Magic Lanthon

               

আশফাক দোয়েল

প্রকাশিত ১২ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আধিপত্যশীল চিনের আধিপত্যহীন চলচ্চিত্র

আশফাক দোয়েল

 

পৃথিবী যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে চারিদিকে ঘুরছে;ঠিক তেমনি,আজ এই সময়ে এসে বিশ্ব-অর্থনীতিও চিনকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দায় ইউরোপ-আমেরিকার মতো পরাশক্তি দেশগুলো যখন ভ্যাবাচেকা খায়,তখন চিন এই মন্দার মধ্যেও নিজের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে অসাধারণ দক্ষতায়।এর মধ্য দিয়ে চিন প্রমাণ করেছে,সে এক অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা। তাই অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে খুব অচিরেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রভুত্ব ছিনিয়ে নিবে চিন। শুধু অর্থনীতিতেই নয়,বিশ্ব-রাজনীতিতেও তারা একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে কয়েক দশক আগেও পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ হিসেবে চিনের অর্থনৈতিক চেহারা মোটেও এমনটি ছিলো না। তখন অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়া এই দেশটির অবস্থা ছিলো অত্যন্ত খারাপ। ১৯৭৯ সালে অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে চিনের অর্থনীতি দ্রুতই পাল্টাতে থাকে। একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে নিজেকে ইতিবাচকভাবে প্রমাণ করতে থাকে চিন। সম্পদের ব্যক্তি মালিকানার বৈধতা দিয়ে,বিপরীতে দেশিয় পণ্যের ব্যবহার ও বিদেশি পণ্যের আমদানিতে কঠোরতা আরোপ করে সরকার। ফলে দেশে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে গতি আসে। একপর্যায়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে চিন বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানিতে দখল করতে থাকে একক আধিপত্য।

বিশ্ব-অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে চিনের এই আধিপত্য গড়ে উঠার পিছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। সেগুলো হলো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন,আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সফলতা,খনিজ সম্পদ,অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজার,সস্তা শ্রম ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। দেশজ এসব উন্নয়নমূলক উপাদানের এক সফল সমন্বয়ের কারণেই চিন এ অবস্থানে পৌঁছেছে বলে মনে করা হয়।তবে বিশ্বে আধিপত্য কায়েমে শুধু অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতাই একমাত্র কথা নয়, এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আরো যে বিষয়টি জড়িত,তাহলো সাংস্কৃতিক সক্ষমতা।

ফলে চিনও বিষয়টি অনুধাবন করে;শিল্প,সাহিত্য,চিত্রকর্ম,খেলাধুলাসহ প্রতিটি বিষয়ে দিতে থাকে বাড়তি মনোযোগ। যে কারণে সংস্কৃতির বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতা বাড়তে থাকে। কিন্তু অবাক করার বিষয়,দেশটিতে শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র কেনো জানি দাঁড়াতেই পারছিলো না। রাষ্ট্রকর্তারা হয়তো অনুধাবনই করতে পারেননি,গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র দেশের শিল্প-সংস্কৃতির পাশাপাশি সামাজিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরতে সক্ষম;সেটা শুধু দেশের ভিতরে নয়,বহির্বিশ্বেও;আর সঙ্গে ব্যবসাতো আছেই। অথচ চিন কেনো জানি সে পথে হাঁটলো না। বহির্বিশ্ব দূরে থাক,অভ্যন্তরীণ বাজারেও চিন নিজের আধিপত্য আনতে ব্যর্থ হলো। ফলে সেই ফাঁকে বৃহৎ এই দেশটির চলচ্চিত্রবাজার একচেটিয়াভাবে দখলে নিলো হলিউড,বলিউডসহ কয়েকটি দেশের চলচ্চিত্র।

এখানে একটি কথা না বললেই নয়,চিনের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু চিনের একার নয়। চিন,তাইওয়ান ও হংকং-এর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে চিনের আজকের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। ডাচ ও স্প্যানিশদের অধীনে থাকা তাইওয়ান ১৬৬১ সালে চিনাদের দখলে আসে। ১৮৯৫-এ চিন-জাপান যুদ্ধে চিন পরাজিত হলে,জাপানের দখলে যায় তাইওয়ান।কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হলে তাইওয়ান আবারো চিনের অধীনে চলে আসে। তাইওয়ানে মূলত চলচ্চিত্রের জন্ম হয়েছিলো ১৯০১ সালে জাপানিদের হাত ধরে। পরে ১৯৪৯-এ চিনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেসময়ের শাসক চিয়াং কাই শেক তাইওয়ানে পালিয়ে যান। তার সঙ্গে চিনের তখনকার কিছু চলচ্চিত্রনির্মাতাও পাড়ি জমান তাইওয়ানে। মূলত পালিয়ে যাওয়া এই চলচ্চিত্রনির্মাতাদের হাত ধরেই শুরু হয় তাইওয়ানের নতুন চলচ্চিত্রের যাত্রা।

পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় হংকং-এর চলচ্চিত্রে চিনের প্রভাব ছিলো চোখে পড়ার মতো;যদিও হংকং তখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিলো। তাই হংকং-এ প্রথম দিকে নির্মিত স্টেলিং এ রোস্টেড ডাক (১৯০৯) এবং রাইট আ রঙ উইথ আর্থেনওয়ার ডিস (১৯০৯) চলচ্চিত্রে চিনের প্রাচীন অপেরার প্রভাব লক্ষ করা যায়। এরপর ৩০-এর দশকে চিনের তৎকালীন সরকার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কুসংস্কার ও অনাচার সঞ্চারিত হচ্ছে বলে মার্শাল আর্টসধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে চিন তাদের দেশে ক্যান্টোনিজ (cantonese)ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করে। ক্যান্টোনিজ ছিলো মূলত হংকংয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও দক্ষিণ চিনের মানুষের ভাষা। ফলে চিনে নির্মিত ক্যান্টোনিজ ভাষার চলচ্চিত্রগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এ কারণে নিষিদ্ধ হওয়া এসব চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অন্যতম জায়গা হয়ে ওঠে হংকং। তবে এ সময় চিন-জাপান যুদ্ধ শুরু হলে,জাপান ১৯৩৭ সালে রাজধানী সাংহাই দখল করে নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪১-এ হংকংও দখল করে জাপান। তবে ১৯৪৫-এ ব্রিটিশরা পুনরায় হংকং দখলে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হংকং হয়ে ওঠে চিনা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন প্রতিষ্ঠার পর তার দ্বারা হংকং চলচ্চিত্রশিল্প আরো ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে থাকে। এভাবেই চলছিলো,সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশদের থেকে হংকংয়ের নিয়ন্ত্রণ পায় চিন। বর্তমানে এটি চিনের বিশেষ প্রসাশনিক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। তাই চিন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে হংকং,তাইওয়ান চলে আসবেই,কিন্তু চলতি প্রবন্ধে পরিধির ক্ষুদ্রতায় এ আলোচনা কেবল চিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

চিনা চলচ্চিত্রের যাত্রা

ক. শুরুর কথা

১৯ শতকের শেষদিকে লুমিয়ের ভাইয়েরা যখন সারা বিশ্বে নিজেদের চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু করে,ঠিক তার এক বছরের মাথায় চিনে চলচ্চিত্র প্রর্দশন হয়।১৮৯৬ সালের ১১ আগস্ট স্পেনিয় ব্যবসায়ী আন্তোনিও রামোস (Antonio Ramos) এর হাত ধরে সাংহাইয়ের এক জু গার্ডেন টি হাউসে (Xu Garden Tea House) শুরু হয় চলচ্চিত্রের প্রথম প্রদর্শনী। এরপর থেকেই চলচ্চিত্রের দর্শকপ্রিয়তা বাড়তে থাকে চিনের বিভিন্ন শহরে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর বিনোদন চাহিদা সেসময় মিটছিলো মূলত বাইরের বিশেষ করে ফ্রান্সের চলচ্চিত্র দিয়ে। এভাবে প্রায় এক যুগ পেরিয়ে ১৯০৮-এ চিন উপলব্ধি করে নিজেদের চলচ্চিত্রের কথা। টিং চুন মাউনটেন নামে প্রাচীন অপেরার কয়েকটি দৃশ্যের চলচ্চিত্রায়ণে তারা তৈরি করে প্রথম চলচ্চিত্র। মঞ্চনাটক বা কমেডিকে ক্যামেরাবন্দি করে তার প্রদর্শনই ছিলো মূলত ওই সময়ের চলচ্চিত্র। তবে অপেরাধর্মী এসব চলচ্চিত্র নিজস্ব চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি চিনে। যদিও এই দশকেই চিন দেশের সামাজিক সমস্যা নিয়ে তৈরি করে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য সাফারিং কাপ্‌ল

বিয়ের অনুষ্ঠানে যে বাগাড়ম্বর করা হয়, সেটাকে নিয়ে ১৯১৩ সালে জিং জিংকিভ (Zhing Zhinhqiv) ও ঝ্যাং সিভান (Zhan Shichvan) নির্মাণ করেন ডিফিকাল্ট কাপ্‌ল নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য কমেডি চলচ্চিত্র। এর মধ্য দিয়ে মূলত চিনের নিজস্ব চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু। এরপর ২০ দশকে চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করতে থাকে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ধারার দিকে এগোতে থাকে তারা। রোমান্টিক, মার্শাল আর্টস, বাস্তব কাহিনী সম্বলিত চলচ্চিত্র বেশ জনপ্রিয়তা পায় এ সময়। ফলে বেশ কয়েকটি বিদেশি প্রযোজনা সংস্থা এগিয়ে আসে চলচ্চিত্র নির্মাণে। এদের মধ্যে এশিয়া পিক্‌চার কোম্পানি (১৯০৮), কমার্শিয়াল প্রেস (১৯১৭) ও চায়না ফিল্ম কোম্পানি (১৯২০) উল্লেখযোগ্য।

১৯২২ সালে চিনের নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রযোজনা সংস্থা মিং শিং। এই সংস্থার কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র-লেবরারস লাভ (১৯২২),সি ওথ্‌ (১৯২২),বিউটিজ অ্যান্ড স্কেলিটন্স (১৯২২),দ্য অরফ্যান রেসকিউজ হিজ গ্র্যান্ডফাদার (১৯২৩)। মিং শিং-এর সাফল্য ওই দশকে চিনে গড়ে ওঠে প্রায় ১৮০টির মতো ছোটো-বড়ো স্টুডিও। এই স্টুডিওগুলোর ঝোঁক ছিলো জনপ্রিয় ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে। তবে সবাই একই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করায় এসব স্টুডিওকে বড়ো ধরনের প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়। এই প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক নির্মাতা বাজার থেকে ছিটকে পড়ে। আবার অনেক স্টুডিওকে পড়তে হয় লোকসানের মুখে।

খ. চলচ্চিত্রের পরিবর্তন, জেনারেশন থেকে জেনারেশন

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র বিকাশ লাভ করেছে প্রযুক্তিগত নানা উন্নয়নের মধ্য দিয়ে অথবা বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে, কোনো ব্যক্তির হাত ধরে। কিন্তু চিনের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। এখানে চলচ্চিত্রের বিকাশ হয়েছে কয়েকটি প্রজন্মের চলচ্চিত্রনির্মাতাদের হাত ধরে। এই কারণে চিনের চলচ্চিত্র ও পরিচালকদেরকে প্রজন্ম অনুসারে ভাগ করার প্রবণতা দেখা যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের চলচ্চিত্রশৈলীতে, ক্যামেরার ব্যবহার ও চলচ্চিত্রের কাহিনীতে রয়েছে বেশ পার্থক্য। সেই অনুসারে শুরু থেকে আজ অবধি চিনের চলচ্চিত্রকে মোট ছয়টি প্রজন্মে ভাগ করা হয়।

২০ শতকের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৯০৫ থেকে ১৯৩২ পর্যন্ত সময়টি ছিলো প্রথম প্রজন্মের চলচ্চিত্র। এই প্রজন্মের পরিচালকদের চলচ্চিত্র নির্মাণে শৈল্পিক দক্ষতা ও প্রকাশের অভিজ্ঞতা না থাকায়,এসব চলচ্চিত্রের মান খুব একটা ভালো ছিলো না। এ সময়ের পরিচালকেরা অপেরা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হওয়ায়, তারা মূলত একটি নির্দিষ্ট তলে ক্যামেরা বসিয়ে অপেরার দৃশ্যধারণ করতো। এতে গুরুত্ব পেতো অপেরার মূল চরিত্র ও কাঠামো।

এ প্রজন্মে অর্থাৎ ১৯১১ সালে ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বে চিনে সংঘটিত হয় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এর মাধ্যমে চিনের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। ক্ষমতাসীন কুয়ো মিং তাং সরকার সেসময় চলচ্চিত্রে গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা প্রকাশে উৎসাহিত করতো, বিপরীতে সামন্ততন্ত্রের পক্ষে কিছু প্রকাশ করতে দিতো না। ফলে এই সময়ের অনেক পরিচালককে চলচ্চিত্রে কমবেশি গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও সামন্ততন্ত্র বিরোধিতা করতে দেখা যায়। এই সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হলো লেবারারস্‌ লাভ (১৯২২),হোয়াইট স্নেক (১৯২৭),দ্য বার্নিং অব রেড লোটাস টেম্পল (১৯২৮)।

বিশ্ব-চলচ্চিত্র নির্বাক থেকে সবাক যুগে প্রবেশের সময়ে চিনও সবাক যুগে প্রবেশ করে। এই সময়ে (১৯৩০ থেকে ১৯৪০ দশক) দেখা যায় চিনের দ্বিতীয় প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের। প্রথম প্রজন্মের বিনোদন-চলচ্চিত্রের জায়গায় এ প্রজন্মে দেখা যায় সমাজের বিভিন্ন বাস্তব অবস্থার প্রতিচ্ছবি; সঙ্গে ফুটে উঠতে থাকে সমাজের নানা শৈল্পিক দিক। এ সময়ের চলচ্চিত্রেই প্রথম প্রকাশ পায় জাতীয়তাবাদ ও আধুনিকতাবাদ। চলচ্চিত্রে গুরুত্ব পেতে থাকে দেশের সামাজিক অবক্ষয়, একই সঙ্গে উন্নয়নের চেষ্টাও। এই প্রজন্মের কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো য়ু ইব্যাং (Wu Yibggang )এর গডেস, জিয়া ইয়ান (Zia Yan) এর স্প্রিং সিক্রোম, ফেই মু (Fei Mu) এর আরবান নাইট, সান য়ু (Sun Yu) এর ব্রুক রোড, ঝু শিলিন (Zhu Shilin) এর মেলোডি অব দ্য লাভিং মাদার

১৯৫০-এর দশকে গণতান্ত্রিক চিন প্রতিষ্ঠা থেকে সাংস্কৃতিক বিপ্লব পর্যন্ত সময়কে বলা হয় তৃতীয় প্রজন্মের চলচ্চিত্রের কাল। এই প্রজন্মের পরিচালকদের তিন ভাগে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে দেখা যায়। প্রথম পর্যায়টি ছিলো ১৯৪৯ সালের গণতান্ত্রিক চিনের গঠন থেকে ১৯৬৫র সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আগ পর্যন্ত। এ সময় উল্লেখযোগ্য কিছু চলচ্চিত্র হলো চেং য়িন (Cheng YIN) এর ফাইট অ্যাক্রোস দ্য কান্ট্রি, শুই হুয়া (Shui Hua) এর হায়ার্ড গার্ল, চুই য়েই (Cui Wei) এর সঙ অব। সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরুর কাল থেকে ১০ বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত ছিলো দ্বিতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্র নির্মাণ। এ সময়ে পাইওনিয়র ওয়ার্ক, ম্যারিটাইম গ্লো,স্পার্কলিঙ রেড স্টার ছাড়া তেমন কোনো ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। এমনকি ফিচারধর্মী চলচ্চিত্র ছিলো একেবারে শূন্যের কোঠায়। আর শেষপর্যায় হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরবর্তী সময়। এ সময় কিছু ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে তৃতীয় প্রজন্মের চলচ্চিত্রনির্মাতারা। এই প্রজন্মের অধিকাংশ চলচ্চিত্রের শৈলী ছিলো বর্ণনাত্মক। ঘটনার বর্ণনায় সচেতনভাবে রাখা হতো আদি-মধ্য-অন্ত পারম্পর্য। এছাড়া মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে তুলে ধরারও একটা প্রয়াস ছিলো এ প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের।

১৯৫০ সালে চিনে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ফিল্ম একাডেমি। প্রথমে এর নাম ছিলো পারফর্মেন্স আর্ট ইন্সটিটিউশন অব দ্য ফিল্ম ব্যুরো। প্রতিষ্ঠার ছয় বছরের মধ্যে এই একাডেমির নাম তিনবার পরিবর্তন করা হয়। প্রথমবার ১৯৫১-তে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ফিল্ম স্কুল অব দ্য ফিল্ম ব্যুরো। এরপর ১৯৫৩-তে নামকরণ করা হয় বেইজিং ফিল্ম স্কুল। এবং সর্বশেষ ১৯৫৬ সালে এর নাম রাখা হয় বেইজিং ফিল্ম একাডেমি। এই ফিল্ম একাডেমি থেকে ৬০-এর দশকে পাশ করে বের হওয়া কিছু তরুণ পরিচালকের হাত ধরে শুরু হয় চতুর্থ প্রজন্মের চলচ্চিত্র। এসব শিক্ষার্থী মূলত ১৯৭৭ পর্যন্ত তেমন কিছু করতে পারেননি। এর অবশ্য কারণও ছিলো। এ পুরো সময় ধরে চিনা চলচ্চিত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিলো মূলত চার চক্র(Gang of Four) অর্থাৎ ওয়াং হুং-ওয়েন, চাংচুন-চিয়াও, চিয়াং চিং ও ইয়াও ওয়েন-ইউয়ান নামে চার ব্যক্তির হাতে। এই চার চক্রের নেতৃত্বেই মূলত সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয় এবং এরপর তারা তাদের চলচ্চিত্র ব্যতীত অন্যসব চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করে দেন।

১৯৭৭ সালের পর থেকে এই তরুণরা পরিচালক হিসেবে নিজেদেরকে প্রকাশ করতে শুরু করেন এবং চলচ্চিত্রের প্রয়োগ ও আঙ্গিকে নানা ধরনের নতুনত্ব ও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগাতে থাকেন। তারা অপেরাধর্মী চলচ্চিত্রকে পুরোপুরি বর্জন করেন। অপেরার কাঠামোকে ভেঙ্গে মানুষের জীবনের মৌলিক বিষয় ও বাস্তব অবস্থা চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতে থাকেন। একই সঙ্গে তারা চিনা চলচ্চিত্রের নানা ধরনের উন্নতি সাধনেও এগিয়ে আসেন। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য নির্মাতারা হলেন ট্যাং ওয়েজি (Tang Wejji), জি ফেই (Xie Fei), হুয়াং সুকিন (Huang Shuqin), হুয়াং জিয়াংঝং য়ু তাংমিং (Huang Jianghong Wu Tianming)। এদের মধ্যে অনেক নির্মাতারা আজও চিনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছেন।

ঝ্যাং য়িমৌ, চেন কাইগে, গুয়াং জিয়ানকিন, তিয়ান ঝুয়াং-ঝুয়াং প্রমুখের হাত ধরে শুরু হয় চিনের পঞ্চম প্রজন্মের চলচ্চিত্রযাত্রা। এরা ছিলেন বেইজিং ফিল্ম একাডেমি থেকে স্নাতক শেষ করা তরুণ। এরা মূলত ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এরা গতানুগতিক ধারার বাইরে বিতর্কিত নানা বিষয় ও কাহিনী, বৃত্তকার-উপবৃত্তকার-অধিবৃত্তকার বর্ণনারীতি, ক্যামেরা মুভমেন্ট ও কলাকৌশলের অবজেক্টিভ ব্যবহার করে নানা ধরনের নিরীক্ষা চালান। ফলে এতে একদিকে চলে সনাতনী সংস্কৃতি ও আধুনিক সংস্কারের মধ্যে সংঘাত; অন্যদিকে চলচ্চিত্রে শুরু হয় স্থান, কাল ও দেশজ অনুসন্ধান, যা চিনের সনাতনী সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নান্দনিকতা থেকে পুরোপুরি আলাদা। এ সময়ের নির্মাতারা চিনের চলচ্চিত্রকে এনে দিয়েছেন নানা আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এ সময়ের কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র দ্য বিগ প্যারাডি (১৯৮৬),দ্য ব্লু (১৯৮৯),কাইট ব্লাডি মর্নিং (১৯৯০) ইত্যাদি। তাই ৫০-এর দশক যেমন ইতালির নিও-রিয়ালিজম, ৬০-এর দশক ফ্রান্সের নুভেল ভাগ ও ৭০-এর দশক জার্মানের নতুন চলচ্চিত্র; তেমনি ৮০র দশক চিনের চলচ্চিত্রের বিশ্বজয়ের দশক।

৯০ দশকের দিকে এসে দেখা গেলো, চিনের পরিচালকরা খুব দ্রুত ও কম খরচে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। এই চলচ্চিত্রগুলোতে তারা একধরনের ডকুমেন্টারির আমেজ আনতে থাকেন। এ পরিচালকদের হাত ধরেই শুরু হয় চিনের ষষ্ঠ প্রজন্মের যাত্রা। এই প্রজন্মের পরিচালকরা স্ট্যান্ড ছাড়া হাতে ধরে ক্যামেরার ব্যবহার শুরু করেন, ডাবিংয়ের চেয়ে পারিপার্শ্বিক স্বাভাবিক শব্দগ্রহণ প্রাধান্য পেতে থাকে। এ ধারার চলচ্চিত্রের ধরনটা ছিলো কিছুটা ইতালির নিও-রিয়ালিজম, কিছুটা সিনেমা ভেরিতে-এর কাছাকাছি। চলচ্চিত্রগুলোতে ফুটে উঠতে থাকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও একধরনের অ্যান্টিরোমান্টিক দর্শন। এছাড়া অধিকাংশ চলচ্চিত্রে চিনের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশের বাজে দিকগুলোর প্রতিও আলোকপাত করা হতো। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ওয়াং জিয়াশুই (Wang Ziaoshuai), এর দ্য ডেইজ,বেইজিং বাইসাইকেল; ঝ্যাং উন (Zhang Yuan)এর বেইজিং বাস্টার্ড,ইস্ট প্যালেস ওয়েস্ট প্যালেস; লুউ য়ি (Lou Ye)এর সুজহো রিভার।উল্লেযোগ্য ডকুমেন্টারির মধ্যে আছে-য়ু ওয়েংগুয়াং (Wu wenguang)এর বামিং ইফ বেইজিং,দ্য লাস্ট ড্রিমার্স (১৯৯০); ওয়াং বিং (Wang Bing)এর তাই জি কিউ (Tie Xi Qu),ওয়েস্ট অব দ্য ট্র্যাকস (২০০৩)।

গ. অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের খোঁজ-খবর

চিনের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। সাংহাইয়ে ১৯১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র আউট অব দ্য ইন্‌কওয়েল প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। তবে ২০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসব অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র চিনে শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। মূলত ১৯২৬ সালে সু উ খোং, ওয়ান লাইমিং, ওয়ান গুচান ও ওয়ান চাওচান-চার ভাইয়ের হাত ধরে দ্য ক্যামেল'স ড্যান্স নামে অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে শুরু করে এ ধারা। এ সময় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের আধেয় হিসেবে চিনের স্থানীয় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

এরপর ৪০ ও ৫০ দশকে অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের যন্ত্রপাতি ও কলাকৌশলের উন্নতি হতে থাকে। ১৯৬০ সালে চিনে প্রথম ওয়াশ পেইন্টিং অ্যানিমেশন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়। ফলে সাংহাই অ্যানিমেশন ফিল্ম স্টুডিওগুলো পুরোদমে কার্টুনসহ বিভিন্ন ধরনের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র তৈরি শুরু করে। এ সময়ের অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রগুলো নানা আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পায়। উদাহরণ হিসেবে হোয়ার ইজ মমা-এর কথা বলা যায়, পাঁচটি আন্তর্জাতিক উৎসবে চলচ্চিত্রটি পুরস্কার পায়;আপরোর ইন হেভেন চলচ্চিত্রটি প্রায় ৪০টি দেশে প্রশংসিত হয়। এরই ধারাবাহিকতা আমরা দেখি ১৯৭৮-এর দিকে; নেঝা কংকার্স দ্য ড্রাগন কিঙ (১৯৭৯) চলচ্চিত্রটি কান উৎসবে ব্যাপক প্রশংসিত ও অভিনন্দিত হয়। এছাড়া থ্রি মংক্‌স্‌ (১৯৮০) নামে আরেকটি চলচ্চিত্র বিভিন্ন উৎসবে আটটি পুরস্কার পায়।

তবে ৯০ দশকের শেষদিকে চিনের বাজারে ঢুকতে থাকে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সব অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। এসব অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের আগমনে বাজার হারাতে থাকে চিনা অ্যানিমেশনগুলো। মূলত দীর্ঘদিন ধরে গতানুগতিক অ্যানিমেশনগুলো দেখে চিনা দর্শকরা হাঁপিয়ে উঠেছিলো, ঠিক এ সময় ঝকঝকে নতুন আঙ্গিকের অ্যানিমেশন নিয়ে আসে জাপান-যুক্তরাষ্ট্র। ফলে চিনের অ্যানিমেশন বাজার সঙ্কটের মধ্যে পড়ে। তবে বসে থাকেনি চিনা পরিচালকরা, তারা ওই সব চলচ্চিত্রের অনুসরণে পূর্ণ উদ্যোমে কাজ শুরু করে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে চিনা অ্যানিমেশনের সংখ্যা বেড়ে যায়। ২০১১ সালে চিনের বিভিন্ন টেলিভিশন তাদের নিজেদের নির্মিত প্রায় তিন হাজার তিনশ ৩৩ ঘণ্টা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রচার করে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন অবশ্য চিনে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের বাজার বাড়তে শুরু করেছে।

ঘ. মাও সেতুং ও চিনা চলচ্চিত্র

শত পুষ্প বিকশিত হোক, শত চিন্তাধারা প্রতিযোগিতা করুক মাও সেতুং-এর এই কথার প্রত্যক্ষ ও স্বতন্ত্র প্রভাব পড়ে চিনের চলচ্চিত্রে। ১৯৪৯ সালে চিনের তৎকালীন সরকার চিয়াং কাইসেক-এর কুয়ো মিং ট্যাং (Kuo Ming Tang) দলের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির গৃহযুদ্ধ হয়। মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির জয়লাভের পর তারা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এরপর মাও সেতুং প্রথম যে কাজটি করেন তাহলো কৃষি, শিল্প, প্রতিরক্ষা ও বিজ্ঞান চারটি বিষয়ে আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা নেন। এর বাইরে আরেকটি বিষয়ে তিনি মনোযোগ দেন, সেটি হলো চলচ্চিত্রের উন্নয়ন। প্রথম বছরেই তিনি চলচ্চিত্রকে জাতীয়করণ করেন। রুশ বিপ্লবের দুই বছরের মাথায় ১৯১৯ সালে লেনিনও চলচ্চিত্রকে জাতীয়করণ করেছিলেন।

মাও সেতুং শুধু চিনের চলচ্চিত্রকে জাতীয়করণ করেই থেমে থাকেননি। তিনি শিল্পীদের চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী করে তোলেন। ফলে কাজও হয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ বাড়তে থাকে। সেসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে;দ্য লাইফ অব য়ু শুনইনসাইড স্টোরি অব দ্য চিং-কোর্ট নামে নির্মিত দুটি চলচ্চিত্রে খুব ভালোভাবে বুর্জোয়া ভাবধারা লক্ষ করা যায়। বিষয়টি লক্ষ করেন মাও, তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে চলচ্চিত্রের সঠিক বুর্জোয়া ভাবধারা প্রকাশের দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত তা নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ রচনা করেন। তিনি শিল্প-সাহিত্যে, চলচ্চিত্রের কাহিনী, চরিত্র ও সংলাপে ছয়টি রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা ঠিক করে দেন। দিক-নির্দেশনায় বলা হয়, শিল্প-সাহিত্য ও চলচ্চিত্র হবে এমন যা-১. দেশের নানা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে (দ্বিধাবিভক্ত নয়), ২. সমাজতান্ত্রিক গঠনকর্মের সহায়ক হয় (বিরোধী নয়), ৩. জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বকে সবল করে (দুর্বল নয়), ৪. গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে দৃঢ় করে (শিথিল নয়),৫.কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকে সবল করে (দুর্বল নয়), ৬. আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক ঐক্য তথা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় জনতার সাম্যবাদী ঐক্যের অনুকূল হয় (প্রতিকূল নয়)। এ ছয়টি নির্দেশনা চিনের অর্থনৈতিক সংস্কার ও উদারনীতিকে সমর্থন করেছিলো। ফলে মাও-এর এই নির্দেশনায় কিছুটা বন্দিত্ব থাকলেও তা চিনা চলচ্চিত্রকারদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে।

শুধু দিক-নির্দেশনাই নয়, মাও সেসময় চলচ্চিত্রে প্রত্যক্ষ পরামর্শ ও সহায়তাও করেন; যা কমিউনিস্ট চিনের অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ প্রশস্ত করেছে। এর ফলস্বরূপ চিনা চলচ্চিত্রে একধরনের স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকতা দেখতে পাওয়া যায়। যেমন দ্য হোয়াইট-হেয়ারড গার্ল চলচ্চিত্রটি ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়। এছাড়াও ৮০০০ লি অব ক্লাউডস অ্যান্ড মুন (১৯৪৭) ও অপেরাভিত্তিক চলচ্চিত্র বিটিং কপার গঙ্‌স্‌ চলচ্চিত্রটি বাইরের অনেক দেশে সমাদৃত হয়েছিলো। তিনি কেবল চলচ্চিত্রকেই নয়, চিনের প্রাচীন-সমৃদ্ধ-জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম অপেরাকে আধুনিকীকরণ ও প্রয়োজনে তা সংশোধন করে নেওয়ার কথাও বলেছিলেন।

বাধা যখন সেন্সরশিপ

কোনো দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা, উন্নতি-অনুন্নতি, জনগণের দুর্বিষহ জীবন-যাপন সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ উপস্থাপন থাকে চলচ্চিত্রে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মুখোমুখি হয়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চলচ্চিত্রকে পড়তে হয়েছে নানা সমস্যায়। রাষ্ট্র কখনো কখনো নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও করেছে চলচ্চিত্রকে। চিনও এর ব্যতিক্রম নয়; ৩০-এর দশকে সান ইয়াৎ সেন-এর কুয়ো মিং ট্যাং সরকার ক্যান্টোনিজ ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ ও ধর্মীয় সংস্কারকে উদ্বুদ্ধ করে-এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে চিনে প্রথমবারের মতো সেন্সরশিপ প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে তারা চলচ্চিত্রের নৈতিক ও আদর্শিক বক্তব্য কী হবে তার ওপরও নজরদারি শুরু করে।

৫০-এর দশকে গণপ্রজাতান্ত্রিক চিন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে আবারো নেমে আসে নানা ধরনের বাধা। সরকারের বিপক্ষে কোনোকিছু প্রকাশকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ শুরু করে তখনকার সরকার। এ সময় স্টেট অ্যাডমিনস্ট্রেশন অব রেডিও, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন (State Administration of Radio, Film & Television-SARFT)প্রতিষ্ঠানটি চিনের সেন্সরশিপে মূল দায়িত্ব পালন করে। প্রতিষ্ঠানটি চিনের চলচ্চিত্রে কোনো ধরনের বাহ্যিক যৌনতা, সহিংসতা,অশ্লীলতা, জুয়াখেলা ও সমাজতান্ত্রিক দলের কোনো সমালোচনা ইত্যাদি চলচ্চিত্র ও টিভিতে প্রদর্শন বন্ধ রাখে। এমনকি কোনোভাবে তা যদি প্রদর্শনও হতো, তাহলে সেই চলচ্চিত্র বা অনুষ্ঠানটির অনুমোদন নিষিদ্ধ করে দেওয়া হতো। এছাড়া নানা ধরনের অপ্রচলিত নিয়মের কারণেও বাদ দেওয়া হতো ছবির নানা দৃশ্য।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, অ্যাকশনধর্মী একটি চলচ্চিত্রে সুইমিংপুলে ইলেকট্রিক ইল মাছের কামড়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু দেখানো হয়। এ ঘটনায় চিনা পুলিশের সম্মান নষ্ট হবে বলে, চলচ্চিত্রটির অনুমোদন দেয়নি সরকার। দেশের মানুষদের কোনো দুর্বিষহ জীবন-যাপন, অতি আধুনিক সমাজ-ঘেঁষা কোনো বিষয়, অনুন্নত অবস্থা, দুর্নীতি, ভূমি-দখল, পরিবেশ নষ্ট করে-এমন বিষয় যা বহির্বিশ্বের কাছে চিনের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে তা সেসময় সেন্সর করা হয়। ৯০ দশকের শেষদিকে সেন্সর কর্তৃপক্ষ কেবল সমাজতান্ত্রিক আদর্শে চলচ্চিত্র নির্মাণের নির্দেশ দিলে চলচ্চিত্র নির্মাণ কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এর বাইরে কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেই তা নিষিদ্ধ করা হতো। তবে নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আগ্রহ থাকায় অনুমোদন না পাওয়া এসব চলচ্চিত্র নানাভাবে বিশেষ করে চোরাইভাবে বাজারে প্রবেশ করে। অনুমোদন না পাওয়া এসব চলচ্চিত্রের চাহিদাও বেশ বাড়তে থাকে।

এছাড়া সারা বিশ্বে সেন্সরের ক্ষেত্রে যে রেটিং পদ্ধতি চালু আছে, চিনে কিন্তু তা নেই। ফলে নির্মাতারা সব বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে সাহস করে না, আর কেউ করলেও তাকে কাটা পড়তে হয় সেন্সরের কাঁচিতে। তবে সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনের নিজস্ব চলচ্চিত্রের বাজার বৃদ্ধি পাওয়ায় রেটিং পদ্ধতি চালু করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক প্রভাব

চিন শুধু সেন্সরশিপ দিয়েই নয়, প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক প্রভাবও বিস্তার করেছে চলচ্চিত্রে। রাষ্ট্র সবসময় চলচ্চিত্রকে নিজেদের মত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখেছে। এমনকি চিনা সরকার দেশিয় চলচ্চিত্র উৎপাদন, আমদানি, স্ক্রিপ্ট নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন, টেলিভিশনে কতোটুকু অনুষ্ঠানের জন্য, কতোটুকু খবরের জন্য সময় পাবে তাও নির্ধারণ করে দেয়। আগেই বলেছি, এসব কিছুর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ৫০-এর দশক থেকে।

পরবর্তী সময়ে ৬০ ও ৭০ দশকের মাঝামাঝি সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব নামে পরিচিত চার চক্র মিলে প্রতিবিপ্লব গড়ে তোলে। এতে রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিল্পসাহিত্যে মাও সেতুং-এর সঙ্গে চার চক্রের প্রতিবিপ্লবী নীতির রাজনৈতিক ও আর্দশগত পার্থক্য দেখা দেয়। তবে চার চক্রের নেতৃত্বে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব নামে যা হয়, তা মূলত চিনের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক দিক বয়ে আনেনি। এ সময় চার চক্রের অধীনে সব চলচ্চিত্র নির্মাণ হতো। শুধু এই নয়, তারা চলচ্চিত্র নির্মাণেও একটি ফর্মুলা আবিষ্কার করেন, যার নাম দেওয়া হয় তিন গুরুত্ব। চলচ্চিত্রে ক্যামেরা কোথায় বসবে, না বসবে তাও তারাই নির্ধারণ করে দিতো। তারা এসব নীতি অনুসারে নিজেরাই কাউন্টার অ্যাটাক (১৯৭৬) নামে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। চার চক্র এতোই ক্ষমতাধর ছিলো যে, ১৯৬৬-৭২ সাল পর্যন্ত সরকারিভাবে সব চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করে দেয়। যার ফলে তাদের সমর্থক ছাড়া অন্য চলচ্চিত্রকর্মীরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। এরা শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করেই থেমে থাকেনি, বহু প্রাচীন পিকিং চলচ্চিত্র ইন্সটিটিউটও বন্ধ করে দেয়।

এরপর ১৯৭৫ সালের দিকে চাং চুন ফিল্ম স্টুডিও শ্রমিক-শ্রেণির কৃতিত্ব নিয়ে পাইয়োনিয়ারস নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। এই চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে চার চক্রের বিরুদ্ধে একটি সক্রিয় সংগ্রাম গড়ে ওঠে। এই চলচ্চিত্রটি ছিলো মূলত বুর্জোয়া ও সর্বহারার সঙ্গে বিপ্লবী চিন্তাধারার সংগ্রাম। তবে চার চক্র থেমে থাকেনি; তারা চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করে এবং এর ফিল্ম নষ্ট করারও চেষ্টা করে। অবশেষে ১৯৭৬ সালে প্রতিবিপ্লবী চার চক্রের পতন ঘটে, এরপর থেকে তাদের বিভিন্ন অপরাধ জনগণের সামনে উঠে আসতে থাকে। এতে জনগণ খেপে যায় এবং চার চক্রের নিষিদ্ধ করা নানা চলচ্চিত্র দেখতে চায়। এতে করে পাইয়োনিয়ারসসহ নিষিদ্ধ হওয়া আর্লি স্প্রিং,রেভলুশনারি ফ্যামিলি, নর্মান বেথুন,দ্য ওপিয়াম ওয়র,নিয়ে এরে,দ্য রিইউনিয়ন অব লিউ অ্যান্ড চাও চলচ্চিত্রগুলো মুক্তি পেতে শুরু করে। এরপর ৮০র দশকের মাঝামাঝি সরকার দেশটির অর্থনীতি ও সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিলে এরও সার্থক ও সৃজনশীল প্রভাব পড়ে চলচ্চিত্রে। এছাড়াও চার চক্রের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া পিকিং ফিল্ম ইন্সটিটিউট এবং বেইজিং ফিল্ম অ্যাকাডেমি খুলে দেওয়া হয়।

চিনা চলচ্চিত্রে হলিউড রাজত্ব

ক. হলিউড চলচ্চিত্র প্রবেশের কারণ

অ্যাকশন কিংবা কুংফু-ক্যারাতেধর্মী চলচ্চিত্র হিসেবে চিনের কোনো তুলনা হয় না; আর তাতে যদি থাকে জ্যাকি চ্যান কিংবা জেট লির মতো অভিনেতারা। এ চলচ্চিত্রগুলো শুরু থেকেই তুমুল সাড়া ফেলে দর্শকদের মধ্যে। তবে গত দুই দশকে ব্যবসায় বিশ্ব রেকর্ড করে আসা চিনের এসব চলচ্চিত্রে ইদানীং ভাটা পড়তে শুরু করেছে। কারণ চিন যখন মার্শাল আর্টসধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে, ঠিক তখন হলিউডসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে চলে রোমান্টিক ও কমেডিধর্মী চলচ্চিত্রের জমজমাট ব্যবসা। শত বাধার মধ্যেও চিনের দর্শকরা এ থেকে চোখ ফেরাতে পারেনি। তারা রোমান্টিক ও কমেডিধর্মী এসব চলচ্চিত্রে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে যেটা হয়, চিনের চলচ্চিত্রনির্মাতারাও দর্শকদের চাহিদা মতো এসব চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা শুরু করে। তবে দুঃখজনক হলো, তাদের নির্মিত রোমান্টিক ও কমেডিধর্মী এসব চলচ্চিত্র অভ্যন্তরীণ বাজার ও বহির্বিশ্বের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেনি। ফলে এতে চিন তার নিজস্ব চলচ্চিত্রের বাজার অনেকখানি হারিয়ে ফেলে, সেই সুযোগে জায়গা করে নেয় হলিউডসহ অন্য দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। অবশ্য এই সুযোগেই ছিলো হলিউড। কারণ চিন বর্তমানে জাপানকে হটিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চলচ্চিত্র-বাজারে পরিণত হয়েছে। হলিউডের পরেই তার স্থান। ফলে চিনের ক্রমবর্ধমান চলচ্চিত্রের বাজার ধরতে হলিউড থেকেছে সদা ব্যস্ত।

এছাড়াও ৯০ দশকের দিকে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশের ফলে চিনের চলচ্চিত্রবাজার বহির্বিশ্বের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। আর এই উন্মুক্ত বাজারে হলিউডসহ বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র অধিক হারে প্রবেশ করতে থাকে। চিন সম্প্রতি বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে ১৪টি থেকে ২০টিতে। ২০১২ সাল শেষে দেখা গেছে, দেশটিতে সর্বোচ্চ আয় করা ১০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে সাতটিই বিদেশি চলচ্চিত্র। এমনকি সারা বছর নতুন-পুরাতন মিলিয়ে যতো চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ চিনের নিজস্ব চলচ্চিত্র, আর বাকিগুলো হলিউড কিংবা বিদেশি অন্যান্য চলচ্চিত্র।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, হলিউড ফ্যান্টাসিভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে এখন নাকি সচেতনভাবে চিনাদের প্রতি একধরনের বন্ধুত্বসুলভ মনোভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। এমনকি চিনা সংস্কৃতিকে হেয় করে বা চিনা সেন্সর বহির্ভূত, যেমন-ঘনিষ্ঠ ও উত্তেজক দৃশ্য, দেখানো থেকে বিরত থাকছে হলিউড। হাজার হলেও একশ ৩৮ কোটি মানুষের দেশ বলে কথা।

খ. চলচ্চিত্রের আয়

হলিউড, বলিউড কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সুপারহিট চলচ্চিত্রগুলোর এক লোভনীয় বাজার হয়ে উঠেছে চিন। ২০১২ সালে চিনের চলচ্চিত্র-বাজারের মোট আয় এক হাজার ছয়শ ৮০ বিলিয়ন ইয়েন (২৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এই বাজার ক্রমে বেড়েই চলছে। খবরটি অন্যদের জন্য ইতিবাচক হলেও, তা চিনের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের খুব ভাবাচ্ছে। কারণ, এই আয়ের বেশিরভাগেই চলে যাচ্ছে বিদেশে, বিশেষ করে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে। অর্থাৎ বক্স অফিস চিনের হলেও একচেটিয়া শাসন করছে হলিউড। ২০১২ সালে চিনের চলচ্চিত্র-বাজারের যে আয় হয়, তার অর্ধেকের বেশি তুলে নিয়েছে বিদেশি চলচ্চিত্রগুলো। অথচ বিদেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে মাত্র ৩৪টি, বিপরীতে চিনের নিজস্ব চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে ৮৯৩টি। গত কয়েক বছরে চিনের নিজস্ব চলচ্চিত্রের আয় লক্ষণীয়ভাবে কমতে শুরু করে। ২০১০ সালে চিনের নিজস্ব চলচ্চিত্রের আয়ের পরিমাণ ছিলো মোট আয়ের শতকরা ৫৬ শতাংশ, ২০১১ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৫৪ শতাংশে এবং ২০১২ সালে তা ছিলো ৫০ শতাংশেরও নিচে।

এবার আসা যাক, গত কয়েক বছরে চিনের বাজারে সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্রের কথায়। চিনে সবচেয়ে বেশি আয় করা হলিউডের চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে-অ্যাভাতার,অ্যাভেঞ্জার্স,মিশন ইম্পসিবল : ঘোস্ট প্রোটকলটাইটানিক থ্রিডি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আয় করেছে গোল্ডেন গ্লোব জয়ী অ্যাভাতার। চলচ্চিত্রটি মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যে শুধু চিনের বাজারের আয় করেছে ৫৪০ মিলিয়ন ইয়েন বা ৮০ মিলিয়ন ডলার। যা চিনের চলচ্চিত্র-বাজারে সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড।

শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, চিনে চলচ্চিত্রের টিকিট বিক্রিতেও রয়েছে হলিউডের আধিপত্য। কারণ টিকিট বিক্রির আয়ের মোট ৫১.৫ শতাংশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি বিশেষ করে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলো।১০ এছাড়াও চিনে টিকিটের মূল্যও একটু বেশি, প্রতিটি টিকেট প্রায় ১৩ মার্কিন ডলার। তবে দেশটির ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত-শ্রেণি কিন্তু এই দামে টিকেট কিনতেও সক্ষম। যে কারণে বিদেশি চলচ্চিত্রনির্মাতাদের কাছে চিনের প্রেক্ষাগৃহগুলো লোভনীয় বাজারে পরিণত হয়েছে।

চলচ্চিত্রে বলিউডের দাপট

বর্তমান বিশ্ব-অর্থনীতিতে একধরনের আধিপত্য করছে চিন। অর্থনীতির মেরুকরণে কখনো কখনো চিন, ভারতের ওপর আবার ভারত চিনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। চিনের সস্তা শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া অপেক্ষাকৃত কম দামের পণ্যের বিপরীতে, ভারত দাঁড়ায় তার বলিউড নিয়ে। এক্ষেত্রে ভারত অবশ্য চিনের থেকে একটু এগিয়ে। বলিউডের অনেক চলচ্চিত্রের এখন লাভজনক বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে চিন। তবে চিনে ভারতিয় চলচ্চিত্রের এই দাপট মোটেই নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত শতাব্দীর ৭০-৮০ দশকে বলিউডের রাজ কাপুরসহ অনেকের চলচ্চিত্র চিনে বেশ ব্যবসা করে। কিন্তু তিব্বতের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে যুদ্ধ ও নানা কারণে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির ফলে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এ পথের প্রশস্ততা কমিয়ে দেয়।

২০০৯ সালে ভারত-চিন যৌথ উদ্যোগে চাদনি চক টু চায়না চলচ্চিত্রটি নির্মাণ হয় এবং দ্য মিথ চলচ্চিত্রে জ্যাকি চ্যান এবং বলিউডের মল্লিকা শেরাওয়াতের সঙ্গে অভিনয় করায়,আবারো চিনা চলচ্চিত্র-বাজারে বলিউডের প্রবেশের সুযোগ বেড়ে যায়। একই বছর (২০০৯) আমির খানের থ্রি ইডিয়টস্‌ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে চিনের চলচ্চিত্র-বাজারে তা তিন মিলিয়ন ডলার আয় করে।১১ বলিউডের কোনো চলচ্চিত্র বিদেশের মাটিতে এর আগে এতো সফলতা দেখাতে পারেনি। দেশের বাইরে থ্রি ইডিয়টস্‌ আয় করেছিলো মোট ১২১ কোটি রূপি, যার অর্ধেকের বেশি চিনের বাজার থেকে। শুধু থ্রি ইডিয়টসই নয়, শাহরুখ খানের মাই নেম ইজ খান ও চোপড়ার ফেরারি কি সওয়ারি চলচ্চিত্রগুলোও বেশ ব্যবসা ও প্রশংসা কুড়িয়েছে চিনের চলচ্চিত্র-বাজারে।

বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিত ও চিনা চলচ্চিত্রের নিজস্ব বাজার

চলতি দশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশে পরিণত হয়েছে চিন। শুধু তাই নয়, চিন দেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বৃদ্ধি করছে সমান গতিতে। এক হিসাবে দেখা যায়, ২০০২ সালে চিনের জিডিপি ছিলো ১২ ট্রিলিয়ন ইয়েন (১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার), যা কয়েকগুণ বেড়ে এক দশক পরে ২০১২ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৭.২ ট্রিলিয়ন ইয়েনে (৭.৬ ট্রিলিয়ন ডলার)।১২ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে সম্প্রতি চিনের সাফল্য ঈর্ষণীয়। আর এই সাফল্যে পিছিয়ে নেই দেশটির চলচ্চিত্র বাজারও।

আগেই বলেছি, বৈশ্বিক চলচ্চিত্র-বাজারে চিনের অবস্থান আজ দ্বিতীয়। যদিও সরকার চলচ্চিত্রকে সবসময় সেন্সরশিপের নানা বেড়াজালে আটকে রাখতে চেয়েছে। এই বেড়াজালের মধ্যে থেকেও নির্মাতারা দর্শকদের জন্য নানাধরনের সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করে চলেছে। যার ফলও অল্পবিস্তর পেতে শুরু করেছে চিনা চলচ্চিত্রবাজার। আর এর প্রমাণ পাওয়া যায় মিডিয়া-মোঘল রুপার্ড মার্ডকের কথায়,চীনা চলচ্চিত্র বাজারের তো তুলনাই হয় না। ...চীনের চেয়ে আর বড় বাজার হতে পারে না। ২০০৫ সালে যেখানে এর রাজস্ব আয় ছিলো ১৫ কোটি ডলার, ২০১০ সালে তা দাঁড়িয়েছে পুরো ১৫০ কোটি ডলারে। এতো কড়াকড়ি, চাপের মধ্যে থেকেও এ ধরনের উত্থান বিস্ময়কর, তার সরকারি সেন্সর না থাকলে তা কোথায় যেত সে-ই প্রশ্ন।১৩

তবে মোটা দাগে কথা হলো, এতো কিছুর পরও চিন নিজেদের চলচ্চিত্রকে হলিউড, বলিউড কিংবা ইরানের মতো সারা বিশ্বে পৌঁছাতে পারছে না। একদিকে নিজেদের চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপ, অন্যদিকে চিনা চলচ্চিত্রের অনেক বিষয়বস্তু আজও বহির্বিশ্বের কাছে ঠিক বোধগম্য হয়ে উঠছে না। মূলত ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে চিনা চলচ্চিত্রের বহু উপাদান পশ্চিমা দর্শকদের কাছে দুর্বোধ্যই থেকে যাচ্ছে। তবে আশার কথা, বহির্বিশ্বের এই লাভজনক বাজার দেখে চিনা সরকারের টনক নড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি তারা চলচ্চিত্র-শিল্পের প্রসারে, উন্নয়নে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রের ওপর আরোপ করা সেন্সরশিপসহ নানা বিধি-নিষেধ কিছুটা শিথিল করেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনে বিশ্বমানের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব চলচ্চিত্রকে এক নতুন দিগন্তে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চিন। ইতোমধ্যে নতুন স্টুডিও প্রতিষ্ঠা, চলচ্চিত্রের সরঞ্জাম ক্রয় ও নতুন প্রযুক্তি আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থও বরাদ্দ করা হয়েছে।

তবে এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মতৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। চলচ্চিত্রের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে নিজেদের চলচ্চিত্রবাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা শুরু করছে চিন। বক্স অফিসে বিদেশি চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে জায়গা দখলের চেষ্টা করছে নিজেদের চলচ্চিত্র। তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া গেছে ২০১২ সালের শেষের দিকে; পুরো বছর হলিউড-বলিউডের চলচ্চিত্র ব্যবসা করলেও বছরের শেষে বক্স অফিসকে কিছুটা আয়ত্তে নেয় দেশিয় চলচ্চিত্র লস্ট ইন থাইল্যান্ড। স্বল্প বাজেটের এ চলচ্চিত্রটি বছর শেষে আয় করে ৯৮.৯ কোটি ইয়েন১৪। যা ওই বছরে বিদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি আয় করা টাইটানিক থ্রিডি চলচ্চিত্রকেও ছাড়িয়ে যায় এবং এটি চিনা চলচ্চিত্র-বাজারে বছরের সর্বাধিক আয় করা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পায়। এছাড়াও গত বছর (২০১২)পেইন্টেড স্কিন : দ্য রেজারেকশনচাইনিজ পোডিয়াক ১২ নামে আরো দুটো চিনা চলচ্চিত্র বক্স অফিসে হিট করে।

চলতি বছরের (২০১৩) প্রথম মাসের একটি হিসাব দিয়ে আলোচনা শেষ করতে চাই। চিনা কমেডি চলচ্চিত্র জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট : কনকোয়ারিং দ্য ডিমনস জানুয়ারিতে আয় করেছে ১০০ কোটি ইয়েন (এক হাজার ২৬৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা)১৫। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্রটি ক্লাইড অ্যাটলাস, দ্য হবিটজ্যাক রিচার্ড-এর মতো হলিউডি চলচ্চিত্রের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে বক্স অফিস থেকে অর্থ তুলে নেয়। চিনা চলচ্চিত্র এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুনভাবে উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ৬৬তম কান উৎসবে তিন বছর পর অংশ নিয়ে Jia Zhangke পরিচালিত চিনা চলচ্চিত্র এ টাচ্‌ অব সিন শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার জিতে নিয়েছে। তাই এ কথা মনে হয় বলাই যায়, অল্প সময়ের মধ্যে চিনা চলচ্চিত্র হয়তো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে হলিউড-বলিউডসহ নানা দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাবে।

 

লেখক : আশফাক দোয়েল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী

ashfaquldoyel@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৫:২৯৩); চীনা চলচ্চিত্রের রূপরেখা; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

২. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৫:২৯৪)।

৩. চীনা চলচ্চিত্র বাজার রাজত্ব হলিউডের; বণিক বার্তা, ১ এপ্রিল ২০১৩।

৪. http://rusbanglanews.ru/latest-news/4328/

৫. http://rusbanglanews.ru/latest-news/4328/

৬. প্রাগুক্ত; বণিক বার্তা, ১ এপ্রিল ২০১৩।

৭.চলচ্চিত্রেও আধিপত্য বাড়ছে চীনের; কালের কণ্ঠ, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।

৮. প্রাগুক্ত; বণিক বার্তা, ১ এপ্রিল ২০১৩।

৯. www.dw.de/a-5181105

১০. প্রাগুক্ত; কালের কণ্ঠ, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।

১১. http://en.wikipedia.org/wiki/Three_Idiots

১২. এক দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শক্তি চীন; কালের কণ্ঠ,১১ নভেম্বর ২০১২।

১৩. প্রশংসা না সমালোচনা; কালের কণ্ঠ, ১৬ জুন ২০১২।

১৪. প্রাগুক্ত; বণিক বার্তা, ১ এপ্রিল ২০১৩।

১৫. www.binodon69.com/১০০-কোটি-ইয়েনের-বাজিমাত/

 বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।  

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন