মুর্শিদা টুম্পা
প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সওদাগর অনন্তের ‘দ্য গোল্ডেন বাংলা প্রজেক্ট’-এ মোস্ট ওয়েলকাম
মুর্শিদা টুম্পা

শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আকাশচারী বিহঙ্গের অবাধ বিচরণে মুগ্ধ হয়েছিলেন। স্বপ্ন দেখেছিলেন বিহঙ্গের ন্যায় ডানা ঝাপটিয়ে বিশালতার স্বাদ আস্বাদনের। তাইতো শিল্পীর ক্যানভাসে চিত্রিত হয়েছিলো বিহঙ্গ স্বরুপ আকাশযানের নকশা। সেটিই ছিলো উড়োজাহাজ নির্মাণ প্রচেষ্টার প্রথম চিন্তা। সেই চিন্তার ক্রম উন্নতির পথ ধরে অরভিল রাইট ও উইলভার রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের হাতে পূর্ণতা পায় উড়োজাহাজ। উড়বার সাধ পূর্ণ হয় মানুষের। কিন্তু তাতেই মানুষ তৃপ্ত থাকেনি। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষে চলতে থাকে আরো উন্নতকরণ প্রক্রিয়া। যার ফলস্বরূপ আসে যুদ্ধবিমান,ড্রোন।‘উন্নতকরণ প্রক্রিয়াটি’ এভাবে সুখলাভের বাসনা থেকে রূপ নেয় আধিপত্য আর প্রতিপত্তি লাভের ভ্রষ্ট প্রচেষ্টায়। উন্নতি ঘটে বটে, তবে হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, এ ‘উন্নতি হচ্ছে ওপরের দিকে পতন।’১
চলচ্চিত্র উদ্ভাবনের পথেও ‘ক্যামেরা অবস্কিউরা’র ধারণা দিয়েছিলেন ভিঞ্চি। পরবর্তীকালে আরো অনেক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের মতোই লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে এসেছিলো চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্র মানুষের মনে জাগিয়েছে নানা সম্ভাবনা। ফলে চলচ্চিত্রেও চলতে থাকলো উন্নতকরণ প্রক্রিয়া। পুঁজি, প্রযুক্তি আর শিল্পের অগ্রযাত্রায় চলচ্চিত্র কখনো হয়ে উঠলো প্রতিবাদ-বিপ্লবের হাতিয়ার, কখনো বা বিনোদনের উৎস, ব্যবসায়িক পণ্য। তবে যুদ্ধ বিমানের মতো বিধ্বংসী না হলেও চলচ্চিত্রের ‘উন্নতকরণ প্রচেষ্টা’য় যোগ হলো এক ভয়াবহ উপাদান, যার নাম পুঁজি।
তাই বাজারের আগমন হলো অনিবার্য। সময়ের পরিক্রমায় বাজারে নতুন মোড়কে পণ্যের পসরা সাজাতে আসলো নতুন নতুন প্রযুক্তি। সাগর পাড়ের সেই রূপকথার রাজকন্যা থেকে শুরু করে রাজ্য উদ্ধারে বর্ম আর তলোয়ারের ঝনঝনানি সবই দৃশ্যমান হয়ে পর্দায় ধরা দিলো; তৈরি হলো এক স্বপ্নীল জগৎ। তবে পর্দার এই স্বপ্ন কেবল হাতছানিই দেয়, তাকে না যায় ছোঁয়া, না যায় ধরা—এ যেনো অলীক স্বপ্ন যেখানে গতি আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। বাস্তবতা থেকে যার গন্তব্য বহুদূর। শিল্পী ভিঞ্চি তার ক্যানভাসে উড়োজাহাজ কিংবা ক্যামেরার যে নকশা এঁকেছিলেন, তা শুধু নকশাই ছিলো না, সেটা ছিলো স্বপ্ন তবে সে স্বপ্ন যুদ্ধের দামামা আর পুঁজিবাদের আঁচড়ে শাণিত হয়নি, বরং নুইয়ে পড়েছে, জঙ ধরেছে তাতে। কেউ কেউ অবশ্য জঙ সরিয়ে রঙ মাখিয়েছেন, ছবিও এঁকেছেন, তবে তা ছবি হয়ে ওঠেনি; বাহারি রঙের বর্ণচ্ছটায় বিভ্রান্ত হয়েছে বার বার।
অবশ্য নতুন আসা প্রযুক্তির বদৌলতে নুইয়ে পড়া এ স্বপ্নকে দাঁড় করানোর একটি সম্ভাবনা দেশে, দেশের বাইরে উঁকি দিচ্ছে। আমাদের এখানে তৈরি হয়েছে, হচ্ছে এক ঝাঁক তরুণ শিল্পী। যাদের হাতে চিত্রিত হতে পারে স্বপ্ন রেখা, অন্তত পরিচালক-প্রযোজক-অভিনেতা অনন্ত জলিল আমাদের এমনই এক আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে তিনি যে ‘ছবি’ অঙ্কন করলেন তাতে বুভুক্ষু দর্শকের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটাই পড়েছে কেবল। সম্প্রতি তিনি দর্শকদের নতুন ক্যানভাসে মোস্ট ওয়েলকাম জানিয়েছেন। সেখানেও কি তিনি নুনই রেখেছেন, নাকি নিম পাতার নির্যাস?
খোঁজ-দ্য সার্চ থেকে মোস্ট ওয়েলকাম টু
ঢাকাই চলচ্চিত্র কখনোই মসৃণ পথ পাড়ি দেয়নি। নানা বাঁক পেরিয়ে কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। ৯০-এর দশকে একটা বড়ো ধরনের আঘাত আসে ইন্ডাস্ট্রির ওপর। একদিকে স্যাটেলাইট চ্যানেল, ভিসিডি-ডিভিডি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদেশি বিশেষত হলিউড ও বলিউডের চলচ্চিত্র সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় দর্শক ঘরে বসেই পছন্দসই চলচ্চিত্র দেখতে শুরু করে। অন্যদিকে এই দশকের মাঝামাঝিতে চলচ্চিত্রে ‘অশ্লীলতা’ ও সহিংসতার মাত্রা বাড়তে থাকে। ফলে শহরভিত্তিক দর্শকের একটি বিরাট অংশ বিশেষত নারী দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। দর্শক হিসেবে অবশিষ্ট থাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, যাদের বিকল্প কোনো বিনোদনের মাধ্যম ছিলো না। আর এসব দর্শক ধরে রাখতে শূন্য দশকে প্রেক্ষাগৃহে শুরু হয় কাটপিসের ব্যবহার। একপর্যায়ে বন্ধ হতে থাকে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ। তবে ২০০৭ সাল থেকে শাকিব খান-অপু বিশ্বাস জুটিকে নির্ভর করে এফ আই মানিক বেশ কয়েকটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দেন। ফল হিসেবে সব নির্মাতা হুমড়ি খেয়ে পড়ে এই জুটির ওপর। ইন্ডাস্ট্রি শাকিব নির্ভর হয়ে পড়ে। চলচ্চিত্রে শাকিবের একই ধাঁচের উপস্থিতিতে দর্শক একঘেয়ে হয়ে আবার প্রেক্ষাগৃহ বিমুখ হতে থাকে; সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের মাত্রা।
এ রকম পরিস্থিতিতে ২০১০-এ খোঁজ-দ্য সার্চ-এর মধ্য দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে বিশিষ্ট গার্মেন্ট ব্যবসায়ী এম এ জলিল অনন্ত’র। তিনি এসে চলচ্চিত্রে বিপুল পুঁজি ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটান। চলচ্চিত্রের প্রচারে কোমর বেঁধে মাঠে নামেন অনন্ত। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচারের ধুম পড়ে, এমনকি প্রথমবারের মতো রাস্তায় রাস্তায় বড়ো বড়ো বিলবোর্ডে দেখা যায় খোঁজ-দ্য সার্চ। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার প্রচার অব্যাহত থাকে। এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রের ট্রেইলার ইউটিউবে মুক্ত করা হয়। ফলাও করে প্রচার করা হয়, ডিজিটাল সাউন্ড ও সিনেমাটোগ্রাফির অনন্যতার কথা।
৯৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত খোঁজ-দ্য সার্চ দেশের ৪৪টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়।২ গণমাধ্যমে প্রচারের এই ব্যাপকতায় কিছু তরুণ দর্শক প্রেক্ষাগৃহেও ফেরে। এরপর খোঁজ পড়ে কী আছে খোঁজ-দ্য সার্চ-এ। চলচ্চিত্রে অনন্ত একই সঙ্গে প্রযোজক ও অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট মেজর মাহমুদের যুদ্ধকে নিয়ে চলচ্চিত্রের কাহিনি। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর (বি সি আই) প্রতিনিধি হয়ে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে জেমস বন্ড স্টাইলে চলে তার এই প্রচেষ্টা। এক কথায় চোর-পুলিশের খেলা। আর চিত্রায়ণ দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না হলিউডকে অনুকরণের প্রয়াস। পশ্চিমে জেমস বন্ডের আবির্ভাবের রাজনীতি যদিও বাংলাদেশে বেমানান, কিন্তু তা বাজার ধরতে সহায়ক।
অনন্ত জলিলের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ (২০১১)। অনেকটা পিছু হাঁটার মতো এবার অনন্ত জলিল পরিচালক গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে দিয়ে মান্না যুগের অ্যাকশনে ফেরত আসলেন। খলনায়ক স্বামীর অনৈতিকতার বিপরীতে সন্তানকে (নায়ককে) নৈতিকতার শিক্ষায় গড়ে তুললেন এক সাহসী মা। তারপর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিকের ভূমিকায় নায়কের আগমন, নায়িকাকে উদ্ধার, অতঃপর অপরাধী বাবার আত্মসমর্পণ—এই হলো কাহিনি। কিন্তু দর্শকের ‘খাবারে’ নতুন আইটেম যোগ করতে ব্যর্থ হলেন অনন্ত। চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিক সফলতার মুখ দেখলো না। হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউয়ে অনন্তের হৃদয় ভাঙলেও তার আশা কিন্তু ভাঙেনি। পরের বছরই (২০১২) মুক্তি পায় দ্য স্পিড ও মোস্ট ওয়েলকাম। দুটি চলচ্চিত্রেই এবার অনন্ত ব্যবসাসফল হন।
প্রথমে দ্য স্পিড প্রসঙ্গে আসি। এখানে অনন্ত খানিকটা কৌশলের আশ্রয় নিলেন, হয়তো দ্বিতীয় চলচ্চিত্রের পরিণতি থেকেই এ শিক্ষা। ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিরসনে তিনি মালয়েশিয়ান প্রযোজকের সহায়তা নিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার যৌথ প্রযোজনায়, সোহানুর রহমানের পরিচালনায় দ্য স্পিড-এর চিত্রায়ণ হলো অর্ধেক বাংলাদেশে আর অর্ধেক মালয়েশিয়ায়। অনন্ত আবারও হলিউড-বলিউড অ্যাকশনে ফিরলেন। কাহিনি বিন্যাসেও প্রয়োগ করলেন নতুন কৌশল, মানে ফ্যান্টাসির মিশেলে বাস্তবতা নির্মাণ। ব্যক্তি অনন্ত ‘বাস্তবে’ যেমন ঠিক সেভাবেই চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করলেন নিজেকে।
দ্য স্পিড-এ তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ সৎ ব্যবসায়ী, শ্রমিকদের ‘ভালো’ মালিক এবং অসহায়ের ত্রাণকর্তা এ জি আই গ্রুপের চেয়ারপার্সন অনন্য। অনন্যর কাজ ভণ্ড, দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা। অতঃপর চিরায়ত বাংলা চলচ্চিত্রের সমাপ্তি দৃশ্যে নায়কের শক্তিবলে ভিলেনকুল পর্যুদস্ত এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নায়কের মুক্তি। তবে এই চলচ্চিত্রে ঢাকার পরিবর্তে মালয়েশিয়ান কারাগার থেকে নায়কের মুক্তি ঘটে। অর্থাৎ ‘আন্তর্জাতিক মানের’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘আন্তর্জাতিক মানের কারাগার’ আর কি! যাহোক, বিগ বাজেট আর চোখ-ধাঁধানো লোকেশনের টানে কিছু দর্শক চলচ্চিত্রটি গিললো।
২০১২ সালের আগস্টে এলো তার চতুর্থ চলচ্চিত্র মোস্ট ওয়েলকাম। অনন্য মামুনের পরিচালনায় মূলত তামিল চলচ্চিত্র কান্থাস্বামীর (Kanthaswami) অনুকরণে নির্মিত মোস্ট ওয়েলকাম। ব্যবসার পথ খুঁজতে বলিউডের মতো অনন্ত এবার তামিল যাত্রায় শামিল হলেন। শুধু অনুকরণ বললে ভুল হবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারে শট্ টু শট্ নকল করা হলো; ব্যবসা করলো সাত কোটি টাকা। এছাড়াও যুক্তরাজ্যের ৪৫টি থিয়েটারে এবং আমেরিকা, ইতালি, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতারসহ আরো কয়েকটি দেশে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন হলো।৩ অবশ্য মোস্ট ওয়েলকাম মুক্তির আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনন্তের উচ্চারণ ভঙ্গি নিয়ে অনেক রসিকতা চললো। তিনি অনেকের আলোচনার পাত্রে পরিণত হলেন। এটা অবশ্য ‘মিডিয়া জনপ্রিয়তা’ তত্ত্বের সাধারণ কৌশল।
মোস্ট ওয়েলকাম-এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩-তে অনন্তের পঞ্চম চলচ্চিত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আয় করলো প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা।৪ চলচ্চিত্রের বাজার সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই ব্যবসার গুটিকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিলেন অনন্ত। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। আর প্রযোজক, অভিনেতা হিসেবে তো আছেনই; এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকারও তিনি। অনন্ত আগের চলচ্চিত্রগুলোতে প্রধান নারী চরিত্র অর্থাৎ নায়িকার ভূমিকাকে একটু আড়ালে রেখেছিলেন। তবে নিঃস্বার্থ ভালোবাসাতে প্রথমবারের মতো অনন্ত নায়িকাকেও সমানভাবে ফোকাস করলেন, তবে নেতিবাচকভাবে।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মুক্তির আগে অনন্ত ও তার স্ত্রী নায়িকা বর্ষার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে—এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। যেটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন এই তারকা দম্পতি। অবশ্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসাতেও এই দম্পতির বিরোধপূর্ণ সম্পর্কই দেখানো হয়। কাহিনিটি এ রকম—নায়িকাকে ‘নিঃস্বার্থভাবে’ ভালোবেসে তার সব চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ করতে থাকে নায়ক। কিন্তু লোভী নায়িকার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে নায়ক বারংবার পরাজিত হয়। অবশেষে নায়িকার বোধোদয় এবং মধুর মিলন। এখানেও ব্যক্তিগত ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার সেই পুরনো তত্ত্বের ব্যবহার। তবে ঘটনা যাই হোক, ফলাফল—ব্যবসায় সফলতা। এর পরই ২০১৪ সালে মোস্ট ওয়েলকাম-এর সিক্যুয়াল মোস্ট ওয়েলকাম টু নির্মাণ করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন পরিচালক অনন্ত।
মোস্ট ওয়েলকাম থেকে মোস্ট ওয়েলকাম টু
যেকোনো চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হলে তার সিক্যুয়াল ও রিমেক তৈরির প্রবণতা নতুন নয়। হলিউড থেকে বলিউড, টলিউড, টালিগঞ্জ হয়ে এই অনুপ্রবেশ ঢালিউডেও। যাহোক, ৯০-এর দশকে ভণ্ড চলচ্চিত্রের ব্যাপক জনপ্রিয়তায় নির্মিত ভণ্ড টু’র মধ্য দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে সিক্যুয়ালের মহরত হয়। এর পর দীর্ঘ বিরতিতে ২০১৪ সালে এসে মোস্ট ওয়েলকাম টু দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে আবারও সিক্যুয়ালের আগমন ঘটে। অবশ্য আসমানি টেকনোলজির বদৌলতে ধুম, কৃষ, টয় স্টোরি বা বন্ড সিরিজের ‘সিক্যুয়াল মাসালা’র স্বাদ আমাদের দর্শকরা আগেই পেয়েছে। তবে অনন্তের বয়ানে, এ দেশীয় চলচ্চিত্র বাজারের সবচেয়ে মূল্যবান প্রোডাক্ট তারই; এফ ডি সি নির্ভর অ্যানালগ চলচ্চিত্রকে মৃত ঘোষণা করে তিনিই চলচ্চিত্রে প্রাণের সঞ্চারকারী; তিনি বাংলা চলচ্চিত্র সংক্রান্ত তথাকথিত ‘হাস্যকর’ কনসেপ্টকে ‘জাতে’ এনেছেন—আলোচনার এ রকম একটি পরিসর অন্তত অনন্ত নিজেই তৈরি করেছেন।
তাই তার এই ‘সফলতা’ পরিমাপ করার দায় এড়ানো যায় না। অনন্ত জলিলের ঝুলিতে সাত কোটি টাকা উসুল করা মোস্ট ওয়েলকাম এবং সেখান থেকে মোস্ট ওয়েলকাম টুয়ে গমন কি শুধুই বাংলা চলচ্চিত্রকে জাতে আনার প্রচেষ্টা? নাকি প্রচ্ছন্ন কোনো কারণ লুকিয়ে আছে তার পিছনে? এই প্রবন্ধ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার একটি প্রয়াস। সঙ্গে চলচ্চিত্র দুটির নিগূঢ় অর্থ উন্মোচনের প্রচেষ্টাও থাকবে। চলচ্চিত্র দুটির টেক্সট বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আলোচনা এগিয়ে যাবে। কারণ ‘টেক্সট এর মধ্য দিয়ে যে ইমেজসমূহ (ভাষাগত, দৃশ্যগত, শব্দগত) গড়ে ওঠে তা সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহ, ক্ষমতাকেন্দ্রসমূহ, ব্যক্তিসমূহ ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমেই আমাদের মনে অর্থবোধকতা তৈরি করে এবং সামাজিক ক্ষমতাব্যবস্থার সেবা করে।’৫
তবে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে চলচ্চিত্র দুটির গল্পে প্রবেশ করি। দুর্নীতি দমন কমিশনে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেট আরিয়ান ও একটি মাজারকে ঘিরে মোস্ট ওয়েলকাম-এর কাহিনি। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতায় ওই মাজারকেই একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করে সাধারণ মানুষ। ঋণখেলাপি ধনীদের কাছ থেকে অবৈধ টাকা ছিনিয়ে আনেন ম্যাজিস্ট্রেট আরিয়ান এবং তা দিয়ে গোপনে মাজারে আসা অসহায় মানুষের মনোবাসনা পূর্ণ করেন। সেই সঙ্গে অপরাধীদের ভালো হওয়ার জন্য মোস্ট ওয়েলকাম জানান। সাধারণ মানুষ ভাবে, মাজারের অলৌকিক ক্ষমতাবলে এসব ঘটছে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের ‘সুপারম্যান’ হয়ে ওঠার এই প্রচেষ্টা নায়িকা অধরা ও তার ভাই আসিফ খানের চক্রান্তে একসময় উন্মোচিত হয়। একপর্যায়ে নায়িকার বোধোদয় হলে তিনি নায়ককে দেশোদ্ধারে সাহায্য করেন। শেষে নায়কের আইনভঙ্গের পিছনে ভালো উদ্দেশ্য থাকায় রাষ্ট্র তাকে ক্ষমা করে দেয়, কাহিনির সমাপ্তি ঘটে।
এরই ধারাবাহিকতায় আসে মোস্ট ওয়েলকাম টু্। সাধারণত আগের চলচ্চিত্রের মূল বিষয় বা আবহে মিল রেখে নতুন কোনো কাহিনি নিয়ে সিক্যুয়াল হয়। তবে সিক্যুয়ালের প্রতিটি চলচ্চিত্রের থাকে আঙ্গিকগত ভিন্নতা। মোস্ট ওয়েলকাম টু শুরু হয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর ক্যান্সার-প্রতিষেধক আবিষ্কারের খবর দিয়ে। সারাবিশ্বে যখন ওই প্রতিষেধক নিয়ে তোলপাড়, তখন সেই ফর্মুলা ও বিজ্ঞানীকে অপহরণ করতে সচেষ্ট হয় একটি আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে সেই বিজ্ঞানীকে রক্ষার দায়িত্ব পান বাংলাদেশের এক পুলিশ কর্মকর্তা। বিজ্ঞানীর নিরাপত্তার দায়িত্ব পাওয়ার পর তার নাতনি অধরার সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা আরিয়ানের প্রেম হয়। বার বার বিজ্ঞানী ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে থাকেন আরিয়ান, কিন্তু একবারের ব্যর্থতায় তিনি পুলিশের চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। তার পর ভিলেনকুলের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণের মারামারির পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞানীকে উদ্ধার করতে সমর্থ হন আরিয়ান। শেষ দৃশ্যে চলচ্চিত্রের অবধারিত রীতিতে পুলিশ বিভাগ আরিয়ানকে বীরত্বের পুরস্কার দেয়। এখানেও রাষ্ট্রের ‘মঙ্গলে’ আইনের ‘বিরোধিতা’ কোনো অপরাধই হয়ে দাঁড়ায় না।
আমি প্রভু হতে চাই
তেলেগু চলচ্চিত্রের সফল তারকা এন টি রমা রায় এক হিন্দু দেবতা চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। সেসময় তিনি সবার কাছে ভালোত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তারও আগে তামিল চলচ্চিত্রের আরেক অভিনেতা এম জি রামচন্দ্র গরিব, দুস্থ ও শোষিতদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করে—এমন চরিত্রে অভিনয় করতেন। যার ফলস্বরূপ বাস্তব জীবনে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলেন। অবশ্য তাদের দুজনের এই জনপ্রিয়তার সমীকরণ একই রেখায় এসে মিলেছিলো। সে আলোচনায় পরে আসছি।
এখন মোস্ট ওয়েলকাম-এ ফিরে আসি। ‘মুশকিল আসান বাবার মাজার’ নামের মাজারে অসংখ্য বিপদগ্রস্ত মানুষ আসছেন সাহায্য চাইতে। পরিস্থিতি এমন, যে কাজ পুলিশের কাছে গেলে হয়, তার জন্যও তারা মাজারেই ছুটছেন। মাজারে গিয়ে যা আর্জি করছেন, সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুয়ারে তা পৌঁছে যাচ্ছে। মনে হয়, মৃত পিরবাবা সবার অলক্ষে জাগ্রত হয়ে ত্রাতারূপে মর্ত্যে এসেছেন! দর্শকের মনে যখন এমন প্রশ্নের উদ্রেক, তখন কাট টুতে দেখা যায়, ‘সুপারম্যান’ রূপে নায়ক সবার অগোচরে সব মানুষের মনোবাসনা পূর্ণ করছেন। যদিও চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করছেন দুর্নীতি দমন কমিশনে কর্মরত একজন ম্যাজিস্ট্রেট চরিত্রে। দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে টাকা লুট করে তা দিয়ে মাজারে আসা মানুষকে সাহায্য করাই তার কাজ। কিন্তু এই ম্যাজিস্ট্রেটই যে ‘মুশকিল আসান বাবা’ সেটা জনসাধারণের কেউ জানে না। এখন প্রশ্ন, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এমন করছেন কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে পুলিশের একটি কথোপকথনে পাওয়া যায়। ম্যাজিস্ট্রেট বলেন,
মানুষ যখন সমস্যা থেকে মুক্তি পায় না, তখন তারা অলৌকিক কিছুর ওপর নির্ভর করে।
আপনারা মানুষের সমস্যার সমাধান করে দিন, শান্তি দিন; তখনই দেখবেন মাজারে মানুষ
আসবে মাজার জিয়ারত করতে—মনের শান্তির জন্য, সমস্যা সমাধানের জন্য নয়।
অর্থাৎ অনন্তের ভাষায়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় মানুষ ধর্মের (অলৌকিকতার) শরণাপন্ন হয়। আর বিশ্বাস নিয়ে আধ্যাত্মিক কোনো শক্তির কাছে সমাধান চাইতে গিয়ে তারা মাধ্যম হিসেবে মাজারের দারস্থ হয়। কিন্তু এই শক্তি তো অদৃশ্য। ভাববাদী দর্শন অনুযায়ী, সেই অদৃশ্য আধ্যাত্মিক শক্তি তথা অলৌকিকতার অধিকারী তো একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু চলচ্চিত্রে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটকে (অনন্ত) সেই অদৃশ্য শক্তির ভূমিকায় দেখি। তাহলে কি এটাই দাঁড়ায়, অনন্ত অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি? যেমনটি ছিলেন তেলেগু চলচ্চিত্রের অভিনেতা এন টি রমা রায়।
সন্দেহটি অমূলক নয়, কারণ বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে মানুষ বিপদে-আপদে পুণ্যবান মানুষদের কবর মানে মাজারে উপস্থিত হয়। কেননা ‘মাজার হলো সাধারণ জনগোষ্ঠী বিশেষত গরিব মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে লালন-পালন ও চর্চা করার একটা অন্যতম সহজ জায়গা।’৬ তাই মোস্ট ওয়েলকাম-এ বুঝতে কষ্ট হয় না যে, ম্যাজিস্ট্রেট অনন্ত দুস্থদের ত্রাতা হয়ে উপস্থিত থেকে নিজেকে সেই অদৃশ্যশক্তির দূত হিসেবে হাজির করছেন। ঠিক যেভাবে এন টি রমা রায় কিংবা এম জি রামচন্দ্র চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে নিজেদের অনন্য ইমেজ নির্মাণ করেছিলেন।
আগেই বলেছি, দক্ষিণের ওই দুই তারকার অনন্য ভাবমূর্তি একটি সমীকরণে মিশেছে। তারা দুজনই পরবর্তী সময়ে সফল রাজনীতিবিদ হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে তাদের যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিলো তারই ফলস্বরূপ তারা দুজনই নিজ এলাকার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ চলচ্চিত্রের এই ভাবমূর্তিকে তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। অনন্তও কি তাদের মতো এই ভাবমূর্তিকে কোনো সময় নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন? সংশয় নিরসনে বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের ‘টক-শোতে’৭ অনন্তের বক্তব্যের কিছু অংশ উল্লেখ করা যেতে পারে। উপস্থাপক অনন্তকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি তো একাধারে চিত্রনায়ক, প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পপতি। তো কোন্ পরিচয়ে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?’ উত্তরে অনন্ত বলেন, ‘দুইটা পরিচয় আমার ভালো লাগে—একটা হচ্ছে আমি শিল্পপতি আর একটা আমি চিত্রনায়ক। কারণ আপনি জানেন একজন বড়ো এবং ছোটো বিজনেসম্যান যাই হোক না কেনো লাস্ট ডেস্টিনেশন হচ্ছে, সে তার জীবনে সি আই পি (বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) হবে। যেটা আমি ২০০৯ থেকে কন্টিনিউয়াস প্রতিবছর হয়ে আসছি। আর চিত্রনায়কের ডেস্টিনেশন হচ্ছে অডিয়েন্স তাকে কীভাবে গ্রহণ করলো বা তার লেভেলটা কোথায়। এখন দর্শকই জানে অনন্ত জলিলের লেভেলটা কোথায়?’ তার কথা থেকে অনুধাবন করতে কষ্ট হয় না যে, ব্যবসায়ী হিসেবে তার আকাঙ্ক্ষার জায়গা হচ্ছে ব্যবসার সর্বোচ্চ জায়গা ধরা, আর চিত্রনায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়া। প্রথম ডেস্টিনেশনে তো ইতোমধ্যে অনন্ত পৌঁছে গেছেন। আর দ্বিতীয়টিতে অর্থাৎ জনপ্রিয়তা না পেলেও সবার নজরে তো এসেছেন। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণের দুই তারকার মতো অনন্য সেই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে অনন্তও জনগণের কাছে অন্য কিছু চাইবেন না তো?
আইনের অতন্দ্র প্রহরী
রাষ্ট্র আইনের শাসনকে বৈধতা দিতে একধরনের সম্মতি উৎপাদন করে। গ্রামসির মতে, আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ‘আধিপত্য’ আর ‘প্রভুত্ব’ নামে দুটি শব্দের জটিল সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।৮ প্রথমটি নানা কায়দায় আমাদের সম্মতি আদায় করে বা করার চেষ্টা করে। সম্মতি আদায়ে রাষ্ট্র আমাদের সামনে জনকল্যাণের ধুয়া তোলে। আর শুধু জনকল্যাণের কথায় কাজ না হলে ব্যবহার করে প্রভুত্ব। যেখানে রাষ্ট্র দমন-পীড়নের সাহায্যে সাধারণ মানুষের ‘ভালো করার’ দিকে নজর রাখে। মোস্ট ওয়েলকাম-এ রাষ্ট্রের এই ‘আধিপত্য’ ট্যাবলেটের ব্যবহার দেখা যায়। ধনীদের কাছ থেকে টাকা লুট করে গরিবদের বিতরণ করার কাজটি একপর্যায়ে নায়কের কাছে অপরাধ বলে মনে হয়। তখন মাজারের খাদেমের কাছে গিয়ে নায়ক বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করছি না তো?’ খাদেমের উত্তর, ‘মানুষের কল্যাণে যে কাজ তা যদি অপরাধ করেও কেউ করে, তাতে পাপ নেই।’ অর্থাৎ আইনের দৃষ্টিতে এটি অপরাধ কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিতে তা পাপ নয়, খাদেমের মুখ দিয়ে এটি স্বীকার করানো হয়।
অর্থাৎ ধর্ম তাকে মুক্তি দিলেও আইনের অনুশাসনে সে সেচ্ছায় বন্দি হয়। কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ হয় না। শেষ দৃশ্যে নায়ক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করে পুলিশকে বলেন, ‘আমি আইন হাতে তুলে নিয়ে যে অন্যায় করেছি, সেই বিচার আইনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত, আমাকে অ্যারেস্ট করুন।’ তখন পুলিশ বলে, ‘থ্যাঙ্ক ইউ আরিয়ান, আবারও প্রমাণ করলেন সত্যিই আপনি মনুষ্যত্ববান মানুষ।’ বোঝা গেলো, রাষ্ট্রের হুকুম মেনে চললেই মানুষ মনুষ্যত্ববান হয়! তাহলে প্রশ্ন, রাষ্ট্র যখন আইনের দোহাই দিয়ে জনগণের অধিকার হরণ করে, বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করে, তখনো কি রাষ্ট্র আইন মেনে করে? নাকি আধিপত্যের অনুশাসনে রাষ্ট্রের নির্মল দাসে পরিণত হয় মানুষ?
প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট
পুঁজিবাদের এই মহাযজ্ঞে চলচ্চিত্র ব্যবসার আরেক প্রপঞ্চ প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট। সাধারণত চলচ্চিত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করে থাকে। কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রযোজক-পরিচালক আগাম অর্থ সংগ্রহ করে, ফলে সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো পণ্যকে চলচ্চিত্রটির নিবেদক হিসেবে দেখানো হয়। কখনো কখনো কৌশলে চলচ্চিত্রের মধ্যে সেই পণ্যের বিজ্ঞাপন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে দুটি কৌশল অনুসরণ করা হয়। কখনো শুধু পণ্যের নাম বলা হয় অথবা শুধু ভিজ্যুয়ালি পণ্যটি দেখানো হয়। আবার কখনো অডিও-ভিজ্যুয়াল দুইটির সমন্বয়ে পণ্যটিকে পরিচিত করানো হয়। ব্যবসায়িক পরিভাষায় যার নাম ‘প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট’। পেশাদার ব্যবসায়ী হিসেবে পশ্চিমাগোষ্ঠী ১৯২৭ সাল থেকেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে এই ধারণাকে যুক্ত করে।৯
হাল আমলে সুপারম্যানকেও দেখা যায়, চলচ্চিত্রের মধ্যে কখনো নামি ব্র্যান্ডের চিপস হাতে উড়াল দিতে, কখনোবা কোকাকোলার পানীয় পান করে অ্যাকশনে নেমে পড়তে। হলিউডের সুপারম্যান থেকে বলিউডের পারফেকশনিস্ট’রাও এখন এর সঙ্গে যুক্ত। ভারতের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি ২০১০ সালে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে শুধু প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে।১০ অনন্ত জলিল বোধহয় ব্র্যান্ডিংয়ের এই হিসাব সম্পর্কে খুব সচেতন, যার প্রমাণ তিনি মোস্ট ওয়েলকাম টু-এ দিয়েছেন। আর এক্ষেত্রে গ্রামীণফোন যেহেতু তাকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর মর্যাদা দিয়েছে সেহেতু এই ‘ঋণ’ শোধ করারও প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। যার প্রমাণ এই চলচ্চিত্রে অহরহ। যখনই মুঠোফোন, ফোন-ট্র্যাকিং কিংবা প্রজেক্টরের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার দেখানো হয়, তখনই ক্লোজ শটে ধরা পড়ে গ্রামীণফোন থ্রিজি, সামস্যাং গ্যালাক্সি মুঠোফোন সেট। এমনকি গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনের স্লোগানটিও মোস্ট ওয়েলকাম টু-এ অনন্ত ‘বেচে’ দিলেন এভাবে-‘অসম্ভবকে সম্ভব করা বাংলাদেশের কাজ’। তাহলে একটি সমীকরণ দাঁড় করানো যায়—
‘অসম্ভবকে সম্ভব করা অনন্ত-এর (গ্রামীণফোন) কাজ’
‘অসম্ভবকে সম্ভব করা বাংলাদেশের কাজ’
অতএব, অনন্ত (গ্রামীণফোন) = বাংলাদেশ, অন্যভাবে
গ্রামীণফোন = বাংলাদেশ
মোস্ট ওয়েলকাম টু-এ প্রদর্শিত পণ্যের তালিকায় আরো রয়েছে ইফাদ ফুডস ও যমুনা গ্রুপের পণ্য। একটি দৃশ্যে নায়কের বোন ভিডিও গেমস খেলছে আর চিপস খাচ্ছে। ক্যামেরা ক্লোজ শটে তার হাতে থাকা ইফাদ চিপস লেখায় ফোকাস করে; তার সামনেই টেবিলে রাখা দুটি ইফাদ মিনারেল ওয়াটারের বোতল। এর মধ্যে নায়কের মায়ের প্রবেশ। মা : ‘সারাদিন শুধু চিপস আর ভিডিও গেম, (রিমোট হাতে নিয়ে) দে তো দেখি দেশের কী অবস্থা।’ বোন : ‘জানো, বাজারে এই চিপসটা (প্যাকেটটা তুলে ধরে) নতুন এসেছে, স্কুলের সবার খুব প্রিয়, তুমি খেয়ে দেখো তোমারও প্রিয় হয়ে যাবে।’ এরপর চ্যানেল পাল্টে টিভিতে নায়ক-ভাইয়ের বীরত্বের সংবাদ দেখতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ইফাদ চিপস খেতে খেতে ওই ঘরে নায়কের এক খালাতো ভাই প্রবেশ করে। এবার তার সঙ্গে কথোপকথন চলতে থাকে। এমন সময় নায়কের প্রবেশ। নায়ক সোফায় বসে টেবিলে রাখা ইফাদ পানির বোতল হাতে নিয়ে পানি খেতে খেতে কথা বলতে থাকে। পুরো পরিবেশকে ধরতে ক্যামেরা এবার প্যান করে। এই পুরো ঘটনার ব্যাপ্তিকাল দুই মিনিট ৫১ সেকেন্ড।
আর একটি দৃশ্যে নায়ক শোকাবহ পরিবেশে পরিবারসহ খেতে বসেছে ডাইনিং টেবিলে। টেবিলের চারপাশ দিয়ে সাজানো ইফাদ পানির বোতল। ক্যামেরার ফোরগ্রাউন্ডে পানির বোতল, মাঝখানে নায়কের পরিবার আর ব্যাকগ্রাউন্ডে লাল রঙের যমুনা ফ্রিজ। এখানে সাবজেক্টকে বাদ দিয়ে ক্যামেরা কিন্তু অবজেক্টকে অর্থাৎ পানি ও ফ্রিজকে ফোকাল পয়েন্টে রাখে। কম্পোজিশনের রুল অব থার্ডের যথার্থ দৃষ্টান্ত দেখান সিনেমাটোগ্রাফার। বিজ্ঞাপনের অডিও-ভিজ্যুয়াল সব রীতি অনুসরণ করে শুধু প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট নয়, রিপ্লেসমেন্ট ঘটান অনন্ত।
গাহি যন্ত্রের জয়গান, হয় যদি
হোক শিল্পের বলিদান
যেসব বিষয়কে বাস্তবে উপস্থাপন করা কষ্টসাধ্য কিংবা কখনো কখনো সম্ভবই না সেক্ষেত্রে বা কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে চলচ্চিত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। যেখানে উদ্দেশ্যই থাকে দর্শকের সামনে বাস্তবতাকে নিখুঁত ও মসৃণভাবে উপস্থাপনের। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ভাষায়, যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন মূলের (মূল যে বস্তুকে নকল করা হচ্ছে) এমন সব বৈশিষ্ট্য তুলে আনতে পারে, খালি চোখে যেগুলো অধরাই থেকে যেত। যদিও যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের মধ্য দিয়ে কোনো শিল্পকর্মকে আমরা যেভাবে পাই, মূল শিল্পকর্মের পরিস্থিতির সঙ্গে তার তুলনা চলে না। কিন্তু এটি মূলের নকলকে এমন বাস্তবতায় নিয়ে আসতে পারে, যে বাস্তবতায় মূল নিজে কখনো পৌঁছুতে পারতো না।১১
সেই অর্থে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বাস্তবতা নির্মাণের একটি যান্ত্রিক কৌশল বলা চলে। যেখানে শিল্পের ছোঁয়া থাকবে; যেখানে প্রযুক্তি যান্ত্রিকতার খোলস থেকে বেরিয়ে এসে শৈল্পিকতায় রূপ নিবে।
কিন্তু অনন্তের আলোচিত দুটি চলচ্চিত্রে স্পেশাল ইফেক্ট বা গ্রাফিক্সের কাজ দেখে মনে হয়েছে, তিনি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন এ কারণে যে, তিনি চলচ্চিত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন এটা বোঝানোর জন্য! আর তিনি প্রযুক্তির পিছনে যে এতো অর্থ লগ্নি করেছেন তা যদি দর্শক না-ই বুঝতে পারে, তাহলে ব্যক্তি-অনন্তর মাহাত্ম্য কোথায়? আর সে জন্যই হয়তো কখনো তিনি গুণ্ডা বাহিনীকে আকাশে ঝুলিয়ে, গুলি করে গাড়ি উড়িয়ে, মোটর সাইকেল থেকে লাফিয়ে হেলিকপ্টার ধরে, কিংবা নায়িকাকে নিয়ে কৃত্রিম গ্রাফিকাল মরুভূমি, ফুলের বাগান বা সমুদ্রপাড়ে নাচগান করেন। তাহলে চলচ্চিত্র ভাষার নান্দনিকতার এ কোন্ রূপ অনন্ত তুলে ধরলেন? দর্শক তার মর্ম কতোটুকু বুঝেছেন জানি না, তবে আমাদের প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী মহাশয় কিন্তু মুগ্ধতায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। মোস্ট ওয়েলকাম টু দেখে গণমাধ্যমে তার প্রশংসা করেছেন এভাবে, ‘তিনি চলচ্চিত্রে যেভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার করেছেন তা এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ডিজিটাল হচ্ছে। এ ধরনের পদক্ষেপ ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।’১২
ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে অনন্তের এই অবদানকে মন্ত্রী মহাশয় অস্বীকার করবেন কীভাবে! এখন প্রশ্ন, এ নিয়ে অনন্তর কোনো ‘ডিজিটাল পলিটিকাল ইকোনমি’ কাজ করছে না তো?
‘সোনার বাংলা’ নির্মাণ প্রজেক্ট
গরিবের বন্ধু নায়ক বনাম খলনায়ক, এটিই বাংলা চলচ্চিত্রের শ্রেণি দ্বন্দ্বের আদর্শ প্লট। নায়ক কখনো বস্তিবাসী, কলেজ-ছাত্র; তারা কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, কখনো ধনীর মাল লুট করে গরিবের মধ্যে বিলিয়ে দেন। এই গণ্ডির বাইরে নায়ক কখনো সৎ পুলিশ কর্মকর্তা, আইনের ফেরে পড়ে যিনি আইনি দায়িত্ব (চাকরি) ছেড়ে কখনো সরাসরি আইন হাতে তুলে নেন, প্রতিবাদ করেন। এমনই এক পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত মোস্ট ওয়েলকাম টু-এ। তবে পার্থক্য হলো রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়, সর্বাত্মক সহযোগিতায় নানা ধরনের প্রজেক্টের মধ্য দিয়ে তিনি দেশোদ্ধারে নামেন। কিন্তু রাষ্ট্রের ছায়াতলে থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার অপশাসনকে কি নির্মূল করা সম্ভব? বিষয়টি তো অনেকটা জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতোই। তাহলে এই চলচ্চিত্রে নায়ক কি সেই দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিলেন, নাকি কুমিরের সঙ্গে মিতা পাতলেন?
নায়ক এ সি পি আরিয়ান ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন। বিকলাঙ্গ করে শিশু ও বৃদ্ধদেরকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করে—এমন এক গডফাদারকে শায়েস্তা করে সবাইকে উদ্ধারের পর সরকারি শিশুপল্লী ও বৃদ্ধাশ্রমে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। ভিক্ষাবৃত্তির এই পদ্ধতি নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর এবং এর বিরুদ্ধে নায়কের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, ভিক্ষাবৃত্তির কারণ হিসেবে শুধু ‘গডফাদারদের’ই দায়ী করা হলো, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কোনো ইঙ্গিত সেখানে অনুপস্থিত।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ভিক্ষাবৃত্তির অবসান ঘটিয়ে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। ২০১০ সালে এসে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়।১৩ তাই হয়তো দেশপ্রেমিক নায়ক সরকারের সঙ্গে নিজেও ভিক্ষাবৃত্তি রোধে চলচ্চিত্রের মাঠে নেমেছেন!
ঘটনার পরম্পরায় বিজ্ঞানী হাসান মঈন খানকে দেখা যায়, রূপপুর আণবিক প্রকল্পের একটি সেমিনারে ভাষণ দিতে যাওয়ার জন্য। তার নিরাপত্তায় নিযুক্ত হয় পুলিশ বাহিনী। প্রশ্ন হলো, এতো প্রকল্প থাকতে নায়ক-পরিচালক অনন্ত রূপপুর প্রকল্পকে বেছে নিলেন কেনো? দ্বিতীয়ত, সেই প্রকল্পের সমর্থনে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী মঈন খানই বা কেনো? ২০১০ সালে তৎকালীন সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের ভাষ্যমতে, ক্ষমতাসীন সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।১৪ এরই প্রেক্ষাপটে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে সরকার। সর্বশেষ ২ নভেম্বর ২০১১ রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর হয়।১৫
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেটি আদৌ সুরক্ষিত ও জনকল্যাণমূলক হবে কি না তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়। অথচ মোস্ট ওয়েলকাম টু-এ বিজ্ঞানী হাসান মঈন খান, যিনি ক্যান্সারের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন, আণবিক প্রকল্পকে জায়েজ করতে তার পক্ষে তাঁবেদারি করছেন। আর তার এই যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে সরকারের পুলিশ বাহিনীর এতো প্রচেষ্টা!
এদিকে বিজ্ঞানী হাসান মঈন খানের নাতি মানে নায়িকার ভাই অটিস্টিক শিশু বিল্টু। অটিস্টিক শিশু হিসেবে বিল্টুর প্রতি যথেষ্ট সহমর্মিতা দেখানো হয় মোস্ট ওয়েলকাম টু-তে। তাকে অটিস্টিক শিশু কল্যাণ স্কুলেও নেওয়া হয়। বিল্টুর উপস্থিতিতে ধারাবাহিক চারটি দৃশ্যের প্রথমটিতে, বিল্টুকে পারিবারিক পরিবেশে নায়িকার সঙ্গে দেখা যায়। নায়িকা বিল্টুর হাত ধরে আনন্দ করছে। দ্বিতীয় দৃশ্যে, নায়িকার বাড়িতে সন্ত্রাসীদের আক্রমণে দেখা যায় বিল্টুর ভীতসন্ত্রস্ত চেহারা। তৃতীয় ও চতুর্থ দৃশ্যে, বিল্টুকে অপহরণ এবং তাকে বাঁচাতে নায়কের প্রাণান্তকর চেষ্টা।
বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে দেখা যায়, মোস্ট ওয়েলকাম টুর যে ন্যারেটিভ, সেখানে একজন অটিস্টিক শিশুর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। বা এমনও হতে পারে পরিচালক একধরনের আবেগ তৈরি এবং মারপিটের দৃশ্যের সূত্র হিসেবে শিশুটিকে ব্যবহার করেছেন। তবে ভিক্ষাবৃত্তি রোধ ও রূপপুর প্রকল্পের উপস্থাপনে যে সন্দেহ মাথা চাড়া দেয়, অটিস্টিক শিশুর উপস্থাপনেও এ রকম ভাবার অবকাশ থেকেই যায়। প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সরকারের অটিস্টিক শিশুর উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিল্টু পর্দায় উঠে আসেনি তো?
কারণ অটিস্টিক শিশুর অধিকার ও সচেতনতা নিয়ে ১৯৯৬—২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় বেশ জোরেশোরে কাজ করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। তারা এবার অটিজম বিষয়ক সচেতনতায় ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও নিরাপত্তা আইন ২০১৩’ প্রণয়ন করেছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তনয়া অটিজম বিষয়ে সফলতার জন্য ‘ডব্ল্লিউ এইচ ও এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ও পেয়েছেন।১৬ এছাড়া ২০১৪—১৫ অর্থবছরে অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।১৭ তাহলে অনন্ত কি এখানেও ‘কুমিরের’ সঙ্গে মিতাই পাতলেন? আর সেজন্যই কি তিনি মোস্ট ওয়েলকাম টুকে সরকারের সব প্রকল্প দিয়ে সাজিয়েছেন! সেক্ষেত্রে এর নাম শুধু মোস্ট ওয়েলকাম টু না রেখে ‘মোস্ট ওয়েলকাম : দ্য গোল্ডেন বাংলা প্রজেক্ট’ রাখলেই যুক্তিযুক্ত হতো।
শেষ সমীকরণ
পক্ষিকুলের মধ্যে শকুন প্রজাতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্যসব পাখিরা যখন শুভ্রনীল মেঘের টানে আকাশ পানে উড়ে যায়, চোখ মেলে দেখতে চায় অপার সৌন্দর্যের বিশালতাকে; তখন শকুন ডানা মেলে উপরে ওঠে বটে, তবে চক্ষুদ্বয়কে অবনত রাখে ভূমিপানে, পাছে কোনো শিকারের সন্ধান মেলে। শকুনের শিকার অনুসন্ধানের এই মনোভাবের সঙ্গে সমাজের পুঁজিপতি পেশাদার ব্যবসায়ীদের বড্ড মিল। তাদেরকে যদি চাঁদেও পাঠানো হয়, তখন তারা ভাবতে শুরু করবেন, চাঁদের মাটি যদি পৃথিবীতে নিয়ে যেতে পারি তাহলে ‘মার্কেট প্রাইস’ কতো পাবো? তাই যদি এই শ্রেণির কোনো উত্তরসূরি ললিতকলা তথা চলচ্চিত্রের সুষমা বিকাশে অগ্রসর হয়, তাহলে সেখান থেকে ‘মার্কেট প্রাইস’ ছাড়া আর কীই-বা আশা করা যায়? আর এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে চলে বিভিন্ন রাজনীতি, তাঁবেদারি। চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে ‘মার্কেট প্রাইস’ খোঁজার মাধ্যম। অনন্ত জলিল সেটিই প্রমাণ করলেন। ভিঞ্চির ক্যানভাস তাই ফাঁকাই রইলো। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম সত্যিকারের কোনো শিল্পীর প্রত্যাশায়।
লেখক : মুর্শিদা টুম্পা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন।
tumpamcjru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. আজাদ, হুমায়ুন (১৯৯২ : ২৪); হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
২.http://en.wikipedia.org/wiki/Khoj:_The_Search
৩.http://en.wikipedia.org/wiki/Most_Welcome
৪.http://boxofficebangladesh.wordpress.com/all-time-highest-grosser/
৫. মামুন, আ-আল (২০১৩ : ২৩১); ‘বাংলা সিনেমা উদ্ধারপ্রকল্প : চন্দ্রকথা, ব্যাচেলরদের পোয়াবারো’; মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৬. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী প্রদত্ত এই বক্তব্যটি নেওয়া হয়েছে মাজার সংস্কৃতি বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র ‘কী সন্ধানে যাই সেখানে’ থেকে। প্রামাণ্যচিত্রটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হয়নি।
৭. ইউটিউব থেকে পাওয়া সাক্ষাৎকারটির ভিডিও লিঙ্ক : https://www.youtube.com/watch?v=NET1ApR0MF0
৮. রহমান, সাদিকুর (২০০৯ : ৬৫); আন্তোনিও গ্রামসির সহজ পাঠ; ঘাস ফুল নদী প্রকাশ, ঢাকা।
৯. http://en.wikipedia.org/wiki/Product_placement
১০. http://www.darashiko.com/2012/06/product-placement-in-films/#.VGtRo2dxXIV
১১. বেঞ্জামিন, ওয়াল্টার; ‘যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলা’; ভাষান্তর : জাকির হোসেন মজুমদার ও মোহাম্মাদ আজম, যোগাযোগ; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; সংখ্যা ৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ৫৬, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১২. সাক্ষাৎকারটি ৩০ জুলাই ২০১৪ তারিখে যমুনা টিভির সন্ধ্যা সাতটার সংবাদভিত্তিক আয়োজন ‘যমুনা নিউজ’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
১৩. ‘ভিক্ষুক জরিপ ও পুনর্বাসন, বরাদ্দ আছে, ব্যবহার হয়নি এক বছরেও’; প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৪।
১৪.http://goo.gl/K5pFam
১৫.http://en.wikipedia.org/wiki/Nuclear_energy_in_Bangladesh
১৬.https://mygoldenbengal.wordpress.com/2014/10/29/saima-wazed-wins-who-award/
১৭.http://www.albd.org/index.php/en/resources/special-reports/1261-addressing-autism-and-disabilities-the-bangladesh-story
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন