Magic Lanthon

               

সেলিম আহ্‌মেদ

প্রকাশিত ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

শিল্পে সাতচারা ও সিনেমা দ্য লাস্ট ঠাকুর

সেলিম আহ্‌মেদ


মগবাজার মোড়ের একটা ছোট জটলা আর শাহবাগের মোড়, যে-রাস্তাটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে গেছে তার ডান দিকে জাতীয় যাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থাগার, চারুকলার ক্যাম্পাস এবং তার উল্টোদিকে ছবির হাট হয়ে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানের অনেকাংশ জুড়ে যে-হাজার মানুষের প্রতিদিনের জমায়েত তা মূলতই মিডিয়া-প্রাণ মানুষদের। এই কর্মীরা মঞ্চ নাটকের, এই কর্মীরা টেলিভিশন নাটকের, এই কর্মীরা ডিজিটাল সিনেমা দলের।

৮০র দশকে শিল্পকলা আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী ছিলাম, শিল্পকলা একাডেমীর স্বেচ্ছাচারিতা থেকে স্বৈরাচার সরকারের পতন পর্যন্ত লাগাতার অংশগ্রহণ। আজ ভাবতে বসলে কখনও মনে হয় অকাতরে যৌবনদান অথবা যৌবনের ধর্মই এমন নষ্ট হয়ে গেলে বিলম্বে বোঝা যাবে। এখনকার নিবেদিতপ্রাণ মিডিয়াকর্মীদের সঙ্গে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগের চারশো দিন শেষ করেছি, একদম কাজ-খাওয়া-ঘুমানো সব একসঙ্গে। কুড়ি-পঁচিশ বছর পর আমার উপর থেকে দেখার চোখ হয়েছে, আমি বুঝতে পারি কতোটা অরণ্যে আছি নাকি এখন নগরায়নের চাপে কংক্রিটের জঙ্গলটা কতো বড়ো হলো। ১৯৮৩ সালে আজকের ছবির হাটের জায়গা জুড়ে ছিলো মোল্লার ক্যান্টিন, মারফতি লাইনের ভক্ত নিজে কখনও তার জীবন-আদর্শ নিয়ে চারুকলার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাইজা-ফ্যাসাদ করেন নাই।

আমরা তিন তরুণ মোল্লার দোকানে ছাপচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করি, প্রদর্শনীর উদ্বোধক ছিলেন মোল্লা স্বয়ং। আমরা তখন সংগঠিত করেছি শিল্পকলা একাডেমী থেকে স্বেচ্ছাচারিতায় বাদ দেওয়া শিল্পকর্মের প্রদর্শনী কল অব এক্সিবিশন, দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখেছি মনোযোগ দিয়ে। দীর্ঘ প্রতিবাদী কাব্য চর্চা করেছি শহীদ মিনারে। তখন আমরা একটা ইস্ট্যাব্‌লিশমেন্ট বিরোধী আন্দোলন করেছি। সেই সময় কর্পোরেট কালচার এদেশে আসে নাই, তবু আমাদের সময় নামের শিল্পী-গ্রুপকে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের প্রদর্শনীর জন্য বিদেশি ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করতে হয়েছিলো। [১। নাগরিক জীবনে সব শিল্পের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন হয়।] এখন কিন্তু বিষয়গুলো একদম পরিষ্কার যেমন-অর্থহীন, ভাসা ভাসা জ্ঞান আর ধ্রুপদ সব শিল্পের পৃষ্ঠপোষকই কর্পোরেট অস্তিত্ব। সামাজিকভাবে আমরা বড়ো পুঁজিকে আর রক্তচোষা বেনিয়া বলি না বরং সুযোগ খুঁজি সিএসআর সংক্রান্ত উড়ে যাওয়া টাকার কতোটুকু নিজের করা যায়।

এ যুগে বিজ্ঞাপননির্মাতা যেমন ভিজিটিং কার্ডে ফিল্মমেকার লিখে পরিচয়টা ধোঁয়াকার বানায় অথবা এইটা হীনমন্যতা ঢাকবার একটা প্রচেষ্টা মাত্র; নিজের পেশাকে হয়তো ঠিক বুঝতে পারছে না। [২। পেশা যেহেতু শুধু উপার্জনের জন্য ব্যবহার হয় তাই ভালোলাগা বা মননে কিছুই লালিত হয় না।] এইবার আমরা ফিল্মমেকার শব্দটা কোন্ কোন্ মানুষের জন্য ব্যবহার করবো তা রীতিমতো দুর্বোধ্য করেছে চারিপাশের কর্মকাণ্ড-এমনকি কোনো বিধিও নাই বাংলাদেশ সরকারের। সিনেমা তৈরির অনুদানের বহর দেখলেই তা বোঝা যায়। যিনি বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণ করে বৃদ্ধ, ভিন্নধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে জগৎ-বিখ্যাত আবার কোন্‌দিন সিনেমা নির্মাণ করবেন এমন স্বপ্ন দেখেন নাই এইসব মানুষেরা অনুদানের সিনেমা তৈরি করেন বা মনোনীত হন এককাতারে। এই মনোনয়নের ভিত্তি কী? কেউ জানে না। রাজনৈতিক মনোনয়ন কখনও কোনো স্থানে বা দেশে শিল্প সৃষ্টির সহায়ক হয়-আমার জানা নাই, বিষয়টি হাস্যকর আর কৌতুকপূর্ণ।

এইসব সন্ধ্যার জটলায় আলাপের কতোকগুলো ধরন আছে সেই বিষয়টা বলা জরুরি। সিনেমা-পাগল কিছু মানুষ, সুলভ ইন্টালেকচুয়াল, আজই সব শেষ করতে হবে কাল সকাল থেকে শুটিং, একঝাঁক অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর; কিছুই হচ্ছে না এমন হতাশ ডিরেক্টর, অভিনয় করবেন নাকি নির্দেশনা দিবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, আর মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা যারা সবে মিডিয়া-পাড়ায় এসেছেন ভালোলাগার টানে। শুধু প্রয়োজন প্রসঙ্গের, শুধু অপেক্ষা সূত্রধরের। কেউ একজন বলে উঠলো একশত সিনেমা হল ডিজিটাল হচ্ছে তো আলাপের শুরু, এইবার সুযোগ, এইবার যদি আবার মানুষ হলমুখী হয়। কেউ একজন বললো-এইবার আমি সিনেমা বানাবো, আমার স্ক্রিপ্টটা প্রায় শেষ। আর একজন বললো-এই রেড ক্যামেরায়? থ্রিডি ফাইভডি দিয়ে সিনেমা? বড়ো নাটক হবে, আর কিছু হবে না। সিনেমার ভাষাই আলাদা। আমার লাগবে থারটি-ফাইভ, সেটের এক কোণায় এনে বসালেই পরিবেশ বদল হয়ে যায়। ফিলিংসটাই ভিন্ন। আমার স্বপ্ন একটু একটু করে কমিয়ে, সীমিত করে এবং প্রয়োজনীয় করে উপস্থাপন করবো তাই চাই থারটি-ফাইভ ক্যামেরা।

অন্যদিকে, আমরা চিত্রনাট্য আর সিনেমায় কুশলীদের ভাষা কী হবে তা ঠিক করতে রাত শেষ করছি। আবার কতো সন্ধ্যা শেষ হয়ে যাচ্ছে বিংশ শতাব্দীর শিল্প আন্দোলনে। এ-আড্ডায় আমি ছাড়া বাকিরা একদম তরুণ, জীবনানন্দের কবিতায় বলতে পারি...শোনো/তবু এ মৃতের গল্প; কোনো/নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;/বিবাহিত জীবনের সাধ/কোথাও রাখেনি কোনো খাদ...।

আমার এ-জগতে মেলামেশার সুযোগে আড্ডা মেজাজে যে-বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি তা যেনো ছেলেবেলার সাতচারা খেলার মতো, একটা দ্রুত নিমিষেই ছুটে আসা টেনিস বল পিঠে দমবন্ধ করা আঘাতের অনুভূতি শুধুমাত্র সাতচারা খেলার খেলোয়াড়রা জানে। ফাটায় দিমু, ফাটায় দিছি খুব পরিচিত শব্দ এখানে। ডিরেক্টরদের ড্রিম সিকোয়েন্স থাকে, সেই এক সিকোয়েন্স ভরসা করে তৈরি হয় নাটক ফিলারের মতো। নাটকের জন্ম ওই সিকোয়েন্সের জন্য। শিল্প নির্দেশনার কোনো সংস্কৃতি টেলিভিশন নাটকে নাই, সিনেমায় দৃশ্য পরিকল্পনা কাঠমিস্ত্রিকে বলে বোঝাতে পারলে বাকিটা ভগবান জানেন কী ধরনের সেট নির্মাণ হয়। কস্টিউম মূলত অভিনেতা-অভিনেত্রীর বিষয়, তারা নিজেদের সংগ্রহ থেকে আনবেন। পরিচালকের পরিচিত কোনো মানুষ সন্ধ্যায় কালো রঙের কাপড় পরলে ভালো লাগে, শুধু এই জ্ঞান সম্বল করে সিনেমার কস্টিউম ডিজাইনার হয়ে যুক্ত থাকেন। আবার পড়াশোনা জানা মানুষ ১৯০০ সালের পোশাক বলতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পোশাককেই দিব্যি চালিয়ে দিয়েছেন। শুধু কোন্ কোন্ জামা-কাপড় কোন্ কোন্ সিকোয়েন্সে আছে তা লিখে রাখবার অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে-কাপড় পরানো হচ্ছে তা হয়তো ৯০ দশকের। মহান পরিচালক তিনিও ভাবছেন নাটক বা সিনেমায় কস্টিউমে পিরিয়ড ধরতে হবে এমন ধারণা মূল্যহীন। জামা-কাপড় দেখবে নাকি? দেখবে তো অভিনয়। ইতিহাসের কথা, নির্দিষ্ট সময়ের গল্প তাই বলে এতো ডিটেইল করতে পারবো না। প্রকৃতপক্ষে গুরুত্ব জানেন না, চলছে সাতচারা খেলা।

মগবাজার মোড়ের সেই ছোট জটলা আর শাহবাগের মোড় থেকে ছবির হাট পর্যন্ত বিস্তৃত তরুণদের স্বপ্ন প্রতিদিন উদ্ভাসিত হয়, আবার দিনশেষে মধ্যরাতে নামে হতাশা; তবুও জীবন তো আশার কথাই বলে। এদের অসংখ্য রেফারেন্স আর আলাপে আমি পর্যটকের মতো এক ঘণ্টার নাটক, সিরিয়াল বা ডিজিটাল সিনেমায় ভ্রমণ করি। ঠিক তেমনি এক সিনেমার কথা, যদিও মূল সিনেমা দেখতে অনেক দেরি হয়ে গেছে তবু মনে পড়ে ইউটিউবে যথাসময়ে দ্য লাস্ট ঠাকুর সিনেমার ট্রেইলার দেখেছিলাম। পরিচালনা এবং সিনেমাটোগ্রাফি সাদিক আহমেদের, ৮১ মিনিটের এই সিনেমা। একটা বড়ো ক্যানভাসের গল্প মনে করেছিলাম, বড়ো ক্যানভাস মানে লাস্ট সাপার-এর মতো অনেক ঘটনার মিলনে একটা কিছু মনে আসতে পারে। কিন্তু নিতান্তই এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদারের শেষ হয়ে যাওয়ার কথা সোঁদা মাটিতে বিদেশি গল্পের চিত্রায়ণের মতো। একদম কিছু না জেনে প্রথমেই দৃশ্য রচনায় মনে হবে এ-সিনেমা নির্মাণের দলটার আছে আধুনিক কারিগরি জ্ঞান। এ-তো ওয়ার্কশপের হাইব্রিড ফসল, শিল্প নাই। 

সিনেমার প্রথম ফ্রেম মানে শুরুতে মৃত নদীতে চাষাবাদ, পানির অংশ সবুজ-জমিন আর ডান দিকে উপরে বসতির মতো এলাকা জুড়ে ত্রিকোণ পতাকার সমাহারে দৃষ্টি চলে যায়, আবার দেখি একটা উইন্ডমিল। কল্পিত নান্দনিক ধারণা, বিদেশি। সিনেমার শুরুতে প্রতিটি দর্শকের মতো আমারও ধারণা হয় সময়টা কতো? কোন্ দশক? গোটাদুয়েক ট্রাক্টরের সঙ্গে এক কিশোরকে যখন দেখি সেলফোনে কথা বলছে তখন বুঝতে চেষ্টা করি এটা এই সময়ের গল্প। আবার ডিস্ট্রিবিউটর যে গল্প-সারাংশ বলেছে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ বছর পরের গল্প, সময়টা ২০০০ সাল। গল্প বলার জন্য কিশোর ওয়ারিস দিয়ে যেভাবে শুরু করা হয়েছে, তা বাংলা সিনেমায় নতুন।

ঠিক তিন-চারটা ড্রিম সিকোয়েন্স আর তার জন্য দরকার গল্প। চিত্রনাট্য সংলাপহীন মানে একটা লাইনআপ, দৃশ্যরচনা হয়তো কিছুটা আছে। ঠাকুরের শার্টের শুধু পকেটের সেলাই খুলে দিলেই দৃশ্যায়ণ পুরনো দিনে চলে যাবে-এমন ভাবনা চতুরতা ছাড়া অন্যকিছু না। তার যে-প্যান্ট, কোমরের বেল্ট সব মিলিয়ে এই নাগরিক রশিতে ঝুলিয়ে রেডিও কী করেন? একটা ওয়েস্টার্ন সিনেমায় তপ্ত দুপুরে দূরের ঘোড়সওয়ার যেমন করে দৃশ্যে প্রবেশ করে ঠিক তেমন কালার, প্রবেশ রেললাইন এর স্রোত ধরে, অথচ কালা এমন কোথাও হেঁটেই যাচ্ছে যেখানে ট্রেন নাই, রেললাইনের ব্যঞ্জনা কেনো একদমই অস্বচ্ছ ধারণা। দৃশ্য রচনায় ওই জায়গাটা চমৎকার, কিন্তু গল্পের কোনো প্রয়োজন আছে কি না তা পরিষ্কার না। সিনেমাটোগ্রাফি কিন্তু সিনেমা নয়, শুধু সহায়ক। চেয়ারম্যানের জামা-কাপড় বিশেষত জুতা দেখলেই বোঝা যায় রাজধানীর সব বাতাস দ্রুত সেখানে যায়, কোনো দূরের অজপাড়াগাঁ নয়। একদম শুকিয়ে যাওয়া তুলসি গাছে পানি ঢালবার সময় ফ্রেমের কম্পোজিশন নিয়ে ভাবনা আছে কিন্তু ওই একটা ফ্রেম কোনো সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে না, ওই পোশাক কোনো শেষ হিন্দু জমিদারকে স্মরণ করে না। অন্ধ মোস্তফাও নাগরিক, গ্রাম-গঞ্জে থাকার কোনো কারণ নাই, পথে চলতে ফিরতে সিগারেট চেয়ে-চিন্তে সুখটান দেওয়া মানুষ। চেয়ারম্যানের ছেলের মতো একজন আছে তাঞ্জু। তাঞ্জু চেয়ারম্যানকে বিলাতি কায়দায় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার শুভেচ্ছা জানায়। চেয়ারম্যানের কথায় বোঝা যায়, ঠাকুর মূল সমস্যা।

ঠাকুর একজন হিন্দু আর চেয়ারম্যান তো একজন মুসলমান...একজনের লাইগা আর একজন দুশমন-এই সংলাপে হিন্দু-মুসলমান মানে সাপে-নেউলে সর্ম্পক উপস্থাপন করে। পরিচয় করে দিতে গিয়ে ঠাকুর সম্পর্কে জানতে পারি খালি মন্দির বানায়, খালি মন্দির বানায়। কিন্তু সিনেমায় একটা ছোট মন্দিরও শেষ করতে পারে না। মোস্তফা জানে দৌলতপুরের এইসব জমি ঠাকুরের ছিলো কিন্তু আজ তা দখল হয়ে যাচ্ছে। তার মানে হিন্দুদের জমি তাদের দখলে থাকছে না হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। গল্প লেখক জানে না-এই বাংলাদেশের অনেক জেলার পরিচিতি শুধু একটা প্রাচীন মন্দিরে আছে, এই বড়ো পরিচয়। মফস্বল শহর থেকে রাজধানীতে এসেছে আমাদের প্রগতিশীল নাট্যকর্মীরা তারপরও তারা বুঝতে চেষ্টা করেন নাই কোন্ চরিত্রে অভিনয় করছেন যা বাঙালি-হিন্দু ও বাঙালি-মুসলমানের মধ্যে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার খেলায়। নিজেদের এই নিকট অতীতকে ভুলে গেছে মহান নাট্যকর্মীরা, কিছু নগদ টাকা সব ধ্বংস করে ফেলে, টাকার মোহ সবকিছু তুচ্ছ করে ফেলে।

এইরকম একটা বন্দুকওয়ালা চৌকিদার...এবার হলিউডের ছবিতে আমাদের প্রবেশ, চৌকিদার মাকে খুঁজতে খুঁজতে দৌলতপুর এসে হাজির। হাতে অস্ত্র...আল্লাহ খোদা মানে না...সাংঘাতিক এইসব সংলাপে চরিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে। চেয়ারম্যান আধুনিক জামা-কাপড় আর আধুনিক চুল-দাড়িকাটার স্টাইল নিয়ে নামাজ পড়তে চলো মার্কা সংলাপ...দূরে সৌন্দর্যের কারণে দৃশ্যায়িত রাস্তায় বাসগুলো আমাদের বিশ্বাস করায় শহরের সঙ্গে খুব ভালো যোগাযোগ সম্পন্ন এক জনপদ। অথচ আউটল এখানে বন্দুক নিয়ে ঘুরছে, ভয় পাচ্ছে দৌলতপুরের বাবা চেয়ারম্যান। এ-অঞ্চলে পুলিশ-আনসার নাই, কোথায় সেই সমাজ? চেয়ারম্যান কি মার্কিনি শেরিফ? [৩। বাংলাদেশের এমন কোনো চেয়ারম্যান আছে, যার পুলিশ প্রশাসনে যোগাযোগ নাই?]  মন্দির নির্মাণ চলছে, ঠাকুর ত্রস্ত হয়ে তদারক করছে, রেডিও চলছে ...যে কবিতা শুনতে জানে না...আমি আমার মায়ের কথা বলছি। এইসব পিছনের কবিতার মর্ম, আমিও কবিতা পড়েছি? নাকি আরও ভয়াবহ সংবাদ যে-হাজার বছরের অন্যায় সয়ে যায় হিন্দু সমাজ, তাই আমি প্রতিকূলতার কথা বলছি। চেয়ারম্যানের তিন বছর ধরে অবৈধ যৌনসম্পর্কের দৃশ্যায়নে খুব মনোযোগী হলে শোনা যায় ...দিয়া মোরে ফাঁকি। সাইফুর রহমানের প্রবেশ, চোখে সুরমাসহ সঙ্গী একদম খাঁটি মৌলবাদের সৈনিক নাকি আমরা বাঙালি মুসলমান মানেই এই চেহারা, বিশ্ব চিনে রাখুক।

সহজ যে-সূত্রে সিনেমা চলছে তা বিলাতি সিনেমাটোগ্রাফি আর গোঁজামিল দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের সংঘাতের জনপদ। জঙ্গিবাদের চারণভূমি অথবা ধর্মান্ধ মানুষের দল এদেশে থাকে এমন গল্পের চিত্রায়ণে সাদা মানুষের দল পরিচালককে দারুণ সম্মান করে, বিলাতি লাল কার্পেট আরও প্রশস্ত হয়। দেশকে হেয় করলে নিজের লাভ দ্রুত আসে, মৌলবাদীদের কথা বলে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করা। এই সূত্র ইরানিরা মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে, ইরানের মতো সভ্যতার পূণ্যভূমি কৃষ্টিহীন মার্কিনিরা শ্রীহীন করেছে, প্রমাণ করেছে মানুষের মতো দেখতে জীবরা মানুষ হয়ে ইরানে থাকে। হাততালি। মিডিয়ার ক্লীবদের জন্য হাততালি।

একজন পরিচালক যখন ক্লোজ-আপে কোনো ডিটেইল কিছু ধরেন, পর্দায় যখন তা প্রমাণ সাইজের থেকে অনেকগুণ বড়ো হয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হয়, তখন দর্শকদের অশিক্ষিত বা গর্দভ সমতুল্য ভাবা ঠিক নয়। কালার হাতে মায়ের নাম লেখা কাগজটায় ঝরনা কলমের লেখা থাকবে, বল পয়েন্টে নয়।

কালার রাইফেল থেকে ছুড়ে দেওয়া গুলি একজন গানম্যান হিসেবে কালাকে প্রতিষ্ঠিত করলো, দৈনিক আটশো টাকায় কালা গানম্যান। আবার চেয়ারম্যানের সঙ্গে স্ত্রীর বাক্যালাপ, শুনলেই বোঝা যায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সংলাপ রচনা। দৃশ্যটা এমন হবে কিছু কথা, চরিত্র, আলো, ফ্রেম। ফাটাফাটি এডিটিং, সব ম্যানেজ। চাঁদ-তারা ত্রিকোণ পতাকা আর উইন্ডমিল, অন্ধকারে সাদা চাদর পরিহিত কালো কালো মানুষের সঙ্গে চেয়ারম্যানের একটা সংলাপ আবার দৃশ্য খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা। চেয়ারম্যানের স্ত্রীর পরামর্শ-সাইফুরের সঙ্গে যোগ মানে ধর্মান্ধ শক্তি কাজে লাগানো। মন্দির বানানোর এতোগুলো মানুষ কোথায় যায়, কেনো মন্দির দুর্বৃত্তরা ভাঙে আর ভাঙা মন্দিরের কাছে আশিষ রায় এসে দাঁড়ালেও পিছনে ক্যারাম খেলা চলতে থাকে কেনো, কে জানে? যদিও আয়োজন দেখলে মনে হয় না যে মন্দির বানানো সম্ভব। টেক্সাসে এক টানটান উত্তেজনার দুপুর, পুরো ক্যানভাসে অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, ছোট ছোট বিশ্বাসহীনতা। তারপর আলোছায়ায় দৃশ্য রচনা, খোলা মাঠে নামাজের দৃশ্য অথবা পুরনো বাড়ির সিঁড়িতে নোনাদৃশ্য। চৌকিদার আর ঠাকুরের অলৌকিক সংলাপ এবং মোস্তফাকে খুন করে চেয়ারম্যানের জনমত ঠাকুরকে আক্রমণ। তারপর সেই হলিউডি সস্তা সিনেমার মতো বিভিন্ন দল গুপ্তধনের আশায় একটা গুহায় প্রবেশ। ছাদের ওপর দিগন্তজোড়া আলোতে দুইজন দাড়িওয়ালা টুপিমাথায় রাইফেল হাতে, এই তো সেই দৃশ্য, এই তো সেই উগ্রবাদী মুসলমান পৃথিবীর সব সুখ তছনছ করে ফেললো! বহু গবেষণায় এমন চরিত্র গঠন, টেরর আইকন ।

শেষ দৃশ্য। এই দৃশ্যে বোঝা যায় চৌকিদার নীতি-আদর্শহীন রক্ষী, মৃত দলপতির নেতৃত্ব বদল, ঠাকুরের শেষ দৃশ্য আর কালার বিশ্বাসহীনতা। শেষ সংলাপে আবার আল্লাহকে স্মরণ।

 

লেখক : সেলিম আহ্‌মেদ স্নাতক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে ভাস্কর্যে। দীর্ঘ সময় হস্তশিল্প, ফ্যাশন ও গ্রাফিক্সের সঙ্গে তার বসবাস। বর্তমানে তৈরি হচ্ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য।

selim24march@yahoo.com


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন