Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ০৭ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্রে নারী

‘হরির উপরে হরি, হরিতে শোভা পায় হরিকে দেখিয়া হরি, হরিতে লুকায়’

ইব্রাহীম খলিল

 

এ বড়ো আজব কারখানা

হিটলারের দেশ জার্মানি বেড়াতে গিয়ে আমেরিকান রুথ হ্যান্ডলার নিয়ে এসেছিলেন পূর্ণবয়স্ক এক নারী শরীরের পুতুলবিল্ড লিলি। লিলি নামের কার্টুন চরিত্রের এই পুতুল নাকি যুদ্ধোত্তর ইউরোপের পরিবর্তিত সমাজে, যৌনবাদী পুরুষের জগতে নারীত্ব ও যৌনতার প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছিলো। এ কারণে লিলির জায়গা হয়েছিলো অ্যাডাল্ট শপে পুরুষের যৌন উপকরণ হিসেবে। পরে অবশ্য বাচ্চাদের খেলনা হিসেবে এর ব্যবহার বেড়ে যায়। দূরদর্শী রুথ হ্যান্ডলার এই লিলির মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন রমরমা ব্যবসার গন্ধ। লিলির অনুকরণে বানানো হয় নতুন পুতুল বারবি। এই বারবি তৈরির জন্য তলব করা হয়েছিলো জ্যাক রায়ান নামে এক দক্ষ নকশাকারকে। মজার ব্যাপার হলো, জ্যাক রায়ান হলো সেই নকশাকার যিনি পেন্টাগনের হয়ে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে হক্ ও স্প্যারো মিসাইলের নকশা প্রস্তুত করে বিখ্যাত হয়েছিলেন।

কিন্তু পুতুল তৈরিতে জ্যাক রায়ান কেনো? তাহলে কি তাদের কাছে অস্ত্র আর পুতুলদুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ? বাস্তবতা কিন্তু তাই বলছে! দুটোই দুই দিক থেকে ভয়াবহ ব্যবসার ইঙ্গিত করে। তাই রায়ানের দক্ষ হাতে লিলি পুতুলের পুনর্জন্ম হয় মেয়েশিশুর খেলার পুতুল বারবি হিসেবে। আসলে এ রকম নতুন কিছু করতে সবসময়ই হয়তো প্রয়োজন হয় রায়ানের মতো কাউকে। কারণ, এই রায়ান কিংবা রুথরাই কখনো মিসাইল, কখনো যৌনাবেদনময়ী পুতুল বানায়; আর এর যুক্তি হিসেবে শান্তি, বিনোদন, উদারপন্থার কথা বলে। একই সঙ্গে তারা এই পৃথিবীর জন্য কল্যাণকামী মানুষ বলেও নিজেদেরকে দাবি করে। আর এর বিপরীতে আরেক দল আছে, যারা নারীকে ঢেকে রাখতে চায়, পরিবর্তনে বাধা দেয়; কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠায় তারাও মিসাইল ব্যবহারে পিছপা হয় না। হালে এই দুই দল উদারপন্থিমৌলবাদী‘’ নামে খ্যাত। দুয়ের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, সেটা পৃথিবীর সবখানেই চিরন্তন।

হয়তো এই দুই শ্রেণিই যুক্তি দিয়ে নারীদেরএগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর; তবে সেটা কি কোনো গুণগত পরিবর্তন? সম্ভবত না। কারণ, তারা একেকজন একেকভাবে নারীকে ব্যবহার করে, তাদের যুক্তিও তুলে ধরে। কট্টরপন্থিরা সমাজ কিংবা ধর্মের অনুশাসনের ছাঁচে ফেলে নারীকে কব্জায় আনে। প্রয়োজনে সমাজের জন্য ক্ষতিকর, এই দোহাই দিয়ে নাইজেরিয়ার উগ্রবাদী দল বোকো হারেম-এর মতো ছাত্রীদের অপহরণের পর হত্যা করে। আর উদারপন্থিরা স্বাধীনতার ধোঁয়া তুলে, কল্যাণের মন্ত্র দিয়ে নারীর স্বাধীনতাহরণ করে প্রতিনিয়ত।

এই উপমহাদেশে নারী মুক্তির একটি বিশেষ পদ্ধতি নিয়ে আসেন ফকির লালন শাহ্। তিনি নারীকে গ্রহণ করেছিলেন সাধনসঙ্গিনী হিসেবে; বাউল সাধনায় দিয়েছিলেন যথাযথ মর্যাদা। কিন্তু সেই সুখও নারীর বেশিদিন সইলো না। লালনের দেহত্যাগের কিছুকাল পরেই নারী পরিণত হয় সাধনার আধারে। যে কারণে পুরুষ-বাউলকে যা কিছু শিখতে হয়, তার কিছুই প্রায় শিখতে হয় না নারীকে। তার স্থূল, পর্বত স্তর নেই। বাউল সাধক স্তরে আসলে নারীকে আনা হয় সাধনার পাত্র হিসেবে। তাকে শেখানো হয় কীভাবে বাউলের নিম্নগতি রোধ করবে এবং দেহ মিলনে সাহায্য করবে। এভাবে রাধা হয়ে কৃষ্ণকে মিলনজনিত সুখ দেওয়ার মধ্য দিয়ে নারী-রাধারা গুরু-কৃষ্ণদের চরণদাসী হয়েছে। আর সঙ্গে অটুট বিশ্বাস রেখেছে, গুরুর পথই তার পথ।

অর্থাৎ কট্টরপন্থি, উদারপন্থি কিংবা বাউলপন্থি­যে পন্থিই হোক না কেনো, তারা নিজেদের মতো করে নারীকে চালিত করেছে, করছে। সভ্যতার শুরু থেকেই সাহিত্য, কাব্য কিংবা মহাকাব্যের পুরুষ রচয়িতারাও পুরুষের ওপর নারীকে করেছে চরমভাবে নির্ভরশীল, চেষ্টা চালিয়েছে দুর্বল জীব হিসেবে প্রমাণের। বেদ, রামায়ণ কিংবা মহাভারত এর বড়ো প্রমাণ। ঠিক একইভাবে গণমাধ্যমও নারীকে নিয়ে যাচ্ছে তাই করে যাচ্ছে অবলীলায়। ফলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো আরো বেশি পাকাপোক্ত হয়েছে প্রতিনিয়ত।

পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নারী স্বাধীনতার জন্য কাজ যে হয়নি তা নয়। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গান, চিত্রকলার বাইরে বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্র, নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্যমাধ্যমেও তাদের এই প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। যেখানে নানাভাবে উঠে এসেছে নারীর স্বাধীনচেতা দৃষ্টিভঙ্গি, নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনার চেষ্টা। যদিও আমাদের দেশে ৭১-এর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অন্যতম জনপ্রিয় গণমাধ্যম চলচ্চিত্রে নারী স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেছেন এমন নির্মাতার সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। তবে এদের মধ্যে যার কথা বেশি শোনা যায়, তিনি আলমগীর কবির।

কারণ অনেকেই মনে করেন, ...আলমগীর কবির বোধহয় আমাদের তারুণ্যের সময়ের প্রথম মানুষ যিনি যুক্তিহীন, বুদ্ধিহীন কথা শুনলে যেমন প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হতেন, তেমনি একজন পাকা পশ্চিমার মতো অন্যের যুক্তি সকল আগ্রহ নিয়ে শুনতেন। কারণ, তিনি বিভিন্ন দেশের নারীকে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে চলতে দেখেছেন। নারী সম্বন্ধে তার এ বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি নারীর স্বাধীনতাকে চলচ্চিত্রে কীভাবে তুলে এনেছেন এবং এ বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিই বা কেমন, আমরা সেটাই দেখার চেষ্টা করবো।

 

স্বাধীনতা বনাম নারী স্বাধীনতা

জীবনে টিকে থাকাই চরম সার্থকতা নয়। কারণ টিকে থাকাই যদি জীবনে চরম সত্য হতো, তাহলে কখনো দাস, সিপাহী বিদ্রোহ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের মতো কোনো সংগ্রামই হতো না। যুগে যুগে মানুষ জীবন দিয়েছে, সংগ্রাম করেছে; কারণ তার যেটা পাওয়ার কথা, তা থেকে সে বঞ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতা ও পরাধীনতার মানে তারা বুঝতেন বলেই হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলেন। এভাবে স্বাধীনতার জন্য রক্তের হোলি খেলা চলেছে, এখনো চলছে; কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেলেনি কাঙিক্ষত সেই স্বাধীনতা। এখন প্রশ্ন, সেই স্বাধীনতা আসলে কী, যার জন্য মানুষ এতকাল ধরে ছুটছে? এর উত্তর পাওয়া এতো সহজ নয়, এটা অনেক ক্ষেত্রেই অনুভূতির ব্যাপার। তার পরও নিজের মতো করে চিন্তা, মতামত, স্বপ্ন, ইচ্ছে প্রকাশের ক্ষমতাই হলো স্বাধীনতা; তবে সেটা মোটেও অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে নয়।

বর্তমান উত্তরাধুনিকতার এই যুগে অনেক কিছুর সঙ্গে মা দিবস, নারী দিবস, পানি দিবস, শিশুশ্রম দিবসের মতো হাজারো দিবস বেড়েই চলেছে। উন্নত রাষ্ট্রে মা-বাবা আলাদা থাকেন, অথবা থাকেন বৃদ্ধাশ্রমে। মা-বাবাকে দেওয়ার মতো সময় তাদের নেই, ফলে বিশেষ দিনকে বেছে নেয় তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য, সঙ্গে আছে কার্ড-ফুল-চকলেট-টি-শার্টের সেই ভয়ঙ্কর ব্যবসা। বুঝে না-বুঝে পশ্চিমের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের আবেগীমধ্যবিত্তরাও (উচ্চবিত্তরা তো আছেই, তবে প্রধান টার্গেট মধ্যবিত্ত) দিবসগুলো পালনে পাগলপ্রায়। কিন্তু এসব দিবস তো একসময় ছিলো না। তাহলে কি পুঁজির তোড়ে আবেগ-অনুভূতি-ভালোবাসা-দায়িত্ব সবকিছুকে জাদুঘরে পাঠিয়ে আমরা এসব দিবস পালনে উদ্যত হয়েছি?

এ বছর (২০১৪) যেমন ৮ মার্চ নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নারী প্রগতি রাষ্ট্র সমাজ প্রগতি-কে সামনে রেখে সারাবিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও পালন করেছে দিবসটা। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? নারীর অবস্থার কি পরিবর্তন হয়েছে? মনরো থেকে ব্রিটনি, হালের গাগা কিংবা আমাদের রেশমা (রানা প্লাজা থেকে উদ্ধারকৃত) সবাইকে নিয়ে যা হয়েছে কিংবা হচ্ছে সেটা কি ব্যবসা ছাড়া আর কিছু! প্রতিদিন সংবাদপত্র-টেলিভিশন-নাটক-চলচ্চিত্রে সেই একই বিষয়, একই কাহিনি। তত্ত্বকথা যতো বেড়েছে, আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র সঙ্গে প্রান্তিক আমরা ততো বেশি জীর্ণ হয়েছি!

নারীর এই পরাধীনতার সূচনা খুঁজতে গিয়ে আদিম সমাজের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, এই সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে; সেখানে সবাই শ্রম দিতো এবং সব সম্পত্তি সম্প্রদায়ের মালিকানাভুক্ত থাকতো। সেখানে নারী-পুরুষের ভিন্ন অবস্থান ছিলো না। নারীর অধস্তনতার অভ্যুদয় ঘটে মূলত ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তিতে। একই সঙ্গে এর বিকাশ হয় যখন শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পুরুষের ওপর বর্তায়। নারী হয়ে ওঠে পুরুষের সম্পত্তি। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে সে ব্যবহৃত হয়েছে পাশা খেলায় পণ, যুদ্ধে লব্ধ গাণিমা বা পণ্য, সন্ধিবিগ্রহের উপাচার বা বিজয়ীর বরমাল্য হিসেবে। একইভাবে আমাদের সমাজেও ছোটোবেলাতেই বাবা-মায়েরা ছেলের জন্য আনেন বন্দুক-গাড়ি আর মেয়ের জন্য বারবি। এখান থেকেই শুরু হয় লৈঙ্গিক বৈষম্য। আস্তে আস্তে নারী তার শরীর-মন-স্বপ্নের ওপর থেকে অধিকার হারাতে থাকে। সমাজ গেলো, ধর্ম গেলো রব তুলে তাকে একটা গণ্ডির মধ্যে রাখা হয়; হারাতে থাকে তার স্বাধীনতা।

তবে আশা ভঙ্গের কোনো কারণ নেই। অবশ্যই নারীর স্বাধীনতা মিলবেযদি নিজের মন, শরীর ও স্বপ্নের ওপর নারীর পূর্ণ অধিকার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব স্তরে নারী ও পুরুষের সমান মর্যাদা, নারীর পূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মন ও শরীর ধর্মের অনুশাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। একই সঙ্গে যদি উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়। আজকের লেখায় এই বিষয়গুলো অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা থাকবে আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্রকে টেক্সট ধরে। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আলমগীর কবির সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া দরকার।

 

আলমগীর কবির ও তার চলচ্চিত্র

বাংলাদেশে চলচ্চিত্রশিল্পের সূচনা হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে। দীর্ঘ এ সময়ে চলচ্চিত্রের উন্নয়নে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে আলমগীর কবির অন্যতম। বিশ্বমানের শিক্ষার তাগিদে তিনি গিয়েছিলেন পশ্চিমে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে তিনি লন্ডনে ইস্ট পাকিস্তান হাউস, ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট প্রভৃতি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হন।

পরে তিনি ডেইলি ওয়ার্কার-এর জন্য কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার নেন, সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধের রণনীতি ও কৌশল সম্পর্কে ধারণাও। এরপর ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে শরিক হন ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামে। একই সময়ে তৎকালীন ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে চলা আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রামেও জড়িয়ে পড়েন আলমগীর। সেখানে ধরা পড়ে কয়েক মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন; যুক্ত হন বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে। আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আবার কারাভোগ করেন তিনি। সেসময় এই উপমহাদেশে আলমগীরের মতো সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়া মানুষ খুব একটা দেখা যায় না। তিনিই এদেশে সম্ভবত প্রথম, যিনি সেই সময় বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক পড়াশোনা করে এসে চলচ্চিত্র-নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাই তাকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিলো অনেক।

৭১ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের যে গ্রান্ড ন্যারেটিভ দাঁড়িয়েছিলো, সেখান থেকে বেরিয়ে আলমগীর নির্মাণ করেন তার প্রথম কাহিনিচিত্র ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩)। মুক্তিযুদ্ধের অন্য সব চলচ্চিত্র থেকে খুব সহজেই ধীরে বহে মেঘনাকে আলাদা করা যায়। এরপর একে একে বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্রসহ আলমগীর নির্মাণ করেন সূর্যকন্যা (১৯৭৬), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), রূপালী সৈকতে (১৯৭৯), মোহনা (১৯৮২), পরিণীতা (১৯৮৪) ও মহানায়ক (১৯৮৫)। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে প্রথম চলচ্চিত্র সমালোচনার প্রবর্তক; এজন্য তাকে সেসময় তীব্র বিরোধিতারও সম্মুখীন হতে হয়েছিলো।

আলমগীরের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটি (সূর্যকন্যা, সীমানা পেরিয়েমহানায়ক) সিডি ও ইউটিউব-এ পাওয়া যায়। এর মধ্য থেকে আলোচনার সুবিধার্থে সূর্যকন্যা ও তার শেষ চলচ্চিত্র মহানায়ককে বেছে নেওয়া হয়েছে। সূর্যকন্যা ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়ার পর আলমগীর বেশ আলোচিত ও প্রশংসিত হন। কারণ নারীদের অবস্থান নিয়ে সেই সময় কথা বলা খুব সহজ ছিলো না। অন্যদিকে মহানায়ক আলমগীরের শেষ চলচ্চিত্র হওয়ায় এটা আগ্রহের অন্যতম কারণ। আলোচনায় যাওয়ার আগে চলচ্চিত্র দুইটির কাহিনি জেনে নিই।

মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকার চিত্রশিল্পী লেলিন। স্বপ্নবান এই তরুণ সমাজ পরিবর্তনে অনেক কিছুই করতে চান, কিন্তু আশা পূরণ হয় না। বেকারত্ব ঘোচাতে বন্ধু রাসেলের দোকানে ডিসপ্লে আর্টিস্ট হিসেবে চাকরি নেন। বিক্রি নয়, দোকান সাজানোর জন্য লেলিন একটি বড়ো নারী-পুতুল তৈরি করেন। হঠাৎ এক রাতে পুতুলটি জীবন্ত হয়ে ওঠে; নাম হয় তার সূর্যকন্যা। এই সূর্যকন্যা রাতে জীবন্ত হয়, আর দিনের আলো আসার আগেই পুতুল হয়ে যায়। লেলিন ও সূর্যকন্যার মধ্যে গভীর প্রেমের নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে সূর্যকন্যা রক্ত মাংসের মানুষ হয়ে ওঠে। সাদামাটাভাবে এই হলো সূর্যকন্যার গল্প। রূপকের আড়ালে নারী মুক্তির এক অনন্য চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে সূর্যকন্যা

অন্যদিকে দারিদ্র্যের চাপে দিলদারের কাছে পকেটমারার প্রশিক্ষণ নেন শিক্ষিত বেকার যুবক রানা। একদিন কালোবাজারি সাকসিনার পকেট মারতে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় রানার। একপর্যায়ে সাকসিনা তাকে কাজ করার প্রস্তাব দিলে তিনি তা নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করেন। এরই সূত্র ধরে একসময় রানা হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি। নিজের প্রয়োজনে রানার প্রেম হয় লিন্ডা, শিলা ও মিশুর সঙ্গে; নায়ক থেকে তিনি হয়ে যান মহানায়ক। সবশেষে পুলিশের কাছে তার আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় মহানায়ক

 

পুরুষ হইতে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নাই

তিনি শেষ, তিনি পরাগতি

উপনিষদের গভীর তত্ত্বের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে হিন্দু দর্শনশাস্ত্রের উৎপত্তি। এ দর্শন থেকে শুরু হয় ঈশ্বরকে জয় করার চেষ্টামাধ্যম হয় ধ্যান। তারা মনে করতেন, একজন মানুষের কখনোই কোনো কিছুর আসক্তিতে পড়া উচিত নয়। কারণ, কেউ যদি আসক্তিতে পড়ে, তাহলে সেই আসক্তি থেকে কামনা জাগ্রত হবে, আর কামনা জাগ্রত হলে জন্ম নেবে ক্রোধ, ক্রোধ থেকে অবিবেচক, আর অবিবেচক হলে তার স্মৃতি নষ্ট হবে, স্মৃতি নষ্ট হলেই পতন; আর পতন হলেই সে ভোগবাদী মানুষে পরিণত হবে। অর্থাৎ, ভোগবাদী মানুষ মাত্রই তার মধ্যে আসক্তি, কামনা, ক্রোধ, অবিবেচনার মতো অপগুণগুলো অবস্থান করে।

সূর্যকন্যাতে মুক্তি লাভের আশায় সূর্যকন্যা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে প্রেমিক লেলিনের জন্য, যে লেলিন মূর্তি থেকে সূর্যকন্যা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে কামনা করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে। এমনকি মুক্তি পাওয়ার পর সূর্যকন্যাকে এই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিবে না বলেও কথা দেয়। কারণ অতীতের কথা মনে পড়লে সূর্যকন্যা আবার পরাধীন হয়ে যাবে, হবে পুরুষের ভোগ্যবস্তু ও সন্তান জন্মের যন্ত্র। কিন্তু এই লেলিন হলো সেই প্রেমিক যে সুযোগের অভাবে সৎ সাজে; নারী সঙ্গমে প্রবল বাসনা থাকলেও নির্জনতার অভাবে নিজেকে চরিত্রবান দাবি করে। যে লেলিন নারীতে আসক্ত, বাবার প্রতি যার প্রচণ্ড রাগ-ক্ষোভ এবং সুযোগের অভাবে যিনি চরিত্রবান, তার কাছ থেকে কী মুক্তি প্রত্যাশা করে ওই নারী?

সূর্যকন্যার শেষের দিকে সূর্যকন্যার সঙ্গে লেলিনের বিবাহের ইঙ্গিত করেন আলমগীর। সেখানেও উদ্দেশ্য সূর্যকন্যার মুক্তিই। তার মানে যে পুরুষের হাতে নারী-বন্দি নির্মিত, সেই নারীকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি দিতে পারে সেই পুরুষই! অন্যদিকে আলমগীর সূর্যকন্যার অতীত স্মৃতি স্মরণ করা নিয়ে সবসময় অনীহা দেখালেন। ভয় দেখালেন, অতীত মনে করলেই সূর্যকন্যা আবার ফিরে যাবে সেই পুতুলের বন্দি জীবনে। এখন প্রশ্ন, অতীত ছাড়া কি মানুষের বাঁচা সম্ভব, সেই অতীত যতোই কষ্টের হোক? মানুষ অতীতকে আঁকড়ে ধরে বর্তমানকে সঙ্গী করে এগিয়ে যায়। বন্দিত্বের অতীত যদি নাই স্মরণে থাকে, তাহলে বর্তমানের স্বাধীনতার তো কোনো মূল্য নেই। এ তো এক পুতুল থেকে আরেক পুতুল হয়ে বেঁচে থাকা। অথচ আলমগীর নারীমুক্তি দেখাতে গিয়ে তাই করলেন।

আদিতে নারী তো পুরুষের চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে ছিলো, সেটা তো আজকের অনেক নারীই জানে। তাহলে নারী তার বর্তমানে পুরুষের অধীনতা ভুলে কেনো স্বাধীন হতে পারে না? যদি এটা না পারে তাহলে সূর্যকন্যাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আলমগীর কবিরের বাধা কোথায়?

সূর্যকন্যার অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রাসেল ও মনিকা। রাসেল লেলিনের বন্ধু আর মনিকা সহকর্মী। রাসেল ও মনিকার সম্পর্ক প্রেমের, একই সঙ্গে মালিক-শ্রমিকের। মনিকাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে রাসেল শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়, কিন্তু বিয়ে করতে চায় না। মনিকা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে; শেষ পর্যন্ত না হলে মনিকা অষ্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু শেষে কোনো এক অজানা কারণে রাসেল ভুল বুঝে ক্ষমা চাইলেই মনিকা সব রাগ-ক্ষোভ ভুলে তাকে বিয়ে করে ফেলে। মনে হয়, এই সময়টির জন্যই মনিকা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো। তাহলে এখানে ব্যক্তি-মনিকার অবস্থান কোথায় থাকলো, নাকি পুরুষ চাইলে সাত খুন মাফ? শেষ পর্যন্ত আলমগীর কিন্তু পুরুষ-রাসেলের হাতেই মনিকার মুক্তি নির্ধারণ করে দিলেন! পুরুষকেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখলেন।

মহানায়ক-এ নায়ক রানা নিজের স্বার্থে কখনো লিন্ডা, শিলা, আবার কখনো মিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। প্রয়োজনে কাউকে ভালোবাসে, কাউকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু লিন্ডা-শিলা-মিশুরা মহানায়ক রানাকে কিন্তু কোনোভাবেই ছাড়তে চায় না। রানা দিব্যি অন্য নারীর সঙ্গে ভালোবাসায় জড়ায়, সুযোগ বুঝে রাগ-ক্ষোভের প্রতিশোধও নেয়। এতকিছুর পরও রানাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হয় লিন্ডা।

দার্জিলিংয়ের মেয়ে শিলা; নেপালে সাকসিনার আদেশে পুরুষের প্রমোদের জন্য কাজ করে। সেও রানাকে ভালোবাসে কিন্তু কখনো স্বামী হিসেবে পেতে চায় না। কারণ সে কুলটা! একপর্যায়ে, নেপাল থেকে ফেরার সময় শিলাকে মুক্তি দেয় রানা। শিলা ঠিক করে গ্রামের বাড়িতে ফিরে ছোটো দোকান দিয়ে সংসার চালাবে। সে বিয়ের কথা ভাবে না। তার আচরণে মনে হয়, সে হয়তো প্রেমিক রানার কথা ভেবেই কাটিয়ে দিবে বাকি জীবন। অথচ এ নিয়ে পুরুষ-রানার কিন্তু তেমন কোনো অনুভূতিই নেই। রানা হবে বহুগামী, আর প্রেমিক, পুরুষহারা শিলাকে বয়ে বেড়াতে হবে একাকিত্বের জীবন। এই না হলে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত পুরুষ-আলমগীরের নারী!   

 

কে বলেরে নারীনারী

এই নারী কি সেই নারী?

অনেক দেশ ঘুরেছেন আলমগীর, দেখেছেন সেসব দেশের নারীর অবস্থা। তাই তার চলচ্চিত্রে এর ছাপ থাকাই স্বাভাবিক। মহানায়ক-এ লিন্ডা নামে থাইল্যান্ডের এক মেয়ে রানার জীবনে আসে। প্রথম দেখাতেই লিন্ডাকে ভালোবেসে ফেলে রানা। ভালোবাসার মূল্যও দেয় লিন্ডা; তাকে রানা যা আদেশ করে ঠিক তা-ই করে সে, ফলে সহজেই নিজের পছন্দ-অপছন্দ ফিকে হয়ে যায়। মনে হয় এগুলো লিন্ডার থাকতে নেই। সে কেবলই পুরুষের সম্ভোগিনী। ফলে মাত্র ১২ দিনের পরিচয়েও রানার জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে লিন্ডা।

তার প্রতিদানে রানা তাকে কিছু না বলেই দেশে চলে আসে এবং কয়েকদিন পর নেপালে গিয়ে শিলার সঙ্গ ভোগ করতে থাকে। রানাকে নেপাল শহর ঘুরে দেখায় এবং নজরদারি করে শিলা। রানা এবার শিলার প্রেমে পড়েশরীর আর মনে আনন্দ নেয়। শিলাও প্রেমে সাড়া দেয়; নিজেকে শিলার কাছে পরিচ্ছন্নভাবে উপস্থাপনের জন্য রানা তার আগের প্রেমের সম্পর্কের কথা স্বীকার করে। ফলে শিলা তাকে আরো বিশ্বাস করে সবকিছু উজাড় করে দেয়। কিছুদিন পর তাকেও রেখে চলে যায় রানা; বলে আসে তোমার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হবে কি না হয়তো জানি না। তবে জানি, তোমাকে আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না।

কিন্তু কোন্ শিলাকে ভুলতে পারবে না রানা? নিরীহ, সহজ-সরল শিলাকে, নাকি অন্যদের চেয়ে সে ভোগের বস্তু হিসেবে বেশি ভালো ছিলো, সেজন্য? আর যদি নাই ভুলতে পারে, তাহলে কেনো এভাবে ছেড়ে চলে আসা? অবশ্য এও হতে পারে, পুরুষ-রানাকে সৎহৃদয়বান হিসেবে উপস্থাপন করা। তবে যে কারণেই আলমগীর তাকে মনে রাখুন না কেনো তা কোনো নারীর জন্যই সম্মানজনক নয়। আবার দেখুন, আর কোনোদিন দেখা হবে না জেনেও বিদায় বেলা রানাকে নিয়ে শিলার সে কী আহ্লাদে গদগদ ভাব, এর কারণই বা কী? নির্মাতা এখানে কী বোঝাতে চাইছেন, এটুকুই একজন নারীর জন্য যথেষ্ট? নাকি একজন বেশ্যার বেঁচে থাকার জন্য এর চেয়ে আর ভালো সান্ত্বনার কিছু নেই!

রানার তৃতীয় প্রেমের সূচনা চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে মিশুর সঙ্গে। মিশু তাকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলে। ভাবখানা এমন, পূর্বজীবনে সে রানার সঙ্গে থাকার জন্যই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো। ফলে এ জীবনে তার রানার মন ভুলানো ছাড়া আর কাজ নেই। আধুনিক-শিক্ষিত মিশু কাগজ-কলমে শিক্ষিত হয়েছেন বটে, কিন্তু হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিকতার শাসন যেনো মুড়িয়ে দিয়েছে তার আচরণ। মিশুকে দিয়ে আলমগীর এখানে নারীকে এমনভাবে সস্তা পণ্য বানালেন, মনে হলো দাম নেই; অতএব ফেলে দাও।

অন্যদিকে যে সূর্যকন্যাকে কেন্দ্র করে সূর্যকন্যা নির্মিত, তাকে ভোগ্যবস্তু করে তুলে ধরা হয়েছে সচেতনভাবে। যে মুক্ত সূর্যকন্যাকে লেলিনের সামনে আনা হলো, সে আসলে লেলিনের বোনের বান্ধবী সুজলা। এই সুজলা লেলিনকে অন্ধের মতো ভালোবাসে, নিজের করে পেতে চায়; যদিও সে লেলিনকে কখনো দেখেনি। তবুও সে দুর্বল। কিন্তু এ দুর্বলতা কিংবা না দেখে অন্ধের মতো ভালোবাসা কেনো? নির্মাতা এখানে কী বোঝাতে চান, নারীকে কেনো এতো দুর্বল মানসিকতায় দেখিয়ে স্বামী বা কোনো পুরুষের ভালোবাসা আদায় করতে হয়? নাকি সেই দুর্বলতা দিয়ে নারীর নমনীয়তাকে জাগিয়ে তুলে পুরুষের দুর্বিনীত কামকে তৃপ্ত করবে?

এদিকে বিপত্নীক রাসেল বিয়ের লোভ দেখিয়ে মনিকার শরীরের উপর প্রতিনিয়ত চড়ে বসে। রাসেলের যখন কামক্ষুধা জাগে, তখনই মনিকাকে সাড়া দিতে হয়। মনিকার ইচ্ছা-অনিচ্ছা এখানে রাসেলের হাতে বন্দি। আলমগীর শেষ পর্যন্ত মনিকাকে বিদেশে না পাঠিয়ে অসম্মত রাসেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করে ফেললেন? তিনি কী বোঝালেন, মনিকার ভালোবাসার জয় হয়েছে, ফিরে পেয়েছে তার অধিকার; আসলে বিয়েটাই কি সব? রাসেলের লাম্পট্যের কথা জেনেও মনিকাকে কেনো শেষ পর্যন্ত তার কাছেই ফিরে যেতে হলো? এতসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আলমগীর দেননি।

 

হাতের কাছে নড়ে চড়ে

খুঁজলে জনমভর মেলে না

আমরা সবাই কোনো না কোনো জায়গায় নীরব। হয়তো সেটা কোনো কারণে, অকারণে কিংবা বাধ্য হয়ে। যার ফলে আমরা একজন আরেকজনের কাছে কোনো না কোনোভাবে শোষিত হয়েছি বা হচ্ছি। ভালোবাসার মানুষটি যতো ভালো মানুষই হোক না কেনো, সেও শোষণ করছে। অনেকে বোঝাপড়ার জায়গা থেকে মানব-মানবীর সম্পর্ককে ভালো জুটি বলে থাকেন। কিন্তু সেটাও আর ঠিক হয়ে উঠছে না; আগেও ছিলো কি না, কে জানে! তবে রবীন্দ্রনাথ তার হৈমন্তী ছোটোগল্পে বলছেন এভাবেধিকাংশ লোকে স্ত্রীকে বিবাহমাত্র করে, পায় না, এবং জানেও না যে পায় নাই; তাহাদের স্ত্রীর কাছেও আমৃত্যুকাল এ খবর ধরা পড়ে না। কেনো পড়ে না, সেটা তিনি সরাসরি বলেননি। তবে আমরা সেটা খুঁজে দেখার প্রচেষ্টা চালিয়ে দেখতে পারি।

সূর্যকন্যাতে কলেজ জীবনে লেলিন তার পাশের বাড়ির এক মেয়ের সঙ্গে হিপনোটিজম চর্চার অজুহাতে সঙ্গমে উদ্যত হয়। মেয়েটিও তার কথামতো চোখ বুজে বিছানায় শুয়ে থাকে; উদ্দেশ্য, লেলিনকে সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু হঠাৎ মেয়েটির মা চলে আসায় তা আর হয় না। তার মানে, পুরুষ যখন যেটা করতে চায়, সেটি পূরণে নারী প্রস্তুত থাকে, কোনোরকম নড়াচড়া এমনকি কথাও বলে না। কারণ পুরুষ নারীর কাছে কিছু চেয়েছেএটাই বড়ো কথা! যদি এটা বড়ো কথা হয়, তাহলে নারীর মুক্তি মিলবে কোথায়? বেগম রোকেয়া নারী স্বাধীনতা নিয়ে বলেছিলেন, যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। ...আমরা যদি রাজকীয় কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব। ভারতে বর দুর্লভ হইয়াছে বলিয়া কন্যাদায়ে কাঁদিয়া মরি কেন, কন্যাগুলি সুশিক্ষিতা করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজেরা অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক। সূর্যকন্যা কি এগুলোর কোনো আশা দেখাতে পেরেছে? নাকি এর পুরুষ-নির্মাতা যাহা করিতে চাহিয়াছেন, তাহাই করিয়াছেন?

দীর্ঘদিন মনিকার সঙ্গে রাসেলের শারীরিক সম্পর্ক থাকলেও মনিকা বুঝতেই পারেনি রাসেল পরে তাকে বিয়ে করতে চাইবে না। নির্মাতা তার নারী অধিকার বিষয়ক এ চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীকে চিনতে না পারা সম্পর্কিত রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যেরই বাস্তব দৃশ্য দেখান, তাহলে তার সেই কল্পিত নারীর অধিকার কোথায়?

 

নারী : আজকের মা

চরম বাস্তবতার সম্মুখীন না হলে একজন মা সবসময়ই তার সন্তান, সংসারের জন্য নিবেদিত প্রাণ। কেননা অনুশাসনে আবদ্ধ নারীমাত্রই মনে করে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্ববোধও পরিবর্তন হয়। তাই সেই বারবি পুতুল-এর বদল হয়; সামনে আসে নতুন আশা, শঙ্কা, স্বপ্ন। এই সমাজ নারীকে বিবাহের নামে নিরাপত্তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এই বিবাহজনিত নিরাপত্তা ভালোবাসার আবেগকে ধরে রাখতে পারে না। প্রেমিক হারিয়ে যায় স্বামীর মধ্যে, হয়ে ওঠে শাসক। অন্যদিকে সবার মন জয় করতে স্ত্রীও চালাতে থাকে একের পর এক কর্মসূচি। আর এ প্রবণতা চলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

সূর্যকন্যাতে লেলিনের মার জীবন দেখে কখনো অদ্ভুত কখনো ক্লান্তিকর মনে হয়। তিনি তার অতীত ভুলে ছেলে-মেয়েকে সবসময় খুশি দেখতে চান; সঙ্গে থাকে স্বামীর প্রতি অভিমান। এই মা সবসময় অকর্মণ্য, অলসভাবে কেবল আনন্দময় স্মৃতিচারণায় জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেন, কোনো কিছু না পেলে মায়াকান্না দিয়ে সবকিছু জয় করতে চান। তাকে দেখে মনে হয়, এই মা শুধুই তার নাতি-নাতনির মুখ দেখে আনন্দে মরতে চান। তাই বার বার প্রত্যাশা পূরণে তিনি লেলিনের কাছে হাজির হন পরিচিত এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য। সবকিছুকে যদি এ রকম চিরাচরিতভাবে দেখার প্রবণতা থাকে নারীর, তাহলে সূর্যকন্যা দিয়ে কী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন নির্মাতা?

আবার, সবকিছুকে তিনি যে একেবারেই সাদামাটা করে দেখিয়েছেন এমনটিও নয়। কখনো কখনো মায়ের স্বাভাবিক আচরণও ধরতে পারেননি। কারণ লেলিনের একমাত্র বোনের বিয়ে কিংবা শিক্ষা নিয়ে লেলিনের একটু চিন্তা থাকলেও তার মায়ের মধ্যে কোনো চিন্তা দেখা যায়নি। দেখে মনে হয়েছে, যতো চিন্তা কেবল ছেলে লেলিনের জন্য। এর কারণ কী? ছেলে লেলিন তার জন্য উপার্জন করে জীবনে অর্থনৈতিক কারণে না পাওয়া শান্তিটুকু কিনে আনবে, নাকি মেয়ের চেয়ে ছেলে সন্তানই বেশি মূল্যবান, সেটা প্রমাণ করবে? তার আচরণ দেখে এও মনে হয়, মেয়ে তার জন্য কিছুই করতে পারবে না; বরং আজ হোক, কাল হোক সে একদিন তার মতো স্বামী-সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে অতীত ভুলে যাবে। তাহলে হাজার বছরের সেই পুরুষতান্ত্রিকতার ছাপ, সেই অধীনতার মাঝ থেকে আলমগীরও কি বের হতে পারলেন? নাকি মুখে আন্দোলন, আর মনে কোনোরকমে বেঁচে থাকাকেই তিনি শ্রেয় মনে করলেন? আর তিনি যদি এটা মনে না-ই করেন, তাহলে নারীর হৃদয়কে কেনো ছলনাপূর্ণ চাতুরী, শঙ্কা দিয়ে কলঙ্কিত করতে হবে?

আবার, আধুনিকতার ছোঁয়ায় নতুন এক মাকে দেখি মহানায়ক-এ। মিশুর মা যখনই শুনলেন রানা বিয়ে করেনি, তখনই তাকে জামাই বানানোর স্বপ্নে বিভোর হলেন। তিনি তার শিক্ষিত মেয়ের মতামত নেওয়ার কোনো প্রয়োজনই বোধ করলেন না! কারণ মেয়ের আবার মতামত কিসের, তাদের কথাই শেষ কথা; মেয়ে তাদের লক্ষ্মী! (কথামতো কাজ করলে এদেশে মেয়েদের অনেকে লক্ষ্মী বলে ডাকে।)

অন্যদিকে, পিতা-মাতাহীন রানার অর্থের কথা জেনে মুহূর্তের মধ্যে তার জন্য এই মা যেনো আরো বেশি আবেগী হয়ে ওঠেন। আলমগীর কি বোঝালেন মায়েরা এ রকম দুঃখীদের দেখলেই কান্নায় আঁচল ভেজান? নাকি অর্থনৈতিক চাকচিক্যের খবরে মনের ভিতরকার আনন্দকে চোখের পানি দিয়ে প্রকাশ করেন? তবে তিনি এই মাকে একদিকে যেমন অনেক বেশি আবেগী করে তুলেছেন, অন্যদিকে প্রকৃতির দেওয়া স্বাভাবিকতাও নষ্ট করেছেন। সবমিলিয়ে মাকে আর মায়ের মতো রাখেননি।

 

তুমি বা কে, কে বা আমি

এই সংসারে

ভারতবর্ষের ইতিহাসে আর্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে শক্তিশালী গণসংগঠনের দুই নায়কের নাম জানা যায়। একজন গণপতি, অন্যজন মহিষাসুর। পরে আর্যরা বিশ্বাসঘাতক গণপতিকে গণেশ নাম দিয়ে বানালো দেবতা, কারণ গণপতি আর্যদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছিলো। পক্ষান্তরে, ভারতীয় উপমহাদেশের জাতীয় বীর মহিষাসুর তার দেশের মানুষের অস্তিত্বের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছিলো। ফলে তাকে হত্যা করে নাম দিলো অসুর।১০ ঠিক এ রকম দেশপ্রেমিক কিংবা অসুর যে বর্তমানে আমাদের দেশে নেই, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে সমস্যা হলো কে অসুর আর কে দেশপ্রেমিক সেটাই বুঝে ওঠা দায়। কারণ বেশিরভাগই নিজেকে সাধু বলে দাবি করে। ফলে এই সাধুর ভিড়ে আসল সাধুকেই খুঁজে পাওয়া যায় না।

মহানায়ক-এর পোশাক আর প্রসাধনীর দিকে যদি একটু খেয়াল করি, তাহলে দেখবো এর নারীরা পোশাকে অনেক বেশি আধুনিক হলেও কর্মে কিংবা কথা-বার্তায় আধুনিকতার সে ছাপ তুলে আনতে পারেননি।

একইভাবে সূর্যকন্যায় মনিকার পোশাক, প্রসাধনী ও অবাধ মদ-ধূমপান দেখে মনে হয়, আলমগীর সত্যিই নারীকে তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেছেন। কিন্তু মনিকার সংলাপে বোঝা গেলো, বাইরে শুধু তার এই রূপ, ভিতরটা ফাঁপা। তার নিজের স্বাধীনতা বলতে আসলে কিছুই নেই। তাহলে পোশাক আর প্রসাধনীর এমন চাকচিক্য দেখিয়ে আলমগীর কিসের ইঙ্গিত দিলেন? নিজের দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ঠুনকোএগুলো ব্যবহারে নারী স্বাধীনতা সম্ভব নয়; নাকি আধুনিকতা আর স্বাধীনতা মানেই মদের বোতল, মুখে সিগারেট আর অবাধ যৌনাচার? আমাদের সমাজে প্রগতিশীল চিন্তা করেনএমন মানুষদের সংখ্যালঘুই বলা যায়। কাজেই সংখ্যাগুরু মানুষের কাছে বিক্রি হওয়ার আশায় কি আলমগীর তার চলচ্চিত্রে দেশিয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ভুলে গেলেন?

 

শেষ বয়ান

ছোটোবেলায় মাদ্রাসায় পড়ার সুবাদে নানা জায়গায় ইসলামি জলসা শুনতে যেতে হতো। একদিন এক মাওলানা ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে বয়ানে আল্লাহকে বড়ো করে হরিকে ছোটো করতে গিয়ে দুটি বাক্য বলেছিলেনহরির উপরে হরি, হরিতে শোভা পায়; হরিকে দেখিয়া হরি, হরিতে লুকায়। বাক্য দুইটির প্রকৃত মানে কী, সেটা তখন বুঝিনি। কিন্তু এতদিন পর কেনো জানি হঠাৎ বিষয়টি নিয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম; দ্বারস্থ হলাম বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের। হরি শব্দের এতো অর্থ (বিষ্ণু, নারায়ণ, কৃষ্ণ, যম, সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, সর্প, ব্যাঙ, হংস, সবুজ বর্ণ, ধান্যবিশেষ।)১১ দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। এবার হুজুরের কথার মর্মার্থ খুঁজে পেলাম। হুজুর আসলে এই দুই বাক্যের মানে বুঝিয়েছিলেন, পদ্ম পাতার উপরে একটি ব্যাঙ, যা দেখতে খুব মনোরম; হঠাৎ ওই ব্যাঙটি একটি সাপ দেখে পানিতে লুকিয়ে যায়। অর্থাৎ এতগুলো হরি শব্দ থাকলেও এখানে দেবতা হরিরা কেউ নেই।

আমাদের সমাজসচেতন চলচ্চিত্রনির্মাতা আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্রেও এটার কোনো ব্যতিক্রম দেখতে পাইনি। আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি পুরুষকে নারীর ওপরে রেখে দিয়েছেন বহাল তবিয়তে। পুরুষের মহিমা, গুণ, শক্তি, সাহসের মধ্যে নারীকে পুরুষে বিলীন করেছেন। যেটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজেই ভালো মানায়। অস্তিত্ব যতোটুকু রেখেছেন, সেটা হয়তো আবার নতুন করে ভোগ করার জন্য।

 

লেখক : ইব্রাহীম খলিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। 

ibrahimrumcj@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. খন্দকার, নাসরিন (২০১১ : ১৭); পুতুলখেলার রাজনীতি : বারবি কাহিনী; সন্ধি প্রকাশনী, ঢাকা।

২. চাকী, লীনা (২০০১ : ৫১); বাউলের চরণ দাসী; পুস্তক বিপণি, কোলকাতা।

৩. হোসেন, মাহমুদুল; সমাজ ও চলচ্চিত্র : আলমগীর কবিরের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা; শিল্প ও শিল্পী; সম্পাদনা : আবুল হাসানাত; তৃতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃ. ১০৫, ঢাকা।

4. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/17701

5. http://www.mukto-mona.com/Articles/salman_sultan/nari.htm

6. www.somewhereinblog.net//blog/abdwahed/29524643

৭. শ্রীমদ্ভগবতগীতা (২০০৬ : ৬১); অনুবাদ : স্বামী অমিত্বানান্দ; রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশন, দিনাজপুর।

৮. আহমেদ, আলাউদ্দীন; গৌতম বুদ্ধের প্রকৃত পরিচয়; নতুন দিগন্ত; সম্পাদনা : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, একাদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, অক্টোবরডিসেম্বর ২০১২, পৃ. ১৫৯, ঢাকা।

৯. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০১১ : ৩৮৫); হৈমন্তী; গল্প গুচ্ছ; জোনাকী প্রকাশনী, ঢাকা।

১০.http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/17701 

১১. আরো অর্থ জানতে দেখতে পারেন বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ম্যাজিক লণ্ঠনের সপ্তম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন