Magic Lanthon

               

জুলফিকার মতিন

প্রকাশিত ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্র : প্রজন্মের ভার

জুলফিকার মতিন


শিল্প মাধ্যম রূপে সিনেমার জনপ্রিয়তা এখন প্রশ্নাতীত। প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াও বিভিন্ন টেলিভিশন কেন্দ্রগুলো থেকে এর নিয়মিত প্রদর্শনী চলছে। ভিডিও ক্যাসেট একে একবারে ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী করে তুলেছে। আমাদের দেশে খুব অল্পদিন আগেও সিনেমা দেখাটা ছিলো অনেকটা পারিবারিক উৎসবের মতো। গৃহকর্তা তার স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নিয়ে রীতিমতো প্রোগ্রাম করে এই ব্যাপারটি সারতেন। অতিথি-অভ্যাগত এলে এটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো সামাজিক আপ্যায়নের একটি রীতি হিসেবে। এখন যেমন করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় চাইনিজ খাওয়াতে। যাহোক, টেলিভিশন কিংবা ভিসিআর-ভিসিপির কল্যাণে উচ্চবিত্তের তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও একটি বড়ো অংশের সিনেমাহলে গিয়ে ছবি দেখাটা কমে এলেও, সাধারণভাবে মানুষ এখনো এজন্য প্রেক্ষাগৃহের ওপরই নির্ভরশীল। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, কোথায় কিভাবে সিনেমা দেখা হচ্ছে, তার রকম-সকম বদলালেও, তা দেখানোর আয়োজন কিংবা তা দেখার আগ্রহ বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।

আমি নেহাতই গ্রামের ছেলে। বাল্য-কৈশোর কেটেছে সেখানে। ওখানে চাঁদভর্তি আকাশ ও দূষণমুক্ত বাতাস এবং আর  আর  যাই থাক, সিনেমা দেখানোর কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। এবং এ কথাটাও আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যে, ছেলেমেয়েরা যে যে কারণে উচ্ছন্নে যেতে পারে, তার একটি হলো সিনেমা দেখা এবং আর  একটি হলো তাস খেলা। তো না থাক সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা, আমরা কিন্তু ওই প্রলুব্ধকর বস্তু সম্পর্কে অনবহিত ছিলাম না। অনেকেই কাজে-কর্মে মহকুমা কিংবা জেলা শহরে যেতেন এবং সেখানে রাত্রিবাসের প্রয়োজন পড়লে পতিতালয়ে গমন করতেন কি না জানি না, তবে যে কাজটি তারা ধর্মপালনের মতোই নিষ্ঠা সহকারে করতেন, তা হলো ফার্স্ট কিংবা সেকেন্ড শোতে সিনেমা দেখা। এবং ফিরে এসে সেসব গল্প তারা যা বলতেন, তা শুনে সিনেমা না দেখার দুঃখ এতিম হওয়ার শোকের মতো বাজতো। তবুও সেসময় জেলা ও মহকুমা শহরে গিয়ে দু-চারটে বই দেখার সুযোগ যে হয়নি, তাও নয়। দু-একটার কথা, সেই ৫০-এর দশকে, মনে আছে; সেগুলো হলো-জেমিনির বহুৎ দিন হুয়ে। মধুবালা অভিনয় করেছিলেন ওতে। বিকাশ রায় অভিনীত মা ছেলে। মনে পড়ে, এসব বই দেখে কেঁদে-কেটে চোখ প্রায় ভাসিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপারও ঘটেছে।

আমার নিয়মিতভাবে সিনেমা দেখার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি থেকে, যখন আমি সিরাজগঞ্জ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ভর্তি হই। শহরে তখন দুটো সিনেমাহল ছিলো, একটি  ‘লক্ষ্ণী’ অন্যটি ‘মমতাজ’। এর দুবছর পর যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি, তখনো তাতে ছেদ পড়ে না। রাজশাহীতেও তখন দুটো সিনেমাহল ছিলো- ‘অলকা’ আর  ‘কল্পনা’। এর বেশ কিছুদিন পর ৬০ দশকের শেষ দিকে ‘বর্ণালী’ হলও যুক্ত হলো তার সঙ্গে। তখনকার দিনের হিসেবে অত্যাধুনিক করে গড়ে তোলা হয়েছিলো একে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ উত্থানের সেই দিনগুলোতে সিনেমা শুরুর পূর্বে কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাতেন। সেটিও ছিলো বাড়তি আকর্ষণের বিষয়। যাহোক, সিনেমা দেখার যে খুব প্রবল আকর্ষণ আমি অনুভব করতাম, তা নয়। তবুও মনে হয়, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী শহরে ছাত্রজীবন কাটানোর সময় তখনকার সিনেমাহলগুলোতে যেসব বই এসেছে, বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া, আমি তার সবই দেখেছি। এই হিসাবটা খুব কি একটা বেশি হয়ে যাচ্ছে? বোধ হয়, তা নয়। কেননা হলগুলোতে বই বদল হতো শুক্রবার। কোনো বই চলতো সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে। সে হিসাবে কোনো হলই ন্যূনধিক ২০টির বেশি বই দেখাতে পারতো না। অধিকাংশ বইয়েরই, বিশেষ করে লাহোর ও করাচি থেকে যেসব উর্দু ছবি আসতো, আজ  কোনোটারই বিষয়বস্তুর কথা মনে নাই। কেননা মনে রাখার মতো তেমন বইই তারা বানাতে পারতো না। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় থেকে ভারতিয় বাংলা ও হিন্দি ছবি আসা বন্ধ হয়ে যায়। সেই ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত বলবৎ আছে।

বলা বাহুল্য, তখনকার সিনেমা দেখার যে অভিজ্ঞতা প্রায় ক্ষেত্রেই তা বিমুগ্ধ হওয়ার। বেশি বয়সী মেয়ের প্রেমে পড়ার একটা বর্ণনা আছে ইভান তুরগেনিভের এক উপন্যাসে। বাংলা অনুবাদও বেরিয়েছে তার। ‘প্রথম প্রেম’ নাম দিয়ে ভাষান্তর করেছেন আলী আহমদ (১৯৯১)। আসলে এটি তুরগেনিভের আত্মজৈবনিক কাহিনী। ১৫ বছর বয়সেই তিনি প্রেমে পড়েছিলেন তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো এক  মেয়ের সঙ্গে। আমার ও আমাদের ওই সময়ের নায়িকারা ছিলেন বয়সে বড়ো। আর  বাস্তবতা তাদের তুরগেনিভের নায়িকার মতো ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে পাওয়া যায়নি। সবাই ঘোরাফেরা করতেন রূপালি পর্দায়। কিন্তু তারা হয়ে উঠেছিলেন আমাদের স্বপ্ন নায়িকা; মধুবালা-নার্গিস কিংবা বৈজয়ন্তীমালা-ওয়াহিদা রহমান-এই রকম আরো অনেকে। আর সবার উপরে ছিলেন সুচিত্রা সেন। বাঙালি বলেই বোধকরি তার প্রতি আমাদের পক্ষপাতটা ছিলো বেশি। এদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তীকালে সামাজিকভাবে পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যেমন, নার্গিস কিংবা বৈজয়ন্তীমালা। এরা রাজ্যসভার সদস্য পর্যন্ত হয়েছিলেন। কানন দেবীর ব্যাপারটাও তাই। তবে তার কথাটি বলছি না এজন্য যে, তার ওপর অধিকার আমাদের পূর্ব প্রজন্মের। এখানকার অনেক ভারতিয় নায়িকাও, যেমন শাবানা আজমি কিংবা অপর্ণা সেন তাদের অভিনেত্রী পরিচয়ের বাইরেও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন একটা সদর্থক ইমেজ। আমাদের দেশের সিনেমার নায়িকাদের এখনো তাদের মতো তেমন কোনো সামাজিক ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। জানি না, কতোদিনে এ অভাব পূরণ হবে।

যাহোক, এখন হয়তো আর আগের মতো সিনেমা দেখি না। তবে একেবারেই যে দেখি না, তা নয়। কেননা সিনেমার যে বন্যা চতুর্দিকে চলছে, কেবল্‌ কানেকশন-ভিসিআর-ভিসিপি যেভাবে মোটামুটি মধ্যবিত্তদেরও জীবন গ্রাস করে ফেলেছে, সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে সিনেমাহল পর্যন্ত যাওয়া দরকার পড়ে না, অনিচ্ছা থাকলেও দেখা হয়ে যায়। তাতে আমার মনে হয়েছে, আমাদের সমাজ-জীবনে কী মাস্তানই বলি, কী ভায়োলেন্সই বলি, তার পিছনে এই সিনেমা, বিশেষ করে হিন্দি ছবির অবদান নেহাৎ কম নয়। হিন্দি ছবির কথাটা বিশেষভাবে বলছি এজন্য যে, পরিমাণে তা বেশি দেখার সুযোগ হচ্ছে। পিয়াজ, মরিচ, ডাল, চিনি, চাল, হালাল মতে জায়েজ হওয়ার জন্য প্রতিক্ষারত গরু ও অন্যান্য যাবতীয় জিনিসের মতো হিন্দি ছবিও আসছে দেদার। সিনেমাহলে এগুলো দেখার কোনো বৈধ ব্যবস্থা না থাকলেও লোকের দেখা বন্ধ থাকছে না মোটেই। চিরকালই হিন্দি ছবির জৌলুস বেশি। পোশাক-পরিচ্ছদে স্বল্পতা, চলন-বলন-নৃত্যগীত এসব দিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার কাজে তাদের পারঙ্গমতা অনেক বেশি কার্যকর। সেখানে ভালো ছবিও হয়; আর্ট-ফিল্ম যাকে বলে তাও হয়। অনেক ছবিতে আর্থ-সামাজিক শোষণের মূল বিষয়গুলোকে ছিনে-নিঙড়ে বের করে আনা হয়। এসবের পরেও হিন্দি ছবি সম্পর্কে সাধারণভাবে যেটা বলা যায়, তাহলো-প্রায় প্রত্যেক ছবিতে একটা নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। পাপের পরাজয় আর  পুণ্যের জয় ঘোষণা করাটাকেই মুখ্য করা হয় সর্বত্র। কিন্তু এই ছবিগুলোই যখন উঠতি বয়সের কিশোর তরুণেরা দেখে, ফলাফল দাঁড়ায়, বোধকরি আমাদের স্কুলগুলোতে ধর্মশিক্ষা দেওয়ার পর বদমায়েশ হওয়ার যে উর্দ্ধহার দেখা যাচ্ছে তার মতো। নায়ক, গুণ্ডা কিংবা মাস্তান হলেও একাই পিটিয়ে শায়েস্তা করছে ১০ জনকে। তার ভিতর ফুটে উঠেছে তার হিরোশিপ। এই হিরোশিপের ভিতর দিয়ে যে রোমান্টিক প্রণোদনা তা বাস্তবের নায়কদের মানে আমাদের কিশোর-তরুণদের করে দিচ্ছে উথাল-পাথাল।

ভিলেন চরিত্রগুলোর ভিতর দিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের যে চিত্র উন্মোচিত হচ্ছে, তা তাদের মনে সৃষ্টি করছে রোমাঞ্চকর অনুভূতির। আকর্ষণ করছে পতঙ্গের মতো। দুর্বৃত্ত নায়কও একটি সুন্দরী নায়িকার লোভনীয় দেহ ও প্রেমমুগ্ধ হৃদয়ের যেভাবে কৃষ্ণ গোপাল সেজে বসে থাকে এবং কাহিনীর শেষে সামান্য অনুশোচনা দ্বারাই ভালোমানুষের মর্যাদা পায়, তাই বা কম কিসে? আসলে বিচারে অপরাধীর দণ্ড হচ্ছে, কিংবা মনস্তাপই একজন হিরোকে শুদ্ধ করে তুলছে-এই বিষয়টি মাইনাস করে আর  যা যা আছে, তাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের অনুপ্রেরণা ও কর্মসক্রিয়তার উৎস। ইংরেজি থ্রিলার কিংবা ওয়েস্টার্ন ছবি কিংবা সিরিয়ালগুলোর বেলাতেও এ কথা সত্যি। আমাদের দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচার ব্যবস্থা, সেটাও তাদের ফিল্মের মাস্তানদের মতো হওয়ার ব্যাপারে হাওয়া দিচ্ছে। সবাই দেখছে অপরাধের কোনো বিচার নেই। অপরাধীর কোনো শাস্তি নেই। সরকার নিজেই তার সমর্থকদের নিচ্ছে না কোনো হিসাব, আর তা না নিলে অন্যের অবৈধ অস্ত্রেরই বা খোঁজ করে কী করে? অতএব  মাস্তান সাজো। রাজনৈতিক দলে, সরকারি দলে হলে বেশি ভালো, নাম লেখাও। সাত খুনতো খুন, ১৪ খুনেরও কোনো হিসাব থাকবে না। হিন্দি ফিল্মের শিক্ষাতো রয়েছেই। তবে সে শিক্ষা নৈতিকতার নয়-পেশি দক্ষতার।

সত্যি বলতে কী, এই অবস্থাটার মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। আমাদের দেশেই বা কী হচ্ছে? এখানকার চিত্রনির্মাতারা ব্যবসা যতোই করুন, পরিচালকেরা যতোই আত্মশ্লাঘা অনুভব করুন, তার পরিমাণও কিন্তু ওই বানানো ছবির আইডিয়া ও ইমাজিনেশনের মতোই ছোটো মাপের। এদিক দিয়ে অবশ্য কলকাতার বাংলা ছবির দাদারাও একই রকম কৃতিত্বের (?) অধিকারী। তার মানে, ব্যতিক্রম বাদে দুজায়গার বাংলা ছবিই বস্তাপচা। কৃত্রিম। আমি সেন্টিমেন্টালিজম ও মেলোড্রামাকেও ততো দোষের বলে মনে করছি না। কিন্তু উভয় স্থানেরই বাংলা ছবিতে বিষয় উদ্ভাবনের সমস্যা যেমন প্রকট, তেমন বিষয়বস্তু যা আছে, তা তুলে ধরার অক্ষমতাও সীমাহীন। কিছুদিন আগে দক্ষিণ ভারতের একটি ছবি দেখেছিলাম, যেখানে নায়িকা তার বিবাহ পূর্বকালের, সামাজিকভাবে অবৈধ সন্তানকে প্রতিপালনের জন্য এতিমখানায় রাখে। একটি নিঃসন্তান দম্পতি সেখান থেকে সন্তানটিকে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সন্তানের পিতা নয়, এমন একজনের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হওয়ার পর বিষয়টি সে তাকে জানায়। স্বামীও তার স্ত্রীর বিবাহপূর্ব সন্তানকে নিজেদের কাছে রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করে। এখন যারা সন্তানটিকে নিয়ে গেছে, ইতোমধ্যেই তার প্রতি তাদের তীব্র বাৎসল্য বোধের সৃষ্টি হয়েছে। তারাই বা ফেরৎ দেবে কেনো? বলতে পারেন সমস্যাটি আমাদের জন্য কিছুটা আরবান। কিন্তু ঠিক এ জাতীয় আরবান নয়, এমন বহু সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাভিত্তিক ছবি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায়তো বটেই, এমনকি অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষাতেও হচ্ছে-যার ধারেকাছেও আমরা যেতে পারছি না।

আগেই বলেছি, কলকাতার বাংলা ছবি আমাদের মতোই নিকৃষ্ট। তবে এটাও ঠিক যে, সেখানকার চিত্রনির্মাতারা অনেক ঐতিহ্যানুগ অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব কিংবা জাতীয় জীবন সম্পৃক্ত বিষয়ের ছবি করার ঝুঁকি নেন। জাতীয় রুচি গঠনের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না কেউ। আমাদের এখানে তেমনটি দেখা যায় না। ঐতিহাসিক কিংবা অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, জাতীয় জীবনের কোনো ঘটনা কিংবা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা প্রগতিশীল ইস্যু নিয়ে সৃষ্ট ছবি খুব কম। ঐতিহ্য বলতে আমরা কেবল বুঝি লোককাহিনী। মুম্বাইয়ের ছবির মারপিট দাঙ্গা-হাঙ্গামা খুব পছন্দ করি বলে চেষ্টা চলে তারই অনুকরণের।

আমাদের ছবিতে আর একটি জিনিসেরও অভাব খুবই প্রকট। এখানে কোনো প্রতিষ্ঠিত কিংবা প্রতিভাবান লেখকের কাহিনী চিত্রায়িত করার কোনো উদ্যোগ নেই। আপনারাই বলুন, কটা ভালো উপন্যাস কিংবা ভালো গল্প নিয়ে সিনেমা হয়েছে? ইংরেজি কিংবা অন্যান্য ভাষার কথা ছেড়েই দিলাম। কলকাতাতেও একসময় বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের কাহিনী নিয়ে সিনেমা হয়েছে। মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্করও বাদ পড়েননি। এছাড়া একেবারেই সম্প্রতি যারা ভালো লিখেছেন, তাদের লেখাও সিনেমাতে আসছে। কিন্তু এখানে সেসবের বালাই নেই। এদিক দিয়ে আমরা সাফসুতরো হয়ে আছি। আমরা ভালো বিষয়বস্তুও দিতে পারছি না, ভালো কাহিনীও নিচ্ছি না, আবার হিন্দি ফিল্মে নায়িকাদের মতো আমাদের এদের ন্যাংটাও (!) করা যাচ্ছে না। খালি পর্দায় চলছে লেফ্‌ট-রাইট মানে নায়ক-নায়িকাদের নৃত্যের নামে একবার সামনে যাওয়া আর একবার পিছনে আসা। আর সেই সঙ্গে চলছে মূল্যবোধের দিক দিয়ে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতা। সংস্কারাবদ্ধ জীবন, অদৃষ্টবাদীতা, নারীর ব্যক্তিত্বহীনতা-এগুলোর ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে তথাকথিত স্থিতিশীল সমাজের ছবি। প্রথা ভাঙার কোনো ব্যাপার নেই; প্রশ্ন নেই সামাজিক দায়বদ্ধতার। আগ্রহ নেই রুচিসম্মত দর্শক সৃষ্টি করার। কেননা, এসব করতে গেলে নগদ লাভের সম্ভাবনাটা কম। অতো ধৈর্য্য ধরবে কে?

বাংলা ছবির কথাটা যাক। এ প্রসঙ্গে বোধ করি আর একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। সাধারণভাবে ছবিতে সেক্স কিংবা প্রাইভেট লাইফকে নিয়ে আসা হচ্ছে বাস্তবতার নামে। কিন্তু বাস্তব জীবনেও মানুষ এসব আচরণ গোপনীয়ভাবেই করে। সে কথা মনে রাখছে না কেউ। এতে ফিল্মের কুসুম কী ফুটছে জানি না, কিন্তু ফল যে ভালো হচ্ছে না, তাতো দেখাই যাচ্ছে।

 

দায়স্বীকার : এই প্রবন্ধটি ১৯৯৬ সালের ১২ জানুয়ারি ভোরের কাগজ-এ প্রকাশ হয়। লেখকের পরামর্শ মতো প্রবন্ধটি সামান্য সংযোজন-বিয়োজন করে ছাপা হলো।

 

লেখক : অধ্যাপক জুলফিকার মতিন মূলত কবি; লিখেছেন গল্প, উপন্যাস সংবাদপত্রের কলামরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ ৪৩ বছর শিক্ষকতার পর সম্প্রতি অবসর নিয়েছেনতার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘স্বৈরিণী স্বদেশ তুই’(১৯৭২), ‘তাই তো সংবাদ নেই’ (১৯৯৯), ‘বৈশাখে ঝড় জল রোদের কবিতা’ (২০০০), ‘ঘামের ওজন কত ভারী’ (২০০১), ‘দুঃখ তোমার দীর্ঘশ্বাস’ (২০০৫), ‘এই সংবাদ এই একুশে’ (২০০৭); উপন্যাস : ‘সাদা কুয়াশার পাখি’(১৯৮৮), ‘রৌদ্র ছায়া ভালবাসা’ (১৯৯০), ‘বাড়ীর নাম পান্থশালা’ (১৯৯০), ‘মানব মানবী’ (১৯৯৬); গল্পগ্রন্থ : ‘আকাশবাসর’ (১৯৯৯), ‘পাগল হবার রূপকথা’ (১৯৯৯), ‘রাখ তোমার উদ্যত বাহু’ (১৯৯৯), ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ (২০০০), ‘অন্যরকম’ (২০০০), ‘অন্ধকারের জন্তুরা’ (২০০৭)।

zulfiquermatin@yahoo.com   

 বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।  

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন