন, সেটা অনুভব করি। আজ, যেমনটা ঋত্বিক কিংবা অ্যান্টনিকে করছি। হতে পারে সেটা কারো চলচ্চিত্র দেখে, কারো কবিগান কিংবা কালী মন্দির দেখে। কিন্তু তারা কেনো বিপ্লবী ছিলেন, জীবনের চেয়ে কর্মের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন; সেটা কি আদৌ বুঝতে পারি?

অনেকেই যে বোঝেননি সেটা নয়। ১৯৫৯ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে ঋত্বিকের অযান্ত্রিক দেখে বিখ্যাত সমালোচক জর্জেস সাডৌল বলেছিলেন, ‘অযান্ত্রিক কথাটির অর্থ কী? আমার জানা নেই এবং আমার বিশ্বাস ভেনিস ফেস্টিভালের কারোরই এটা জানা ছিলো না। আমি পুরো গল্পটাও বলতে পারব না, কারণ সেখানে কোন সাবটাইটেল ছিলো না। কিন্তু এতদস্বত্ত্বেও আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দেখেছিলাম।’১৬

আসলে ঋত্বিক ও অ্যান্টনি স্বপ্ন দেখতেন, দেখাতেন চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মধ্যেও কীভাবে ‘সুন্দর’ সমাজের বীজ রোপণ করা যায়, যেখানে শ্রেণি বিভাজন, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদী লালসা থাকবে না; হারিয়ে যাবে প্রথম কিংবা তৃতীয় বিশ্বের ধারণা। নিঃশেষ হয়ে আসবে মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও যন্ত্রণা। অ্যান্টনি ও ঋত্বিক যা ভাবতেন সেটা জাতিস্মরমেঘে ঢাকা তারায় পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। মেঘে ঢাকা তারার চিত্রায়িত দৃশ্য সাদা-কালো না হলে সময়কে ধরার যে আবেদন সেটা হয়তো অপূর্ণই থেকে যেতো। চলচ্চিত্রের শুরুতে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীনের ‘উত্থালি পাত্থালি’ গানটি ছিলো মনে দাগ কাটার মতো। অন্যদিকে জাতিস্মর-এ কুশল হাজরার পূর্বজন্মের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের স্মৃতির বর্ণনায় প্রথমে গোলমেলে মনে হলেও শেষ পর্যন্ত ঘোরের মধ্যে রাখে অনেকক্ষণ। চলচ্চিত্র দুটি শুধু সঙ্গীতপিপাসু দর্শকের অসম্ভব চমৎকার কিছু গানের জন্য নয়, এক অনন্তবিস্তারী বিরহগাথার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে জাতিস্মরমেঘে ঢাকা তারায় গল্প বলার ক্ষেত্রে আদি, মধ্য ও অন্তের যে ধারাবাহিকতা সেটা ভেঙে ফেলে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জাতিস্মর-এ অতি বাঙালিপনা দেখাতে গিয়ে মায়াকে পাশ্চাত্য ঢঙে ক্রমাগত মদ্যপান ও ধূমপান করিয়ে পরিচালক ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন সেটা বোধগম্য নয়। বাংলার মেয়েরা মদ ও ধূমপান করতে ভালোবাসে, নাকি এটা বাঙালি হওয়ার পূর্বশর্ত! এই বিষয়টি একটু দৃষ্টিকটুই মনে হয়েছে। যাহোক, বিপ্লবহীন এক বদ্ধ সময়ে দাঁড়িয়ে মেঘে ঢাকা তারাজাতিস্মর যে মানুষ দুজনকে তুলে ধরলো, তাতে আর কিছু না হোক বিপ্লব কীভাবে করতে হয় তার একটা আপাত ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সব ছাপিয়ে এ কারণেই চলচ্চিত্র দুটি একটু আশার, একটু সাহসের প্রতীক হয়ে থাকবে এটা বলা যায়।


লেখক : ইব্রাহীম খলিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ibrahimrumcj@gmail.com



তথ্যসূত্র

১. জানা, সুনীল (২০১৩ : ২৫); ‘ক্ষুদিরামের জবানবন্দি’; ক্ষুদিরামের জবানবন্দি; সম্পাদনা : শেখ রফিক; বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনী, ঢাকা।

২. মুরশিদ, গোলাম; ‘দ্বারকানাথ ঠাকুর : আধুনিকতার বিস্তৃত পথিকৃৎ’; কালি কলম; সম্পাদনা : আবুল হাসনাত; বর্ষ ১১, সংখ্যা ৫, পৃ. ১২, সাল ২০১৪, ঢাকা।

৩. ঘোষ, বিনয় (২০০৫ : ২৮); বিদ্রোহী ডিরোজিও; বাক্‌-সাহিত্য (প্রা.) লি., কোলকাতা।

৪. প্রাগুক্ত; ঘোষ, বিনয় (২০০৫ : ৯৮)।

৫. প্রাগুক্ত; ঘোষ, বিনয় (২০০৫ : ১৯)।

৬. শ্রী শ্রী চণ্ডিতে দেবী দুর্গার যে দশ মহাবিদ্যার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে তৃতীয় মহাবিদ্যা হলেন দেবী কালী। আর দেবী কালীকে উপলক্ষ্য করে যিনি আরাধনা করেন তিনিই কালী সাধক।

৭. প্রাগুক্ত; মুরশিদ, গোলাম (২০১৪ : ১২)।

৮. হাবিব, ড. রহমান (২০১০ : ৫৩); রাজা রামমোহন রায় : দর্শন ধর্ম চিন্তা; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৯. http://etokkhonearindam.blogspot.com/2013/11/ritwik-ghatak-jibon-kormo-o-dorshon.html

১০. http://etokkhonearindam.blogspot.com/2013/11/ritwik-ghatak-jibon-kormo-o-dorshon.html

১১. মুৎসুদ্দী, চিন্ময় (২০০১ : ২৯); ‘আমি বেঁচে আছি : ঋত্বিক ঘটক’; ঋত্বিকমঙ্গল [বাংলাদেশে ঋত্বিক-চর্চা দলিল : ১৯৭২২০০০]; সম্পাদনা : সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

১২. অনেকে মনে করেন, অ্যান্টনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছেন। তার মা একজন বাঙালি। বাবা এখানে ব্যবসা করতে আসা একজন পর্তুগিজ ফিরিঙ্গি। যাহোক আমরা যেহেতু জাতিস্মর নিয়ে লিখছি, তাই এই চলচ্চিত্রের কাহিনিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছি।

১৩. গায়েন, কাবেরী (১৯৯৮ : ৪৮); ‘সমাজ, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ প্রসঙ্গে রেমুণ্ড উইলিয়ামস : বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একটি সমালোচনাত্মক পাঠ’; adcomso journal; Editor : salim Reza Newton; centre for social science research (cssr), rajshahi university.

১৪. http://etokkhonearindam.blogspot.com/2013/11/ritwik-ghatak-jibon-kormo-o-dorshon.html

১৫. http://jishumohommad.blogspot.in/2010/12/blog-post.html

১৬. http://etokkhonearindam.blogspot.com/2013/11/ritwik-ghatak-jibon-kormo-o-dorshon.html


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন