Magic Lanthon

               

রুবেল পারভেজ

প্রকাশিত ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন : চলচ্চিত্র-ময়দানে যুদ্ধ

রুবেল পারভেজ


তৃষ্ণা ওদের মেটে না তামাম দুনিয়ার ঐশ্বর্যেও

ওরা চায় তাই টাকার পাহাড় তুলতে

ওদেরি জন্যে খুন করো, নিজে খুন হও

ওরা যাতে পারে টাকার পাহাড় তুলতে।

 

খোলাখুলি ওরা বলে না মোটেই

মরা ডালে দেয় ঝুলিয়ে রঙীন লণ্ঠন

মিথ্যাকে ফুলবাবুটি সাজিয়ে বড় রাস্তায় ঘোরায়

চুমকি-বসানো জেল্লার নীচে ল্যাজগুলো রাখে ঢেকে।

 

টাইটেল

এই সেই রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রের প্রকৃত নাগরিক তথা রেড ইন্ডিয়ানরা আজ নিজ দেশেই নির্বাসিত-নির্যাতিত; এই সেই রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রটি পৃথিবীর বুকে প্রথম বিদ্ধ করেছিলো মানববিধ্বংসী আণবিক বোমা; এই সেই রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রটি ঠিক এই মুহূর্তেই কোনো না কোনো দেশের নিরীহ-ক্ষুধার্ত মানুষের বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে আছে; এই সেই রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রটির একচ্ছত্র শাসনের কারণে তাবৎ বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ আজ উদ্বাস্তু-ক্ষুধার্ত। নিজেকে সব রাষ্ট্রের ঈশ্বর বলে স্বয়ং ঘোষিত এই মানবপ্রিয় রাষ্ট্রটির নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য জলে-স্থলে-আকাশে-মহাকাশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে প্রতিনিয়ত সে নিজেকে প্রমাণ করে চলছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। কেননা ন্যায্যতা আর বৈধতা শব্দ দুটি যেনো তাদের কেনা, তাদের হাতে গড়া। এজন্য সে একক আধিপত্য ও মহা-পরাক্রমশালী হয়ে অত্যন্ত ন্যায্যতার সঙ্গে পৃথিবী জুড়ে তার পদযাত্রা করে যাচ্ছে নিশ্চিন্তে সুচারুরূপে।

আসলে বুদ্ধিমান কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর হতেই শুরু হয় এই অঞ্চলে রেড ইন্ডিয়ানদের ওপর অকথ্য নির্যাতন; সেই সঙ্গে শুধু সম্পদ লুণ্ঠনে বনাবনি না হওয়ায় নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে রক্তারক্তি করে ইউরোপিয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি ভাগ হয় দুটি ভাগে। যে লাউ সেই কদু অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে ঘাপটি মারা ঔপনিবেশকারী তথা দখলকারীরাই হয়ে ওঠে এখানকার প্রকৃত নাগরিক। শুধু তাই নয়, যুদ্ধজয়ী এই জার্মান, ইতালি, ব্রিটেন, পর্তুগাল আর স্পেনের মতো ভিনদেশিদের দৈনন্দিন সংস্কৃতিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের চিরন্তন সভ্যতা।

ইতিহাস জানান দেয়, ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর থেকে বিপুল আকারে ইউরোপীয় মানুষ আমেরিকায় আগমন করতে শুরু করে। কিন্তু কলম্বাস যখন আমেরিকার সন্ধান পান তখন বিরাট আমেরিকাভূখ- জনশূন্য কিংবা সভ্যতাবিহীন ছিল না। আমেরিকার নিজস্ব অধিবাসীদের প্রতিষ্ঠিত সেই সভ্যতা ইউরোপীয় অধিবাসীদের আক্রমণ এবং গ্রাসের ফলে আজ বিলুপ্তপ্রায়। ইতিহাসের জাদুঘরে তার কেবলমাত্র কিছু রেশ এবং আভাস দেখা যায়। সভ্যতার হাতে সভ্যতার বিনষ্টির এ একটি বিস্ময়কর এবং আধুনিক দৃষ্টান্ত। আর এভাবেই সভ্যতা বিনষ্টকারী এই রাষ্ট্রটি তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ধ্বংসকারীরূপে নিজেকে তুলে ধরতে লাগলো প্রতিনিয়ত। একপর্যায়ে তাদের ঐকান্তিক ও চিরায়ত শপথের স্লোগানই হয়ে উঠলো মারো, মারো এবং মারো, আর সব লুটেপুটে আনো। এতেই মঙ্গল, এতেই তুমি বিশ্বজিৎ হবে, নতুবা নয়। ব্যস, সেই থেকেই শুরু। তারপর দাসদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, কালোদের ওপর নির্যাতন মানে বর্ণবৈষম্যের ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত হয় এই যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের শরীর। থাক, সে ইতিহাস সবারই জানা। তবে লোকাল পরিসরের এই হামলা গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিকতায় রূপ দিতে বেশি সময় লাগেনি এই যুদ্ধবাজদের। সম্পদে ভরপুর পার্শ্ববর্তী দেশ মেক্সিকো আজ এই রাষ্ট্রটির পেটের মধ্যে। মাদক আর চোরাচালানির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে দেশটিকে তারা করে তুলেছে মাফিয়াদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদোর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, গ্রানাডা, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, কিউবাসহ পুরো অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এই রাষ্ট্রটির আগ্রাসী আক্রমণের শিকার হয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও হারিয়েছে।

তেল সম্পদের বিস্তীর্ণ ভূমি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার প্রায় প্রতিটি দেশেই এই যুক্তরাষ্ট্র তার কর্তৃত্বের ধ্বজা জিইয়ে রেখেছে। এজন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া, লিবিয়া, লেবানন, ইরাক, ইরান, কুয়েতসহ অন্যান্য দেশগুলোতে নানা অজুহাতে ও কৌশলে সতর্ক প্রহরা নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর তারা। যেকোনো মূল্যেই (সোজা কথায় অজুহাতে) এই অবস্থানে থাকার জন্য তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের (গুটি কতক চাটুকার বন্ধু রাষ্ট্র) কাছে যুক্তি তুলে ধরে। কেননা তারা বেশ ভালো করেই জানে, সম্মতি আদায়ের মাধ্যমে কোনোকিছু দখলে রাখতে পারাই হলো, সেসবের পুরোটা ইচ্ছেমতো ভোগের অধিকার আদায় করা। এ লক্ষ্যে তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই ন্যায্যতা, বৈধতা উৎপাদন করতে সচেষ্ট হয়। একদিকে বন্ধুরাষ্ট্রের সামনে সুবিধার মুলা ঝুলানো হয়, আরেকদিকে নতজানু রাষ্ট্রকে ভয় দেখিয়ে সম্মতি আদায় করা হয়। এবং সবচাইতে যে কাজটি তারা করে তাহলো-তাদের শক্তিশালী ও মূলধনসমৃদ্ধ গণমাধ্যমকে মাত্রাতিরিক্ত কাজে লাগিয়ে বিশ্বের তাবৎ মানুষের মনোজগতে তাদের স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর হস্তক্ষেপ করার জোর দাবি তোলে। আর এরই মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণেসমস্যাপীড়িত অঞ্চলে এরা কখনো ত্রাতা আবার কখনো সরাসরি ধ্বংসকারীরূপে আবির্ভূত হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যায়।

দৃশ্যপর্ব-১

ভাবার কোনো কারণ নেই, মার্কিন দেশের কর্তারা অযৌক্তিকভাবে সমস্যাপীড়িত অঞ্চলের মানুষমানবতাকে রক্ষার লক্ষ্যে শুধু যুদ্ধেই লিপ্ত হয়। সেই সঙ্গে তাদের এই মানবতা রক্ষাকারী অভিযানকে শুদ্ধতার সঙ্গে অব্যর্থভাবে সফল করতে আয়োজন করা হয় বিস্তর সব পরিকল্পনার। আর এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হয় যুদ্ধের পক্ষে মিত্র বাড়াতে ব্যাপকভাবে প্রয়োগযোগ্য ও যৌক্তিকভাবে সংহত৩ মতাদর্শ তৈরিতে। যা দিয়ে তাবৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের  প্রকৃত-মালিক অর্থাৎ জনগণকে এই যুদ্ধের পক্ষে আনা যায়। আর কখনো যদি সেসময় হাতে না থাকে, তবে একদিকে চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি আর একদিকে প্রচারণা। বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, এএফপি, এপি, এমটিভিতে চলে জ্ঞানী ও ভদ্দরলোক সম্প্রদায়ের একের পর এক বয়ান। যুদ্ধ শুরু হয়, যুদ্ধ এগিয়ে চলে, ভদ্দরলোক-জ্ঞানী সম্প্রদায়ের যুক্তি বেরোয়, তারা আবার যুক্তি বানায় আর লাড্ডুর মতো তা গিলতেই থাকে জনগণ। তবে যুক্তি শুধু মগজেই ঢুকানো হয় না; চোখের সামনে বিশাল পর্দায় যুদ্ধকে চলচ্চিত্রায়ণ করা হয় তাদের মতো করে। ম্যাকডোনাল্ডসের দামি বার্গার, পপকর্ন মুখে দিয়ে দর্শক হিসেবে তা দেখে নিশ্চিত আপনি কাঁদবেন, মার্কিন সৈন্যদের কষ্টে হবেন সমব্যথী; আর নিশ্চিত হয়ে হা-পিত্যেশ করে বলতে থাকবেন, আহারে কতো কষ্ট করে বউ-বাচ্চা ছেড়ে এই নিরীহ যোদ্ধারা মানুষকে বাঁচাতে এসেছে, মুক্ত করতে এসেছে খোদ ঈশ্বর আর মানবতাকে! 

অন্যান্য মাধ্যমের সঙ্গে চলচ্চিত্রকে আজ এভাবেই যুদ্ধের ময়দানে বন্দুক-বোমার মতোই কাজে লাগানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্র আজ এই ভয়ঙ্কর রক্তপিপাসু সাম্রাজ্যবাদীদের পাপধৌতকরণের অব্যর্থ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। কেননা চলচ্চিত্রের দৃশ্যরূপের প্রভাবন ক্ষমতা এতো বেশি কার্যকরী যে, তাতে শুধু কোনো বিষয়ের উপস্থাপনই থাকে না, সেই সঙ্গে থাকে দর্শক হৃদয়কে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম কৌশল প্রয়োগের সক্রিয় উপযোগিতা। যে কারণে কোটি কোটি ডলার খরচ করে হলিউডে যুক্তরাষ্ট্রের মহান চলচ্চিত্রকাররা আজ যুদ্ধ নিয়ে তৈরি করে চলেছে শত শত ভিজ্যুয়াল ইতিহাস। ফলে শত্রু নিধন ও ভিজ্যুয়াল ইতিহাস নির্মাণ-এই দুই-ই চলে সমান ও সমান্তরালে। যা কিনা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো যুদ্ধতেও তাদের উপস্থিতিকে জায়েজ করতে অসাধারণভাবে কাজে দেয়। তাছাড়া যুদ্ধবাজ মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে হলিউডের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠও বটে। জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য সমরাস্ত্র নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের চল... (এখানে) অনেক আগে থেকে।আর সেই থেকেই আমরা মানে আমজনতা কমবেশি এও জানতে থাকি, মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে গণমাধ্যম মালিকানা বা চলচ্চিত্রে পুঁজি বিনিয়োগ ব্যাপারীদের সম্পর্কের মধুরতা কেমন। আর কেনোইবা যুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্রকে তারা এতো গুরুত্ব ও সতর্কতার সঙ্গে নির্মাণে এগিয়ে আসে।

দৃশ্যপর্ব-২

তবে এটা করেই তারা দায়িত্ব শেষ করে না; ঘাড়ে দিবারাত্রি এই ভূত ভর করে রাখে যে, শত্রুপক্ষ যেকোনো সময়ই তাদের নাগরিকদের ওপর হামলা চালাতে পারে। যে কারণে প্রতিক্ষণ যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তায় (আসলে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য) নতুন নতুন শত্রুর খোঁজে হয়রান। তাছাড়া শত্রুই যদি খুঁজে না পাওয়া যায় তাহলে সে কীভাবে অন্য রাষ্ট্রে প্রবেশের যৌক্তিকতা আদায় করবে। এজন্য তারা ভিন্ন সময়, ভিন্ন পরিস্থিতিতে, ভিন্ন ভিন্ন জাতের সন্ত্রাসীর জন্ম দেয়। কারণ যুদ্ধ তো তাদের চালিয়ে যেতেই হবে।

দৃশ্যপর্ব-৩

আর বর্তমানে বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসা তাদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু কে বা কারা-এমন প্রশ্ন পুরোপুরিই অবান্তর। কেননা মুসলমান আর তাদের পালিত ধর্ম ইসলামই যে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রধান হুমকি ও আশঙ্কার কারণ-তা মোটামুটি পরিষ্কার। প্রতিনিয়ত তারা কি সংবাদে, কি চলচ্চিত্রে অথবা হোয়াইট হাউজের দাপ্তরিক সম্মেলনে সর্বত্রই ইসলাম, সন্ত্রাস, জিহাদ, বোমাবাজ শব্দগুলো একই সঙ্গে লেপ্টে ব্যবহার করে আর প্রমাণ করে মুসলমানরাই এই দুনিয়ার (বিশেষ করে পাশ্চাত্য) জন্য সবচেয়ে বড়ো হুমকি। এমনকি ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে হামলার চাক্ষুষ কোনো প্রমাণ না পেয়েও যখন মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম টেইলর বলেন, হামলা কারা করেছে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নাই। কিন্তু আমার মনে হয়, জঙ্গী মুসলমানরা এতে জড়িত থাকার বিরাট সম্ভাবনা আছে। ফলে এই মনে-হওয়া নামক ভীতিই তাদের তাড়া করে ফেরে দিবানিশি; সঙ্গে মগজে বুদ্ধি পাকাতে থাকে কীভাবে এই মুসলমানদের খতম করা যায়।

এ লক্ষ্যে তাদের একদল মেধাবী ও ধূর্ত পরিকল্পনাকারী দক্ষ নায়কের বেশে হাজির হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান, হলিউড, এফবিআই, সিআইএ, এনএসএসহ আরো অজানাসব সন্ত্রাস সনাক্তকরণ, জব্দ ও নিধনকারী প্রতিষ্ঠান ঐক্যমতের ভিত্তিতে এই মুসলমান সন্ত্রাসবাদীদের নিধনে কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে। বিশেষ করে ৯/১১র হামলার পর তাদের এই শ্রম বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। এজন্য বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই তারা সন্ত্রাসবাদী মুসলমানদের নিধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে যা যা করণীয় সবই ঠিকঠাক করছে। আসলে এই সন্ত্রাসবাদ জিনিসটাই-বা কী আর কেনোইবা সেটি শুধুই মুসলমানদের ঘাড়ে চাপানো হলো; আর মুসলমান জঙ্গিরাই কেনো শুধু তাদের ওপরেই এতো তিক্ত; কী এমন স্বার্থগত কারণে উভয়ের মধ্যে এই পরিস্থিতি, যে কারণে চলচ্চিত্র নামের নবীন শিল্পমাধ্যমটির গুরুকেন্দ্র হলিউডও তাদের (মুসলমান) ওপর এতো ক্ষিপ্ত-সেই প্রশ্নের সন্ধান অত্যন্ত জরুরি।

 

জুম ইন

যিনি আদেশ পালন করে আদেশকারীর মান/স্বার্থ রাখলেন, নুন খেয়ে গুণ গাইলেন, অন্যদিকে যিনি আদেশ পালন করলেন না, বিরোধিতা করলেন, নুন খেয়ে নিমক হারামি করলেন-এই দুইয়ের প্রতি আদেশদাতার একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি কি সম্ভব? এই প্রশ্নে স্বয়ং ব্রহ্মাও নিশ্চিত ছিলেন। তার কথা মান্য করায় দেবতারা যেমন সম্মান পেতেন, বিপরীতে আদেশ অমান্যকারী রাহুও তার কাছ থেকে শাস্তি পেয়েছিলেন। ঠিক যেভাবে আদেশ অমান্য করায় আল্লাহও ফেরেশতাকে শয়তান বানিয়ে দিয়েছিলেন।

বিধাতার ক্ষমতাকে কেউ যদি অগ্রাহ্য করে তাহলে ভালো থেকে মুহূর্তের মধ্যেই তাকে যেভাবে খারাপ বানানো হয়, ঠিক সেই মোতাবেক মনুষ্য জাতির মধ্যেও একই প্রবণতা। যেমনটি আমরা দেখতে পাই বিশ্বমাস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও। তার স্বার্থের বাইরে কাজ করলে তুমি বেঈমান, নাফরমান, রাষ্ট্রদ্রোহী। আর পক্ষে কাজ করতে পারলেই তুমি দেশপ্রেমিক, খাঁটি। তার স্বার্থের জন্য কাউকে হত্যা করলে হত্যাকারী বীর; আর স্বার্থের বাইরে গেলে সেটি সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসবাদ। তার সবচাইতে কাছের বন্ধু এসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। তিনি এবং তদীয় সহকর্মী ক্লেয়ার স্টার্লি এক জায়গায় বলেছেন, যা কিছু পাশ্চাত্য, এসরায়েল, এয়াহুদি-নাসারা ট্রাডিশন বা সভ্যতা এবং মঙ্গলের সঙ্গে শত্রুভাবে আপন্ন তাই সন্ত্রাসবাদ। তাছাড়া এরা জানে, সবসময়ই বলে, যে সকল বিধ্বংসী কার্যকলাপ জনমনে ভীতির উদ্বেগ ঘটায়, ধর্মীয়, রাজনৈতিক অথবা নীতিগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৃত রুচিবিরুদ্ধকাজ, ইচ্ছাপূর্বক সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার বিষয় উপেক্ষা অথবা হুমকি প্রদান করা। আইন বহির্ভূত কার্যকলাপ এবং যুদ্ধকেও সন্ত্রাসবাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কিন্তু সবসময় তত্ত্ব কথা বলা এই যুক্তরাষ্ট্রই আবার তাদের একটি ভবনে হামলা চালানো কিছু অজ্ঞাত হামলাকারীকে ধরতে পুরো আফগানিস্তানে তাণ্ডবলীলা চালিয়ে হাজারো মানুষকে হত্যা করেছে, একে কি আপনি সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আন্দোলন বলবেন?

ক্ষমতার এই সূক্ষ্ম খেলায় মার্কিনিদের কাছে মুসলমান মানেই মৌলবাদী। আর হাস্যকর হলেও সত্য, এই মৌলবাদ ডিসকোর্সটির জনকও তারা। বাংলা ব্যাকরণের সমাস অনুযায়ী মৌলবাদ হলো-মূলের ওপর বিশ্বাস। আমরা সাধারণ মানুষেরা জীবনের মূল বলতে সত্য, সুন্দর, শান্তি, মানবতা, জীবনের জয়গানকে বুঝলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পণ্ডিতদের কাছে তা মোটেও এমন নয়। তাদের চোখে মৌলবাদ এমন এক নীতি, যা স্বার্থ উদ্ধারে জঙ্গিবাদকে বেছে নিতে বাধ্য করে; এবং সেই পথ অবশ্যই ইসলাম ধর্মীয় চেতনা থেকে উদ্ভূত-যা পৃথিবীকে এক নিমিষে ধ্বংস করে ফেলতে পারে! এজন্য তাদের হত্যার পথ জায়েজ করার ছক আঁকে তারা। অর্থাৎ চিরন্তন (মূল) সত্য, সুন্দর আর মানবতার ওপর গড়া বিশ্বাস নয়, মার্কিন দেশের গড়া আইন-নিয়ম-নীতি মানার ওপরই নির্ভর করে মুসলমানরা মৌলবাদী কি না।

যদি মানো তো সমস্যা নেই (এর মানে বুঝতে হবে, সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধ না করে, পিঠে হাত বুলিয়ে দখলে রাখার কৌশল, যেমনটি তারা সৌদি আরব, জর্দান ও তুরস্কের ক্ষেত্রে করে)। আর যদি না মানো তাহলে তুমি মৌলবাদী, সন্ত্রাসী। আবার তাদের ভাষায় এই মৌলবাদ যেহেতু ইসলাম ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সেহেতু মার্কিনিরাও তাদের ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে-এটি তখন বৈধ, স্বতঃসিদ্ধ। এ কারণেই হয়তো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেন। আর তখনই পরিষ্কার হয়, পৃথিবীর সবচাইতে প্রগতিশীলধর্ম নিরপেক্ষ এই রাষ্ট্রটির রাষ্ট্রপতিদের শপথবাক্য কেনো বাইবেল ধরেই হয়। পাঠক আপনারাই বলুন, মাজেজার সঙ্গে মাজেজার মিল না থাকলে চলে!

 

মিড শট্

মুসলমান, ইসলামি জঙ্গিবাদ নিয়ে হলিউড এখন পর্যন্ত তার দক্ষতার প্রমাণ রেখে চলেছে। এই প্রবন্ধে মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের সময় অর্থাৎ ৯/১১র পরবর্তীকালে ইসলামি জঙ্গিবাদকে নিয়ে হলিউড নির্মিত তিনটি চলচ্চিত্র আনথিঙ্কেবল (২০১০), কিংডম (২০০৭), দ্য হার্ট লকার (২০০৮) নিয়ে আলোচনা করা হবে। সেই সঙ্গে এও খুঁজে দেখার চেষ্টা থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ধাপে ধাপে যুক্তি সাজিয়ে মুসলমান-ইমেজ নির্মাণ, মুসলমান জঙ্গি নিধন ও মুসলিম রাষ্ট্রে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে সারাবিশ্বের বৈধতা আদায় করে। আর এক্ষেত্রে সারাবিশ্বে সন্ত্রাস নিধনের দায়িত্বে নিয়োজিত এফবিআই, মার্কিন সেনাবাহিনীর চরিত্রই বা কী তা বোঝার চেষ্টা থাকবে।

 

ক্লোজ শট্ ১

আনথিঙ্কেবল। এফবিআই-এর সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কার্যক্রমের ওপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র আর্থার ইয়ঙ্গার নামে এক সাবেক মার্কিন সেনা। পরে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে মোহাম্মদ আতা ইউসুফ হন। একপর্যায়ে এই মুসলমান ইউসুফ সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়েন; ঘোষণা দেন মার্কিন মুল্লুকের তিনটি জায়গায় তিনি আণবিক বোমা পেতে রেখেছেন এবং আগামী চারদিনের মাথায় সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটবে। এতে এফবিআইসহ পুরো মার্কিন প্রশাসনের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তারা ইউসুফকে ধরেও ফেলে। কিন্তু বিধি বাম। ইউসুফ কোথায় বোমা রেখেছে সেটা স্বীকার করাতে ব্যর্থ হয় এফবিআই, সেনাবাহিনী। এমনকি এইচ নামের এক এজেন্টকে দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয় তাকে। এরই মধ্যে একটি বোমা বিস্ফোরণ হয়ে বেশ কয়েকজন মারাও যায়। এতে এইচ ক্ষুব্ধ হয়ে ইউসুফের স্ত্রীকে নির্দয়ভাবে খুন করে। তবে, যখন তার দুই সন্তানকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়, তখন ইউসুফ স্বীকার করে। এরপর এজেন্ট ব্রডি মানবতার খাতিরে বাচ্চাদের ছেড়ে দেয়। এদিকে ইউসুফের স্বীকার করা ঠিকানায় মার্কিন বাহিনী বোমা খুঁজে পায়, নিস্ক্রিয় করে; কিন্তু শনির দশা যেনো তাদের ছাড়ে না। বোমা নিস্ক্রিয়কারীরা যখন এ নিয়ে আনন্দে আত্মহারা, ঠিক তখনই ঘটে...। আর এভাবেই এক নিরাপত্তাহীনতা ও সন্দেহবাতিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় আনথিঙ্কেবল-এর কাহিনী।

 

টাইটেল শেষ হইবার একটু আগে : শট্-১

শুরু করছি, আনথিঙ্কেবল-এর শুরুর আগ থেকে। স্টিভেন আর্থার ইয়ঙ্গার, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিচয় দেন আমেরিকার নাগরিক হিসেবে। এই পরিচয়ে কিছু একটা বলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ইতস্তত স্বরে বলেন, আমার, আমার কিছু দাবি আছে। এরপর আর কিছু বলতে পারেন না। পরে গায়ে একটি কোট দিয়ে বলেন, পরম ক্ষমাশীল আল্লাহ ও তার প্রিয় রাসুল হজরত মুহাম্মদের নাম নিয়ে শুরু করছি। তার ওপর শান্তি বর্ষিত হউক। আমার নাম মোহাম্মদ আতা ইউসুফ। আমার সাবেক নাম স্টিভেন আর্থার ইয়ঙ্গার। এই বর্ণনার পরই চলচ্চিত্রটির শুরুর আগের পর্ব শেষ হয়। বোঝা গেলো, সে তার ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে।

 

শট্-২

যাহোক, এরপর শুরু হয় চলচ্চিত্রের মূল কাহিনী। শুরুতেই দেখা যায়, ব্যস্ত রাস্তার অনেক মানুষের মধ্য দিয়ে এক নারী হেঁটে এসে একটি শিশু ও তার মায়ের পাশে দাঁড়ান। পর মুহূর্তেই তিনি শিশুটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে হাত ইশারা করেন, সঙ্গে শিশুটিও। কিন্তু শিশুটির মা ওই নারীর কাছে একটি অস্ত্র দেখতে পেয়ে কিছুটা শঙ্কিত হন। সেটি খেয়াল করে ওই নারীর মুখে অপরাধবোধ ফুটে ওঠে-ঢেকে ফেলেন জামার ভিতর থেকে বের হয়ে আসা অস্ত্রটি। পরক্ষণেই এই নারীকে দেখা যায় লস অ্যাঞ্জেলস্-এ অবস্থিত এফবিআই-এর সন্ত্রাসবাদ দমন ইউনিটের একটি অফিসকক্ষে। বোঝা যায়, নারীটি আর কেউ নন, এই অফিসেরই সবচেয়ে বড়ো কর্তাব্যক্তি।

 

শট্-১ + শট্-২ = শট্-৩

মাঝির সঙ্গে যেমন নৌকার, উকিলের সঙ্গে যেমন আসামির তেমনি অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্ক পুলিশের। আনথিঙ্কেবল-এ প্রথম শটে ধর্মান্তরিত মুসলমান ইউসুফ, পরের শটে এফবিআই-এর সন্ত্রাস দমন সংস্থার কর্মকর্তা ব্রডির উপস্থাপন চিরাচরিত সেই চোর-পুলিশ সম্পর্ক তত্ত্বেরই প্রয়োগ। তার মানে মুসলমান যেখানে, এফবিআই-ও সেখানে! শুধু তাই নয়, প্রথম শটেই লুকিয়ে থাকা ইউসুফের বিধ্বস্ত ও রহস্যে ভরা চোখ-মুখ দেখলেই তাকে একজন অপরাধীই মনে হয়। আর এর পরের শটেই এজেন্ট ব্রডিকে আত্মপ্রত্যয়ী, সাহসী ও জনগণের সেবক হিসেবেই দেখা গেলো। কারণ, একদিকে যখন ইউসুফ লুকিয়ে বোমা হামলা চালিয়ে মানুষ মারার পরিকল্পনা করে, সেই মুহূর্তে মায়ের হাত ধরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি যেনো ভয় না পায়, সেজন্য ব্রডি তার কাছে থাকা অস্ত্রটি লুকিয়ে রাখে। এতেই প্রমাণ হয়, মুসলমান ইউসুফ সন্ত্রাসী আর ব্রডি তথা এফবিআই মানব দরদী। অর্থাৎ আনথিঙ্কেবল-এ মূল কাহিনীতে ঢোকার আগেই কোনো রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই মুসলমান ও এফবিআই-এর ওপর একটি সাধারণ ইমেজ দাঁড় করানো হয়।

 

ডিপ ফোকাস

একটি ময়ূরের ডিমের মধ্যে যে তরল পদার্থ থাকে, তার মধ্যেই সূক্ষ্মভাবে প্রলীন হয়ে থাকে ময়ুরের সমগ্র অবয়ব, অঙ্গসংস্থান ও তার ক্রিয়াকারীত্ব, তেমনি বুদ্ধিস্থ সূক্ষ্ম শব্দবীজের মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে থাকে শব্দবৃত্তি, শব্দ-বাক্যের বিবর্তনধর্মের গঠনক্রম ও পারম্পর্য।

এফবিআই অফিসের সবাই ব্রডির পরিচালনায় সন্ত্রাসবাদ নিধন নিয়ে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি তৈরির কাজে ব্যস্ত। এ সময় একটি বিষয় চোখে পরে তাহলো, চলচ্চিত্র শুরুর পর দুই মিনিট ৫১ সেকেন্ড থেকে চার মিনিট পর্যন্ত (মোট এক মিনিট ৯ সেকেন্ড) তারা মসজিদ, হামলাকারী, বিষাক্ত কলম, আরব সমর্থিত মানুষ, মুসলিম দেশ বসনিয়া শব্দগুলো ব্যবহার করে; এর মধ্যে মসজিদ শব্দটিই তিনবার উল্লেখ করেছে এফবিআই-এর এজেন্টরা। আবার, রিনা নামের এক বসনিয়ান মুসলিম নারীকে তার দেশে সংঘটিত যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত বলে তার ওপর ব্যবস্থা নিতেও আরেক এজেন্ট ফিলিপস পরামর্শ দেয় ব্রডিকে। শুধু তাই নয়, ফিলিপস ওই নারীকে নিয়ে আরো বলে, অন্য কেউ হলে কিছু আসতো যেতো না, কিন্তু সে তো (রিনা) খুবই ধর্মভীরু একজন মুসলিম। এতোটুকু দৃশ্যায়ন দেখে মনে হয়, এফবিআই-এর যাবতীয় কর্মকাণ্ড এই মুসলিমদের নিয়েই। যেহেতু বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস নিধনে এফবিআই কাজ করে, সে কারণে মুসলমানই যে পৃথিবীর একমাত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তা অনেকটাই এই শব্দগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে প্রমাণ হয়ে যায়।

 

বিগ ক্লোজ আপ

একটি আলোকচিত্র হাজার কথার চেয়েও অনেক বেশি কথা বলে। প্রাচীন চিনা এই প্রবাদটির মূল্য আজ অনেক বেশি-অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তো অবশ্যই। কারণ পৃথিবীর আমলাতান্ত্রিক সুবিন্যস্তকরণ প্রক্রিয়ায়, বহু কাগজপত্রই বৈধ বলে বিবেচিত হয় না যদি তাদের সাথে নাগরিকদের চেহারার একটি আলোকচিত্র-প্রতীক সাঁটা না থাকে। ... আলোকচিত্রকে মূল্যবান মনে করা হয়, কেননা তারা তথ্য প্রদান করে।১০ আমরা আনথিঙ্কেবল-এও দেখতে পাই শত শত আলোকচিত্র। এফবিআই-এর অফিসে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই এসব আলোকচিত্র। সিনেমাটোগ্রাফার তার অসাধারণ দক্ষতা দিয়ে ট্রলি শট্, ফ্রিজ শট্, প্যানিং, জুম করে যেভাবে দেখিয়েছেন তাতে বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয় না এগুলো কাদের ছবি; মুখ, পোশাক আর অবয়ব দেখে যে কেউ বুঝে নিতে পারেন, এগুলো শুধুই মুসলমানের মুখ। ব্রডি যখন প্রথমবারের মতো ইউসুফের ছবি হাতে নেন, তখন ইউসুফের মাথায় একটি সাদা রঙের টুপি দেখা যায়। আবার এই অফিসেরই দেয়ালে Suspected terrorist cells, continental U.S. নামের বড়ো আকৃতির কয়েকটি বোর্ডে সাঁটানো যতোগুলো মুখের ছবি দেখা যায়, সেগুলোর প্রত্যেকটি কোনো না কোনোভাবে দাড়ি, পাঞ্জাবি, পাগড়ি, বোরকা, স্কার্ফ ইত্যাদি ধারণ করে।

বলা বাহুল্য, এগুলোর সঙ্গে মুসলমানদের সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে। কারণ, পৃথিবীর তাবৎ মুসলমানরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে এগুলো ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, এগুলোকে তারা তাদের ধর্মীয় আচার হিসেবে মানতেই অভ্যস্ত। তার মানে এই আলোকচিত্রগুলো দেখিয়ে আনথিঙ্কেবল নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করতে চায়, যাদের মুখে দাড়ি, যারা পাঞ্জাবি-টুপি, বোরকা-স্কার্ফ পরে-শুধু তারাই জঙ্গি-সন্ত্রাসী-বোমাহামলাকারী। আর যেহেতু মুসলমানরাই এগুলো পরিধান করে, সেহেতু একমাত্র মুসলমানরাই বোমাবাজ-সন্ত্রাসী।

 

বার্ডস আই ভিউ

মার্কিন দেশ থেকে শুরু করে পৃথিবী জুড়েই গোয়েন্দা নজরদারি করার একচ্ছত্র অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এফবিআই। সেই প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে আজ অবধি এই সংস্থাটি বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ লাখ লাখ মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর কড়া নজরদারি চালিয়ে আসছে, এমনকি প্রয়োজনভেদে হত্যাও করছে অবলীলায়। তাছাড়া গুম, নির্যাতন, বন্দি, হুমকির মতো অভিযোগ আছেই। ভয়ঙ্কর এসব তথ্য তারা যেমন জানে, আমরাও তেমন জানি কিছুটা হলেও। ফলে এফবিআই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সামান্য হলেও বিতর্কের মুখে পড়েছে। আর এই বিতর্ক অর্থাৎ থলের বিড়াল আবার থলেতে ভরতেই তারা এখন আশ্রয় নিচ্ছে বিভিন্ন কৌশলের। আনথিঙ্কেবল সেই টোপগুলোর একটি।

এফবিআই-এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, তারা স্বীকারোক্তি আদায়ে অভিযুক্তের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়। অবধারিত এই সত্যটি ঢাকতে আনথিঙ্কেবলকে তারা ব্যবহার করেছে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। খেয়াল করুন, হেনরি হ্যারল্ড হামফ্রিশকে। যার সাংকেতিক নাম এইচ, আচরণ দেখলেই মনে হয় তিনি প্রচণ্ড উগ্র ও ভয়ঙ্কর একজন মানুষ। এখানে লক্ষণীয়, তিনি নিজে কৃষ্ণাঙ্গ, খুনি এক বসনিয়ান মুসলিম তার স্ত্রী। এই সম্পর্ক দিয়ে তো এটাই বুঝানো হলো, এই হিংস্র মানুষটাকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ হতে হবে এবং তার সঙ্গে মুসলমান নারী ছাড়া কেইবা বসবাস করবে। নির্যাতনকারী এই এইচ-এর প্রকৃত পরিচয় যে কী তা চলচ্চিত্রজুড়ে গোপন রাখা হয় জাতীয় স্বার্থে!

আবার, স্বীকারোক্তি আদায়ে ইউসুফের ওপর যখন এইচ তার সমস্ত পাশবিকতা প্রয়োগ করে, তখন ব্রডিসহ এফবিআই ও সেনাবাহিনীর কর্তারা বারবার মানবতার কথা স্মরণ করে দেয়; এইচকে ইউসুফের ওপর নির্যাতন করা থেকে বিরত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। একপর্যায়ে এইচকে ভয়ঙ্কর আখ্যায়িত করে এই সেল থেকে তাকে বের করে দেওয়ার প্রস্তাব উঠলে আকস্মিকভাবে সবারঅপরিচিত এক জাতীয় নিরাপত্তাকর্মী এসে বারবার তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের নিরাপত্তার কথা, রাষ্ট্রের মঙ্গলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দেশ ও দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য আমাদের সবকিছুই করা উচিত বলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে। সুতরাং বোঝা যায়, নির্যাতন কিংবা হত্যা করেই হোক রাষ্ট্র ও জনগণকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে।

 

ইনসার্ট

একজন অপরাধীকে শায়েস্তা করে যদি হাজার মানুষকে বাঁচানো যায় তাহলে সেটা দোষের কী। যুক্তরাষ্ট্র বোঝাতে চায়, মানুষকে নির্যাতন কতোটা ভয়ঙ্কর, কতো বড়ো অপরাধ; বোঝাতে চায়, এই জঘন্য কাজগুলো তারা করতে চায় না কিন্তু বাধ্য হয়। যুক্তির স্পর্ধা দেখুন, ব্রডি ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা ইউসুফের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে চাইলে সহকর্মী জ্যাক চিৎকার করে ব্রডিকে বলেন, যদি বোমা ফাটে তাহলে আপনার সংবিধান, আইন দিয়ে হালচাষও (Fucking) করা যাবে না। এই অবস্থায় আপনি যদি আইন মানতে যান, ঠিক আছে; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হবে? আমরা নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে এই নিমকহারামদের (Bastards) বিরুদ্ধে শুধুই অভিযোগ দায়ের করবো? এই কথা বলে ব্রডিকে বাগে আনে জ্যাক। এখানেই শেষ নয়, পরের শটেই জ্যাকের মতো ব্রডিকে এভাবে বোঝাতে চান এইচ-

ব্রডি : এইচ, আমাদের কাজ তো শারীরিক নির্যাতন করা না।

এইচ : এজন্যই আমি ভাবি, এটাকে (শারীরিক নির্যাতন) সবাই কেনো সেই মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবহার করে আসছে।   

ব্রডি : তাহলে শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের গোপন কৌশল ব্যবহার, আর এর (শারীরিক নির্যাতন) মধ্যে কি কোনো পার্থক্য থাকলো?

এইচ : এটা মোটেও শত্রুদের ব্যাপার না, এটা আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) ব্যাপার। হেলেন, (ব্রডির আসল নাম) আমরা দুর্বল, আমরা পরাজিতদের দলে। আমরা ভয়ে আছি, ওরা (মুসলমানরা) নয়। আমরা যা সন্দেহ করি, ওরা তা বিশ্বাস করে।

ব্রডি : সে যাহোক, আমাদের তো মূল্যবোধ আছে।

এইচ : ও আচ্ছা, আমাদের মূল্যবোধের দাম তাহলে কতোগুলো জীবনের বিনিময়ে দিতে হবে?

শেষ প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারে না ব্রডি-সঙ্গে আমরাও। মানব সভ্যতার শুরুতে শারীরিক নির্যাতন ছিলো, তাই এই সময়েও মানুষকে নির্যাতন, হত্যা করা যাবে? যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই কী দুর্বল ও পরাজিতদের দলে! মানুষ হত্যা তারা বাধ্য হয়ে করে; আর মুসলমানরা তা বিশ্বাস করে, কোনো কারণ ছাড়াই করে? এতো মানুষ হত্যা করেও কীভাবে ব্রডি বলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধ আছে?

 

ডিটেইল অ্যান্ড সিম্বল

এই যুক্তরাষ্ট্র টুইন টাওয়ারে হামলার দায়ে এক ওসামাকে দায়ী করার পরও যেমন আফগানিস্তানের হাজারো নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ধরতে হত্যা করেছে হাজারো ইরাকিকে; তেমনি রাগের ঝাল মেটাতে আনথিঙ্কেবল-এ ইউসুফের স্ত্রীর গলায়ও ছুরি চালায় এইচ। হত্যার আগে যেভাবে নিরীহ ব্রডি উচ্চবাক্যে বোমা হামলার সঙ্গে ইউসুফ সম্পৃক্ত আছে কি না জিজ্ঞাসা করে, যেভাবে তার দুই অবুঝ শিশুকে নির্যাতন সেলে ঢুকিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করে, তাতে মনে হয়, কোনো পরিবারের একজন সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেই সেই পরিবারের অন্যরাও তাতে সম্পৃক্ত থাকে। তার মানে আন্তর্জালিক যোগাযোগের মতোই ইসলামি সন্ত্রাসবাদ-এর ক্ষেত্রে ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের, পরিবারের সঙ্গে দলের, দলের সঙ্গে দেশের, আর দেশের সঙ্গে গোটা বিশ্বের একটি সম্পর্ক আছে!

শুধু তাই নয়, ইউসুফের স্ত্রী জেহানকে মারতে এলে জেহান কোনো উপায় না দেখে বলেন, আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছেন কেনো, আমি তো আমেরিকার নাগরিক। তখনো সে রেহাই পায় না। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বুঝতে পারি, জেহান, ইউসুফ কিংবা তার সন্তানেরা আমেরিকার নাগরিক হলেও কিচ্ছু করার নেই। কেননা, তারা মুসলমান।

 

ফ্রিজ শট্

ইউসুফ মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে, ইউসুফরা মিথ্যা তথ্য দেয়-এমন অভিযোগ শুরু থেকেই দিয়ে আসছিলো এইচ। এমনকি ইউসুফের স্বীকার করা তিনটি বোমার বাইরেও যে আরো বোমা আছে তাও যুক্তি দিয়ে তুলে ধরে সে। কিন্তু ব্রডি ও অন্যান্যরা কেউই তা বিশ্বাস করেনি। তাছাড়া উপরের নির্দেশে ইউসুফ ও তার স্ত্রীর ওপর এইচের নির্যাতন দেখে অন্যরা ক্ষিপ্ত হয়। এইচের প্রতি সবার অবিশ্বাস-এর মাত্রা যখন চরমে তখনই আনথিঙ্কেবল-এর শেষ দৃশ্য। দেখা যায়, ইউসুফের স্বীকার করা তিনটি বোমা নিস্ক্রিয় করে উল্লসিত মার্কিন সৈন্যরা। আমাদেরও মনে হয়, তারা ইউসুফকে বিশ্বাস করেছে। কিন্তু হিতে বিপরীত। ক্যামেরা ধীরে ধীরে প্যানিং করে দেখিয়ে দেয়, এইচ-ই ঠিক; সে সত্যবাদী, চতুর্থ বোমা নিয়ে তার যে সন্দেহ-যুক্তি সবই ঠিক; বিস্ফোরণ ঘটার একেবারে দ্বারপ্রান্তে আরেক আণবিক বোমা। প্রমাণ হয় মুসলমানদের ওপর বিশ্বাসের কারণেই এই ধ্বংস, এতো নিরীহ মানুষের মৃত্যু; অর্থাৎ ইসলামি জঙ্গিবাদ শেষ হওয়ার নয়।

 

দৃশ্যপর্ব-৪

আনথিঙ্কেবল ইউসুফকে দিয়ে প্রমাণ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত যাবতীয় সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে শুধু মুসলমানরাই জড়িত। ঠিক এই পর্যায়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে, বিশেষ করে কোনো মুসলিম দেশে যদি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ হামলার শিকার হয়, তাহলে তো নিশ্চিতভাবেই তারা যুক্তি দিতে পারে, কোনো মুসলমান ব্যক্তি বা তাদের কোনো সংগঠন এই হামলার জন্য দায়ী। তারা এও প্রমাণ করতে চায়, মুসলমানদের প্রয়োজনে, মুসলিম রাষ্ট্রের উন্নয়নে তারা পরবাসী জীবন কাটালেও মুসলমানরাই বেঈমানের মতো তাদের ওপর হামলা চালায়। ঠিক এমনই যুক্তিতে ভরা এক চলচ্চিত্র কিংডম (২০০৭)। চলচ্চিত্রটির কাহিনী এমন-

সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত দ্য আল রাহমাহ ওয়েস্টার্ন হাউজিং কম্পাউন্ড। যেখানে বেশকিছু মার্কিন পরিবারের বসবাস (অধিকাংশই তেল উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত)। পিকনিককে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এদের সবাই আনন্দে আত্মহারা। ঠিক তখনই পুলিশের পোশাক পরিহিত কয়েকজন মুসলমান জঙ্গি মার্কিন নাগরিকদের ওপর উপর্যুপরি গুলি চালাতে থাকে; যা থেকে বাদ যায় না শিশুরাও। ভয়ঙ্কর এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ ও মুহাম্মদ (স.) এর নাম উচ্চারণ করে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে বসে এক মুসলমান সন্ত্রাসী। নিহত হয় কমপক্ষে একশো মার্কিনি। এর কিছুক্ষণ পর বিধ্বস্ত ওই এলাকায় আবারো ঘটে বোমা বিস্ফোরণ, মারা যায় আরো একশো মানুষ। খবর পেয়ে মার্কিন মুল্লুক থেকে সেখানে ছুটে আসে এফবিআই-এর চারকর্মী। হামলা কিভাবে ঘটলো, কারা ঘটালো তা তদন্তে মাঠে নামে তারা। কিন্তু সৌদি আইনের বেড়াজালে তারা বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে বলে মনে করতে থাকে। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এক সৎ পুলিশ কর্মকর্তার সহযোগিতা ও নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় তারা অপরাধের মূল হোতাদের পাকড়াও করতে সমর্থ হয়। অবশেষে সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে ইসলামি জঙ্গিবাদীদের হত্যা করে নায়কের বেশে তারা দেশে ফিরে যায়।

 

লং শট্

যুক্তরাষ্ট্রের একটি দুঃখের নাম-তেল। সেই হিসেবে যে দেশের বেশি তেল, সেই দেশের সঙ্গে তাদের বেশি তেলবাজির সমীকরণ থাকে। যে কারণে সৌদির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক হিসাব-নিকাশ করেই এগোয়; স্বার্থের প্রয়োজনে মডারেট মুসলিম দেশের তকমা দিয়ে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদও (আপাতত) দেয়। আবার স্বার্থে টান লাগলে হুমকিও দিয়ে রাখে।

খেয়াল করুন, কিংডম-এর টাইটেল কার্ডের দিকে। শুরুতেই সৌদি আরবের তেল সম্পদ খুঁজে পেতে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ও দয়াদাক্ষিণ্যের কথা বারবার বলে। এও বলে-সৌদি আরবের নিরাপত্তায় ও তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সেখানে দরকার। এ কথা শুনে মনে হয়, রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবের নিজস্ব কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। আর সৌদিদের তেলের খনি আছে তাতে কী; যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র কষ্ট করে সেই তেল উত্তোলন করে আবার কিনেও নেয়, আর তেল বিক্রির অর্থই যেহেতু সৌদির একমাত্র রক্ষাকবজ, সেহেতু তাদের  (সৌদিদের) তো বেশি আমার-আমার করা ঠিক না।

আবার, ওয়াহাবি সমর্থিত রাজ পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দহরম-মহরম সম্পর্ক সত্ত্বেও ১৯৭০ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে তারা ইসরায়েলের পক্ষ অবলম্বন করলে ওয়াহাবিরা এতে ক্রুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে তারা সৌদি রাজপরিবারকে বাধ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তেল রপ্তানি স্থগিত করে দিতে। আর এই হিতে বিপরীত ঘটার কারণেই ওয়াহাবিরা যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্যের চোখে কট্টরবাদী, মৌলবাদী আর উগ্র সন্ত্রাসী। তাহলে তাদের মন মতো চললে তুমি ভালো আর না চলতে পারলে সন্ত্রাসী!

বুঝলাম না হয়, ওয়াহাবিরা তাদের আঁতে ঘা দিয়েছে, কিন্তু সারাবিশ্বের বাকি মুসলমানরা কী দোষ করলো যে কিংডম-এ শুরুতেই একতরফাভাবে ঘোষিত হয়, এই সেই জাতি (মুসলমান) যারা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সাংঘর্ষিকভাবে অবস্থান করে। এই কথাগুলো ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ভিজ্যুয়ালি একবার মুসলমানদের সমবেত নামাজ, একবার যুক্তরাষ্ট্রের ডলার গোনা, আবার মুসলমানদের মসজিদ ও নামাজ পড়া, সঙ্গে বিরাট বিরাট শপিংমল, নাইট ক্লাব দেখানো হয়। অসাধারণ এই ভিডিও সম্পাদনার সঙ্গে ঐতিহ্য (মুসলমানদের রীতি-নীতি) আর আধুনিকতা (মার্কিন বাজারি ব্যবস্থা) উচ্চারণ করে দেখিয়ে দেওয়া হয় সংঘর্ষটা আসলেই কিসের সঙ্গে কিসের। তার মানে, যুক্তরাষ্ট্র = আধুনিকতা, মুসলমান = প্রতিক্রিয়াশীলতা!

 

ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শট্

ফিরে যাই এইমাত্র ঘটে যাওয়া আল রাহমাহ ওয়েস্টার্ন হাউজিংয়ের বোমা হামলার ঘটনায়। যেখানে নিহত হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মানুষ তথা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এটি এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। আর এতে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন এফবিআই। ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত এফবিআই-এর হেড অফিসে এই পরিস্থিতি নিয়ে চলছে রুদ্ধশ্বাস বৈঠক। মনে রাখুন, আলোচনা কিন্তু বোমা হামলা নিয়ে। অথচ আলোচনার শুরুতেই সহকর্মী নিহতের ঘটনায় আবেগাপ্লুত এজেন্ট মায়েস বলেন, সৌদি রাজপরিবার তো বুঝতেই পারছে না যে, তারা সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। যদি তারা তাদের দেশকে রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তো দেশের জনগণকে রক্ষা করতে পারবে না, আর তেলের কথাতো বাদই দিলাম। তার মানে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ হামলার শিকার হলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে, ঠিক আছে; কিন্তু তেলের কথা ভুলে গেলে চলবে না। তার মানে সেই আসল বাণী, জনগণ গোল্লায় যাক কিন্তু তেলের যেনো কোনো ক্ষতি না হয়।

আবার, তদন্তে যাওয়ার আগেই তারা মোটামুটি নিশ্চিত, আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সৌদির জঙ্গি সংগঠন আবু হামজাই এ হামলার জন্য দায়ী। আবু হামজা এই হামলার সঙ্গে যুক্ত কি না সেটা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই; কিন্তু এফবিআই-এর কাছে প্রশ্ন, আপনারা যেহেতু নিশ্চিত জানেনই এই সংগঠনটিই হামলাটি করেছে, তাহলে সেখানে তদন্ত করতে হয় কেনো? সরাসরি ব্যবস্থা নিলেই হয়। সেটা তারা করবেন না, কারণ সন্ত্রাসী ধরার চেয়ে ওই দেশে তাদের প্রবেশ নিশ্চিত করাটাই বেশি জরুরি। কেননা ঔপনিবেশিকতা যার জন্মগত স্বভাব, তার অভ্যাসতো এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

ক্লোজ শট্ ২

সোজা কথায়, যে রাষ্ট্র মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ, সেটি রাষ্ট্র হিসেবে পুরোপুরি ব্যর্থ! এ কথার প্রমাণ মেলে, কিংডম-এ। আনথিঙ্কেবল-এর এইচ-এর মতোই দেখতে এফবিআই-এর কৃষ্ণাঙ্গ এজেন্ট রোনাল্ড ফ্লুরি। তার নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল বোমা হামলার তদন্তে ততোক্ষণে সৌদির বিমানবন্দরে হাজির। শুরুতেই তারা পুলিশের কাছে তল্লাশির নামে নাজেহাল হন। তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় যাবতীয় সব অস্ত্র। আর ঠিক তখনই তাদের (এফবিআই-এর) দুজন সহকর্মীর লাশ কফিনে করে রাতের আঁধারে দেশে পাঠানো হচ্ছে দেখে আঁতকে ওঠেন এজেন্ট মায়েস। এরপর তাদের প্রোটোকলের পাজেরো গাড়িগুলোকে ঘণ্টায় ১৫০ কিমি গতিবেগে ছুটতে দেখে ভ্যাবাচেকা খান আরেক এজেন্ট শায়েকস্। এর কিছু পর বিপরীত দিক থেকে আসা একটি গাড়ি শঙ্কিত করে তোলে তাদের। বিষয়টি সৌদি পুলিশের ভাষায়, রাতে কিন্তু আপনারা এখানে (সৌদি) নিরাপদ নন। এ সময় সৌদি পুলিশকে এতোটা ভীরু ও আতঙ্কগ্রস্থ দেখানো হয় যে, তারা পিকআপে বসে থাকা একটি উটকে দেখেও সন্ত্রাসী ভেবে অস্ত্র তাক করে বসে। অবশ্য এতে উপহাস করতেও ছাড়েনি ফ্লুরিরা। তারপর নিরাপত্তার অভাবে এফবিআই-এর এই দলটিকে বিশাল একটি রুমে তালাবদ্ধ করে থাকতে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কিংডম বুঝিয়ে দেয়, মানুষের জন্য কতোটা অনিরাপদ এক দেশ সৌদি আরব।

 

প্যানিং শট্

রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় থাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবাহিনী। কিন্তু যদি তারা কখনো তা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে আসে জাতিসংঘ। আক্রান্ত রাষ্ট্রটির সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা সন্ত্রাস দমনে কাজ করে জাতিসংঘেরই বিশেষ বাহিনী। আন্তর্জাতিক আদালত থেকে শুরু করে সব রাষ্ট্রই এ কথা জানে; আর এও জানে-জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়া কোনো দেশ অন্য কোনো দেশে হামলা চালালে তা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু সবাই সে আইন মানে কি? যুক্তরাষ্ট্র তো না-ই। কিংডম-এ তারা সেটির প্রমাণ রেখেছে। বোমা হামলার ঘটনা তদন্ত করতে মার্কিন স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অনুরোধে এফবিআইকে পাঁচ দিনের জন্য সৌদি রাজপরিবার তাদের দেশে থাকার অনুমতি দেয়। কিন্তু তারা সৌদি বিমানবন্দরে নেমেই অহেতুক সেখানকার নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়; সঙ্গে অবাচনিকভাবে বুঝিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র তল্লাশি করে আপনাকে উলঙ্গ করে ফেলবে কিন্তু তাদের কিছুই বলা যাবে না!

এরপর যাত্রাপথে তাদের দায়িত্বে থাকা কর্নেল আল গাজীকে সরাসরি বোমা হামলার বিষয়ে জেরা করে তারা। কিন্তু কর্নেল গাজী যখন এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তখন রাগান্বিত ফ্লুরি বলে, বোমা হামলার সঙ্গে কারা জড়িত তা জানো না। পুলিশের পোশাক পরিহিত ওই বোমা হামলাকারীরা কারা তাও জানো না। তোমরাতো দেখছি কিছুই জানো না। ফ্লুরি কথাগুলো এমনভাবে বলে যে, মনে হয় কোনো দেশে সন্ত্রাসী হামলা ঘটার আগেই সেদেশের নিরাপত্তাবাহিনীকে তা জানতেই হবে; তা না হলে তারা ব্যর্থ, পরাজিত। বুঝলাম কথা সত্য, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে যখন সন্ত্রাসী হামলা হয়, তখন ওই এফবিআইসহ তাদের নিরাপত্তাবাহিনী কি বসে বসে আঙুল চোষে? আর নিজেদের এই ব্যর্থতা যদি তারা না-ই স্বীকার করে, তাহলে কি ধরে নেবো তারা নিজেরাই নিজেদের দেশে হামলা চালানোর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবগত!

শেষদিকে দেখা যায়, এফবিআই-এর উপস্থিতিতে সৌদির এক বিশেষ বাহিনী মুসলমান জঙ্গিদের হত্যা করছে। সৌদি প্রিন্সও ইতোমধ্যে সাংবাদিকদের কাছে তার এই সফলতা তুলে ধরেছেন। কিন্তু ছোটো ছোটো এসব কিশোর জঙ্গিদের লাশ দেখে খুশি হতে পারে না ফ্লুরি, মায়েসরা। এ সময়ে ফ্লুরি তার উপরের মহলকে মুঠোফোনে বলেন, স্যার, আমি এখন নিহত জঙ্গিদের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু আমার মনে হয়, এখানেই এর শেষ নয়।

এরপর কিংডম-এর অন্তিম অঙ্ক, হাইওয়ে ধরে গাড়িতে যাওয়ার সময় ফ্লুরিরা আক্রান্ত হয় মুসলমান জঙ্গিদের দ্বারা। এতে সে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও শুরু হয় ফিল্মিকায়দায় বন্দুকযুদ্ধ। তাদের ধাওয়ায় জঙ্গিরা আশ্রয় নেয় একটি ফ্ল্যাটবাড়িতে। একপর্যায়ে শায়েক্সকে জিম্মি করে তারা। ব্যাপক সংঘর্ষের মধ্যে এক পিচ্চি জঙ্গি গুলি করে বসে এফবিআই-এর প্রিয়ভাজন আল গাজীকে। গাজীকে বাঁচাতে সেই পিচ্চি জঙ্গিকে গুলি করে ফ্লুরি। ঠিক তখনই অশীতিপর এক বৃদ্ধ হঠাৎ-ই লুকিয়ে রাখা অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়তে উদ্যত হলে তার জীবনও সাঙ্গ হয় ফ্লুরির গুলিতেই। এ সময় এফবিআই জানতে পারে, মুসলমান জঙ্গিদের পালের গোদা ছিলেন এই বৃদ্ধটিই। আর এর মাধ্যমেই তারা বুঝিয়ে দেয় প্রকৃত জঙ্গিবাদীদের ধরতে একমাত্র এফবিআই-ই যোগ্য। আর এতে কোনো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব কিংবা স্বয়ং জাতিসংঘ চুলোয় গেলেও কিচ্ছু করার নেই যুক্তরাষ্ট্রের।

 

দৃশ্যপর্ব- ৫

উপরের চলচ্চিত্র দুটিতে পর্যায়ক্রমে প্রমাণ হয়, মুসলমান জঙ্গিবাদ-এর ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তি ইউসুফরা নয়, গোটা একটি মুসলিম দেশও জড়িত। আরো প্রমাণ হয়, ইসলামি জঙ্গিদের থাবায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই শুধু মারা পড়ছে, আর এদের ধ্বংসে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র তথা এফবিআই ও মার্কিন সেনাবাহিনীই সবচেয়ে অব্যর্থ, উপযুক্ত-অন্য কেউই নয়। তবে এই জনমঙ্গলকর কাজটি করতে কিন্তু তাদের অনেককে জীবনের মায়া ত্যাগ করতে হয়, মাতৃভূমি ছাড়তে হয়। দ্য হার্ট লকার এই বয়ানই দেয়। এর কাহিনী এমন-ইরাকের জনগণকে বোমা হামলা থেকে রক্ষা করতে আসে মার্কিন সেনাবাহিনীর একদল সাহসী ও ত্যাগী সদস্য। এরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় পুঁতে রাখা শক্তিশালী বোমা নিস্ক্রিয় করে। একপর্যায়ে শরীরের রক্ত, এমনকি জীবনবাজী রেখে তারা বোমা নিষ্ক্রিয় ও জঙ্গিদের হত্যার মধ্য দিয়ে রক্ষা করে ইরাকের সাধারণ মানুষকে। তবে যুদ্ধ থেমে থাকে না, তাই মার্কিন সৈন্যদেরও নিতে হয় জীবনের ঝুঁকি-কারণ ইসলামি জঙ্গিবাদ তো আর শেষ হওয়ার নয়

 

ক্যামেরা, রেডি

এ কথা বলতে কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করা লাগে না যে, যুক্তরাষ্ট্র তার জন্মের পর থেকেই যা যা করেছে, তাতে একটা অসাধারণ যুক্তি ছিলো, আছে। যেহেতু সে প্রচণ্ড ক্ষমতাধর, সেহেতু তার সব যুক্তিতেই সবাই সমস্বরে বলে, জি হুজুর, আপনিই ঠিক। আর এই জি হুজুর আওয়াজের মাজেজা দিয়েই সে আজও পশ্চিমে সূর্য ওঠায়। বর্তমানে মুসলমান জঙ্গি নিধনেও সে যুক্তি দাঁড় করায়। এমনই এক যুক্তির নাম মানবতা। আর এই মানবতা এমনই এক জিনিস যাকে রক্ষা করতে অবশ্যই দরকার হয় তাদেরই সেনাবাহিনীকে; যারা তাদের জীবন-যৌবন দিয়ে হলেও মানবতাকে রক্ষা করে। দ্য হার্ট লকার-এর সৈন্যরাও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের মানবতার পক্ষে।

দ্য হার্ট লকার-এর শুরু আজান ও কোরআনের ধ্বনি দিয়ে, আর এর সঙ্গে ডলি শটে রোবটের চোখে দেখা যায়, যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত ইরাকের রাস্তাঘাট। আরেকটু খেয়াল করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন পৃথিবীর সবচাইতে জনপ্রিয় ড্রিংকস পেপসি ক্যানের বিধ্বস্ত শরীর। বুঝতে বাকি থাকে না, ইরাক যুদ্ধের কারণেই এতো বড়ো ক্ষতি। এরপর রাজধানী বাগদাদের একটি এলাকায় মার্কিন সৈন্যদের দেখানো হয়-উদ্দেশ্য পুঁতে রাখা বোমা খুঁজে তারা নিস্ক্রিয় করবে। এ লক্ষ্যে প্রথমে তারা একটি রোবোটের সাহায্য নেয়, কিন্তু সেটি ভেঙে যায়। ফলে এবার সাহসী সৈন্যরা নিজেরাই এগিয়ে আসে। আবারো বুঝলাম, আনথিঙ্কেবল-এর এফবিআই যেমন স্বীকারোক্তি আদায়ে ব্যর্থ, সন্ত্রাস নিধনে কিংডম-এ যেমন সৌদি রাষ্ট্রটি পুরোপুরি ব্যর্থ, ঠিক তেমনি বোমা নিস্ক্রিয় করতে রোবটও ব্যর্থ। সুতরাং এখানে অবশ্যই মার্কিন সৈন্যদের প্রয়োজন, প্রয়োজন তাদের কর্তৃত্বের, ক্ষমতা ব্যবহারের।

 

হিরো, অ্যাকশন

শুরুতেই দেখা যায়, থম্পসন নামের এক সৈন্য নিরাপত্তামূলক পোশাক পরে বোমা নিস্ক্রিয় করতে এগিয়ে যায়। তখন দূর থেকে এক ইরাকি তার হাতে থাকা মোবাইল ফোন-রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটাতে তৎপর হয়। এটি খেয়াল করে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য স্যানবর্নসহ অন্যরা তাকে রিমোটটির সুইচ না টিপতে অনুরোধ করে। কিন্তু তারপরও সে সুইচ টিপলে বোমাটি প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত হানে থম্পসনের গায়ে-অমর (তাদের ভাষায়) হয় সে। খেয়াল করুন, যে মার্কিন সৈন্যরা সারাবিশ্বের জঙ্গিদের হত্যা করতে মুখিয়ে থাকে, জীবন-যৌবন শেষ করে দেয়, সেখানে তারা এক বোমা হামলাকারীকে হাতে পেয়েও কিন্তু তাকে গুলি করেনি।

আবার, আনথিঙ্কেবল, কিংডম-এর মতো দ্য হার্ট লকার-এর মার্কিন সৈন্যরাও সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে, শিশুদের আদর করে; এমনকি আত্মঘাতী এক হামলাকারীকে বাঁচাতে নিজেদের জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত বলে মনে হয়। কিন্তু আসলেই কি তারা সেটা করে? ইরাক যুদ্ধে তাহলে শিশুসহ যে হাজারো মানুষ মারা গেলো, তা কি তাহলে ইরাকিরা নিজেরাই করেছে? দ্য হার্ট লকার-এ তাহলে মার্কিন সেনাদের সাধুসুলভ এই আচরণ কেনো? নাকি গণহত্যার অপরাধ থেকে বাঁচতে ভিজ্যুয়াল ইতিহাসের প্রমাণ হিসেবে এসব তুলে ধরা?

 

এনজি শট্

আনথিঙ্কেবল, কিংডম অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের খারাপ কাজগুলোকে লুকিয়ে রাখতে সফল হলেও দ্য হার্ট লকার এক্ষেত্রে ব্যর্থ। বেশি সাধুগিরি দেখাতে গিয়ে তারা নিজেদের গুমোর নিজেরাই ফাঁস করে দিয়েছে। যেমন, মার্কিন সৈন্যদের ব্যবহৃত ট্যাঙ্ক জাতীয় গাড়ির পিছনে বড়ো সাদা কাগজে লাল রঙ দিয়ে লেখা, একশো হাত দূরে থাকুন, তা না হলে আপনাকে গুলি করবো। কথাগুলো তো সবাইকে এই বার্তাই দেয় যে, ইরাকের নাগরিকরা সত্যি সত্যিই তাদের কাছে নিরাপদ নয়। যারা বলতে পারে, একশো হাত দূরে থাকুন নইলে গুলি করা হবে, তারা কীভাবে এদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিবে?

আবার, সাহসী সেনা কর্মকর্তা জেমস যখন বোমার আঘাতে নিহত ডিভিডি বিক্রেতা সেই ছোটো ছেলেটির ক্ষত-বিক্ষত দেহ খুঁজে পায়, তখন ভারাক্রান্ত স্যানবর্ন তাদের সঙ্গে থাকা এক সৈন্যকে প্রশ্ন করে, তুমি কি এর আগে কখনো বোমায় আঘাতপ্রাপ্ত কোনো মানুষের শরীর দেখেছো? উত্তরে সেই সৈন্যটি বলে, না। আর বলবেই তো, কেননা যারা সবসময় যুদ্ধবিমান থেকে বোমা মেরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এক নিমিষে হত্যা করে, তারা কিভাবে বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখবে? তারা তো একটি মাত্র সুইচ টিপে হিরোশিমা-নাগাসাকিতে ক্ষত-বিক্ষত করা হাজার হাজার মানুষের লাশও দেখেনি!    

 

ওকে, কাট্

গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হিটলারকে আমরা ঘৃণা করি, পারলে জুতাও মারি। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই, সেনাবাহিনী এই হিটলারের নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে। হিটলারের হাতে ছোটো আনা ফ্রাঙ্কের মতো যারা মারা পড়েছে, আমরা বিশ্বনাগরিকেরা তাদের জন্য ব্যথিত হই, সমবেদনা জানাই, ইতিহাস লিখি। কিন্তু মুসলমান জঙ্গি দোষে দুষ্ট করে যেসব নিরীহ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র অবলীলায় হত্যা করছে, সেই সাধারণ মানুষগুলোর আত্মা কি কোনোদিন আমাদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা, সমবেদনা পাবে? আনথিঙ্কেবল, কিংডম কিংবা অস্কারজয়ী দ্য হার্ট লকার-এর উল্টো পথে হেঁটে, এই মানুষগুলোর স্বপক্ষে কি কখনো ইতিহাস রচিত হবে?


লেখক : রুবেল পারভেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

rubelmcj@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. হিকমত, নাজিম (১৯৯৯ : ৫০); এখন প্রশ্ন; নির্বাচিত নাজিম হিকমত; অনুবাদসুভাষ মুখোপাধ্যায়; দেজ পাবলিশিং, কলকাতা।

২. করিম, সরদার ফজলুল (২০০৬ : ৪৪); আমেরিকার সভ্যতা; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা।

৩. আ-আল মামুন রচিত মার্কসবাদী মৌল ধারণা ও মিডিয়া বিচার নামের অপ্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে শব্দ দুটি নেওয়া।

৪. ম্যাকডোনাল্ডস হলোবিশ্বের সবচাইতে দামি ও জনপ্রিয় ফাস্টফুড বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫র জনক ম্যাকডোনেল ডগলাস এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা। যিনি একই সঙ্গে খাদ্য ও মারণাস্ত্রের সফল বিক্রেতা।

৫. হলিউডের ছবিতে যুক্তরাষ্ট্রের এত প্রভাব! শিরোনামের এই লেখাটি ডয়েচে ভেলে ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া। লেখাটি ২২ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত।

৬. নিউটন, সেলিম রেজা; পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমে মুসলমানের মুখ; মানুষ; সম্পাদনাসেলিম রেজা নিউটন; ফেব্রুয়ারি ২০০৩, পৃষ্ঠা৩৪৩, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা।

৭. খান, সলিমুল্লাহ (২০০৯ : ১৭১); এডোয়ার্ড সায়িদ, এসলাম ও সন্ত্রাসবাদ; আদমবোমা; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৮. বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়ায় দেখুনসন্ত্রাসবাদ নিবন্ধটি।

৯. খান, কলিম (২০০১ : ৬২); পরমাভাষার সংকেত; পরমাভাষার সংকেত ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি ও ভাষাতত্ত্বের নতুন দিগন্ত; প্যাপিরাস, কলকাতা।

১০. সনটাগ, সুজান (২০১৩ : ২৫); ইন প্লেটোস কেইভ; অন ফটোগ্রাফি; অনুবাদমাহমুদুল হোসেন; নোকতা, ঢাকা।


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন