Magic Lanthon

               

হাইফা আল-মনসুর

প্রকাশিত ০৪ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

হাইফার আওয়াজ শোনা যায়

হাইফা আল-মনসুর

রাস্তার একপাশে শুটিং ইউনিট প্রস্তুত। ক্যামেরা, অভিনেতা ও অন্যান্য কলা-কৌশলীরা নিজেদের কাজ নিয়ে পুরো ব্যস্ত। যথারীতি শুটিংও শুরু হয়, কিন্তু পরিচালক মানে ডিরেক্টরস-মিডিয়ার ডিরেক্টর কোথায়? কোনো এক গায়েবি আওয়াজে একের পরে এক ক্লান্তিহীন শট্ নেওয়া চলে। কারো কাজে যেনো ক্ষান্তি নেই। খেয়াল করে শোনা গেলো, একটু দূরে কোথা থেকে যেনো অ্যাকশন, কাট্ শব্দগুলো মৃদু আসছে। শব্দের উৎসের সন্ধান করতে গিয়ে, কে জানতো এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এতো সাসপেন্স! রাস্তার ওপাশে কাভার্ড ভ্যানের ভিতর থেকে ওয়াকিটকি হাতে কথাগুলো বলছেন বোরকা পরা এক নারী। আবারো আওয়াজ লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন।

শুটিংকাব্যটি নিয়ে শুটিং হলেই ভালো হতো। দর্শক অন্তত রূপকথার গল্প মনে করে মজা পেতো! কিন্তু তা না হয়ে সেটা একটা কাল, একটা সময়ের দুর্দান্ত নথি হয়ে থাকলো ইতিহাসে। এটা সেই দেশের ইতিহাসের নথিযে দেশে কাভার্ড ভ্যানে থাকা ওই নারী পরিচালকের সমগোত্রীয়রা এখনো নিজ পিতা-ভাই দ্বারা চরমভাবে অবহেলিত-ঘৃণিত, স্বামীদের হাতে নিগৃহীত। সেখানকার নারীরা একা বৈধ পথে নিজ দেশের সীমানা অতিক্রম করলে তার পুরুষ অভিভাবকদের (বাবা-স্বামী-ছেলে) কাছে সতর্ক বার্তা আসে। সে দেশে ভোরের আলো, দুরন্ত আকাশ, দস্যিপনা সবকিছুই কেবল পুরুষের জন্য। ভয়ঙ্কর লৈঙ্গিক বৈষম্যের সৌদি সমাজে এ শুটিংকাব্যটির রচয়িতা হাইফা। পুরো নাম হাইফা আল-মনসুর। তাকে মজা করে ওয়াকিটকি শুটিং-এর উদ্ভাবকও বলা যেতে পারে।

সবসময় নিজের চেনা, জানা, দেখা চারপাশের গল্পটাই বলতে চেয়েছিলেন হাইফা। সর্বশেষ গল্পটা বলার জন্য কাজ করেছেন দীর্ঘ পাঁচ বছর। এ হয় তো ও হয় না, তবে শেষ পর্যন্ত গল্প তিনি বলেই ছেড়েছেন। সে গল্প কিশোরী ওয়াজদার। আর ওয়াজদার ওয়াজদা বানাতে গিয়ে হাইফা কীভাবে যেনো বানিয়ে ফেলেছেন সৌদির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র; আর নিজের নামের সঙ্গে যোগ করেছেন প্রথম নারী পরিচালকের খেতাব। তবে ওয়াজদাতে ওয়াজদার স্বপ্ন পূরণে যতো কষ্ট হয়েছে, তার ঢের বেশি কষ্ট পোহাতে হয়েছে হাইফাকে তার ওয়াজদা নির্মাণের স্বপ্ন পূরণ করতে।

 

হাইফার বয়ান

সৌদিতে অহেতুক চলচ্চিত্র নিয়ে কারো আগ্রহ দেখাবার কারণও দেখি না আমি, সম্ভবত সৌভাগ্যক্রমেই আমার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটে। জন্মেছিলাম সৌদির পূর্বাঞ্চলের আল-হাসা শহরে। তবে আমার জন্য তা জন্মেই দেখি রুদ্ধ স্বদেশভূমির মতো ছিলো না। কী করে যেনো পরিবারের সবারই বেশ শিল্প-সাহিত্যে একটা ঝোঁক ছিলো; ধর্ম নিয়েও বাড়াবাড়ি একেবারেই ছিলো না কারো। সেই জন্মভিটার কথা নাকি এখনো ভুলতে পারেন না হাইফা। ১২ ভাই-বোনের বিশাল পরিবারে তিনি ছিলেন অষ্টম।

ছোটোবেলায় আমরা মানে ভাই-বোনেরা খুব মজা করতাম, এই যেরকম হয় আর কী, সবাই মিলে বাচ্চাদের সিনেমা দেখা, কখনো কখনো বড়োদেরটাও আমরা দেখতাম। এসব সিনেমা জোগাড়ের ব্যাপারটা অনেকটা বজ্র আটুঁনি ফসকা গেরোর মতো ছিলো; উপরে দেশজুড়ে সিনেমা নিষিদ্ধ কিন্তু তলে তলে ভিডিও দোকানে হাতের নাগালে পাওয়া যেতো সব। সেসময় সবকিছু বাদ দিয়ে জ্যাকি চ্যান-এ আমাদের খুব আগ্রহ ছিলো। বলতে পারেনসে ছিলো আমাদের স্বপ্নের নায়ক। যেই না সিনেমা দেখা শেষ, সেই ঢুসুম-ঢুসুম মারামারি শুরু। সে কী ফাইটিং ছিলো আমাদের!

ফাইটিংয়ের মতোই হাইফারা নাকি আর একটা কাজ করতো, তর্কযুদ্ধ। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে সে কী তর্ক। সত্যি বলছি, তর্ক দেখে কেউ ভাবতেই পারবে নাএরপর আমরা সবাই মিলে এক বেডে শোয়া কিংবা এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতে পারি! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মতবিরোধ হলেও আমাদের একে অপরের বোঝাপড়াটা ছিলো দুর্দান্ত। তাই ভলতেয়ারের গণতন্ত্র প্র্যাকটিস ভালোই জমতো।

আমার মা ছিলেন একেবারেই অন্যরকম। হঠাৎ মনে হতো অন্য হাওয়ায় গড়া একজন। আর সেটা হওয়ার কারণও ছিলো। আমার মায়ের ঠিক নিজের না, এক চাচাতো বোন নাকি সেই ১৯৯১ সালে রাজধানী রিয়াদে কার  (Car) চালানোর জন্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ভাবুন কী সাহস! একই অপরাধে সেসময় খালার সঙ্গে আরো গ্রেপ্তার হন ৪৬ জন নারী। হাজার হলেও আমার মা তো সেই রক্তেরই, বুঝতেই পারছেন। দুদশক আগে রাস্তায় মেয়েদের বের হওয়াই যখন সমস্যা, তখন আমার খালা কার চালাচ্ছেন! একেবারে জ্যাকি চ্যানের ফ্লাইং কিক্ বলতে পারেন।

অন্যদিকে হাইফার বাবা আবদুল মনসুরের কবি হিসেবে বেশ খ্যাতি ছিলো। তিনি আইনব্যবসাও করতেন। বাবা অবশ্য আমার সফলতাটা দেখে যেতে পারেননি। কবছর আগে চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। এই আফসোসটা আমার থেকেই যাবে বাকি জীবন। কারণ ছোটোবেলায় তার সঙ্গে সিনেমা দেখতে দেখতে কখন যেনো তিনি আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন সিনেমাটা, তা নির্মাণের ইচ্ছেটাও। পরে অবশ্য বড়ো হয়ে এইটা বুঝেছিলাম পরিষ্কার। আর একটা কাজ বাবা-মা দুজনে মিলেই আমাদের জন্য করতেন, সেটা হলো আমাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা। এজন্যই হয়তো সামগ্রিক বিবেচনায় একটা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও আমার স্কুলের অন্য সহপাঠীদের মতো শৈশব পেরিয়েই আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়নি।

একে একে সব পাস করে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আসে হাইফার। এবার সবাইকে ছেড়ে দূর দেশে যেতে হয় তাকে। অবশ্য উৎসাহটা ছিলো আমার পরিবারের সবার। তখন আমার বয়স কতো হবে, ১৮-১৯। একদিন সবকিছু গুছিয়ে পাড়ি জমালাম কায়রোতে, ভর্তি হলাম সেখানকার আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে। অবশ্য সেটা ছিলো একটু অন্যরকম পরিবেশ। সেখানে আর যাই হোক নারীদের ওপরে অতোটা খড়গ ছিলো না। খালার কথা মনে হয় অবচেতনেই মাথায় ছিলো; সেখানে গিয়েই আমি একটা লাল রঙের পুরনো হুন্দাই গাড়ি কিনি। তারপর ড্রাইভিং। সে দিনগুলোর কথা বলবার নয়! এখনো মনে হলে অদ্ভুত একটা শিহরণ জাগে মনে।

একসময় ওই দিনও ফুরিয়ে আসে। পরিবারের ইচ্ছায় সাহিত্যে শেষ করি আমার স্নাতক। মাথায় আগে থেকেই সিনেমাটা ছিলো, তার ওপর সাহিত্যের ভূত; দুইয়ে মিলে তখন একাকার অবস্থা। সাহিত্যের কল্পনা, সেলুলয়েডে রূপকল্প হতে থাকে সময়ে অসময়ে। তবে এর মধ্যে আর একটা কাজ অবশ্য করেছিলেন হাইফা। দেশে ফিরে একটা নামকরা তেল কোম্পানিতে কাজ নিয়েছিলেন জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে। চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনার ঝোঁকটা আর মাথা থেকে নামাতে পারছিলাম না আমি। তারপর সোজা চলে গেলাম অস্ট্রেলিয়া। সেখানে সিডনি ফিল্ম স্কুলে শুরু হলো আমার নতুন জীবন, টালমাটাল স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন। সেই টালমাটাল স্বপ্নের শক্ত ভিতটা হাইফা দাঁড় করান ওয়াজদায় (২০১২) এসে।

 

২.

সিডনিতে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোনিবেশ করেন হাইফা। একে একে হু, দ্য বিটার জার্নি, দ্য অনলি ওয়ে আউটওম্যান উইদাউট শ্যাডোস নির্মাণ করেন। এর মধ্যে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হুর (২০০৩) উপজীব্য বিষয় ছিলো নারীদের ওপর নির্যাতন। সাত মিনিট ব্যাপ্তির এই চলচ্চিত্রটিতে আমি একজন পুরুষ সিরিয়াল কিলারকে দেখিয়েছি, যার কাজ হলো নেকাবধারী নারীদেরকে হত্যা করা। হু রিলিজের পরে অনেকেই আমাকে গালিগালাজ করে মেইল করতে থাকে। অনেকে বললো, আমি নাকি নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নই, আমি নাকি ধার্মিক না। অথচ এটা কিন্তু মোটেও সত্য নয়।

বছর দুয়েক পর নেকাব নিয়ে আমি ওম্যান উইদাউট শ্যাডোস নামে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করি। প্রামাণ্যচিত্রটির একটি সাক্ষাৎকারে শেখ আয়েদ আল-কারনি নামের একজন ধর্মীয় নেতা বলেন, ইসলামে এমন কোনো আইন নেই যে নারীদের নেকাব পরতেই হবে। বিষয়টি খুব আলোচিত-সমালোচিত হয়। বিভিন্ন উৎসবে চলচ্চিত্রটি প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়। কিন্তু পরে আল-কারনি প্রামাণ্যচিত্রে দেওয়া তার এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। আমি তখন কিছুটা সমস্যায় পড়ি। সত্যি বলতে কি, আল-কারনির এ আচরণ দেখে আমার মনে হয়েছিলো তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

এ সময় একধরনের সমস্যা হচ্ছিলো, যেগুলো সরাসরি প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। এই যেমন ধরেন খারাপ-খারাপ কথা লিখে আমাকে একটা মেইল করলো; কখনো কখনো মৃত্যুর হুমকি দিয়েও মেইল আসতে থাকলো। এ নিয়ে উত্তেজিত কিংবা টেনশন করে আর কী করবো বলুন, তাই আক্রমণাত্মক না হয়ে নম্র হও কৌশল নিয়েছিলাম। তবে এটা ঠিক, আমি কিন্তু তেমন কোনো বাড়াবাড়ি একেবারেই করিনি; এমনকি সৌদির নাগরিক হিসেবেও নয় বরং একজন বহিরাগত হিসেবে আমি প্রচলিত রীতি-নীতি মেনেই সেখানে কাজ করতে চেয়েছি, ওখানকার মানুষগুলোকে একটা আওয়াজ দিতে চেয়েছি।

 

৩.

পাঠশালায় যাওয়ার পথে কিশোরী ওয়াজদার মন পড়ে থাকতো প্রশস্ত রাস্তার চলন্ত সাইকেলে। বাধ সাধলেন মা, কোনোমতেই সাইকেল কিনে দিতে রাজি হলেন না। কিন্তু ওয়াজদার মাথায় তখন খালি বাইসাইকেল ঘোরে। অনিয়ন্ত্রিত আবেগী মন দোকানে যায়, সাইকেলের দাম শোনে, বিমর্ষ হয়ে ফিরেও আসে। শুরু হয় ছোটোমানুষের ছোটো ছোটো চেষ্টা, উদ্দেশ্য সাইকেলের জন্য টাকা। পাঠশালায় সহপাঠীদের কাছে ব্রেসলেট বিক্রি; একজনের চিঠি আরেকজনের কাছে পৌঁছানো; কিন্তু সব মিলে টাকার হিসাব আর এগোয় না। হঠাৎ চলে আসে একটা সুযোগ, কোরআন পাঠ প্রতিযোগিতা। অংশ নিয়ে ওয়াজদা পুরস্কার হিসেবে কিছু রিয়াল জিতে নেয়। আর ততোদিনে ওয়াজদা অবশ্য গোপনে শিখে নিয়েছে সাইকেল চালানোটা। তারপর একদিন সেই স্বপ্নের সবুজ সাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামে সে। এই সাদামাটা গল্প নিয়ে ওয়াজদার কাহিনী।

চলচ্চিত্রটি আত্মজীবনীমূলক কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে, হ্যাঁ আবার নাদুটোই বলেন হাইফা। অবশ্য এ প্রশ্ন নাকি অনেকেই করেছে তাকে। ওয়াজদার কাহিনী মূলত আমার ভাতিজির, ওর বাবা বেশ রক্ষণশীল। তবে এটাও ঠিকএ গল্প যে একেবারে আমার নয়, এমনটিও নয়। আমার স্কুলের অন্য সহপাঠীদের এমন স্বপ্ন আমি কাছ থেকে দেখেছি, একই সঙ্গে দেখেছি তাদের স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্টও।

আমি সেই সাধারণ গল্প, আমার নিজের দেশের গল্প বলতে চেয়েছি। আমি জানি না সেটা পেরেছি কি না? তবে এটা নিশ্চয় সমাজকে একটা বড়ো বার্তা দেওয়ার চেষ্টা ছিলো। এই দেশটার অনেক মেয়েই ওয়াজদার মতো বড়ো স্বপ্ন দেখে। তারা দৃঢ়প্রত্যয়ী, সম্ভাবনাময়ী অনেকটা ওয়াজদার মতোই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওয়াজদার মতো তাদের কষ্টের পথ আর শেষ হয় না।

 

৪.

চলচ্চিত্র নিয়ে হাইফার স্বপ্নটাও হয়তো শেষ হতো না, যদি না ভিসকন্তি, রোসেলিনি, ডি সিকারা না আসতো। ইতালিতে ৪০-এ সৃষ্ট এ ধারার বোধহয় সর্বশেষ ব্যবহার করলেন হাইফা। এশিয়ায় সত্যজিৎ, ৫০-এ ফ্রান্সে গদার-ত্রুফোরাও একটু ভিন্নভাবে করেছেন এর ব্যবহার। সত্যি বলতে কিদেশ, কালে যখনই চলচ্চিত্র সঙ্কটে পড়েছে তখনই সাথি হয়েছে ভিসকন্তিরা। 


হাইফার কাছে বাইসাইকেল নাকি অনেক কিছুর প্রতিনিধি। এই চলাফেরার কথাই ধরুন, সে কী স্বাধীনতা! পাশ্চাত্যে তো বাইসাইকেলের ব্যবহার নারীদের পোশাকই পাল্টে দিয়েছিলো। আমি মনে করি, সাইকেলের গতি যান্ত্রিকতা থেকে পিছিয়ে থাকলেও এর একটা অসাধারণত্ব আছে। গতির সেই ধীর বৈশিষ্ট্যটাকে আমি ধরতে চেয়েছিলাম। নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝতে পারছেন ওয়াজদার গল্প বলতে যাওয়াটা আমার জন্য মোটেও সুবিধার ছিলো না। ওয়াকিটকি দিয়ে শুট্ করতে গিয়েও আমাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষই সিনেমা বানানোর বিষয়টাকেই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। এই গল্পটা অনেকটাই টম অ্যান্ড জেরির গল্পের মতো। কোনোখানে বাধা পেয়ে আমরা ইউনিট নিয়ে চলে গেছি, আবার ফাঁকা পেয়ে টুপ করে ফিরে এসেছি। কী করবো বলুন, ধারাবাহিকতা তো রাখতে হবে।

আর এই দেশে কাজ করতে গিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু যে আমি পাবোএমন আশাও অবশ্য করিনি। আরো নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, নারী হওয়ায় আমার আশাটা আরো সঙ্কুচিত ছিলো। কোনো প্রকার উৎসাহ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ অনেক কাজই আমাকে হেসে-খেলে করতে হয়েছে এখানে।

 

৫.

আমি এমন এক কাজ শুরু করেছিলাম যেখানে প্রতি পদে পদে আমাকে সঙ্কুল পথ অতিক্রম করতে হচ্ছিলো। অভিনেত্রী খুঁজতে গিয়ে আমাকে পড়তে হলো আরেক ফ্যাঁকড়ায়। আমি চাচ্ছিলাম সৌদির কেউ এখানে কাজ করুক। কিন্তু ওই যে বললাম ফ্যাঁকড়া, অভিনেত্রী পেলেও তাদের পরিবার আর রাজি হচ্ছিলো না। অনেকে তো এমন কথা বললো, যদি তার মেয়ে বা আত্মীয় অভিনয় করেতাহলে তারা তার সঙ্গে সম্পর্কই ছিন্ন করবে। তার পরও দুর্দান্ত সাহসী কয়েকজন এগিয়ে এসেছিলো, আমি তাদের সালাম জানাই।

নাম ভূমিকা বা ওয়াজদার জন্য আমি অনেকগুলো মেয়ের অডিশন নিই। কিন্তু আমি ঠিক যে মুখটা খুঁজছিলাম মানে সেই হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও সরল প্রকৃতির কেউ মিলছিলো না। ভাবুন, বহু কষ্টে সব ঠিকঠাক করেছি, দিন চলে যাচ্ছে, এদিকে আমার দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। এরপর হঠাৎ-ই একটা মেয়ের সন্ধান পেলাম। সে নাকি জাস্টিন বিবার-এর (কানাডিয়ান পপ গায়ক ও অভিনেতা) গানের ভক্ত, ৮০ দশকের ফ্যাশনে জার্সি-হাই টপ্স পরে, আর যেমনটি চেয়েছিলাম কার্লি চুল। ১১ বছর বয়সী ওয়াদ মোহাম্মেদ (Waad Mohammed) নামের সেই শিশুটির বাস ছিলো রাজধানী রিয়াদে।

মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল পরিবারের ওয়াদকে তারা অভিনয়ের সম্মতি দিলো। প্রথমে আমি খানিকটা আশ্চর্যই হই, কিন্তু পরে তার পরিবারের যুক্তি শুনে অন্তত শঙ্কিত হয়নি। পরিবারের কথা, ওয়াদ তো এখনো নারীই হয়ে ওঠেনি, ১৬ বছর পর্যন্ত চাইলে সে অভিনয় করতেই পারে। তখন আমি চরম এক্সাইটেড ওয়াদকে নিয়ে, মনে মনে ভয়ও পাচ্ছিলাম; ওয়াদ-এর মধ্যে কেমন যেনো একটা বিদ্রোহী-বিদ্রোহী ভাব রয়েছে; শেষ পর্যন্ত যদি বেঁকে বসে। কিন্তু ও যেদিন প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালো, সেদিনই আমার সব সংশয় কেটে গেলো।

 

৬.

ভাবুন চলচ্চিত্রই নেই, সেখানে প্রযোজক পাবেন কোথায়! তার পরও অনেক কাঠখড় পুড়ে অর্থ লগ্নিকারী একজনকে পেলাম, সে এক রাজপুত্তুর। কিন্তু ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম তা নয়, সৌদির সাত হাজার প্রিন্সের মধ্যে আসলেই আল-ওয়ালিদ বিন তালাল একেবারেই অন্যরকম। বেশকিছু কারণে বেশ আলোচিতও বটে। প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিন একবার করলো কী-তালালের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করলো; তালাল তো ক্ষেপে খুন। কী হয়েছে, কী হয়েছে-পরে জানা গেলো যে পরিমাণ সম্পদ তালালের আছে ফোর্বস তার চেয়ে কম সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছে। ফোর্বস তালালের সম্পদের পরিমাণ ১৩৪০ কোটি পাউন্ড বললেও তার দাবি অনুযায়ী এই পরিমাণ নাকি দুই হাজার কোটি পাউন্ড। আর বিলাসবহুল লেভিশ জেট সিরিজের (বিশেষ ধরনের বিমান, যেখানে কনসার্ট হল, তুর্কিশ বাথ ও রোল্স-রয়েস গাড়ি রাখার একটি গ্যারেজ আছে) একটি বিমান লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছে আট কোটি পাউন্ডে বিক্রি করেও তালাল আলোচনায় চলে এসেছিলেন। এছাড়া অ্যাপল, টুইটার ও নিউজ কর্পোরেশনে তার বড়ো ধরনের অংশীদারিত্ব তো রয়েছেই।

দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ রাজপুত্রদের মধ্যে তালাল অন্যতম। নারীর অধিকার নিয়েও তালালের চিন্তা অনেক বেশি আধুনিক। তার কর্মচারীদের দুই-তৃতীয়াংশই নারী, যার মধ্যে দেশের প্রথম নারী পাইলটও রয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, এসব নারীদের তালাল সবসময় নেকাব বাদ দিতে উৎসাহ জুগিয়ে থাকেন। তার স্ত্রী আমিরাহ অবশ্য নেকাব পরেন না, বেশ গ্ল্যামারও আছে তার। সিএনএনসহ পশ্চিমা বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে সৌদি নারীদের অধিকার ইস্যুতে তিনি বেশ সরব।

 

৭.

প্রযোজক পাওয়াসহ নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ওয়াজদা আলোর মুখ দেখে ২০১২ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানেই ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। এরপর আরো ছয়টি উৎসব ও নয়টি দেশে চলচ্চিত্রটি দেখানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮৬তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতে পাঠানো হয়েছে ওয়াজদা। তবে আমার দুঃখ একটাই, মাতৃভূমি সৌদি আরবেই এখনও ওয়াজদা মুক্তি দিতে পারিনি। কিন্তু ভালো লেগেছে, যখন দেখেছি শুধু চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য অনেক আরবিয় পার্শ্ববর্তী দোহা ও দুবাইয়ের প্রদর্শনীতে গেছে।

ওয়াজদায় নিখুঁতভাবে সৌদি জীবনচিত্র উপস্থাপন দেখে আমার বোনেরা তো বিস্মিত। আমার যে বোনটি নেকাব পরে, সেও আমাকে তার ভালো লাগার কথা বলেছে। ও আমার উদ্দিষ্ট দর্শকও বটে। কারণ আমি জানি, সে শিক্ষিত হলেও যথেষ্ট রক্ষণশীল; তাই সত্যিকার অর্থেই ও ওর জীবনকে চলচ্চিত্রে খুঁজে পেয়েছিলো। আমার মনে হয়, অধিকাংশ আমজনতাই চলচ্চিত্রটি উপভোগ করবেন। আমি এও আশা করি, একটা সময় সৌদি টেলিভিশন চ্যানেলে চলচ্চিত্রটি দেখানো হবে।

 

৮.

তবে সৌদি সমাজের পরিবর্তন যে হচ্ছে না এমনটাও নয়, কিছু ইতিবাচক আভাস আমাকে অনুপ্রাণিত করছে। এখন ৭৫ শতাংশ সৌদি নাগরিক যাদের বয়স ৩০-এর নিচে, তারা ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে। পাশাপাশি এক লাখ শিক্ষার্থীর বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ হয়েছে বাদশাহ আব্দুলাহ্র বৃত্তির কল্যাণে। আরো সম্ভাবনার কথা হলো, বিভিন্ন বিষয়ে বাদশাহকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য এ বছরের (২০১৩) জানুয়ারিতে ৩০ জন নারীকে শুরা কাউন্সিলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৭ জনই পিএইচডি ডিগ্রিধারী। আসন্ন ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনে নারীরা প্রার্থীতা ও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। মনে রাখতে হবে, এই অর্জনগুলোই ধীরে ধীরে সংগ্রাম-আন্দোলনের রূপ নেবে। আর আরো আশার কথা হলো, কাকতালীয় হলেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নারীদেরকে জনসম্মুখে সাইকেল চালানোর অনুমতি দিয়েছে সরকার।

তবে আশাহত হওয়ার যে একেবারে কিছু নেই তা নয়, সম্প্রতি রাজ-রাজারা সৌদি টুইটার ব্যবহারকারীদের ওপর একটু ক্ষেপেছেন; সেন্সর ও নজরদারির সুযোগ না দিলে স্কাইপি, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারকে বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছে।

কিন্তু যাই হোক, সবকিছু ছাপিয়ে আমি চাই, আমার মেয়ে নিজস্বতা নিয়ে সৌদিতেই বেড়ে উঠুক, এই দেশের মানুষ নারী হিসেবে তাকে শ্রদ্ধা করুক। আমি জানি, প্রচলিত রীতি-নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করা সহজ এবং এ দিয়ে হয়তো সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। তবে অবস্থা যাই হোক, সৌদি নারীদের সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : রোকন রাকিব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

rakib.2071@gmail.com

 

তথ্য-উপাত্তের খোঁজ

১. http://www.telegraph.co.uk/culture/film/starsandstories/10183258/Haifaa-al-Mansour-I-wanted-to-have-a-voice.html

২. আব্বাস, রানা; ‘হাইফা আল মনসুর : প্রাচ্যের আলোকবর্তিকা’; সমকাল-এর বৃহস্পতিবারের বিনোদন ক্রোড়পত্র ‘নন্দন’, ২৫ জুলাই ২০১৩।

৩. http://www.theguardian.com/film/2013/sep/16/wadjda-oscars-saudi-arabia

৪. http://www.balticaa.com/en/about-us/news-and-press-releases/the-top-10-most-expensive-private-jets/


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন