ইব্রাহীম খলিল ও মাহামুদ সেতু
প্রকাশিত ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
জনতার অপেরা পুঁজিপতির সোপ
ইব্রাহীম খলিল ও মাহামুদ সেতু

আবহমানকাল থেকে মানুষ চিত্তবিনোদনের জন্য লোকজ সংস্কৃতি, সঙ্গীত, নৃত্য, শিল্পকলা, খেলাধুলা, চলচ্চিত্র, বেতার, টেলিভিশনসহ নানা উপকরণের দ্বারস্থ হয়ে আসছে। যান্ত্রিক মাধ্যমগুলো আসার আগে দর্শকদের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে অনুষ্ঠানস্থলে যেতে হতো কোনো কিছু উপভোগ করার জন্য, যা মোটেও সহজসাধ্য ছিলো না। বেতার প্রযুক্তি সে-সমস্যা অনেকাংশে দূর করে ঘরে ঘরে সংবাদ, গান, নানারকম অনুষ্ঠান পৌঁছাতে শুরু করে। তবে অভাবনীয় এই প্রযুক্তির বড়ো অসুবিধা ছিলো, দৃশ্যমানতার অভাব। যার সমাধানও হয় ১৯২৬ সালে টেলিভিশন উদ্ভবের মাধ্যমে। কথার সঙ্গে দৃশ্যমানতার উপস্থাপন টিভিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়।
তবে পুঁজি নামের অস্ত্রটি টেলিভিশনে যুক্ত থাকায় চ্যানেলওয়ালারা এর দর্শক-শ্রোতার মনোজগতে ‘উপনিবেশ’ কায়েমের চেষ্টা চালায়। এ-জন্য প্রতিনিয়ত টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নাচ, গান, নাটক, সোপ অপেরা, সিনেমা, খেলাধুলা, সংবাদ, এমনকি বুদ্ধিজীবীদের আলাপচারিতাসহ বিভিন্ন ধরনের আধেয়ের পসরা সাজানো শুরু করে। সমসাময়িক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মধ্যে সোপ অপেরা (যা ডেইলি সোপ, মেগাসিরিয়াল কিংবা সিরিয়াল নামে পরিচিত) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধেয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
‘বাংলাদেশে এর শুরুটা সেই ১৯৯৯ সালে, বেসরকারি টিভি ‘চ্যানেলআই ’এ জোয়ার ভাটা নামে ডেইলি সোপের মাধ্যমে। আব্দুল্লাহ আল মামুন এর পরিচালনায় সোপটি ১০০ পর্ব শেষ করে। এরপর দীর্ঘ দিন আর ডেইলি সোপ প্রচার হয়নি। ২০০৭-০৮ সালে এটি নতুন করে চালু হতে থাকে। এ সময় মহানগর, গুলশান এভিনিউ, ডলস হাউস বেশ জনপ্রিয় হয়।’১ তবে এর মানে এই নয় যে, এর আগে আমাদের দর্শক ডেইলি সোপের সঙ্গে পরিচিত ছিলো না। মূলত স্যাটেলাইটের বদৌলতে ভারতিয় চ্যানেল বিশেষ করে হিন্দি চ্যানেলগুলোতে ডেইলি সোপের দৌরাত্ম্য আমাদের দেশের নির্মাতাদের চিন্তায় ফেলে; তারই প্রতিক্রিয়া ছিলো দেশিয় ডেইলি সোপ। তবে ভারতিয় চ্যানেলগুলোর ডেইলি সোপের ধারে-কাছে যেতে পারেনি দেশিয় সোপগুলো।
এই উপমহাদেশে এক সময় ডেইলি সোপে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো স্টার প্লাস, জি টিভি, সনি টিভি। কিছু দিন হলো এর পাশাপাশি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্টার জলসা, জি বাংলা, ই টিভি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখন বেশ কয়েকটি চ্যানেল সপ্তাহে ছয় দিনই কেবল সোপ অপেরাই সম্প্রচার করে। প্রশ্ন জাগে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সোপ অপেরা নির্মাণ ও প্রদর্শনের প্রতি এতো আগ্রহের কারণ কি শুধুই জনপ্রিয়তা, নাকি অন্য কিছু? সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ-প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ-জন্য আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সোপ অপেরাগুলো থেকে ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’২ স্টার জলসায় প্রচারিত জনপ্রিয় দুটি সোপ অপেরা মা ও টাপুর টুপুর-কে আধেয় বিশ্লেষণের জন্য বেছে নিয়েছি। ডেইলি সোপ দুটির ৬০ পর্ব করে দেখা হয়েছে। এ-ক্ষেত্রে সরাসরি টেলিভিশনে না দেখে, বাজার থেকে ডিভিডি কিনে কম্পিউটারে দেখা হয়। তবে সোপ দুটির অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য কিছু পর্ব টেলিভিশনে সম্প্রচারের সময়ও দেখা হয়েছে। শুরুতেই সোপ অপেরার সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর স্বার্থ, গণমাধ্যম ও বাজারের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক এবং দর্শক-শ্রোতা কারা-আলোচনা করা যাক।
সোপ অপেরা : গণমাধ্যম, বাজার সঙ্গে দর্শক-শ্রোতা
সোপ অর্থ সাবান, আর অপেরা অর্থ গীতিনাট্য। তবে ‘সোপ’ ও ‘অপেরা’ মিলে ‘সোপ অপেরা’ নামে যে-নতুন ‘বস্তু’র উদ্ভব ঘটেছে তা কিন্তু মোটেও ‘সাবান-নাট্য’ নয়। এটি হচ্ছে, এক বা একাধিক সমস্যার পরস্পর আন্তঃসম্পর্কে চলমান বিশদ ও বর্ণনাত্মক কাহিনীর ক্রমিক চিত্রায়ণ; যা এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে শেষ হয় যে, আগামী পর্ব আরও চিত্তাকর্ষক হবে। এর কাহিনী বিন্যাস এমন-আজ একটি সমস্যার তৈরি, তো কাল সেটির সমাধান।আবার পরশু যে-সমস্যা, পরের দিন সেটির সমাধান। এভাবে সমস্যা-সমাধান-সমস্যা ধারাবাহিকতায় গল্পটি চলতে থাকে। অবশ্য এতে একজন নির্মাতা (এ-ক্ষেত্রে শুধু যে-নির্মাতাই দায়ী এমনটি বলা যাবে না) নির্বিঘ্নেই বছরের পর বছর তার সোপ অপেরা চালিয়ে নিতে পারেন। এটি উপস্থাপনার আঙ্গিক থেকে সোপ অপেরার ব্যাখ্যা।
তবে উদ্দেশ্যের দিক থেকে একে ‘সাবান-নাট্য’ না বললেও, ‘সাবান-বেচা-নাট্য’ বললে অত্যুক্তি হবে না। আসলে সোপ অপেরার জন্মই দিয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্র তৈরির উদ্দেশ্যে। ১৯ শতকের ৩০’র দশকে সাবান তথা প্রসাধনী তৈরির বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন-প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল, কোলগেট-পামওলিভ, লিভার ব্রাদার্স (হালের ইউনিলিভার) প্রভৃতি যে-সমস্ত রেডিও বা টিভি ধারাবাহিকগুলো প্রযোজনা করতো সেগুলোকেই বলা হতো ‘সোপ অপেরা’। ‘এর যাত্রা শুরু ১৯৩৭ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকায় বেতারে, প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল প্রযোজিত গাইডিং লাইট নামক সোপ অপেরা দিয়ে; যদিও টিভিতে এর সম্প্রচার শুরু ১৯৫২ সালে।’৩
প্রথম থেকেই সোপ অপেরাগুলোর দর্শক-শ্রোতা মূলত গৃহিণীরাই; অবশ্য পরে শুধু নারীদেরকেই উদ্দিষ্ট দর্শক-শ্রোতা করে নেয় নির্মাতারা। সেকালে সোপ অপেরার প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য আজকের মতো ৩০ মিনিট ছিলো না; দিনে ১৫ মিনিট করে, সপ্তাহে তা পাঁচ দিন সম্প্রচার হতো। ‘১৯৫৬ সাল থেকে সিবিএস টিভিতে প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল’র প্রযোজনায় তৈরি অ্যাজ দ্য ওয়ার্ল্ড টার্নস ও দ্য এজ অব নাইট প্রথম আধাঘণ্টাব্যাপী সম্প্রচার শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালের শেষ নাগাদ প্রায় প্রতিটি সোপ অপেরা আধাঘণ্টা এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে ১৯৭০ নাগাদ অধিকাংশই এক ঘণ্টার পর্ব সম্প্রচার শুরু করে। এমনকি অ্যানাদার ওয়ার্ল্ড কিছুদিন ধরে দেড় ঘণ্টার পর্বও প্রচার করেছিলো। সোপ অপেরার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সম্প্রচারিত গাইডিং লাইট ও অ্যাজ দ্য ওয়ার্ল্ড টার্নস যথাক্রমে চলেছিলো ৭২ ও ৫৪ বছর।’৪ সোপ অপেরার ইতিহাস থেকে এতোক্ষণে এটি নিশ্চয় স্পষ্ট হয়েছে, গণমাধ্যম তার বিনোদন দেওয়ার দায়িত্বটি পালনের আড়ালে বহুজাতিক বাজার বিস্তারে যথেষ্ট তৎপর, সেকাল থেকেই।
এই উপমহাদেশে সোপ অপেরার ব্যাপ্তি খুব বেশি দিনের নয়। ‘এ-অঞ্চলে ভারতীয় চ্যানেল দূরদর্শন-এ ১৯৮৪ সালে হাম লোক দিয়ে এর যাত্রা শুরু। ১৫৪ পর্বের এই সোপ অপেরাটি সে-সময় ছিলো ব্যাপক জনপ্রিয়’৫; যাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক বিনোদনমূলক চ্যানেল সোপ অপেরাকে তাদের মূল আধেয় করে তুলতে শুরু করে। এতে একদিকে যেমন দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতি ছিলো বেশি, অন্যদিকে এর স্পন্সর হতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহও ছিলো চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি সোপ অপেরার মধ্যে কৌশলে বিভিন্ন পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যাপার তো আছেই। ‘১৯৭৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সোপ অপেরা চলার সময়টাতেই টিভি চ্যানেলগুলো সবচেয়ে বেশি আয় করে থাকে।’৬ যেহেতু সোপ অপেরাগুলো পরিবারকেন্দ্রিক, নারীনির্ভর কাহিনী নিয়ে তৈরি, সেহেতু এর মূল দর্শক থাকে নারী। নারীকে নিয়ে নির্মিত সোপ অপেরা আর নারীর হাতে থাকা টিভি-রিমোট, এক সময় পরিবারের অন্যদেরকে তাদের অজান্তেই এর অন্তর্জালে ডুবিয়ে ফেলে।
আমাদের বাছাইকৃত সোপ অপেরা দুটি পরিবারকেন্দ্রিক ও নারীনির্ভর, যার মূল উপজীব্য-স্বার্থের দ্বন্দ্ব, নারীদের আন্তঃকলহ, ঈর্ষা, আক্রোশ, দাম্পত্য কলহ প্রভৃতি। এখানে, ছোটবেলায় হারানো ‘ঝিলিক’-এর ফিরে আসা এবং পুনরায় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কাহিনী নিয়ে আবর্তিত হয়েছে মা’র গল্প। এর পিছনে কাজ করেছে সম্পত্তির লোভ, ব্যক্তিগত ঈর্ষা ও আক্রোশ। অন্যদিকে সংসারের নানা টানাপোড়েন এবং ‘টাপুর’-এর স্বাধীনচেতা মনোভাবকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলছে টাপুর টুপুর-এর গল্প। আর এখানেও রয়েছে ব্যক্তিগত ঈর্ষা, আক্রোশ ও অহংকারের চিত্রায়ণ। তবে সোপ অপেরার অন্তরালে গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপন, দর্শকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, বহুজাতিক কোম্পানির বাজার বিস্তারের কৌশল এবং দর্শক ধরে রাখতে গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে এখন আমরা কথা বলবো।
নারীর ওপরে পুরুষ সত্য : তাহার ওপরে নাই
নারী কী বা কে? নারী কি পুরুষের বিপরীত লিঙ্গের মানুষ, নাকি সে নিজেই একজন পূর্ণমানুষ-এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ও বাস্তবতার মিল সামান্যই। ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী মানুষ নয়, এমনকি সমস্যাগ্রস্ত মানুষও নয়, নারী হচ্ছে সমস্যাগ্রস্ত মেয়েমানুষ।’৭ এখানে নারী কখনই নিজেকে স্বাধীনভাবে চালাতে পারে না। কারণ জীবনের নানা পর্যায়ে তাকে থাকতে হয় বাবা, স্বামী, সন্তানের অধীনে। অবশ্য তার স্বাধীনতা চিন্তা-চেতনাতেও অনুপস্থিত, যা হাজার বছরের সংস্কারের ফল। এ-রকম একটি সংস্কার হচ্ছে বিয়ের প্রচলিত প্রথাটি, যাতে নারীকে তার চেয়ে পাঁচ, দশ এমনকি দ্বিগুণ বয়সের পুরুষকে বিয়ে করতে হয়। অন্যদিকে পুরুষ বড়ো-তো নয়ই, এমনকি সমবয়সীকেও বিয়ে করতে চায় না। আবার মেয়ের বিয়ের জন্যও তার চেয়ে ‘অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন’ পাত্র খোঁজা হয়। অন্যদিকে, নিজের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন পাত্রের কথা মেয়েরা চিন্তাও করতে পারে না। তাহলে বিষয়টি কি এমন, মেয়েরা পরাধীন থাকতে চায়, স্বামী সেবা করে স্বর্গ পেতে চায়, নাকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাকে এসব করতে বাধ্য করে? নারীর এই পরাধীনতা যে-তার ওপর আরোপিত তা বোঝা যায়, সিমোন দ্য বোভেয়ারের কথায়, ‘কেউ নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, ক্রমশই নারী হয়ে ওঠে।’৮
আর নারীর ‘নারী’ হয়ে উঠার পিছনে সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবারের পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকাও কম নয়। পত্রিকাগুলোতে নারীদেরকে মানুষ নয়, ‘নারী’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা থাকে; প্রথম থেকে শেষ, সব পাতায়। পাতাগুলোতে নারীমুখের আধিক্য থাকলেও উপস্থাপনার বিষয় হিসেবে গুণের পরিবর্তে শারীরিক সৌন্দর্যই প্রাধান্য পায়। যেমন : খেলার পাতায় মারিয়া শারাপোভা কিংবা সেরেনা উইলিয়ামসের ছবি এমনভাবে দেওয়া হয় যেখানে তাদের অর্ধনগ্ন বুক বা উরু বের হয়ে থাকে। বিপরীতে পুরুষ রাফায়েল নাদালের ছবিতে তার পেশীবহুল হাতই যথেষ্ট। আবার, বাংলাদেশি নারী ওয়াসফিয়ার এভারেস্ট জয়ের পর প্রথম আলো ‘নকশা’য় তার ফ্যাশন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এভারেস্টজয়ী হলেও তার ‘নারী’-সত্তা যে-আছে, তা মনে করিয়ে দেয়। এতে অন্য নারীরা তার মতো কৃতিত্ব অর্জন করতে না পারলেও, তাকে ফ্যাশন ‘আইকন’ হিসেবে অনুসরণ করে তৃপ্তি মেটায়।
অন্যদিকে মুসা ইব্রাহীম কিংবা মুহিত এভারেস্টজয়ী হলেও তাদের ফ্যাশন নিয়ে এমন কোনো প্রতিবেদন হয় না। কারণ মুসা-মুহিতদের শৌর্য-বীর্যের বিপরীতে ওয়াসফিয়ারা দাঁড়ায় মাধুর্য হয়ে।
অবশ্য প্রিন্ট-মিডিয়ার মতো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতেও নারীর উপস্থাপনায় তেমন কোনো ভিন্নতা চোখে পড়ে না। টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, সংবাদপাঠ কিংবা বিজ্ঞাপনে সাজসজ্জার উপকরণ হিসেবে নারীর পোশাক, মেক-আপ ,সংলাপ ও ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলে পুরুষের চাহিদা অনুযায়ী নারীকে উপস্থাপনের প্রবণতা লক্ষণীয়। এই গণ্ডির বাইরে নয় সোপ অপেরাও। টাপুর টুপুর’র একটি দৃশ্যের কথা বলা যেতে পারে, যেখানে মূল নারী চরিত্র টাপুর স্বাধীন, দৃঢ়চেতা, স্বাবলম্বী, সৎ, কর্মঠ ও প্রতিবাদী; অফিসে যাওয়ার জন্য আয়নার সামনে বসে ধীর-স্থিরভাবে সাজসজ্জা করছিলো। এ-সময় আবহসঙ্গীতের সঙ্গে ক্লোজ-শটে তার শাড়ি, কানের-দুল, মাশকারা, টিপ, লিপস্টিকের ব্যবহার এমনভাবে দেখানো হচ্ছিলো; যেনো সুশ্রী মুখই সব! এছাড়া অনেক সময় ধরে সাজসজ্জার কারণে বাবার ঔষধ কেনা কিংবা কাজের লোকের বেতন দেওয়ার মতো বিষয়গুলিও তার কাছে তেমন কোনো গুরুত্ব পায় না। এর মাধ্যমে নারীর কাছে কাজের চেয়ে সাজসজ্জা যে-বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রমাণের চেষ্টা থাকে। অবশ্য নারীর কাছে সাজসজ্জার গুরুত্ব যে-পুরুষের তুষ্টি অর্জনের জন্য তার প্রমাণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞাপনেও দেখা যায়; চাকরি পাওয়ার জন্য ‘স্মার্ট’ হওয়া আবশ্যক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ নারীকে স্বাবলম্বী হতে হলেও সাজসজ্জা করে আগে পুরুষের মন জোগাতে হবে। মোদ্দাকথা, নারীর যতো গুণই থাকুক না কেনো, তাকে দর্শনধারী হতেই হবে!
টাপুর টুপুর-এর আরেকটি দৃশ্যে, ‘স্বাধীনচেতা’ পায়েল শরীরে অনেক জ্বর নিয়ে শুয়ে আছে, উঠতে পারছে না। এমতাবস্থায় রাতুল মাস্টার (তার স্বামী) এসে বলছে, ‘এই যে, তাড়াতাড়ি ভাত রাঁধুন। আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে।’ এ-সময় টাপুর পায়েলের জ্বরের কথা বললেও সে তা আমলে না নিয়ে বলে, ‘আমার সংসারে থাকতে হলে কাজ করতে হবে, না হলে অসুখের অজুহাত না দিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাওয়াই ভালো।’ একুশ শতকে যেখানে ‘নারী মুক্তি’র পক্ষে গণমাধ্যম জোর প্রচার চালাচ্ছে, আবার তারাই ‘পুরুষ’ রাতুলের সাফাই গাইছে! অবশ্য এই উপস্থাপন, নারীকে পরনির্ভরশীল প্রমাণ করে, তাকে যথেচ্ছাভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। এই যথেচ্ছা ব্যবহার চলে টিভির বাইরে বাস্তবের কর্মক্ষেত্রেও, কলকারখানায় বা নির্মাণ কাজে নারী পুরুষের সমান কাজ করেও সমান পারিশ্রমিক পায় না। অথচ এই নারী ‘পুরুষের চাইতে প্রায় পনের গুণ বেশি সাংসারিক কাজের বোঝা বহন করে।’৯ সেই শ্রমের মূল্য তো সে পায়ই না, উপরন্তু এ-শ্রমের যে-মূল্য আছে সেটাও মানতে নারাজ অনেকে। ‘তাই প্রতি বছর বিশ্ব-অর্থনীতি থেকে নারীর এ-অদৃশ্য অবদান স্বরূপ ১১ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়ে যায়।’১০ আরেক হিসাব অনুযায়ী, ‘নারীরা পৃথিবীর মোট কাজের দুই-তৃতীয়াংশ সম্পাদন করে...কিন্তু মোট সম্পদের ১০০ ভাগের মাত্র এক ভাগের মালিক হলো নারীরা।’১১ আর বাকি ৯৯ ভাগের মালিকানা লাভের জন্যই নারীকে অধীনস্ত করে রাখা দরকার পড়ে পুরুষের। হয়তো এ-জন্যই পুরুষতান্ত্রিক গণমাধ্যম সোপ অপেরায় পুরুষের উদ্দেশ্য সফল করতেই নারীকে বারবার পরনির্ভরশীল করে উপস্থাপন করে।
এবার মা নিয়ে কথা বলা যাক। একটি দৃশ্যে দেখানো হচ্ছে, দিপু (ঝিলিকের কাকা) কারাগারে; কিন্তু পরিবারের কেউই, এমনকি তার মা-ও (দিপুর মা) উকিল নিয়োগে তাকে রাজি করাতে পারছে না। এমতাবস্থায় ‘আট-দশ বছর বয়সী’ ঝিলিক তার সঙ্গে দেখা করে তাকে রাজি করায়। আশ্চর্যের বিষয়, দিপু ঝিলিকের কথায় রাজি হয়ে কারাগার থেকে বেরোলেও তার মা খুশি হয় না। কারণ, সে চায় না ঝিলিক এ-পরিবারে থেকে সম্পত্তির অংশীদার হোক, বরং সে ঝিলিকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে একজন মা যেভাবেই হোক, প্রয়োজনে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সন্তানকে বিপদ থেকে রক্ষার চেষ্টা করে। আর সেটা অন্য কেউ করলে মা তো ওই ব্যক্তির কাছে চির কৃতজ্ঞ-ঋণী থাকে। কিন্তু এখানে মায়ের সেই রূপায়ণ নেই। তাহলে এই মা কে? এই মা/নারী কি তাহলে কেবল ষড়যন্ত্রকারী, কলহকারী। তার মানে, মমতাময়ীর বিপরীতে ষড়যন্ত্রকারী; নারীর কি তাহলে মানুষের রূপ নেই?
মা-এ মনীষ (ঝিলিকের আসল বাবা) ঝিলিককে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তার স্ত্রী, বাবা, মা, ভাই-সবাই খুশি হয়। তবে সম্পত্তির অংশীদার বেড়ে যাবে ভেবে খুশি হন না তার পিসি আর বৌদি। এ-সময় সবার মতামত জানতে চাওয়া হলেও তারা সরাসরি বিরোধিতা না করে, ঝিলিককে বাড়ি ছাড়া করতে তৎপর হয়। এ-ক্ষেত্রে মনীষের সঙ্গে তাদের বসচা হতে পারতো, কিন্তু তা না করে গোপনে ঝিলিকের বিরুদ্ধে লাগার কারণ কী? মনীষের পিসি বা বৌদি জানে কর্তা ‘পুরুষ’-কে বসচা করে তো আর পরাজিত করা যাবে না! তার মানে নারী, নারীর বিরুদ্ধেই লড়তে পারে; পুরুষের বিরুদ্ধে তার লড়াই হয়তো অসম্ভব! অথচ এর বিপরীতচিত্রের ভুরিভুরি উদাহরণ সমাজ-রাষ্ট্রে কিন্তু আছে।
সামাজিক সহিংসতার প্রদর্শন ও প্রভাব
সহিংস শব্দটির দিকে তাকালেই দেখা যায়, হিংসার ছাপ। সহিংস শব্দের অর্থ হিংসার সঙ্গে, আর কারও সঙ্গে হিংসা বা ঈর্ষামূলক আচরণ করাই সহিংস আচরণ; এটা যেমন শারীরিক আক্রমণের মাধ্যমে হতে পারে, তেমনি কথা, কাজ বা অঙ্গ-ভঙ্গির মাধ্যমেও। একইভাবে সহিংসতার প্রদর্শনও কিন্তু এক ধরনের সহিংস কাজ। কারণ, গণমাধ্যমে প্রদর্শিত সহিংসতা দর্শকদেরকে উত্তেজিত বা প্রভাবিত করতে পারে। টেলিভিশন যেহেতু সক্রিয় মাধ্যম; এর আধেয়গুলোতে উপস্থাপিত সহিংসতার প্রভাবনমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ধরুন, মা’র কথা। মনীষের পিসির নির্দেশে ঝিলিককে চুরি করে নিয়ে যায় হিরা আম্মা, যার কাজ হলো ছোট ছেলে-মেয়েদের চুরি করে নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় অর্থ উপার্জন করা। আর মনীষের পিসি এই কাজটি করে মনীষদের সম্পত্তির লোভে, কারণ ঝিলিককে বিদায় করতে পারলে সম্পত্তির একজন অংশীদার কমে যাবে। আবার, মা’র আরেকটি দৃশ্যে, ফুলকি তার বান্ধবীদের সঙ্গে ঝিলিকের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এভাবে-‘এই তোরা জানিস, ও না আগে চোর ছিলো? অনেক মানুষের বাড়িতে চুরি করেছে; তবে এখন চুরি করে না’। তখন তার এক বান্ধবী ফুলকিকে বলে, ‘এই আমি না কখনও সামনা-সামনি চোর দেখিনি; এই প্রথম দেখলাম’। তখন তারা অট্টহাসিতে মেতে ওঠায় ঝিলিক মর্মাহত হয়ে দৌড়ে পালায়। আবার ঝিলিককে যখন স্কুলে ভর্তি করা হয়, তখন স্কুলে টিফিন খাওয়ার সময় ঝিলিকের চারপাশে ফুলকিসহ তার বন্ধুরা চোর চোর বলে উল্লাস প্রকাশ করে। এছাড়াও এই ফুলকি মনীষের পিসির সঙ্গে এক হয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় বাল্যকাল থেকেই। এ-রকম চরিত্রগুলি যখন অন্য কিশোর-কিশোরীরা দেখছে, তখন তাদের মধ্যে কী ধরণের মানসিক পরিবর্তন ঘটছে কিংবা প্রভাবিত করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদিও আমাদের দেশে শিশুমনে টিভি’র প্রতিক্রিয়া নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি। তবে পশ্চিমে এ-সংক্রান্ত অনেক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়, বিভিন্ন গবেষকদের আলোচনায়।
টিভিতে সহিংস দৃশ্যের আধিক্যের ফলে বাস্তব জীবনে সংঘটিত সহিংসতার প্রতি কোন্ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে-সে-বিষয়ে ১৯৭৪ সালে একটি গবেষণা চালান ড্রাবম্যান ও টমাস।১২ এতে সহিংসতাপূর্ণ চলচ্চিত্র দেখা ও না-দেখা দুই দল শিশু নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, যারা সহিংসতাপূর্ণ চলচ্চিত্র দেখেছে তারা সহিংসতাপূর্ণ চলচ্চিত্র না-দেখা শিশুদের চেয়ে বেশি সময় নিয়েছে সহিংসতা নির্ণয় করতে। এর পাশাপাশি সহিংসতাপূর্ণ চলচ্চিত্র দেখা শিশুরা অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করেছে।
এ-তো গেলো শিশুদের কথা; তাহলে বড়োদের বেলায়? টাপুর টুপুর-এ টাপুর সন্তানসম্ভবা। অন্যদিকে, তার বোন টুপুর মা হতে পারবে না জেনে-টাপুরকে সন্তানসহ হত্যা করতে পায়েসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেয়; যদিও এই ষড়যন্ত্র সফল হয় না। এভাবে নারীদেরকে হিংসুটে, ঈর্ষাকাতর, স্বার্থপর করে দেখানোর কারণ ‘মানুষ একবার যা দেখে তাতে ধাতস্থ হয়ে যায়, ফলে তাকে বিস্মিত ও বিমূঢ় করে তুলতে চাই নবতর আয়োজন।’১৩ আর এ-জন্যই সোপ অপেরার নির্মাতারা এমন নতুন নতুন আয়োজনের ডালা নিয়ে বসে আছে, যেখানে তারা দেখায় বউ-শাশুড়ি, ননদ-জা-ভাবী, বোন-বোন এ-রকম নানা সম্পর্কের মধ্যে নানামাত্রিক আন্তঃকলহ। এ-সব সহিংস দৃশ্যের আধিক্যের ফলে টিভি আসক্ত দর্শক-শ্রোতাদের অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ডিসেনসিটিজেশন বা বোধ-বিনষ্টি। অর্থাৎ ‘ভায়োলেন্স দেখতে দেখতে মন-মানস অভ্যস্ত হয়ে যায় ভায়োলেন্সে, ফলে বাস্তব জীবনের সন্ত্রাস-পীড়নের বিরোধী না হয়ে মন হয়ে ওঠে আপোষমূলক অথবা অনুভূতিহীন।’১৪ এছাড়া মনোবিজ্ঞানী এইচ জে আইসেঙ্ক ও ডক্টর কে বি নিয়াস তাদের ‘সেক্স, ভায়োলেন্স অ্যান্ড দ্য মিডিয়া’ গ্রন্থে সহিংসতা নিয়ে পর্যালোচনার এক পর্যায়ে দেখিয়েছেন, সহিংসতাপূর্ণ অনুষ্ঠান সহিংসতার প্রতি বোধ সাময়িকভাবে হ্রাস করে সচেতনতা ভোঁতা করে দেয়।১৫ এ-থেকে অনেকটাই বোঝা যায়, টিভি’তে দেখা সহিংসতা মানব মনে কতোটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
সোপ অপেরা : কলকাঠি যাদের হাতে
ডিনার পার্টি; অতিথিতে পরিপূর্ণ। ক্লোজ-শটে ‘সুশ্রী’ ও ‘পরিপাটি’ নারীদের প্রায় ১২ জনের মুখ দেখানো হয়, বিপরীতে পুরুষের মুখ দেখানো হয় মাত্র চারজনের-এটা টাপুর টুপুর’র দৃশ্য। ক্যামেরার সামনে নারী মুখের এই আধিক্য, তাদের বেপরোয়া আচরণ দেখে মনে হয়, সমাজে নারী ‘স্বাধীন’ হয়ে গেছে। সে আর ঘরের মধ্যে বন্দি নয়। তবে নারীর এই অবস্থানের উল্টো পরিস্থিতি লক্ষ করা যায়, টাপুর টুপুর-এর ক্যামেরার পিছনে নারীর অংশগ্রহণ কতোটুকু তা দেখলেই। পুরো সোপ অপেরা নির্মাণে অর্থাৎ কাহিনীকার, পরিচালক, সহকারী পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, সম্পাদনাসহ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ অনুপস্থিত। মা’র ক্ষেত্রেও একই কথা। এর মূল কাহিনী বিন্যাস করেছেন কাজরী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ সুদীপ পাল, সম্পাদনায় ড্যানী, প্রযোজনায় শ্রীকান্ত মেহতা ও মহেন্দ্র সোনী। কেয়া পাতার নৌকোর চিত্রনাট্যকার লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, ক্যামেরাম্যান মাধব, শিল্প-নির্দেশক অমিত, প্রযোজক চন্দ্র শেখর, ও পরিচালক শৈবাল ব্যানার্জি; সতীর চিত্রনাট্যকার অনুজ চট্টোপাধ্যায়, শিল্প-নির্দেশক আশিষ, ক্যামেরাম্যান মনোজ কুমার, পরিচালক সুমন দাস ও প্রযোজক অশোক ধানুকা। অন্যান্য সোপ অপেরাতেও ক্যামেরার পিছনে উল্লেখ করার মতো নারীর অংশগ্রহণ নেই। তাহলে, সোপ অপেরায় ক্যামেরার পিছনে নারীর অংশগ্রহণ না থাকলেও, ক্যামেরার সামনে নারী-মুখ-এর আধিক্যের কারণ কী?
সোপ অপেরাগুলোর স্পন্সরদের দিকে তাকালেই এর উত্তর পাওয়া যায়। টাপুর টুপুর’র মূল স্পন্সর ভিকো নারায়ণী ক্রিম, স্ব-পথ-এর বোরো প্লাস, সাত পাকে বাঁধার সেনকো গোল্ড; এর সবগুলোই নারীদের প্রসাধনী সামগ্রী। কিছু সুশ্রী নারী-মুখ এ-সব পণ্যের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করে। সোপ অপেরা এ-ক্ষেত্রে ঠিক সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে ওইসব পণ্যের বিক্রিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সোপ অপেরার মুখগুলো এদের দর্শকদের মনে ‘সুশ্রী’ মুখের চাহিদা বাড়ায়, আর অপেরার ফাঁকে ফাঁকে চলে সেই সুশ্রী মুখ তৈরির উপাদানের প্রদর্শন। এ-এক অন্যরকম খেলা; খালি চোখে দেখা যায় না।
অন্যদিকে, মা’র প্রধান স্পন্সর কমপ্ল্যান কোনো প্রসাধন সামগ্রীর প্রতিষ্ঠান না হলেও এর পিছনে রয়েছে আরেক ‘খেলা’। মূলত এটি একটি ‘হেলথ ড্রিংক’, যা সাধারণত শিশুর যথাযথ বেড়ে ওঠায় ভূমিকা রাখে (কমপ্ল্যানের বিজ্ঞাপনে তাই অন্তত বলা হয়)। মা-এ স্পন্সরের এই ভিন্নতা সাদামাটাভাবে দেখার বিষয় নয়। কারণ, মা’র কাহিনী এগিয়েছে ঝিলিক নামের শিশুটিকে কেন্দ্র করে। যেহেতু এর ‘মর্মস্পর্শী’ কাহিনী মা ও সন্তানকেন্দ্রিক, তাই এর উদ্দিষ্ট দর্শকের একটা বড়ো জায়গা দখল করে রেখেছে মায়েরা। যারা কিনা সন্তানদের ‘যথাযথ বেড়ে ওঠা’ নিয়ে চিন্তিত থাকেন। তারা মা দেখেন, আর শিশু ঝিলিকের ‘অতিমানবীয়’ আচরণে মুগ্ধ হন। একই সঙ্গে ঝিলিকের ‘অতিমানবীয়’, ‘কমপ্ল্যানিয়’ পারদর্শিতাকে নিজ সন্তানের ওপর আরোপ করতে চান।
গভীর ধ্যানে দর্শক : কৌশলী যখন কর্পোরেট গোষ্ঠী
পড়াশোনার সুবাদে যশোরে থাকাকালীন মেসের এক বুয়াকে চিনতাম। তিনি স্বামী, সন্তান কারো কাছেই মাথা গোজার ঠাঁই পাননি। অবশেষে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তিনি মেসে কাজ করতে বাধ্য হন। তার এই নিরানন্দ জীবনে বিনোদনের একমাত্র অবলম্বন ছিলো সোপ অপেরা। এটার প্রতি তার এতোই ঝোঁক ছিলো যে, অন্যের বাড়িতে অনেক রাত জেগে তিনি এ-সব দেখতেন। তার সবচেয়ে প্রিয় ছিলো মা। মা’র প্রতি তার এই ভালো লাগার কারণ জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলাম, ঝিলিকের দুঃখ-দুর্দশা তাকে সমব্যথী করতো। তিনি মেসে আমাদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গেও ঝিলিকের জন্য শুভকামনার কথা জানাতেন, ঝিলিককে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন।
নিজের জীবনে দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত এক নারী যখন টিভির পর্দায় আরেকজনকে তার মতো অবস্থায় দেখছে, তখন সেই চরিত্রে নিজেকে খুঁজে ফেরার চেষ্টা করেন; তৈরি হয় সমানুভূতি, অনেকক্ষেত্রে সহানুভূতি। এই সমানুভূতি-সহানুভূতির সমন্বয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে। এই আবেগ তাদের অবচেতনভাবেই সোপ অপেরা নিয়ে করে তোলে আগ্রহী। এই আগ্রহ আরও জোরালো হয়, যখন স্টার জলসা তাদের বিজ্ঞাপনে বলে ‘আমাদের ঝিলিক এখন আপনাদের আপনজন।’ ঝিলিক বলে, ‘আমি আমার মাকে হারিয়ে অনেক মা’কে পেয়েছি। যারা আমার মায়ের মতো সন্তানকে হারিয়েছেন, আমি আপনাদেরই মেয়ে। আর যেনো কোনো সন্তান হারিয়ে না যায়, সেজন্য সন্তানকে ধরে রাখুন।’
‘ঝিলিকের মতো সন্তানকে’ ধরে রাখার এই কৌশল যথাযথ ব্যবহার করে সোপ অপেরাগুলো ব্যবসার দিকে এগিয়ে যায়, সফলও হয়। তারা সোপ অপেরার গল্পকে এমন করে সাজায়, যা দর্শককে একটা বিভ্রমের মধ্যে ফেলে, তারা না পারে বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে, আবার না পারে জীবন থেকে আলাদা করতে। কিন্তু সমস্যা হলো সবকিছু থাকলেও প্রকৃত জীবনের ছোঁয়া কেবল সেখানে থাকে না।
দর্শককে ধরে রাখার আরেকটি অভিনব কৌশল হলো নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু করা। মা কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই প্রতিদিন (সোম থেকে শনি) রাত সাড়ে ৮টায় শুরু হয়। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের বিজ্ঞাপন বিরতির মাঝে নির্বিঘ্নেই দর্শক তার প্রয়োজনীয় ছোটখাটো কাজ নিশ্চিন্তে সেরে আসতে পারে। আবার দর্শকের মনোযোগ যাতে নষ্ট না হয়, সে-জন্য কোনো বিজ্ঞাপন-বিরতি ছাড়াই একটি সোপ অপেরা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি শুরু হয়। ফলে বাংলাদেশের সোপ অপেরাগুলোয় বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ দর্শক ভারতিয় ওইসব চ্যানেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এখানেই শেষ নয়। ভারতিয় বিভিন্ন চ্যানেলের এসব অপেরার একটি পর্ব দিনে-রাতে বিভিন্ন সময় চারবার সম্প্রচার হয়। মা বাংলাদেশ সময় সকাল ০৭.৩০, দুপুর ১২.৩০, বিকাল ০৩.৩০ ও রাত ০৮.৩০ টায় সম্প্রচার করা হয়। এতে কেউ রাতে প্রথমবার সম্প্রচারের সময় তা কোনো কারণে না দেখতে পারলেও পরের দিন সকাল, দুপুর অথবা বিকালে সেটা দেখে নিতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটা এ-রকম, যে-কোনো মূল্যে আপনাকে দেখতেই হবে, আপনি কেবল আওয়াজ দেবেন কখন দেখতে চান; আমরা হাজির হবো আপনার কাছে! এই হাজির থাকা সবার কাছে সে শ্রমিক-চাকুরে-গৃহিণী-শিশু-বৃদ্ধা-শিক্ষার্থী যেই থাকুক।
‘সোপ’ বিক্রির সফল হাতিয়ার ‘অপেরা’
প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশের কারণে বিশ্ব একটি গ্রামে পরিণত হবে, যোগাযোগবিদ মার্শাল ম্যাকলুহানের এই বক্তব্যের সূত্র ধরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে টেলিভিশন। যার ধারাবাহিকতায় এ-দেশে টিভির সূত্রপাত হয় ১৯৬৪ সালে জাপানের নিপ্পন ইলেক্ট্রনিক্স কোম্পানির মাধ্যমে। বর্তমানে টিভির সংখ্যা অগণিত হলেও এক সময় ‘উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রায় অধিকাংশেরই টেলিভিশন কেন্দ্র চালু করার মতো উন্নত শিল্পব্যবস্থা অথবা প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ছিল না। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর দেদার সাহায্যেই টেলিভিশন তৃতীয় দুনিয়ার বাস্তবে পরিণত হয়।’১৬ কিন্তু পুঁজিবাদী দেশগুলোর এই সাহায্য দেওয়ার পিছনে স্বার্থ কী? এক সময় ভারতিয় উপমহাদেশে বৃটিশরা রেল চালু করেছিলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য নয়, তাদের শোষণের ব্যাপ্তি বাড়ানোর জন্য। ঠিক একইভাবে টেলিভিশনকেও তারা বাণিজ্য প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। বিষয়টি এ-রকম, ‘তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশে টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্র স্থাপন অর্থই হলো পশ্চিমী নির্ভরতা সূচিত হওয়া। দৈনিক টেলিভিশন প্রোগ্রামের সময়সীমা ভরে তুলতে যে ব্যাপক আয়োজন দরকার তা কোনো দেশেরই জাতীয় অনুষ্ঠান দ্বারা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।’১৭ এ-জন্য উন্নত দেশগুলো থেকে গরীব দেশগুলোকে প্রচুর পরিমাণে অনুষ্ঠান আমদানি করতে হতো। এক হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকা ১৯৫৮ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ১৪ বছরে (৫৯, ৬২, ৬৬ ও ৬৯ সাল ছাড়া) প্রায় ১১৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুষ্ঠান রপ্তানি করে।১৮ ঠিক একইভাবে ভারতিয় চ্যানেলগুলো এ-দেশ থেকে যে-পরিমাণ অর্থ আয় করছে, নিম্নে সেটার তালিকা১৯ দেওয়া হলো :
চ্যানেলের নাম মাসিক চার্জ
স্টার প্লাস এক কোটি ৫৯ লাখ ৯৭ হাজার ৭৫০ টাকা
সনি এক কোটি ৯২ হাজার ১৫০ টাকা
লাইফ ওকে এক কোটি ২৩ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা
জি টিভি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৩৫০ টাকা
স্টার জলসা ১৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫০ টাকা
জি বাংলা ১৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫০ টাকা
সেট ম্যাক্স ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬০০ টাকা
এই বিশাল অঙ্কের অর্থ তাদের প্রত্যক্ষ আয়। তবে এর বাইরে নানা পণ্যের ব্র্যান্ডিং-এর মাধ্যমে তাদের যে-পরোক্ষ আয় হয়, তার পরিমাণও নিশ্চয় এর চেয়ে বহু গুণ বেশি। এই ব্র্যান্ডিং হয় সোপ অপেরাগুলোর মূল চরিত্রের নাম অনুসারে যেমন : ঝিলিক-ড্রেস, রাশি-ড্রেস, টাপুর টুপুর শাড়ি-জুতা ইত্যাদি। উল্লেখ্য, গত ঈদুল-আজহা ও দূর্গাপূজায় ঝিলিক-ড্রেসের দাম ছিলো সর্বনিম্ন ৬৫০০ টাকা। আর এ-ক্ষেত্রে নারী হয় বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড। কারণ, সোপ অপেরায় নারীদের চরিত্রভেদে বয়সের মানদন্ডে প্রায় দৃশ্যেই বিভিন্ন পোশাকে, গহনায় ও সাজসজ্জায় প্রদর্শন করা হয়। মা’তে একই পর্বে ঝিলিককে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিমাকে (ঝিলিকের মা) আকাশি রঙের শাড়িতে, ঝিলিক স্কুল থেকে আসার পর কফি রঙের শাড়িতে এবং রাতে ঝিলিককে বাড়িতে রাখা হবে কি না-এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় লাল রঙের শাড়িতে দেখানো হয়। প্রশ্ন ওঠে, নাটকের চরিত্রের প্রয়োজনে শাড়ি নাকি শাড়ির প্রদর্শনের জন্য এসব নাটকের নির্মাণ?
মা মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত, বিচারকের পরিবার এবং টাপুর টুপুর উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। অন্যান্য সোপ অপেরাতেও মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারকে দেখা যায়। পর্দায় এসব চরিত্রের উপস্থাপন স্বপ্ন জাগায়, এদের দেখে নিম্নবিত্তরা ‘সাংস্কৃটাইজেশন’২০ প্রক্রিয়ায় উচ্চবিত্ত হতে চায়। এ-প্রসঙ্গে গৌতম ভদ্র বলেন, ‘...নিম্নবর্গ উচ্চবর্গে চলে যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত বড়লোক হচ্ছে; তাই বড় বড় ফ্লাট কিনছে, আমেরিকা থেকে এই নিয়ে আসছে-কন্টিনিউয়াসলি সাংস্কৃটাইজেশন হচ্ছে।’২১ পাঠক দেখুন, এখানে নিম্নবিত্তের উচ্চবিত্ত হওয়ার এই সাংস্কৃটাইজেশন-এ মূলত ভিতরের অবয়বের চেয়ে বাহ্যিক অবয়ব তথা ভোগ-বিলাসিতা প্রাধান্য পাচ্ছে। মানে বাজার! ব্যবসা!
ইন্দ্রিয়কে দুধে-ভাতে রাখার সুষম ব্যবস্থা
স্বর্গ কী; কোথায়? মানুষ আদিকাল থেকে এর কথা শুনলেও, বাস্তবে তা ধরা দেয় না। কিন্তু কী আছে স্বর্গে, যার জন্যে মানুষ এতো উদগ্রীব? ধর্মগ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, স্বর্গে ‘নেই’-এর কোনো স্থান নেই। অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষিত সবকিছুরই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে এখানে, যার জন্য স্বর্গ মানুষের পরম আরাধ্য। স্বর্গের অস্তিত্বের প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত হলেও মানুষের ইন্দ্রিয়ে স্বর্গের সুখ জাগিয়ে তুলতে সোপ অপেরার ভূমিকাও কম নয়।
টাপুর টুপুর-এ টুপুরের শ্বশুরবাড়ি অনেক রকম দামি দামি আসবাবপত্র, ঝাড়বাতি, আরামদায়ক বিছানা ইত্যাদি দিয়ে সাজানো; আছে ছোটখাটো পানশালাসহ বিশাল হলরুম। এই বাড়ির নারীরা সবসময় দামি পোশাক ও গহনা পরিহিত অবস্থায় থাকে, যা থেকে কাজের মেয়েরাও বাদ পড়েনি। আবার সকালের নাস্তায় দেখা যায়, টেবিল ভর্তি ফলমূল, ডিম, কফি, পাউরুটি, জেলিসহ নানা দামি খাবার, যা পরিবেশন করে দামি রেস্তোরাঁর সেফদের পোশাক পরিহিত কাজের লোক। স্বল্প আয়ের মানুষ এসব কল্পনাও করতে পারে না। এর বাইরে এখানে থাকে দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন, হিংসা-বিদ্বেষ। আর এতেও এক ধরনের নৈকট্য বা একাত্মতা খুঁজে পায় দর্শক-শ্রোতা। একদিকে, নিজের কল্পনা, আশা-আকাঙ্ক্ষার মিল, অন্যদিকে জীবনের বাস্তব দ্বন্দ্ব, হতাশা আর ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি। ফলে সোপ অপেরাকে তারা একান্ত আপন মনে করে, বাস্তবতা ভুলে সাময়িকের জন্য হলেও ইন্দ্রিয় সুখে, সেখানে দেখা জীবন উপভোগ করতে চায়। এ-জন্য সে বাজারে গিয়ে ঝিলিক-ড্রেস, টাপুর শাড়ি বা রাশি শাড়ি কিনে নিজের মধ্যে ওই চরিত্রগুলোকে ধারণ করতে চায়।
কিন্তু এভাবে ‘ভার্চুয়াল’ স্বর্গ পাইয়ে দেওয়ার যে-গুরুদায়িত্ব (!) সোপ অপেরা নিয়েছে তা মানুষের ভোগের প্রবৃত্তিকে অতিমাত্রায় জাগ্রত করছে। আর নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষগুলো বাড়তি এই আকাক্সক্ষা মেটাতে স্বল্পমূল্যে ওভার-টাইম নামে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হয়। এতে উভয় দিক থেকে লাভবান হয় পুঁজিপতিগোষ্ঠী; একদিকে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে পণ্য বিক্রি, অন্যদিকে শ্রমশোষণ!
গণমাধ্যম হচ্ছে গণমানুষের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম। বস্তুনিষ্ঠভাবে মানুষকে তথ্য দেওয়া, শিক্ষা দেওয়া, সচেতন করে তোলার পাশাপাশি বিনোদন দেওয়াই এর কাজ। আর গণমাধ্যম এ-কাজগুলো করে তার দায়িত্ব-কর্তব্যবোধের জায়গা থেকে, নৈতিকতার কথা স্মরণ রেখে। কিন্তু গণমাধ্যমের জনপ্রিয় আধেয় সোপ অপেরার অন্তরালে কতিপয় পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার যে-সংস্কৃতি চলে আসছে সেটা এর আদর্শের সঙ্গে কতোটুকু মিলে? আর পুঁজিপতি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ-নির্ভরতাই২২ কি টিভিকে তাদের স্বার্থ রক্ষায় বাধ্য করছে?
লেখক : ইব্রাহীম খলিল ও মাহামুদ সেতু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
ibrahimrumcj@gmail.com
write2hasan.ru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. ‘হোঁচট খেল ডেইলি সোপ’; কালের কণ্ঠ, ১০ মার্চ ২০১০, ঢাকা।
২. সময় স্বল্পতার কারণে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নেওয়া হয়েছে। কারণ, এতো অল্প সময়ের মধ্যে কোনো একটি চ্যানেলের সবগুলো সোপ অপেরা দেখা সম্ভব হয়নি।
৩. http://en.wikipedia.org/wiki/Soap_opera
৪. http://en.wikipedia.org/wiki/Soap_opera
৫. http://en.wikipedia.org/wiki/Indian_soap_opera
৬. http://en.wikipedia.org/wiki/Soap_opera
৭. বেবেল, উদ্ধৃত; আলম , খ.; ‘কোটাভিত্তিক নারীপাতা’; যোগাযোগ; সম্পাদনা-ফাহমিদুল হক, সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি-২০০৫, পৃষ্ঠা-১৪৭, রাজশাহী।
৮. তুলি, সোহানা পারভীন (২০০৯ : ১২৯); ‘টেলিভিশনে নারী দৃশ্যবস্তু, পুরুষ দ্রষ্টা’; গণমাধ্যম/শ্রেণিমাধ্যম; সম্পাদনা-রোবায়েত ফেরদৌস ও মুহাম্মদ আনওয়ারুস সালাম, শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।
৯. আলম, খ.; ‘কোটাভিত্তিক নারীপাতা’; যোগাযোগ; সম্পাদনা-ফাহমিদুল হক, সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি-২০০৫, পৃষ্ঠা-১৪৫, রাজশাহী।
১০. প্রাগুক্ত; আলম, খ. (২০০৫ : ১৪৬)।
১১. প্রাগুক্ত; আলম, খ. (২০০৫ : ১৪৫)।
১২. হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ১০৫); মনোজগতে উপনিবেশ : তথ্য সাম্রাজ্যের ইতিবৃত্ত; প্রাচ্য প্রকাশনী, ঢাকা। ১৩. প্রাগুক্ত; হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ১০৫)।
১৪. প্রাগুক্ত; হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ১০২)।
১৫. প্রাগুক্ত; হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ১০৫)।
১৬. প্রাগুক্ত; হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ৮৯)।
১৭. প্রাগুক্ত; হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ৯০)।
১৮. প্রাগুক্ত; হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ৯০)।
১৯. http://importantnews24.com/archives/1374
২০. ‘‘সাংস্কৃটাইজেশন’, এটা রিনাউনন্ড এ্যন্থ্রপলজিস্ট শ্রীনিবাস এর একটি ধারণা; এর মূল কথা হলো যে উচ্চবর্ণকে দেখে নিম্নবর্ণের লোকেরা নানা কিছু শেখে, ফলো করে জাতে ওঠার চেষ্টা করে।’(ভদ্র, গৌতম; ‘আদিকল্পের রূপান্তর : নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাস’; যোগাযোগ; সম্পাদনা-ফাহমিদুল হক, সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি-২০০৫, পৃষ্ঠা-১৯১, রাজশাহী।)
২১. প্রাগুক্ত; ভদ্র, গৌতম (২০০৫ : ১৯১)।
২২. প্রাগুক্ত; হক, মফিদুল (১৯৮৫ : ৮৭)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন