Magic Lanthon

               

মাহামুদ বিপ্লব ও মাহমুদ বাবু

প্রকাশিত ০৯ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

উৎসব : সুখ সন্ধানের নিষ্ফল আয়োজন

মাহামুদ বিপ্লব ও মাহমুদ বাবু

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,

দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে॥

পান করে রবি শশী অঞ্জলি ভরিয়া

সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি

নিত্য পূর্ণ ধারা জীবনে কিরণে॥

 

বিশ্বকবি এই সঙ্গীতখণ্ডে বিশ্বে যে আনন্দধারা অবলোকন করছেন, প্রাকৃতজনের কাছে তা দৃষ্টির অগোচর। কিন্তু তাদের ভুবনেও এক আনন্দধারা আছে, যদি তা অনেকাংশেই খণ্ডিত, নানা কারণে বিঘ্নিত। সে আনন্দের উৎস এবং রূপ, কারণ এবং ক্রিয়া প্রায় সর্বত্রই অনুষ্ঠানগত প্রাণ। সাধারণ ভাষায় আমরা সেসবকেই বলি উৎসব। সালটা ২০০০। বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মাণ করলেন উৎসব। ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্র মানেই বাস্তবধর্মী এক স্বতন্ত্র কাহিনী। ঠিক সেই সূত্র ধরেই ঋতুপর্ণ মানব সমাজে উৎসবের বাস্তব রূপ তুলে ধরলেন এই চলচ্চিত্রে। এটি তার নির্মিত পঞ্চম চলচ্চিত্র। এখানে দুর্গোৎসবকে উপলক্ষ করে একটা একান্নবর্তী পরিবারের সব সদস্য বছরে একবার মিলিত হয়। বনেদি পরিবারের বনেদিয়ানা চলে গেলেও এই পরিবারের সদস্যরা দুর্গাপূজায় উপস্থিত থাকেন নিজেদের সম্পর্কের সূত্রটাকে টিকে রাখতে।

উৎসবকে বলা হয় আনন্দের সহযাত্রী। তাইতো সবাই যাবতীয় অশান্তিকে ভুলে কিছু সময়ের জন্য হলেও নিজেদের অজান্তেই আনন্দে মেতে ওঠে। উৎসব ব্যতীত মানুষের মিলনের এতো বড়ো তীর্থ আর কিছুই নেই। তাই সব বাধা-বিপত্তিকে উপেক্ষা করে এই বনেদি পরিবারের সবাই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে দুর্গোৎসবে মিলিত হতে। আচ্ছা, এই যে সব দুঃখ কষ্টকে ভুলে আনন্দের হাসি হাসা, সব বাধা-বিপত্তিকে উপেক্ষা করে একত্র হওয়া এর প্রধান কারণ কি শুধুই উৎসব? উৎসবই কি জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে? নাকি জীবনের প্রয়োজনে কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে উৎসবের আবির্ভাব ঘটে? তাহলে উৎসবের মানে কী? জীবনে উৎসবের বা উৎসবে জীবনের স্থানটা কোথায়? পাঠক, এই আলোচনায় উৎসব চলচ্চিত্রের আলোকে আপাতত এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

.

জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ উৎসবের পরিচয় বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। বাংলায় উৎসব শব্দটির সাধারণ মানে আনন্দের সহযাত্রী। অভিধানও এই মতে সায় দেয়। তবে সে আনন্দের স্বরূপ কী, কেমন তার ব্যাপকতা বা অভিলাষ অভিধান সেসব বিষয়ে নির্বাক; অন্তত ভারতীয় উপমহাদেশে। আমরা তাই একেবারে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আঙিনায় সীমিত আনন্দজনক অনুষ্ঠানকে যেমন উৎসব বলে জানি, তেমনি সমাজের দশজনকে নিয়ে কৃত অনুষ্ঠানকেও। মূলকথা, যে সামাজিক সাম্প্রদায়িক বা পারিবারিক সমাবেশ থেকে সুখ বা আনন্দ লাভ করা যায় তাই উৎসব। তবে সে সুখ বা আনন্দের রূপ-চেতনা সবসময় এক রকম হয় না। ইংরেজি অভিধানে যে উৎসবের এমন মিলন বা সারবন্দি নেই, তা নয়। উৎসব সেখানেও অবশ্যই আনন্দ অনুষ্ঠান, ওরা এটাকে বলে, A joyful or honorific celebration. কিন্তু তাদের সংজ্ঞায় খাওয়া-দাওয়ার বিষয়টিও জড়িত। যেগুলোকে আমরা তাদের মতো কেবল ceremony নামের ছোটোখাটো আচার-অনুষ্ঠান বা ক্রিয়াকর্মের ব্যাপার বলেই চিনি।

উৎসব মানুষকে সুযোগ করে দেয় পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে মিলেমিশে সময় কাটানোর, দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে মিলে আবেগ-অনুভূতি বিনিময় করার, আপন-পর সব ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার। উৎসবই সুযোগ করে দেয় অপরিচিতদের কাছে ডেকে পরিচিত হওয়ার। অবশ্য উৎসব নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাতামাতি দেখা যায় পশ্চিমাদের মধ্যে। জীবনের প্রায় প্রতিটি উৎসবকেই তারা উদ্যাপন করে ব্যাপক আয়োজন আর আনন্দ-উদ্দীপনায়। তাই উৎসবের সংজ্ঞাও তাদের কাছে একটু ভিন্ন। পশ্চিমি ধারণায় উৎসব বোঝাতে যে শব্দটি ব্যবহার হয়, সেই festival অর্থেরও রয়েছে অনেক ব্যাপকতা; রয়েছে সমাজের আর ১০ জনের সঙ্গে এর সম্পর্ক। ব্যক্তি বা পরিবার সেখানে গৌণ, কখনো অনুপস্থিত। উৎসব সেখানে নির্দিষ্ট ঋতু বা অনুষ্ঠানমালার সমাহার। মোট কথা, বেশ বড়ো বা দেশব্যাপী সংঘটিত অনুষ্ঠানকে উৎসব বলা হয়ে থাকে।

.

উৎসবের সব উপাদানই ঐতিহ্যনির্ভর। উৎসবই মানুষকে যুগিয়েছে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। উৎসব থেকে মানুষ অর্জন করেছে মিলনের সুখ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে সৃষ্টি করেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তাই লোকজ সংস্কৃতির ভাষায়, উৎসব মানে মিলনানন্দ, একের সাথে এক বা একের সাথে বহুর মিলে গড়ে ওঠে উৎসব। উৎসবই জাতির প্রাণ, যে জাতির উৎসব নেই সে জাতির প্রাণ নেই, চলার শক্তি নেই। উৎসবে তাই মানুষ থাকে উজ্জীবিত, বিবাদ ভুলে মৈত্রী বন্ধনে হয় আবদ্ধ। উৎসবের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো সম্মিলিতভাবে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উৎসবকে তাই সংজ্ঞায়িত করা হয় ফোকলোরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই। উপাদান হিসেবে নির্বাচন করা হয় দুটি বিষয়কেএকটি লোকসমাগম, অন্যটি আনন্দ-উল্লাস। অর্থাৎ সমাজের সবার সমন্বয়ে করা আনন্দদায়ক ক্রিয়া-কর্ম। সুতরাং যে সামাজিক, পারিবারিক বা সাম্প্রদায়িক সমাবেশ থেকে সুখ বা আনন্দ লাভ হয় তাই মূলত উৎসব।

এই উৎসব দিয়ে যে শুধু পারিবারিক বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হয় তা নয় বরং এর মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনও সম্ভব। ধর্ম তাই উৎসবকে একটু আলাদা চোখে দেখে। আনন্দ উল্লাসের পাশাপাশি সেখানে কিছু নিয়ম-রীতি মানার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বলা হয়, এসব রীতি মেনে চললে পুণ্যার্জন সম্ভব। এককালে ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে কবিগান, অভিনয় ইত্যাদিও আয়োজন করা হতো। আজও তার ব্যতিক্রম হয় না। প্রসঙ্গত আজকের পৃথিবীর প্রায় সব উৎসবই আনন্দজনক হয়ে ওঠে নাচ-গান, বাদ্য-বাদনের মাধ্যমে। বহু ধর্মীয় উৎসবে এগুলো কেবল আনন্দভোগের উপকরণই নয়, আচার-অনুষ্ঠানের অঙ্গও বটে। কাঁসার ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য ছাড়া দুর্গাপূজা তো হয়ই না। আবার কিছু আরতি তো শুধু নাচেরই। ইসলামে উৎসবের এ রকম ব্যবস্থা না থাকলেও শবেবরাত, ফাতেহা-ই-দোয়াজদাহাম বা ইয়াওমুন্নবির মতো দু-একটি উৎসবে আলোকসজ্জাসহ কাওয়ালি গানের যে আয়োজন করা হয় তা কিন্তু বহুদিনের চলে আসা রীতি বা প্রথা বহির্ভূত নয়।

ধর্মীয় উৎসবগুলো মূলত ত্যাগ, ধ্যান-দানেরই উৎসব। মুসলমানরা ঈদে যে পশু কোরবানি করে তা কিন্তু ইসলামেরই একটি রীতি। ধ্যান-ত্যাগের মাধ্যমে যেমন স্রষ্টার তুষ্টি অর্জন হয়, তেমনি ত্যাগ ও দানের মাধ্যমে সমাজ-সম্প্রীতি দৃঢ় হয়। তাই ধর্মীয় উৎসব শুধু বিশ্বাসী এবং স্রষ্টার বন্ধনকে শক্তিশালী করে তা নয়, বরং এটি সমাজের সদস্যদের বন্ধনকেও শক্তিশালী করে। তবে মানুষের জীবনের মৌলিক দুটি উৎসবের নাম জন্ম ও মৃত্যু। জন্মের মাধ্যমেই মানুষের পৃথিবীতে আগমন ঘটে। জন্ম তাই স্বাভাবিক কারণেই আনন্দ-উল্লাসের। আবার মৃত্যু মানেই চলে যাওয়া। প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে নিতে হয় চিরবিদায়। স্বীয় কর্মগুণেই কেউ কেউ এরপরও টিকে থাকে। আর স্বাভাবিক কারণেই মৃত্যুতেও মানুষকে সম্মিলিতভাবে বিদায় জানানো হয়। তাই মানুষের জীবনের এই অবশ্যম্ভাবী দুটি মুহূর্তকে উৎসব না বলে কি কোনো উপায় আছে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম বলেন, দলের মানুষজন সমষ্টিগত বোধ ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে একত্রিত বোধ করেন, তারা সম্মিলিত হন এবং এটি তাদেরকে তাদের নৈতিক ঐক্যের ব্যাপারে সচেতন করে তোলে। গূঢ় অর্থে, ডুর্খেইম ধর্মীয় উৎসবকে দলের অনুভূতি এবং সংহতি প্রকাশের ও সেটিকে পুনরায় পাকাপোক্তকরণের একটি প্রধান বন্দোবস্ত হিসেবে দেখিয়েছেন।

পুঁজি সবসময়ই সর্বগ্রাসী। মানুষের আগ্রহের বিষয়ে নিজের মতাদর্শ, চিন্তা-চেতনার প্রসার ঘটিয়ে মুনাফা বাড়ানোই পুঁজির প্রধান কাজ। উৎসবকে ঘিরে আমাদের এই যে মাতামাতি বা দুর্বলতা সেই সুযোগটি গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র ভুল করেনি এই পুঁজি। এজন্য প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে উৎসবকে দিতে হয়েছে নতুন নতুন কাঠামো। মা-বাবা-বন্ধু-ভালোবাসা-শিক্ষক দিবস তারই প্রমাণ বহন করে। বৈশ্বিক ভয়ঙ্কর অস্থিরতার মধ্যেও দিবসের বা উৎসবের এই আনুষ্ঠানিকতাগুলো যেনো আবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪.

পাঠক, যে উৎসবে পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্র এমনকি ধর্মও সর্বদা মেতে আছে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার মূল রূপ তুলে ধরলেন ঋতুপর্ণ। নাম দিলেন উৎসব। দেখালেন জীবন ও উৎসবের সম্পর্ক। তবে সমাজ, ধর্মসহ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উৎসবের যে বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় তা থেকে এই উৎসবের বৈশিষ্ট্য একটু আলাদা। উৎসবকে কেন্দ্র করে সব কষ্ট বা যন্ত্রণাকে কেউই ভুলে যেতে পারেনি সম্পূর্ণরূপে। উৎসবের প্রতিটি ক্ষণে কষ্টগুলো তাদেরকে ভুগিয়েছে। দাম্পত্য জীবনের কলহ, কর্মক্ষেত্রের অশান্তি, প্রেম-বিচ্ছেদ, মনোবাসনা পূরণ না হওয়া আর একাকিত্বের অশান্তিতে তাদের কেউ না কেউ সারাক্ষণই ভুগেছেন। জীবনের হিসাব-নিকাশে দেখা দিয়েছে গড়মিল। কিন্তু উৎসবকে সামনে রেখে সেসব যোগ-বিয়োগের হিসাব ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন অনেকে। নিজের অজান্তেই একটু হেসেছেন, কিছু সময়ের জন্য হলেও আনন্দে মেতেছেন। কষ্টগুলোকে নিজের মধ্যেই চেপে রেখে উৎসবকে সার্থক করার চেষ্টা করেছেন। চলচ্চিত্রটির গল্প আবর্তিত এমন অনেকগুলো গল্পকে ঘিরেই। তবে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে জেনে নিই উৎসব-এর কাহিনী।

পরিবারের বড়ো মেয়ে পারুল। তার ছেলে জয়। গল্প শুরু জয়ের কণ্ঠস্বর দিয়ে। জয় তার হ্যান্ডিক্যামে ভিডিও করতে করতে সবার পরিচয় তুলে ধরে। পারুলরা চার ভাই-বোন। ছোটোবেলায় পারুল তার পিসতুতো ভাই শিশিরের সঙ্গে বড়ো হয়। একপর্যায়ে তারা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলে। যা মেনে নিতে পারেনি এই বনেদি পরিবারের কেউই। ফলে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হতে হয় শিশিরকে। বিষয়টি নিয়ে বিয়ের পরও পারুলের সংসারে অশান্তি আছে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সদ্য গড়ে ওঠা ভালো লাগাকে আর বেশি দূর এগিয়ে নেয় না জয় ও তার মামাতো বোন শম্পা। পারুলের ছোটো বোন কেয়া। তার স্বামী অরুণ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে কোনো কাজ-কর্ম না করে মদ্যপানে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। ফলে ভালোবাসা, আনন্দ একেবারেই ছুঁয়ে যেতে পারেনি কেয়ার হৃদয়। পারুলের দুই ভাই। ছোটো দা প্রদীপের অফিসে সমস্যা। বিষয়টি নিজের মধ্যেই রেখেছেন তিনি। জয়ের ইচ্ছা সে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করবে। কিন্তু পরিবারের চাপে তাকে বিদেশ যেতে হচ্ছে এমবিএ করতে। বাড়িতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে থাকেন পারুলের মা। নিয়মানুযায়ী উৎসব শেষে সবাই চলে গেলে তিনি হয়ে পড়েন আবারো একা।

ক.

তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেনো? বাংলা ও বাঙালির মূল্যবোধ বিচারে বঙ্কিমচন্দ্রের এই কথাটি আজ যেনো না বললেই নয়। কেননা ভারতিয় উপমহাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি তথা সমাজের সর্বস্তরে যে বৈষম্য আজ ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে তা দেখে হয়তো ধনীদের বলার ইচ্ছা জাগে, তুমি এতো গরিব, তাই আমি এতো ধনী হইবো না কেনো! এই অঞ্চলে মুষ্টিমেয় লোক ধনী হয়ে গেছে বলেই তার বিপরীতে সৃষ্টি হয়েছে এতো গরিব। বৃটিশ শাসনের ৬৯ বছর পরে এসে আজ এই অঞ্চলের বড়ো শহরগুলোতে একদিকে বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি, শত কোটি টাকার ছড়াছড়ি আর তার পাশেই মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত নিরন্ন মানুষের মিছিল। সেখানে মানুষে মানুষে বিভেদের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে অর্থ। 

অর্থের ক্যারিশমার এই চিরচেনা চিত্রটি উৎসবকেও ছুঁয়ে যায়। পারুলকে ভালোবাসা আর ব্যক্তিগত অস্বচ্ছলতার কারণে যে শিশিরকে একসময় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো, সেই শিশিরের চিঠি পেয়ে তাকে বাড়ি আসতে দিতে কারোরই তেমন কোনো আপত্তি থাকে না। এমনকি যে পারুলকে সেদিন ঘরে আটকে রাখা হয়েছিলো আজ তাকেই শিশির আসবে বলে বাড়িতে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করা হয়। কারণ, আজ শিশির অঢেল সম্পত্তির অধিকারী, এখন তার অর্থের পরিমাণ এতো বেশি যে বনেদি পরিবারের বাড়িটা কিনে নেওয়ার মতো সামর্থ্যই সে রাখে; মানে বিভেদটা আর নেই। সুতরাং তিনি আর অবহেলার পাত্র নন, তার পরিচয় এখন অর্থ-বিত্তে। তাকে এখন পারস্যের কবি শেখ সাদীর মতো আদর-যত্নে করাই যায়। আর একটু স্বার্থ হাসিলের জন্য পারুলকেও বলা যায় তাকে আপ্যায়ন করাতে।

তবে নিজ পরিবারে এই স্বার্থপরতাকে একদমই মেনে নিতে পারে না পারুল। তাই চিৎকার করে পরিবারের প্রতি তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, সত্যি করে বলোতো আজকের মতো সেদিন যদি তার গাড়ি-বাড়ি থাকতো তাহলে কি তোমরা তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারতে? ভয়ঙ্কর কষ্টে থাকা পারুলের এই প্রশ্নের উত্তর কেউ না দিলেও বুঝতে বাকি থাকে না এই সমাজ এই পরিবার কতোটা আত্মমগ্ন আর স্বার্থপর। ঋতুপর্ণ তার স্বভাবজাত ভঙ্গিমায় পারুলের প্রশ্ন দিয়ে মানুষের মনের নগ্নতাকে খুঁজে ফেরেন উৎসব-এ।

খ.

দুঃখ মানুষকে প্রতিনিয়ত বন্দি করে রাখতে চাইলেও সে তা থেকে চিরকালই পরিত্রাণ চেয়েছেএই থেকেছে মানুষের আমরণ প্রত্যাশা। এখনো এই উপমহাদেশে সুখ খুঁজে ফেরার অনেকগুলো উৎসের মধ্যে অন্যতম হলো নারী-পুরুষের বিবাহিত জীবনে প্রবেশ। নারী-পুরুষ দুজনের কাছেই তাই বিয়ে হয়ে ওঠে বিশেষ এক কাঙ্ক্ষিত ও আরাধ্য বিষয়। উৎসব-এ বাড়ির ছোটো মেয়ে কেয়া মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে থাকা স্বামী অরুণের কাছ থেকে শত চেষ্টায় এতোটুকু ভালোবাসা পায় না। অন্তত দুর্গাপূজার উৎসবকে কেন্দ্র করে সেই পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হবে এমনটাই আশা করেছিলেন কেয়া। তাই দুর্গাপূজায় অনেক উৎসাহ নিয়ে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু উৎসবের মানে বোঝার চেষ্টা করে না অরুণ, তাই কেয়ার মিনতি সত্ত্বেও শ্বশুরবাড়ি থেকে উৎসবের দিনই তার চলে যাওয়া, সঙ্গে বদলে দেয় উৎসবের মানেটাকেই।

তার মানে উৎসবে চাইলেই কেউ আনন্দে আত্মহারা হতে পারে না, কিংবা পারে না প্রিয় মানুষটির হাতটি ধরে স্বপ্ন দেখে দূরে হারিয়ে যেতে। ঋতুপর্ণ আমাদের বুঝিয়ে দেন, উৎসব ব্যক্তির একার জড়িত হওয়ার কোনো বিষয় নয়। এর সঙ্গে অন্য মানুষ, কাছের মানুষ সবার সঙ্গে একটা অদৃশ্য যোগাযোগ আছে, যেগুলোর সম্মিলন ছাড়া ব্যক্তির নিজস্ব যেকোনো চাওয়া-পাওয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে। আবার এটাও ঠিক, ব্যক্তি-কেয়া নিজে ভালো না থাকলেও শুধু এই সম্পর্কের তাগিদে তাকে ভালো থাকার চেষ্টা করতে হয় উৎসবকে ঘিরে। তার মানেউৎসবের আনন্দ লাভে যদি কারো কাছে অদৃশ্য বন্দিই থাকতে হয়, বারবার মিনতি করতে হয়, সে উৎসব কি আসলেই উৎসব নাকি সুখ সন্ধানের এক নিষ্ফল আয়োজন? ঋতু কি সঙ্গে এটিও বোঝাতে চাইলেন, সমাজে যেভাবে নিত্য-নতুন উৎসবের উদ্ভব ঘটছে, তাতে বাধ্য হয়েই ব্যক্তি তার আপন-সত্তাকে হারিয়ে সবার মধ্যে থেকে মরে গিয়েও আনন্দে বেঁচে থাকছে। এতে লাভ কার, উত্তরতো পরিষ্কার, তাই না?  

গ.

পারুলকে তার পরিবার নিজের ইচ্ছে মতো ব্যবহার করেছে। পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারণেই একদিন শিশিরের সামনে আসতে পারেনি পারুল; আজ আবার পরিবারই তাকে শিশিরের সঙ্গে দেখা করতে বলছে। আর তাই অসহায়ের মতো পারুল ছেলের বুকে মাথা রেখে আক্ষেপের সঙ্গে প্রশ্ন করে, ওরা (তার পরিবারের অন্য সবাই) কেনো আমার সঙ্গে এ রকম করলো? আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রবাদ-প্রবচনে নারী সম্পর্কে দুটি কথা বলা যায়। একটিনারী হলো মায়ের জাত; যা শ্রদ্ধা-সম্মানের যোগ্য। অন্যটিনারী পরিবারের অধস্তন। বিলীয়মান সামান্য কিছু মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই পুরুষতন্ত্র বিরাজ করছে। দেশভেদে তারতম্য থাকলেও নারীদের ধারণা দেওয়া হয়, তারা এই পরিবার বা সমাজের অধস্তন। যেখানে তাদের চাওয়া-পাওয়াটা গুরুত্বহীন।

খেয়াল করুন, পরিবারের পছন্দের ছেলেকেই কিন্তু বিয়ে করতে হয় পারুলকে। আর সেখানেও তাকে কথার আঘাত সহ্য করতে হয় তার সেই ভালোবাসার প্রসঙ্গটি নিয়েই। সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হবে বলে নীরবে তা সহ্য করে পারুল। পারুল-শিশিরের এই পরিণতি দেখে নিজেদের ভালোবাসাকে আর গভীরে নেয় না শম্পা ও জয়।

আবার, কেয়াকে দেখুন। যার সব স্বপ্ন-আশা-আকাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশা তার স্বামী অরুণকে ঘিরে, সেই অরুণ কিন্তু একবারের জন্যও তাকে বুঝতে চেষ্টা করে না। তাহলে কেনো ধরে নেবো না অরুণের এই আচরণ পুরুষ আধিপত্য নয়? পারুল, শম্পা আর কেয়াদের অবস্থার উন্নতি কি কোনোদিনই হবে না? পরিবার, পিতা কিংবা স্বামীএদের অমানবিক নিষ্ঠুর চাওয়া-পাওয়াকেই কি আমরণ পালন করতে হবে? 

এই চিরচেনা প্রশ্নগুলো একদিকে যখন ঋতুপর্ণ তার চলচ্চিত্রে তুলে ধরছেন, তখনও কিন্তু গোটা বিশ্বে নারী জাগরণের সুর বাজছে। আর নারীবাদ বা নারীবাদী এই আন্দোলন যে শুধু নারীদের একক প্রচেষ্টার প্রতিফলন তাও কিন্তু নয়, বরং বহু পুরুষ এই বলয়ে স্বেচ্ছায় অবগাহন করেছে। অতীত ও বর্তমানে অনেক পুরুষই নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠকে দৃঢ়প্রত্যয়ে ব্যক্ত করেছে। অথচ উৎসবএ নারী-পুরুষ কোনো চরিত্রেই এমন প্রতিবাদী ভাবনা ফুটে উঠতে দেখি না। প্রচলিত এই নিয়মকে ভাঙতে, এর বেড়াজাল থেকে বের হয়ে কেউ আসেনি এখানে। অথচ ঋতু যে যুগে বাস করেন তার অনেক আগেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেথুন সাহেব, জ্ঞানদান নন্দিনী ও কৃষ্ণভাবিনীর মতো সচেতন ব্যক্তিরা নারী অধিকার রক্ষায় আন্দোলন করেছেন। নারী জাগরণের পথিকৃৎ এই ব্যক্তিদের মতো করে যদি নারী-পুরুষ সবাই ভাবতে পারে এবং অধিকার চেতনায় জাগ্রত হয় তবেই নিশ্চিত হতে পারে নারী-পুরুষ সম-অধিকার।

ঘ.

 

প্রতিটি ইট প্রতিটি দেয়াল তুলে দিয়েছে যে আড়াল

একান্নবর্তীরা একান্ন ভাগ হয়েছে তাতে অর্ধ শতাব্দীকাল

বেড়েছে কৃষিজমির ময়দানে অসংখ্য বিভাজন বাঁধ

কাঁটাতারগুলো সীমারেখা টেনে ভুলিয়াছে সম্পর্কের স্বাদ

বছরের অন্যান্য দিনগুলোতে বনেদি পরিবারের এই বাড়িটি বেশ শান্ত ও নিরানন্দ থাকলেও উৎসবের দিনগুলোর চিত্রটা আলাদা। দীর্ঘসময় পর একত্র হয়ে সবাই বেশ আনন্দিতও। পরিবারে সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসার কমতি না থাকলেও নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তারা নিজেদের সমস্যাগুলো অন্যের সঙ্গে নির্দ্বিধায় ভাগাভাগি করতে পর্যন্ত পারছে না। এমনকি একজন অন্যজনকে যে ভালোবাসে তাও সরাসরি প্রকাশ করতে পারে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক দিন দিন যে শিথিল হচ্ছে তা বলতে আর কোনো বাধা নেই। এর কারণ হিসেবে কেউ দায়ী করেন পরিবর্তনশীল সমাজকে, কেউ আবার সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে।

আজ বাজার-অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় ভরা মানুষের এই সভ্য জীবনে পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ। পুঁজিবাদ আর উৎপাদন ব্যবস্থার চূড়ান্ত অগ্রগতির কারণে আজ তাই নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য, একদল মানুষ অন্যদলের অধীন। পরিবারের উন্নয়ন আর জীবনকে আধুনিক করতে মানুষ হচ্ছে শহরমুখী। যৌথ পরিবার ভেঙে তৈরি হচ্ছে একক পরিবার। দূরত্ব তৈরি হচ্ছে সদস্যদের মধ্যে। আবার আর্থিকভাবে সফল হয়ে কেউ অসামান্য উচ্চতায়, কেউবা দিশেহারা। এর ফলে মনের দিক থেকে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। নিজের স্বার্থকে একটু হলেও প্রাধান্য দিচ্ছে কেউ কেউ। আর তাই কেয়ার ছোটো বউদি তার পছন্দের ঘরটি না পেয়ে মনক্ষুণ্ন হয়ে স্বামীকে বলেন, পরেরবার এলে জানিয়ে দিও ঘরের সমস্যা থাকলে আসবো না। আবার কেয়ার ছোটো দা প্রদীপ ঋণ নেওয়ার জন্য বাড়ি বন্ধক রাখতে চাইলে বড়ো দা বলেন, আমার অংশ ছেড়ে দিলাম কিন্তু অন্যরা কি দেবে? মনের দিক থেকে একে অন্যের প্রতি টান অনুভব করলেও তাদের রক্তের সম্পর্ক হার মেনেছে স্বার্থের কাছে। আর তাই ভাইকে সাহায্য করতে বাড়ির অংশ বন্ধক রাখতেও তাদের এতো দ্বিধা।

এমনকি বৃদ্ধা মায়ের প্রতি তাদের ভালোবাসার যে নমুনা তা আজ অধিকাংশ পরিবারের সঙ্গেই সাদৃশ্যপূর্ণ। উৎসব শেষে সবাই যার যার মতো চলে যাবে, শুধু মায়ের কাছে থাকবে না কেউ। একাকিত্বের প্রহর গুনবেন তিনি। মাকে কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার কথা ভাবলেও তার একাকিত্ব দূর করার কথা কেউ ভাবে না। হয়তো একদিন এই বাড়িটিও বিক্রি হয়ে যাবে। মার অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও থাকবে কিন্তু থাকবে না তার স্মৃতির মায়া-মমতা মাখা পরিবার।

ঙ.

জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে এসেও প্রচলিত রীতি বা প্রথায় আজ অবহেলিত শিক্ষার্থীদের মতামত বা সিদ্ধান্ত। আর তাই জয়ের চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন থাকলেও তা বাস্তবতার মুখ দেখে না। শুধু তাই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিষয় নির্ধারণও করছেন আজ অভিভাবকরা। আর কোনো শিক্ষার্থী যখন তার বিষয় বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাকে ভাবা হয় অনধিকার চর্চা হিসেবে। শিক্ষার্থীদের এ ধরনের মতামত, তার চিন্তার কথা কেউ জানতেও চায় না। কিংবা জানার বিষয় হতে পারে বলে উপলব্ধিও করে না। আর তাই জয়ের বাবা তার ছেলের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কোনো গুরুত্ব দেননি।

জয়ের বাবার মতো অধিকাংশ অভিভাবকই মনে করেন, সন্তানদের ব্যাপারে তারাই কেবল সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই তাদের ভাবনায় যা সঠিক ও কল্যাণকর তাই চাপিয়ে দেন সন্তানদের ওপর। ফলে তাদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে দিন দিন শিক্ষার্থীদের কাছে পড়াশোনার আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। যা তাদের সফলতার পথে বেশ বড়ো অন্তরায়। কারণ বিজ্ঞান বলে, মন ও মস্তিষ্কের মধ্যকার সম্পর্কটা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক ওই বিষয়টি নিয়েই ভালো কাজ করেযে বিষয়টি মন তাকে নির্বাচন করে দেয়।

সুতরাং মনের ইচ্ছা, চাহিদা বা আগ্রহের বিরুদ্ধে কাজ করতে বলে তা থেকে ভালো ফল আশা করাটা অনেকাংশেই নিরর্থক। খেয়াল করুন, নিজের স্বপ্নের বাইরে এসে জয় তার ভবিষ্যৎ জীবনে সার্থক না ব্যর্থ তা ঋতুপর্ণ তুলে না আনলেও আমাদের সমাজে এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল নয়। এ রকম হাজারও জয় প্রত্যাশা অনুযায়ী পড়াশোনার সুযোগ না পেয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। আবার অনেকেই বাধ্য হয় পড়াশোনা ছেড়ে দিতে।

৫.

মানব জীবনের সূচনা থেকে অন্তিম পর্যন্ত জীবন-জীবিকা, হাসি-কান্না প্রত্যেকটি অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে উৎসব। মানুষ তার জীবনে উৎসবকে যেভাবে জায়গা দিয়েছে, ঠিক সেভাবে উৎসবেও জায়গা করে নিচ্ছে পুঁজি। বিশ্বব্যাপী উদযাপন হচ্ছে উৎসব, অংশগ্রহণ করছে বিশ্বনেতারা সেই সঙ্গে আমজনতাও। মোড়লদের চোখে-মুখে অদ্ভুত মিশ্র রকমের হাসি! যেনো বলছে দেখো দেখো, সাম্যবাদ পঁচা আর পুঁজিবাদ লক্ষ্মী। আর তাই বুঝি বিত্তবান ও ভাগ্যবানরা যখন উৎসব উদ্যাপন করতে ছুটে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও মালয়েশিয়ার মতো দূরের কোনো গন্তব্যে, তখন উৎসব যতোই কাছে আসতে থাকে, ততোই নগরে, বন্দরে ভাগ্যাহত স্বল্পবিত্ত নাগরিকদের দেখা যায় ট্রেন, বাস, লঞ্চের টিকিটের জন্য দীর্ঘ কাতারে। এদের সবারই উৎসব করার অধিকার আছে, আছে সরকারি ছুটিও, কিন্তু অর্থ নেই, আছে অভাব।

তাই তাদের উৎসব অভাবের কপাটেই বন্দি। বৈষম্যের এ সমাজে নিত্যদিনের জীর্ণ-শীর্ণ জীবনের মতো উৎসবও যে বিষাদের ছায়ায় বিমর্ষ হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অসঙ্গতিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা আর পুঁজির প্রবল তোড়ে এখন মানুষ খড়-কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে পৃথিবীব্যাপী, থামানোর কোনো উপায় যেনো নেই। মানুষের পক্ষে যেনো সম্ভবই হচ্ছে না ঐক্যবদ্ধ হওয়া। অবস্থানগত আর মানসিক দূরত্বে আজ উৎসবগুলোও হয়ে উঠছে অনেকাংশেই নিরানন্দের।

পারিবারিক জীবনে নেমে আসছে অশান্তি। তবে আর কতোকাল এভাবে? সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবর্তন করতে হবে আমাদের মন-মানসিকতাকেও। জীবন মানে যুদ্ধ, যদি কেউ লড়তে পারে। জীবন মানে সংগ্রাম, যদি কেউ তা করতে পারে। জীবন মানে খেলা, যদি কেউ খেলতে পারে। আবার জীবন মানে স্বপ্ন, যদি তা গড়া যায়। সুতরাং জীবনকে সুন্দর ও সুখী করতে প্রয়োজন মূল্যবোধকে জাগ্রত করা, আর তাহলেই পূর্ণতা পাবে আমাদের উদ্যাপিত উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত।

লেখক : মাহামুদ বিপ্লব ও মাহমুদ বাবু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।  

biplob.ammm@yahoo.com

mdmahamudulhasan566@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. রহমান, আতোয়ার (১৯৮৫ : ১); উৎসব : কি ও কেন; উৎসব; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

২. হাসনাত, সাবরিনা (২০১৩ : ২); ভূমিকা; গ্রামীণ লোকমেলার সন্ধান : বরেন্দ্র অঞ্চল; কনকর্ড এম্পোরিয়াম, ঢাকা।

৩. http://eyv-bahar.blogspot.com/2013/03/blog-post_13.html

৪. http://www.golpokobita.com/golpokobita/article/7259/6129

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন