সিহাব কায়সার প্রীতম
প্রকাশিত ০৪ মার্চ ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
মুক্তধারায় রাবীন্দ্রিক মোড়কে রাষ্ট্র-বন্দনা
সিহাব কায়সার প্রীতম

নাহ্, তার আর সহ্য হলো না। সিদ্ধান্তটা সে নিয়েই ফেললো শেষ পর্যন্ত; খুন করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে তাদের কফিতে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে ফেলা হলো। তারপর ছুরি ও বঁটি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চললো উপর্যুপরি আঘাত। আঘাতে শ্বাসনালি কেটে গেলো, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো রক্ত। একসময় নিথর হলো দুটি দেহ। ব্যস, মিশন সম্পন্ন। এবার রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো। একপর্যায়ে বিবেকের দংশনে পরাভূত। সর্বশেষ থানায় গিয়ে অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমি মা-বাবাকে হত্যা করেছি। আমাকে আটক করুন।’১
ঠিক এভাবেই বাংলাদেশের সমাজকে তীব্র একটা ঝাঁকুনি দিয়েছিলো ঐশী রহমান। তার পরই দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। ঐশীর বেপরোয়া, মাদকাসক্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে আসে গণমাধ্যমে। সমাজ তাকে ধিক্কার দেয় পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার জন্য। এমনকি কিশোরী হিসেবে তার অপরাধের দায় যাতে রাষ্ট্রকে নিতে না হয়, সেজন্য তাকে সাবালিকা বানানো হয় ‘মেডিকেল টেস্ট’-এর মাধ্যমে। কিন্তু যে মাদকের গ্রাসে ঐশী এতো কাণ্ড ঘটালো, সেই মাদক সে পেলো কোথায়? তখন অবশ্য অনেকে অভিভাবকের অসচেতনতাকে দুষেছেন, তরুণ সমাজের অবক্ষয়ের কথা বলেছেন। কিন্তু ঐশীরা যাতে ইয়াবা, ফেনসিডিলের মতো মাদকের হাত থেকে নিরাপদ থাকে, সেটি নিশ্চিত করার প্রধান কর্তব্য কি অভিভাবকদের নাকি তারুণ্যের নৈতিকতার?
আবার যখন কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার যুবকরা ‘সুন্দরবনে দস্যুবৃত্তি’২ করে বেড়ায়, তখন রাষ্ট্র তাদের হত্যা করে। ফলে মানুষের মনে আসে স্বস্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কিন্তু এই যুবকরা দস্যুতায় জড়ালো কেনো? কেনো তাদের কর্মসংস্থান হয়নি—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কখনো মিলে না।
অথচ রাষ্ট্র এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই জন্মেছিলো যে, সে তার সব নাগরিকের দেখভাল করবে, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; খাওয়াপরাসহ যাবতীয় অধিকার নিশ্চিত করবে। অতএব, নির্দ্বিধায় বলা যায়—ঐশীদের মাদক থেকে রক্ষা করার, বেকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিলো রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র সে দায়িত্ব কখনো পালন করেনি, শুধু শাস্তি দেওয়ার কর্তব্যটুকু করে গেছে। ফলে অপরাধ না কমে বরঞ্চ বেড়েছে। তবে সন্ত্রাস দমনের নামে রাষ্ট্রের এমন স্বেচ্ছাচারিতাকে মেনে নেননি অনেক প্রতিবাদী চরিত্র। এদের মধ্যে আলাদা করে রবীন্দ্রনাথের কথা বলতেই হয়। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের কাজ ডিমের খোসার মতো।’৩ অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে ডিমের খোসার কাজ ভিতরের অংশকে রক্ষা করা হলেও বাস্তবে তা ভোজনকারীর হাত থেকে ডিমকে রক্ষা করতে পারে না। ঠিক তেমনই রাষ্ট্রও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার নাগরিকের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। সেজন্যই রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে, বিশেষত স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসংখ্যবার কলম ধরেছেন। স্বৈরাচারী সমাজের বিরুদ্ধেও তার ধিক্কার ছিলো স্পষ্ট। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। সে জন্যই তার ‘তাসের দেশ’-এর তাসেরা মানুষ হয়ে ওঠে, ‘অচলায়তন’-এ অচলায়তন ভেঙে পড়ে, ‘মুক্তধারা’র ঝরনা বইতে থাকে এবং ‘রক্তকরবী’র সেই ভীষণ রাজারও পতন ঘটে।
রাষ্ট্রের আলোচনায় হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা এই কারণে যে, তার রচিত দুটি নাটক ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ ও ‘মুক্তধারা’কে উপজীব্য করে টালিগঞ্জে ২০১২ সালে মুক্তধারা নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। যে চলচ্চিত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। আর সেই বিষয়গুলো নিয়েই কিছু বলার অভিপ্রায়ে এই আলোচনা।
রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ ও ‘মুক্তধারা’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র ২০ বছর বয়সে লিখেছিলেন গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’। মহর্ষি বাল্মীকির রামায়ণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দস্যু রত্নাকরের কথা তিনি এ নাটকে তুলে ধরেন। এই কাহিনি বাল্মীকির রামায়ণে পাওয়া যায় না। গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র প্রথম মঞ্চায়ন হয় ১৮৮১ সালে কলকাতার বিদ্যাভাজন সমাগম সম্মিলনী মঞ্চে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই সেখানে বাল্মীকির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
‘বাল্মীকি প্রতিভা’র পুরোটা জুড়ে রয়েছে রত্নাকরের গল্প। রত্নাকর তথা বাল্মীকি ছিলেন দুর্ধর্ষ ডাকাত। অনুসারীদের নিয়ে মানুষের ধনসমপদ লুট করাই ছিলো তার কাজ। তিনি দেবী কালীর ভক্ত ছিলেন। একদিন কালীকে পূজা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাল্মীকি তার অনুসারীদের বলি নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। ডাকাতদল বনের মধ্যে পথভোলা এক বালিকাকে পেয়ে তাকেই বলির জন্য নিয়ে আসে। কিন্তু বালিকার হৃদয়ছোঁয়া আকুতিতে গলে যায় বাল্মীকির পাষাণপ্রাণ। তিনি বালিকাকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এতে ডাকাতদল তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়। বাল্মীকি তখন ডাকাতদলের সঙ্গ ত্যাগ করে আমূল বদলে যান।
যদিও রামায়ণের রত্নাকরের গল্পটি এ রকম-একদিন তমসা নদীর ধার দিয়ে যাচ্ছিলেন নারদ মুনি ও প্রজাপতি ব্রহ্মা। রত্নাকর তাদের লুট করতে গেলে নারদ মুনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তার পাপের ভাগ তার পরিবারের কেউ নেবে কি না। অবশ্যই নেবে বলে রত্নাকর নারদ মুনিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। কিন্তু একপর্যায়ে দেখা গেলো, পরিবার তা নিতে অপারগ। এই দুঃখে সংসার ত্যাগ করে তিনি নারদ মুনির কাছে এ পাপ থেকে পরিত্রাণের উপায় জানতে চান। তখন নারদ তাকে ৬০ হাজার বার রামনাম জপ করতে বলেন। কিন্তু তিনি যতোবারই ‘রাম’ বলতে চাইলেন ততোবারই তা হয়ে গেলো ‘মরা’। মরা, মরা বলতে বলতেই একসময় তা রাম হয়ে গেলো। এভাবে রাম বলতে বলতে তার পুরো শরীর বল্মী অর্থাৎ উই-এর ঢিবিতে ভরে গেলো। সেই থেকে তার নাম বাল্মীকি।
যাক সেসব কথা, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় ফিরে আসি। একদিন দুই ব্যাধ বাণ মেরে মিলনরত বকযুগলের একটিকে হত্যা করলে বাল্মীকি নিজের অজান্তেই দেবভাষার দুটি শ্লোক বলে ওঠেন—
মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।
অর্থ : হে ব্যাধ, তুমি যে কামমোহিত ক্রৌঞ্চমিথুনকে (বকযুগলকে) বধ করলে, তার ফলস্বরূপ জীবনে কখনো শান্তি পাবে না।
এই ঘটনাটি বাল্মীকির রামায়ণেও ছিলো, তবে একটু ভিন্নভাবে। এই দুটিই রামায়ণের প্রথম শ্লোক। শ্লোক দুটো উচ্চারণ করে বাল্মীকি যারপরনাই অবাক হন। কারণ তিনি দেবভাষার কিছুই জানতেন না। তখন তার সম্মুখে আবির্ভূত হন দেবী সরস্বতী। সরস্বতীর দর্শন পেয়ে তার পাষাণহৃদয় বিগলিত হয়। তিনি কালীপ্রতিমা পরিত্যাগ করেন। তার আহ্বানে সরস্বতী পুনরায় আবির্ভূত হয়ে বাল্মীকিকে বলেন—
দীনহীন বালিকার সাজে,
এসেছিনু এ ঘোর বনমাঝে,
গলাতে পাষাণ তোর মন
কেন বৎস, শোন তাহা শোন।
আমি বীণাপাণি, তোরে এসেছি শিখাতে গান,
তোর গানে গলে যাবে সহস্র পাষাণপ্রাণ।
যে রাগিনী শুনে তোর গলেছে কঠোর মন,
সে রাগিনী তোর কণ্ঠে বাজিবে রে অনুক্ষণ।
...
বসি তোর পদতলে কবি-বালকেরা যত
শুনি তোর ক্ণ্ঠস্বর শিখিবে সঙ্গীত কত।
এই নে আমার বীণা, দিনু তোরে উপহার
যে গান গাহিতে সাধ, ধ্বনিবে ইহার তার।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ তার ‘মুক্তধারা’ নাটকটি রচনা করেন ১৯২২ সালে। এই নাটকে রাষ্ট্রের অনৈতিক ও স্বেচ্ছাচারী আচরণের বিরুদ্ধে তার মনোভাব স্পষ্ট। ‘মুক্তধারা’য় রয়েছে পাশাপাশি দুটি রাজ্য উত্তরকূট ও শিবতরাই। উত্তরকূটের রাজা রণজিৎ শিবতরাইয়ের মানুষদের একঘরে করে রাখার উদ্দেশ্যে দুই রাজ্যের সংযোগকারী নন্দীসঙ্কটের পথ বন্ধ করে দেন। সেই সঙ্গে তাদের আবাদ বন্ধ করার জন্য ঝরনার মুক্তধারায় বাঁধ দিতে যন্ত্ররাজ বিভূতিকে দিয়ে একটি যন্ত্র তৈরি করেন। সেটি করতে রাজার লোকেরা সাধারণ মানুষদের জোর করে ধরে নিয়ে যেতো। যন্ত্রটি তৈরির সময় দুর্ঘটনায় অসংখ্য সাধারণ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়।
এই অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদ যারা করে, রাজা তাদেরকেও হত্যা করতে চান। কিন্তু তাতে তিনি সফল হননি। কারণ তার পুত্রই যে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। রাজপুত্র হয়েও অভিজিৎ আমজনতার পাশে এসে দাঁড়ান। শিবতরাইয়ের মানুষের মঙ্গলে তিনি নন্দীসঙ্কটের পথ খুলে দেন। এই অপরাধে রাজা অভিজিতকেও বন্দি করেন। কিন্তু তাতে দমে যাননি যুবরাজ। মুক্তি পেয়ে ঝরনার মুক্তধারাকে মুক্ত করার দায়ভার তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। আর সেটি করতে গিয়েই তিনি ঝরনার পানির প্রবাহে বিলীন হয়ে যান। নিজের জীবন দিয়ে শেষ পর্যন্ত নিম্নবর্গের মানুষের কল্যাণ সাধন করেন তিনি ।
৪১ বছরের ব্যবধানে রচিত দুটি ঘটনা। কিন্তু দুটি ঘটনার মধ্যেই যেনো একটা যোগসূত্র আছে। সেই যোগসূত্রেই রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের কথা, ভাবনার কথা আঁচ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই এমন এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন, যে রাষ্ট্র কারো ওপর নজরদারি করবে না, কারো অধিকার কেড়ে নিবে না; যেখানে সবাই নিজের মতো করে বাঁচবে। সমাজের অন্যায়-অনাচার দূর করতে রাষ্ট্র ব্যবস্থারও দরকার পড়বে না। প্রত্যেকে আত্মোপলব্ধির দ্বারা পাপাচার বর্জন করবে।
২০১২ সালে এসে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে সেই স্বপ্নের বিনির্মাণে প্রবৃত্ত হলেন কলকাতার দুই নির্মাতা-নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। যার মধ্যে তারা ‘বাল্মীকি প্রতিভা’কেও অন্তর্ভুক্ত করলেন। তাদের সেই প্রচেষ্টায় এবার চোখ রাখা যাক।
নন্দিতা-শিবপ্রসাদের ‘সশ্রদ্ধ নিবেদন’
‘কংক্রিটের জঙ্গলের’ নির্মম অন্ধকারে ছিলো এক দস্যু রত্নাকর। নাম তার ভিকি। খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া ভিকি ছিলো সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র। একদিন সঙ্গদোষে পা বাড়ালো অন্ধকার জগতে। মারামারি, গোলাগুলি, চাঁদাবাজিতে সে হয়ে উঠলো পার্কস্ট্রিটের ত্রাস। একদিন ধরাও পড়লো পুলিশের হাতে। ১৮টি মামলায় ফেঁসে শাস্তি হলো প্রায় নয় বছরের কারাবাস। কারাভোগকালেই একদিন নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়-এর সংস্পর্শে তার মনের ভিতর ঘটলো ব্যাপক পরিবর্তন; বদলে যেতে থাকলো জীবনটাই।
সেই ভিকি ওরফে নাইজেল আকারা’র জীবনকাহিনিকে উপজীব্য করে মুক্তধারা নির্মাণ করেন নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের প্রতি এটি ছিলো তাদের ‘সশ্রদ্ধ নিবেদন’। যে নিবেদনে রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ ও ‘মুক্তধারা’ নাটক দুটির মূলভাব এক করে নাইজেলের জীবনের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করলেন তারা।
মুক্তধারায় মূলত কারাগারের চিরন্তন ধারণা বা ডিসকোর্সকে পরিবর্তন করার কথা বলা হয়েছে। শুরুতেই আছে গান্ধীর বচন এবং অপরাধীকে ঘৃণা না করে, অপরাধকে ঘৃণা করার ইঙ্গিত। এখানে কারাগার হলো সংশোধনাগার; আর কয়েদিরা আবাসিক। সেই সূত্রেই মুক্তধারায় এসেছে কলকাতার একটি সংশোধনাগারের কিছু আবাসিকের গল্প। এখানকার প্রধান চরিত্র ইউসুফ মোহাম্মদ খান। তিনি এই চলচ্চিত্রের বাল্মীকি, যার পাষাণপ্রাণ গলাতে দেবী সরস্বতী রূপে রয়েছেন নীহারিকা চ্যাটার্জি (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)। আর রয়েছেন একজন ব্রিজনারায়ণ দত্ত, যার মাঝে নন্দিতা-শিবপ্রসাদ হয়তো তুলে ধরতে চেয়েছেন নাটক ‘মুক্তধারা’র যুবরাজ অভিজিতকে।
একদিন এক হাজার আটশো ৫৩ জন আবাসিকের এই সংশোধনাগারের আই জি (ইন্সপেক্টর জেনারেল) হয়ে আসেন ব্রিজনারায়ণ দত্ত। এসেই ঠিক করলেন আবাসিকদের কালচার থেরাপি দিয়ে ‘ভালো’ করে তুলবেন। সে লক্ষ্যে দত্ত আবাসিকদের নাচ শেখানোর দায়িত্ব দেন নৃত্যশিল্পী নীহারিকাকে। একপর্যায়ে নীহারিকা ঠিক করলেন তাদের নিয়ে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ মঞ্চস্থ করবেন, শুরু হলো কঠোর অনুশীলন। আর এই সুযোগে ইউসুফ তার কয়েক সঙ্গী নিয়ে সুড়ঙ্গ কাটলো সংশোধনাগার থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে। অবশেষে মঞ্চায়নের দিন নাটক চলাকালে সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যায় ইউসুফ ও তার সঙ্গীরা। পালানোর পরেই হঠাৎ ইউসুফের বোধোদয় হয়; সঙ্গীদের নিয়ে সে প্রত্যাবর্তন করে সংশোধনাগারে। ফলে জয় হয় ২০১২ সালের বাল্মীকির, জয় হয় নীহারিকা-ব্রিজনারায়ণের, জয় হয় রাষ্ট্রের। আর এভাবেই একজন অপরাধীকে সংশোধনাগার নামক কারাগারে ফিরিয়ে এনে রবীন্দ্রনাথকে সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর ‘উপহার’ দেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ।
কারাগার : ‘কল্যাণকামী’ রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত
মুক্তধারার পুরোটা জুড়ে যে কারাগারের ডিসকোর্স বদলের গান গাওয়া হয়েছে, সেই ‘কারাগার’ বিষয়টি আসলে কী? ঠিক কী উদ্দেশ্যেই বা কারাগারের উদ্ভব হয়েছিলো? প্রশ্নগুলো দর্শকের মনে আসা অমূলক নয়। রাজা-বাদশাহদের আমলে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া হতো প্রকাশ্যে, সবার সামনে। তখন কোনো কারাগার ব্যবস্থা ছিলো না। এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো—প্রথমত, দোষীকে শাস্তি দেওয়া হতো; দ্বিতীয়ত, জনগণকে বোঝানো হতো তুমি অন্যায় করলে, রাজার বিরুদ্ধাচরণ করলে একই পরিণতি হবে; সুতরাং সাবধান। প্রকাশ্য এই শাস্তির মাত্রাটা ছিলো ভয়ানক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দণ্ডিতের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। কিন্তু একটা সময় প্রকাশ্যে এ নির্যাতনের সমালোচনা হতে লাগলো। বলা হলো—শাস্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দোষীকে সংশোধন করা। ‘সেজন্য দণ্ডও হওয়া উচিত শারীরিক নির্যাতন নয়—দোষীকে নজরবন্দী করে তাকে সামাজিক অনুশাসনে শিক্ষিত করে তোলা।’৪ অর্থাৎ অপরাধীকে সমাজ থেকে, পরিবার পরিজন থেকে, মুক্ত আলো-বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হোক। তারপর তার মধ্যে অনুশোচনা জাগিয়ে নিজের ভালো-মন্দ নিজেকেই বুঝতে শেখানো হোক।
এই তত্ত্বেই একসময় কারাগার ব্যবস্থা চালু হলো। সে ব্যবস্থায় অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে অপরাধীকে বন্দি করে রাখা হতো। তবে এতে আখেরে লাভ হলো রাষ্ট্রের। কারণ এ পদ্ধতিতে রাষ্ট্র তার ক্ষমতাতন্ত্রের ভিত্তি আরো মজবুত করলো। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে যারা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, সমাজ ও দেশের জন্য যারা ‘হুমকীস্বরূপ’ তাদেরকেই কারাগারে পোরা সহজ হলো। তারপর কয়েদিদের সুকৌশলে বশে আনা, আন্তোনিও গ্রামসি’র ভাষায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। যে আধিপত্য ‘... শক্তি প্রয়োগের বদলে ‘সম্মতির’ দ্বারা একটি শ্রেণী কর্তৃক অপরাপর শ্রেণীর উপর ‘প্রাধান্য’ প্রতিষ্ঠা ...’৫ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র বোঝাতে চায়—সে অপরাধীদের ওপর অত্যাচার না করে, মুক্তধারার নীহারিকা চ্যাটার্জির মতো বুঝিয়ে ‘ঠিক’ পথে আনার চেষ্টা করে। সে সকলকে বোঝায়, নিজের ক্ষতি এড়াতেই প্রত্যেকের সুপথে চলা উচিত।
রাষ্ট্রের এমন আচরণে একসময় অপরাধীরা ভাবে—আসলেই তো রাষ্ট্র আমাদের কতো ভালো চায়! ঠিক যেমন সংশোধনাগার থেকে পালানোর সময় ইউসুফের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘... আমি যাবো না ... ম্যাডাম সকলের সামনে ছোটো হয়ে যাবে, ম্যাডামকে ছোটো হতে দিতে পারবো না।’ জনগণও রাষ্ট্রের এহেন ‘সফলতা’য় বাহবা দেয় এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নেয়। আর নিজেরাও অনুশাসনবদ্ধ হয়ে চলে। এভাবে রাষ্ট্র সুকৌশলে অপরাধীকে বশে আনার কাজটিও করে, আবার নিজেকে ‘মঙ্গলকামী’ হিসেবে জাহির করে জনসমর্থনও আদায় করে। অর্থাৎ সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না (মানে রাষ্ট্রক্ষমতা নিরাপদ থাকে)। এজন্যই হয়তো মিশেল ফুকোকে বলতে শোনা যায়—‘আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র আদৌ সার্বভৌমত্বের ছক অবলম্বন করে চলে না। তা চলে অনুশাসন বা ডিসিপ্লিনের ছকে।’৬
কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ করুন, রাষ্ট্র অপরাধীদের সংশোধনের দায়িত্ব নিলেও তারা কেনো ‘অপরাধী’ হয়ে ওঠে—সে কথা কখনোই বলে না। কারণ সেটি বলতে গেলে হয়তো রাষ্ট্রের নিজের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। কেননা, সব অপরাধ বন্ধ করে দিলে বা হয়ে গেলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, আইন-আদালত, কারাগার প্রভৃতির আর দরকার পড়বে না। আর এসব না থাকলে খোদ রাষ্ট্রই বিলীন হয়ে যায়। তাই অপরাধের আঁতুড়ঘর নিয়ে রাষ্ট্রের কখনোই কোনো আগ্রহ নেই। মুক্তধারাতেও তা-ই ঘটে। শুরুতেই দেখানো হয়, দুর্ধর্ষ ইউসুফকে; সে চাঁদাবাজি, অপহরণ, মানুষ হত্যা করে; প্রতিষ্ঠা হয়—সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর সে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ইউসুফকে সংশোধনাগারে পুরতে হয় ‘সংশোধনের’ উদ্দেশ্যে। তারপর ব্রিজনারায়ণ ও নীহারিকার আগমন ঘটিয়ে ইউসুফকে ‘বাল্মীকি’ করে তোলা হয়। কিন্তু ইউসুফের ‘ইউসুফ ভাই’ হয়ে উঠার নেপথ্য কারণ পর্দায় একবারও তুলে আনেন না নন্দিতা-শিবপ্রসাদ। যেনো মঙ্গলকামী রাষ্ট্রের বিজ্ঞাপনই মুক্তধারার উদ্দেশ্য। যদি তা-ই হয় তাহলে বলবো, যে চাতুর্যের সঙ্গে তারা রাষ্ট্রের গুণগান গেয়েছেন তা এক কথায় ‘অসাধারণ’।
শিব গড়তে বাঁদর
সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। তবে সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি হলো বিনির্মাণ। কঠিন এই জন্য যে, নির্মাতাকে সাহিত্য রচয়িতার মূলভাব বজায় রেখে দর্শককে নতুন কিছু উপহার দিতে হয়; নয় তো বিনির্মাণ সার্থক হয় না। আর এই ‘... বিনির্মাণ করতে গিয়ে ব্যক্তি যদি আসলের মহিমা নষ্ট করে দেন কিংবা আগ বাড়িয়ে ‘ভিন্ন’ কিছু তৈরি করে বসেন, মানে শিব গড়তে যদি বানর তৈরি করে বসেন, তাহলে সেটা একটু সমস্যাই বটে।’৭
মুক্তধারায় নন্দিতা-শিবপ্রসাদ বাল্মীকি ও যুবরাজ অভিজিতকে যথাক্রমে ইউসুফ ও ব্রিজনারায়ণকে দিয়ে রূপায়ণ করেছেন। এছাড়াও দেবী সরস্বতীর আদলে উপস্থিত আছেন নীহারিকা চ্যাটার্জি। এখন চলচ্চিত্রের এই চরিত্রগুলোকে রবীন্দ্রনাথসৃষ্ট চরিত্রগুলোর সঙ্গে মেলানো যাক। বাল্মীকির ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক নাবালিকার করুণ আকুতিতে তার বুকের ভিতরটা গলে যায়। তিনি নিজের সমস্ত পাপ বিসর্জন দেন। আর ইউসুফের ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের বেঁধে দেওয়া ছকের সার্থক প্রয়োগ। মানে ‘কালচার থেরাপি’র মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় ইউসুফকে।
বাল্মীকি কিন্তু নিজের আত্মোপলব্ধি থেকেই দস্যুতা ত্যাগ করেছিলেন, সেখানে কেউ তাকে ভালো হতে বাধ্য করেনি। কিন্তু মুক্তধারায় আত্মোপলব্ধির জায়গাটা ঠিক কোথায়? এখানে অপরাধীদের ভালো হতে বাধ্য করা হয়েছে; জোর করে তাদের নাচের ক্লাসে পাঠানো হয়েছে; তাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো অপরাধী কিন্তু নিজের অনুধাবন থেকে বদলাতে চায়নি। অথচ রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকি প্রতিভা এমন সংশোধনের কথা বলে না। প্রকৃত মানুষ হতে গেলে কোনো মানুষের যে রাষ্ট্রীয় দিকনির্দেশনার প্রয়োজন নেই; নিজেই নিজেকে শুধরে নেওয়া যায়, সেটাই তিনি দেখিয়েছিলেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য়।
খটকা আছে ব্রিজনারায়ণকে নিয়েও। তার মধ্যেই বা নন্দিতা-শিবপ্রসাদ কোন্ অভিজিতকে বিনির্মাণ করলেন? অভিজিৎ যেখানে সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য জেনেশুনে জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেখানে ব্রিজনারায়ণ তো রাষ্ট্রের অনুগত ‘দাস’ মাত্র। কয়েদিদের তিনি আবাসিক বলছেন, কিন্তু আবাসিকের মতো অধিকার দিয়েছেন কতোটুকু? মুখে সংশোধনাগার বললেও আবাসিকদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির বিধান কিন্তু তিনি বদলাননি। যে চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্যই কারাগারের ডিসকোর্স ভেঙে সংশোধনাগার তৈরি করা, সেখানে কেবল নাম পাল্টিয়ে ‘কয়েদি’র কী লাভ!
নিরপরাধ কালুয়া শেখকে এক পুলিশ কনস্টেবল পিটিয়ে মেরে ফেললেও তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেন না ব্রিজনারায়ণ! কারণ এতে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণ হয়। নাচের ক্লাস চালু রাখার জন্য রাজ্যপালের সামনে তিনি রাষ্ট্রের অনুগত ভৃত্যের মতো মিনতি করেন; দৃপ্ত কণ্ঠে তার দাবি জানাতে পারেন না। তাহলে যুবরাজ অভিজিতের মতো ব্রিজনারায়ণ অকুতোভয় হতে পারলেন কই?
মোদ্দা কথা, চলচ্চিত্র মুক্তধারা রাষ্ট্রযন্ত্রের বৈধতা চায়; রবীন্দ্রনাথ ‘মুক্তধারা’য় তা চাননি। মুক্তধারায় রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের এ কোন্ বিনির্মাণ করলেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ!
সেই মুসলমানি ডিসকোর্স
মুক্তবাজারে পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজার ধরে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়। একই পণ্যকে সময়ের ব্যবধানে সামান্য এদিক-ওদিক করে তারা নতুন রূপে হাজির করে। গায়ের রঙ ফরসাকারী ‘পন্ডস ক্রিম’-এর কথাই ধরা যাক। আগে বাজারে ‘পন্ডস ভ্যানিশিং ক্রিম’ নামে একটি ব্র্যান্ডই ছিলো। অথচ এখন বাংলা ছয় ঋতুর জন্য কমপক্ষে ছয়টি ক্রিম রয়েছে। এছাড়া ডে, নাইটে ব্যবহারের জন্য রয়েছে আরো হালি খানেক ভারসন। অর্থাৎ, বাজারে আধিপত্য ধরে রাখতে একই জিনিস, কেবল নতুন রঙে, নতুন মোড়কে উপস্থিত।
পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এই নীতির সঙ্গে এক ‘ভগবানের’ নীতির বেশ মিল দেখতে পাই। এই ‘ভগবান’ সমগ্র পৃথিবীর ক্ষমতা দখলের জন্য মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে পৃথিবীজুড়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে। বলছি ‘ভগবান’ যুক্তরাষ্ট্রের কথা। পুরো বিশ্বে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এতদিন তার অজুহাত ছিলো আল-কায়েদা। কিন্তু ২০১১ সালে লাদেনের মৃত্যুর পর আল-কায়েদার বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ কার্যত সমাপ্ত হয়। তখন থেকেই আল-কায়েদা ‘পুরনো পণ্য’, আর ‘নতুন পণ্য’ ইসলামিক স্টেট বা আই এস। খ্যাতিমান লেখক মাইক হুইটনি নতুন এই ব্র্যান্ডকে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি রক্তক্ষয়ী আগ্রাসনের পথ সুগম করার কৌশল হিসেবে।৮
নতুন পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যথারীতি বেছে নিয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমকে। গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত পশ্চিমা নাগরিকদের শিরশ্ছেদের ভিডিও প্রকাশ করে দেখাচ্ছে—নতুন এই জঙ্গিরা আল-কায়েদার চেয়েও কতোখানি ভয়ানক (কোম্পানিগুলো যেমন নতুন পণ্য সম্পর্কে বলে—এখন আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী আর দ্বিগুণ কার্যকর!)। তাই পৃথিবী ‘রক্ষা’য় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আবশ্যক। সে লক্ষ্যে ওবামা জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে, ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা চালানোর ঘোষণাও দেন। তবে মুখে ‘আইএসের জঙ্গিদের দমনের কথা বলা হলেও তাঁর ভাষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়।’৯
নিজের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এই মুসলমানি ডিসকোর্সের আরেক অনুসারী ভারত। দেশটির প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলমানকে স্রেফ জঙ্গি হিসেবেই দেখা হয়। নন্দিতা-শিবপ্রসাদই যার প্রমাণ দিলেন মুক্তধারায়। এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড়ো দুই অপরাধী হলেন—ইউসুফ মোহাম্মদ খান ও রশিদ করিম খান। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা মুসলমান। শুধু তা-ই নয়, নামগুলো খেয়াল করুন, খাঁটি মুসলমানি নাম। অর্থাৎ নাম দিয়েই প্রথম ধারণায়ন—খাঁটি মুসলমান মাত্রই সন্ত্রাসী। এবার তাদের কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দিই। ইউসুফ এতটাই ভয়ঙ্কর যে, গারদের ভিতর থেকেও সে বাইরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। ওদিকে রশিদ মিয়া ৪০ বছর ধরে সংশোধনাগারে আছেন, কারণ সে নকশালদের জেল থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলো। তার মানে ভারতের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলনের পিছনেও ছিলো কেবল মুসলমানরাই! ইউসুফ ও রশিদ নিয়মিত নামাজ পড়ে। রশিদের নামাজের স্থান আবার ফাঁসির মঞ্চ। অর্থাৎ অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির স্থান আর মুসলমানের নামাজ—দুটোই এক! তার মানে মুসলমানের শ্বাসপ্রশ্বাসে কেবল খারাপ উদ্দেশ্যই নিহিত।
অথচ ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নেতৃত্ব দিয়ে ট্রেনে আগুন লাগিয়ে শত শত মুসলমান হত্যা করেন; সেটি অবশ্য ‘জঙ্গিবাদ’ নয়! যখন ‘ভগবান’ যুক্তরাষ্ট্রের দিলখুশ রাখতে নরেন্দ্র মোদির বি জে পি বলে, ‘ভারতে মুসলমানরা হলো ‘আগ্রাসী শক্তি’। ভারত হলো হিন্দুদের দেশ (Motherland of hindus)’১০ তখন ভারতের কবি-সাহিত্যিক-নির্মাতারা মুখে আঙুল দিয়ে বসে থাকেন! তখন কোথায় যায় তাদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ চেতনা?
সবচেয়ে বড়ো যে ধন্দটি লাগে তা হলো, যে নাইজেল আকারা’র জীবনকাহিনি নন্দিতা-শিবপ্রসাদ মুক্তধারায় তুলে ধরলেন সেই নাইজেল তো খ্রিস্টান। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকিও ছিলেন হিন্দু। তাহলে পর্দায় ‘মুসলমান ইউসুফ’কে কোন্ সূত্রে উপস্থাপন করলেন তারা?
মুক্ত নয় মুক্তধারা
মুক্তধারার সারমর্মই হচ্ছে একটি মুক্তধারা তৈরি করে বন্দিদের আত্মার মুক্তি ঘটানো। সেই উদ্দেশ্যেই এতো কাণ্ড, এতো আয়োজন। অথচ সেই মুক্তধারা নিজেই তো বন্দি হয়ে আছে গুটিকয়েক কয়েদির মধ্যে। এক হাজার আটশো ৫৩ জন কয়েদির মধ্যে মাত্র ৩০ জনকে নির্বাচন করা হলো নাচের ক্লাসের জন্য, যারা পেলো বাড়তি সুবিধা। এদের মধ্যে আবার বিশেষভাবে ইউসুফ ও হ্যাপির রোজ রোজ মেডিকেল ডায়েট ভোগ করা তো ছিলোই। যেগুলো কিনা স্বয়ং ব্রিজনারায়ণই অনুমোদন করলেন; যাকে একজন আদর্শ, নীতিবান, প্রগতিশীল কর্তা হিসেবে মুক্তধারায় উপস্থাপন করেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ। তার মানে বাকি এক হাজার আটশো ২৩ জনের সংশোধনের প্রয়োজন নেই?
আসলে এটিও রাষ্ট্রেরই কূটচাল। ব্রিজনারায়ণ কেবল রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এখানে। রাষ্ট্র খুব ভালো করেই জানে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিজ্ঞাপনের জন্য উপযুক্ত মডেল কে; কাদেরকে সংশোধন করলে জনতার বাহবা পাওয়া যাবে? সে জানে ইউসুফদের মতো সেলিব্রেটি সন্ত্রাসী—যারা গারদের ভিতরেও মূর্তিমান আতঙ্ক; যারা ব্রিজনারায়ণের মতো দুঁদে পুলিশ কর্মকর্তার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস রাখে, তাদের ‘ভালো’ বানাতে পারলে মানুষ তাদের নিয়েই মেতে থাকবে; বাকিদের কথা আর উঠবে না। এই সূত্র মেনেই ব্রিজনারায়ণ এমন ৩০ জনকে বাছাই করেন যাদের অপরাধ অন্যদের তুলনায় গুরুতর। আর তারা যাতে কালচার থেরাপি অবশ্যই গ্রহণ করে, সে জন্য নিয়ম ভঙ্গ করে তাদের কাউকে কাউকে তিনি মেডিকেল ডায়েট দেন, অনুমতি দেন বিনা প্রহরায় চলাফেরার। এভাবে কারাগারের ভিতরেও উঁচু-নিচু ভেদাভেদ তৈরি করেন আই জি (প্রিজন) দত্ত। আর তাতে সংশোধনাগারের ভিতরেও প্রমাণ হয়, রাষ্ট্র কেবল উচ্চবর্গীয়দের যন্ত্র।
মুক্তি মিললো না সরস্বতীরও
রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে নারীরই প্রাধান্য, বিশেষ করে তার গল্পগুলোতে নারীকেন্দ্রিক সমাপ্তিই লক্ষ করা যায়। যদিও বঙ্কিমচন্দ্রের গল্পগুলোও নারীকেন্দ্রিক। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে পুরুষতন্ত্রের কাছে নারীকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের নারী চরিত্রগুলো সেখানে অপেক্ষাকৃত আত্মপ্রত্যয়, আত্মগরিমায় উজ্জ্বল। এই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে অস্বীকার করার সাহস দেখিয়েছেন তার ছোটোগল্পের কয়েকটি নারী চরিত্রের মাধ্যমে। এই ধারার উল্লেখযোগ্য গল্প ‘নষ্ট নীড়’ (১৯০১) ও ‘স্ত্রীর পত্র’ (১৯১৪)। বিশেষত ‘স্ত্রীর পত্র’ তৎকালীন সমাজের জন্য ছিলো একপ্রকার চপেটাঘাত। যেখানে নায়িকা মৃণাল পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। নারীর প্রতি স্বামীর পরিবারের অবহেলা, সংসারের সিদ্ধান্তে স্ত্রীর অংশগ্রহণকে মেনে না নেওয়া ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই সংসার ছেড়ে চলে যান। এই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পত্রের মাধ্যমে তিনি তার স্বামীকে জানান।
ভাবুন, রবীন্দ্রনাথ আজ থেকে একশো বছর আগে নারী স্বাধীনতা নিয়ে কতো বড়ো সাহস দেখিয়েছিলেন। অথচ তাকে নিবেদিত চলচ্চিত্রে নন্দিতা-শিবপ্রসাদের নারী নির্মাণ হলো পুরো উল্টো। নীহারিকা তার স্বামী অরিন্দমের পুরুষতান্ত্রিক আচরণে বন্দি এক নারী। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও মেয়েকে হারানোর ভয়ে অরিন্দমের সব নির্যাতন তিনি মুখ বুজে সহ্য করেন। অথচ এই নীহারিকাই কিনা ব্রিজনারায়ণের আমন্ত্রণে সংশোধনাগারে ‘সরস্বতী’ হয়ে হাজির হন আবাসিকদের মনের মুক্তি ঘটাতে! তাহলে প্রশ্ন, যে নারী দেবী হয়ে এতগুলো বন্দির মুক্তি দেবেন সেই দেবী নিজে কেনো পুরুষতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দি? সেই দেবীকে কেনো তার স্বামীর কাছে মুক্তি ভিক্ষা করতে হয়? এবং এই মুক্তি কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাননি নীহারিকা। মুক্তধারার শেষে যখন সার্বিক পরিস্থিতি বর্ণনা করেন নীহারিকা, তখন শুরুতেই তিনি বলেন, ‘না, অরিন্দম স্পৃহাকে কোথাও পাঠায়নি; স্পৃহা আমাদের কাছেই আছে।’ তার মানে দাঁড়ালো অরিন্দম চায়নি বলেই সপৃহা নীহারিকার কাছে আছে। নীহারিকা নিজে তার মেয়েকে রক্ষা করতে ব্যর্থ। অর্থাৎ দেবী সরস্বতীকেও পুরুষতন্ত্রের কাছে নতজানু করে রাখলেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ। রবীন্দ্রনাথ যে সাহস একশো বছর আগে দেখিয়েছিলেন, সেই সাহসের ছিটেফোঁটাও নন্দিতা-শিবপ্রসাদ দেখাতে পারেননি মুক্তধারায়।
সারমর্ম
দীর্ঘ মুক্তধারার শেষাংশে নীহারিকা একটি সারমর্ম টেনেছিলেন। সেই পদ্ধতি অনুসরণে এই লেখাটি আর দীর্ঘ না করে আমিও একটি সারমর্ম দিই। ২০০৪ সালের কথা, তখন চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের নতুন বাসিন্দা আমি। কয়েকদিন পরেই পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের বিকালে নতুন এলাকায় ঘুরতে বের হলাম। পুরো এলাকা ঘুরে কেনো জানি কোথাও কোনো অনুষ্ঠান হতে দেখলাম না। মনটা একটু খারাপই লাগছিলো; হঠাৎ-ই একটু দূরে মাঠের এক কোনায় ছোটো একটি সামিয়ানা টাঙানো দেখলাম। কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি মঞ্চের ব্যানারে লেখা ‘শুভ নববর্ষ ১৪১১’। সামনে কিছু চেয়ার রাখা আর মঞ্চে দু—চারজন বসে গল্প করছে। উৎসাহী হয়ে একজনের কাছে জানতে চাইলাম ঘটনা কী? তিনি জানালেন, নববর্ষ উপলক্ষে স্থানীয় তরুণরা সন্ধ্যার পর থেকে এখানে জুয়া খেলবে, চলবে সারারাত। প্রতিবছরই নাকি নববর্ষ উপলক্ষে এই এলাকায় এ ধরনের অনুষ্ঠানই চলে। শুনে কিছুটা অবাক, কিছুটা রাগ নিয়ে ফিরে এলাম বাসায়।
মুক্তধারা দেখার পর বছর দশেক আগের সেই স্মৃতি মনে পড়লো। মনে হলো মুক্তধারার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর উছিলায় নন্দিতা-শিবপ্রসাদ নিজেদের কেবল প্রচারের আলোয় আনতে চেয়েছেন। ফলে রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে হয়েছে কেবল রাষ্ট্র-বন্দনা। শুধু বন্দনা দিয়ে রাষ্ট্র এই পন্থায় টিকে থাকতে পারবে তো? সে প্রশ্ন না হয় সময়ের হাতেই তোলা থাক।
লেখক : সিহাব কায়সার প্রীতম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
gentle_pritom@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. ‘মেয়ে ঐশীই ঘাতক’; সমকাল, ১৮ আগস্ট ২০১৩।
২. হোসেন, হেদায়েৎ; ‘সুন্দরবনে দস্যুতায় লিপ্ত হচ্ছে বেকার যুবকরা’; যুগান্তর, ১৫ অক্টোবর ২০১৪।
৩. http://goo.gl/oyOMFF
৪. চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০৭ : ১৭৪); ‘ক্ষমতা প্রসঙ্গে দুই প্রেক্ষিত : গ্রামশি ও মিশেল ফুকো’; মিশেল ফুকো : পাঠ ও বিবেচনা; সম্পাদনা : পারভেজ হোসেন; সংবেদ, ঢাকা।
৫. রহমান, সাদিকুর (২০০৯ : ৬৫); আন্তোনিও গ্রামসির সহজ পাঠ : জীবন সংগ্রাম ও চিন্তা; ঘাস ফুল নদী, ঢাকা।
৬. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০৭ : ১৭৪)।
৭. পারভেজ, রুবেল; ‘কিউ-এর তাসের দেশ-এ চেনা-অচেনা রবীন্দ্রনাথ’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; সংখ্যা ৭, জুলাই ২০১৪, পৃ. ১৯৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
৮. সামিন, সাইফুল; ‘অজুহাত আইএস, লক্ষ্য আসাদ’; প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪।
৯. প্রাগুক্ত; প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪।
১০. http://www.probenews.com/Details/1380
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন