উসমান সেমবেন
প্রকাশিত ২১ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘সেখানে নারকেল গাছও আছে, আছে কলা গাছের ভেলাও; সর্বোপরি সেখানে রয়েছে মানুষ’
উসমান সেমবেন
তিনি আফ্রিকান চলচ্চিত্রের জনক। চোখের সামনেই তিনি দেখেছেন তার দেশের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রাম। মানসিক ও আর্থিক দাসত্বের শিকার এই মানুষগুলোর নিত্য সহচর ছিলেন তিনি। নিম্নশ্রেণির মানুষের সঙ্গে বুর্জোয়া সমাজের প্রতারণা, আফ্রিকান সরকার ও আরব শাসকবর্গের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বিরোধী বক্তব্য, তার প্রতিটি সৃষ্টির অনবদ্য হাতিয়ার। তার প্রায় প্রতিটি সৃষ্টিই আফ্রিকার সাধারণ ভাগ্যবিড়ম্বিত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষগুলোর জীবনের কথা বলে; তিনি উসমান সেমবেন। সংস্কৃতিকে যুদ্ধ প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই উসমান সেমবেনই সাধারণ ‘অমানুষ’ আফ্রিকানদের দেখিয়েছেন বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
তার ভিতরের সৃষ্টিশীলতা তাকে করে তুলেছে আফ্রিকার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা সাহিত্যিকদের একজন। মূলত উপন্যাস লিখতেন। ‘দ্য ব্ল্যাক ডকার’ (১৯৫৬) তার প্রথম উপন্যাস। এরপর লেখেন ‘ও কান্ট্রি, মাই বিউটিফুল পিপল’ (১৯৫৭), ‘গড্স বিটস অব উডস্’ (১৯৬০),‘দ্য মানি অর্ডার অ্যান্ড হোয়াইট জেনেসিস’ (১৯৬৫), ‘জালা’ (১৯৭৩), ‘দ্য লাস্ট অব দ্য অ্যাম্পেয়ার’ (১৯৮১)। সমালোচকদের দৃষ্টিতে তার সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘গড্স বিটস অব উডস্’।
ঔপন্যাসিক হিসেবে তুমুল সাফল্যের এক পর্যায়ে উসমান অনুভব করলেন, যেসব মানুষকে কেন্দ্র করে এই সৃষ্টিশীলতা, সেই নিরক্ষর মানুষগুলোর কাছে তার লেখাটি ঠিক পৌঁছাচ্ছে না। ফলে শিল্পের আধুনিকতম মাধ্যম চলচ্চিত্রকেই বেছে নেন পরিবর্তনের অস্ত্র হিসেবে। ৪০ বছর বয়সে নতুন করে, নতুন মাধ্যমে শুরু করেন উসমান। এ-যাত্রা শুধু উসমানের জন্য নতুন ছিলো না, পুরো আফ্রিকার জন্যই ছিলো নতুন। নিজ মাতৃভাষা ও অন্যান্য আফ্রিকান ভাষায় নির্মিত তার চলচ্চিত্রগুলো স্বপ্নহারা মানুষগুলোকে দিয়েছিলো স্বপ্নের দিশা।
একাধারে পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার উসমান ১৯৬৩ সালে বানালেন প্রথম চলচ্চিত্র Barom sarret (১৯৬৩)। এরপর একে একে নির্মাণ করেন-Niaye (১৯৬৪), La Noire de (১৯৬৬), Madabi (১৯৬৮), Emaitai (১৯৭১), Xala (১৯৭৫), Ceddo (১৯৭৭), Camp de Thiaroye (১৯৮৮), Guelwaar (১৯৯৩), Fatt kine (২০০০), Moolaade (২০০৩)।
মারাত্মক স্বপ্নবান ও প্রতিবাদী এই মানুষটির জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯২৩ সাল সেনেগাল-এর জিগুইনচর-এ। ২০০৬ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন উসমান। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৭ এর ৯ জুন সেনেগাল-এর ডাকারে ৮৪ বছর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে উসমান পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, সম্মাননা। ১৯৯৬ সালে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। উসমান তার শেষ কাহিনীচিত্র মুলাদে-এর নির্মাণ সম্পন্ন করেন তিন বছরেরও বেশি সময় নিয়ে। চলচ্চিত্রটি কান এবং বারকিনো ফাসোর ফেসপাকো (FESPACO) চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়। ২০০৪ সালের ১১ এপ্রিল ছবিটি সম্পূর্ণ নির্মাণ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই মরক্কোর রাবাত-এ উসমান সেমবেন-এর এই সাক্ষাৎকারটি নেন ফরাসি অধ্যাপক সাম্বা গাদজিগো। উসমান সেমবেনের জীবনীকার সাম্বা গাদজিগো বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের মাউন্ট হলিওক কলেজে। ইংরেজি ভাষার এই সাক্ষাৎকারটি ম্যাজিক লণ্ঠন-এর জন্য বাংলায় ভাষান্তর করেছেন কৃষ্ণ কুমার।
সাম্বা গাদজিগো : সেমবেন রাবাত-এ মরক্কান সিনেমাটোগ্রাফি সেন্টারে সম্প্রতি আপনি আপনার মুলাদে (Moolaade) সিনেমার সাব-টাইটেল সম্পন্ন করলেন। একটু বলবেন, মুলাদে সিনেমাটি আপনাকে, আপনার ক্যারিয়ার, আপনার প্রত্যেক দিনের সংগ্রামকে বুঝতে কীভাবে সাহায্য করবে?
উসমান সেমবেন : না, আমি জানি না। শেষ হয়ে যাওয়া সিনেমাটা বা ‘পণ্যটা’ কীভাবে বস্তুতে পরিণত হলো। তবে এতোটুকু বলতে পারি, আমাদের প্রতিদিনের যে-বীরত্বগাঁথা তা নিয়েই সিনেমাটার আধেয় গড়ে উঠেছে। এটা আসলে আমার ট্রিলজির দ্বিতীয় পর্ব।
সাম্প্রতিক আফ্রিকার যুদ্ধাবস্থা অনিয়ন্ত্রিত, বিশেষ করে সাহারার দক্ষিণ দিকের। কিন্তু দেখুন, সেখানেও জীবন আছে, জীবন চলছে ঠিক জীবনের মতোই। সর্বতভাবে আমাদের যে-দৈনন্দিন জীবনযাপন, দিন শেষে জনগণ তা ভুলে যায়, মনে রাখে না। এরা আমাদের নিরস জীবনযাপনে প্ররোচিত করে। কিন্তু এই যে, গুপ্ত সংগ্রাম, জনগণের সংগ্রাম, তা কিন্তু অন্যান্য দেশের মানুষের সংগ্রামের মতোই। যাকে আমি আমার ভাষায় দৈনন্দিন জীবনের বীরত্বগাঁথা বলি। এই বীরদের কোনো দেশ নেই; কোনো জাতি তাদের পদক দেয় না...কখনও নির্মিত হয় না তাদের প্রতিমূর্তি। এটাই আমার ট্রিলজির প্রতিকৃতি। ইতোমধ্যে ট্রিলজির দুইটা সম্পন্ন করেছি, একটা ফাত-কিনে অন্যটা এই মুলাদে আর তৃতীয়টা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।
মুলাদে-এ আমি আফ্রিকার সবুজঘেরা গ্রামগুলোকে প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছি। ‘অন্যদের’ সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের নিমিত্তে মূলত আমি এটা করেছি। এর সঙ্গে সিনেমায় এমন কিছু বহিস্থ প্রভাবক রেখেছি, যা আফ্রিকাকে জানা-বোঝার ক্ষেত্রে একটা পরিপূর্ণ জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে। আমি দেখিয়েছি, দুটো মূল্যবোধ কীভাবে পরস্পরের মধ্যকার সংঘর্ষে ক্রিয়া করে। এর মধ্যে একটা প্রথাগত মূল্যবোধ, যা যৌনতার ভিত্তিতে নারীকে বিভাজিত করে।
অনেক আগের কথা; যীশু, মোহাম্মদের আগের কালটা ছিলো হেরোডোটাসের আধিপত্যের। এই মূল্যবোধটা গড়ে উঠেছিলো তখনই। আমার মনে হয়, নারীর প্রতি আজকের যে-নিগ্রহের দৃষ্টিভঙ্গি, তার শুরু তখনই। আর অন্য মূল্যবোধটা সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সক্রিয়; সেটা হলো দুর্বলের ওপর সবলের নিয়ন্ত্রণ। এই দুই ধরনের মূল্যবোধের মিলন, বিরোধিতা, বিস্তার এবং তার ফল হিসেবে সংঘর্ষ-আমাদের সমাজের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে আরও অনেক আধুনিক সাংঘর্ষিক উপাদান, যা আমাদের সংস্কৃতি বিনির্মাণের অংশ। আমাদের যে-উপরিকাঠামো (superstructure), তার সর্বোচ্চ স্থান জুড়ে রয়েছে ধর্ম। এই উপাদানগুলো যদি পানি হয়, তবে আমার সিনেমাটা সেই পানিতে পালতোলা নৌকা মাত্র।
গাদজিগো : আপনি বলেছেন মুলাদে’র অধিকাংশ জায়গা জুড়েই রয়েছে আফ্রিকান জনগণের কথা। একটু বিস্তারিত বলবেন কি?
উসমান : কথাটা আমি এক ধরনের চেতনা থেকে বলেছিলাম, এটা আফ্রিকান সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নির্মিত। তবে অবশ্যই এতে এমন কিছু উপাদান আছে, যা বাইরে থেকে নেওয়া। কিন্তু পুরো সিনেমা জুড়ে রয়েছে একটা সংস্কৃতি, একটা ভাষা এবং এর রূপক ও প্রতীক। সিনেমায় দুটো ভিনদেশি উপাদানের একটা হলো সাবেক একজন সেনাসদস্য। যিনি মানবতাবাদী ও শান্তিবাহিনীর সব মিশনে অংশগ্রহণ করেছেন। আরেকজন ইউরোপে নির্বাসিত ব্যক্তি। যিনি কিনা আফ্রিকার এক গ্রাম-প্রধানের সন্তান। তবে এটা আমার কাছে একটা সম্পূর্ণ আফ্রিকান চলচ্চিত্র।
গাদজিগো : আপনার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘The Black Docker’। উপন্যাসটির প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘The Mother’। এখানে আপনি নারীদের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন। তুলে ধরেছেন আফ্রিকান নারীদের বীরত্বগাঁথা। একটি ব্যাপার বলুনতো, আপনার প্রতিটি কাজে বারবার এই বীরত্বগাঁথা কেনো ফিরে আসে?
উসমান : আমি মনে করি, আফ্রিকা মাতৃতান্ত্রিক দেশ। আফ্রিকার পুরুষেরা চরমভাবে মাতৃতান্ত্রিক। তারা তাদের মাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। তারা মায়ের নামে দিব্যি কাটে। তারা বাবার অপমান কিছুটা সহ্য করলেও মায়ের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড আঘাত পায়। মাকে রক্ষা করতে না পারলে তারা মনে করে জীবনই বৃথা। আমাদের প্রথানুযায়ী সাধারণ একজন মানুষের নিজস্ব কোনো মূল্য নাই। সে মূলত তার মায়ের মাধ্যমে মর্যাদা পেয়ে থাকে। এই ধারণাটা ইসলামের সঙ্গেও যায়। ভালো স্ত্রী, ভালো মা-একজন অনুগত মা। তিনি জানেন, কীভাবে তার স্বামী-সংসারের দেখাশোনা করতে হয়। মা-ই আমাদের সমাজের প্রতীক।
আফ্রিকান সমাজের এই মাতৃতান্ত্রিকতা আমার অন্তরে গাঁথা। সম্ভবত, এটা আমরা ইসলাম পূর্ব-যুগের মাতৃশাসিত সমাজ ব্যবস্থা থেকে পেয়েছি। আমার কাছেও মনে হয়, প্রত্যেকটা মানুষই স্ত্রী-জাতিকে ভালোবাসে। আফ্রিকানদের মধ্যে শতকরা ৫০ জনই নারী। আমরা বা পুরুষেরাও মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। সব মিলিয়ে আমরা প্রায় ৮০ কোটি আফ্রিকান। যদি নারী-পুরুষ একত্র হয়ে কাজ করা যায়, তবে তা উন্নয়নের জন্য একটা বড়ো শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
গাদজিগো : ৫০টি আফ্রিকান দেশের মধ্যে ৩৮টিতেই ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে। তারপরও আপনি বারকিনো ফাসো-এর মতো দেশের একটি গ্রাম নিয়ে সিনেমা করেছেন। গ্রাম হিসেবে ‘জেরিসো’-কে কেনো বেছে নিলেন?
উসমান : ইচ্ছা করলেই আমি সিনেমাটা অন্য কোথাও করতে পারতাম। কিন্তু আমি যে-জিনিসটা খোঁজার চেষ্টা করেছি, তা এখানে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। আমি সিম্পলি একটা গ্রাম খুঁজতে চেয়েছি, যা আমার সৃষ্টিশীল বাসনাকে নাড়া দেয়। আমি চাইলে আফ্রিকার আদর্শ কোনো গ্রামকে নিতে পারতাম। কিন্তু সেটা মোটেও উচিত হতো না। সেজন্য আমি হাজার হাজার কিলোমিটার ঘুরেছি। বারকিনো ফাসো, মালি, গিনি এমনকি গিনি বিসাউ-এ গিয়েছি। কিন্তু এই গ্রামটা দেখেই আমার মনে হয়েছে, এটাই আমি খুঁজছি। আমি যা চেয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি কিছু আছে এখানে। গ্রামের মাঝখানে রয়েছে সজারু আকৃতির মসজিদ, যা সাব-সাহারান অঞ্চলের অনন্যসাধারণ স্থাপত্যের নিদর্শন। স্থাপত্যটা বাইরের কোনো প্রভাবক দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়নি। সেখানকার উইপোকা আর পিঁপড়ার ঢিবির কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কারণ, এটাই ছিলো আমার মুলাদে সিনেমার প্রতীক। আর এজন্যই জেরিসো-কে আমি বেছে নিয়েছিলাম।
গাদজিগো : আপনি প্রায়ই বলেন, ‘আমার কাছে সৃষ্টিকর্ম হলো কোরার মতো (এটি বিশেষ ধরনের আফ্রিকান সঙ্গীত যন্ত্র, যাতে ২১টি তার রয়েছে), যার অনেকগুলো সূত্র। আমি এটা বাজাতে পছন্দ করি এবং সময় নিয়ে শুনি। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা, এ-ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন।’ কিন্তু আমার কথা হলো, ঠিক কোন্ ধরনের সন্তুষ্টি আপনাকে মুলাদে-এর মতো সিনেমা নির্মাণে অনুপ্রাণিত করেছে?
উসমান : দেখুন, অভিজ্ঞতার শেষ নেই। আমি দলবদ্ধ হয়ে কাজ করি। যে-দলে রয়েছে মরক্কো, আইভরি কোস্ট, বেনিন, মালি, বারকিনো ফাসো, ফ্রান্স ও সেনেগালের অধিবাসী। এইমাত্র আমি আমার সিনেমাটি শেষ করলাম এবং অপেক্ষায় আছি আমার দলের প্রতিক্রিয়া দেখার। এটা আমার একার কৃতিত্ব নয়। আনন্দ, অর্থাভাব, কষ্ট ও সন্তুষ্টি সবই পেয়েছি সিনেমাটা নির্মাণের সময়। কিন্তু প্রথম প্রদর্শনীতেই আমার সব দুঃখ-কষ্ট ঘুচে গেলো। সিনেমা করার সময় আমি একটা বিষয় সবসময় মাথায় রাখার চেষ্টা করি, যেনো তা শুধু বর্তমানের চাহিদা না মেটায়। ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করি। তাই আমার সিনেমা সময়ের মাপকাঠি দিয়ে মাপা যাবে না।
গাদজিগো : পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ কি আপনি ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্সে করতে চেয়েছিলেন-সে সামর্থ্য কি আপনার ছিলো? তারপরও কেনো মরক্কোর রাবাত-এ করলেন?
উসমান : মরক্কোতে এটাই কিন্তু আমার প্রথম অভিজ্ঞতা নয়। ফাত-কিনে সিনেমার পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ-যেমন সম্পাদনা, সাউন্ড এডিটিং ইত্যাদি মরক্কোর রাবাত-এ করেছি। এজন্য আমি গর্ব করে বলতে পারছি, মুলাদে এই মহাদেশেই জন্মেছে এবং এখান থেকেই নির্মিত। এটা আমার ব্যক্তিগত অহঙ্কার। ফলে আফ্রিকান ফিল্মমেকারদের, বিশেষ করে তরুণদের আমি বলতে সমর্থ হবো-সিনেমা তৈরির জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা আমাদের মহাদেশেই আছে। আমরা কোনো ধনী দেশ নই, তারপরও আমাদের রয়েছে পছন্দ করার মতো অনেক কিছু।
দেখুন, প্রচলন আছে সভ্যতার জন্ম এই আফ্রিকাতেই। তারা লুসিকে (Lucy, যার সাংকেতিক নাম ALL288-1। এটি হোমিনি শ্রেণির অন্তর্গত এবং মানুষের সহজাত বলে ধরা হয়। নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, আনুমানিক ৩.২ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে এদের বাস ছিলো। ১৯৭৪ সালের ২৪ নভেম্বর ইথিওপিয়ার আফার ডিপ্রেসন এলাকায় এই ফসিলটি পাওয়া যায়) নিয়ে কথা বলে। তারা মিশরকে নিয়েও অনেক কথা বলে। বিতর্ক আছে, আমরা ও ইউরোপিয়রা মাগরেবদের সঙ্গে একত্রে ছিলাম। শেখ আন্তা দিওপ তার এক বইয়ে দেখাতে চেয়েছেন, সব সভ্যতার উৎপত্তি মিশরের ফারাও সভ্যতা থেকে। আমি তার সঙ্গে একমত। ফারাও ছিলো কালো সভ্যতা।
পৃথিবীতে এই যে-বিভাজন তা এসেছে কৃষ্ণাঙ্গ দেবীর কাছ থেকে। হেরোডোটাস তাকে যখন প্রথম দেখেছিলেন, তখন থেকেই এই বিভাজনের শুরু। এটা খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম বা চতুর্থ শতকের কথা। মিশরিয় প্রথানুযায়ী এই মহাদেশে যাদের বসবাস, তারা এসেছিলো জিম্বাবুয়ে থেকে কিন্তু জন্ম নিয়েছিলো নাইজেরিয়ায়। কিন্তু এই জাতি কেনো ভেঙে গিয়েছিলো আমরা তার কারণ অনুসন্ধানে পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা অবশ্যই এ-ব্যাপারে নিজেদেরকে প্রশ্ন করি।
কেউ অতীতের জন্য কাঁদে না। কিন্তু আমি মনে করি, আফ্রিকার বর্তমান বাস্তবতায় ওই মূল্যবোধে পুনরায় উজ্জীবিত হওয়া উচিত। আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। এটা আমাদের পৈতৃক সম্পদও। অবশ্যই আমরা তা পুনরুদ্ধার করবো এবং বলবো আমরা তা পারি। কিন্তু এতে একটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা আছে।
গাদজিগো : আমরা জানি, আপনি শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত। ইন্দোচীন যুদ্ধে মার্সেই-এর জাহাজে যুদ্ধ করেছেন; আলজেরিয়ায় ঔপনিবেশিক যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। এমনকি কোরিয়ান যুদ্ধের সময়ও আপনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন কমিশন্ড অফিসার হিসেবে। কিন্তু এখন কেনো সংস্কৃতি, শিল্পের জন্য যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
উসমান : আমি তা জানি না। আর এ-ব্যাপারে কিছু বলবও না। আমার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ জেলে, দাদাও তাই। মাছ ধরেই সারাজীবন কাটিয়েছেন তারা। বাবা বারবার বলতেন, কোনো সাদা মানুষের মতো দক্ষ কর্মী তিনি নন। তার সমস্ত অভিজ্ঞতাই মাছ ধরায় বন্দি ছিলো। আমার পরিবারে একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে আমিই প্রথম স্কুলে যাই।
গাদজিগো : হ্যাঁ, যাই হোক। মার্সেই-এর সিজিটি লাইব্রেরিতে থাকাকালীনই লেখক হিসেবে আপনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। তারপর কি আপনি নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিলেন লেখালেখি করার এবং পরবর্তীতে সিনেমা নির্মাণের?
উসমান : না, না! লেখার প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই আমি লেখালেখি শুরু করি। এটা ছিলো মূলত আমার রাজনৈতিক কার্যের একটা অংশ। যুবক বয়সে আমি ওইসব লাইব্রেরিতে যেসব বই পড়েছি, তা আফ্রিকা সম্বন্ধে নেতিবাচক কথায় ভরপুর ছিলো। আফ্রিকাকে বলা হতো কলাগাছের আফ্রিকা, দূষিত আফ্রিকা, ‘ভালো’ কৃষ্ণাঙ্গ, ওরা বুড়ো হয় না-এরকম আরও অনেক কথা। ওইসব বই পড়ে জেনেছিলাম, আমরা নাকি যুদ্ধবাজ। আমি বলতাম, যে-আফ্রিকা থেকে আমি এসেছি, তা তো এমন নয়! সত্যি কথা বলতে কী সেখানে নারকেল গাছও আছে, আছে কলা গাছের ভেলাও; সর্বোপরি সেখানে রয়েছে মানুষ। আমরা তো আর পিঁপড়া নই।
গাদজিগো : সম্প্রতি আপনার পছন্দ দ্বারা আমি দারুণভাবে প্রভাবিত। শুনেছি, আপনি নাকি শিল্পের চেয়ে রাজনীতির দিকেই নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
উসমান : ও রাজনীতি...হ্যাঁ, এটা একটা কপর্দকশূন্য পছন্দ। সংস্কৃতি, রাজনৈতিক; কিন্তু এর অন্য এক ধরনের রাজনীতিও আছে। আপনি চাইলেও আপনার পছন্দমতো সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন না। আপনি এর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন বলছেন, তবে শিল্পে কিন্তু আপনি রাজনৈতিক। আপনি বলেছেন ‘আমরা’, ‘আমি’ বলেননি। জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে মানুষ তার নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তোলে। তারা একটা নির্দিষ্ট যুগের দিকে এগিয়ে যায়। আমি যখন নতুন সংস্কৃতি দেখি, তখন সেটা এভাবেই ব্যবহার করি-হতে পারে সেটা রাজনীতি। তবে সেটা রাজনীতিবিদদের রাজনীতি নয়। তাতে মন্ত্রী কিংবা এরকম কিছু হওয়ার লোভ নেই। আমি মানুষের জন্য কিছু বলতে চাই। বিতর্ক দেখতে চাই। কোন্ উদ্দেশ্য নিয়ে আপনি আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, আমার কাজ সম্বন্ধে? আমি নির্বাচিত নই, ভোটের জন্য কারও কাছে কোনো শপথও করিনি। শিল্পী হিসেবে আমার পুরস্কার একটাই, লোকে আমার কাছে তাদের উৎসাহ জানাতে আসে।
গাদজিগো : আপনি ১৯৭৫ সালে ব্লুমিংটনের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে ‘Man is culture’ শিরোনামে লেকচার দিয়েছিলেন। সেই সময় সপ্তাহজুড়ে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করেছি। আমি যা বলতে চেয়েছি, আপনি তা খুঁজছেন। আমি বলতে চেয়েছি ‘সত্য অর্থে’ আপনি আফ্রিকান সংস্কৃতিকে কীভাবে বর্ণনা করবেন?
উসমান : কিন্তু আমি তা কাকে বলেছিলাম? এই এলাকার বেশিরভাগ লোকই মান্দিং ভাষায় কথা বলে। তবে কিছু লোক আছেন যারা শুধু মান্দিং নয়, ফ্রেঞ্চ ভাষায়ও কথা বলতে পারে। তারা কিন্তু এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ইংরেজি বা ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলে না। তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনের ভাষা ব্যবহার করে। এখানে ‘দুঃখ’ একটা সত্য ঘটনা, যা আমার সাহিত্যে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দুঃখ বিষয়টাও এখানে ভালোভাবে, খুব সহজভাবেই বুঝতে পারা যায়।
গাদজিগো : আপনি প্রায়ই বলেন-সিনেমা কিছুটা গণিতের মতো, সাহিত্যের মতো নয়। আবার একই সঙ্গে বলেন, সিনেমা শিল্প ও ইন্ডাস্ট্রি। আজকের আফ্রিকান সিনেমার অবস্থান কোথায়? তা কোন্ পথে এগোচ্ছে?
উসমান : তা বলতে পারি না। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, আমরা সফলতার দোরগোড়ায়। কিন্তু সেটা কীভাবে, কখন-সে সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা নেই। পথটা হতে পারে সোজা, বাঁকা, চড়াই অথবা ঢালু? কিন্তু সফলতার জন্য আমাদের শক্ত মনোবল রয়েছে। এই শতকে কিছু মানুষ বিশ্বদৃষ্টির বাইরে, অথচ সে সম্বন্ধে তারা কিছু বলতে পারছে না। পুরো মহাদেশের মানুষ বিশ্বদৃষ্টির বাইরে? না, আমরা তা পারি না এবং তা আমাদের পারাও উচিত না।
গাদজিগো : আমরা দাস যুগ, ঔপনিবেশিক যুগের মধ্য দিয়ে এসেছি। এখন চলছে বিশ্বায়নের যুগ; যাকে আমরা নব্য-উপনিবেশিকতাবাদও বলতে পারি। সবসময় মানুষ তার আঘাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সেমবেন, আপনি কি বলতে পারেন, রুখে দাঁড়ানোর এই শক্তি আমরা কোথায় পাই?
উসমান : তা আমি জানি না, বলতেও পারি না। কিন্তু আপনি যা বলছেন, তার সঙ্গে আমরা গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আজ পর্যন্তও আফ্রিকা রুখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বর্তমান শতাব্দী আফ্রিকা মহাদেশের জন্য ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। দাস প্রথা গড়ে উঠেছিলো গীর্জার আশীর্বাদে, ইউরোপিয়রা তা গ্রহণও করেছিলো। আপনি বাইবেল, কোরআন কিংবা তালমুদ-এ (ইহুদি আইন ও শিক্ষণীয় বিষয়ের সংগ্রহ) তা পেতে পারেন। ইউরোপিয়রা সম্পদের জন্য উপনিবেশিকতার মধ্য দিয়ে আফ্রিকাকে বিভক্ত করেছে। ১৮ ও ১৯ শতকে ইউরোপিয় দেশগুলো একত্র হয়ে আফ্রিকাকে দখল করেছিলো।
ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও আরও কয়েকটি ইউরোপিয় দেশ আফ্রিকাকে ভাগ করে যে-যার মতো শাসন করেছে। এমনকি দাস যুগেও এসব দেশ আফ্রিকার উপকূল পর্যন্ত তাদের সীমানা বাড়িয়েছিলো। এখন আফ্রিকাকে একতাবদ্ধ, নতুনভাবে গোষ্ঠীবদ্ধ করার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে ইউরোপ। এই ইউরোপ যখন আফ্রিকাকে তাদের মতো শোষণ করছিলো, ঠিক তখন ইউরোপেরই ফ্রান্স স্বাধীনতা, মানুষের অধিকারের বুলি আওড়াচ্ছিলো। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা-সাম্য-ভ্রাতৃত্বের যে-স্লোগান, সেটা যেনো শুধু ইউরোপিয়দের জন্যই, আফ্রিকানদের নয়। তারা এমন ব্যবস্থা কায়েম রেখেছে যা-আজও দাসপ্রথা ও উপনিবেশিকতারই প্রতিনিধিত্ব করছে। অথচ বিশ্বায়ন কিন্তু তা বলে না।
আবারও আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সম্পদের জন্য তারা আমাদের চেপে ধরেছে। পুনরায় যুদ্ধ আমাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফ্রিকা আজ শুধু যুদ্ধের কথাই ভাবছে। ১০০ বছরের দাস কিংবা উপনিবেশিক শাসনামলে যতো আফ্রিকান মরেছে, ১৯৬০ সাল থেকে তার চেয়েও বেশি আফ্রিকান, আফ্রিকানকে মেরেছে। বিশ্বায়নের কথা বলে আমাদের বলা হচ্ছে ‘ফরাসিভাষী’। আমাদের নেতারা, তাদের অনেকের কথাই বলতে পারি, যারা ইউরোপে বাড়ি বানাচ্ছেন। দেশে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই, তারা ইউরোপে পাড়ি জমাতে প্রস্তুত থাকেন।
আমরা বিশ্বায়ন নিয়ে ভাবি না, ভাবতে চাইও না। আফ্রিকাতে অর্থনৈতিক সমস্যার চেয়ে মানবিক সমস্যাই বেশি। যখন আফ্রিকানরা নিজেদের মধ্যে, নিজ প্রতিবেশী দেশসমূহের মধ্যে বিনিময় করতে পারে না, তখন সেটা একটা বড়ো সমস্যা। ইউরোপিয় বাজার যেখানে মাত্র ২৫ কোটি মানুষের, সেখানে আফ্রিকায় রয়েছে প্রায় ৯০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার। এ-কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনীতি ও পদার্থবিদ্যার নীতি পৃথিবীর সর্বত্র, সব সংস্কৃতি, সব ভাষাভাষী মানুষের জন্যই এক।
গাদজিগো : ১৯৬০ সাল থেকেই আপনি আফ্রিকানদের জাতীয় ভাষাকে পূর্বের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম করছেন। ৭০ দশকে উল্ফ ভাষায় বেশ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ‘কাদ্দু’ নামের একটি সংবাদপত্র বের করেছিলেন। সম্প্রতি এই বছরেই, বুবাকার বরিস দিওপ (Boubacar Boris Diop) এর সম্পাদনায় উল্ফ ভাষার প্রথম আদর্শ সংবাদপত্র প্রকাশ হয়। উল্ফ, পুলার, সোনিঙ্কা, বোমবারা ভাষায় এখন বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত রেডিওগুলোতে কর্মীরা অসাধারণ কাজ করছে। আজকের যে-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তা যদি বহাল থাকে, তবে আমরা কি আমাদের ভাষাকে সাধারণের কাজে লাগাতে পারবো?
উসমান : আপনি বলছেন ‘যদি’। আপনি একজন ফরাসি অধ্যাপক, আপনি আমাকে বলেন ‘যদি’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন? আমাদের নেতারা তা চান না। আপনি কী কল্পনা করতে পারেন, দক্ষিণ সাহারার একটা দেশের অফিসিয়াল ভাষা আফ্রিকান। আমাদের মহাদেশের অধিকাংশ নেতাই এ-ব্যাপারে নেতৃত্ব দিতে পারেন না। এটা বর্তমান নেতৃত্বের দায়িত্ব, কিন্তু দুঃখের বিষয়-আমাদের নেতৃত্বের অধিকাংশই মাতৃভাষায় কথাই বলেন না।
গাদজিগো : আমরা কিছুক্ষণ আগেই ট্রিলজি নিয়ে কথা বলেছি। আপনি ইতোমধ্যে ফাত-কিনে ও মুলাদে নির্মাণ করেছেন। এবার বলুন আপনার ট্রিলজির তৃতীয়টির নাম কী হবে?
উসমান : আমার ট্রিলজির তৃতীয়টিতে থাকবে শহরের কাহিনী, থাকবে সরকার। সিনেমার নাম হবে দ্য ব্রাদারহুড অব র্যাটস (The Brotherhood of Rats)।
গাদজিগো : আপনাকে ধন্যবাদ।
উসমান : আপনাকেও ধন্যবাদ।
সূত্র :http://www.marxmail.org/INTERVIEW_SEMBENE.htm
অনুবাদক : কৃষ্ণ কুমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করেছেন। এখন ‘সোনার হরিণ’ খ্যাত চাকরির সন্ধানে রয়েছেন।
kumarkrishmcj@gmail.com
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন