রুবেল পারভেজ ও মাহমুদ আপেল
প্রকাশিত ১৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
রূপান্তর : নিয়ম ভাঙা-গড়ার নতুন পথে এক ‘দস্যি’ চলচ্চিত্র
রুবেল পারভেজ ও মাহমুদ আপেল
এক আশ্চর্য শক্তির নাম গণমাধ্যম। সময়ের ভারে ভারাক্রান্ত ও মোহগ্রস্ত এক মাধ্যম হিসেবে যার পরিচিতি আজ সর্বত্র। এক সময়ে স্বাভাবিক মাত্রায় মানবীয় বলয়ে চলতে থাকা এই মাধ্যমটি বর্তমানে জ্যামিতিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়া শক্তিশালী এক দানবের নাম। নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, এর আওতায় বিশ্বের সমস্ত কিছুই। সে-এখন এতোই সজাগ ও তৎপর যে, গর্ভবতী ঐশ্বরিয়ার দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে সবচেয়ে ক্ষমতাধর মার্কিন সরকারের গোপন নথি পর্যন্তও প্রকাশ করছে প্রতিনিয়ত; ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্যতা তারা অবশ্য এতে রাখে এবং পাচ্ছেও। কিন্তু তখনই সন্দেহ জাগে যখন তিউনিসিয়া, সুদানের মতো অঞ্চলের মানুষেরা দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়ে প্রতিনিয়ত মারা পড়ছে, তখন মিডিয়া-মোঘলদের প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া এতোটুকুও উচ্চবাচ্য করে না। অথচ বারাক ওবামা কিংবা ডেভিড ক্যামেরন কোনো অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে বার্গার-স্যান্ডউইচ খেলেন, কি খেলেন না, তা ঠিকই প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠে এই গণমাধ্যমের!
এক সময়ে যে-গণমাধ্যম গণমানুষের কথা বলবে বলে হাজির হয়েছিলো, সেই গণমাধ্যম রূপান্তর হতে হতে আজ ক্ষমতাবানদের পকেটমাধ্যম হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যমে হাজির হওয়া নেতার দেওয়া ভাষণই পরবর্তীতে টইটুম্বুর ইতিহাস হয়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। সেই সঙ্গে ক্ষমতাহীন, আবাল নিম্নবর্গের চেতনা নিচেই চাপা পড়তে থাকে। এক রাজা তার ইতিহাস তৈরি করে; আরেক রাজা সেটি ধারণ করে। শুধু তাই নয়, ‘ব কলম’ নিচুজাতের ইতিহাসও তারা রচনা করে যান, ভিন্ন মেজাজে। তাদের মেজাজমুখি মনোভাবের ইতিহাসই হয়ে ওঠে ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’। স্বহস্তে নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতিসহ সব নীতির দিকপাল হয়ে ওঠে ‘মহান’ এই উচ্চজাতের মানুষেরা।
ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে, যেখানে যেভাবে লেখা আছে, সেই সমস্ত জায়গায় ক্ষমতাশালী ও নেতৃত্বশীল ব্যক্তির মুখরোচক বয়ান ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। সমাজনেতা, মহাজন, ব্যবসায়ী বিশেষ করে ধর্মীয় ক্ষেত্রে অলৌকিক শক্তির ধোঁয়াশাচ্ছন্ন মতবাদ প্রভাবিত করে ঘটমান প্রতিটি মুহূর্তকে। কারণ, ক্ষমতা নামক অদৃশ্য এই অস্ত্রটিকে টিকে রাখতে ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে লাগাম দিয়ে টেনে ধরতেই আগমন ঘটানো হয় ‘মানতেই হবে’ নির্দেশিত বিভিন্ন গ্রন্থের। এ-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ-গ্রন্থগুলোই সবচেয়ে বেশি পঠিত হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবও রাখে অনেকবেশি। এতে একদিকে যেমন বিভিন্ন ধর্মের ঐতিহাসিক বয়ানের বিবৃতি থাকে, সেই সঙ্গে কীভাবে জীবনকে যাপিত করতে হবে, তার ‘হুকুম’ও বাতলানো থাকে। অন্যদিকে পারলৌকিক লোভ ও জাগতিক শাস্তির বিষয়টিতো আছেই।
সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তন হতে থাকে মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় বিষয়ের। এক সময়ের বনবাসী মানুষ আজ সুউচ্চ ইমারতবাসী, ভৌতিক সব বিষয়কে সে-বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করে। আদিযুগের পথ হারানো মানুষটিও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে খুঁজে পায় তার আপন ভুবন। শুধু তাই নয়, সে-চোখ বুজে অনায়াসে বের করে আনে তার কাক্সিক্ষত বিষয়কে। এমনই ভাবে সবকিছুর মধ্যে পরিবর্তন ঘটলেও পরিবর্তন ঘটে না শুধু এই সুবৃহৎ গণমানুষের ‘পবিত্র শরীরে’ পঠিত নানা ধর্মের নানান ধর্মগ্রন্থের একটি বাণীও। কোরআন-বেদ-বাইবেল-রামায়ণ-মহাভারত প্রভৃতি সব ধর্মগ্রন্থ যুগ যুগ ধরে মানুষের পথ চলার নির্দেশক হয়েছে। গভীর ধর্মবোধে আচ্ছন্ন হয়ে মানুষ এইসব গ্রন্থের প্রতিটি বাণীই অমোঘ নিয়ম হিসেবে মেনে নিয়েছে।
ধর্মগ্রন্থ যেহেতু সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, সেহেতু শুরু থেকেই রাজশক্তির আশ্রয়ে ধর্মীয় ব্যক্তিরাই মূলত এর সংরক্ষক ও প্রচারকের দায়িত্ব পালন করতেন। আর সেই সুযোগে রাজশক্তি সবসময়ই সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মকে উপস্থাপন করে জাগতিক চেতনালুপ্ত ও পারলৌকিক লোভযুক্ত বিষয় হিসেবে। যে-কারণে ধর্মীয় গ্রন্থগুলি প্রচারের ক্ষেত্রে মূল ভাবার্থ কতোটুকু বজায় থেকেছে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। প্রশ্নও তুলেছেন অজপাড়াগাঁয়ের এক গীতিকবি তার গানে, ‘কোরআন-হাদিস বুঝতে গেলে কিছু জ্ঞানের প্রয়োজন/ দুই পাতার ছিপারা পইড়া বুঝবে কী মদন/নিজেরাই বোঝে না অন্যরে বুঝায়/সব লোকেরে ভুল বুঝাইয়া কাঠ-মোল্লারা খায়।’ এভাবেই মূল বিষয়ে না গিয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও এক ধরনের ভয়ে আচ্ছন্ন রাখা যায়, তারই ফরমান জারি রাখা হতো; অন্যদিকে নেতৃত্বে থাকা বিভিন্ন ধর্মের লোকদেরই স্তুতি থাকতো এসব গ্রন্থে।
‘মহাভারত’ এমনই এক ঐতিহাসিক গ্রন্থ। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির শক্তিশালী প্রভাববিস্তারকারী এই গ্রন্থে সে-সময়ের ঘটে যাওয়া সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও তাদের সংঘঠিত প্রতিটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘ইতিবাচক’ বিবরণ পাওয়া যায়। মহাভারতের মূল-কাহিনীতে কুরু রাজপরিবারের কর্তাদের ‘বিস্তারিত’ জানা গেলেও কখনও জানা যায়নি রাজকর্মচারী বা রাজ্যের সাধারণ উল্লেখযোগ্য কোনো চরিত্রের। যতোটুকু আছে তাতে রাজপরিবারের স্তুতি ও আনুগত্যসূচক ক্রমণিকা। সেই জায়গা থেকে বের হয়ে, ‘পবিত্র’ এমনই এক গ্রন্থের আধেয় নিয়ে গণমাধ্যমের শক্তিশালী অংশ চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করে আবু সাইয়ীদ নির্মাণ করলেন রূপান্তর।
চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণ নতুন এক বিষয় নিয়ে দর্শকের কাছে হাজির হয়। মহাভারতে সমরপণ্ডিত দ্রোনাচার্য অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে শাসকশ্রেণির ক্ষমতার সম্মান রক্ষায় অনৈতিকভাবে একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলী কেটে নেয়। পরবর্তীতে এর প্রতিবাদে একলব্যের গোত্রের মানুষেরা বৃদ্ধাঙ্গুলী ছাড়াই তীর চালানো শেখে; যা মূলত শোষকের সামনে নতজানু অবস্থান থেকে বের হওয়ারই শামিল। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ইচ্ছে করলেই যে-বের হওয়া যায়; ক্ষমতার কেন্দ্রে যে সাধারণ মানুষও অবস্থান করতে পারে, তারই বিমূর্ত বয়ান হাজির করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। রাজা-রাজ্য-ক্ষমতা-প্রজা আর এদের মধ্যকার চিরন্তন ‘সম্পর্কের’ মিথকে ভেঙে ফেলে এই চলচ্চিত্র যোগ করে এক নতুন ভাবনার।
বিকল্প সিনেমার বিকল্প আধেয়
বিকল্প সিনেমার মানে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, ভাবাদর্শিক-বিচ্ছিন্নতা, আধেয়গত ভিন্ন চিন্তার মতো বিষয়গুলোই ভাবা হয়। এতে এমন বিষয়ের উপস্থাপন থাকে যা প্রতিনিয়ত ঘটছে, কিন্তু সমাজের নিকট অনেকক্ষেত্রেই এর গ্রহণযোগ্যতা নেই; নেই প্রকাশের স্বাধীনতাও। সেই সঙ্গে তা প্রকাশ পেলে হয়তো প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ও এর আইন-কানুন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিকল্প চিন্তার চলচ্চিত্র আসলে ‘এমন চলচ্চিত্র যা শিল্পীর স্বাধীন ভাবপ্রকাশের সম্ভাবনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। ...এমন এক চলচ্চিত্র যা সমাজ, বিজ্ঞান ও শিল্পবিষয়ক মানুষের বিকল্প প্রকল্পগুলিকে ধারণ করে এবং এসবের সহযাত্রী হয়।’১ সেইভাবে, সেইমতেই চলছিলো তার বিকাশের লড়াই। স্বাধীনতা উত্তর দেশে এই চিন্তার সোনার ফসল সূর্য দীঘল বাড়ি, চাকা, কীর্তনখোলা, মাটির ময়না, শঙ্খনাদ, চিত্রা নদীর পারে প্রভৃতি সব চলচ্চিত্র। যা এই ধারার সফল সৃষ্টি বলে ধরে নেওয়া হয়। এই চলচ্চিত্রগুলো মনোজগতে বিকল্পের এমন অনেক চিন্তার উদ্রেক করে এবং ব্যক্তি-মানুষকে ভিন্ন অর্থে চোখ তুলে তাকাতে সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করে। এসব সিনেমায় সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি প্রতিটি প্রভুত্বকামি বিষয়ের আষ্টেপৃষ্ঠে জমাট বাঁধা সঙ্কটে ফাটল ধরাতে দেখি। রূপান্তর এই গোছেরই চলচ্চিত্র। কিন্তু বিষয়ের প্রেক্ষাপট হিসেবে ইতিহাসের চর্চায় তা অত্যন্ত জরুরি বয়ান হিসেবে হাজির হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্ম এমন এক শক্তিশালী সামাজিক জায়গায় অবস্থান করে, যার মধ্যকার পালনীয় সব বিষয়কে একই চোখে দেখা সবার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। এটিই যেনো সরল ও শুদ্ধ। কিন্তু আবু সাইয়ীদ মহাভারতের এমন জায়গাতে এসে চোখ রাখলেন; যেখানে নাড়া দিলে সেই কুরু রাজপরিবার থেকে শুরু করে বর্তমানের বিশ্ব ‘গণতান্ত্রিক’ নেতাদের পরিবারের কৃতকর্মের একটি সরলরৈখিক ফর্দ পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে পাওয়া যায় সাধারণ মানুষের সমাজ পরিবর্তনের চিরায়ত স্বপ্নকে; যা দ্বারা এই মানুষেরা পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূর। আবু সাইয়ীদের এই সিনেমা আমাদেরকে নিয়ে যায়, আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে শুরু করে দাস সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ, সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মূলে, আসলে এসব ক্ষেত্রে কোন্ নিয়ামক প্রধান ভূমিকা পালন করেছে সে-দিকেই। সাধারণ শোষিত মানুষের দ্বারা নির্মিত সমাজ ব্যবস্থাই হাজার বছর ধরে উৎপাদন সম্পর্ক আর উৎপাদন শক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেয়, আর এই রূপান্তরিত সময়ই এগিয়ে নিয়ে যায় মহাকালকে। রূপান্তর তারই বিমূর্ত বয়ান।
এই সময়ে কেনো প্রয়োজন রূপান্তর
কর্তৃত্বপরায়ণ শক্তিশালী ক্ষমতাবানদের হাতে লালিত বড়ো মিডিয়াগুলো ক্রমান্বয়ে পাখা মেলছে; কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে ছড়ানো সব মিডিয়া-প্রতিষ্ঠানগুলো। আর ছোট মিডিয়া-প্রতিষ্ঠানগুলো ধোপে টিকতে না পেরে, তাদের আদর্শ-অস্তিত্ব ধরে না রাখতে পেরে, তাদের গুরু বড়ো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। আর সেই সুবাদে সেও তৈরি করে নতুন প্রভুত্বকামি সব মতাদর্শের; ফাঁকে তৈরি হয় নানান ইতিহাস। এরই মধ্যে উইকিলিকস আর ছোট-কাগজগুলোও চেষ্টা করে, এই প্রভুত্বের-দাসত্বের নাগাল থেকে বের হয়ে আসতে। ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন সব ঘটনার যা রূপান্তরেরই সদৃশ। কেননা মূলধারার গণমাধ্যম একচেটিয়াভাবে রাষ্ট্রনৈতিক সুশীতল ছায়ায় বেড়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকৃত সব কর্মকেই বৈধতা দেয়। আর রাষ্ট্র যেহেতু আধিপত্যশীল শ্রেণিরই প্রতিনিধি, সে-তার পক্ষেই সওয়াল-জবাব তুলে ধরে এটিই স্বাভাবিক। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামাজিক কর্তব্য পালনে গণমাধ্যম সমাজে কী করে, এর উত্তরে ক্লাসিক্যাল মার্কসবাদীরা মনে করেন, ‘গণমাধ্যম সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি-আধিপত্যকেই টিকিয়ে রাখতে চায়; সমাজের তথাকথিত ‘স্ট্যাটাস কৌ’ বা ‘বিরাজমান অবস্থা’কেই জারি রাখতে চায় এবং সে লক্ষ্যেই সব আয়োজন সম্পন্ন করে।’২
সে-জন্যই আমরা দেখি, দুনিয়া চালানো বড়ো মিডিয়া-প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে অন্য দেশের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধকে বৈধতা দেয়, নারীকে পণ্যের মডেল বানিয়ে পণ্যের ‘পণ্য’ বানানো হয়। স্বাধীনতাকামি মানুষদের হরহামেশা করে তোলা হয় জঙ্গি-বিচ্ছিন্নতাবাদী, এমনকি ‘গণতন্ত্র’ কায়েমের সবচেয়ে ‘বৈধ’ উপায় নির্বাচনেও কে ক্ষমতায় আসবে আর কে ক্ষমতায় আসবে না, তা নির্ধারণ করে দেয়-প্রচলিত এই গণমাধ্যম। আর এরই ফাঁকফোকরে মূলধারার প্রতি ত্যক্ত মানুষ খুঁজে ফেরে বিকল্প মাধ্যমের। রূপান্তর-এ আমরা দেখি, রাজ্য ক্ষমতাবলে অন্যায্যভাবে একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলী কেটে নেওয়ার পর সমগোত্রীয়রা এর প্রতিবাদে বৃদ্ধাঙ্গুলীর ব্যবহার ছাড়াই তীর চালানো শেখে। এতে একদিকে প্রচলিত নিয়মের ওপর প্রতিবাদ যেমন হয়, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত হয় আত্মনির্ভরশীলতার প্রমাণ। ঠিক এমনই ভাবে মূলধারার গণমাধ্যমের স্বৈরাচারী আচরণের কারণে একলব্য গোত্রীয়দের মতোই একদল মুক্তিকামি মানুষ গণমাধ্যমকে নিয়ে বিকল্প পথে ভাবতে শুরু করে; প্রকাশ করতে চায় বিধ্বংসী সব তথ্য।
তবে সে-পথও এতো সহজ নয়। তথ্যের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে, তথ্যপ্রকাশের দায়ে আটক মার্কিন সৈনিক ব্রাডলি ম্যানিং বলেন, ‘আমি চাই মানুষ সত্যটাকে দেখুক...কারণ তথ্য ছাড়া আপনি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।’৩ আর এ-জন্যই শাসকেরা স্তব্ধ করে দিতে চায় গোপন তথ্য-প্রকাশকারীদের। অর্থাৎ বিকল্প সব ব্যবস্থাকে। কিন্তু মানব সমাজ রূপান্তরের ন্যায় গণমাধ্যম ব্যবস্থার রূপান্তরও আমাদের জানার-বোঝার-লড়াই এর পথ তৈরি করে দিয়েছে। মানুষ এখন নিউমিডিয়ার কল্যাণে অনায়াসেই যেকোনো তথ্য জানতে পারছে, সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। যার সুবাদে হয়তো একদিন এই বিক্ষুব্ধ পৃথিবী রূপান্তরিত হয়ে বাসযোগ্য ও সুন্দর হবে। এর স্বপক্ষে আমেরিকার পাবলিক জার্নালিজমের প্রবক্তা ও ‘হোয়াই জার্নালিস্ট আর ফর?’ গ্রন্থের লেখক জে রোজেন মনে করেন, গণমাধ্যমের ওয়াচডগ হিসেবে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও বলছেন, ‘মৃত প্রেসের জায়গায় আমরা পেয়েছি উইকিলিকস। তার মতো অন্য অনেকে বলছেন, বিশ্বজুড়ে উইকিলিকস একটা নয়, শত শত, হাজার হাজার এমনকি লাখ লাখ! তথ্যের ওপর একচেটিয়া দিন শেষ হয়েছে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উইকিলিকস’ যুগে প্রবেশ করলাম।’৪ সত্যিই তাই হলো, হাজার হাজার ভিন্ন ধারার গণমাধ্যম ইতোমধ্যেই স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে প্রভুত্বহীন এক বিশ্বের, যা-কিনা পৃথিবীকে অন্তত একদিন হলেও বেশি টিকে থাকতে সহায়তা করবে।
চরিত্র হিসেবে একলব্যের বিচার
সাধারণভাবেই ধরে নেওয়া হয়, সৃষ্টির প্রথম মানবটিই ছিলো পৃথিবীর সবকিছুর অধিকারী। তার জন্য বসবাসের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা ছিলো না, ছিলো না কোনো ধর্ম বা জাতের প্রশ্ন। তার একমাত্র পরিচয় ছিলো সে মানুষ। তবে এ-নিয়েও বিতর্ক আছে; বিতর্কে না গিয়ে ধরেই নিলাম-এরপর তার বংশবৃদ্ধি ঘটলো, বাড়তে থাকলো তার বংশধর। আস্তে আস্তে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লো তারা সবাই। তারপর বিকাশের এক পর্যায়ে তারাই চালু করলো সম্পদ বণ্টন প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়ার মূলে ছিলো শ্রম। শারীরিক শ্রমের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হলো কে কতোটুকু সম্পদের অধিকারী হবে? এতে গুটিকতোক সবলের ‘আরও চাই’ বাসনা প্রবল হয়ে উঠলো। সংখ্যাগরিষ্ঠ দুর্বলরাই হয়ে উঠলো তাদের উৎপাদনী শক্তি। আর এতেই তৈরি হলো শাসক-শোষিত নামের দুটি শ্রেণির।
অন্যদিকে শোষকের নিয়ন্ত্রণে পথ চলা শুরু হলো নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষদের। এই নিম্নবর্গের আরও অর্থ আছে, তাহলো-অধস্তন। নিম্নবর্গের মানুষের কাছে অধস্তনতাই ধর্ম হয়ে উঠলো। উচ্চবর্গের নির্মিত এই ধর্মভাবকে নিম্নবর্গের চৈতন্যে এমনভাবে গেঁথে দেয় যে, সে আর নিজেকে জাগতিক বলে ভাবতে পারে না। সবসময় অলৌকিক চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে। এর একটি সুন্দর ব্যাখ্যা হাজির করছেন রণজিৎ গুহ। তিনি বলছেন, ‘...যা ঐহিক তাকে অলৌকিক বলে মনে হয়, যা একান্তই মানবিক তা দৈব বলে ভুল হয়। ঐতরিকতার আতিশয্যেই কর্তা কখনও কখনও নিজের সৃষ্টিকেই সঠিকভাবে চিনতে পারে না। যা তার নিজের প্রতিভাজাততাকে সে অন্যের কৃতিত্ব বলে বর্ণনা করে।’৫
একলব্য সেই শোষিত ও ধর্মভাবাপন্ন শ্রেণিরই একজন। অথচ যিনি ছিলেন সমরশাস্ত্রে অধিক জ্ঞান ও চিন্তার প্রশ্নে বুদ্ধিদীপ্ত এক তরুণ। তিনি সমরপণ্ডিত দ্রোনাচার্যের সমর দক্ষতা ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে গুরু মেনে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিম্নজাতের হওয়ায় তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। তারপরও দ্রোনাচার্যকেই গুরু মেনে একলব্য তার সমরশিক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু শোষকজাত অর্জুনের সমরকৌশল তার কাছে পরাস্ত হবে, এ-কারণে শাসকশ্রেণির নির্মম শোষণের শিকার হন তিনি। যা নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে তাকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে হয়েছে। একলব্যের নিষ্ঠা, গুরুভক্তি ও সমরদক্ষতা থাকলেও তাকে দ্রোনাচার্য তিরস্কারতো করেছেনই, সেই সঙ্গে অর্জুনের তথা রাজশক্তির সম্মানহানি ঘটবে এই আশঙ্কায় অন্যায়ভাবে তার হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলীও কেটে নেন। করবেন না-ই বা কেনো, কারণ শুধু দ্রোনাচার্য নয়, রাজপুত্র অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ছিলো স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণের, যিনি বিষ্ণুর রাজনৈতিক অবতার। ধর্ম যেখানে তাকে সুশীতল ছায়া দান করেছে, সেখানে দ্রোনাচার্যের এই আচরণ মোটেও অবাক হওয়ার মতো নয়। বিষয়ের বর্ণনার এই জায়গাতে এসে আমাদের খটকা লাগে, প্রশ্নের উদ্রেক হয়; রাজশক্তির সমরপণ্ডিত দ্রোনাচার্যকে এতো বেশি শ্রদ্ধা ও তার কথামতো কাজ করতে চাওয়া কি তার নিম্নবর্গের বৃত্ত থেকে বের হয়ে উচ্চবর্গে প্রবেশের অভিলাষ নয়? একই সঙ্গে রাজ্য আইনকে সম্মান করে বৃদ্ধাঙ্গুলী বিসর্জন দেওয়া, যুক্তিহীন-অবান্তর কাজকে সঠিক বলে তা মেনে চলা, একলব্যের স্বজাতির অর্থাৎ নিম্নবর্গের জন্য অপমান-পরাজয় নয়?
একলব্য তাহলে কেনো রাজ-দরবারের সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন? তার উত্তর গ্রামসি দিচ্ছেন এইভাবে, ‘...সেই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটির উপর যার মাধ্যমে বুর্জোয়াশ্রেণী কেবল শাসনযন্ত্রে তার প্রভূত্বই প্রতিষ্ঠা করে না, সৃষ্টি করে এক সামাজিক কর্তৃত্ব বা ‘হেগেমনি’। কেবল রাষ্ট্রীয় শক্তিকে অবলম্বন করে এই সার্বিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শের জগতে এক আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ‘হেগেমনিক’ বুর্জোয়াশ্রেণী তার শাসনের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে ‘সাবলটার্ন’ শ্রমিকশ্রেণীর কাছ থেকে সামাজিক সম্মতি আদায় করে নেয়।’৬ তাহলে এ-কথা বললে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না যে, একলব্য সেই রাজচিন্তার জালেই ঘুরপাক খাওয়া এক অবনত চিত্তের দাস।
একলব্য না পারলেও তার অনুগতরা তার অনুপস্থিতিতে কিন্তু ঠিকই জয়ী হয়েছিলেন। এ-জয় একলব্যের নয়, এ-জয় বাকি সব নিম্নবর্গের মানুষের। একলব্যের দৃঢ় মানসিক চেতনার জয় আমাদের মুগ্ধ করলেও, শ্রেণি দ্বন্দ্বের প্রশ্নে বা তার স্বগোষ্ঠীর মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ক্ষেত্রে তার নিজ ভূমিকা নগণ্য বলেই বিবেচিত। একলব্য তার মেধা, মননকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ততার প্রমাণ রাখলেও নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে নিম্নবর্গের পক্ষে কাজ করার ক্ষেত্রে তার মনকে এতোটুকু বিচলিত করেনি। এর কারণ অবশ্য এটি হতে পারে, ‘...সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার আদর্শ সার্বভৌমত্ব নয়, বরং কেন্দ্রহীন সর্বব্যাপী এক অনুশাসনতন্ত্র, যেখানে সকলেই স্বাধীন, অথচ স্বাধীনভাবেই তারা অনুশাসনের শৃঙ্খল পরতে রাজি।’৭ একলব্য দ্রোনাচার্যের কাছে না থেকেও, তার আদেশ না মেনেও তারই মতো করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন; এটি আসলে তার চৈতন্যে ফুকোর আবিষ্কৃত অনুশাসন ব্যবস্থারই একটি ফল মাত্র। যুগে যুগে শাসকশ্রেণি এই বিষয়টি এমনইভাবে চালিয়ে এসেছে এবং তার আধিপত্যকে টিকে রেখেছে। সেজন্য সমর দীক্ষায় দীক্ষিত হয়েও মস্তিষ্কের শৃঙ্খল থেকে এতোটুকুও বের হয়ে আসতে পারেননি একলব্য।
অধিকার আদায়ে সবসময়ই জনসাধারণ, নেতা ও তাদের চেতনার সঠিক ও শৃঙ্খলিত সমন্বয়ের প্রয়োজন। তাবৎ দুনিয়ার যতো সংগ্রাম-আন্দোলন তা মূলত এই তিনটি বিষয়ের ওপরই নির্ভর করেছে। সমরাস্ত্রে কতো শক্তিশালী বা বৈশ্বিক সম্পর্ক কতো মজবুত, তার থেকেও বড়ো কথা ওই তিনের সম্পর্ক কতো অটুট। ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা সবার নিশ্চয়ই মনে আছে। মার্কিন বাহিনী তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও এই ভঙ্গুর দেশটির কাছে পরাজিত হয়েছে। আর আমাদের দেশের কথাতো সবারই জানা। দীর্ঘ নয় মাস তৎকালীন সারা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এদেশের আপামর জনতা ছিনিয়ে এনেছিলো লাল-সবুজ পতাকা। প্রশ্ন ওঠে, এজন্য কার অবদান সবচাইতে বেশি?
জনসাধারণ, নেতা না অন্যকিছু? স্বাভাবিকভাবেই এর উত্তর জনসাধারণ। জনগণ তার দাবি আদায়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজের জীবন দিয়ে আপন সত্তা, আপন ভূমিকে রক্ষা করেছে। সহজভাবেই ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল পাতায় তাদের চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার কথা। যুগ যুগ ধরে তাদের শ্রদ্ধা, ভক্তি করারই কথা। কিন্তু ইতিহাসে তাদের অবস্থান কি আমরা সেভাবে দেখি? না, কারণ সর্বকালে দেশে দেশে ক্ষমতাশীলরা এমনভাবে নিজেকে জাহির করেছে যে, সাধারণরা তাদের আলোর কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছে, অনেকে বাধ্য হয়েছে নিজেকে আড়াল করতে।
এমনই এক মহান যোদ্ধা তাজউদ্দীন আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যার নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছিলো এই দেশ। যার সাহসী, দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল এই স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা তাকে কতোটুকুই স্মরণ, শ্রদ্ধা করি! তাকে নিয়ে ইতিহাসইবা কীভাবে রচিত হয়েছে? স্বাধীন দেশে সময়ের পরিপ্রেক্ষিত ওই মানুষটিকে ভয়ঙ্কর বিদ্রূপের শিকার হতে হয়েছিলো। তারপরও যুদ্ধ পরবর্তী ভঙ্গুর দেশের পুনর্গঠনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন তিনি। আমেরিকার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান রবার্ট ম্যাকনামারা তাজউদ্দীন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সম্ভবত সে এখন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী।’ আবার বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের সাবেক ডিজি গোলক মজুমদার তাকে আখ্যায়িত করেছিলেন, ‘He was a statesment, not a politician।’৮ এত বড়ো মাপের গণমানুষের একজন নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এই রাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছুই পাননি। কারণ হিসেবে জানা যায়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের পরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীনের নীতিগত বিষয়ে কিছু কিছু মতান্তর দেখা দেয়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা এই সুযোগে তাদের দুজনের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়।’৯ পরিস্থিতির ওই ঘূর্ণায়মান সময়ে স্বাভাবিকভাবেই পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে ক্ষমতার বলয় থেকে সরে যেতে। শুধু তিনিই নন তার মতোই হারিয়ে গেছে মাওলানা ভাসানী, কর্নেল তাহেররা। যারা সাধারণ মানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও মসনদে বসে থাকা নেতার ক্ষমতার জোয়ারে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি, বাধ্য হয়েছেন ইতিহাসের নির্মম চোরাস্রোতে হারিয়ে যেতে।
আজকের সময়ে এসে তাদের ম্লান হয়ে যাওয়াকে আর আশ্চর্য বলার কোনো কারণ নেই। কারণ, হাজার বছর আগে একলব্যের সহযোগী পঞ্চাননও ওই একইভাবে হারিয়ে গেছে-মহাভারতের পাতা থেকে। কারণ, মহাভারতের বয়ান কেবল ক্ষমতাবানদের। সাধারণ মানুষের কাতার থেকে যারা নিজেকে এক ‘বিশেষ’ জায়গাতে নিয়ে যায়, তাদের কথা ছাড়া আর কারও কথা উঠে আসে না, এটাই হয়তো স্বাভাবিক। কারণ, ‘ক্ষমতাশীল উচ্চবর্গের দ্বারা নিম্নবর্গের নির্মাণ-এর নিদর্শন আমরা পাই ইতিহাসের দলিলে। হাজার হাজার দলিল, সেই দলিলের উপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকের বর্ণনা, তার পাশাপাশি অন্য নানাবিধ জ্ঞানচর্চা, ধর্মচর্চা, সমাজবিধি, এ-সবের সংমিশ্রণে তৈরি হয় এক-একটি প্রভাবশালী ডিসকোর্স যার মাধ্যমে ক্ষমতাশীল শ্রেণীর মতাদর্শ সামাজিক আধিপত্য বিস্তার করে। এইসব ডিসকোর্সের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিম্নবর্গকে চিহ্নিত করা হয়েছে বিভিন্নভাবে।’১০ যা নিয়ে চিন্তিত নন এই সময়ের সিনেমা রূপান্তর’র নির্মাতা আবু সাইয়ীদও। তিনিও তীরে এসে তরী ডোবালেন। ভাঙতে পারলেন না ক্ষমতাবানদের প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত ডিসকোর্সকে।
একদিকে ভাগ্যবিড়ম্বিত-নির্যাতিত-বঞ্চিত স্বজাতির পক্ষে না থেকে পালিয়ে যাওয়া একলব্যকে মহাভারতের পাতায় যথাযথ স্থান না দেওয়ার জন্য প্রশ্ন তুলেছেন সাইয়ীদ। এ-জন্য সিনেমার শুরুতে প্রোলগে মহাভারতের বিভিন্ন জায়গাকে তুলোধোনা পর্যন্ত করতে ছাড়েননি তিনি। আবার বিপরীতে একলব্যের অবর্তমানে পঞ্চানন শোষকের বিরুদ্ধে বৃদ্ধাঙ্গুলী ছাড়াই যে-লড়াইটি করলেন ও জয়ী হলেন; এই কৃতিত্বের জন্য তার নামটিও যে-একলব্যের পাশে উচ্চারিত হওয়া উচিত, এ-নিয়ে একবারও ভাবলেন না। এ-দায় কী তাহলে আবু সাইয়ীদের, নাকি নিম্নবর্গ বলে পঞ্চাননদের কথা বলা পাপ, নিষিদ্ধ।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে কিছু কথা না বললেই না
টাকার গরম, প্রযুক্তির দৃষ্টিনন্দন ব্যবহার আর শিল্প নির্দেশকের সাজসজ্জার মতো জটিল সব চিন্তার সমন্বয়ে গড়ে উঠে বর্তমানের প্রতিটি ছবির প্লট। তা যদি হয় ঐতিহাসিক কোনো বিষয়ের উপস্থাপন তাহলেতো আর কোনো কথাই নেই। বিশাল সেট আর ভারী প্রপস-কস্টিউমসের রমরমা সমাহার ছবির কাহিনীর বর্ণনা বোঝার চাইতে চোখকে বাধ্য করে অন্যকিছুর দিকে ঝুঁকতে। ফলে দর্শক যখন সিনেমা হল থেকে সিনেমা দেখে বের হয়ে আসে, তখন ভাবের চোখের চাইতে, চোখের উপরের চোখে ভাসতে থাকে এর বাহ্যিক বিষয়। এতে অবশ্য একটি লাভ আছে, তাহলো ‘বুদ্ধিমান’ কোনো নির্মাতা এর সঠিক ব্যবহারে আমজনতার কাছ থেকে বাহবা পেতে পারেন অনায়াসে।
অবস্থা যখন এই, ঠিক এই সময় মহাভারতের মতো ঐতিহাসিক গ্রন্থ থেকে বিষয় নির্বাচন করে তা থেকে ন্যারেটিভ ঢঙে, এক অর্থে বক্তব্যনির্ভর চলচ্চিত্র তৈরি করলেন আবু সাইয়ীদ। যেখানে ভারতের বিভিন্ন টিভি-চ্যানেল ঐতিহাসিক নাটক নির্মাণে বিশাল সেট, জাঁকজমকপূর্ণ কস্টিউম, ভারী মেক-আপের ব্যবহার করে এক ধরনের ফ্যান্টাসি-আবহ তৈরি করে রেখেছে, সেখানে রূপান্তর নির্মাণে নির্মাতা এক সরল উদ্দীপক ভাবনায় দর্শক-আকর্ষণ ধরে রাখতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। রূপান্তর-এর মধ্যে ‘গুরুদক্ষিণা’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণের মাঝে মাঝে মূল বক্তব্য তুলে ধরার কৌশল খুবই প্রাণবন্ত ছিলো। সিনেমার শুরুর দিকে টপ শটে হোটেল ও তার চারপাশের প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্য অপরূপ ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছে। এক্ষেত্রে ক্যামেরা-সঞ্চালকের প্রশংসা না করলেই নয়। এই শট্টি দেখানোর পাশাপাশি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার পুরো আবহকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করেছে।
তবে গল্পের নির্মাতা যখন একলব্য-দ্রোনাচার্যের বিষয়টি নিয়ে তার সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করছিলো তখন ট্রলি শটের মাধ্যমে তাদের ধারণ করার বিষয়টি নিয়ে একটু কথা আছে। সবাই যখন কথা বলছিলো, সে-সময় ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক নায়িকাকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। এ-কারণে ওই শটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা অন্য চরিত্রগুলো ক্যামেরা থেকে সরে গেছে। আবার আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতালদের সংস্কৃতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে নির্মাতার সতর্ক অবস্থা যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। সাঁওতালি নৃত্যের উপস্থাপনা চমৎকার হলেও দল বেঁধে হোটেলের দোতলা পর্যন্ত উঠে যাওয়া শট্টির অর্থ পরিষ্কার নয়।
অম্বর যখন শুটিং চলাকালীন তীর ধরার ভুল ধরিয়ে নিজেই তীর ছুড়ে দেখায়, তখন যে-গাছে গিয়ে তীরটি বিদ্ধ হয় এবং পরের শটে মিড ক্লোজে যে-গাছটি দেখানো হয়, এ-ক্ষেত্রে দুটি গাছই যে ভিন্ন তা বুঝতে কারও সমস্যা হয় না। এ-ব্যাপারে পরিচালকের সচেতনতা জরুরি ছিলো। ফেরদৌস ও সাকিবা বাংলাদেশের ‘বাণিজ্যিক’ চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পী। রূপান্তর-এ তাদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি চরিত্র হলো গুরুদক্ষিণা নামের চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ও তার সহকারী। একজন চলচ্চিত্রনির্মাতার ভিতরের যে-টানাপোড়েন তা ফুটিয়ে তুলতে ফেরদৌস ব্যর্থ হয়েছেন। তার কথা বলা, হাঁটার ধরন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি যেনো চরিত্রটা ধারণ করতে পারেননি। চলচ্চিত্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র জুড়ে ছিলেন সাকিবা। অথচ অভিনয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে-বিষয়, অবাচনিক যোগাযোগ সেখানে তার দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। তার অভিনয় দেখে বারবার মনে হয়েছে তিনি অভিনয় করছেন। তার অভিনয়ের জড়তা কখনও কখনও দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছে চলচ্চিত্রের বাস্তবতা থেকে বের হয়ে আসতে। পঞ্চানন ও অম্বর চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে দুজন শিল্পীই অনেক বেশি সাবলীল ছিলেন। চলচ্চিত্রের শুরুতে মহাভারতে উল্লিখিত বিভিন্ন ঘটনার বয়ান ও আঁকা চিত্রের মাধ্যমে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন নির্মাতা, যা দর্শককে মূল ঘটনায় নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
এই চলচ্চিত্রটি ২০০৭ সালে বাংলাদেশ তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুদানে নির্মাণ হয়। মজার ব্যাপার হলো, রাষ্ট্রের অর্থে সেই রাষ্ট্রেরই শাসকদের চরিত্র উপস্থাপনে একটু পিছিয়ে গিয়ে মহাভারতের কুরু রাজ্যের প্রসঙ্গ এনেছেন পরিচালক। বিপদজনক অথচ সাহসী এ-ধরনের উদ্যোগের জন্য আবু সাইয়ীদকে ধন্যবাদ।
সবকিছুই চলে নিয়মের অমোঘ নিয়মে। মনুষ্যসৃষ্ট এই নিয়ম কাদের দ্বারা নির্মাণ হবে, তা মূলত নির্ভর করে নিয়মের অধিকর্তা কে বা কারা। শত শত বছর ধরে চলে আসা এই নিয়মের সুফল ভোগকারী তার মতো করেই প্রত্যেকটি বিষয় চালাবে এটিইতো স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়ম ভাঙার নিয়ম যদি চালু করে অন্য কেউ, তাহলে বুঝতে হবে তার ক্ষমতা কতো বেশি। এক সময় রাজা শক্তির জোরে ইতিহাস রচনা করতো তার নিজের মতো করে, কিন্তু আজ সে-অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। একজন সাধারণ মানুষও চাইলেই তার মত প্রকাশ করতে পারছে, তুলে ধরতে পারছে তার স্বপক্ষের যুক্তি। আবার সময় ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আজ গণমাধ্যমেরও অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। পূর্বতন গণমাধ্যম ব্যবস্থার সেই ভয়াল, রাক্ষুসে নীতির অবসানেও শুরু হয়েছে গণমানুষেরই দ্বারা চালিত গণমাধ্যম। এভাবে এ-সবকিছুর রূপান্তর আমাদের পথ চলার গতিকে আরও শাণিত করবে। গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রও যে-ভিন্নভাবে, অন্যপথে হেঁটে গণমানুষের না-জানা, না-বলা কথাকে প্রকাশ করতে পারে বা করবে তারই পটভূমি রচিত হলো রূপান্তর-এ।
লেখক : রুবেল পারভেজ ও মাহমুদ আপেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
rubelmcj@gmail.com
appel_mcj.ru10@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৮ ); ‘চলচ্চিত্রে মতানৈক্যের কণ্ঠস্বর : বিকল্প চলচ্চিত্র’; সিনেমা; ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।
২. ফেরদৌস, রোবায়েত (২০০৯ : ১৪); ‘গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ক্ষমতা-প্রশ্ন’; গণমাধ্যম/শ্রেণিমাধ্যম; সম্পাদনা-রোবায়েত ফেরদৌস ও মুহাম্মদ আনওয়ারুস সালাম; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. নিউটন, সেলিম রেজা (২০১১ : ৬); উইকি-উন্মোচন : প্রযুক্তি, প্রতিরোধ ও সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কি খ্যাপা বিজ্ঞানী, বিন লাদেন, নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী?; কাঠপেন্সিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়‘।
৪. ‘জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ত্রিমুখী সংগ্রাম’; প্রথম আলো, ৮ ডিসেম্বর ২০১০।
৫. গুহ, রণজিৎ (২০০৪ : ৪৩); ‘ভূমিকা : নিম্নবর্গের ইতিহাস’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা-ভদ্র গৌতম ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৬. চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০৪ : ৩); ‘ভূমিকা : নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার ইতিহাস’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা-ভদ্র গৌতম ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৭. চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০০ : ৬১); ‘ক্ষমতা প্রসঙ্গে দুই প্রেক্ষিত : গ্রামশি ও মিশেল ফুকো’; ইতিহাসের উত্তরাধিকার; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৮. হোসেন, মাহমুদুল (২০১১ : ৫৮); ‘তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যছবি : স্বদেশের সত্য-কোষ’; দেখা; সম্পাদনা-মাহমুদুল হোসেন; প্রগেসিভ প্রিন্টার্স প্রা. লি., ঢাকা।
৯. আনিসুজ্জামান; ‘তাজউদ্দিন আহমেদে ও স্বদেশ ভাবনা’; প্রথম আলো, ২০ জুলাই ২০১২।
১০. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০৪ : ১৮)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন