ফাহিমা আল ফারাবী
প্রকাশিত ০৭ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
রাশোমন-এ মনুষ্যত্ব : আকুতাগাওয়া’র সঙ্কট কুরোসাওয়া’য় উত্তরণ
ফাহিমা আল ফারাবী

১৯৫১ সালে যখন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব থেকে রাশোমনকে মনোনীত করা হয়, তখন খোদ জাপানের কেউই ভাবেনি চলচ্চিত্রটি নিরঙ্কুশ জয়ে প্রথম স্থান অধিকার করবে। রাশোমন-এর এই জয় ছিলো বিস্ময়কর, এই বিজয় ছিলো পশ্চিমাদের এশিয় চলচ্চিত্রকে নতুনভাবে আবিষ্কারের বার্তাবহ। রাশোমন আরো বুঝিয়ে দিয়েছিলো, নিজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শক্ত ভিতে ভর রেখেই চলচ্চিত্র ভাষার পূর্ণ ব্যবহার করে চলচ্চিত্র জগতে নতুন কিছু সংযোজনের অপার সম্ভাবনায় ঋদ্ধ জাপানসহ মহাদেশের অন্যান্য দেশগুলো। সবার চোখ খুলে দিয়েছিলো রাশোমন; কিন্তু তার মহিমা কি শুধু কারিগরি ও চলচ্চিত্র ভাষার মুন্সিয়ানায় সীমাবদ্ধ? পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এবং বোধ করি সমগ্র পৃথিবীতেই রাশোমন আজ পরিচিত ধ্রুপদী চলচ্চিত্র হিসেবে। যুগে যুগে রাশোমন বিস্মিত, আন্দোলিত করে চলেছে দর্শক-বোদ্ধাদের মন ও মনন; প্রভাবিত করেছে প্রজন্মান্তরের চিত্র-পরিচালকদের। কিন্তু কী এই রাশোমন, কোথায় তার মূল বিশেষত্ব? চলচ্চিত্র হিসেবে তার কৃতিত্ব কোথায়, কোন্ জাদুমন্ত্রেই বা তা হয়ে ওঠে আকিরা কুরোসাওয়া’র মাস্টারপিস?
রাশোমন-এর ইন্দ্রজাল ভেদ করতে হলে প্রথমে যেতে হবে এর উৎসে—রিউনোসুকে আকুতাগাওয়া’র গল্পদ্বয়—‘রাশোমন’ ও ‘বাঁশবনে খুন’১ জাপানি সাহিত্যের দুই অনবদ্য সৃষ্টি, যা থেকে উৎসারিত হয় কুরোসাওয়া’র এই মাস্টারপিস। সত্য ও ন্যায়ের আপেক্ষিকতা, সর্বোপরি মনুষ্যত্বকে আকুতাগাওয়া’র সাহিত্যে যে সঙ্কটে পতিত হতে দেখা যায়, মহত্তম পরিচালক কুরোসাওয়া‘র একই গল্পের ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্র রাশোমন-এ আমরা দেখি এর পরিপূর্ণ রূপ। মনুষ্যমনের জটিলতায়, নৈতিকতার প্রশ্নে কুরোসাওয়া কেবল আলো ফেলেই ক্ষান্ত হন না, বরং তার প্রচ্ছন্ন কারণগুলোকে চলচ্চিত্রের ভাষায় ব্যক্ত করতে সচেষ্ট হন। চলচ্চিত্রটির শেষে কুরোসাওয়া’র বহুল আলোচিত যে সংযোজন (কাঠুরের পরিত্যক্ত শিশুটিকে গ্রহণ) এবং নারী চরিত্রটির ব্যাপকতর উপস্থাপন চলচ্চিত্র হিসেবে যেমন, শিল্পের মাপকাঠিতেও তেমন ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় মূল গল্পকে। শিল্প হিসেবে ও সঙ্কট উত্তরণের প্রশ্নে রাশোমন-এর সাফল্য পরিষ্কার হয়ে উঠতে পারে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মূল্যায়নে, যা এই রচনাটির মূল উপজীব্য।
রাশোমন ও কুরোসাওয়া
জাপানের চলচ্চিত্র জগতের সম্রাট-খ্যাত পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া যখন রাশোমন নির্মাণের কাজে হাত দেন তখনো তিনি সম্রাট হয়ে ওঠেননি। রাশোমন-এর প্রযোজক সংস্থা দাইয়েই প্রথম থেকেই সন্দিহান ছিলো কাজটা নিয়ে; এর সহকারী পরিচালকেরা চিত্রনাট্য পড়েও প্রথমে বুঝতে পারেননি রাশোমন-এর ধাঁধা। আসলে রাশোমন-এর গল্পটি সাধারণভাবেই যেকোনো মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট—একটি খুনের ও ধর্ষণের সাক্ষীদের বিবৃতি, যা একটা আরেকটার সঙ্গে কোনোভাবেই মিলে না। এমন একটি দুর্বোধ্য গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর দুঃসাহসই শুধু কুরোসাওয়া দেখাননি, রাশোমন-এর ধাঁধার এক মানবিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে শিল্পী হিসেবে নিজস্ব একটা আশ্বাস ও আস্থাও দর্শকের মধ্যে পুনঃস্থাপন করেছেন।
পরিচালক হিসেবে কুরোসাওয়া বিশেষভাবে পরিচিত তার গভীর মানবতাবোধ ও নৈতিকতা নিয়ে প্রবল আগ্রহের জন্য। ব্যক্তিমানুষের বস্তুনিষ্ঠ চরিত্রায়ণ তার চলচ্চিত্রে প্রাধান্য পায়; তৎকালীন জাপানি চিন্তাধারার ক্ষেত্রে যা ছিলো অনেকাংশেই বিপ্লবী। তার ইকিরু, হাই অ্যান্ড লো, সেভেন সামুরাই চলচ্চিত্রসমূহে চরিত্রগুলোর বস্তুনিষ্ঠ চরিত্রায়ণ শুধু ব্যক্তি ও সমাজের পরস্পর সম্পর্ককেই নিরিখ করে না, মানবতা বা মনুষ্যত্বের সীমারেখাকেও যেনো পরখ করে দেখতে চায় মানবিক শক্তি ও দুর্বলতার মাপকাঠিতে। রাশোমন-এও তার ব্যত্যয় ঘটে না। গল্পের খুন ও ধর্ষণের ঘটনা দেখাতে কুরোসাওয়া যে মস্তিষ্কভেদী বস্তুবাদী সংলাপের উন্মেষ ঘটান, মানুষের নৃশংসতা নির্মমতাকে তুলে ধরতে যেভাবে তিনি এতটুকু পিছপা হন না, এটা তার মর্মভেদী অন্তর্দৃষ্টিরই পরিচয় দেয়। কিন্তু সে বিষয়ে বিশদে যাওয়ার আগে মূল গল্পে একটু ফিরে যাওয়া দরকার, যার নিরীক্ষণ কুরোসাওয়া’র নিজস্বতা সম্বন্ধে আমাদের নিশ্চিত করে।
সাহিত্যে ‘রাশোমন’ : আকুতাগাওয়া’র অমীমাংসিত সঙ্কট
আগেই বলা হয়েছে রিউনোসুকে আকুতাগাওয়া’র গল্প ‘রাশোমন’ ও ‘বাঁশবনে খুন’ (জাপানি ভাষায় ‘য়াবুনো নাকা’) অবলম্বনে কুরোসাওয়া’র আলোচ্য চলচ্চিত্রটি নির্মিত। আকুতাগাওয়া ক্ষণচর এক লেখক, বেঁচেছিলেন মাত্র ৩৫ বছর। এই সীমিত সময়ে তিনি যা রচনা করে গেছেন তা জাপানি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে আজও স্বীকৃত। যদিও আকুতাগাওয়া’র জীবদ্দশায় তা হয়নি, হলে হয়তো তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিতেন না।
আকুতাগাওয়া’র অধিকাংশ গল্পই ইতিহাসের ঘটনা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রভাবিত, যদিও চরিত্রগুলো নতুন চেহারা পায় আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গুণে। তার গল্প ‘রাশোমন’ কিয়োতো’র ঐতিহাসিক রাশোমন তোরণের প্রেক্ষাপটে সাজানো; এক সদ্য বেকার তাকেহিতো’র প্রবল ঝড়-বৃষ্টির রাতে নৈতিক অধঃপতনের চিত্র। এই গল্প থেকে মূলত কুরোসাওয়া রাশোমন চলচ্চিত্রের আবহটুকু নেন। চলচ্চিত্র রাশোমনও তাই ‘রাশোমন’ গল্পের মতোই শুরু হয় প্রবল দুর্যোগের ঘনঘটায়। সে যেনো মানুষের ডেকে আনা ভয়াবহতম দুর্যোগ, ধরাধামের উপর্যুপরি বিনাশের বার্তাবাহী। রাশোমন-এর ধ্বংসস্তূপ, ক্ষয়িষ্ণু একসময় যখন খুন, রাহাজানি, লুটপাট নিত্যকার ঘটনা, এর সবকিছুর সঙ্গে মিশে যায় মুশলধার বৃষ্টি। এমন ঝড়বৃষ্টিতে ভেঙে পড়া জীর্ণ রাশোমন তোরণে শুরু হয় তিনজনের কথোপকথন—কাঠুরে, বৌদ্ধ পরিব্রাজক ও এক সাধারণ লোক, বিষয় ‘বাঁশবনে খুন’। এর মধ্যে প্রথম দুজন ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী ও মামলার সাক্ষী। কথোপকথনের এই পুরো অংশটুকুই কুরোসাওয়া’র নিজস্ব সংযোজন, এর মধ্য দিয়ে তিনি কাঙ্ক্ষিত উপসংহারে পৌঁছান।
মূল ‘বাঁশবনে খুন’ গল্পে আকুতাগাওয়া একটি খুন ও ধর্ষণের ঘটনাকে তুলে ধরেন মোট সাতজন ব্যক্তির জবানবন্দিতে। এর মধ্যে মুখ্য খুনি ব্যক্তি, ডাকাত তাজোমারু, তাকেহিতো’র ধর্ষিতা স্ত্রী মাসাগো ও মৃত ব্যক্তি সামুরাই তাকেহিতো স্বয়ং। এমন প্রকরণকৌশলে গল্পটি হয়ে ওঠে একাধারে বস্তুনিষ্ঠ ও বস্তুনিরপেক্ষ। গল্পটি বস্তুনিষ্ঠতা পায় এ বলে যে, পুরো ঘটনাই উপস্থাপন হচ্ছে কোনো না কোনো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। আবার, গল্পটি বস্তুনিরপেক্ষও বটে, কারণ পুরো গল্পে লেখক নিজের বলে একটি বাক্যও খরচ করেননি (যদিও মৃত ব্যক্তির বিবৃতি অনেকটাই লেখকের নিজস্ব মনোভাবকে ব্যক্ত করে)।
ঘটনা এই যে, জঙ্গলের পথে সামুরাই তাকেহিতো তার স্ত্রীকে নিয়ে যাচ্ছিলো গন্তব্যে। পথে কুখ্যাত ডাকাত তাজোমারু’র চোখ পড়ে সুন্দরী মাসাগো’র ওপর। লোভের বশে তাকেহিতো ব্যর্থ হয় স্ত্রীকে রক্ষা করতে, মাসাগো ধর্ষণ হয় তাজোমারু’র হাতে। এর পরের ঘটনা অস্পষ্ট, তবে এরই জের ধরে মারা যায় তাকেহিতো, যার লাশ খুঁজে পায় এক কাঠুরে। মাঝখানের এই ধোঁয়াশাতেই হাতড়ে ফিরতে হয় উত্তর, কিন্তু যা মেলে আকুতাগাওয়া’র গল্পের শেষে তা যেনো এক ধাঁধা, এক বিশাল শূন্যতা—কারণ লুটেরা, তাকেহিতো’র স্ত্রী, তাকেহিতো—তিনজনই নিজেদের খুনি বলে সাক্ষ্য দেয়।
আকুতাগাওয়া গল্প এখানেই শেষ করে দেন, মৃতের জবানবন্দিতে। আপাতদৃষ্টিতে, তার কাছে মৃতের মতামতই চূড়ান্ত। কিন্তু সত্য অনুসন্ধানে কুরোসাওয়া যেনো এক কাঠি বাড়া, মৃতকেও অস্বীকার করে তিনি সাজিয়ে নেন এক নতুন সত্য, যা মানবতাকে এক নতুন দিশায় পুনরুজ্জীবিত করে।
কয়েকটি জবানবন্দি ও আরো
গল্পের কাঠুরে, বৌদ্ধ পরিব্রাজক, তাজোমারু (ডাকাত), মাসাগো ও তাকেহিতো’র জবানবন্দিকে প্রায় হুবহুই চলচ্চিত্রে তুলে আনেন কুরোসাওয়া। জবানবন্দিগুলো সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক।
কাঠুরের জবানবন্দি : আকুতাগাওয়া’র গল্প শুরু হয় কাঠুরের সাক্ষ্য দিয়ে; বনের মধ্যে তাকেহিতো’র লাশ সে-ই আবিষ্কার করে। মূল গল্পে কাঠুরের ভূমিকা এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, কিন্তু চলচ্চিত্রে কুরোসাওয়া কাঠুরের ভূমিকাকে আরো খানিকটা বিস্তৃত করে কাহিনিকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। চলচ্চিত্রে কাঠুরে শুধু লাশটিকে খুঁজেই পায় না, পুরো ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করে হয়ে ওঠে সাক্ষ্যবহনকারী তৃতীয় পুরুষ। এই তৃতীয় পুরুষের ভাষ্যেই (প্রায়) জীবন্ত হয়ে ওঠে সত্য ঘটনাটি, যেখানে নারীটির ভূমিকা তার সব দ্ব্যর্থবোধক ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। যেহেতু মূল গল্পে চূড়ান্ত মীমাংসা টানার মোটেও কোনো চেষ্টা করা হয় না, চলচ্চিত্রের এই বাড়তি সংযোজনকে একটা সম্ভাব্য মীমাংসা উপস্থাপনে কুরোসাওয়া’র প্রয়াস বলতে দ্বিধা নেই।
কাঠুরের জঙ্গলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার এই সিকোয়েন্সটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে নান্দনিক লঙ্ টেকগুলোর একটি বলে স্বীকৃত। কুরোসাওয়া অবশ্য এর কৃতিত্ব অনেকটাই তার সিনেমাটোগ্রাফার মিয়াগাওয়া’কে দিয়েছেন; সরাসরি সূর্যে ক্যামেরা তাক করে শুট্ করার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত তারই ছিলো।
বৌদ্ধ পরিব্রাজক : দ্বিতীয় সাক্ষ্যটি বৌদ্ধ পরিব্রাজকের, রাশোমন-এর ধ্বংসস্তূপ থেকে ক্যামেরা ফ্লাশব্যাকে চলে যায় জবানবন্দিতে। পরিব্রাজক জবান পেশ করেন, কীভাবে বনের পথে তার দেখা হয় সামুরাই তাকেহিতো ও তার ঘোড়সওয়ার পর্দাবৃতা স্ত্রীর সঙ্গে। সবগুলো জবানবন্দির মতো এখানেও subjective cameraev POV angle-এর প্রয়োগ করা হয়। প্রত্যেক সাক্ষীকে ক্যামেরার ঠিক মুখোমুখি বসানো হয়—এ থেকে দর্শকই যে কুরোসাওয়া’র কাছে প্রধান বিচারক তা বোঝা যায়।
পুলিশ কনস্টেবল : তৃতীয় সাক্ষ্যটি সেই পুলিশ কনস্টেবলের, যে তাজোমারু’কে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। পুলিশটি তাকে খুঁজে পায় নদীর ধারে ধরাশায়ী অবস্থায়।
ডাকাত তাজোমারু : তাজোমারু’র চরিত্রে তোশিরো মিফুনের কাজ এই চলচ্চিত্রের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি বলে ধরা যায়। মূল গল্পে যেমন তাজোমারু সম্পূর্ণ সত্য বলার অঙ্গীকার করে বলে, কীভাবে বনে প্রথম তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাকেহিতো ও মেয়েটির। ক্যামেরা ডিরেক্ট কাটে চলে যায় ফ্লাশব্যাকে।
জবানবন্দির মতো ফ্লাশব্যাকগুলোও subjective । অর্থাৎ সত্য/বাস্তবতা চিন্তা-প্রক্রিয়া, এমনকি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াটিই ব্যক্তিনির্ভর। চলচ্চিত্রের এই টেকনিক অত্যন্ত কার্যকরভাবে কুরোসাওয়া’র বক্তব্যকে তুলে ধরে সেলুলয়েডের ভাষায়। কিন্তু সত্য ও বাস্তবতা চূড়ান্তভাবে আপেক্ষিক—আকুতাগাওয়া’র মতো কুরোসাওয়া’র বক্তব্য এখানেই শেষ নয়।
মাসাগো : ডাকাতের পরে মেয়েটির জবানবন্দি শুরু হয়। মেয়েটির ভাষ্যে, ধর্ষণের পরে সে স্বামীর কাছে ছুটে গেলে পায় ঘৃণার শীতল দৃষ্টি। একাধিক ফুল ফ্রেম ক্লোজশটে দর্শকও সেই ঘৃণা চাক্ষুষ করতে পারে, দেখতে পারে মাসাগো’র দৃষ্টিতে তার স্বামীর রূপান্তর। মাসাগো’র ভাষ্যমতে, সে তার স্বামীকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কুরোসাওয়া যেখানে মেয়েটির অভিজ্ঞতাকে এক নতুন বিচিত্র আলোয় তুলে ধরতে চান, আকুতাগাওয়া’র দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে অনেকটাই সাদা-কালো।
মৃত ব্যক্তি (তাকেহিতো) : চলচ্চিত্রে মৃত ব্যক্তির কাহিনি বলা হয় এক মিডিয়ামের মাধ্যমে। মৃতের সংস্করণে বউ ডাকাতকে বলে তাকে মেরে ফেলবার জন্য। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ডাকাত ও তাকেহিতো দুজনই মেয়েটিকে মেরে ফেলার উদ্যোগ নিলেও মাসাগো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তাকেহিতোর ভাষ্যমতে, অন্য কেউ নয়, নিজেরই ছুরিকাঘাতে তার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু গল্পের শেষের ছেঁড়া সুতোটি, আত্মহত্যার পরে মৃতের বুক থেকে ছুরি সরিয়ে নেওয়া, এরই জের ধরে কুরোসাওয়া নিয়ে আসেন কাঠুরের স্বীকারোক্তি, নিজস্ব কায়দায় জোড়া দিতে থাকেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধাঁধার খণ্ডখণ্ড টুকরোগুলোকে।
কাঠুরের স্বীকারোক্তি (ধাঁধার হারানো খণ্ড) : কাঠুরের স্বীকৃতির এই অংশ কুরোসাওয়া’র সম্পূর্ণ নিজস্ব সংযোজন। সুতরাং এর পাঠের মাধ্যমে তার রাশোমন নামক এই ধাঁধার এক অর্থ উদ্ধার করার প্রয়াসের স্বরূপ প্রকাশ হয়। কাঠুরের বিবৃতিতে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে গল্পের দুই পুরুষের প্রকৃত কাপুরুষতা। তাকেহিতো-তাজোমারু’র দীর্ঘ বিলম্বিত, হাস্যকর সে তলোয়ার যুদ্ধ কুরোসাওয়া যেভাবে এক দীর্ঘ শটে ধারণ করেন, সেটা উপর্যুপরি নিষ্ফল আস্ফালন ছাড়া আর কিছুই বোধ হয় না। এই আস্ফালন তাজোমারু’র বীরোচিত তলোয়ার কসরত আর তাকেহিতো’র নারীবিদ্বেষী বিবৃতির অসংলগ্নতাকে তুলে ধরে তাৎপর্যপূর্ণভাবে।
কাঠুরের বিবৃতির মাধ্যমে কুরোসাওয়া চরিত্রগুলোকে একধরনের বিনির্মাণ করেন। পুলিশ ও তার নিজের সাক্ষ্যে ডাকাত তাজোমারু’র যে ভয়ানক ও বীরপ্রতাপ ইমেজ গঠন হয়, কাঠুরের বর্ণনায় তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তাজোমারু’র বিবৃতিতে মাসাগো অসহায় নারী, বার বার কাকুতি-মিনতি করে তাকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য। ডাকাতের সঙ্গে তাকেহিতো’র বিবৃতির বিশাল ফারাকের কারণ আর কিছুই নয়, তাজোমারু’র পুরুষালি অহম। শুধু ডাকাতের নয়, তাকেহিতো ও মাসাগো’র চরিত্রও নতুনভাবে দেখা যায় এই পর্বে। ছাড়া পেয়ে তাকেহিতো স্ত্রীকে গ্রহণ করতে নারাজ হলে মেয়েটির তাকে মেরে ফেলবার অস্বাভাবিক আর্জির ব্যাখ্যা যেমন এতে মেলে, তেমনই মেয়েটির গল্পের সেই ভয়াবহ ঘৃণার দৃষ্টির উৎসও খুঁজে পাওয়া যায়।
কিন্তু কাঠুরের বিবৃতির সিকোয়েন্সটি উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিশেষ উপাদান যোগ করার কারণে, ডাকাত-মাসাগো-তাকেহিতো’র মধ্যকার ত্রিভুজ মিথস্ক্রিয়া; ভিন্নভাবে বললে মেয়েটির দুই পুরুষের পৌরুষে আঘাত হেনে পরস্পরকে দ্বন্দ্বে লিপ্ত করবার দৃশ্যটি। সিকোয়েন্সটি তাৎপর্যপূর্ণ দুটি কারণে—১) মেয়েটির অপরাধবোধ ও ফলস্বরূপ খুনের দায়স্বীকারের একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। ২) নারীর জটিল মনস্তত্ত্ব, (ও তার কারণে) কুরোসাওয়া‘র আলোকপাতের প্রকাশ লক্ষ করা যায়।
গল্প ও চলচ্চিত্রে বার বার যে বিষয়টি উন্মোচিত হয় তা হচ্ছে নারীর সতীত্ব নিয়ে তৎকালীন জাপানের প্রচলিত সংস্কার—স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হলে (স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক) সে নারী ম্লেচ্ছ, স্খলিতা। নারীর এমন অবস্থানই তাকে ফেলে দেয় উভয়সঙ্কটে, তার ব্যতিক্রম হয় না মাসাগো’ও। ধর্ষিতা মাসাগো দৌড়ে স্বামীর বাঁধন কেটে দিলে ডাকাতের প্রশ্নের জবাবে তিক্ত উত্তর করে—‘একটা মেয়ের কথার এখানে কি-ই বা মূল্য আছে?’ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্মমতা যেনো মাসাগো’র সেই তির্যক বাক্যে, পাষাণ মুখচ্ছবিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু মাসাগো’র স্বামী প্রথমেই তার ‘নষ্টা-ভ্রষ্টা’ স্ত্রীর জন্য লড়াইয়ে অস্বীকৃতি জানায়, অনাগ্রহী হয়ে ওঠে ডাকাতও। ধর্ষিতা নারীর সে করুণ পরিণতি ক্ষণিকের জন্য ফুটে ওঠে সেলুলয়েডে—ডাকাতের দু-পায়ের ফাঁকে ধুলায় লুটায়িত মাসাগো, বামে একটু দূরে স্বামীর উন্নাসিক মুখ। ডাকাতের সান্ত্বনা বাক্য—‘মেয়েরা স্বভাবতই দুর্বল হয়’; জ্বলে ওঠে মাসাগো, হেসে ওঠে পাগলের মতো—‘তোমরাই আসলে দুর্বল!’ ছলনাময়ী নারীর রূপ নিয়ে দুই পুরুষের আঁতে ঘা দিয়ে ক্রমে লিপ্ত করে মরণপণ লড়াইয়ে। অর্থাৎ মাসাগো’র চরিত্রটিও শান্ত-নম্র জাপানি বউটির ভূমিকা থেকে বিনির্মিত হয় কুরোসাওয়া’র সত্য অন্বেষণে।
একটি আদি-অন্তহীন ধাঁধা ও কুরোসাওয়া’র সত্য অন্বেষণ
কিন্তু কোনো সত্যই পরম নয়, কোনো গল্পই নয় নিখুঁত—‘সত্যে’ নির্বিচার বিশ্বাস কুরোসাওয়া স্থাপন করতে চাননি। তাইতো অবতারণা করেন নতুন দৃশ্যপটের—রাশোমন-এ ধ্বনিত হয় নবজাতকের কান্না। তৃতীয় ব্যক্তি বাচ্চাটির গায়ের অলঙ্কার খুলে নিতেই কাঠুরে প্রতিবাদ জানালে প্রকাশ হয়ে পড়ে নতুন সত্য—কাঠুরেই চুরি করেছিলো মৃত ব্যক্তির রত্নখচিত খঞ্জর। সবার মতো কাঠুরেও গল্পটি নিজের সুবিধানুযায়ী বলেছিলো। ডাকাত নিজের অপরাধ স্বীকার করেও এক বীরোচিত কাহিনির অবতারণা করে; মৃত ব্যক্তি সমস্ত দোষ স্ত্রী ও ডাকাতের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে; মেয়েটি নিজের সচ্চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে স্বামীর ঘৃণার দৃষ্টিতে তাল-জ্ঞান হারায় এবং কাঠুরে কেবল থাকে নীরব দর্শক। রাশোমন-এর সহকারী পরিচালকেরা যখন দ্বিধাগ্রস্ত মনে কুরোসাওয়া’র শরণাপন্ন হন, তখন তিনি এভাবেই ব্যাখ্যা করেন রাশোমনকে—‘মানুষ চাইলেও নিজেদের সঙ্গে নিজে সৎ হতে পারে না। তারা নিজেরা নিজেদের সম্পর্কে অলংকরণ ছাড়া কোনো কথা বলতে পারে না। এই স্ক্রিপ্টে এমনই সব মানুষের কথা বলা আছে—যারা মিথ্যা ছাড়া বাঁচতে পারে না, এই অসত্যের মধ্যেই ভালো মানুষ হিসেবে তারা নিজেদের খুঁজে পায়। ...অহম এমন এক অভিশাপ যা মানুষ জন্ম থেকে বহন করে চলেছে; এর থেকে নিষ্কৃতি পাবার উপায় নেই। এই সিনেমাকে বলতে পারো এক আজব পাণ্ডুলিপি, অহমই একে মেলে ধরে। ...মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার অসম্ভবতাকে যতোটাই অনুধাবন করবে, তখনই বুঝতে পারবে এর প্রকৃত অর্থ।’২
মানব মনস্তত্ত্বের জটিলতাকে স্বীকার করে নিয়েই কুরোসাওয়া রাশোমন নামের অন্ত-আদিহীন ধাঁধার এক বোধগম্য ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন, যা প্রায় খাপে খাপেই গল্পের ছেঁড়া সুতোকে জোড়া লাগাতে সক্ষম হয়। কিন্তু এ তো গেলো গল্প ও চলচ্চিত্রের আধেয়ের কথা, দর্শনের দিক থেকে কাজ দুটির মধ্যে কতোটুকু তফাত থেকে যায়?
সাহিত্যের ‘রাশোমন’-এর দর্শন জটিল, কুহেলিকাপূর্ণ। গল্পে তিনজনই খুনের দাবিদার, একই ঘটনা তিন ভিন্ন বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হয়। গল্পের বিভিন্ন বাঁকগুলো যেমন ভিন্নতর, তার চেয়েও ভিন্ন পরিণতিগুলো। এভাবে পাঠক অন্তিমে গিয়ে কোনো সমাধান তো খুঁজে পানই না, বরং শেষমেষ ‘সত্য’ সম্বন্ধেই সন্দিহান হয়ে পড়েন। সত্যের এই টলায়মান অবস্থান তাই আকুতাগাওয়া’র বিশ্বদৃষ্টি ও প্রকারান্তরে গল্পশৈলীতেই নিহিত। আকুতাগাওয়া’র এই বিশ্বদৃষ্টির পাঠ হতে পারে—যেখানে মানুষ আছে সেখানে প্রকৃত সত্য বলে কিছু নেই। কিন্তু এই চূড়ান্ত মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হুমকির মুখে পড়ে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নগুলো, কিংবা মনুষ্যত্ব স্বয়ং। পরিব্রাজকের কণ্ঠেই প্রকট হয় এই সঙ্কট—‘এ তো ভয়ানক! মানুষ যদি পরস্পরকে বিশ্বাসই না করতে পারে তবে পৃথিবীটাই যে নরক হয়ে যাবে!’ উত্তরে তৃতীয় ব্যক্তির মধ্যে আশ্রয় নেয় আকুতাগাওয়া—‘নরকই তো!’
সঙ্কটের তীরে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকান কুরোসাওয়া—সত্যের প্রতিশ্রুতিবিহীন পৃথিবী নারকীয় হলে মনুষ্যত্বই বা টিকে থাকে কী করে? উত্তর মিলে চলচ্চিত্রের শেষে, কাঠুরে শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে। অপরাধবোধে অনুতপ্ত হয়েই কিংবা মানবিক সহানুভূতিতে কাঠুরের এই মহৎ কর্মই যেনো পরিব্রাজক এবং অবশেষে দর্শকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। বাইরের দুর্যোগের ঘনঘটা স্তিমিত হয়, রাশোমন-এর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হেঁটে যায় পরিতৃপ্ত মুখে কাঠুরে, কোলে তার আগামীর সম্ভাবনা নবজাত মানবশিশু। হোক সে মানবশিশু আজন্ম অহমাক্রান্ত, দিনের শেষে তবু ওই হাজার ত্রুটিপূর্ণ মানবতাই থাকে তার শেষ সম্বল।
আকুতাগাওয়া’র অবিশ্বাসকে এভাবেই বিশ্বাসে রূপান্তর করেন কুরোসাওয়া সেলুলয়েডের নান্দনিক ভাষ্যে। কুরোসাওয়া’র জন্য মানুষের মানবতাতেই উত্তরণ সব সঙ্কটের, তার নির্মিত রাশোমনও তাই গায় মানবতার জয়গান, সব দুর্যোগ প্রশমন পরে।
লেখক : ফাহিমা আল ফারাবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন।
fahima.farabi@outlook.com
তথ্যসূত্র
১. আকুতাগাওয়া’র আলোচ্য গল্পের নামটি ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে ‘In a groveÕ। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস গল্পটির ইংরেজি নামের বাংলা ভাষান্তর করেন ‘বাঁশবনে খুন’। রাসোমন নামে আকুতাগাওয়া’র অনুবাদ সংকলনটি ২০০৬ সালে ঐতিহ্য প্রকাশনী, ঢাকা থেকে প্রকাশ হয়।
২. কুরোসাওয়া, আকিরা (১৯৮১ : ২৬৭—২৬৮); Something like an autobiography; ভিন্টেজ প্রকাশনী, যুক্তরাষ্ট্র।
পাঠ সহায়িকা
১. কুরোসাওয়া, আকিরা (১৯৮১); Something like an autobiography; ভিন্টেজ প্রকাশনী, যুক্তরাষ্ট্র।
২. রিচি, ডোনাল্ড (১৯৯৯); The films of Akira Kurosawa; ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, যুক্তরাষ্ট্র।
৩. লোব্রুত্তো, ভিনসেন্ট (২০০৫); Becoming film literate: The art and craft of motion pictures; প্রেইগার, যুক্তরাষ্ট্র।
৪. রিবেরু, বিধান (২০১১); চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা; রোদেলা প্রকাশনী, ঢাকা।
৫. ইলিয়াস, খালিকুজ্জামান (২০০৬); রাসোমন; ঐতিহ্য প্রকাশনী, ঢাকা।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ম্যাজিক লণ্ঠনের সপ্তম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন