Magic Lanthon

               

এবিএম সাইফুল ইসলাম

প্রকাশিত ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ড. নো থেকে স্কাইফল-১

সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির বর্ধিত সংস্করণ

এবিএম সাইফুল ইসলাম


ব্রিটিশ লেখক, সাংবাদিক ও নৌবাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইয়ান ফ্লেমিং সৃষ্ট একটি কাল্পনিক চরিত্র জেমস বন্ড। ফ্লেমিং তার ১২টি উপন্যাস ও দুটি ছোটো গল্পে জেমস বন্ডের কথা বলেছেন। ১৯৬৪ সালে তার মৃত্যুর পর আরো সাতজন লেখক একই আদলে এই চরিত্র নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেন; প্রাধিকারপ্রাপ্ত লেখকরা হলেনÑকিংসলে এমিস, ক্রিস্টোফার উড, জন গার্ডনার, রেমন্ড বেনসন, সিবাসটিয়ান ফক্স, জেফরি ডিভার ও উইলিয়াম বয়েড। এছাড়া পরবর্তী সময়ে তরুণ জেমস বন্ডকে নিয়ে লিখেছেন চার্লি হিগসন। ইয়ান ফ্লেমিং-এর উপন্যাসে উজ্জীবিত হয়েই মূলত সৃষ্টি হয়েছে জেমস বন্ড সিরিজের চলচ্চিত্র, যেখানে মূল নায়কের সাংকেতিক কোড ‘০০৭’। ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা যায় কেবল ‘ইউ লাইভ টুয়াইস’ উপন্যাসটিতে; সেখানে তাকে অস্থায়ীভাবে ‘৭৭৭৭’ নম্বর দেওয়া হয়। ‘ডাবল ও’ বা ‘ডাবল জিরো’ কোডটির মাধ্যমে জেমস বন্ডকে তার কর্তব্য-কর্মে যে কাউকে হত্যা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এমআইসিক্স-এর (মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, সেকশন সিক্স) ০০৭ কোডধারী এজেন্টকে কাউকে হত্যার জন্য জবাবদিহি করতে হয় না।

বন্ড, লন্ডনের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বা এসআইএস-এর প্রধান গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন; তবে ১৯৯৫ সালের পর এসআইএস-এর নাম পরিবর্তন করে এমআইসিক্স রাখা হয়। এ পর্যন্ত শন কনারি, জর্জ ল্যাজেনবি, রজার মুর, টিমোথি ডান্টন, পিয়ার্স ব্রুসনান ও ড্যানিয়েল ক্রেইগÑএ ছয়জনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে জেমস বন্ডকে চিত্রিত করা হয়েছে। এই সিরিজের প্রায় সবগুলো চলচ্চিত্রই নির্মাণের নেপথ্যে রয়েছে ইংল্যান্ডের ‘পাইনউড স্টুডিও’ ও ‘ইয়ন প্রোডাকশনস’। সিরিজের প্রথম চলচ্চিত্রের নাম ড. নো, যা ১৯৬২ সালে মুক্তি পায়; এবং সর্বশেষ ২০১২ সালে ৫০ বছর পূর্তিতে মুক্তি পায় এই সিরিজের ২৩তম চলচ্চিত্র স্কাইফল

হ্যারি পটারের পর জেমস বন্ড সিরিজ এখন পর্যন্ত ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। সারাবিশ্বে এই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার কারণ এবং প্রযোজকদের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিভে যাওয়া বাতি তাদের সহোদরের ভূমিকা পালনকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে জ্বালিয়ে রাখার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। ড. নো থেকে স্কাইফল পর্যন্ত যে ২৩টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে তার প্রায় সবগুলো নির্মাণের উপাদান ও উদ্দেশ্য যেমন একই, তেমনি কাহিনী এবং রসবোধও একই রকম। একটি চলচ্চিত্রকে অন্য চলচ্চিত্র থেকে আলাদা করার তেমন কিছুই নেই। একই বিষয় ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র; বলা যায় অনেকটা ‘ওল্ড ডগ নিউ ট্রিকস’-এর মতোই।

 

১.

১৯৬২ সাল। কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্ষেপণাস্ত্র পাঠালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধাংদেহীভাব অবলম্বন করেছিলো তা জন এফ. কেনেডি ও নিকিতা ক্রুশ্চেভ-এর সমঝোতায় থামানো হয়েছিলো। একই বছর মহাশূন্যে টেলস্টার স্যাটেলাইট প্রেরণ করা হয়। এই ৬২-তেই লন্ডনে জেমস বন্ডের প্রথম কিস্তি ড. নো চলচ্চিত্রশিল্পে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৬২ থেকে ২০১২ সাল­-এই সময়ে কেনেডি-ক্রুশ্চেভ মারা গেছেন; স্যাটেলাইট যোগাযোগ এখন একেবারেই সাধারণ একটি বিষয়; কিন্তু ৫০ বছরের জেমস বন্ড এখনো টাটকা, তাজা, অতি শক্তিশালী, আত্মশ্লাঘাপূর্ণ, হামলাকারী অসাধারণ বামন হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।

টেরেন্স ইয়ং পরিচালিত ড. নো মূলত একটি ব্রিটিশ গোয়েন্দা চলচ্চিত্র (স্পাই ফিল্ম)। গোয়েন্দা চলচ্চিত্র যদিও চলচ্চিত্রের আলাদা কোনো ধরন নয়, কিন্তু ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন; যা আসলে থ্রিলার ও অ্যাকশন ফিল্মেরই একপ্রকার বর্ধিত অংশ। যেখানে কাল্পনিক গুপ্তচরবৃত্তি করা হয় বাস্তবসম্মত অথবা অলীক কল্পনাপ্রসূতভাবে। ড. নো স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন-ক্যারিবিয় নীতি-কৌশলেরই বহিঃপ্রকাশ। দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে অবস্থিত এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সেতু হিসেবে ক্যারিবিয় অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। আর ভৌগোলিক দিক দিয়ে অঞ্চলটি মার্কিন পরিমণ্ডলে অবস্থিত হওয়ায় এর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৫০ দশকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ক্যারিবিয় অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে-যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলে গণতান্ত্রিক নীতি-কৌশলের মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দেয়। ১৯৫৯ সালে কিউবায় সমাজতন্ত্রের বিজয় সূচিত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ক্যারিবিয় নীতি-কৌশলের ক্ষেত্রে সামরিক নীতির ওপর বেশি জোর দেয়। ড. নো-তে দেখা যায়, ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের জ্যামাইকা স্টেশনের প্রধান জন স্ট্রেন্জওয়েজ অতর্কিত আক্রমণে নিহত হলে তার মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটন করতে বন্ডকে সেখানে পাঠানো হয়। এখানে সিআইএ এজেন্ট ফেলিক্স লেইটারের ভূমিকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ। টেরেন্স ইয়ং-এর পরিচালনায় গুপ্তচর হিসেবে জেমস বন্ডের নাম ভূমিকায় প্রথমবার অভিনয়ের মাধ্যমে সবার নজরে আসেন স্যার শন কনারি।

পরবর্তী সময়ে জেমস বন্ড সিরিজে শন কনারি আরো চারটি-ফ্রম রাশিয়া উইদ লাভ (১৯৬৩), গোল্ডফিঙ্গার (১৯৬৪), থান্ডারবল (১৯৬৫) ও ইউ অনলি লাইভ টুয়াইস (১৯৬৭) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। মাঝখানে বিরতি দিয়ে ১৯৭১ সালে নির্মিত ডায়মন্ডস আর ফরএভার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে কনারি পুনরায় বন্ড হিসেবে ফিরে আসেন। ১৯৮৩ সালে ইয়ন প্রোডাকশনের বাইরে নেভার ছে নেভার এগেইন চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেছিলেন। এর ফলে কনারি টানা ২১ বছর মানে সবচেয়ে দীর্ঘসময় বন্ড হিসেবে নিজেকে বিশ্বে তুলে ধরেন। তার অভিনীত বন্ড সিরিজের সাতটি চলচ্চিত্রই বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সফল হয়েছিলো।

 

২.

স্কাইফল জেমস বন্ড সিরিজের ৫০ বছর পূর্তিতে ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ চলচ্চিত্র; যাতে বন্ড চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় ব্রিটিশ অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেইগ। ২০০৬ সালে ক্যাসিনো রয়্যাল দিয়ে তিনি বন্ড চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন; ২০০৮ সালে বন্ড সিরিজের ২২তম চলচ্চিত্র কোয়ান্টাম অব সোলাস-এও ক্রেইগ অভিনয় করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলো-এমজিএম, কলাম্বিয়া পিকচার্স ও সনি পিকচার্স এন্টারটেইনমেন্ট। জেমস বন্ড নাম ভূমিকায় অভিনয়কারী হিসেবে ধারাবাহিকভাবে তৃতীয়বারের মতো রয়েছেন ড্যানিয়েল ক্রেইগ এবং খলনায়ক রাউল সিলভা চরিত্রে আছেন জেভিয়ের বার্ডেম। চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য করেছেন জন লোগান, নিল পার্ভিস ও রবার্ট ওয়াদে।

স্কাইফল-এর কাহিনীচিত্র একেবারেই সমসাময়িক পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। জেমস বন্ডের এই কিস্তিতে টার্গেট ছিলো উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের একটি তুলনামূলক বিচারের চেষ্টা। মূল উদ্দেশ্য সাইবার-টেররিজমের একটি উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা। খলনায়ক রাউল সিলভা চরিত্রে জেভিয়ের বার্ডেম; যিনি এনএটিও’র (ন্যাটো) গোপন তথ্য ফাঁস করে দেন। এখানে পরিষ্কারভাবে তাকে অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আংশিকভাবে আরো দেখানো হয়েছে, সিলভা’র যৌনতা নিয়ে স্নায়বিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা। যদিও বিষয়টিকে কাহিনীর কম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখানো হয়। অ্যাসাঞ্জের থেকে সিলভা’র ভিন্নতা হলো আমেরিকার সঙ্গে তার বৈপরীত্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থেই সিলভা এখানে অ্যাসাঞ্জ থেকে আলাদা। কারণ, অ্যাসাঞ্জ উইকলিকস-এ সমগ্র পশ্চিমা শক্তি বিশেষত বিশ্বমোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপকর্ম প্রকাশ করেছেন। আর সিলভা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মোড়ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই স্কাইফল-এ সে শুধুই একজন প্রতিশোধপরায়ণ মানুষ। এমআইসিক্স-এর দায়িত্ব পালনে কারাভোগের যন্ত্রণা ও নিপীড়ন তার এই প্রতিশোধপরায়ণতার কারণ।

ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনেও তার কোনো আপত্তি নেই। তির্যকভাবে দেখলে বলা যায়, স্কাইফল-এ বাস্তবতার উল্টোদিক খুব ভয়ানকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কারণ, এটা আমরা কম বেশি সবাই জানি যে-বাস্তবিকপক্ষে অ্যাসাঞ্জকে দুষ্কৃতিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে আমেরিকা এবং ব্রিটেনের গণমাধ্যমগুলো। আফগানিস্তান, ইরাক, জিম্বাবুয়েসহ অসংখ্য দেশের সঙ্গে তারা যে কূটনৈতিক অপতৎপরতা চালিয়েছে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিয়েছে অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস। অ্যাসাঞ্জের মতো মানুষের সহজবোধ্য প্রণোদনা এবং তাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে অনেকটা বিবস্ত্র করার চেষ্টা কখনোই ইতিবাচক হতে পারে না। বিবিসি, সিএনএন অথবা ফক্স নিউজের মতোই হলিউড পশ্চিমা গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। যদিও ব্রিটিশ চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির পরিচয় এবং হলিউডের সঙ্গে এর সম্পর্ক একটি বিতর্কিত ইস্যু।

 

৩.

১৯৬২ থেকে ২০১২-দীর্ঘসময়ে জেমস বন্ড সিরিজের মোট ২৩টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে কিছু বিষয় মুক্তিপ্রাপ্ত প্রায় সব চলচ্চিত্রেই বিদ্যমান; এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ক. জেমস বন্ড পরিচয়জ্ঞাপক গান্ ব্যারেল সিকোয়েন্স, যেখানে দেখানো হয় বন্ড অস্ত্র হাতে হাঁটছে, হঠাৎ মোচড় কেটে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাক করে শুট্ করে; সম্ভাব্য আততায়ীকে লক্ষ্য করে এটা একপ্রকার শাসানি। এই গান্ ব্যারেল সিকোয়েন্স চলচ্চিত্রের একেবারেই প্রথমে অথবা শেষে দেখানো হয়। খ. বিভিন্ন ধরনের ছোটো-ছোটো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি-যা সাই-ফাই (সায়েন্স ফিকশন) মুভিকেও হার মানায়। গ. যৌন আবেদনময়ী নারী, যারা বন্ডকে মারার চেষ্টা করে; কখনোবা তার মোহাসক্ত হয়ে পড়ে, সঙ্গে অর্থহীন-অর্থপূর্ণ যৌনতা। ঘ. অপেক্ষাকৃত পুরনো স্থানে অস্বাভাবিক মারামারি, খ্যাপাটে ধাওয়া করার দৃশ্য, কখনোবা বিভীষিকাময়। ঙ. যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’র (সিআইএ) সাহায্য, সহায়তা, উপকার বা অনুবল। চ. মদ বা সুরা জাতীয় পানীয় আর তার সঙ্গে জুয়াখেলা। ছ. অসার্থক সামাজিক প্রয়াস এবং আগের কোনো বন্ড চলচ্চিত্রের রেফারেন্স। জ. চূড়ান্ত মারামারির জন্য বিশাল ব্যয়বহুল সেট।

ইয়ান ফ্লেমিং ১৯৫২ সালে ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ লেখার মাধ্যমে যখন জেমস বন্ডের আত্মপ্রকাশ করেন তখনই এটাকে কোল্ড-ওয়ার যুগের প্রোপাগান্ডা পণ্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বন্ড স্বাধীনতাকামীদের দুমড়ে-মুচড়েই দিক, জনপ্রিয় সরকারকে অপসারণ করুক কিংবা রাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক ও শাসককে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক নির্মমভাবে হত্যা করুক না কেনো; এর পাঠক ও দর্শকশ্রোতা কিন্তু বন্ডকে অতিক্রিয় একজন পুরুষ, কমিউনিস্ট বিরোধী ও অতি মানবীয় সৈনিক হিসেবেই দেখতে পায়-যে সাম্রাজ্যবাদী আনুগত্য থেকে কখনোই পিছু হটেনি।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কোল্ড-ওয়ার পরবর্তী সময়ে হলিউড অনেকটা বাধ্য হয়েই জেমস বন্ডকে পুনরুদ্ভাবন করেছিলো। ১৯৯৫ সালে গোল্ডেন আই ছিলো তার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ। এর পরে জেমস বন্ডকে একেবারে প্রত্যক্ষভাবে আধুনিক বিশ্ব-রাজনীতির প্রতিফলক হিসেবে দেখা যায়। কোরিয়ায় আগ্রাসন নিয়ে ডাই অ্যানাদার ডে এবং আফ্রিকায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্যাসিনো রয়্যাল-এ যে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। বাস্তব জীবনে আমরা জেমস বন্ডের অনুপ্রবেশ দেখতে পাই দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মতো সংগঠনকে যখন বর্ণবাদের বিপক্ষে কথা বলার জন্য সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়; একইভাবে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ মুভমেন্টকেও একই সারিতে ফেলা হয়। অর্থাৎ ভিন্নমত পোষণকারীরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক যাই হোক না কেনো, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি বা সংগঠনকে প্রতারকের মতো দমিয়ে রাখার চেষ্টা তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। অথচ এই যুক্তরাষ্ট্রই কিন্তু পরবর্তী সময়ে নেলসন ম্যান্ডেলাকে নির্লজ্জের মতো ভুরি ভুরি সম্মানে সম্মানিত করেছে। অর্থাৎ তারা নিজেদের স্বার্থে সমসাময়িক বিশ্বের মোড়লিপনা ধরে রাখতে যেকোনো কিছুই করতে পারে। 

স্কাইফল-এ তথাকথিত সাইবার-টেররিজমকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা একই বৈশিষ্ট্যের অংশ। এখানে অন্যায়ভাবে যুক্তি প্রদর্শন করার চেষ্টা করা হয় যে, এমআইসিক্স-এর গোপন তথ্য ফাঁস হওয়াই সাধারণ নিরপরাধ লোকের মৃত্যুর কারণ। এই একটি খোঁড়া যুক্তি দিয়ে সিলভা’র সাইবার-টেররিজমকে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এটা আমাদের অনেকের কাছে স্পষ্ট যে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এটা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। উইকিলিকসকে নিয়ে এই অভিযোগের ভণ্ডামিটাই হলো চরম সন্ত্রাস বা নিষ্ঠুরতা। যেখানে সন্ত্রাস দমনের নামে আমেরিকা নিরপরাধ লোকদের সঙ্গে ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া অনেক ভিডিও বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেছে তাদের অপকর্মকে।

 

৪.

চলচ্চিত্র একটি দেশের সংস্কৃতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। একটি ভালো চলচ্চিত্র একটি নতুন ভাবনা বা অনুভূতিকে স্পষ্ট ভাষায় রূপ দিতে সক্ষম; একইভাবে দর্শক-শ্রোতাদেরকেও তাদের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি, অনুমান ও সংস্কার সম্পর্কে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। গণমাধ্যম হিসেবে কিছু কিছু টেলিভিশন চ্যানেলের নিরপেক্ষ থাকবার একপ্রকার সীমাবদ্ধতা থাকে; কিন্তু চলচ্চিত্রে তার কোনো বালাই নেই। সীমাবদ্ধতাটা একটু লাগামছাড়া হওয়ার জন্যই এর প্রতিফলনও তাই সমাজে অবশ্যম্ভাবী। একই কারণে এর সমালোচনাও স্বাভাবিক। যোগাযোগের নতুন এবং বিদ্যমান ধারণা অডিয়েন্সকে পরিবর্তিত বিশ্বের বিভিন্ন পথ সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে পারে। যেকোনো দেশের চলচ্চিত্র যেকোনো দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে পারে। এই কায়দায় এই মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের বিশ্বজোড়া ব্যবস্থার ওপরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমাশক্তি। যার অন্যতম অংশীদার ব্রিটিশ চলচ্চিত্র। তাদেরই অনেকটা অমর সৃষ্টি বন্ড, জেমস বন্ড।

ব্রিটেন হচ্ছে আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো মিত্র। তাদের ইতিহাস, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির যেমন মিল আছে, তেমনই বৈদেশিক নীতি এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও এর সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটেন যদিও হলিউডের ওপর অনেকটাই ঋণী তাদের প্রচার ও প্রসারের জন্য; কিন্তু আসলে তারা হলিউডের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি বর্ধিত অংশ। পরিষ্কারভাবে বলা যায়, ব্রিটিশ চলচ্চিত্র সংস্কৃতিতে হলিউড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। হলিউডকে বর্তমান সময়ে ভৌগোলিকভাবে নির্দিষ্ট করা সহজ নয়।

আধুনিক চলচ্চিত্র বিশ্বে একটি আধিপত্য বিস্তারকারী প্রতিষ্ঠান হলিউড। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের প্রেক্ষাগৃহ থেকে শুরু করে চতুর্দিকে বিক্ষিপ্তাবস্থায় হলিউডের চলচ্চিত্র পাওয়া যায়। অনলাইন ব্যবস্থায় এটা মানুষের কাছে আরো সহজলভ্য হয়েছে। এই সুযোগটাই তারা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অবাধ প্রবাহ হলিউডের আধিপত্যকে সুসংহত করছে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশনের আবিষ্কার হলিউডকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে; আর এটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে মার্কিনিরা তাদের ফিল্ম প্রোডাকশন পুনর্গঠন করে, যার সুফল তারা এখন ভোগ করছে।

 

৫.

উল্লিখিত আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, চলচ্চিত্র হিসেবে ‘জেমস বন্ড’ সমসাময়িক আর্থ-সমাজিক, রাজনৈতিক ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতিফলন। আর জেমস বন্ড চরিত্রটি ইঙ্গ-মার্কিন মোড়কে আচ্ছাদিত অন্তর্জ্ঞানলব্ধ একজন ব্রিটিশ হিরো, যে ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করে এবং এই গোয়েন্দাকে হলিউডে পাঠিয়ে পৃথিবীব্যাপী পশ্চিমা সভ্যতার হিরো হিসেবে দেখানো হয় এবং বর্তমানে এই হিরো নিছক একজন ব্রিটিশের ঊর্ধ্বে উঠে ইঙ্গ-মার্কিন সংস্কৃতি অনুসরণ করে। কর্মক্ষেত্রে তার ভূমিকা পশ্চিমা মূল্যবোধের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিপাদন করা। কোনো বিশেষ প্রবণতাসম্পন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রকৃতি স্বরূপ এবং তাকে উপস্থাপনের পালাক্রমও পরিবর্তিত, কিন্তু ধরন একই। অর্থাৎ বন্ডের মূল দ্যোতনা নির্ধারিত, যদিও তার নির্দেশনা বা উপস্থাপনা পরিবর্তিত। নির্বিশেষে এটাই প্রতীয়মান-যে নায়কই জেমস বন্ডের চরিত্রে অভিনয় করুক না কেনো, তার চারিত্রিক গূঢ়ার্থ সবসময়েই একই অবস্থানে। বন্ডের এই পরিবর্তনশীল, কিন্তু প্রোথিত প্রকৃতির গূঢ়ার্থই-তাকে তথাকথিত জনপ্রিয় সংস্কৃতির পৌরাণিক চরিত্রে উপবিষ্ট করেছে। বন্ডের এই পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে সুবিন্যস্তভাবে বর্ণনা করেছেন সেমিওটিক তাত্ত্বিক বার্থেস; তার মতে, প্রতীক ও অর্থ মিথ সৃষ্টি করে, আর এই মিথগুলোই সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শকে স্পষ্টভাবে রূপ দিতে সক্ষম। আর এভাবেই বন্ড জনপ্রিয় সংস্কৃতির ধারায় ইঙ্গ-মার্কিন ভাবাদর্শের অবতার হয়ে উঠেছে।

 

লেখক : এবিএম সাইফুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।

mon_mcru@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র


১. http://www.fightbacknews.org/2012/11/14/her-majesty-s-imperialist-service-skyfall-and-politics-007-2012

২. Arnett, P. (2009 : 2); 'Casino Royale and Franchise Remix : James Bond as Superhero'; Film Criticism, 33(3) : 1-17.

৩. Chandler, D. (2002 : 145); Semiotics : the Basics; Abingdon & New York : Routledge.



বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন