তামান্না মৌসী
প্রকাশিত ০৭ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার
নীল ছবিতে শুভ্র প্রেম
তামান্না মৌসী

সৃষ্টির শুরুতে পুরুষ ও নারীর এখনকার মতো আলাদা সত্তা ছিলো না। বরং নারী ও পুরুষ মিলে ছিলো একক সত্তা। তাদের দেহ ও ঘাড় একটি হলেও মুখমণ্ডল ছিলো দুটি। ফলে বিভিন্ন দিকে তারা দেখতে পেতো সহজেই। অবয়ব দেখে মনে হতো যেনো দুটি প্রাণীকে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে; যাদের চারটি পা, চারটি হাত এবং একজোড়া লিঙ্গ রয়েছে।
এই উদ্ভট সৃষ্টির প্রতি একপর্যায়ে গ্রিক দেবতারা ঈর্ষান্বিত হন। কারণ চারটি হাত থাকায় তারা বেশি পরিশ্রম করতে পারতো। দুদিকেই মুখ থাকায় থাকতে পারতো সদাসতর্ক। যে কারণে তাদের কখনোই অবাক করা সম্ভব হতো না। সেই সঙ্গে চারটি পা থাকায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটা, কোনোটাই তাদের পক্ষে অসহনীয় ছিলো না। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিলো একই দেহে উভয় লিঙ্গের উপস্থিতি! ফলে বংশবৃদ্ধির জন্য তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতো না।
মানুষের এ অমিত শক্তি কমাতে দেবরাজ জিউস এক ফন্দি আঁটেন। বজ্রের আঘাতে তিনি মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করেন। তৈরি হয় মানুষের দুটি আলাদা অংশ—নারী ও পুরুষ। এ প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয় ঠিকই, কিন্তু শক্তি কমে অর্ধেকে নামে। বিভক্ত অংশ দুটি তখন একে অন্যকে খুঁজতে থাকে, যাতে তারা আবার একত্র হয়ে হারানো শক্তি পুনরুদ্ধার করতে পারে। আর হারানো শক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য একত্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই বলা হয় যৌনমিলন বা সেক্স। মহান দার্শনিক প্লেটো যৌনমিলনকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবেই।
মিশেল ফুকো তার ‘হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি’ বইতে দেখিয়েছেন শরীরবিদ্যা, জৈবিক প্রক্রিয়া, আচরণ, সংবেদন, চেতন ইত্যাদির সমন্বয়ে ‘যৌনতা’ নির্মাণ হয়। অথচ সমাজকাঠামো কার্যকারণ সম্পর্ককে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে শেষ অবধি সেই ‘যৌনতা’কেই দেখায় সবকিছুর কারণ হিসেবে। এজন্য ব্যক্তির যৌনসত্তা তার চরিত্রের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়, ব্যক্তির প্রকৃতির চাবিকাঠি যেনো লুকিয়ে আছে তার যৌনসত্তার চরিত্রে। আর এই বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়েই ফুকো এনেছেন ‘সমকামিতা’কে। সমকামিতা তাই ‘আশ্চর্য’ কোনো বিষয় নয়। তবে এর উপস্থাপন নিয়ে জটিলতা অনেক।
১৯ শতক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সমাজে সমকামিরা এক বিশেষ প্রজাতি বলে চিহ্নিত হয়ে আসছে। অথচ প্রাচীন গ্রিসেও এর অস্তিত্ব ছিলো! একে ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় বলে মেনে নিতে নারাজ শাসকশ্রেণির তৈরি করা সমাজ। ফলে সমকামিতা আর কোনো ‘যৌনতা সম্পর্কিত কাজ’ নয়, এটিই এখন ব্যক্তিসত্তার পরিচয়। ব্যক্তি ‘নিষিদ্ধ’ কাজটি করছে কি না তার বদলে বড়ো প্রশ্ন হয়ে ওঠে ব্যক্তিটি ‘সমকামি’ কি না। এভাবেই গড়ে ওঠে সমকামিতার ডিসকোর্স। আর তাতে সহজেই সমকামিতা বিষয়টিকে অবাঞ্চিত হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়। কারণ ক্ষমতা এখানে ব্যক্তির যৌন আচরণকে দমন করে। আর অবদমিত যৌনতার বহিঃপ্রকাশ কারো মধ্যে দেখলে তাকেই স্বাভাবিকের গণ্ডির বাইরে ফেলা হয়। এতে ব্যক্তিমানুষকে সহজে শাসন করা যায়।
সমকামিতা বিষয়টি নিয়েই যেখানে এতো রাখ ঢাক, সেখানে দুজন সমকামির মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার প্রশ্নই অবান্তর। তবুও কিছু কথা আছে, থাকে; কেউ না কেউ জানাতে চায়। তেমনি দুজন সমকামি নারী, সমাজে যারা ‘লেসবিয়ান’ নামেই পরিচিত—তাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগার উপস্থাপন ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার।
থ্রু দ্য আইজ অব অ্যান অডিয়েন্স
পুরো তিন ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের ফরাসি এ চলচ্চিত্রটি ২০১৩ সালে কান উৎসব-এ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘গোল্ডেন পাম’ জিতে। সেই সঙ্গে জিতে নেয় সমালোচক পুরস্কারও। তিউনিশিয় বংশোদ্ভূত ফরাসি পরিচালক আবদেল লতিফ কিশিশে এর নির্মাতা। তিনিই এর চিত্রনাট্য লিখেছেন জুলি মারোহ’র ‘ব্লু অ্যাঞ্জেল’ উপন্যাস অবলম্বনে। ফরাসি দুই তরুণী—আদেল ও এমা’র প্রেমের গল্প এটি।
প্রেম, সম্পর্ক, বিচ্ছেদ ও জীবনবোধের গল্প ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার। মূল চরিত্র ১৭ বছরের হাইস্কুল পড়ুয়া আদেল এবং ২৭ বছর বয়সের চারুকলার শিক্ষার্থী এমা। এ সময়ের আদর্শবাদী তরুণী আদেল মা-বাবার সঙ্গে ফ্রান্সের লিলে শহরে থাকে। শিক্ষাখাতে সরকারি বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে সে পথে নেমে প্রতিবাদ করে, স্লোগান দেয়। স্কুলে তার প্রিয় বিষয় ইংরেজি ও ফরাসি সাহিত্য। পড়াশোনা শেষ করে আগ্রহ শিক্ষকতা করার। স্কুলের এক ছেলে একসময় আদেলের প্রতি আগ্রহী হয়। স্কুল বাসে পরিচয় তাদের; এরপর প্রেম। একপর্যায়ে শারীরিক সম্পর্ক। যদিও আদেল ওর বন্ধুদের মতো শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে গালগল্পে মুখর নয়, বরং লাজুক। ছেলেটির সঙ্গে সম্পর্কটি ঠিক বুঝতে পারে না আদেল। যে কারণে তেমন কোনো আকর্ষণও অনুভব করে না; সে নতুন কাউকে খুঁজতে চায়।
একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে নীল চুলের এক টমবয় মেয়েকে তার সঙ্গিনীর সঙ্গে হেঁটে যেতে দেখে আদেল। হাঁটতে হাঁটতেই আবার ফিরে তাকায় সে। দেখে সেই নীল চুলের মেয়েটিও তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ওদিকে ছেলেটির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় মানসিকভাবে আদেল খানিকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এক গে (গে বলতে দুজন পুরুষের মধ্যকার যৌনসম্পর্ককে বুঝায়) সান্ত্বনা দেয় আদেলকে। স্কুল শেষে অন্য বন্ধুদের রসালো আলাপ এড়িয়ে আদেল তার সেই বন্ধুর সঙ্গে একটি গে নাইটক্লাবে হাজির হয়। ক্লাবের অদ্ভুত উটকো পরিবেশ ভালো না লাগায় বেরিয়ে পড়ে একাকী। ঘুরতে ঘুরতে হাজির হয় পাশের লেসবিয়ান নাইটক্লাবে। হঠাৎ সেখানে দেখা হয় নীল চুলের সেই মেয়েটির সঙ্গে। নাম এমা। আদেলকে চিনতে পেরে এমা তাকে জিজ্ঞেস করে—এই অপরিচিত জায়গায় সে কেনো এসেছে? এমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে আদেলের। এমাকে নিজের ফোন নম্বর দেয়। অনুরোধের স্বরে জানতে চায়, সে এমার ফোনকল পাবে কি না।
চলচ্চিত্রের পরের অংশ এগিয়েছে এমা আর আদেলের সম্পর্কের অদ্ভুত এক আবেগ অনুভবে। চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি খাবারের ব্যাপারেও সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুজন। একজনের পছন্দ স্প্যগেটি মিট সস, তো অন্যজনের অয়েস্টার (শামুক), সি-ফুড এসব। এমার মা তার বাবাকে ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেছেন। তাদের মজার সংসারে সমকামিতাকে তারা খোলা মনে মেনে নিতে পারেন। এ পরিবারের জীবনবোধ অনেক উদার। অন্যদিকে আদেলের বাবা-মা জানেন এমার কাছে আদেল দর্শন শিখছে। ইদানীং দর্শনে আদেলের গ্রেডও ভালো হচ্ছে বলে তারা খুশি। একদিন কথা প্রসঙ্গে আদেলের বাবা এমাকে বলেন, শিল্পচর্চা, ছবি আঁকা—এসব বাড়তি যোগ্যতা বা শখ হিসেবে ভালো। কিন্তু জীবনে চলতে গেলে ‘বিল পে’ করা যায় এমন চাকরিবাকরির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকা চাই। তাই হয়তো এমা-আদেলের সম্পর্কটি প্রথাগত ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী আদেলের বাবা-মার কাছে গোপন রাখে ওরা। জীবনযাপনের এমন বিপরীত মেরুতে অবস্থানের কারণেই হয়তো মানুষের প্রতি মানুষ এমন তীব্রভাবে আকৃষ্ট হয়! শুধুই কি আকর্ষণ? জীবনের বাকি অংশগুলোতে এ বৈপরীত্য কখনো একে অন্যের কাছাকাছি হতে পারে কি?
এমার চুলের নীল রঙ ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার-এ বার বার ফিরে এসেছে সুখের মোটিফ হিসেবে। ভালোবাসার উষ্ণতা বোঝাতে দুঃখের নীল রঙের ব্যবহার জীবন-বৈপরীত্যেও অদ্ভুত এক দ্যোতনা। এমার ছবির মডেল হয় আদেল। সময় গড়ায়। আদেল-এমার জীবন বয়ে চলে। এমার ডাই করা চুলের নীল রঙ ফিকে হয়ে আসে। জীবনের সবকিছুই তো আর মধুময় হয় না। একসময় রঙের প্রলেপ উঠে গেলে ধূসর হয়ে যায় সব।
স্নেহ-ভালোবাসা বা প্রেম-অপ্রেম শুধু নারী পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সবকিছু ছাপিয়ে মানুষ হিসেবে মানুষের আবেগ খুঁজে পাওয়া যায় এ চলচ্চিত্রে। তবে সেটি শুধু সাড়ে সাত মিনিটের পর্দা ঝলসানো যৌন-দৃশ্যের কল্যাণেই—এমনটি ভাবার কারণ নেই। অবশ্য চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার বিষয়বস্তু এই অন্তরঙ্গ দৃশ্যই।
যাহোক, যেকোনো দর্শককেই আলোড়িত করবে ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার—সেটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেভাবেই হোক না কেনো। এক পর্নোগ্রাফি ছাড়া অন্য যেকোনো চলচ্চিত্রে সেক্সকে দেখানো হয় রাখ ঢাক করে। তার ওপর আবার সমকামিদের সেক্স! এ তো অপাঙক্তেয় বিষয়। কিন্তু এ বিষয়টিই তুলে ধরা হয়েছে এখানে। কতোটা আবেগের বহিঃপ্রকাশ করা যায়, এ মাধ্যমে সেটাও যেনো নতুন এক মাত্রা পেয়েছে। চলচ্চিত্রটিতে আদেল ও এমার চরিত্রে আদেল এক্সারসিপুলোস ও লিয়া সেঁদু করেছেন অনবদ্য অভিনয়।
ইন বিটুইন দ্য লাইনস
নারীর শরীর ও যৌনতা সম্পর্কে প্রথম প্রকাশ্য আলোচনা আসে সিমোন দ্য বোভায়ার-এর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ বইটি থেকে। এখানে বোভায়ার জোরালোভাবে দাবি করেন, যতোদিন পর্যন্ত পুরুষের শরীরকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হবে ততোদিন পর্যন্ত যৌনতা বিষয়ে বৈষম্য থাকবেই। কিন্তু যৌন সমতার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো সমাজে যৌনতা দুভাবে কাজ করে। প্রথমত, এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যৌন পার্থক্যকে বাঁচিয়ে রেখে অসমতার সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, যৌনতার ক্ষেত্রে যে রাজনীতি চলছে তাও উন্মোচন করে।১ আর এ দুটি কাজই পরবর্তী সময়ে পুরুষ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নারী আন্দোলনের রূপ নেয়।
যৌনমিলনের মাধ্যম হিসেবে নারীকে ব্যবহার করা হলেও নারীকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় দেখতে চায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। ফলে নারী এক্ষেত্রেও হারিয়ে ফেলে তার স্বকীয়তা, যেখানে তৃপ্তির প্রশ্নই আসে না কখনো। তার একমাত্র উদ্দেশ্যই হয়ে পড়ে গর্ভধারণ। নিজের শরীরের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই প্রাথমিক পর্যায়ের নারীবাদীরা যৌনতার জন্য পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হওয়াতে অনীহা প্রকাশ করেন। এর বিপরীতে তারা সমলিঙ্গের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন।
নারীর সমকামিতার পিছনে কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসবে পুরুষের প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টি। আবার এ অনাগ্রহের পিছনের কারণ হলো যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব। কিন্তু নারীবাদীরা এই কথাকে মোটেও সমর্থন করেন না, কারণ হিসেবে তারা মনে করেন, অন্য সবকিছুর মতো সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমতা কাম্য। যৌনতার ক্ষেত্রে একজন পুরুষ যখন নারীকে তার অধস্তন মনে করে, তখন নারী তার স্বকীয়তা ও তৃপ্তি খুঁজে পায় না তাতে। বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে যখন একজন নারীকে আমরা বলতে শুনি, ‘আই সি দ্যাট দোজ হু টাচড মাই হার্ট ফেইলড টু অ্যারাউজড মাই বডি; অ্যান্ড দ্যাট দোজ হু অ্যারাউজড মাই বডি ফেইলড টু টাচ মাই হার্ট।’২
একটি সম্পর্ক যতো গভীর আর পোক্ত হোক না কেনো, কোনো না কোনো সময় সেটাতে কর্তৃত্বের প্রশ্ন চলেই আসে। একজন অন্যজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় অজান্তেই। এটাকেই আমরা বলছি ‘পুরুষতান্ত্রিক’ মানসিকতা। শুধু পুরুষেরাই যে এমন আচরণ করে, এমনটি ভাবার কোনোই কারণ নেই। এই মানসিকতার নারীরাও করতে পারে পুরুষসুলভ আচরণ। যেমনটা করেছে ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার-এর এমা। সে একজন চিত্রশিল্পী। আর শিল্পীরা উৎসাহ পেতে অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ব্যবহার করেন। আদেলের সঙ্গে এমাও সেই আচরণই করে। তার অবহেলার কারণেই একপর্যায়ে আদেল সহকর্মীর প্রতি আকৃষ্ট হতে বাধ্য হয়।
একটি সম্পর্ক চলাকালীন অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া অনৈতিক। পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা সবই এজন্য হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু সঙ্গীর অনবরত অবহেলা যে এ ধরনের কাজে উৎসাহ জোগায় সেটিও মাথায় রাখতে হবে। বিশ্বাস ভঙ্গের কথা বলে এমা বাড়ি থেকে আদেলকে চলে যেতে বলে। ঠিক আছে মানলাম সেটি। কিন্তু আদেলের সামনে এমা যখন তার প্রাক্তন সঙ্গিনী ও মডেলের প্রেগনেন্সি নিয়ে অত্যুৎসাহী হয়ে পড়ে, তখন সেটি আদেলকেও কষ্ট দেয়। তাছাড়া আদেলকে না জানিয়ে ছবি আঁকা ও প্রদর্শনীর কাজে দিনের পর দিন এমার বাইরে থাকাটা কি আমাদের পরিচিত সমাজব্যবস্থার পুরুষতান্ত্রিকতার কথাই মনে করিয়ে দেয় না?
শেষ পর্যন্ত আদেল কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে নিজের স্বপ্নের পথেই এগিয়ে যায়। এমার সঙ্গেও একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকে থাকে। আর এমা তার সেই সাবেক মডেল কাম সঙ্গিনী আর তার বাচ্চাকে নিয়ে বাস করতে শুরু করে। বাচ্চার ব্যাপারে এমার এই আচরণও মনে করিয়ে দেয় পিতৃসুলভ বৈশিষ্ট্যকেই। আদেলের সঙ্গে সম্পর্কটিকে এমা তার শিল্পসত্তা বিকাশের কাজে লাগায়। আদেলকে ছেড়ে যেতে তার কষ্ট হলেও ব্যক্তিসত্তা আর ইগোর কারণে তা মানতে চায় না। আদেলও বুঝতে পারে এমার সঙ্গে তার সম্পর্কটি শিল্প আর আবেগ, উভয় বিষয়ের প্রয়োজন পূরণ সংক্রান্ত। কিন্তু আদেল সেটি মানতে চায় না। এমার কাছে আবার সুযোগ চায় পুরনো সম্পর্কটি গড়ে তোলার। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দেয় এমা। পরে এমার ছবিরই এক প্রদর্শনীতে দেখা হয় এমার এক অভিনয়শিল্পী বন্ধুর সঙ্গে, যে তার বিষয়ে বরাবরই আগ্রহী। তার কথা শোনার আগেই সেখান থেকে বেরিয়ে যায় আদেল।
পরিচালক অত্যন্ত সুকৌশলে শেষ দৃশ্যটি এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে, পরেরটা ভেবে নেওয়ার ভার ছেড়ে দিয়েছেন দর্শকের হাতে। সেই সঙ্গে আবার এমনও খানিকটা আভাস দিয়ে রেখেছেন যে, সমকামিতা বিষয়টি সাময়িক। অনেকটা আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা তাদের টিনএজ সন্তান প্রেমে পড়লে যেমন ‘সাময়িক মতিভ্রম’ বলে ঝেঁটিয়ে বিদায়ের চেষ্টা করেন তেমনই। তবে যাই হোক বা ঘটুক না কেনো, আদেলরা সামনে এগিয়ে যাবেই, নিজের লক্ষ্য পূরণের লক্ষ্যে।
সবকিছুর পরে আবার ফিরে যেতে হয় সেই মার্কসের কাছেই। অর্থনৈতিক অসমতা-বৈষম্যই নারী-পুরুষের অসমতার ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী। এখানে বিয়ে নারী মুক্তির পথে যেমন বাধা নয়, তেমনি সমকামিতা সব সমস্যার সমাধানও নয়। তবে উভয় বিষয়কেই রাজনীতি ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বাইরে ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়াটাই হবে যৌক্তিক। তাই নারীবাদের নতুন স্লোগান হওয়া উচিত—দ্য পার্সোনাল ইজ পার্সোনাল। অর্থাৎ যা ব্যক্তিগত, সেটি নিতান্তই ব্যক্তিগত।
লেখক : তামান্না মৌসী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে সমকাল-এ শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
tammcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. বিস্তারিত জানতে দেখুন : বোভায়ার, সিমোন দ্য (২০০৮); দ্বিতীয় লিঙ্গ; অনুবাদ : হুমায়ুন আজাদ; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
২. কোয়েলহো, পাওলো (২০০৮ : ১৬ ); ইলেভেন মিনিটস; হারপার কলিন্স পাবলিশার্স, যুক্তরাজ্য।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন