Magic Lanthon

               

আশফাক দোয়েল

প্রকাশিত ২৬ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চাঁদ তার আলো ধরে রাখতে পারবে তো

‘আকাশেতে লক্ষ তারা, ধুম : থ্রি একটারে’

আশফাক দোয়েল


ভূমিকা

জন্মলগ্ন থেকেই চলচ্চিত্রকে দুইটি স্বার্থ নিয়ে চলতে হয়েছে। প্রথমটি, শিল্পীদেরযারা এই নতুন প্রচার-মাধ্যমটিকে আবিষ্কার করেছিলো এক অভিনব শিল্পকলা হিসেবে। দ্বিতীয়টি, ব্যবসায়িক স্বার্থযাদের কাছে এই মাধ্যমটি ছিলো নিছক ব্যবসায়িক পণ্য। তবে এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবসায়িক স্বার্থই সম্ভবত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে এই মাধ্যমটির ওপর। ইতিহাস জানান দেয়, সেই আদিযুগ থেকেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে আর্থিক মুনাফার চিন্তাটা জড়িয়ে ছিলো। ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রদর্শিত প্রথম চলচ্চিত্রকে প্রবেশমূল্য দিয়েই দেখতে হয়েছে সাধারণ দর্শকদের। ফলে এই মাধ্যমটি কিছুদিনের মধ্যেই লাভজনক ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করে সারাবিশ্বে। আর এই সফলতাই পরবর্তী সময়ে বুদ্ধিমান ব্যবসায়ীদের টেনে আনে চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও নির্মাণে। ভারতীয় চলচ্চিত্রও এর বাইরে নয়; সেই ১৮৯৬ সালে ভারতের বোম্বেতে (মুম্বাই) প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সময় দর্শকের কাছ থেকে এক রুপি করে নেওয়া হয়েছিলো। সেই এক রুপির ব্যবসা ভারতীয় চলচ্চিত্রে আজ ছড়িয়েছে শত শত কোটিতে।

বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার এবং চলচ্চিত্র-নির্মাণের জটিলতা কমে যাওয়ায় ভারতের বিশাল এই ব্যবসা শুধু উপমহাদেশে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপসহ সারাবিশ্বের বাজারে প্রবেশ করেছে। ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি আজ নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রেকর্ড আয় করা ধুম : থ্রি এর বড়ো প্রমাণ।

দুইশো ৬০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত ধুম : থ্রি ভারতে নয় হাজার ও বিদেশে নয়শো প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পায়। প্রথম দিনেই নিজেদের বাজারে চলচ্চিত্রটি আয় করে ৩৫ কোটি রুপি এবং প্রথম সপ্তাহে আয় করে একশো ২০ কোটি রুপি; আর বাকি বিশ্বসহ আয় করে মোট পাঁচশো ৩০ কোটি রুপি। আয়ের দিক দিয়ে যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এখানেই শেষ নয়, নতুন পরাশক্তি চিনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি মিটাতে ধুম : থ্রির ওপর ভরসা পর্যন্ত করছে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চলচ্চিত্রটি কিছুদিনের মধ্যেই চিনের দুইশোটি প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এখন খুব স্বাভাবিক প্রশ্নকী রয়েছে এই চলচ্চিত্রে, যা প্রেক্ষাগৃহমুখী করেছে এতো দর্শককে; একচেটিয়া ব্যবসা করেছে সারাবিশ্বে? এই প্রবন্ধে মূলত দর্শকদের দিক থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে।

 

চলচ্চিত্র, ব্যবসা ও দর্শক

একশো বছর পার করলো ভারতীয় চলচ্চিত্র। আগেই বলেছি, দীর্ঘ এই সময়ে নান্দনিক পরিবেশনা, ধুমধাড়াক্কা নাচ-গান, নামিদামি নায়ক-নায়িকা ও দর্শকপ্রিয়তায় দেশটির চলচ্চিত্র সারাবিশ্বে তার অবস্থান জানান দিয়েছে। লুমিয়েরদের হাত ধরে ভারতবর্ষে চলচ্চিত্র আসার এক দশক পরেই ১৯১৩ সালে কাহিনিচিত্র নির্মাণের কৃতিত্ব দেখান দাদা সাহেব ফালকে। মহাভারত-এর কাহিনি অবলম্বনে রাজা হরিশচন্দ্র নামে চলচ্চিত্রটি ভারতবর্ষের প্রথম কাহিনিচিত্র হিসেবে পরিচিত। তার এই চলচ্চিত্রটির হাত ধরেই শুরু হয়েছিলো ভারতের নিজস্ব চলচ্চিত্রের যাত্রা। এর কিছুদিনের মধ্যেই ভারতের মুম্বাইয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে চলচ্চিত্রশিল্প; সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শকও।

৩০-এর দশকে আরদেশির এম ইরানিআলম আরার প্রেমনির্ভর কাহিনির মধ্য দিয়ে ভারতে শুরু হয় সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা। চলচ্চিত্রটি এ সময় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলো। কারণ, একদিকে ভাষাগত মিল, অন্যদিকে সবাক যুগের শুরুতেই চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার। ইরানি অবশ্য গান ব্যবহারের এই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ভারতীয় লোকসংস্কৃতি থেকেই। নির্বাক যুগে মূলত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হতো মঞ্চনাটক বা যাত্রা অনুকরণ করে। আর এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সময় পর্দার আড়াল থেকে গাওয়া হতো গান। যাতে মঞ্চনাটক কিংবা যাত্রা দেখতে অভ্যস্ত দর্শকরা এটির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। নির্বাক যুগের সেই ধারণা ইরানি সবাক যুগে তার চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন; যুক্ত হয় ডজনখানেক গান ও নাচ। ফলে চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে বেশ সফল ও দর্শকপ্রিয়তা পায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পর অর্থাৎ ৪০ থেকে ৫০-এর দশকে চলচ্চিত্রের কাহিনিকে ছাপিয়ে এই নাচ-গানই প্রধান হয়ে ওঠে মাসালা চলচ্চিত্রে। অর্থাৎ এসব চলচ্চিত্রে আবশ্যিক উপাদান হিসেবে থাকত বিশেষ বিশেষ অভিনেতা-অভিনেত্রী, বিশেষ ধরনের গল্প-চরিত্র-নাচ-গান, বিশেষ অঞ্চলে বিশেষ কায়দার দৃশ্য, বিশেষ কিছু রসের প্রকাশ। ফলে নতুন ধারার এই মাসালা চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আর এই দর্শকপ্রিয়তা ধরে রাখতেই পরিচালকরা শিল্পকে গুরুত্ব না দিয়ে, শুধু বিনোদনের খোরাক হিসেবে মাধ্যমটিকে ব্যবহার শুরু করে।

৬০-এর দশক ছিলো ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ। কারণ এই সময় চলচ্চিত্রের নির্মাণ যেমন বেড়ে যায়, তেমনি সারাবিশ্বে প্রশংসিতও হয়। এ সময়ের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র মুঘল-ই-আযম (১৯৬০)। সেলিম-আনারকলির প্রেম-কাহিনি নিয়ে নির্মিত মুঘল-ই-আযম-এ ব্যবহৃত গান ও অভূতপূর্ব সেট দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। চলচ্চিত্রটি প্রথম সপ্তাহে আয় করে ৪০ লক্ষ টাকা, আর মোট আয় পাঁচ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। এ সময় দিলীপ কুমার, মিনাকুমারী ও পৃথ্বিরাজ কাপুরের মতো বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি নায়ক-নায়িকারও উত্থান হয়েছিলো ভারতীয় চলচ্চিত্রে।

এবার আসা যাক ৭০-এর দশকে। এ সময় ভারতে অ্যাকশন, কমেডি ও রোমান্টিক চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। কারণ ৬০-এর দশকে ভারতে যে শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছিলো সেখানে কাজ করতে গ্রামের প্রচুরসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হয়। এ সময় এই মানুষের বিনোদনের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে কাজ না পাওয়া এই অসহায় মানুষগুলোর স্বপ্নভঙ্গ হতে থাকে। তারা সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। নির্মাতারা এ সময় ঠিক এই বিষয়গুলো তুলে আনতে থাকেন তাদের চলচ্চিত্রে। ফলে নিজেদের বাস্তব অবস্থা সেলুলয়েডে উঠে আসায় অসহায় এই মানুষের ঢল নামতে থাকে প্রেক্ষাগৃহে; ব্যবসাও হয় জমজমাট। এ সময়ের ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের মধ্যে দিওয়ার (১৯৭৫), শোলে (১৯৭৫), ত্রিশূল (১৯৭৮), মুকাদ্দার কা সিকান্দার (১৯৭৮) উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় হয় শোলে। রোমান্টিক, কমেডি, ড্রামা ও গানের সংমিশ্রণে রমেশ সিপ্পি শোলে নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রটি সেসময় ভারতে এতই দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিলো যে, একটি প্রেক্ষাগৃহে একটানা পাঁচ বছর চলেছিলো। এমনকি ৭৫ সপ্তাহ ধরে অসংখ্য প্রেক্ষাগৃহে শোলের আগাম সব টিকেট বিক্রি হয়ে যায়।

৮০ ও ৯০-এর দশকে এসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অ্যাকশন ধারার চলচ্চিত্রগুলো দর্শকপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে। অন্যদিকে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে ৩০ দশকের পরিবারকেন্দ্রিক রোমান্টিক ধারার চলচ্চিত্র। এ সময় ব্যবসাসফল হয় ম্যায়নে পেয়ার কিয়া (১৯৮৯)। নবাগত ভাগ্যশ্রী ও সালমান খানের প্রেমনির্ভর এই চলচ্চিত্রটি ঝড় তোলে বক্স অফিসে।

এছাড়া ৯০ দশকের আরেকটি চলচ্চিত্র হাম আপকে হ্যায় কৌন (১৯৯৪); সালমান খান ও মাধুরি দীক্ষিত অভিনীত পরিবারকেন্দ্রিক এই চলচ্চিত্রটি প্রমাণ করেছিলো, জনপ্রিয় ফর্মুলায় যৌনতা ও মারদাঙ্গা চলচ্চিত্র কীভাবে সুস্থ-পারিবারিক কাহিনির কাছে পর্যুদস্ত হতে পারে। সেসময় গোটা ভারতে ৬৫ লক্ষ দর্শক প্রতিদিন চলচ্চিত্রটি দেখেছে এবং প্রায় ৫০ কোটি রুপি ব্যবসা করেছিলো। এছাড়া শুধু অডিও ক্যাসেটে গান বিক্রি বাবদ আয় হয় ৭০ লক্ষ রুপি।

নতুন শতাব্দীর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম দশকই ছিলো বিচিত্র ধরনের গল্প, অভিনয় কুশলতা, আইটেম সঙ্ ও বিগ বাজেটের চলচ্চিত্রে ভরপুর, সঙ্গে বিশাল ব্যবসাও। এ সময় সারাবিশ্বে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিশাল বাজার গড়ে উঠতে থাকে। এই দশকের মুক্তি পাওয়া আমির খান অভিনীত লগন (২০০১), রঙ দে বাসন্তী (২০০৬), তারে জামিন পার (২০০৭) কোটি কোটি রুপি আয় করে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র লগন। উপমহাদেশের জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করার অভিনব কাহিনি নিয়ে লগন নির্মাণ হয়। চলচ্চিত্রটি সেই সময় আয় করে প্রায় ৪৭ কোটি রুপি।

এখন হলিউডের মতো ভারতীয় চলচ্চিত্রে চলছে সিক্যুয়াল ও রিমেকের প্রতিযোগিতা। কোনো চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হলেই তার সিক্যুয়াল তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেমন : রেস, রেস টু; দাবাং, দাবাং টু; ধুম, ধুম : টু, ধুম : থ্রি; গোলমাল থেকে গোলমাল ফাইভ পর্যন্ত সিক্যুয়াল করা হয়েছে। অনেক আগে নির্মিত দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রের রিমেকের পাশাপাশি তামিল বা অন্য ভাষার ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র তো আছেই। আর দর্শকরাও এগুলো দেখতে প্রেক্ষাগৃহমুখী হচ্ছে। ফলে একদিকে বাড়ছে সিক্যুয়াল চলচ্চিত্র-নির্মাণের সংখ্যা; অন্যদিকে একে কেন্দ্র করে বেড়ে চলেছে মুনাফার প্রতিযোগিতা।

এছাড়াও এই দশকের চলচ্চিত্রে আরেকটি বিষয়ের প্রাধান্য বেড়েছেগান। ভারতীয় চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার অবশ্য সেই ৩০-এর দশক থেকেই চলে আসছে। তবে বর্তমানের এই গানগুলো আইটেম সঙ্ বলে বিশেষ নামে আবির্ভূত হয়েছে। কাহিনির সঙ্গে সম্পর্কহীন, নারী-শরীরকেন্দ্রিক এসব গান চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেছে এক নতুন জায়গায়। তবে এই ধারার গানের প্রচলনও হঠাৎ করে শুরু হয়েছে এমন নয়। সেই ৪০-এর দশক থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে বিশেষ ধরনের এই গান। তবে সেসময় আইটেম সঙে মূল নায়ক-নায়িকার বাইরে অন্য কাউকে দেখা যেতো। যাদেরকে প্রচলিত ভাষায় ভ্যাম্প (vamp) বলা হয়। কিন্তু এখন বেশিরভাগ আইটেম সঙে অংশ নিচ্ছেন হার্টথ্রব নায়িকারা। ফলে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে যতো না আয় হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে আইটেম সঙ্ দিয়ে। তাহলে কি চলচ্চিত্রের দর্শকরা শুধু আইটেম সঙ্ দেখার জন্যই চলচ্চিত্র দেখছে? যদি তা-ই না হতো, তাহলে তিসমার খান বা দম মারো দম-এর মতো দুর্বল কাহিনির চলচ্চিত্রগুলো কীভাবে ব্যবসায়িক সফলতা পেলো?

পাঠক, মোশন ক্যাপচার প্রযুক্তির আদলে নির্মিত স্পিলবার্গের হলিউডি চলচ্চিত্র দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব টিনটিন ও জেমস ক্যামেরনের অ্যাভাতার নিশ্চয়ই সবাই দেখেছেন। এই প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্যবাস্তবে নায়ক-নায়িকা যেভাবে হাত-পা ছোড়ে, মুখভঙ্গি করে চলচ্চিত্র পর্দায়ও ঠিক একইভাবে তাদের দেখা যাবে, তবে তা হবে অ্যানিমেটেড। বর্তমানে ভারতের চলচ্চিত্রও এই যুগে প্রবেশ করেছে। তামিলের সুপারহিরো রজনীকান্ত ও বলিউডের দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত কোচাদাইয়ান ভারতের প্রথম মোশন ক্যাপচার চলচ্চিত্র।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রতি দশকেই কমবেশি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র এসেছে। এই ধারা হয়তো অব্যাহত থাকবেও। কিন্তু এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে যারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে তারা হলো দর্শক। এই দর্শকরা যুগে যুগে তাদের আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে এই শিল্পকে। তারা চলচ্চিত্র দেখে কেঁদেছে, হেসেছে, মিলিয়েছে জীবনের সঙ্গে। সাধারণ দর্শক যে কতোভাবে চলচ্চিত্রকে তার জীবনের সঙ্গে মিলায়, কতোভাবে তাকে ধারণ করেতার শেষ নেই। দর্শকের সেই জীবন, জীবনের সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক, তার দেখাসবকিছু নিয়েই সে দর্শক।

যাদের সঙ্গে, যেভাবে কথা বলা হয়েছে

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য ধুম : থ্রি দেখেছে রাজশাহী শহরের এমন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে কথা বলা হয়েছে। নমুনায়নের সুবিধার্থে সমগ্রককে পাঁচটি বর্গে ভাগ করা হয়। প্রথমত, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী (বিশেষ করে নবমদশম শ্রেণি); দ্বিতীয়ত, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী; তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; চতুর্থত, চাকরিজীবী (প্রাথমিক, উচ্চ ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশ) ও পঞ্চমত, সাধারণ পেশাজীবী (রেস্টুরেন্টকর্মী, রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, অটোরিকশাচালক ও ঝাড়ুদার)। সমগ্রক থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সচরাচর সামনে পাওয়া গেছে এমন ৪০ জনকে নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বর্গের জন্য আটজনকে নেওয়া হয়, যাদের চারজন নারী ও চারজন পুরুষ।

বর্গ

নমুনায়িত সংখ্যা

পুরুষ + মহিলা

মাধ্যমিক শিক্ষার্থী

৮ জন

৪ জন পুরুষ + ৪ জন নারী

উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী

৮ জন

৪ জন পুরুষ + ৪ জন নারী

সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী

৮ জন

৪ জন পুরুষ + ৪ জন নারী

চাকরিজীবী

৮ জন

৪ জন পুরুষ + ৪ জন নারী

সাধারণ পেশাজীবী

৮ জন

৪ জন পুরুষ + ৪ জন নারী

 

যতো ধরনের মতামত পাওয়া গেলো

ধুম : থ্রি দেখায় আগ্রহের কারণ

নমুনায়িত দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে ধুম : থ্রি দেখায় আগ্রহী হওয়ার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি কারণ জানা গেছে। চলচ্চিত্রটি দেখার পর ইতিবাচক বা নেতিবাচক যে মন্তব্যই দর্শকরা করুক না কেনো, তাদের প্রায় সবাই নীচের পাঁচটি কারণের কোনোটি বলেছেন :  

১. বেশিরভাগ দর্শকের ধুম : থ্রির আগের দুটি পর্ব দেখা থাকায়, তার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পর্বটি দেখেছে বলে জানিয়েছে। আগের দুটি চলচ্চিত্রের মূল বিষয় ছিলো চুরি। তারা ভেবেছিলো, এবারো হয়তো চুরিই দেখানো হবে, আরো নতুন কোনো কৌশলে, নতুন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

২. প্রোমো দেখে তারা চলচ্চিত্রটি দেখতে আগ্রহী হয়েছে। কারণ প্রোমোতে যে গান ও অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো দেখে তাদের ভালো লেগেছিলো।

৩. আমির খান ও ক্যাটরিনা কাইফের প্রথম জুটি ধুম : থ্রি। কারো পছন্দ আমির খান, কারো পছন্দ ক্যাটরিনা কাইফ, আবার কারো কাছে এ দুইজনই পছন্দের। প্রিয় নায়ক-নায়িকাকে দেখার জন্য তারা চলচ্চিত্রটি দেখেছে।

৪. সব হিন্দি চলচ্চিত্রই দেখা হয়, তাই ধুম : থ্রিও দেখেছেএমন কারণের কথাও বলেছে কেউ কেউ।

৫. ধুম : থ্রি অনেক টাকা ব্যবসা করেছে; কী আছে এই চলচ্চিত্রে যে কারণে এতো টাকা ব্যবসা করলোএই কৌতূহলে অনেকে চলচ্চিত্রটি দেখতে আগ্রহী হয়েছে।

ধুম : থ্রি যে কারণে ভালো লাগেনি

ক. সিক্যুয়াল ও প্রোমো : যা ভেবেছিলাম তা নয়

চোর-পুলিশের কাহিনি নিয়ে নির্মিত ধুম-এর সিক্যুয়াল ধুম : থ্রি। আগের চলচ্চিত্রের মূল বিষয় বা আবহে মিল রেখে নতুন কোনো কাহিনি নিয়ে সাধারণত সিক্যুয়াল নির্মাণ হয়। তবে সিক্যুয়ালের প্রতিটি চলচ্চিত্রের রয়েছে আঙ্গিকগত ভিন্নতা। ভারতীয় চলচ্চিত্রে ৮০র দশকের শেষের দিকে নাগিনার (১৯৮৯) মাধ্যমে সিক্যুয়ালের যাত্রা শুরু। তবে সেই সময়ের সিক্যুয়াল চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের এতটা প্রভাবিত করতে পারেনি। কিন্তু বিংশ শতকে এসেই এই সিক্যুয়াল চলচ্চিত্রের হিড়িক পড়ে যায়। কারণ বর্তমানে সিক্যুয়াল নির্মাণের একটি বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসা। কোনো একটি চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে সফল হলেই সেটির সিক্যুয়াল নির্মাণের পাঁয়তারা চলে।

ঠিক একই ব্যাপার ঘটে ধুম : থ্রির ক্ষেত্রেও। ধুম ২০০৪ সালে ৭২ কোটি ৪৭ লক্ষ রুপি আয় করে। আর্থিক সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ২০০৬ সালে নির্মাণ হয় ধুম : টু। এটি আয় করে একশো ৫০ কোটি রুপি। অর্থাৎ ধুম : টুর সাফল্য ধুমকে ছাড়িয়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ। ফলে সাফল্য আরো দ্বিগুণ করতে উন্নত প্রযুক্তি, নামিদামি নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে ২০১৩ সালে নির্মাণ হয় ধুম : থ্রি। চলচ্চিত্রটি মুক্তির কয়েক সপ্তাহে সারাবিশ্বে পাঁচশো ৩০ কোটি রুপি আয় করে আগের রেকর্ড ভেঙে দেয়। কিন্তু ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য লাভ করা এই চলচ্চিত্রটি দেখেছে এমন নমুনায়িত দর্শকের ৪০ শতাংশই এটির সিক্যুয়াল নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এমনকি সিক্যুয়ালের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আগের চলচ্চিত্রের সঙ্গে এই চলচ্চিত্রের তেমন মিলও তারা খুঁজে পায়নি। কারণ হিসেবে দর্শকরা বলেছে, ধুম : থ্রিতে চুরির পরিকল্পনার কথা বলা হলেও চুরিটা ঠিক কেমন করে হলো তা দেখানো হয়নি। তাদের কাছে ধুম : থ্রিতে সাহেরের (আমির খান) চুরি করার কায়দা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের চেয়ে ধুম-এর কাবির (জন আব্রাহাম) ও ধুম : টুর মিস্টার এর (হৃত্বিক রোশন) চুরি করার কায়দাগুলো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।

ধুম সিরিজের অন্য দুটি চলচ্চিত্রে যে ধরনের চুরির কৌশল ছিলো, দর্শক তার চেয়ে আরো নতুন কিছু চেয়েছিলো ধুম : থ্রিতে। ব্যাংকের ডলার রাস্তায় ওড়া, আর সাহেরের বাইক হাঁকিয়ে সার্কাসে জাদু দেখিয়ে পালিয়ে যাওয়া দেখার চেয়ে দর্শক দেখতে চেয়েছিলো ব্যাংকের ডলার কীভাবে রাস্তায় আসলো বা সাহের কীভাবে জাদু দেখিয়ে পালিয়ে গেলো। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, দর্শকের নিজস্ব কল্পনাশক্তি রয়েছে। চলচ্চিত্রে সে এই কল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চায়। সে তার কল্পনার বাইরের কিছু সহজে গ্রহণ করতে পারে না। ধুম : থ্রির ক্ষেত্রেও কিছু দর্শকের তেমনটি হয়েছে। যে কারণে ধুম : থ্রি সিক্যুয়ালের বৈশিষ্ট্য মেনে নির্মাণ হলেও তা ওই দর্শকের কাছে ভালো লাগেনি।

চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য নিয়ে নির্মাণ হয় তার বিজ্ঞাপন, হালে যাকে প্রোমো বলা হয়। প্রোমো দেখানোর মূল উদ্দেশ্য হলো দর্শক যেনো চলচ্চিত্রটি দেখতে আগ্রহী হয়। প্রোমোর দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩০৪৫ সেকেন্ড হয়ে থাকে। নমুনায়িত দর্শকদের মধ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কাছে ধুম : থ্রির প্রোমোটি ভালো লেগেছিলো। তবে প্রোমোর সঙ্গে চলচ্চিত্রের তেমন মিল না পাওয়ায় তারা ধুম : থ্রি দেখে হতাশ হয়েছে। কারণ, প্রোমো দেখে বেশিরভাগ দর্শকই মনে করেছিলো কমেডি, অ্যাকশন ও চুরি করার বিষয়টি ধুম সিরিজের অন্যান্য চলচ্চিত্রের চেয়ে ধুম : থ্রিতে আরো সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

খ. সমস্যা যখন নায়ক-নায়িকা

সবচেয়ে বেশি দর্শক যে কারণে ধুম : থ্রি দেখেছে তা হলো নায়ক-নায়িকা। ধুম : থ্রির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউডে মিস্টার পারফেক্ট খ্যাত আমির খান, হার্টথ্রব ক্যাটরিনা কাইফ ও অভিষেক বচ্চন। এই উপমহাদেশে (এখন অবশ্য তা উপমহাদেশও ছাড়িয়েছে) যাদের বিপুল পরিমাণ ভক্ত-দর্শক রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৫৮ শতাংশ দর্শকের কাছে ধুম : থ্রিতে এই তিনজনের কারো অভিনয়ই ভালো লাগেনি। এমনকি আমির-ক্যাটরিনা জুটিকে মানায়নি বলেও তাদের মতামত। কারণ হিসেবে ২৫ শতাংশ দর্শক বলেছে, আমির খানের চেয়ে ক্যাটরিনা কাইফের শারীরিক উচ্চতা বেশি, যা তাদের কাছে মোটেও ভালো লাগেনি।

অর্থাৎ বাস্তব জীবনে এই দর্শক নারী-পুরুষকে মিলানোর ক্ষেত্রে যেভাবে তাদের শারীরিক কাঠামোর মূল্যায়ন করে, চলচ্চিত্রেও কিন্তু সে তারই প্রতিফলন দেখতে চায়। তাদের ধারণাই এমন, নারী উচ্চতায় অবশ্যই লম্বা হতে পারে, কিন্তু তা মোটেও পুরুষের চেয়ে নয়। আর কখনো যদি তা হয়, সেটা বেমানান! কেননা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোতে পুরুষের অপরাজিত শারীরিক অবয়বটাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে নারীর থাকবে রূপ-লাবণ্য, কিন্তু শক্তিমত্তা ও সাহসের দিক থেকে পুরুষরাই এগিয়ে থাকবে।

নমুনায়িত দর্শকের কাছে আরেকটি বিষয় খারাপ লেগেছেআমির খানের নেতিবাচক অভিনয়। ১২ দশমিক ৫ শতাংশ দর্শক বলেছে, এই ধরনের চরিত্রে তাকে মানায় না। কারণ তিনি নায়ক। আর নায়ক কোনো নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করতে পারে না বলে তারা মনে করে। আসলে নায়ক-এর একটি ডিসকোর্স দাঁড়িয়ে গেছে; নায়ককে অবশ্যই সৎ ও ভালো হতে হবে, কোনো ধরনের দোষ থাকা যাবে না। তাই হয়তো ধুম : থ্রির মূল চরিত্রে আমির থাকা সত্ত্বেও দর্শকদের কাছে তাকে ভালো লাগেনি। অর্থাৎ নায়ক সংক্রান্ত ডিসকোর্সে দর্শক এতটাই মগ্ন যে, ঠিক কোন্ পরিপ্রেক্ষিতে সাহের (আমির খান) এ ধরনের একটা অবস্থান নিলো সেটা তারা বিবেচনাতেই আনতে চায়নি। আবার, নমুনায়িত দর্শকের ২০ শতাংশের কাছে অ্যাকশন চরিত্রে তাকে ভালো লাগেনি। অথচ ২০০৮ সালে গজনিতে এই আমির খানের অ্যাকশনই বেশ সাড়া ফেলেছিলো। চলচ্চিত্রটি সে বছর দুইশো কোটি রুপি (দেশে একশো ৬০ কোটি আর দেশের বাইরে ৪০ কোটি ) আয় করে।

এ তো গেলো নায়কের কথা, নমুনায়িত দর্শকের ২০ শতাংশ নায়িকা হিসেবে ক্যাটরিনা কাইফকেও পছন্দ করেনি। তারা বলেছে, নায়িকা হিসেবে ক্যাটরিনাকে নিষ্ক্রিয় মানে অনেকটা শো পিস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের উপস্থিতির জন্য তাকে বাদ দিয়ে একজন সাধারণ মডেলকে কাস্ট করলেই হতো। তার মানে এক শ্রেণির দর্শক নাচ-গানে শরীরী উপস্থাপনার বাইরেও নায়িকার অভিনয় দেখতে চেয়েছে। যদিও হিন্দি চলচ্চিত্রে নায়িকা মানেই নায়কের প্রেমিকা, সঙ্গে অর্ধ-নগ্ন হয়ে নেচে-গেয়ে দর্শকের অবসাদ দূর করা। ধুম : থ্রির কিছু দর্শক ক্যাটরিনার ক্ষেত্রে এটা মেনে নিতে পারেনি। এক্ষেত্রে দুটি ঘটনা ঘটতে পারে : প্রথমত, প্রিয় নায়িকা ক্যাটরিনার এ অবস্থা তারা হয়তো মেনে নিতে পারেনি; দ্বিতীয়ত, তারা হয়তো নাচ-গানের বাইরে অভিনয়ের যে নায়িকা সেটা দেখতেই আগ্রহী। এই ছোটো আলোচনায় অবশ্য দর্শকের চিন্তা অতো দূর বিন্যাসে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এতটুকু বোঝা যাচ্ছে, দর্শকের এই চিন্তা খুব সহজে ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না।

গ. কাহিনি : কল্পনাকে ছড়িয়ে

ধুম : থ্রির কিছু দৃশ্য বাস্তবসম্মত কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দর্শকরা; বিশেষ করে সাহেরের বাইক চালানো। চলচ্চিত্রে বাইকটিকে কখনো পানিতে, কখনো পানির নীচে, দড়ির উপর দিয়ে, কখনো উড়ে যেতে দেখা গেছে। নমুনায়িত দর্শকদের ৩০ শতাংশ বলেছে, এই দৃশ্যগুলো খুবই অবাস্তব। বোঝা যায়, চলচ্চিত্রে তিন ঘণ্টার জগতে বিভ্রম তৈরি হয় ঠিক, কিন্তু তার সঙ্গেও দর্শক বাস্তবতার মিল খুঁজতে থাকে। ফলে যতোক্ষণ পর্যন্ত বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সে কল্পনার মিল খুঁজে পায়, ততোক্ষণ পর্যন্ত তারা চলচ্চিত্রে তা হয়তো গ্রহণ করে। কিন্তু যখনই হাইটেক প্রযুক্তির ব্যবহারে অতি কাল্পনিকতা নির্মাণ হয়, তখন দর্শকের কাছে তা আর ভালো লাগে না। এই মেনে নেওয়া, না-নেওয়ার সঙ্গে অবশ্য দর্শক যে বাস্তবতায় বেড়ে ওঠে তার একটা বড়ো সম্পর্ক আছে। তাই সামাজিক বাস্তবতায় চলচ্চিত্রে প্রযুক্তিকে কতোখানি ব্যবহার করা যাবে বা যাবে না সেটা নিয়েও ভাববার অবকাশ আছে।

এছাড়াও দর্শক এমন চলচ্চিত্র দেখতে চায়, যা তাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবে। অর্থাৎ কাহিনি হতে হবে আকর্ষণীয় ও নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ। কিন্তু ধুম : থ্রির ১২ দশমিক ৫ শতাংশ দর্শক বলেছে, অর্ধেকে গিয়ে তাদের আর চলচ্চিত্রটি দেখতে ভালো লাগেনি। কারণ এ সময়েই (বিরতি) তারা বুঝে গিয়েছে কাহিনির শেষে ঠিক কী ঘটবে।

ঘ. অভিযোগ আছে গান নিয়েও

ভারতীয় চলচ্চিত্রে গানের আধিপত্য সেই শুরু থেকেই। বলিউডে খুব কম চলচ্চিত্রই আছে যেখানে গান নেই। বর্তমানে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর আয়ের অন্যতম উৎস সম্ভবত গানের স্বত্ব বিক্রি। নির্মাতারা কোরিওগ্রাফারকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মেধা, মনন, মূলধনের প্রায় পুরোটাই বিনিয়োগ করে গান ও তার চিত্রায়ণে। যেকোনো উপায়ে গান দর্শকপ্রিয় হওয়া চাই-ই-চাই। মজার ব্যাপার হলো, অনেক ফ্লপ চলচ্চিত্রের গানও হিট। কোনো কোনো গান তার চলচ্চিত্রকেও ছাড়িয়ে গেছে।

তবে উল্লেখ্য, ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বেশি আয় করা ধুম : থ্রির গানগুলো দর্শককে মোটেও বিনোদন দিতে পারেনি। ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ দর্শকের কাছে ধুম সিরিজের অন্য চলচ্চিত্র থেকে ধুম : থ্রির গান ভালো লাগেনি। তাদের দাবি, ধুম-এর জনপ্রিয়তার মূল কারণ সিক্যুয়াল ও তার গান। এই সিরিজের থিম সঙ্ ধুম মাচালে গানে ক্যাটরিনার গ্ল্যামার ও কোরিওগ্রাফি ভালো বললেও এর মিউজিক নাকি তাদের ভালো লাগেনি। ধুম-এর গানটির আদলেই এই গানটি হওয়ায় তারা নাকি হতাশ হয়েছে। এতে তারা কোনো নতুনত্ব পায়নি। আবার ধুম : থ্রিতে মালাংকামলি শিরোনামে গান দুটি শ্রুতিমধুর হলেও সেখানে নাকি ক্যাটরিনার নাচ তাদের ভালো লাগেনি। ধুম সিরিজের তিনটি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন প্রিতম। দর্শকের মত, প্রথম দুটি চলচ্চিত্রে তিনি কম্পোজিশন পারদর্শিতা দেখালেও ধুম : থ্রিতে তার কিছুই দেখাতে পারেননি।

ভালো করেনি পার্শ্বচরিত্রও

নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রকেও গুরুত্ব সহকারে দেখে দর্শকরা। নমুনায়িত দর্শকের ১৫ শতাংশ বলেছে, ধুম : থ্রিতে নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করা জ্য দিক্ষিত (অভিষেক বচ্চন) ও আলির (উদয় চোপড়া) অভিনয়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

নমুনায়িত দর্শকের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছে, বার বার (ধুম সিরিজের অন্য দুটি চলচ্চিত্র) পুলিশ হিসেবে অভিষেক বচ্চনকে তাদের ভালো লাগছে না। যদিও দর্শকদের একটি বড়ো অংশ ধুম : থ্রিনায়ক হিসেবে অভিষেক বচ্চনকে মনে করেছে (নায়কের ডিসকোর্সে জ্য দিক্ষিত-ই এগিয়ে)। তবুও ধুম বা ধুম : টুতে মাস্টার মাইন্ড প্ল্যানিং এবং বিচক্ষণ চিন্তাভাবনার যে বিষয়গুলো অভিষেক বচ্চনকে তাদের কাছে প্রিয় করে তুলেছিলো, ধুম : থ্রিতে সেই বিচক্ষণতার ছাপ নাকি তার মধ্যে দর্শক খুঁজে পায়নি। পুলিশ অফিসার হিসেবে অভিষেক বচ্চনের পরিবর্তে অন্য কাউকে দিয়ে অভিনয় করালে ভালো হতো। এছাড়া আলির অতি ভাঁড়ামি নিয়েও তাদের বিরক্তি আছে।

ভালো লাগারও যথেষ্ট কারণ আছে

প্রথমত, ৫০ শতাংশ দর্শক ধুম : থ্রির সিক্যুয়াল, নায়ক-নায়িকা ও পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়, গানে সন্তুষ্টির কথা বলেছে। তাদের দাবি, সিক্যুয়াল চলচ্চিত্র হিসেবে ধুম : থ্রি ভালো ছিলো। যদিও সিরিজের অন্য পর্বের মতো এখানে চুরি করার বিষয়টি ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি, তার পরও চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার নানারকম কায়দা আকর্ষণীয়ভাবে দেখানো হয়েছে। সাধারণত ধুম সিরিজে চুরি করার বাইরে অন্য বিষয় খুব একটা দেখানো হয় না। কিন্তু ধুম : থ্রি এর ব্যতিক্রম। কারণ এখানে শুধু চুরিই নয়, সার্কাস বাঁচানোর লড়াই, যমজ দুই ভাইয়ের বোঝাপড়া-সংঘাত, ব্যাংক মালিকের অমানবিকতাএ ধরনের নানা বিষয়ের উপস্থাপন দর্শকদের নতুনত্ব দিয়েছে।

২০ শতাংশ দর্শক আমির খানের দ্বৈত চরিত্রের (সাহের ও সামার) অভিনয়ে মুগ্ধতার কথা জানিয়েছে। অনেকে বলেছে, আমির বর্তমান বলিউডের সবচেয়ে ভালো অভিনেতা, এর প্রমাণ তিনি এই চলচ্চিত্রেও রেখেছেন। এদের অনেকেরই ধারণা, তার অভিনয় দক্ষতার ওপর ভর করেই ধুম : থ্রি এতটা সাফল্য পেয়েছে।

এবার আসা যাক চলচ্চিত্রের অ্যাকশন-এ। সেই আদিতে মানে নির্বাক যুগ থেকেই চলচ্চিত্রে অ্যাকশন জনপ্রিয়তার একটি বড়ো উপকরণ। একদিকে নাচ-গান, অন্যদিকে অ্যাকশনদুইটি বিষয় চলচ্চিত্রকে দিয়েছে এক নতুন আঙ্গিক। বলিউডি চলচ্চিত্রে এ দুটি বিষয় এখন একভাবে বললে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীন সেই মল্লযুদ্ধ থেকে বর্তমানের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের ব্যবহারকী নেই সেখানে! দাবাং (২০১৩), এক থা টাইগার (২০১৩), গুন্ডের (২০১৪) মতো অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র যার অন্যতম উদাহরণ। ব্যবসায়িক সাফল্যের দৌড়ে তাই সব নায়ক-নায়িকাকে এসব চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করতে হয়।

নমুনায়িত দর্শকের ২০ শতাংশের কাছে অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে আমির খানকে খুব ভালো লেগেছে। তারা বলেছে, তিনি অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে খুব একটা অভিনয় করেন নাএটা ঠিক, তা সত্ত্বেও ধুম : থ্রিতে তার অভিনয় দেখে মনেই হয়নি অ্যাকশন হিরোদের চেয়ে তিনি কোনো অংশে খারাপ। ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ দর্শক মনে করে, তিনি এমন একজন নায়ক, যিনি যেকোনো চরিত্রেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন; তার অভিনয় দক্ষতা নিয়ে তাদের কোনো সন্দেহই নেই।

এছাড়া সাহের কীভাবে ব্যাংক লুট করলো তা দেখা না গেলেও তার বাইকের বহুমাত্রিক ব্যবহার ২০ শতাংশ দর্শককে বিনোদিত করেছে। বিশেষ করে তরুণ দর্শকরা এটি দেখে বেশ আনন্দিত বলে জানিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের যে বাইক-ম্যানিয়া, তারই একধরনের বর্ধিত সংস্করণ চলচ্চিত্রে দেখে হয়তো তারা এ মত দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, মিস্টার পারফেক্ট আমির খান আর হার্টথ্রব ক্যাটরিনার ভক্ত-দর্শকের কমতি নেই এই উপমহাদেশে। কাহিনি, নির্মাণ যাই হোক, চলচ্চিত্রে প্রিয় নায়ক-নায়িকাকে দেখতে পারলেই শান্তি। এমনকি চলচ্চিত্রে তারা কী অভিনয় করলো বা না করলো তাও এতটা জরুরি নয় এই দর্শকের কাছে। ২০ শতাংশ দর্শক শুধু ধুম : থ্রি দেখেছে প্রিয় নায়ক আমির খান ও নায়িকা ক্যাটরিনা কাইফ-এর জন্য। ঠিক এ কারণেই আর্থিক যোগ্যতায় সারাবিশ্বের অভিনেতাদের তালিকায় বলিউড নায়ক শাহরুখ-এর অবস্থান হয় দ্বিতীয়। 

শুধু নায়ক-নায়িকার অভিনয় নয়, পার্শ্বচরিত্রে ইকবাল হারুন খানের (জ্যাকি শ্রফ) অভিনয়ও দর্শকদের ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কাছে খুবই ভালো লেগেছে। অল্প সময়ের জন্য হলেও তার অভিনয় মূল কাহিনিকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করেছে।

তৃতীয়ত, শাহরুখ খান ও দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত হ্যাপি নিউ ইয়ার মুক্তির আগেই একটি গান দিয়ে আয় করেছে দুইশো কোটি টাকা। শুধু হ্যাপি নিউ ইয়ারই নয়, বর্তমানের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের গানই ৫০ থেকে একশো কোটি টাকার ব্যবসা করে। অর্থাৎ এ থেকে ধারণা করা যায়, দর্শকের একটি বিরাট অংশ চলচ্চিত্র দেখে শুধু গানের জন্যই। ৩০ শতাংশ দর্শকের কাছে ধুম : থ্রির গানগুলো ধুম সিরিজের অন্য চলচ্চিত্রের গানগুলোর চেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।

শুধু গানই নয়, নায়ক-নায়িকার নাচও তাদের আগ্রহী করেছে। ১২ শতাংশ দর্শক বলেছে, ধুম : থ্রিতে ক্যাটরিনা কাইফের নাচ, বিশেষ করে কামলি, মালাং ও থিম সঙটির নাচ খুব ভালো লেগেছে। তারা বলেছে, চলচ্চিত্রে সাধারণত আমির খানকে এভাবে নাচতে দেখা যায় না। ধুম : থ্রির স্টেজ প্রোগ্রামগুলোতে তার নাচ নতুন মনে হয়েছে। অন্যদিকে নাচে সহজহস্ত ক্যাটরিনা কাইফের গ্ল্যামার ও নিখুঁত কোরিওগ্রাফি ধুম : থ্রি  দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়

এক ধুম : থ্রির বদৌলতে পাওয়া সুখস্মৃতি রোমন্থনের বাইরে গিয়ে ২০১৩ সালে ভারতে নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রের আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে আলোচনা শেষ করছি। ওই বছর ভারতে মোট চলচ্চিত্র মুক্তি পায় একশো ৮৩টি; যার মধ্যে সর্বকালের সেরা ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ছিলো একটি (ধুম : থ্রি) আর ব্লকবাস্টার ছিলো চারটি; দুটি হয়েছে সুপারহিট, হিট হয়েছে মাত্র পাঁচটি। ১৫টি চলচ্চিত্র কোনো রকম টাকা তুলে নিতে সক্ষম হলেও ৩৫টি তাদের নির্মাণব্যয় তুলতে পারেনি। আর বাকি একশো ২১টি চলচ্চিত্রের একেবারেই ভরাডুবি হয়েছে। তার মানে লাভের টাকা গুনতে গুনতে ধুম : থ্রির প্রযোজক যখন ক্লান্ত, তখন অসংখ্য চলচ্চিত্রের ভরাডুবির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি!

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অবস্থান তাহলে কোথায়? শতাধিক ব্যর্থ, বক্স অফিসের ভাষায় যাকে বলে ডিজাস্টার, চলচ্চিত্রের বিপরীতে একটি বা দুটি চলচ্চিত্রের কোটি কোটি টাকা রোজগার কখনো পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য সুখকর হতে পারে না। এভাবে গুটিকতক চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার বদৌলতে পাওয়া বাহ্বার আওয়াজে অধিকাংশ চলচ্চিত্রের চাপা কান্না হারিয়ে যায়।

মনে রাখতে হবে, শুধু ধুম : থ্রির মতো চলচ্চিত্রের ওপর নির্ভর করে আজকের এই ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি। এই ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দর্শকরা, বিশেষ করে নিম্নবর্গের দর্শকরা। অথচ মধ্যবিত্ত ভদ্র দর্শককে টানতে গিয়ে সেই দর্শককে ভুলে গেছে নির্মাতারা। ভয়ঙ্কর প্রচারণার ফাঁদে ফেলে নিম্নবর্গের জীবন থেকে যোজন দূরের যে জীবনের কথা আজকের ভারতীয় চলচ্চিত্র বলছে, সেটা কতোদিন এই মানুষ দেখবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তরও তারা দিয়েছে একশো ২১টি ডিজাস্টার চলচ্চিত্র দিয়ে।

 

লেখক : আশফাক দোয়েল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

ashfaqdoyel@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. http://en.wikipedia.org/wiki/Dhoom_3

২. চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে বলিউড ভরসা; কালের কন্ঠ, ৫ জুন ২০১৪।

৩. ভৌমিক, সোমেশ্বর (১৯৯৬ : ২৬৪); সিনেমার আশ্চর্য বাজার; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ১; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রা.লি., কলকাতা।

৪.  http://en.wikipedia.org/wiki/Mughal-e-Azam

৫. গঙ্গোপাধ্যায়, অনিশা (১৯৯৬ : ২৮৮); ভারতে দেশি ও বিদেশি সুপারহিট ছবি; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ১; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রা.লি., কলকাতা।

৬. প্রাগুক্ত; গঙ্গোপাধ্যায়, অনিশা (১৯৯৬ : ২৯২)।

৭. www.boxofficeindia.comYearsyears_detail2013

৮. মুক্তির আগেই সুপারহিট!; প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৪।

৯. www.boxofficeindia.comYearsyears_detail2013

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন