Magic Lanthon

               

দীপা মাহবুবা ও ফারহানা সুস্মিতা

প্রকাশিত ১৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

কমন জেন্ডার : দ্য ফিল্ম

ভিতর চোখে ‘হিজড়া’ উপাখ্যান এবং মেলবন্ধনে ‘পপুলার কালচার’ ও ‘হাই কালচার’

দীপা মাহবুবা ও ফারহানা সুস্মিতা


আমরা কীভাবে আমাদের আত্মপরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করি? কিসের ভিত্তিতে হয় এই সংজ্ঞায়ন? স্বাভাবিক শব্দটির মানে কী আমাদের কাছে? যারা আমাদের তৈরি এই স্বাভাবিকের মানদণ্ডে পড়ে না, আমরা কেনো তাদেরকে ঘৃণা করি? কেনো খুঁজতে যাই না এই ঘৃণার কারণ, শুধু অন্ধের মতো ঘৃণাই করি। আমরা কিছু মানুষের প্রতি কেনো নির্দয়-কোনো কারণ ছাড়াই, কেনো?

এগুলো হচ্ছে এ-রকম কিছু প্রশ্ন, যা কোনো চলচ্চিত্র দেখার পর একজন সংবেদনশীল দর্শকের মনে উঁকি দেবে; যদি কিনা সেটি হয় কমন জেন্ডার : দ্য ফিল্ম এর মতো চলচ্চিত্র। যে-চলচ্চিত্রটি নিয়ে মুক্তির আগেই দর্শকের মনে সৃষ্টি হয় ব্যাপক আগ্রহ। মূলত বিভিন্ন শহরজুড়ে লাগানো চলচ্চিত্রটির পোস্টার সবার দৃষ্টি কাড়ে। কারণ, তাদের পরিচিত পুরুষ অভিনেতারা এখানে নারীবেশ ধারণ করেছে। ২১ ডিসেম্বর ২০১২ দেশের ১১টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় কমন জেন্ডার। আগ্রহী দর্শকদের মধ্যে যারা মেয়েলি আচরণ নিয়ে স্থূল রসিকতা দেখবার আশা নিয়ে চলচ্চিত্রটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন; কমেডি ফিল্ম দেখতে আসা সেই সব দর্শকের জন্য চলচ্চিত্রটি ছিলো বিনা মেঘে বজ্রপাত। মূলত কমন জেন্ডার একটি মানবিক চলচ্চিত্র। যার শুরুটা স্পষ্টতই একটি সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মতো; কিন্তু যখন চলচ্চিত্রটি শেষ হয়, দর্শকদের এটি বাকরুদ্ধ করে দেয় নির্দয়ভাবে তাদের চিন্তার সহজাত গণ্ডির বাইরে টেনে এনে।

চলচ্চিত্রটির মুক্তি উপলক্ষে ২০ ডিসেম্বর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন,পৃথিবীর শত বছরের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে-কয়টি চলচ্চিত্র সমাজ পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে যেমন : সাদা ও কালো মানুষের ব্যবধান, দাস প্রথার অবসান ইত্যাদি; হিজড়া সম্প্রদায়ের ভাগ্য পরিবর্তনে কমন জেন্ডার : দ্য ফিল্ম সে-রকমই একটি চলচ্চিত্র বলে আমি মনে করি।

যদিও বাংলাদেশের জনপ্রিয়ধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোকে বিদ্যমান জ্ঞানতাত্ত্বিক ডিসকোর্সে বিনোদনমাত্র,রাজনৈতিক দায়হীন,অশৈল্পিক,অগভীর, বাজারি ইত্যাদি অভিযোগে সাধারণত সিরিয়াস আলোচনার বাইরে রাখা হয়। ওসব নিয়ে আলোচনা করার কিচ্ছু নেই-এই মনোভাবে জনপ্রিয়ধারার ছবিগুলোকে নিয়ে না সংবাদপত্র, না লেখক, না বুদ্ধিজীবী কেউই গভীরভাবে আলোচনা করেন না।

তবে বাংলা চলচ্চিত্রে বিদ্যমান পপুলার কালচারহাই কালচার এর মধ্যে সেতু নির্মাণ করেছে সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত কমন জেন্ডার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচনায়ও যা এনেছে নতুন মাত্রা। চলচ্চিত্রটিকে একই সঙ্গে বাংলা সিনেমার নিয়মিত দর্শকেরাও যেমন লুফে নিয়েছেন, তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকেও চলচ্চিত্রটি হিজড়া সমাজ ও বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। 

ঢাকার গতানুগতিক বাণিজ্যিক ছবির যে-দর্শক, তার প্রোফাইল বা গড় চরিত্র নির্মাতাদের জানা। সুতরাং ঢালিউডের প্রযোজক-পরিচালকেরা প্রতি সপ্তাহে যেসব বাণিজ্যিক ছবি মুক্তি দিচ্ছেন, সেগুলোরও একটা ফর্মুলা বা গৎবাঁধা কাহিনী থাকে। ব্যতিক্রমী ছবি বানিয়ে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি নিতে তারা রাজি নন। এমন যখন সিনেমার ধরন, তখন বাণিজ্যিক দিক থেকে চিন্তা করলে তরুণ পরিচালক নোমান রবিন-এর সিদ্ধান্ত যে-আত্মঘাতী ছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে কমন জেন্ডার নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ দেখে ঢাকার বলাকা সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারের কর্মী শামসুল আরেফিন রনিও অবাক হয়েছেন, এটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী ছবি। কিন্তু সব ধরনের দর্শকই এই ছবি দেখতে আসছেন। এ-নিয়ে টানা তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। সাধারণত অন্য কোনো ছবি এতোদিন চলে না। কমন জেন্ডার সব শ্রেণির দর্শকই দেখছেন, তবে তাদের মধ্যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের সংখ্যাই বেশি। ব্যতিক্রমী কাহিনী, তাদের এই ছবি দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে টেনেছে।

কমন জেন্ডার-এর গল্প, চিত্রনাট্য নোমান রবিনের; প্রযোজনায় ইআর সিনেমা। সম্প্রতি চলচ্চিত্রটি গোল্ডেন গ্লোব-এ অংশ নেয়। নোমান বলেন, এই ছবিটি নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য সমাজের সবার চোখে হেয় ও অবহেলিত হিজড়া জনগোষ্ঠীকে মানুষ হিসেবে সম্মান দেখানো এবং তাদের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি। একই সঙ্গে রবিন আশা প্রকাশ করেন, এটি দেখার পর দর্শক হিজড়াদের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা ও পরিবর্তিত মনোভাব নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হবে।

অভিনন্দন নোমান রবিনকে। রূপালি পর্দার মধ্য দিয়ে এই প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের জীবনযাপন মূলস্রোতের মানুষদের সামনে তুলে ধরা, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রায় বৈপ্লবিক ঘটনা। তাহলে কেনো এই নিবন্ধ-এই প্রশ্ন যদি কেউ করে বসেন, তার মোটামুটি একটি উত্তরও খাড়া করে রেখেছি; বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিজড়া সমাজের বাস্তবতা এবং তাদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালক কতোখানি ঔদ্ধত্য দেখাতে পেরেছেন, চলচ্চিত্রটি কি সুশীল সমাজের তৈরি নির্দিষ্টতার সীমা লঙ্ঘন করতে পেরেছে, নাকি এর বিষয় নিয়ে চলছে পপুলার কালচারহাই কালচার-এর দ্বন্দ্ব?

 

দুই.

এখন প্রথমেই যে-প্রশ্নটি আসে, তাহলো-কারা এই হিজড়া? চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের জন্মপরবর্তী লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয় মূলত তারাই হিজড়া। তবে আমাদের সমাজ বাস্তবতায় বিজ্ঞানের এ-সংজ্ঞা বদলে গেছে। হিজড়া কোনো মানুষের জন্মগত পরিচয় হতে পারে না; যেমন হতে পারে না বেশ্যাহিজড়া আসলে একটি বৃত্তির নাম, সে-কারণেই হিজড়া-বৃত্তি বা হিজড়া-পেশা একটি উপার্জনের উৎস। বেশ্যারা অবশ্য যৌনতার জন্য প্রান্তিক (অবশ্যই শিক্ষা-অর্থনীতির দুর্বলতার নিরিখে)। এ-কথা আমরা সবাই জানি, যথার্থ শিক্ষা ও সুঠাম অর্থনৈতিক অবস্থানের কোনো কামুক নারীকে বেশ্যা বলার ক্ষমতা অবশ্যই আমাদের নেই। ঠিক তেমনই হিজড়ারাও প্রান্তিক। যদিও হিজড়াদের এই প্রান্তিকতার প্রবঞ্চনা আরও ভয়াবহ।

‘‘হিজড়েরা-এ তাবৎ (নাকি সেই সুদূর আদি-অকৃত্রিম ইতিহাসের কাল থেকে) যৌন প্রতিবন্ধী বলেই সমাজের কাছে বিবেচিত। ...সেই সমাজই আবার হিজড়ে-দের যৌনতাহীন মানুষ হিসেবে প্রান্তিক অবস্থানে পৌঁছে দেয়; অর্থাৎ কামুকতা এবং যৌনতা না থাকা যেনো সমাজের কাছে প্রান্তিক অবস্থানের বিষয়। মানুষের যৌনতা মূলস্রোতে-র সমাজপতিদের দ্বারা নির্দিষ্ট। জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ছাড়াও হিজড়া দলে রয়েছে আরও কিছু ভিন্ন ধরনের মানুষ। সাধারণত প্রাকৃতিক বা জন্মগত হিজড়াদের সংখ্যা খুবই কম। এদের অতীত ইতিহাস মোটামুটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, তবে হিজড়া দলে যারা খোজা বলে পরিচিত তাদের সম্পর্কিত কিছু তথ্য বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষদের পুরুষাঙ্গ ছেদন করে তাকে হিজড়া বানানো হয়, এরাই খোজা নামে পরিচিত। সমরেশ বসুর বান্দা উপন্যাস থেকে এই খোজাদের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, প্রজননে অক্ষম খোজারা হারেমের নারীদের পাহারা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হতো। শুধু তাই নয়, সুলতানের যৌন রোগেরও সামগ্রী ছিল তারা। আর আজকের দিনে যে শব্দ দিয়ে খোজাদের শনাক্ত করা হয় তা হল হিজড়ে, যার অর্থ না পুরুষ, না নারী। শব্দটির উৎপত্তিস্থল মনে করা হয় উর্দু, যে ভাষা ব্যবহৃত হত মোগল বাজারে আর সৈন্য ছাউনিতে, যাতে মিশেছে হিন্দি, ফার্সি আর আরবি। ...ক্লীব, তৃতীয় প্রকৃতি, ষন্দ, পুংসতৃহীন, নিষ্পৌরুষ, নপুংসকলিঙ্গ ইত্যাদি শব্দে খোজা কিংবা যৌন অক্ষম দুই-ই বোঝাতে পারে।  

এ-ক্ষেত্রে অবশ্য কাহিনীকারের ধারণা পরিষ্কার। নোমান চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছেন সেই সব মানুষদের গল্প নিয়ে যাদের অ্যানাটমিকাল-সেক্স ছেলেদের মতো, কিন্তু মেন্টাল-সেক্স মেয়েদের মতো। চলচ্চিত্রটি দেখে বোঝা যায়, এটি গতানুগতিক সাধারণ মানুষের বা মূলস্রোতের মানুষের চোখে দেখা হিজড়া উপাখ্যান নয়; বরং তিনি প্রান্ত জীবনের অনুভবকে এমনভাবে ফুটিয়েছেন, যেনো মনে হয় কাহিনীকার নিজেও একজন প্রান্তিক মানুষ, যিনি জীবনভর কাটিয়েছেন ওদের সঙ্গে।

 

তিন.

এবার প্রশ্ন, তাহলে কমন জেন্ডার এর মানে কী? এটি সম্প্রতি প্রচলিত হওয়া একটি অর্ধ-সম্মানসূচক শব্দ, যেটি ব্যবহৃত হয় সুনির্দিষ্ট লিঙ্গপরিচয়বিহীন মানুষদের বোঝানোর জন্য; যাদেরকে আমরা ঐতিহ্যগতভাবে (ও অসম্মানজনকভাবে) হিজড়া বলে জানি।

চলচ্চিত্রটির নাম থার্ড সেক্স না হয়ে কমন জেন্ডার কেনো হলো? তাহলে সেক্স ও জেন্ডার এ-দুটো কি আলাদা বিষয়? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক বুলাভদ্র এর ধারণা এ-ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, সেক্স আমাদের জৈবিক লিঙ্গ, যা নিয়ে আমরা জন্মাই, আর জেন্ডারকে বলবো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লিঙ্গ, যা নিয়ে আমরা জন্মাই না, যা আমরা সামাজিক কাঠামো এবং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অর্জন করি। এটাকে জন্মের পর দ্বিতীয় জন্মও বলা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, আসলে আমরা তো কোনো মানুষকে পুরো ব্যক্তি, সম্পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ভাবতে শিখিনি। আমরা কোনো মানুষকে ছেলে হিসেবে বা মেয়ে হিসেবে ধরি। এবং এটা আমাদের এতোটাই বদ অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে যে, আমরা এখন সবকিছুর ওপরই লিঙ্গত্ব আরোপ করে ফেলি। ওয়াশিং মেশিন, শ্যাম্পু এসব মেয়েলি জিনিস। বিজ্ঞাপনে সুবেশা মেয়েরা এসবের কথা বলেন। এক ধরনের পর্দার মধ্য দিয়ে আমরা সমাজকে দেখি, ব্যক্তিকে বুঝি না। মেয়ে বুঝি, ছেলে বুঝি। মেয়েলি বুঝি, পুরুষালি বুঝি। আমি এই ছেলে বা মেয়ে দুটি আলাদা আলাদা খোপের অস্তিত্বের বিশ্বাসী নই। ইতিহাসের দিকে তাকালেই তো আমরা দেখতে পাই প্রাচীন মানবী এবং প্রাচীন মানবের সাজপোশাক প্রায় একরকম ছিল, অলঙ্কার ব্যবহার করতেন দুজনই, পরের দিকে সামাজিক প্রক্রিয়া, সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো, তদুপরি রাজনীতির প্রভাবে তাদের বেশভূষার পরিবর্তন এল। নারী ও পুরুষের দুটো আলাদা বাক্স বন্ধ অস্তিত্বের উদ্ভব হল।

পুরুষালিমেয়েলি অর্থাৎ যৌনতাবোধ, দীর্ঘদিন ধরে মনোবিজ্ঞানীরা এই নিয়ে গবেষণা করছেন। কিন্তু মতৈক্য যে-এসেছে তা কিন্তু নয়। এক এক দলের এক এক রকম থিওরী। এত তাত্ত্বিক কচকচির পুরো ব্যাপারটা সাধারণ মানুষ যে সহজেই বুঝবে তা নয়। অতএব, সেসব বাদ দিয়ে যা বুঝেছি, তা হল দুটি আলাদা তত্ত্ব এযাবৎ এ বিষয়ে রয়েছে। এক দল বলছেন, জন্মাবধি যে কোন মানুষের মধ্যেই একই সঙ্গে পুরুষ যৌনতা এবং নারী যৌনতা মিলেমিশে আছে। ম্যাসকুলিনিটি এবং ফেমিনিনিটি একই শরীরে জন্মানোর সময় থেকেই বর্তমান। কী শরীরে, কী মনে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভারসাম্যের ফারাক হতে থাকে। এই ফারাক তৈরীর পিছনে কাজ করে শারীরিক, মানসিক এবং বিশেষ করে পারিবারিক এবং সামাজিক নানা কার্যকারণ। অন্য তত্ত্বটি হল, জন্ম মুহূর্তে শিশুটির যৌনতা বোধ থাকে শুন্য। ধীরে ধীরে নানা ঘাত প্রতিঘাতে তার মধ্যে তৈরী হয় যৌনতা বোধ। কোন দিকে সে যাবে, অর্থাৎ তার সেক্সুয়ালিটি ঠিক কেমন হবে, তা নির্ভর করে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর, পরিবারের উপর, সমাজের উপর, দুটি তত্ত্বের মধ্যে গোড়ায় ফারাক থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুটিরই চমৎকার মিল। প্রসঙ্গত, ভারতীয় কবি নবনীতা দেবসেনের একটি সাক্ষাৎকার উল্লেখ না করলেই নয়। পুরুষালিমেয়েলি অর্থাৎ যৌনতাবোধ সম্পর্কে আমাদের সামাজিক ধারণার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি বলেন, এ সমাজে মেয়েলি শব্দটা নঞর্থক কিন্তু পুরুষালি সদর্থক ও প্রশংসার। ...পুরুষ মানুষ মানেই সে বেশী পরিমাণে মানুষ আর মেয়েমানুষ মানেই সে অনেক কম মানুষ। সে কারণেই পুরুষের ক্ষেত্রে মেয়ে হওয়া মানেই অধঃপতন।

আসলে, সমাজে যখন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ (নারীরা) লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় থাকার পরেও দুঃখ-কষ্ট ও অসাম্য সহ্য করে, তখন অ-লিঙ্গ পরিচয়ের এই জনগোষ্ঠী আরও বেশি দুঃখ-কষ্টে থাকবে সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। রাসসুন্দরী থেকে বেগম রোকেয়া হয়ে আজকের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে নারীর অবস্থান যতোটা না নারীর, ততোটা পুরুষের, পৌরুষের। সুতরাং এমন প্রেক্ষাপটে আমরা যখন স্পষ্টতই দেখি-তারা অকল্পনীয় অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, আমরা আসলে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের সমস্যাসঙ্কুল একটা পরিণতিই দেখছি। যে-বিভাজন সমাজের তৈরি করা, টিকে রাখা এবং সমাজের ক্ষমতাশালীদের দ্বারা প্রভাবিত।

এই প্রসঙ্গে মার্কিন নৃ-তত্ত্ববিদ সেরিনা নন্দার নিদার ম্যান নর উইম্যান বইটির কথা না বললেই নয়। তিনি এখানে স্বেচ্ছায় এই সম্প্রদায়ে যোগ দেওয়া দক্ষিণ ভারতীয় হিজড়াদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, নির্বাণ (খাসি) করাকে দীক্ষা ও পুনর্জন্ম হিসেবে দেখানো হয়, নৃশংস কাজটাকে ধর্মীয় আচারের চেহারা দেয়া হয়। হিজড়ে জীবনে প্রবেশকে নিছক লিঙ্গান্তর হওয়াই মনে করা হয় না, ধরা হয় মানুষটি এক তৃতীয় প্রকৃতিতে উত্তীর্ণ হল। তবে নন্দার এই ব্যাখ্যায় সায় দেননি জিয়া জাফ্রি। তিনি দ্য ইনভিজিবল টেল অব ইউনাক বইয়ে উল্লেখ করেন, পাশ্চাত্যে তো কাউকে ট্রানস সেক্সুয়াল বা উভযৌন বা লিঙ্গাতীত মনে করা হয়, যখন সে নারী বা পুরুষ মনে করে, সে ভুল শরীরে জন্মেছে। এই ধরনের মানুষদের থার্ড সেক্স বা তৃতীয় যৌনতার মানুষ বিবেচনা করা যায় না। খাসি করা তো উভযৌনতার প্রতিষ্ঠা নয়, তার বিসর্জনই।

একটি দেশের উন্নতি দেশের সব পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর উন্নতি। তাই দেশের সব পর্যায়ের সুষম অর্থাৎ দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য আমাদের অবশ্যই প্রান্তিকে পরিণত হিজড়া সম্প্রদায়কে সমাজের মূল স্রোতে আনতে হবে। আর তাই যৌনতার বিসর্জন নয়, বরং সামাজিকভাবে উভযৌনতার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। খোজাকরণের মধ্য দিয়ে তৃতীয় প্রকৃতিতে উত্তীর্ণ হওয়া নয়, বরং ট্রান্স-সেক্সুয়াল বা লিঙ্গান্তর হওয়াই ভুল শরীরে জন্মানো পুরুষকে নারীর পরিচয় এনে দেবে। এবং প্রান্তিক হিজড়া সম্প্রদায়কে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনবে। নিজেদেরকে একটি সভ্য জাতি হিসেবে পরিচিত করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

 

চার.

হিজড়াদের অত্যাচার দৌরাত্ম্য নিয়ে অভিযোগ ওঠে প্রায়ই। কোনো বাড়িতে নবজাতকের আবির্ভাব ঘটলে ঢোল বাজিয়ে একদল হিজড়ার নৃত্যগীত ও মোটা টাকা দাবি করাটা খুবই পরিচিত ঘটনা। কাহিনীকার নোমান রবিন বাঙালি হিজড়ার সেই মনস্তত্ত্ব অনেকখানি ধরতে পেরেছেন। আসলে হিজড়ার কোনো জাতিসত্তা, ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রথম থেকেই থাকে না, সে ব্যক্তি মানুষের জন্ম হয় মূলস্রোতে-রই সমাজে। লিঙ্গ চিহ্নে পুরুষ হওয়ার কারণে সে পুরুষ বাচ্চার মতোই বড়ো হতে থাকে। কিন্তু ক্রমেই ধরা পড়ে ওই পুরুষ বাচ্চার আচরণ মেয়েলিমেয়েলি পুরুষ ছোট থেকেই সামাজিক মানুষের কাছে হাসির খোরাক, অকারণ অস্বস্তিকর। এবং এই সমস্ত মানুষের ওপর অকথ্য অত্যাচার করার বৈধ অধিকার যেনো সমাজের মূলস্রোতের মানুষদের জন্মগত অধিকার। সার্কাসের জোকার কিংবা হিন্দি সিনেমার (অবশ্যই বাজারি) কমেডিয়ান পুরুষের নারী বেশ ধারণ এবং নারীর আচরণকে স্থূল রসিকতা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। সেই কারণেই সমাজের মূলস্রোতের পণ্ডিত থেকে মূর্খ সকলেরই মেয়েলি-পুরুষকে অন্যায়ভাবে ঘৃণা করতে শেখায়। এই ঘৃণা এতোটাই বিস্তৃত ও প্রচারিত যে, সেই মেয়েলি বালক ক্রমশ একা হয়ে পড়তে থাকে। এমনই একটি সমাজে মেয়েলি পুরুষ যখন সমাজের অত্যাচারে একা কোণঠাসা বিষণ্ণ হয়ে যায়, যখন সে বুঝতে পারে তার এই জন্ম বৃথা এবং বেঁচে থাকা গ্লানি ছাড়া আর কিছু নয়, তখন তার পরিবার ও আত্মীয়রাও তাকে ঝেড়ে ফেলতে চায়। তেমনি মেয়েলি পুরুষও পৌঁছে যায়-প্রান্তবাসীদের ডেরায়, হিজড়া খোল-এ। খোল-এটি ওই সম্প্রদায়ের ভাষার শব্দ। খোল মানে বাড়ি, নিবাস, আড্ডা, আলয়। এভাবেই জন্ম হয় প্রতিটি হিজড়ার।

কমন জেন্ডার চলচ্চিত্রে দেখা যায়, জীবনযাপনের পদে পদে হিজড়ারা হোঁচট খায়। শিক্ষার সূত্রে জীবনে কখনও তাদের বই-খাতা হাতে কোনো স্কুল-কলেজের চৌকাঠ পেরোনো সম্ভব হয় না, প্রতিনিয়ত সমাজের কাছে তারা তিরস্কৃত? জীবনের শুরুতেই বোধ করি সেই শিশুটিও বুঝে যায়...সে অনাহূত, অনাকাঙ্ক্ষিত! তার ভোটাধিকার নেই, সমাজ-সংসারে প্রবেশাধিকার নেই, অর্থনৈতিক ইঁদুর দৌড়েও অংশগ্রহণ নেই, নেই কোনো স্নেহের প্রকাশ, নেই প্রেমেরও ব্যঞ্জনা-তাহলে কী আছে তার? চলচ্চিত্রে দেখা যায়, পাবলিক টয়লেটে পুরুষ ও নারী উভয় কর্নার থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়। মূলস্রোতের মানুষদের সঙ্গে প্রেম-বিয়ে যেখানে শুধুই প্রহসন। সঞ্জয়ের প্রতি সুস্মিতার প্রেম, সঞ্জয়ের পরিবারের অসন্তোষ-নিন্দা, মায়ের প্রতি বুবলির ভালোবাসা, বাবা-ভাইয়ের লাঞ্ছনা আর মৃত্যুর পর তাদের সৎকারের জন্য গোরস্থানে ঠাঁই না পাওয়া এবং সমাহিত করার জন্য লৈঙ্গিক পরিচয় গোপন রাখা-এসব কারণেই হয়তো তারা বেপরোয়া; কায়দা-কেতা দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বিব্রত করে, নবজাতকের পরিজনের কাছে টাকার জন্য জোরাজুরি করে। এভাবেই তারা হয়তো প্রতিশোধ নেয় মূলস্রোতের।

 

পাঁচ.

সিনেমায় গল্প লাগে। কমন জেন্ডার গল্পহীনের গল্প বলার চেষ্টা করেছে। বলা যায়, কাহিনীকারের সেই চেষ্টা প্রায় সফল। ছবির গল্প বলার কায়দাটা নিয়ে কিছু বলার আছে। শুরু থেকেই গল্পের গ্রাফ কেবল উপরের দিকেই উঠেছে। মাঝে মাঝে যদি একটু নিচে নামতো, মানে উঠা-নামা আর কী-তাহলে উপস্থাপনার ঢঙে হয়তো আরও মুন্সিয়ানা তৈরি হতো। তবে গল্পে একটি গতি আছে, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকদের ধরে রাখবেই রাখবে। কিন্তু শেষটা মনে হয়েছে, কেনো জানি তাড়াহুড়ো করে শেষ করে ফেলেছেন নোমান।

কমন জেন্ডার মূলত হিজড়াদের সামাজিক অবস্থান, জীবিকা ও মনস্তত্ত্বের চলচ্চিত্র। যেখানে আমরা দেখি- সমাজের অসুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হিজড়ারা বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, বিনোদনের মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত। এরা সাধারণ মানুষের কটূক্তি থেকে রেহাই পেতে দলবদ্ধভাবে বাস করে। সেখানে গড়ে ওঠে এদের নিজস্ব সংস্কৃতি। চলচ্চিত্রের এক পর্যায়ে দেখা যায়, বিয়ের একটি অনুষ্ঠানে সুস্মিতাকে বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেয় সঞ্জয়। মুঠোফানে তাদের আলাপ চলতে থাকে। সঞ্জয় মাঝেমধ্যেই তাকে বলে, সে (সুস্মিতা) যদি মেয়ে হতো, তবে খুব ভালো হতো। সঞ্জয়ের এই প্রত্যাশা সুস্মিতার মধ্যে নারীভাবের সঞ্চার হয়, সে নিজের মধ্যে নারীত্বের উপস্থিতি টের পেতে থাকে। এক পর্যায়ে সঞ্জয়ের প্রেমে পড়ে সুস্মিতা। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় সঞ্জয়ের পরিবার ও সমাজ। সঞ্জয়ের মা-বাবা তাকে একজন হিজড়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য তিরস্কার করে। প্রতিবাদে সঞ্জয় বলে, তোমরা না বলো হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই সমান। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই, আর আজ! সঞ্জয়ের বাবা বলে, না! ওরা স্নেহতুল্য কিন্তু এক সাথে মেলামেশা করা যায় না। এই কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থাৎ পুরো সমাজের সভ্য মানুষগুলোর মনের কথাটি বলিয়ে নেন নোমান।

কৌম্য, সুস্মিতা বা বুবলির মতো চরিত্রগুলোর প্রত্যেকেই হিজড়া সমাজের প্রতিনিধি চরিত্র। এদের জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পরিচালক বহু প্রশ্ন তুলতে চেয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, হিজড়ারা কৌমের মতো করে যৌথভাবে কোনো এক মাসির অধীনে বেড়ে ওঠে। নাম পাল্টে সুস্ময় হয়ে যায় সুস্মিতা, বাবু হয়ে যায় বুবলি। আর এখানেই এই সিনেমায় সুস্মিতা কিংবা বুবলির ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে উত্তরণ। তারা দৈনিক চাঁদা তুলে তাদের সেই মাসিকে (সোহেল খান) দেয়। মাসির কাছে গোপনে খবর বিলি করে, তারই বিশ্বস্ত এক লোক। কোনো এলাকায় কোনো শিশু হিজড়া পাওয়া গেলে, সেই লোক এসে তাকে খবর দিয়ে যায়। বিনিময়ে সে টাকাও পায়। একদিন রাতের অন্ধকারে হিজড়ারা সবাই মিলে সেই শিশুর বাড়িতে হাজির হয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাকে এক ধরনের ছিনিয়েই নিয়ে আসে। হিজড়া হয়ে ওঠার এই হলো প্রক্রিয়া। তবে এর বাইরে লিঙ্গনাশ (খাসি) করার মধ্য দিয়ে হিজড়া জীবনে প্রবেশের ঘটনাও আছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হওয়ার কারণে রুটি-রুজির জন্য পুরুষাঙ্গ ছেদন করে হিজড়া বানানোর মতো ঘটনা ঘটায় একটি দুষ্টচক্র। অশিক্ষা ও ভয়াবহ দরিদ্রতা একদল মানুষকে বাধ্য করা হয় হিজড়া-বৃত্তি গ্রহণে-এই বিষয়টি কমন জেন্ডার উপাখ্যানে অনুপস্থিত।

হিজড়া জনগোষ্ঠী গোটা ব্যাপারটা যখন ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়ে ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি। এই প্রশ্ন রেখেই যদি কমন জেন্ডার দেখতে বসি, তাহলে চলচ্চিত্রটি দর্শক বোদ্ধাদের কিছু প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে। কারণ, কাহিনীকার এই আলোচনায় নিরব। মানবী বন্দোপাধ্যায়ের মতানুসারে, সামাজিক মানুষ মুসলিম শাসনে সম্রাটদের খোজার সঙ্গে মৈথুন সুখের কথা জেনেও, হিজড়ে সম্প্রদায়কে যৌনাঙ্গের ত্রুটিযুক্ত মানুষ এবং যৌনতাহীন মানুষ বলে আড়াল করতে চায়। এই আড়ালে চলে অবৈধ যৌনতার যথেচ্ছাচার। যৌনতার যত প্রকার প্রকরণ আছে তার সমস্ত প্রকারের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং খোলা মনে তা মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই সমাজে ওই আন্তেবাসীদের আন্তরিক সত্যে মূলস্রোতে পরিণত করা যাবে।১০ কিন্তু প্রান্তিকদের মূলস্রোতে পরিণত করার কোনো চেষ্টা আমরা চলচ্চিত্রে দেখি না।  বিকল্প/অনিয়মিত এই ইস্যু যখন সিনেমায় ধারণ করার মতো নোমান আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেনো আবার হুটহাট এই কাহিনী-কাব্যের লাগাম টেনে ধরেন-এই প্রশ্নের সুরাহাটাও বোধ করি নোমানেরই ওপরই বর্তায়।

 

ছয়. 

চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে বাণিজ্য আর আর্টের মধ্যে এক অদৃশ্য মেলবন্ধনের চেষ্টা আছে। বিকল্প বিষয়বস্তু নিয়ে তথ্যবহুল কাহিনীর সঙ্গে হাস্যরস বা গান কী অনুপাতে মেশালে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে তা উপাদেয় হবে, সেটি পরিচালক যথার্থই বুঝেছেন। আমরা মূলত সেই সব চলচ্চিত্রে আর্ট তকমা লাগাই যা দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য নির্মাণ হয় না। ভারতে মণি কাউল ও কুমার সাহানিরা এসে এমন সব দুর্বোধ্য চলচ্চিত্র বানানো শুরু করলেন সেগুলো দেখার কোনো দর্শক ছিলো না। তখন আঙ্গিক দিক দিয়ে অবর্ণনাত্বক ফর্মে বানানো চলচ্চিত্রগুলোকে আর্ট ফিল্ম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে অবর্ণনাত্বক ফর্মে এমন কোনো দুর্বোধ্য চলচ্চিত্র বানানো হলে বাণিজ্য ও গণসচেতনতা দুটোই যে-গোল্লায় যাবে এ-ব্যাপারে নোমান নিশ্চিত ছিলেন। শিওর সাকসেস্ ফর্মুলা হিসেবে চলচ্চিত্রে থাকতে হয় বড়ো পর্দার Raw Meterial। তা না হলে যে-প্রশ্ন ওঠে, তাহলো সিনেমা হয়ে ওঠা আর না-ওঠা। আর এ-ক্ষেত্রে বড়ো পর্দার Raw Meterial হিসেবে পরিচালক আরোপ করেছেন আইটেম গান। যাকে অধুনা পপুলার কালচার বলা যেতে পারে। এ-ক্ষেত্রে না বললেই নয়, পিয়ের বর্দু তার জনপ্রিয় নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় পপুলার কালচার (জনসংস্কৃতি) কে বলেছিলেন শিল্প ও জীবনের মধ্যকার ধারাবাহিকতা১১ তিনি আরও বলেন, বিদ্যাজগতে জনসংস্কৃতি বা পপুলার কালচার এবং উচ্চসংস্কৃতি বা হাই কালচার নিয়ে অধ্যয়নে এক ধরনের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান, এবং এটা একটা পরিহাস যে, জনগণের তাতে সামান্যই অংশগ্রহণ আছে।১২জনসংস্কৃতি জনগণ দ্বারা চিহ্নিত হয়নি, হয়েছে অন্যদের দ্বারা। এই অন্যরা নিঃসন্দেহে বিদ্বান গবেষক-বিশ্লেষকরা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে জনসংস্কৃতিপন্থীদের দিক থেকে এটা একটা শ্লাঘার বিষয় যে, সামন্তবাদের বিদায় এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে, সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিকে অধ্যয়ন অত্যন্ত জরুরি এবং তা হাই কালচারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ।১৩

চলচ্চিত্র গবেষক ফাহমিদুল হক কমন জেন্ডার : দ্য ফিল্ম সম্পর্কে লিখেছেন, জনপ্রিয় করে তোলার বেশ কিছু উপাদান সংযোজনের সচেতন প্রয়াস চলচ্চিত্রটিতে লক্ষ করা গেলেও কেবল বিষয়বস্তুর কারণেই এটি একটি বিকল্প চলচ্চিত্রের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।১৪ চলচ্চিত্রের বিষয় নিয়ে জনপ্রিয় বা মূলধারা, বিকল্পধারার আলোচনায় যাবার আগেই জানিয়ে রাখা ভালো, এ-সম্পর্কে চলচ্চিত্র গবেষকদের মধ্যে নানা ধারণা প্রচলিত। একদল চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মনে করেন, চলচ্চিত্র যদি জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়, তাহলে চলচ্চিত্রের মূলধারা বিকল্প ধারা বলে তো কিছু থাকার কথা নয়, তার নাম হওয়া উচিত কেবলই চলচ্চিত্র। তবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্রকে ভিন্ন ভিন্ন ধারার সংজ্ঞায় বিভক্ত করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিকল্প ধারার ছবিগুলোর বিষয়বস্তু হলো আদিবাসী বা জাতিগত সংখ্যালঘু, সমকামী, তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া ইত্যাদি। প্রচলিত সমাজে এই পরিচয় নিয়ে বাস করতে গিয়ে যে সংকট তাদের জন্য নির্ধারিত থাকে তা তুলে ধরা এসব ছবির লক্ষ্য।১৫ অন্যদিকে, প্রথাগত কাহিনী ফর্মূলাভিত্তিক চিত্রনাট্য, দর্শকের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা মূলধারার চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে বিষয়টা এমন হয়-দর্শককে যৌনতা, সহিংসতা, মন ভোলানো গল্পের মাধ্যমে বিনোদন দেয়া যাবে কিন্তু ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, আচরণগত জায়গায় ঝাঁকুনি দেবে এমন কাহিনী উপস্থাপন করা যাবে না।১৬

বিষয়বস্তুর কারণে চলচ্চিত্রটিকে বিকল্প ধারার মনে হলেও, খটকা লাগে যখন চলচ্চিত্রে দেখা যায় নির্মম জীবনযাপন করেও হিজড়াদের ধর্মবিশ্বাস অটুট থাকে, কথায় কথায় তারা আল্লাহকে সাক্ষী মানে। হুজুরদের দেখা যায়, তারা হিজড়াদের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল। যেখানে বাস্তব চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির প্রসঙ্গে কাহিনীকার লাগাম টেনে ধরেন, যা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু নোমান ঔদ্ধত্য দেখাতে পারতেন। পারতেন সুশীলসমাজের তৈরি নির্দিষ্টতার সীমা লঙ্ঘন করতে। এই প্রশ্ন জারি থাকুক...

 

সাত.

অভিনন্দন, কলাকুশলী ও চলচ্চিত্রটির চরিত্রাভিনেতাদেরকে। না নারীর, না পুরুষের ঢঙে যে কণ্ঠ, আচার-আচরণ হাঁটাচলা তা হুবহু আয়ত্ত করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে তুলে ধরা, সত্যি বিস্ময়। সুস্মিতার চরিত্রে সাজু খাদেম এবং বুবলির চরিত্রে মঞ্চের নামী অভিনেতা দিলীপ চক্রবর্তী অসাধারণ অভিনয় করেছেন। কোনো প্রশংসাই যাদের জন্য অতিরিক্ত নয়। প্রয়াত অভিনেতা দিলীপ চক্রবর্তী অসাধারণ অভিনয় প্রতিভার জন্যই গোটা ছবিতে চমৎকার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিষ্ঠা করে গেলেন এক হিজড়া চরিত্র। রূপান্তরকামি অর্থাৎ যখন কোনো পুরুষ মনে করে-সে ভুল শরীরে জন্মেছে, এই মনস্তাত্ত্বিকতা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই পরিচালক চাঁদকে যেমন ঘোমটা দিয়ে আড়াল করা যায় না, কারও মনের ভালোবাসা তেমনই আড়াল হয় না গানটির অবতারণা করেন। অভিনেতা সাজু খাদেমকে দেখে বোঝা যায়, গানটির চিত্রায়ণ সম্পর্কে স্বয়ং সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন পরবর্তী সময়ে তার (সুস্মিতা) মনস্তত্ত্বের নানা বাঁক বোঝাতে এই দৃশ্যটি দারুণভাবে সাহায্য করবে। এতে অভিনয়ে আরও আছেন সোহেল খান, অপু, জয়রাজ, রোজি সেলিম, ডলি জহুরসহ অনেকে।

চলচ্চিত্রে কস্টিউম, সেট-সবকিছুর মধ্যেই পরিচালক বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছেন বলে মনে হয়েছে। ন্যান্সি, বালাম, আরেফিন রুমীর কণ্ঠের গানগুলোও শ্রুতিমধুর। রাহুল আনন্দের শব্দধারণ ও আবহসঙ্গীতের কাজ অসাধারণ। হিজড়া সমাজ এর অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনাগুলো যেনো আবহসঙ্গীতে আর্তচিৎকার আর হাহাকার হয়ে বারবার ফিরে আসে। ছবি দেখতে দেখতে আর চোখ মুছতে মুছতে দর্শক ক্রমাগত অনুভব করেছে, কেবল হিজড়া হওয়ার কারণেই তাদের এই অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার পরিণতি আত্মহনন ডেকে আনে।

 

আট.

শেষ কথা হলো, সমালোচনাও আলোচনার বাইরে নয়। চলচ্চিত্রটির কাহিনী-বিস্তৃতি অনেকটা সরলরৈখিক। যদিও বেসিক এলিমেন্ট হিসেবে প্রয়োজনীয় নথি-তথ্যপঞ্জির পর্যাপ্ত সংগ্রহ ছিলো, অতএব আঙ্গিক এবং সিনেম্যাটিক প্রয়োগকুশলতা প্রদর্শনের পর্যাপ্ত অবকাশ ছিলো। তবে চিত্রনাট্যে ইন্টালেকচুয়াল ডাইমেনশন এর অনটন চোখে পড়ে। জরাগ্রস্থ সমাজব্যবস্থার আরোগ্যের আশায় পরিচালক যেনো উদ্যোগ নিয়েছেন সমাজের মুখে সেলুলয়েড ক্যাপসুল পুরে দিতে। ফলে কাহিনীটি হয়ে উঠেছে একটি শিক্ষামূলক কাহিনী, যা হতে পারতো আরও অনেক বেশি নাটকীয়। মানবিক বিষয়বস্তুকে উপস্থাপনার ঢঙে হয়তো আরও পেশাদারিত্ব থাকতে পারতো। সেই সঙ্গে কাহিনীকার হতে পারতেন আরও সাহসী-প্রত্যাশা নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের প্রতি। সেই সঙ্গে বলতেই হবে, কিছু দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটির আকর্ষণীয় দিক হলো, এতে হিজড়া জীবনের অসমতা এবং তার ফলে সৃষ্ট দুঃখ-কষ্টের মোকাবেলা দেখানোর পাশাপাশি সমস্যার মূলের দিকে প্রশ্নবোধক অঙ্গুলিসংকেত করা হয়েছে। যে-ঘৃণা ও একই সঙ্গে যে-ধরনের ভয় নিয়ে সাধারণ মানুষ হিজড়াদের সঙ্গে আচরণ করে, তা এমন কিছুর ফলাফল-যা আমাদের মনের অনেক গভীরে গাঁথা; যেখানে মূলস্রোত-এর সমাজ তার নিজস্ব মানদণ্ডে নির্ধারণ করছে প্রাকৃতিকপ্রকৃতিবিরুদ্ধ-এর সংজ্ঞা।

 

নোমানের প্রচেষ্টা যে-সফল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকুক। ফিরে আসুক আগের হল-ভাঙা দর্শক। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের প্রতি প্রত্যাশা জারি থাকুক...

 

লেখক : দীপা মাহবুবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনি প্রথম আলোয় প্রদায়ক হিসেবে কাজ করেন। ফারহানা সুস্মিতা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

dipamahbuba@gmail.com
fsusmita@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. ঢাকার ছবি কমন জেন্ডার নিয়ে মাতামাতি; আকবর হোসেন; বিবিসি বাংলা; ঢাকা; বুধবার, ১১ জুলাই, ২০১২।

২. বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ১৯৭); বাংলা সমাজ ও সাহিত্যে তৃতীয় সত্ত্বা চিহ্ন; প্রতিভাস, কলকাতা।

৩. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ২৩ -২৫)।

৪. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ২৩০)।

৫. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ২৩২)

৬. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ৩৬)।

৭. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ২৩৬)।

৮. সেরিনা নন্দা, উদ্ধৃত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ২৯); বাংলা সমাজ ও সাহিত্যে তৃতীয় সত্ত্বা চিহ্ন; প্রতিভাস, কলকাতা।

৯. জিয়া জাফ্রি, উদ্ধৃত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ২৯); বাংলা সমাজ ও সাহিত্যে তৃতীয় সত্ত্বা চিহ্ন; প্রতিভাস, কলকাতা।

১০. প্রাগুক্ত; বন্দোপাধ্যায়, মানবী (২০১২ : ১৯৮-২০০)।

১১. McGuigan, Jim (1992 : 10), Cultural Populism, Routledge, London.

১২. প্রাগুক্ত;McGuigan, Jim (1992 : 10)|

১৩.http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/28765219

১৪. হক, ফাহমিদুল; কমনজেন্ডার; প্রথম আলো, ৫ জুলাই, ২০১২।

১৫. হক, ফাহমিদুল ও শাখাওয়াত মুন (২০০৬ : ৪১); বাংলাদেশের এইসব চলচ্চিত্র : বিকল্প নাকি স্বাধীন’’; চলচ্চিত্রের সময়, সময়ের চলচ্চিত্র; ঐতিহ্য প্রকাশনী, ঢাকা।

১৬. প্রাগুক্ত; হক, ফাহমিদুল ও শাখাওয়াত মুন (২০০৬ : ৪৪)।

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন