হালিমা খুশি ও রুম্পা রায়
প্রকাশিত ০৬ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
৮০ দশকের চলচ্চিত্রে নারী
বেহুলা-আলেয়া-চম্পার পর এবার জোস্না বিবিদের পালা
হালিমা খুশি ও রুম্পা রায়
আমরা কেবলই হাঁটছি তো হাঁটছি। পথটা পিচ ঢালা কিন্তু চারধারে গাছ কই! একটার পর একটা যেনো কামাতুর, স্বার্থান্বেষী চোখ দিয়ে সাজানো। অগ্রভাগে এগোতে হলে ওই চোখের দিকে তাদের মতো করে চাইতে হয়। কেননা ওই চোখ সাধারণের নয়; তা ক্ষমতার, নিয়ন্ত্রণের। নিজের মতো করে কিছু করতে চাইলেও সেই ক্ষমতা সেই নিয়ন্ত্রণের ভিতর দিয়ে এককথায় তাদের নির্মিত কাঠামোর মধ্যে থেকেই করতে হবে। কারণ, পথচারী যে ক্ষমতাহীন, নিয়ন্ত্রণাধীন একজন ‘নারী’, যাকে কেবল উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ব্যবহার করা যায় এবং তা বিনা খাটুনিতে। কিন্তু পথিক ছাড়া পথের কী মূল্য? এই চেতনাকে ঘুমিয়ে রাখতে ক্ষমতাতন্ত্রের কতোই না আয়োজন। গ্রামসির মতো করে বলতে গেলে অনেকটা মানুষের চৈতন্যে ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্মতি উৎপাদন করে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার আয়োজন। যেহেতু নিম্নবর্গের (নারী) চেতনা খণ্ডিত, নির্জীব, পরাধীন সেহেতু তাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাও সহজ। আর তাই তারা যেভাবে নারীকে গণমাধ্যমে বিশেষ করে চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করতে চায় তারাও যেনো ঠিক সেভাবে তৈরি করে নিজেদের।
কিন্তু চলচ্চিত্র তো জীবনের কথা বলে। তাহলে এ কোন্ জীবনের দিকে আমাদের টানতে চায়! সেই ১৯৩১-এর দ্য লাস্ট কিস থেকে ১৯৮৯-এর বেদের মেয়ে জোস্না, মাঝখানে বাংলা চলচ্চিত্রে কতো ধারার উত্থান; কিন্তু নারী রয়ে গেলো ঘটনার প্রয়োজন পূরণের উপকরণ মাত্র। যদিও ৭০ দশকের শেষের দিকে আলমগীর কবিরের সূর্যকন্যা (১৯৭৬) ও সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭) চলচ্চিত্র দুটিতে নারীকে বলিষ্ঠ হতে দেখি কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে তা মিইয়ে যেতে যেতে অবশেষে নদীকে আবার সেই সাগরে মিশতে হয়। তাই আর্টনারের কথাটা খুব করে বলতে ইচ্ছে করে, ‘সামাজিক চৈতন্যে নারী প্রকৃতির কাছাকাছি আর পুরুষ সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রক।’১ ৮০-তে নারীকে ক্ষমতায়নের মর্যাদাপূর্ণ আসনে খানিকক্ষণের জন্য ‘বসানো’ হলেও তা শেষ পর্যন্ত হস্তান্তর করতে হয় ক্ষমতাতন্ত্রের নায়ক পুরুষের হাতে। বিষয়টি এ রকম যে, নারী প্রতিবাদী হলেও স্বামীর কাছে প্রতিবাদহীন, কোমলমতি। কারণ তা না হলে যে বেহেশতে তার ঠাঁই মিলবে না! এই হলো বাংলা চলচ্চিত্রের নারী।
নারী নির্মাণের এই চরিত্র জনসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। যেখানে সস্তা, অগভীর কিন্তু চমকপ্রদ কিছু ঘটনাপ্রবাহে দর্শককে বুঁদ করে রাখা হয়। তাই দর্শকও যেনো ভাবতে পারে না, নারীরও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বা অধিকার রয়েছে। সবাই মিলে যেনো তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখতেই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা দেখার চেষ্টা করবো ৮০ দশকে নারীর চিত্রায়ণ।
আর দশক হিসেবে ৮০-কে বেছে নেওয়ার কারণ, এই দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে নেতিবাচকতার সমান্তরালে কিছুইতিবাচক পরিবর্তনও ঘটে। কথাটি এজন্য বলা যে, এ সময়ে পোশাকি, নকল ও অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের সংখ্যা যেমন বেড়ে যায়, একই সময় বিকল্পধারা বা স্বাধীনধারা (১৯৮৪) নামে নতুন ধারারও জন্ম হয়। তবে বলে রাখি—এই ধারাটি আমাদের আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। আমরা জনসংস্কৃতির ভিত্তিতে নির্বাচিত চলচ্চিত্র নিয়ে এগোবো এবং দেখবো সেই দশকের চলচ্চিত্রের নারীরা কেমন ছিলো।
জনসংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র
বলা হয়, চলচ্চিত্র জনসংস্কৃতির একটি অংশ। বাংলাদেশের জনজীবনে জনসংস্কৃতি হিসেবে চলচ্চিত্র বিরাট অংশ দখল করে আছে। এখন চলচ্চিত্র কীভাবে জনসংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে সেটি দেখার চেষ্টা করবো। সাধারণ অর্থে জনসংস্কৃতি বলতে বোঝায় জনগণের ভালো লাগার বিষয়, যা তার কাছে সহজবোধ্য। রিচার্ড ডায়ার ও জিনেট ভিনসেনদু বিষয়টিকে আরো সহজ করে বলেছেন, ‘‘জনপ্রিয়’ হলো তাই, যা জনগণ পছন্দ করে। তবে কোনো সংস্কৃতিকে ‘জনপ্রিয়’ বলা বাহুল্য মাত্র। কেননা, মানুষের ‘প্রিয়’ না হলে কোনো সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। তবে চলতি ধারণায় জনসংস্কৃতি বলতে সাধারণত বোঝানো হয় ‘পাবলিকের’ পছন্দ। অর্থাৎ সস্তা, চটুল, খেলো রুচির জিনিস।’২ সাধারণ মানুষ কী পছন্দ করবে তার ভিত্তিতে জনসংস্কৃতি নির্মাণ হয়। সাধারণ জনগণ জনসংস্কৃতির ভোক্তা, কিন্তু এর স্রষ্টা নয়। এখন প্রশ্ন আসে, সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বুঝি কিংবা সংস্কৃতি কীভাবে ‘জন’ হয়ে ওঠে। আমরা বলছি—পাবলিকের পছন্দ সস্তা, চটুল রুচির জিনিস—এতো সাদামাটা সিদ্ধান্তে আসা কি সম্ভব? আমরা যে সাধারণের রুচি নিয়ে কথা বলছি, তাদের রুচি কি তাদের মধ্যে থেকে আসে নাকি তাদের রুচি নির্মিত? এই প্রশ্ন জরুরি। এমনকি এই প্রশ্নের উত্তরও এতো সহজে হ্যাঁ/না দিয়ে সম্ভব না। কারণ যদি সংস্কৃতি নির্মিতও হয়, তাহলেও মনে রাখতে হবে এই সংস্কৃতির কিছু অংশ ওই মানুষের মধ্যে ছিলো। এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ধারণ হবে পরের আলোচনা। একই সঙ্গে প্রশ্ন, পপুলার কালচার বলে আদৌ কি কিছু আছে? সব কালচারই কোনো না কোনোভাবে সেই মানুষ নিজের মধ্যে ধারণ করে কিংবা ধারণ করানো হয়। সেক্ষেত্রে জনসংস্কৃতির মূল্যায়ন কীভাবে হবে?
তবে বিষয় যাই হোক, জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি মূলসূত্র হচ্ছে প্রতিফলন ও নিজ উদ্দেশ্যসাধন। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে গণমানুষের চেতনায় লালিত মিথ, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে; কিন্তু একই সঙ্গে একই সময়ে আবার ওই মিথ, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে নিজ স্বার্থে নিপুণভাবে কাজে লাগানো হয়। এভাবেই চলচ্চিত্রের মূলধারা বা বাণিজ্যিক ধারা সাধারণ মানুষের একেবারে কাছে পৌঁছায়। আর তাকে পুঁজি করে চলে এর অবিরাম নির্মাণ। আর তখন সামাজিক দায়বদ্ধতা, রুচিবোধ, সৃষ্টিশীলতাকে বাদ দিয়ে পরিচালকের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে ব্যবসা।
নাচ-গান, ভায়োলেন্স, মারপিটে ভরপুর এক উদ্ভট কাহিনী নিয়ে পরিচালকরা হাজির হয় দর্শকের কাছে। এই নাচ-গান, ভায়োলেন্স—সবকিছুর কেন্দ্রে আবার থাকে নারী। যাদেরকে উপস্থাপন করা হয় নানা ইঙ্গিতময় ব্যঞ্জনায়। সাধারণ জনগণের কাছে এগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পায়। অর্থাৎ এই জনপ্রিয়তা পাওয়ার আরেকটি কারণ হয়ে ওঠে নারী। আবার শুধু নিম্নবিত্ত মানুষই নয়, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিও কোনো না কোনোভাবে এই চলচ্চিত্রকে কনজিউম করে, আস্বাদন করে, উপভোগ করে। এই প্রসঙ্গে ফরাসি দার্শনিক পিয়ের বর্দু বলেন, ‘যাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূলধন নেই, জনসংস্কৃতি তাদেরই।’৩ এই অর্থে মূলধারার চলচ্চিত্র একটি জনসংস্কৃতি যা বিপুল জনগোষ্ঠী দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে আস্বাদিত হয়ে আসছে।
আবার দেখা যাচ্ছে, মূলধারার চলচ্চিত্র ও জনসংস্কৃতি—এই দুইয়ের মধ্যে আধেয়গত জায়গায় কোনো অমিল নেই। এই দিক থেকেও মূলধারার চলচ্চিত্র জনসংস্কৃতির একটি অংশ। এখন আমরা ৮০ দশকের মূলধারার চলচ্চিত্রকে দেখার চেষ্টা করবো। এজন্য শুধু ব্যবসায়িকভাবে সফল কয়েকটি চলচ্চিত্রকে বেছে নিয়েছি।
একই বৃত্তে তোমার অবিরাম ঘুর্ণন
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও দাসপ্রথার উদ্ভব থেকে সৃষ্ট শ্রেণি দ্বন্দ্বের সঙ্গে সঙ্গে নারী জাতির শোষণ-নিপীড়ন ও পরাধীনতার যে যুগ শুরু হয়েছিলো তা আজও বিদ্যমান। সময়ের সঙ্গে এই শোষণ-নিপীড়ন ও পুরুষাধিপত্যের রূপ পরিবর্তন হলেও তা আরো ভিন্ন মাত্রায় বিকশিত হয়েছে। এই ভিতকে টিকে রাখতে ক্রমাগত চর্চা চলছে সমাজের সর্বত্র। যা থেকে বাদ পড়েনি সেলুলয়েডের পর্দাও। কালে কালে পুরুষাধিপত্য চর্চার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই মাধ্যমটি। যার শুরুটা আমরা দেখি চলচ্চিত্রের একেবারে আদিলগ্ন থেকেই। ১৯২৭—১৯২৮ সালে ঢাকার নবাব পরিবারে শখের বশেই নির্মাণ হয় বাংলার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র সুকুমারী। চলচ্চিত্রটি একজন নারীর নামে হলেও সেখানে কিন্তু নারী চরিত্রে অভিনয় করেছিলো পুরুষ।
এরপর আসা যাক প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস এর কথায়। অবশ্য ১৯৩১ সালে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে নায়িকা চরিত্রে নারীই অভিনয় করেছিলেন। তবে তিনি ছিলেন একজন ‘পতিতা’। এই চলচ্চিত্রের অন্য তিন নারী অভিনেত্রীর মধ্যেও একজনকে আনা হয়েছিলো পতিতালয় থেকে, আরেকজন ছিলেন বাইজি; অন্যজন সম্পর্কে অবশ্য তেমন কিছু জানা যায়নি।
পাঠক লক্ষ করুন, প্রথম চলচ্চিত্রটিতে নারীর কোনো অংশগ্রহণই নেই। অথচ চরিত্রটির জন্য নারীর প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু সেদিন ঘর ছেড়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেননি। আর অন্যটিতে নারীর অংশগ্রহণ আছে; তবে সেই নারী ‘সাধারণ’ কেউ নন, ‘পতিতা’ (পুরুষের ভাষায়)। এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে নারীর পদার্পণ ঘটলো ঠিকই কিন্তু সে কোনো ‘ভদ্রঘর’ কিংবা ‘সাধারণ ঘর’-এর ‘শিক্ষিত’ নারী নয়। অর্থাৎ বাংলা চলচ্চিত্রে নারীর অংশগ্রহণ শুরুই হলো একজন ‘পতিতা’-কে দিয়ে। আর দেশের প্রথম বাঙালি মুসলমান অভিনেত্রী (মিস রোকেয়া খাতুন) চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেন নিজ দেশ ছেড়ে লাহোরে গিয়ে পরিচয় গোপন করে।
দ্য লাস্ট কিস নির্মাণের পর অবিভক্ত বাংলার এই অংশে চলচ্চিত্রনির্মাণের ক্ষেত্রে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ১৯৩১—১৯৫৬ পর্যন্ত সময়টা বলা চলে চলচ্চিত্রের অন্ধকার যুগ। কেননা এই সময়ে হাতেগোনা কয়েকটি তথ্যচিত্র ছাড়া চলচ্চিত্রে নতুন কোনো মাত্রা যোগ হয়নি।
১৯৫৬ সালে নির্মাণ হয় প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ। শৈল্পিক কোনো চিন্তাধারা এর পিছনে কাজ না করলেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ। মূলত এর হাত ধরেই বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্পের গোড়াপত্তন। আলমগীর কবিরের ভাষায়, ‘...দুর্বল নির্মাণ শৈলির এই ছবিটি দর্শকদের আনুকূল্য পেয়ে স্থানীয় ছবির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বাজারের ইঙ্গিত দিয়ে যায়।’৪ এছাড়া এর মাধ্যমেই প্রথম পেশাদার হিসেবে চলচ্চিত্রে নারীর আগমন ঘটে। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একই সঙ্গে সাতজন নারী সেলুলয়েডের জগতে পা রাখেন। অভিনেত্রীদের কেউ কেউ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন; কারো ছিলো মঞ্চে অভিনয়ের দক্ষতা।
মুখ ও মুখোশ-এ কুলসুম, রাশিদা ও হামিদা এই তিন নারী চরিত্রের রয়েছে সরব উপস্থিতি। বাকি চারজনের স্বল্প উপস্থিতি চোখে পড়ে একেবারেই কাহিনীর প্রয়োজনে। এখানে নারীকে দেখি নাচে-গানে ডাকাত দলের মনোরঞ্জন করতে। অবলা আর প্রতিবাদহীন রূপ দেখি রাশিদা চরিত্রটিতে, যে ভাইয়ের বউ হামিদার নির্যাতন সহ্য করেও মুখবুজে থাকেন। আর মুখ্য নারী চরিত্র কুলসুম হাজির হন ডাকাত সর্দারের ভোগের পণ্য হিসেবে। ৫৬-তে এসে চলচ্চিত্রে শিক্ষিত নারীর আগমন ঘটলো ঠিকই, কিন্তু ৩১-এর নারী আর এই নারীর মধ্যে গুণগত কোনো পরিবর্তন চোখে পড়লো না।
মুখ ও মুখোশ-এর হাত ধরে বাংলাদেশে কাহিনীচিত্র নির্মাণের শুরু। এরপর ১৯৫৮ সালে এফডিসি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের সামনে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়। এরপর ক্রমাগত বাড়তে থাকে বাংলা চলচ্চিত্রের সংখ্যা। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে একের পর এক নারী অভিনেত্রীর; কিন্তু অভিনয়শিল্পী হিসেবে নয় বরং পুরুষ আধিপত্যকে আরো মজবুত করার হাতিয়ার হিসেবে চলে তাদের ক্রমাগত ব্যবহার। যা অব্যাহত থাকে ৬০ দশকেও।
এই দশকে শুরু হয় লোককাহিনীভিত্তিক চলচ্চিত্রনির্মাণ। ১৯৬৫ সালে সালাউদ্দিন নির্মাণ করেন রূপবান। ব্যাপক সাড়া ফেলা রূপবান দর্শক-শ্রোতার ওপর উর্দু চলচ্চিত্রের প্রভাবে ভাগ বসায়। অত্যন্ত দর্শকপ্রিয় রূপবান-এ নারীর উপস্থাপন কেমন ছিলো তা দেখা যেতে পারে।
রূপবান-এ পাপগ্রস্ত পুরুষের পাপ মোচনের দায় এসে বর্তায় ১২ বছরের এক নারীশিশুর ওপর। কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল পিতৃতন্ত্র রক্ষায় রূপবানকে সব ত্যাগ ও দুর্ভোগ স্বীকার করে নিতে হয়। এর মধ্য দিয়ে পিতৃতন্ত্রের আদর্শ নারীর যে সর্বংসহা প্রতিমূর্তি তার অবয়ব শক্ত হয়। সেই সঙ্গে স্বামী যেমনই হোক না কেনো সেই শ্রেষ্ঠ—এ জাতীয় পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবই প্রতিষ্ঠা পায়। রূপবান-এর সাফল্যের পর লোককাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একে একে নির্মাণ হয় একই ধারার বেহুলা’র (১৯৬৬) বেহুলা, নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র (১৯৬৭) আলেয়া কিংবা সাত ভাই চম্পা’র (১৯৬৭) চম্পা। মজার ব্যাপার হলো, চরিত্রের বৈশিষ্ট্যে রূপবান এর সঙ্গে এদের তেমন কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। ৫৬ থেকে ৬৫, পিতৃতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করার যে কৌশল তা বলবৎ থাকে সেলুলয়েডের পর্দাতেও ।
৭০ দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে যোগ হয় নতুন আরেক ধারা। এ সময় নির্মাতারা সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। এই ধারায় জহির রায়হানের এক অনবদ্য সৃষ্টি জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)। এখানে প্রতীকীভাবে একজন দজ্জাল ‘গৃহকর্তা’র মাধ্যমে একটি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর ক্ষমতার চর্চা ও অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরা হয়। দেশের সেই সময়ের অস্থিরতায় সন্দেহাতীতভাবে এমন চলচ্চিত্রের নির্মাণ সাহসিকতার দাবি রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবার তথা ওই ‘রাষ্ট্রের’ প্রধান হিসেবে চলচ্চিত্রে যাকে দেখানো হলো তিনি কিন্তু একজন নারী! এখন প্রশ্ন, পুরুষ কর্তৃত্বের চলতি প্রথা ছেড়ে জহির এ চরিত্রে একজন নারীকে নিলেন কেনো? তিনি কি প্রথা ভাঙলেন নাকি প্রথা পাকাপোক্ত করলেন? নাকি অবচেতনে পুরুষতন্ত্রের টাল সামলাতে পারেননি! সঙ্গে আরেকটি বিষয় চোখ এড়ায় না, যে সাথী ও বিথী (বিয়ের আগে) সেই সময় নিয়মিত প্রভাতফেরিতে যেতেন, দেশ নিয়ে যারা এতো সচেতন, তারাই বিয়ের পরে পুরোদস্তুর ‘বঙ্গ ললনা’ বনে গেলেন! দেশ যেনো এখন আর তাদের ভাবায় না। ব্যস্ত তারা পারিবারিক কলহ নিয়ে। তাই ফারুক আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু তোমাকে আর দশটা সেকেলে বউ এর মতো ভাবিনি বিথী।’ অথচ ফারুকদের কিন্তু সেই বাইরের জগৎ, আন্দোলন অব্যাহত ছিলো আর সাথীরাই কেবল সেই গৃহে।
এই বছরেই বাংলা চলচ্চিত্র প্রথম কোনো নারী পরিচালককে পায়। বিন্দু থেকে বৃত্ত’র (১৯৭০) মধ্য দিয়ে রেবেকা পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিন্দু থেকে বৃত্ত সুধী মহলে প্রশংসিতও হয়। স্বাধীনতার পূর্ব সময়েই যেখানে একজন নারী পরিচালকের সফল আবির্ভাব ঘটে, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বর্তমানে আমরা দেখি নারী পরিচালকের কোটা শূন্য বললেই চলে। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও নারী পরিচালক রয়েছেন একেবারে হাতেগোনা। অথচ ইরানের মতো রক্ষণশীল দেশেও আমরা দেখি উল্লেখযোগ্য হারে নারী পরিচালককে; যারা সব প্রতিকূলতার মধ্যেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। ইরানের বিখ্যাত নারীনির্মাতা সামিরা মাখমালবাফ বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই বলেন, ‘এমনিতেই একটা ধারণা কাজ করে যে, একজন নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে পারে না। এটা উতরানো একজন নারীর জন্য আসলেই কঠিন। ...ফলে প্রথম কাজ হলো এই পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকা। এবং এটা করেই ধীরে ধীরে মানসিকতা বদলে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।’৫ আবার সৌদি আরবের মতো কট্টর মুসলিম দেশেও হাইফা আল-মনসুর’রা কিন্তু পিছিয়ে থাকেননি। সব ধরনের প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে হাইফা নির্মাণ করেছেন কাহিনীচিত্র ওয়াজদা (২০১৩)। তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বিশ্বকে। অন্যদিকে আমাদের দেশে নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও সেখানে নারীর নির্মাণ সমাজের প্রচলিত বৃত্তের বাইরে নয়; আর নারীনির্মাতার কথা তো বললামই।
এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশের চলচ্চিত্রে নারী চিত্রায়ণেও ব্যতিক্রম কোনো কিছু চোখে পড়ে না। সেই সময় নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ চলচ্চিত্রে নারী এসেছে কেবল ধর্ষিতা হিসেবে। যাদের বেশির ভাগের শেষ পরিণতি ছিলো আত্মহত্যা। আবার যারা বেঁচে ছিলেন তাদের ক্ষেত্রে দেখানো হয়েছে পুরুষ সঙ্গীটির মহানুভবতা। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি অস্ত্র হাতে নারীও এগিয়ে এসেছিলো। অথচ ‘একদিকে সরাসরি নারীর যুদ্ধে অংশগ্রহণকে অদৃশ্য করে ফেলা হয়, অন্যদিকে ধর্ষণের মতো মারাত্মক যুদ্ধাপরাধেও নারীর সামাজিক অবস্থানকে পুরুষের উদারতার বা মহানুভবতার ওপর নির্ভরশীল করে তোলার এক রাজনীতি দেখা যায়।’৬
চলচ্চিত্রের আদিলগ্ন থেকে ৭০ দশক হয়ে আমরা এবার পৌঁছেছি ৮০ দশকে। এই দশকটি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা এই সময়ে এসে বাংলা চলচ্চিত্রে বেশকিছু নতুন বাঁকের সন্ধান মেলে। ৮০ দশকে এসে মৌলিক কাহিনীনির্ভর সুস্থ সামাজিক চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমতে থাকে। এসব চলচ্চিত্রের মধ্যে ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০), ভেজাচোখ (১৯৮৮) দর্শকপ্রিয়তা পেলেও ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি। সেখানে জায়গা করে নেয় উদ্ভট কাহিনীনির্ভর পোশাকি চলচ্চিত্র। পরিচালকদের কাছে সামাজিক রুচিবোধের তুলনায় সেসময় ব্যবসা মুখ্য হয়ে ওঠে। নাচে-গানে পরিপূর্ণ চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসায়িক সাফল্যও পায়। যেমনটি আমরা দেখি সওদাগর (১৯৮২), আবে হায়াৎ (১৯৮৩), পদ্মাবতী (১৯৮৪), নরম গরম (১৯৮৪) নামে কিছু পোশাকি চলচ্চিত্রে। এগুলোর ব্যবসায়িক সাফল্যে একের পর এক চলতে থাকে এ ধরনের চলচ্চিত্রের নির্মাণ। অর্থাৎ এখানে আশ্রয় নেওয়া হয় নির্দিষ্ট মানপ্রমিতকরণের। একটি নির্দিষ্ট মানের মধ্যে চলচ্চিত্রগুলোকে আবদ্ধ করা হয়। যদিও ৬০ দশকের রূপবান কিংবা বেহুলার সঙ্গে এই চলচ্চিত্রগুলোর গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। কেবল উপস্থাপনায় ছিলো নতুন ঢঙ, নতুন মোড়ক।
৭০ দশকে রংবাজ (১৯৭৩) দিয়ে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের শুরু হলেও এর কদর বাড়ে অর্থাৎ ব্যবসায়িক বিকাশ হয় মূলত ৮০ দশকে এসে। একে একে নির্মাণ হয় নসীব (১৯৮৪), লড়াকু (১৯৮৬), সারেন্ডার-এর (১৯৮৭) মতো চলচ্চিত্র। এগুলোতে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে জুড়ে দেওয়া হয় মারপিটের দৃশ্য। সেই সঙ্গে আগমন ঘটে একের পর এক অ্যাকশন হিরোর। তাদের পাশে নারী চরিত্রকে রাখা হয় সহযোগী নয় বরং সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে।
এই দশকেই চলচ্চিত্রে এক নতুনতর ধারার জন্ম হয়। যাকে আমরা বলছি বিকল্পধারা। একদল নির্মাতা এফডিসির বাইরে এসে নিজেদের মতো করে চলচ্চিত্রনির্মাণ শুরু করেন। এর হাত ধরেই আমরা পাই বাংলাদেশে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগামী (১৯৮৪)। এর ঠিক দুই মাস পরে হুলিয়া (১৯৮৪)। স্বল্পদৈর্ঘ্যরে এই দুটি চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হয়। আত্মপ্রকাশ ঘটে একঝাঁক নতুন নির্মাতার। একে একে নির্মাণ হয় প্রত্যাবর্তন (১৯৮৬), আবর্তন (১৯৮৯), আদম সুরতসহ (১৯৮৯) বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ফলে গতানুগতিক চলচ্চিত্রের বাইরে তৈরি হয় নতুন এক ধারা। সেই সঙ্গে তৈরি হয় এক শিক্ষিত-সচেতন নাগরিক দর্শকশ্রেণির। বিকল্পধারার স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র নিয়ে আজ কথা এই পর্যন্তই। এই ধারা নিয়ে হয়তো কথা বলবো অন্য কোনোখানে, অন্য কোনোভাবে।
৮০ দশকের শেষ দিকে বাংলা চলচ্চিত্রের পালে এক নতুন হাওয়া লাগে। যার পথচলা শুরু হয়েছিলো রূপবান দিয়ে। লোককাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্র পুনরায় ফিরে আসে। তবে এবারের বিষয় আগের চেয়ে ভিন্ন মাত্রা পায়। ১৯৮৯-তে তোজাম্মেল হক বকুল নির্মাণ করেন বেদের মেয়ে জোস্না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড তৈরি করে এটি। আগেই বলেছি আমাদের আলোচনা এগিয়ে যাবে ৮০ দশককে ধরে। এই দশকে চলচ্চিত্রের বেশকিছু নতুন ধারা আমরা দেখলাম। এবার দেখবো এসব ধারায় নারীর উপস্থাপন।
বেদের মেয়ে জোস্না, লাইলী মজনু ও কাঞ্চনমালা
‘যন্ত্র’র মাঝেই ক্ষমতাতন্ত্রের মূলমন্ত্র
প্রসব, পালন ও সংসারের কাজে নিয়োজিত থেকে নারী ‘প্রজাতি’র সংরক্ষণ করে এবং নিজে থেকে যায় অপরিবর্তিত। আর এর ব্যত্যয় ঘটলেই নারীর ওপর নেমে আসে পুরুষতন্ত্রের খড়গ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো, নারীকে কেবল মা হলেই চলে না, তাকে হতে হয় পুত্রবতী মানে আগামীর পুরুষের জননী। যার মধ্য দিয়ে কালে কালে রোপিত হয় পুরুষতন্ত্রের বীজ। অন্যদিকে বন্ধ্যা ও অপুত্রক নারী থাকে সমাজের চোখে সবসময়ই অবহেলিত। সমাজের ভিতরেই তাদের জন্য আলাদা এক শ্রেণি তৈরি করা হয়। অথচ সন্তান পুত্র হবে, না কন্যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে একজন পুরুষের ওপর। সমাজের এই রূপ সেলুলয়েডেও ব্যতিক্রম নয়। বেদের মেয়ে জোস্নাতে বৃদ্ধ বয়সেও জোস্নার নানীকে উদ্দেশ করে নানাকে বলতে শোনা যায়, ‘দিনে দিনে বুড়ি হইয়া গ্যালা, আমারে তো একটা পোলা-মাইয়া দিতে পারলা না। আজ যদি আমার ঘরে পোলা-মাইয়া থাকতো, তাগো ঘরে পোলা-মাইয়া থাকতো...।’ এতো বছরের সংসার শেষেও যেনো সন্তান উৎপাদনই ছিলো তার প্রধান কাজ। অথচ সন্তান না হওয়ার জন্য দায়ী একজন পুরুষও হতে পারে। পুরুষতন্ত্র এই প্রশ্ন কখনো তোলেই না। এই দায় ক্ষমতাতন্ত্রের জোরে পুরোটা চাপিয়ে দেয় নির্দোষ নারীর ওপর। আর ক্রমাগত চর্চায় সমাজে এটিই আজ প্রতিষ্ঠিত। এঙ্গেলস যথার্থই বলেছেন, ‘...স্ত্রীলোক হল পদানত, শৃংখলিত, পুরুষের লালসার দাসী, সন্তানসৃষ্টির যন্ত্র মাত্র।’৭ নারী ‘যন্ত্র’, কিন্তু সেই ‘যন্ত্র’র ক্রিয়া সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই পুরুষের! কিংবা সেই ‘যন্ত্র’ সম্পর্কে ধারণা থাকলেও পুরুষ তা যৌক্তিকভাবে মানতে রাজি নন। অথচ ক্ষমতাতন্ত্রের বলে ‘যন্ত্র’র কাজ নির্ধারণ করে দেয় আবার তারাই।
‘ভক্ষক’ আর ‘রক্ষক’-এর দোলাচলে নারী
পুরুষ নারীকে সংজ্ঞায়িত করেছে, নারীর অবস্থান নির্দেশ করেছে নিজেকে মানদণ্ড করে। পুরুষ ধ্রুব, আর ‘নারী, এক আপেক্ষিক সত্তা।’৮ পুরুষ নারীকে ছাড়াই ভাবতে পারে নিজের কথা; কিন্তু নারী পারে না পুরুষকে ছাড়া নিজেকে ভাবতে। তাই নারী হচ্ছে তা, পুরুষ তাকে যা মনে করে। পুরুষের কামাতুর শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে চলার সাধ্য কি তার! সে কারণেই কখনো তাকে হতে হয় ধর্ষিতা, কখনোবা নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার। পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো বর্বরোচিত এই আচরণকে স্বীকৃতি দেয়, চলে তার চর্চা।
লোককাহিনীভিত্তিক বেদের মেয়ে জোস্না, কাঞ্চনমালা ও লাইলী মজনুতেও এই চেষ্টা বলবৎ থাকে। জোস্নাকে উজিরপুত্রের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হতে হয় বারবার। অন্যদিকে একই পরিস্থিতির শিকার হতে হয় কাঞ্চনমালাকেও তারই গোত্রের পুরুষের কাছে। যেখানে ফুটিয়ে তোলা হয় নারীর অসহায় আর ভয়ার্ত ইমেজকে। আবার কখনো কখনো শুধু শারীরিক নয় পুরুষের ভয়ঙ্কর কুদৃষ্টির শিকার হয় নারী, যেমনটি আমরা একেবারে শুরুতেই বলেছিলাম। আর তাইতো জোস্নাকে স্নানরত অবস্থায় দেখে রচনা করা হয়, ‘গলা জলে নেমে কন্যা গতর মাজন করে, জঙ্গলে বসিয়া ওস্তাদ হায় হুতাশ করে।’ লাইলী মজনুতেও লাইলীকে তুলে নিয়ে যায় ডাকাত সর্দার। তার হাত থেকে লাইলী রক্ষা পান নিজের জীবন দিয়ে। আবার লক্ষ করুন, জোস্না বা কাঞ্চনমালার রক্ষাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় কোনো না কোনো পুরুষ। তার মহানুভবতায় সিক্ত হয় নারী। এমনকি পুরুষের বেশ ধরে যেকোনো জায়গায় চলাচলেও নারী পায় পূর্ণ নিরাপত্তা। বেদের মেয়ে জোস্নাতে উজির কন্যা তারাবানু জমিদার পরগনায় আনোয়ারকে নির্ভয়ে খুঁজতে যান পুরুষের ছদ্মবেশে। অথচ নারীর নিজেকে রক্ষা করার মতো কোনো ইমেজ নির্মাণ হয় না। পুরুষ হয়ে ওঠে অনিবার্য, অপরিহার্য, অবধারিত; আর নারী হয় আকস্মিক, অপ্রয়োজনীয়, সংখ্যাতিরিক্ত।
শতাব্দীর শৃঙ্খলে বন্দি এক ‘ঘুড্ডি’
নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পিতৃতন্ত্র সমস্ত আর্থ-কর্তৃত্ব রেখেছে পুরুষের হাতে। পুরুষের ক্ষমতা চর্চার উদ্দিষ্ট সে। একই সমান্তরালে পুরুষ ক্ষমতাবান আর নারী ক্ষমতাহীন। তাইতো রাজমাতা (বেদের মেয়ে জোস্নায়) হয়ে অন্যায় জেনেও নিজ সন্তানের মৃত্যুদণ্ড মাথা পেতে নিতে হয়। স্বামীর মতের বিরোধিতা করার ক্ষমতা তার থাকে না। শুধু স্বামীর পা জড়িয়ে নিষ্ফলা আবেদন জানাতে পারেন তিনি। কারণ পিতৃতন্ত্র সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিবারই হলো প্রধান। পরিবারই তার শাসন ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখার প্রধান মাধ্যম। পরিবার অনেকটা পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র; আর পরিবার রাষ্ট্রের পতি হয় পরিবারের প্রধান পুরুষটি। পুরুষ হয় প্রভু আর নারী তার আজ্ঞা পালনকারী। আর সে কারণেই হয়তো নারী, সে রাজমাতা-রানি কিংবা চাকরানী যাই হোক, নিজস্ব কোনো মতামত জানাবার ক্ষমতা রাখে না। একই কারণে লাইলী প্রাণ দিয়ে কায়েসকে ভালোবাসলেও তার ওপর নেমে আসে পিতৃতন্ত্রের খড়গ। জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার কোনো অধিকার তার থাকে না। এটা নির্ধারণেও ক্ষমতা রাখেন কেবল পরিবারের কর্তাই। শুধু পুরুষালি পারিবারিক কলহের জের ধরে লাইলীর বাবা এই সম্পর্ক মানতে নারাজ। যার জন্য চরমমূল্য দিতে হয় তাদের।
নরম গরম ও পদ্মাবতী
‘আমিও তো হতে পারি নরম থেকে গরম’
৮০ দশকে ফ্যান্টাসি বা পোশাকি যে চলচ্চিত্র ধারাটির সূচনা হয়েছিলো তার বিষয় ছিলো মূলত নাচে-গানে ভরা উদ্ভট-অচেনা সব কাহিনী। শুধু কাহিনী নয়, চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোও ছিলো উদ্ভট সব বৈশিষ্ট্যে ভরা। এই ধারার চলচ্চিত্র হিসেবে এই আলোচনায় নরম গরম (১৯৮৪) ও পদ্মাবতীকে (১৯৮৪) বেছে নেওয়া হয়েছে।
নরম গরম-এ মুখ্য নারী চরিত্র মধু। ঘরে-বাইরে নারীর ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সবসময় রুখে দাঁড়ান তিনি। এমনকি মধু ছাড় দেন না রাজ্যের অত্যাচারী নায়েবকেও। প্রতিবাদী এ আচরণ নিয়ে তার নিজের ভাষ্য এমন, ‘আমারও তো মন আছে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমারও তো প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করে, আমিও তো হতে পারি নরম থেকে গরম।’ তাই এককথায় অনেকের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী মধু। অন্যদিকে যৌতুকের জন্য নিজের বোনকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেও কোনো প্রতিবাদ না করে তাকে বাড়িতে ফিরে নিয়ে আসেন। শেষ পর্যন্ত নিজের শাশুড়ির কাছ থেকে গহনা ও যৌতুকের টাকা ধার নিয়ে তিনি বোনের শ্বশুরবাড়িতে পাঠান।
আবার এই মধুই তার পতি জমিদারপুত্র মারুফকে ভালো করার গুরুদায়িত্ব নেন। মুখবুজে সহ্য করেন স্বামীর সব অত্যাচার। পতিসেবায় পাগল ‘প্রতিবাদী’ মধুকে একপর্যায়ে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার পায়ের নিচে আমাকে ঠাঁই দিও।’ এই পায়ের নিচে ঠাঁই নেওয়ার জন্য স্ত্রী থেকে বাইজি হতেও পিছপা হন না তিনি। আবার স্বামীকে ‘ভালো’ করে তোলার চেষ্টায় ব্যর্থ মধু শেষ পর্যন্ত সেই পতি-মারুফকে কারাগারে বন্দি করে রাখেন।
পদ্মাবতী-তে বেদেকন্যা পদ্মাবতী। অত্যাচারী জমিদারের রোষানলে পড়ে নির্যাতনের শিকার হন তার বেদে বাবা। এতে বাধা দিলে পদ্মাবতীকেও চাবুক মেরে আহত করেন জমিদার স্বয়ং। এমনকি জমিদার বেদে বহরকে তাড়িয়ে দিলেও কোনো প্রতিবাদ করেন না পদ্মাবতী। অথচ বেদে বহরের লোকজনের ভাষ্যমতে, পদ্মাবতী নাকি ঘোড়ায় চড়া থেকে তলোয়ার বিদ্যায় সমান পারদর্শী। তার প্রমাণও পাওয়া যায় শাহাজাদা ইমরানকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ওয়াজেদকে মেরে প্রাসাদ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা থেকে। আসলে এই পদ্মাবতী কিন্তু আসল বেদেকন্যা নন। ‘ভাগ্যের’ পরিহাসে শিশুকালে তাকে জমিদারকন্যা থেকে বেদেকন্যার রূপ নিতে হয়েছিলো। কিন্তু কোথা থেকে কীভাবে পদ্মাবতী এই ঘোড়ায় চড়া আর তলোয়ার চালনা শিখেছিলেন তার কথা বলা হয় না। অবশ্য এটাই হয়তো ‘ফ্যান্টাসি’। জমিদার কন্যারা তাহলে মনে হয় ‘জন্মগত’ভাবেই ঘোড়ায় চড়া আর তলোয়ার চালনা শিখে আসেন! শুধু প্রতিবাদ করাটা শেখেন না! কারণ নারী-জমিদারকন্যা যদি প্রতিবাদ করে তার পালক বাবাকে উদ্ধার করেন, তাহলে তো পুরুষ-নায়কের কিছুই করার থাকবে না। তাহলে তো নারীকে নিয়েও পরিচালকের আর ফ্যান্টাসি করার কিছুই থাকবে না।
লক্ষণীয়, একই মধু কখনো প্রতিবাদী, কখনো পতিব্রতা, কখনো বাইজি আবার কখনো স্বামীকে শাসনকারী। আবার একই পদ্মাবতী ঘোড়ায় চড়েন, তলোয়ার চালান কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না। এখন প্রশ্ন তাহলে ‘আসল’ মধু কিংবা পদ্মাবতী কোন্ জন—এই না হলে ফ্যান্টাসি! আসলে কাহিনী নিয়ে তো পরিচালক ফ্যান্টাসি করেননি, করেছেন নারী চরিত্র নিয়ে। কারণ পুরুষকে নিয়ে তো আর ফ্যান্টাসি করা চলে না; তার তো পুরুষত্ব আছে। আর নারীর তো আত্ম বলে কিছু নেই। তার আত্মা নির্মাণ করে পুরুষ। সেই পুরুষ নিয়ে কি আর ফ্যান্টাসি শোভা পায়!
চাঁপাডাঙ্গার বউ ও ঢাকা-৮৬
যাহা-কিছু বলি আজি সব বৃথা হয়,
মন বলে মাথা নাড়ি॥ এ নয়, এ নয়।
‘বাস্তব বলে কিছু নেই, বরং বাস্তবের নির্মিতি আছে, নির্মাণ-প্রক্রিয়া আছে। যতই বাস্তব বলে মনে হোক না কেনো, সব টেক্সটই আসলে নির্মিত বাস্তবের প্রতিনিধিত্ব করে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে এবং বহু ব্যবহারে সেই নির্মিত বাস্তবকেই অতঃপর মৌলিক মনে হতে থাকে’৯—হল-এর এই রেপ্রিজেন্টেশন তত্ত্বের প্রয়োগ দেখি চাঁপাডাঙ্গার বউ (১৯৮৬) ও ঢাকা-৮৬-তে (১৯৮৮)। গাঁয়ের মোড়ল সেতাব মন্ডল, যার জমি-জিরাত আছে, আছে পঞ্চায়েতে বিচারের ক্ষমতা অর্থাৎ বাইরের যাবতীয় কাজের একজন দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তি তিনি। অন্যদিকে চাঁপাডাঙ্গা, যিনি সংসারের সব ‘অনুৎপাদনশীল’ কাজের একনিষ্ঠ গৃহকর্ত্রী। কিন্তু কর্তার অনুমতি না নিয়ে কাউকে কিছু দেওয়ার অধিকার তার নেই। অথচ তাকে বলা হয় সংসারটা তার। স্বামীর হাজার হাজার টাকা হিসাব করে অতি যত্নে রাখেন তিনি, কিন্তু সেগুলো নিজের নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ আন্দোলনের সময় থেকে যখন নারী-পুরুষের সমান অধিকারের আইনগত প্রশ্ন তোলা হয়, তখন ৮০ দশকে এসেও কেনো বাংলা চলচ্চিত্রের নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি থাকে না? ঢাকা-৮৬-তে শান্তা লন্ডন থেকে পড়াশোনা করে ফিরলেও তাকে কোনো চাকরি করতে দেওয়া হয় না। তারা (পুরুষ) কি তাহলে প্রমাণ করতে চায় কেবল অন্দরমহলই নারীর বিচরণ ক্ষেত্র! অথচ সূচনালগ্নে নারীই কিন্তু গোষ্ঠী প্রধান ছিলো। সময়ের প্রয়োজনে যখন জোড়া বিবাহের স্থলাভিষিক্ত হলো একক বিবাহ প্রথা এবং অবসান হলো জননীবিধির; এঙ্গেলসের মতে তখনই হলো ‘স্ত্রীজাতির এক বিশ্ব ঐতিহাসিক পরাজয়।’১০ নারীকে রাখা হলো ‘অনুৎপাদনশীল’ ঘরকন্যার কাজে আর পুরুষ উৎপাদনে, অন্য অর্থে ক্ষমতায়। সেই যে নারী ঘরে ঢুকলো তারপর কতো যুগ পেরিয়ে গেলো নারী তার ক্ষমতা, মর্যাদা ফিরে পায়নি, অন্য অর্থে দেওয়া হয়নি। দিলে হয়তো সেতাব তার বউয়ের সামনে এতো সহজে দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারতেন না বা শান্তাকে এভাবে ঘরবন্দি করতে পারতেন না। কিন্তু কেনো এই চাঁপাডাঙ্গা বা শান্তাদের নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নেই? এ কি কেবলি ঐতিহাসিক পরাজয়ের ফল নাকি ক্ষমতাতন্ত্রের ক্ষমতা চর্চার?
যে কথায় প্রাণ মোর পরিপূর্ণতম
সে কথা বাজে না কেন এ বীণায় মম!
‘নারীর সমস্ত শিক্ষা হবে পুরুষের আপেক্ষিক। তাদের খুশি করা, তাদের কাছে উপকারী হওয়া, তাদের কাছে প্রিয় ও সম্মানিত হওয়া, শিশুকালে তাদের লালন করা, বয়স্ককালে তাদের যত্ন করা, তাদের পরামর্শ ও সান্ত্বনা দেয়া, তাদের জীবনকে মধুর ও সুন্দর করা হচ্ছে নারীর সব সময়ের দায়িত্ব।’১১ রুশোর এই কথাই যেনো ক্ষমতাতন্ত্র মনে প্রাণে ধারণ করে নিজেদের স্বার্থে। তাই সবাই যখন চাঁপাডাঙ্গার চরিত্র নিয়ে এমনকি তার স্বামীও যখন প্রশ্ন তুললেন তখনও তিনি নির্বিকার। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার বদলে আত্মহত্যার পথকেই তার শ্রেয় মনে হয়। সেখানে ‘পুরুষ’ মহাতাব তার পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত তারই প্রচেষ্টায় তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। অর্থাৎ নারী এতোটাই অসহায় যে নিজের অপমানের সমাধান তাকে খুঁজে ফিরতে হয় মৃত্যুতে।
অন্যদিকে পুরুষ সবসময়ই শক্ত হাতে হাল ধরতেই অভ্যস্ত, আর তাই সমাধানও তারই হাতে। এই নির্মিত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আজকের নারীও চলছে অবিরাম। সেতাব (চাঁপাডাঙ্গার বউ) যখন বাঁকা চোখে পুটির শরীরের ভাঁজ দেখেন তখন সমাজের কিছু এসে যায় না। সেখানে পুরুষ ইচ্ছে করলেই ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে, স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারে কিন্তু স্ত্রীর সে অধিকার নেই।
চাঁপাডাঙ্গার মতো ঢাকা-৮৬-তে শান্তাকেও তার খালার কাছে বলতে শুনি, ‘আমি আর বাঁচতে চাই না, আমাকে একটু বিষ এনে দাও।’ অন্যদিকে সোহানেরা বুদ্ধি আঁটতে থাকে কী করে এর সমাধান বের করা যায়। নারীচিত্ত কি এতোই দুর্বল যে তারা জীবনাবসান ছাড়া কোনো সমাধান খুঁজে পায় না বা খোঁজার চেষ্টাও করে না। সেই ১৯০৪ সালে রোকেয়া বলেছিলেন, পুরুষরা মেয়েদের সব ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে কেবল গায়ের জোরে। নারীর গায়ের জোর ৮৪ বছর পরেও মনে হয় একই রকমই আছে!
ভূতের মতন চেহারা যেমন নির্বোধ অতি ঘোর—
যা-কিছু হারায় গিন্নি বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর।
‘পুরুষতন্ত্রের উদ্ভাবিত নারীশিক্ষা হচ্ছে নারীকে পুরুষের দাসী করার শিক্ষা। শিশুকাল থেকেই নারীদের শেখানো হয় যে তাদের প্রকৃতি পুরুষের বিপরীত; নারীরা নিয়ন্ত্রণ করবে না, তারা আত্মসমর্পণ করবে অন্যের নিয়ন্ত্রণের কাছে। সব ধরনের নীতিশাস্ত্র শেখায় যে পুরুষের কাছে আত্মসমর্পণই তাদের কর্তব্য; আর সব ধরনের ভাবালুতা তাদের শেখায় যে নারীর প্রকৃতি হচ্ছে অন্যের জন্যে বেঁচে থাকা, নিজেদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা। বঞ্চিত হওয়াই নারীত্ব!’১২ হুমায়ুন আজাদ নারী প্রকৃতির যে কথা বলেছেন, চাঁপাডাঙ্গার বউ-এর নারীরা তারই প্রতিনিধিত্বশীল অংশ। তাদের ক্ষমতার সমান তাদের অধিকার! সেখানে আমরা দেখি, বড়ো বৌদির দুঃখ ঘোচাতে মানুর নিষেধ সত্ত্বেও মহাতাব তার ছেলে রতনকে দত্তক দিতে চান। বৌদিকে মহাতাব বলেন, ‘কালই পঞ্চায়েত ডেকে মানিককে তোমার দত্তক পুত্র হিসেবে দান করবো, তারপর দেখবো কে তোমাকে বাঁজা বলে।’ মহাতাবের যতোখানি অধিকার রয়েছে মা মানুরও কিন্তু ততোখানি। কিন্তু মানুর সেই অধিকার সমাজ স্বীকৃত নয়। আবার মানুকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বললেও সে যাবে না, তার যুক্তি এটা আমার ছেলের বাড়ি; তার নিজের বলে যেনো কিছু নেই। নারীর নিজের বলে হয়তো কিছু থাকতে নেই! শত প্রতিকূলতার মধ্যে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ‘বুক ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল ভগিনী! আমরা আসবাব নই; বল কন্যে! জড়াউ অলঙ্কার রূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল, ‘আমরা মানুষ’।’১৩ যেখানে নারী মুক্তির অর্থ খোঁজে পুরুষের সমকক্ষতার মধ্য দিয়ে সেখানে শতাব্দীর শেষে এসে নারীর চিত্রণ অধীনতার। যা কিনা পুরুষতন্ত্রেও শত যুগের প্রচারণা প্রাকৃতিকভাবেই নারীদের দুর্বলতা ও পুরুষের অধীনতার দৃশ্যমান রূপ। এখন প্রশ্ন হলো কেনো নারীর এই চিত্রণ?
ঢাকা-৮৬-তে ছবি অর্থাৎ শান্তার খালা ও সোহানের মামা শরিফ দুজন দুজনকে ভালোবাসেন। প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ের বিয়ে হবে সামান্য বিএ পাস বেকার মধ্যবিত্ত ছেলের সঙ্গে! তা মেনে নেননি ছবির বাবা, অন্য অর্থে তার সমাজ। অথচ এর বিপরীত হলে কিন্তু কোনো সমস্যা হতো না। কারণ তাতে ষোলো আনা নিয়েই পুরুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। যদিও ‘বিদ্রোহী’ ছবি শেষ পর্যন্ত অবিবাহিতই থেকে যান। চলচ্চিত্র বলেই হয়তো এগুলো সম্ভব হয়। বাস্তবে ছবিদের টিকে থাকা খুব সহজ হয় না। পরবর্তী সময়ে শান্তা আর সোহানকে নিয়ে একই ধরনের সমস্যা হলে ছবিকে পাঠানো হয় শান্তার কাছে তাকে রাজি করাতে। অবশ্য ছবি প্রথমে রাজি না হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে যেতেই হয়। ছবি শান্তাকে বলেন, ‘জীবনে প্রেম আসে, সেই প্রেমের জন্য কাউকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়। কিন্তু প্রেম কোনো যুক্তি মানে না। অথচ সবাই সেই যুক্তির পাল্লা দিয়ে প্রেমকে তুচ্ছজ্ঞান করে। আমাকে দেখ, তোর বাবা-মার চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু যাকে ভালোবাসলাম, কই তাকে তো আমি পেলাম না। আমার মতো তোর জীবনটা হোক এ আমি চাই না।’ তার মানে ‘বিদ্রোহী’ ছবি কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবার-সমাজের কথাই মেনে নেন। বোঝাতে চান নিজের নয়, পরিবারের মতে বিয়ে করলেই হয়তো তিনি সুখে থাকতেন!
অন্যদিকে এই পরিস্থিতিতে সোহানের মামা শরিফকে দেখা যায় উল্টো চরিত্রে। তিনি যে তখন বিত্তবান এমনও নয়, বরং তাকে নির্ভর করতে হয় ভাগ্নের টাকার ওপর; তা সত্ত্বেও সোহানের বিয়ে নিয়ে তার বক্তব্য আপসহীন জোরালো। সেখানে যদি শান্তার খালা নাও থাকতেন, তবুও সোহানের মামা এই বিয়েটা করাতে পারতেন। কিন্তু শান্তার খালা মানে ছবি কিন্তু তা পারেননি; অন্যভাবে বললে তাকে পারতে দেওয়া হয়নি। অথচ দেখুন, সেই ১৮ শতকের প্রায় অশিক্ষিত রাসসুন্দরী (রাসসুন্দরী ১৮৭৫ সালে বাংলায় তার ‘আমার জীবন’ নামে একটি আত্মজীবনী লেখেন। বলা হয়, বাংলা ভাষায় লেখা এটি প্রথম কোনো আত্মজীবনী) আত্মজীবনী লিখে এখনও বেঁচে আছেন, তারপর কতো নারীর একেকটি পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত দৃঢ় রোকেয়া। কতো বছর পেরিয়ে গেলো কিন্তু সেই আপসহীন অবস্থান আর চোখে পড়লো না।
লড়াকু ও সারেন্ডার
শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী!
পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি...
তোমার প্রেমেই আমি সুন্দর/ তোমার ছবিতে আঁকা অন্তর/ আর কী আছে চাওয়া/ আর কী আছে পাওয়া/ তুমি যেনো সবই দিলে—স্বপ্নে দেখা জুলির এ গান বলে দেয়, সোহেলকে ছাড়া তার জীবন অর্থহীন। জুলি তার জন্য রুমালে বড়ো যত্নে আঁকেন সোহেল নামটি। আকুতির স্বরে বলেন, ‘আবার কবে আসবেন?’ এর উত্তরে সোহেল বলেন, ‘আসবো’। অন্যদিকে পাপড়ি যখন রুবেলকে বলেন, ‘তোমার কী এমন কোনো কথা নেই যা শুধু আমাকে বলা যায়।’ এর প্রত্যুত্তরে রুবেল বলেন, ‘আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না!’ আবার সোহেল চোরাকারবারিদের সঙ্গে লড়াই করে পাঁচ লাখ টাকা জিতে নেন। তারপর দুই ভাই-বোন মিলে ভাবতে থাকে কীভাবে এতো টাকা কাজে লাগাবেন? রুবেল বলেন—ব্যবসা করতে হবে, গাড়ি কিনতে হবে, ধার শোধ করতে হবে। অন্যদিকে জুলি বলেন—বাড়ি ঠিক করতে হবে, বিয়ের বাজেট করতে হবে। সহজেই চিন্তার বিস্তর ফারাকটি চোখে পড়ে। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্ তাই বলেছিলেন, ‘...এবং আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি একথা স্বীকার ক’রে যে হয়তো প্রকৃতিই পুরুষ ও নারীর মধ্যে সৃষ্টি করেছে বড়ো বিভেদ, নয়তো পৃথিবীতে এ-পর্যন্ত যে-সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে, তা খুবই পক্ষপাতপূর্ণ।’১৪ তিনি শুধু এটাই বলেননি, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন এই বিভেদ, অসাম্য মানুষের তৈরি। কারণ অসাম্য, বৈষম্য যতো বেশি হবে পদদলিত-অধীনস্ত-শোষণ ততোটাই হবে সহজ।
লড়াকুতে (১৯৮৬) পাপড়ির মামার মুখে শুনতে পাই, ‘মেয়ে হয়ে জন্মেছিস, পরের ঘরে যেতেই হবে।’ তার মানে মেয়েদের জন্মই হয়েছে পরের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। আর এজন্য জুলি পাপড়িকে বলেন, ‘একটু খাতির-যত্ন কর, কপালে থাকলে একদিন গলায় ঝুলে যেতেও পারে!’ তার মানে পুরুষেরা ছুটবে সাফল্যের পিছে আর মেয়েরা পুরুষের। এবারেও সেই ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্-এর কথা, ছোটোবেলা থেকেই নারীকে নারী হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। তাই বিয়ের বাজারে জুলির মতো মেয়ের জুড়ি নেই। কারণ একে তো জুলি সেবাপরায়ণ তার ওপর ‘সতেজ’, ব্যবসার ভাষায় যাকে বলে ‘ইনট্যাক্ট’ (intact)। আর এজন্যই বুঝি ডিভোর্স বা বিধবা মেয়েদের বিকেলের সবজির মতোই দাম। তাই সোহেল বলেছিলেন, ‘বন্ধুত্ব করতে হলে বিদেশি আর যদি বিয়ে করতে হয় তাহলে স্বদেশিনী খাঁটি বাঙালি’ (পতিসেবা, গৃহপরিচারিকা, সন্তান লালন-পালনকারী)। কেনো, বিদেশি মেয়েরা তথাকথিত মেয়েসুলভ নয় বলে; তাদেরকে দমিয়ে রাখা যাবে না বলে; নিজের মতো নির্মাণ করা যাবে না বলে?
সারেন্ডার-এ (১৯৮৭) সীমাকে জসিম কীভাবে সাজায় একটু দেখি, সীমা আর জসিম পার্কের পুকুর পাড়ে বসে বাদাম খান। একপর্যায়ে জসিম বাদামের খোসা সীমার মুখে ফুঁ দিয়ে ছড়িয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘আমি কষ্ট করে খোসাগুলো ছাড়িয়ে দিলাম।’ নায়ক বলেন, ‘আর আমি বাদামের রঙিন খোসাগুলো দিয়ে তোমাকে সাজালাম, অপরূপা।’ পুরুষরা তাহলে সবসময় খোসা ছাড়িয়ে দেওয়া বাদাম খেয়েই অভ্যস্ত। একটু অন্যভাবে দেখি, সন্তান লালন-পালন করবে তুমি মানে মা, আর অভিভাবক হওয়ার কৃতিত্ব আমার মানে বাবার। সারেন্ডার-এ দেখি রনি মানে সীমার ছেলের অবস্থা গুরুতর হলে চিকিৎসক ছেলের বাবার অনুপস্থিতিতে তার মায়ের অভিভাবককে খোঁজেন। ছেলেকে এতো বড়ো করলেও অভিভাবক হতে পারেননি সীমা; কেবল বাদামের খোসা ছড়িয়ে খাবার উপযুক্ত করে দিয়েছেন! এক দৃশ্যে সীমাকে দেখিয়ে জসিমের বন্ধুরা বলেন ‘ফার্স্ট ক্লাস রেজাল্ট, ফার্স্ট ক্লাস লেডি দোস্ত—একসাথে দুটো কব্জা করেছিস।’ প্রশ্ন জাগে, নারী তাহলে কব্জা করার বিষয়!
“সুকঠিন গার্হস্থ্য ব্যাপার
সুশৃঙ্খলে কে পারে চালাতে?
রাজ্যশাসনের রীতি নীতি
সূক্ষ্মভাবে রয়েছে ইহাতে।”
‘স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্যপ্রস্থ (সেলাই করিবার জন্য) মাপেন। স্বামী যখন কল্পনা-সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহনক্ষত্রমালাবেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ড ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাউল ডাল ওজন করেন এবং রাধুনীর গতি নির্ণয় করেন।’১৫ রোকেয়ার এই আদর্শহীন জীবনই এখনও চলচ্চিত্রের নারীর ‘আদর্শ জীবন’। বাংলা চলচ্চিত্রে ১৯৮৬-তে লড়াকুর মধ্য দিয়ে যে অ্যাকশনধর্মী ধারার প্রসার ঘটলো সেখানেও নারীর চিন্তার রদবদল হলো না। মারপিট সর্বস্ব এই নতুন ধারার কেন্দ্রে কে রইলো? সেই পুরুষ। যে সবকিছু আদায় করে লড়াই করে। নতুনের স্বাদ কেবল পুরুষেরই। তাহলে এই নতুন ধারায় নারীর উপস্থাপনে নতুনত্ব কোথায়? যেখানে পুরুষের ক্ষমতার সমান্তরালে নারীর উপস্থাপন হওয়া উচিত, সেখানে তা না হয়ে বরং নারীর উপস্থাপন ভয়াবহ রকমের দাসত্বের/বন্দিত্বের। তাই ১০ বছর পরে দেখা হয়ে সোহেল আর রুবেল যখন ব্যবসার কথা বলেন, তখন জুলি আর সোহেলের মা ব্যস্ত হন স্মৃতি রোমন্থনে। এগিয়ে যাওয়া নয়, সুন্দর দিনের স্মৃতি হয়তো জুলি আর সোহেলের মা’র সম্বল। আবার অন্যদিকে সোহেল ও রুবেলের প্রেমিকা জুলি আর পাপড়িকে দেখি শুধুই চা বানাতে আর পছন্দের মানুষকে নিয়ে কল্পনার রাজ্যে ডুবে থাকতে।
সারেন্ডার-এও দেখি একই চিত্র। সীমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন সেই সংসার-অতিথি আপ্যায়ন আর সন্তান লালন-পালন নিয়ে। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্ (অ্যা ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইট্স অব ওম্যান : উইথ স্ট্রিকর্চাস অন পলিটিকেল অ্যান্ড মোরাল সাবজেক্টস্) নারী অধিকার আদায়ের জন্য ১৭৯২ সালে সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলেছেন। কারণ যে শক্তি নারীকে শোষণ করছে সে অধিকাংশ পুরুষকে করছে। তাই তারা যেভাবে নারীকে ভিন্ন করে উপস্থাপন করছে সেভাবেই নির্মিত হচ্ছে তাদের অবস্থান। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রে কতো ধারা এলো গেলো, নারী পড়ে রইলো রোকেয়ার ওই রন্ধনশালায়। মনে পড়ে হেগেলের সেই চিরাচরিত বাণী, সবকিছু পরিবর্তনশীল, কেবল নারীরই কোনো মৌলিক পরিবর্তন নেই!
গোধূলি বচন
পৃথিবী জুড়ে নারী তার শ্রমকে বিস্তৃত করেছে অন্দরমহল থেকে বাহিরে, এটা যেমন ঠিক। বিপরীতে পুরুষও কিন্তু ঠিকই ধরে রেখেছে বাহিরের জগতে বিচরণও কেবল তারই। তাইতো ১৯৩১ থেকে ৫৬ হয়ে ৮০ দশকের চলচ্চিত্রে নারী, এমনকি আজকের নারীরও চিত্রায়ণে হেরফের হয় না একচুল। তাহলে ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমরা (আমি) কেমন করে?’ উত্তর অবশ্যই আছে; কেনো, যেমন করে খাঁচাটি তৈরি ঠিক তেমন করেই। মার্কসবাদে আছে ‘ম্যানিপুলেশন’, বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘স্বার্থগত সঞ্চালন’। আপনাকে-আমাকে সেই স্বার্থগত সঞ্চালন বুঝতে, স্বার্থগতভাবে নিজেকে সঞ্চালিত করতে জানতে হবে। নইলে ‘সোনার সেই অদৃশ্য খাঁচা’ কিন্তু ভাঙবে না। ভাঙার হাতিয়ারে নিজের স্বার্থগত সঞ্চালনে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যেমন লাগবে, একই সঙ্গে ঠিক করতে হবে চারপাশের অন্য সব অনুষঙ্গও। সর্বোপরি প্রমাণ করতে হবে নারী শুধু তার লৈঙ্গিক পরিচয় বৈ আর কিছু নয়; নারী রবী ঠাকুরের অর্ধেক কল্পনা নয়, পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
লেখক : রুম্পা রায় ও হালিমা খুশি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। হালিমা খুশি লেখালেখির পাশাপাশি নিয়মিত গান ও বিতর্ক করেন।
brattomcj@gmail.com
khushimcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. শেরি বি আর্টনার, উদ্ধৃত; মজিদ, ইমরান; ‘নারীবাদী চলচ্চিত্র ভাবনা ও জনপ্রিয় ধারার বাংলা চলচ্চিত্র’; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল; সম্পাদনা—কামরুন নাহার; বর্ষ—৪, সংখ্যা—৪, জুন—২০১১, পৃষ্ঠা—১৭, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ঢাকা।
২. রিচার্ড ডায়ার ও জিনেট ভিনসেনদু, উদ্ধৃত; নাসরীন, গীতি আরা ও ফাহমিদুল হক (২০০৮ : ১৯—২০); ‘ওয়াইড এ্যাঙ্গেল : জনসংস্কৃতি হিসেবে চলচ্চিত্র’; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প, সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. পিয়ের বর্দু, উদ্ধৃত; নাসরীন, গীতি আরা ও ফাহমিদুল হক (২০০৮ : ২০); ‘ওয়াইড এ্যাঙ্গেল : জনসংস্কৃতি হিসেবে চলচ্চিত্র’; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প, সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।
৪. আলমগীর কবির, উদ্ধৃত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ১১৯); ‘প্রথম সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্যরে ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’’; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৫. সামিরা মাখমালবাফ, উদ্ধৃত; ইসলাম, উদিসা (২০১২ : ১২৮); ‘সিনেমায় আমার পুনর্জন্ম হয়েছে’; ইরানী চলচ্চিত্র : ১০ নারী নির্মাতা; ভাষাচিত্র, ঢাকা।
৬. গায়েন, কাবেরী (২০১৩ : ২৯); ‘‘সত্য’ নির্মাণ করে কে?’; মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে নারী-নির্মাণ; বেঙ্গল পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
৭. ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস, উদ্ধৃত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৮ : ২৩৩); ‘বিয়ে ও সংসার’; নারী; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৮. মিশলে, উদ্ধৃত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৮ : ২৩); ‘নারী, ও তার বিধাতা : পুরুষ’; নারী; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৯. প্রাগুক্ত; গায়েন, কাবেরী (২০১৩ : ১৭)।
১০. প্রাগুক্ত; ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস, উদ্ধৃত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৮ : ২৩৩)।
১১. জাঁ-জাক রুশো, উদ্ধৃত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৮ : ৯৮); ‘নারীর শত্রুমিত্র : রুশো, রাসকিন, রবীন্দ্রনাথ এবং জন স্টুয়ার্ট মিল’; নারী; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
১২. আজাদ, হুমায়ুন (২০০৮ : ১১২); ‘নারীর শত্রুমিত্র : রুশো, রাসকিন, রবীন্দ্রনাথ এবং জন স্টুয়ার্ট মিল’; নারী; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
১৩. রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, উদ্ধৃত; মুরশিদ, গোলাম (২০১৩ : ১৮৯); ‘প্রথম নারীবাদী : রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’; নারীপ্রগতির একশো বছর : রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া; অবসর প্রকাশনা, ঢাকা।
১৪. মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্, উদ্ধৃত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৮ : ২৬৪); ‘মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্ : অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু’; নারী; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
১৫. প্রাগুক্ত; রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, উদ্ধৃত; মুরশিদ, গোলাম (২০১৩ : ১৮৮)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন