Magic Lanthon

               

ঋতুপর্ণ ঘোষ, মাধবী মুখোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর ও অপর্ণা সেন

প্রকাশিত ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সত্যজিতের নায়িকারা

ঋতুপর্ণ ঘোষ, মাধবী মুখোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর ও অপর্ণা সেন

সংখ্যা ৬-এ ‘ম্যাজিক আড্ডা’ বিভাগে আমরা প্রয়াত নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ স্মরণে পশ্চিমবঙ্গের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচারিত আড্ডার ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকাশ করেছিলাম। আমরা মূলত সেই আড্ডার অডিও-ভিজ্যুয়াল আলোচনার একটি লিখিত রূপ দিয়ে পাঠককে ভিন্ন স্বাদ দিতে চেয়েছি। আমাদের সেই চেষ্টা সফল হয়। এ নিয়ে পাঠকদের কাছ থেকে বেশ সাড়া পাই আমরা। তাই এবারে ‘সত্যজিতের নায়িকারা’ শিরোনামে ২০১৩ সালে ‘কলকাতা লিটারেরি মিট’ (২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি দেশি-বিদেশি লেখকদের সঙ্গে পাঠকের সেতুবন্ধন তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া নিয়মিতভাবে এরা ইতিহাস, খেলাধুলা, ভূ-রাজনীতি ও চলচ্চিত্র নিয়ে বিভিন্ন আড্ডার আয়োজন করে) আয়োজিত একটি আড্ডার ভিডিও ইউটিউব থেকে সংগ্রহ করে সেটির ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকাশ করছি। আলোচনাটি দীর্ঘ হওয়ায় তা পর্বাকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার থাকছে দ্বিতীয় পর্ব। আগ্রহী পাঠকের যে কেউ চাইলে ইউটিউবে ঢু মেরে আসতে পারেন : পার্ট-১, https://www.youtube.com/watch?v=0MEhqakZX-I এবং পার্ট-২, https://www.youtube.com/watch?v=gR5UZV-tRvQ। [সম্পাদক]

 

দ্বিতীয় কিস্তি

ঋতুপর্ণ ঘোষ : অভিনেত্রীর পাশাপাশি রিনা দি যেহেতু পরিচালকও, তাই একটা জিনিস আমি তাকে জিজ্ঞাসা করছি; সত্যজিতের পোর্ট্রেচার অব উইমেন মানে যেভাবে উনি মেয়েদের পোর্ট্রে করেছেন সিনেমাটোগ্রাফিকালি, তার মধ্যে কী বৈশিষ্ট্য তুই পাস?

অপর্ণা সেন : একটা জিনিস আমার হঠাৎ মনে পড়লো, আমি একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম মানিক কাকার। সেখানে আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মেয়েদের সম্বন্ধে ওর কী মনে হয়? ও তখন আমায় বলেছিলো, আমার মনে হয় পুরুষদের সঙ্গে তারা (নারীরা) শারীরিকভাবে সমকক্ষ নয় বলেই বোধ হয়, নৈতিকভাবে তারা পুরুষদের থেকে বেশি শক্তিশালী। তাদের নৈতিক মানে মরাল স্ট্রেন্থটা অনেক বেশি। আমাদের এটা বোধ হয় মনে রাখা দরকার, প্রত্যেকটা মানুষকে দেখতে হবে ইন দ্য কনটেক্সট অব দেয়ার টাইম। তাই দেখতে হবে, সেই প্রজন্মের মানুষ কীভাবে ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছিলো উপনিষদ, ব্রাহ্মসমাজ, বেঙ্গল রেনেসাঁ, রবীন্দ্রনাথ দিয়ে। কারণ সবকিছু দিয়ে তো তৈরি মানুষটা। তাই সেই ধরনের একটা নৈতিকতা মানিক কাকার নারী চরিত্রের মধ্যে ছিলো; যেটা থেকে আমরা এখন সরে এসেছি অনেকখানি।

ঋতুপর্ণ : এটা আমারও মনে হয়, এটা পিট্রিয়াকাল কনস্ট্রাক্ট; মেয়েদের একটা মরাল হবার দায়িত্ব তাদের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া।

শর্মিলা ঠাকুর : নৈতিকতা ছাড়াও সেই সময়ের যে কথা রিনা বললো, সেটা তো নিশ্চয়। কিন্তু উনি যে রকম ছিলেন, মানে দ্য ডিরেক্টর গেইজ হোয়াট মেইড হিম, বাট তাছাড়াও উনি যা যা বা যে সময়ের ছবি করেছেন, উনি তো অনেক ধরনের ছবি করেছেন—মহানগর করেছেন, চারুলতা করেছেন, অরণ্যের দিনরাত্রি করেছেন, সীমাবদ্ধও করেছেন—নানারকম নারী চরিত্র। সেই সময়ে নারী যা করতো, যা সম্ভব ছিলো, হোয়াট দ্য সিচুয়েশন, অ্যাকোর্ডিং টু দ্য টাইম, ইট ইজ ট্রু টু দ্য টাইম, অ্যান্ড সামটাইম লাইক ইন দেবী ফর ইন্সট্যান্ট, নট এগ্‌জ্যাক্টলি রিলেটেড টু নারীর চরিত্র, হিরোইনের চরিত্র। কিন্তু যেখানে উনি ব্রাহ্ম ছিলেন, উনি ওতো সব ভজন বা গান রিলেজিয়াস গান ...। অথচ উনি গানটা লিখলেন, ‘এবার তোরে চিনেছি মা’—উনি নিজে লিখলেন ওটা। কারণ উনি বোঝাতে চাইলেন যে, এটা আমি বুঝি। সো ইন অর্ডার টু ডু দ্যাট, এটাও তো করেছেন উনি।

অপর্ণা : না না, এটা কিন্তু সমালোচনা নয় রিংকু (শর্মিলা)।

শর্মিলা : না না, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু গেট হিম ইন অ্যান আর্গুমেন্ট; আই অ্যাম জাস্ট সেয়িং, হোয়াট হি ওয়াজ। তো সময় নিয়ে এটাও কিন্তু করেছেন তিনি।

অপর্ণা : সেই সময়ের মধ্যে থেকেই তো সবকিছু দেখতে হবে আমাদের। উনি কিন্তু নারীদের গভীর সম্মান দিয়েছেন সবসময়। চারুলতায়, যেখানে একটা বৈধ সম্পর্কের বাইরে একজন নারীর একটা আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে; সেখানেও কিন্তু চারুলতাকে তিনি গভীর সম্মান এবং সমবেদনার দৃষ্টিতে দেখেছেন। এই সম্পর্কে শর্মিলা ঠিকই বলেছেন, উনি (রায়) মনে করতেন, সেই সময় এ রকম সম্পর্কের বৈধতা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না, কোনোভাবেই না। সুতরাং উনি সেই বৈধতা দেনওনি। আমার মনে হয়, ক্রমশ প্রত্যেকটা মানুষের বিবর্তন হয়, ওরও বিবর্তন হয়েছে।

মাধবী মুখোপাধ্যায় : এখানে তো একটাই কথা, যেমন অমল একসময় চলে গেলো, কিন্তু চারু গেলো না। চারু কিন্তু ওইখানেই থাকলো। রবীন্দ্রনাথের যে লেখা সেখানে—‘ভূপতি বলিলো, চলো চারু বেড়িয়ে আসি। চারু কহিলো, না, থাক।’ সেখানটাই সে না বলে; অথচ দুজনে আসলো কিন্তু মাঝখানে একটা গ্যাপ থাকলো। চারু কিন্তু যায়নি, অমল পালিয়ে গেছে।

অপর্ণা : হুম, ঠিকই তো; উনি গভীর সমবেদনা এবং সম্মানের সঙ্গে দেখেছেন চারুলতার বেদনা। 

ঋতুপর্ণ : এটা কিন্তু চারুলতা (মাধবী) বললেন, অমল কিন্তু পালিয়ে গেছে, চারুলতা যায়নি। তার মানে বুঝুন (হেসে) এখন অবধি অমলের চলে যাওয়ার বেদনাটা কতোখানি।

শর্মিলা : অ্যাকচুয়ালি, কাপুরুষ-এ ব্যাপারটা আরো বেশি ...।

ঋতুপর্ণ : কাপুরুষ-এ বিবাহিত মাধবী এবং সৌমিত্র একজন আগন্তুক। সেখানেও সৌমিত্র চলে যাবেন ফাইনালি, করুণাকে নেবে না। কিন্তু কাপুরুষ-এর সবচেয়ে মজার জিনিসটা হচ্ছে, গল্পটা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘জনৈক কাপুরুষের কাহিনী’ থেকে নেওয়া। ওই গল্পটা কিন্তু উত্তম পুরুষে মানে ফার্স্ট পারসনে লেখা, আমি আমি করে লেখা, মানে সৌমিত্র চরিত্রটা আমি আমি করে লিখছেন। সেইখানে আমি আমি করে যে গল্পটা লেখা, সেই গল্পটিকে কী করে করুণার গল্প করে দেওয়া যায়, নায়ককে কাপুরুষ করে ফেলা হয়—সেটার একটা মানে বিবাহ ইন্সটিটিউশনটা, সেটাকে তিনি খুব সুন্দর করে সেলিব্রেট করছেন অপুর সংসার-এ। তার পরে উনি এই ইন্সটিটিউশনটার সমস্যাগুলোর মধ্যে খুব যত্ন করে সন্তর্পণে ঢুকেছেন। চারুলতার সামনেই ভূপতি, তার কিন্তু কোনো দোষ নেই, তিনি আদ্যোপান্ত ভালো মানুষ।

অপর্ণা : সেটা কিন্তু একধরনের চেকোভিয়ান এলিমেন্ট, মানিক কাকার একেবারের গোড়ার দিকের ছবিগুলোতে এটা খুব বেশি করে ছিলো। বিষয়টা এমন যে, দোষ কারো নয়, প্রত্যেকেরই একটা পয়েন্ট অব ভিউ আছে।

শর্মিলা : কারোরই দোষ, মানে দে আর নট হিরো।

ঋতুপর্ণ : না, আমাদের কখনো এটা মনে হয় না যে, এতো ভালো স্বামী থাকতে, যে চারুলতাকে এতো ভালোবাসে; তার পরও কেনো তিনি অমলের প্রতি আকৃষ্ট হবেন।

শর্মিলা : কিন্তু তুমি দেখো ওই সিনটা দেখো, যেখানে চারুলতা আছেন ভদ্রলোক (ভূপতি) এলেন, ঘরে চলে গেলেন; কাগজপত্র বের করলেন, ও (চারুলতা) দাঁড়িয়ে রয়েছে ওকে দেখলোই না, চলে গেলো সোজা। এটাও একধরনের অবহেলা, কন্টিনিউয়াস অবহেলা।

ঋতুপর্ণ : কিছু কিছু অভ্যেস বদলানো দরকার। অভ্যেস নিয়ে বেঁচে থাকতে থাকতে আমরা ভুলে যাই এটা বদলানো দরকার। যদিও সেই বদলগুলো আস্তে আস্তে ঘটছে। এবং আমার যেটা মনে হয়, চারুলতা ও সৌমিত্র যেনো সীমাবদ্ধতে শর্মিলা ঠাকুর হয়ে ফিরে আসে; মানে সেখানে একটা দাম্পত্যের মধ্যে প্রবেশ করেন একজন নারী। এবং তারা যখন প্রথম গাড়িতে করে আসছেন ..., এই জিনিসটা আমার মাঝে মাঝে আশ্চর্য লাগে। সীমাবদ্ধর টুটুল (শর্মিলা ঠাকুর) মানে শ্যালিকা, উনি আসছেন একটা দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে; ওখানেও একটা মন্দা বৌঠান আছে, তিনি স্টেরিওটাইপ নারীর মতো কাজ করেন। তার পাশেই আরেকজন আছেন যিনি অন্যরকম নারী। এটা কিন্তু দ্য মান্ডিন অ্যান্ড দ্য ডিসায়েল ওম্যান, সবসময় সব জায়গায় পর পর একটা করে রয়েছে।

শর্মিলা : যিনি (টুটুল) প্রশ্ন করছেন, এটা ভালো না খারাপ?

ঋতুপর্ণ : এই প্রথম একজন পলিটিকাল নারী এলো গল্পের মধ্যে।

অপর্ণা : একটা নীরব বিদ্রোহ কিন্তু প্রথম থেকেই ছিলো। আমরা যখন সর্বজয়াকে দেখি, অনেক সময় মনে হয়েছে সর্বজয়া শুধুই মা। সর্বজয়ার মধ্যে যে ভূমিকা শুধুই মায়ের ভূমিকা, স্ত্রী হিসেবে সর্বজয়াকে কিন্তু আমরা পাই না। মা হিসেবে সর্বজয়াকে আমরা সর্বোপরি পাই। কিন্তু সেখানেও একটা নীরব বিদ্রোহ ছিলো তার। এটা কিন্তু পথের পাঁচালীতে, অপরাজিততেও আছে। যেভাবে উনি চাকরি করছেন, যেভাবে উনি ছেলেকে সরিয়ে নিলেন গ্রাম থেকে; কারণ ছেলে হুঁকোতে তামাক সেজে দিচ্ছে, মানে ছেলেও একসময় ভৃত্য হয়ে যাবে। তাই সেখান থেকে সরিয়ে নিলেন ছেলেকে। অসম্ভব ...।

ঋতুপর্ণ : নিজে দাসী হলেন, কিন্তু ছেলেকে ভৃত্য হতে দেবেন না।

শর্মিলা : ভীষণ ডিগনিটি, ইভেন ...।

অপর্ণা : সেখানে একটা নীরব বিদ্রোহ রয়েছে কিন্তু। 

ঋতুপর্ণ : আর এতো সুন্দর সিনেম্যাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ।

মাধবী : একটা স্ট্রাগলিং পিরিয়ড।

ঋতুপর্ণ : কিচ্ছু না, করুণা ব্যানার্জি একবার তাকালেন, তার পরই ট্রেনের শট্‌। ফিরে আসছেন।

অপর্ণা : খুব সুন্দর করে করা। তারপর ক্রমে ক্রমে আমরা তো দেখেছি, এই যে মহানগর, এটা আমার সমস্ত প্রিয় ছবির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। যেখানে একজন নারী, যে শুধু নিজের সম্বন্ধে ডিসিশন নিচ্ছে তা না, সে একটা মরাল ডিসিশন নিচ্ছে আরেকটি মেয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে বলে—এটা যে আমার এতো ভালো লেগেছিলো।

আমরা সেদিন এক জায়গায় কথা বলছিলাম সিনেমা নিয়ে; তখন আমার মনে হলো, স্কুলে যদি মহানগর-এর মতন ছবি দেখানো হতো। শেষদৃশ্যে যখন মাধবী দি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন এবং অনীল দা-ও চাকরিটা হারিয়েছেন; তখন তারা বলছেন, এতো বড়ো শহরে দুজনের একজনও কী একটা চাকরি পাবো না? তাতে একেবারে সমান সমান, নারী-পুরুষ একেবারে সমান সমান, অথচ সেটা কতোদিন আগে করা!

শর্মিলা : কিন্তু এটা নিয়ে তো খুবই চর্চা হয়েছিলো, খুবই ক্রিটিসিজম হয়েছিলো।

মাধবী : না, এটা নিয়ে খুব হয়নি, হয়েছিলো চারুলতা নিয়ে।

শর্মিলা : না না, এটা নিয়েও অনেকে কথা বলেছেন। আমি পড়েছি।

মাধবী : আস্তে আস্তে একটা মেয়ে, কাজ করতে করতে কনফিডেন্সটা আসলো নিজের প্রতি। এবং সেই কনফিডেন্সেই সে তখন চাকরি ছেড়ে দিলো।

শর্মিলা : এটা একটা দারুণ সিন। ওই যে ক্যামেরা উঠে গিয়ে একটা বাল্ব জ্বলছে, একটা বাল্ব জ্বলছে না।

মাধবী : তখন সে ভয় পেয়েছিলো,স্বামী কী না বলে। স্বামীর কাছে যখন আসলো, তখন স্বামী কিছুই বললো না। তখন ও বার বারই বলছিলো, তুমি রাগ করেছো আমার ওপর? তারপর যখন স্বামী বললো, না, তা নয়; তখন তারা দুজনে হাসছে মানে একটা আশা, প্রত্যেকটা মানুষ এই আশা নিয়েই বেঁচে থাকে। সেই আশার একটা আলো দেখানো হলো—‘এতো বড়ো শহরে আমরা কি একটা চাকরি পাবো না’ বলে।

ঋতুপর্ণ : তখনই মহানগর কথাটার মানে বেরিয়ে আসে। দুজনই সমনাগরিক হয়ে যান। স্বামী-স্ত্রী মানে দুজনেই তাদের উপার্জনের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে।

অপর্ণা : তখন ‘চিত্রাঙ্গদা’ মনে পড়ে। খুব বেশি করে মনে পড়ে, ‘দেবী নহি, নহি আমি সামান্যা রমণী। যদি পার্শ্বে রাখো মোরে সঙ্কটের পথে।’

মাধবী : পূজা করি রাখিবে মাথায়, সেও আমি নই; অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে পিছে, সেও আমি নহি।

ঋতুপর্ণ : আমি সীমাবদ্ধর কথায় কোথায় যেনো আটকালাম?

অপর্ণা : অনেক অন্যরকম কথায়।

দর্শক : (দর্শক সারি থেকে একজন স্মরণ করিয়ে দিলেন) সত্যজিতের ছবিতে পলিটিকাল চরিত্রের প্রথম আবির্ভাব।

ঋতুপর্ণ : হ্যাঁ, পলিটিকাল চরিত্র মানে সুদর্শনার একজন পুরুষ বন্ধু আছে পাটনায়, তিনি নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। আমাদের মনে রাখতে হবে, ছবিটা তৈরি হচ্ছে ১৯৭২-এ। হাওড়া স্টেশন থেকে তাকে নিয়ে আসা হচ্ছে, গাড়ির পিছনের সিটে বসেছেন পারমিতা। গাড়ি চালাচ্ছেন বরুণ চন্দ্র মানে শ্যামলেন্দু, পাশে সুদর্শনা। পারমিতা বাইরে তাকিয়ে বললেন, দেখো দিনের বেলা দেখলে বোঝাই যায় না এখানে এতো খুনখারাবি হয়। তখন সুদর্শনা জিজ্ঞেস করেন, আপনি (বরুণ চন্দ্র) চেনেন ওদের? পারমিতা বলেন, ও কী করে চিনবে। সেটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বরুণ বলেন, হ্যাঁ, কে-কাদের-কারা মারছে? সুদর্শনা বলেন, যারা মরছে। এই যে টুটুল এলো বাড়িতে, এই কারণে আমার মনে হয়, চারুলতা ও অমলের মধ্যে যে একটা রোমান্টিক ইন্টারেস্ট ছিলো, এটাতে (সীমাবদ্ধতে) সেটা আরো ..., সাবটেরিনিয়ান।

শর্মিলা : এটা তো ঠিক রোমান্টিক নয়। তুমি যেটা বলছো সেটা ঠিক বুঝতে পারছি, মানে যে রকম দেবরের ...।

ঋতুপর্ণ : তখনই মনে হয় ...।

অপর্ণা : এটা প্রেমের সম্পর্ক, এর মধ্যে মানে চারুলতার কথা বলছো?

শর্মিলা : না না, সীমাবদ্ধর কথা বলছি।

ঋতুপর্ণ : মানে আধিঘারওয়ালি (শ্যালিকা), এই যে সেটাকে, তার সীমাটা ...।

অপর্ণা : আকর্ষণ তো একটা হয় ...।

শর্মিলা : একটা ফ্লার্টেশন, একটা অ্যাট্রাকশন। অ্যাট্রাকশন, এ থেকে শ্রদ্ধা; মানে ওকে যখন আগে দেখতো বাইসাইকেল নিয়ে, বাবার কাছে পড়তে আসার সময়। একটা আইডিয়ালিস্টিক, একটা শ্রদ্ধার মতো। দ্যাট ইজ দ্য কেইস, আই উড নট কল অ্যা রোমান্টিক রিলেশনশিপ।

ঋতুপর্ণ : না, আসলে সম্পর্কটা ইক্যুয়াল হয়ে যায়; স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কটা ইক্যুয়াল ছিলো না।

শর্মিলা : সেজন্য এটা বাইরে যারা দেখেছে, এখানে সেরকম চর্চা হয়নি বা ক্রিটিসিজম হয়নি। ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে সবাই দেখেছে। তারা বলেছে, এটা ভীষণ রোমান্টিক ব্যাপার, এটা অ্যাফেয়ারের মতো। তোমার মনে হয়েছে (ঋতুপর্ণের দিকে তাকিয়ে), এটা আমার অ্যাফেয়ার? আমার তো মনে হয়নি।

ঋতুপর্ণ : আমার মনে হয়, এর মধ্যে একটা গভীর সম্পর্কের জায়গা ছিলো।

শর্মিলা : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। একটা মেন্টাল ...।

ঋতুপর্ণ : এবং শেষে যে ঘড়িটা খুলে রেখে চলে যায়, তার মধ্যে যে অভিমান, একা বসে আছে ...।

শর্মিলা : একটা বিট্রায়াল ...।

ঋতুপর্ণ : এই বিট্রায়ালটার মধ্যে কোথাও ফরমাল আত্মীয়তার বাইরেও একটা ইনটেনসিটি আছে বলে আমার মনে হয়।

শর্মিলা : ইনটেনসিটি তো নিশ্চয় আছে। যেভাবে, হি ইজ রিলেটিং টু হার, সেটা ওর নিজের বউয়ের সঙ্গে তো করতে পারছে না। বউ তো শুধু বাড়িঘর, গয়না, প্রমোশন হবে কি হবে না—এগুলোই বেশি ভাবছে। এখানে ওর একটা অন্য সম্পর্ক আছে সুদর্শনার সঙ্গে।

অপর্ণা : একটা সাবটেরিনিয়ান অ্যাট্রাকশন কিন্তু মানিক কাকা অনেক সময় করেছেন। আমার তো মনে হয় এখানে শ্যামলেন্দুর সঙ্গে সুদর্শনার সেটা ডেফিনেটলি আছে। আর একটা জায়গায় আছে, যেটা অনেক বেশি শকিং; কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং লাগে আমার। সেখানে আমার মানিক কাকাকে অসম্ভব রকম আধুনিক মনে হয়, সেটা হচ্ছে, শ্বশুরের সঙ্গে দেবীতে দয়াময়ীর সম্পর্ক।

ঋতুপর্ণ : উফ্‌ ..., ইস্‌ ...।

অপর্ণা : যেখানে চিঠি নিয়ে শ্বশুর দয়াময়ীকে বলছেন, কী লেখে তোমাকে?

ঋতুপর্ণ : রোজ লেখে?

অপর্ণা : রোজ লেখে? মানে বোঝা যাচ্ছে পুত্রবধূর প্রতি ..., মানে আমার এখন বলতে বলতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে; পুত্রবধূর প্রতি একটা আকর্ষণ, যেটাকে উনি নিজের কাছে কখনো স্বীকার করতে পারছেন না। এবং এই জন্যই সেই স্বপ্নটা আসে।

ঋতুপর্ণ : পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে।

শর্মিলা : সেটাই তো সিনেমার মজা। কারণ যখন একটা ছবি তৈরি হয় এবং যখন সেটা দর্শকের কাছে পৌঁছোয়, সব দর্শক আলাদাভাবে সেটা দেখে এবং দ্যাট বিকামস অ্যা রিয়ালিটি, দ্যাটস সো ওয়ান্ডারফুল। কারণ আমরা একটা ভেবে ছবি করি, তারপর সেই ছবিটা যখন সবার হয়ে যায়, তখন তা নানারকম ভাবে দেখা হয়। তোমরা (ঋতুপর্ণ ও অপর্ণার দিকে তাকিয়ে) যেমন অনেক কিছু দেখো, আমরা হয়তো সেটা দেখি না; আমরা হয়তো অন্যভাবে সেটা ভাবি। দ্যাট ইজ দ্য বিউটি, বাট নাথিং ইজ অ্যাবসোলিউট।

অপর্ণা : আমার মনে হয়, মানিক কাকার এটা এতই বেশি ছিলো, তাই ওটা মাল্টিডাইমেনশনাল হতেই হবে।

শর্মিলা : নিশ্চয়ই, সাব টেক্সট, অ্যানিবডি ক্যান রিড অ্যানিওয়ে।

ঋতুপর্ণ : তবে দেবী করে ফেলাটা নিজের ইন্দ্রিয়কে দমন করার জন্য নয়, ছেলের কাছ থেকে আনঅ্যাভেইলবল করে দেওয়া।

শর্মিলা : হ্যাঁ নিশ্চয়ই, সেরকম ভাবেও দেখা যায়।

ঋতুপর্ণ : আমারও মনে হয় সেটা। কারণ ওই যে পুত্রের প্রতি একটা ঈর্ষা ...।

(এই সময় আয়োজকদের একজন একটা কাগজ সঞ্চালক ঋতুপর্ণের কাছে দিয়ে যায়। মনে হলো সময় নিয়ে কোনো কথা)

ঋতুপর্ণ : (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) কী করে বুঝবো, কেউ বলে দিও। আর ১০ মিনিটে অডিয়েন্স কোয়েশ্চেন নেবো, ফর অ্যানাদার ফিফটিন মিনিটস (দর্শকদের হাসি)। কারণ এই তিনজনকে একসঙ্গে আর মঞ্চে পাবে না, তোমাদের যা জিজ্ঞাসা, যা জানার জেনে নাও।

কী বলছিলাম, জাস্ট ঘোমটার আড়ালে থাকা দয়াময়ীকে বলে যাচ্ছে, ‘তোমার যত্ন-আত্তি করে, খাতির করে, চিঠি লেখে’। (এই সময় মাধবী বন্দোপাধ্যায়ের ফোন বেজে ওঠে, ঋতুপর্ণ বলেন বন্ধ করো—দর্শকদের হাসি)।

অপর্ণা : ভালোই তো খুব ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক চলছে, ভালোই লাগছে।

ঋতুপর্ণ : চিঠি লেখে, কী রোজ লেখে? এটা যেনো ঈর্ষা। তার পরে রাতে স্বপ্ন দেখলেন; এটা একেবারেই  ফ্রয়েডিয়ান জায়গা থেকে আসা।

শর্মিলা : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।

ঋতুপর্ণ : এবং তার জন্য শর্মিলা ঠাকুরের মতো দুটো চোখের দরকার পড়েছিলো। যে চোখ দুটো ফাইনালি দেবী দুর্গার চোখ হয়ে যাবে (দর্শকের তালিতে পরের কথাটি শোনা যায়নি)। কিন্তু শিল্পী হিসেবে ...।

মাধবী : আরেকটা কথা বলতে হবে। শুধু চোখ নয়, শর্মিলা ঠাকুরের গালের টোলটাও দরকার ছিলো। (দর্শকদের হাততালি)

ঋতুপর্ণ : না না, দেবী হবার জন্য টোলটা দরকার ছিলো না, অপর্ণা হবার জন্য ছিলো। এই জায়গাটা আমি না বলে পারছি না; অপু ট্রিলজির প্রথম অপুকে ইন্ট্রোডিউস করা হয়, একটা ছেঁড়া কাঁথার মধ্য দিয়ে তার চোখটা মেললো। এবং ওইটা আমরা প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলাম। এর পর পঞ্চম ছবি মানে যখন অপুর সংসার তৈরি হচ্ছে, তখন ওই পর্দার ছেঁড়া ফাঁক দিয়ে অপর্ণার চোখটা ফিরে এলো। ওই যে লেট মোটিফটা যেটা (পথের পাঁচালীতে) শুরু করেছিলেন।

শর্মিলা : আমি যখন এগুলো দেখি, আমার মনে হয় আমি যেনো অন্য কারো ছবি দেখছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা তো কেউ দেখেনি প্রথমে। আমি যখন তাদের বললাম, এইটা আমি; ওরা বললো, মোটেও তুমি নও, এটা হতেই পারো না তুমি। আমি বললাম, হ্যাঁ এটা আমি। (সবার হাসি)

ঋতুপর্ণ : কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন; আমার মনে হয় এটা সব দর্শকের প্রশ্ন। এটা তোকে (শর্মিলা) উত্তর দিতেই হবে, অরণ্যের দিনরাত্রিতে তুই যে ওরকম উঁচু উঁচু খোঁপা বেঁধেছিস, সেটা উনি (সত্যজিৎ) অ্যালাউ করেছিলেন কী করে? 

শর্মিলা : জানি না।

ঋতুপর্ণ : উনি তো এটা করতেন না, উনি তো একটু রিয়ালিস্টিক চেহারা চাইতেন।

শর্মিলা : হ্যাঁ।

ঋতুপর্ণ : এটা কি তোকে বেশি ভালোবাসতেন তাই?

শর্মিলা : এনটায়ারলি মানিকদার দোষ এটা ...।

অপর্ণা : আমার মনে হয়, উনি (সত্যজিৎ) ওই চরিত্রটাকে একটু আধুনিক মহিলা হিসেবে ধরেছিলেন, মানে এটা আধুনিকতার একটা লক্ষণ।

ঋতুপর্ণ : আধুনিকতার লক্ষণ এতখানি চুল বাঁধা!

শর্মিলা : ঋতু, আমার মনে হয় তুই অ্যাবসোলিউটলি রাইট। হি শুড হ্যাভ বিন অ্যা লিটল মুভ উইথ মি। হয়তো ...।

ঋতুপর্ণ : আর চান্স পেয়ে, তুই সেটা করে চলে এসেছিস।

শর্মিলা : একে তো কী ভীষণ গরম ওখানে, তাই অতো সব আলোচনা কথাবার্তা বলার সময় তখন ছিলো না উনার। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট আছে, ফ্রেম করে নেবো—এই ভেবে হয়তো হি অ্যালাউড মি।

অপর্ণা : তিনি সেরকম ছাড়ার পাত্র তো ছিলেন না। কিন্তু ...। (দর্শকের হাসি)

ঋতুপর্ণ : কিন্তু নারে, পরের দিকের মেইকগুলো যেমন ...।

অপর্ণা : অসম্ভব পারফেকশনিস্ট ছিলেন।

শর্মিলা : লাস্ট সিনে কিন্তু নেই।

মাধবী : তখন শর্মিলা ঠাকুরও শর্মিলা ঠাকুর হয়ে গেছেন।

শর্মিলা : কিন্তু আমি ওই চৌকিদারের কাছে গেলাম, সেখানে যেটা দেখলাম; থ্রু দ্য ইউ নো, চৌকিদার ওর বাচ্চাদের নিয়ে শুয়ে আছে, ওখানে দ্য চুল (হেয়ার) ওয়াজ অলরাইট।

ঋতুপর্ণ : কী এমন বাহাদুরি হচ্ছে! সেখানে চুল (হেয়ার) ওয়াজ অলরাইট ...।

শর্মিলা : ছবিটা এতো সুন্দর যে সবাই ...।

ঋতুপর্ণ : (অপর্ণার দিকে তাকিয়ে) তোর মৃন্ময়ীর বিবর্তনটা কি খুব স্বাভাবিক লাগে?

অপর্ণা : হ্যাঁ, কারণ একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, এটা তিনটা ছবির একটা। সুতরাং পুরো জিনিসটা সংক্ষিপ্তভাবে করা দরকার ছিলো। যখন করেছিলেন সেটা খুব ইন্টেলিজেন্টলি ছিলো। আমাকে বলেছিলেন, আমি তিনটি শটে নেবো তোকে, প্রথমটাতে ভীষণ কাঁদছে, শুয়ে আছে; তার পরে চুল-টুল এলোমেলো, ওর ভিতরে একটা ভীষণ ঝড় চলছে; তারপর একদম শান্ত, সমস্ত চুল আঁচড়ানো সুন্দর। সেখানে যখন চর্কিকে নিয়ে এলো, চর্কি মরে গেছে; তখন ও বললো, যা পুড়িয়ে ফেল।

ঋতুপর্ণ : আসলে চর্কিকে প্রায় ওর একটা এক্সটেনশন মনে হয় আমার কাছে। বিয়ের রাত্রিতেও লাফিয়ে সে চর্কিকে খুঁজছিলো। কিন্তু মৃন্ময়ীর বিয়ের রাত্রিতে দোলনাটাই, আমার কাছে ছবিটা শেষ হয়ে যায় ওখানে।

অপর্ণা : না না না ঋতু, কেননা এটা তো ...।

ঋতুপর্ণ : ওই যে একটা চর্কির জন্য ব্যাকুলতা, বিয়ের সাজে ছুটে এসে ...।

অপর্ণা : সেটা তো গল্প নয়।

ঋতুপর্ণ : গল্প তো ‘সমাপ্তি’, ‘‘পোস্টমাস্টার’ও নয়। ‘‘পোস্টমাস্টার’-এর রতন রবীন্দ্রনাথের গল্পে পায়ে পড়ে কেঁদেছিলো, আমায় শহরে নিয়ে চলো। এখানে রতন একটা বালতি ভরে, অভিমান করে চলে যায়, একটা কথাও বলে না। এই আধুনিকতাটা যিনি পেয়ে গেছেন ...।

অপর্ণা : গল্প বলতে আমি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গল্প বলেই আলাদা করে বলছি না।

ঋতুপর্ণ : বুঝতে পেরেছি।

অপর্ণা : রবীন্দ্রনাথের গল্পের স্পিরিটটা আছে, কিন্তু মানিক কাকা ছবির জন্য যে গল্পটা সাজিয়েছিলেন, সে গল্পের মধ্যে কিন্তু মৃন্ময়ীর যে বিবর্তনটা হলো মানে প্রেমে পড়লো, বালিকা থেকে নারী; যেটাকে আজকাল বলে, কামিং অব এইজ—সেই রকম মনে হয় আমার।

ঋতুপর্ণ : মানে তোর মনে হয় একটা অ্যাডলসেন্স থেকে, প্রথম সেক্সুয়ালিটি ...।

মাধবী : বাল্যকাল থেকে ...।

চলবে

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন