সেলিম আহমেদ
প্রকাশিত ১২ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ধান ভানতে শিবের গীত
টেলিভিশন একটি না-চলচ্চিত্র
সেলিম আহমেদ

৪৭-উত্তর সময়ে রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্বের আবরণে ভারত ও পাকিস্তান-এই দুটি দেশ পৃথিবীতে কোন্ পরিচয়ে পরিচিত হবে তা কিন্তু ললাটের লিখন না;আমাদের পূর্বপুরুষরা পালাক্রমে দুটি বোমা লালন করে আসছিলো-প্রথমটি হিন্দু (সনাতন বৈদিক ধর্ম) আর দ্বিতীয়টি ইসলাম। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে আবার ইসলামি বোমায় মানুষকে বোকা বানানোর প্রচেষ্টা ছিলো,কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামি ১৯৭১-এ কোনো কাজে আসে নাই। ধর্ম ব্যবসায়ীদের সুবিধার ডিম কিন্তু থেকে যায়, সেই ডিম বড়ো হয় পরবর্তী সময়ে রাজনীতির অঙ্গনে।
স্বাধীনতা-উত্তর ৮০ দশক,সেসময়ের কথা বলছি। সামরিক শাসনে বাংলাদেশ,ধর্ম-রাজনীতির ইসলামি বোমার আঘাতে তখন একুশে ফেব্রুয়ারির শোভাযাত্রার সড়কে আলপনা আঁকা নিষিদ্ধ। আমি তখন ঢাকা আর্ট ইন্সটিটিউট-এর ছাত্র;নিবাস কক্ষ-১২,শহীদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাস,নিউমার্কেট,ঢাকা। এই ১২ নম্বর কক্ষের আছে অনেক লম্বা গল্প,একসময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের কারিগরদের এক মিলনস্থল ছিলো এই কক্ষ।আর্ট ইন্সটিটিউট-এর নিয়ম অনুযায়ী যদিও থাকবার কথা চারজনের বা সিট বরাদ্দ চারজনের,কিন্তু আমরা সংখ্যায় অনেক,ওয়াকিলুর রহমান (জার্মান প্রবাসী চিত্রশিল্পী),সাইদুল হক জুইস (ছাপচিত্রশিল্পী),হাবিবুর রহমান (ভারত প্রবাসী চিত্রশিল্পী),আজাদ (বাটা সু কোম্পানির কর্মকর্তা),আজিজ (চিন থেকে উচ্চতর পড়াশোনার পর দেশে অবস্থানরত শিল্পী),আলী মোরশেদ নোটন (ক্যাটস্ আই-এর ডিজাইনার),আজিজ আহমেদ রুমি (শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) ও আমি। এছাড়া প্রায় নিয়মিত এই ঠিকানা ব্যবহার করতেন ঢালী আল মামুন (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র ছিলেন তখন) এবং প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ। আমি ফেব্রুয়ারিতে সরকারি নিষেধ অমান্য করে অবাধ্য শিল্পীদের সঙ্গে আলপনা আঁকতে আরম্ভ করলাম, আর এটাই ছিলো আমার জীবনের প্রথম সরকারি নিয়ম ভাঙা। আলপনা হিন্দু সংস্কৃতি-এই ছিলো সরকারি দোহাই,সুবিধাবাদী ধর্মীয় ব্যাখ্যা।
৮০’র দশক খুব গুরুত্বের সময়,বিশেষত চলচ্চিত্রের জন্য। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদের জন্ম,আর এই সংসদের মাধ্যমেই এ ভূ-খণ্ডে চলচ্চিত্রান্দোলনের শুরু। রাজনীতি, সময় আর সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগের কারণে সময়টাকে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ এবং ১৯৭১ থেকে ১৯৮০-দুই ভাগে ভাগ করা যায়। স্বাধীনতার আগের সময়ের পুরোটাই শেষ হয়েছিলো শুধু চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য বোঝাতে বোঝাতেই। স্বাধীনতার পর ৮০ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলনের বিকাশ ও বিস্তৃতির সময়;ততোদিনে জনসাধারণের ভিতর সুস্থ চলচ্চিত্র দেখবার আগ্রহ তৈরি হয়ে গেছে,সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যাও বেড়েছে।
১৯৭৯ সাল। মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর যৌথভাবে চলচ্চিত্রায়িত সূর্যদীঘল বাড়ী। সাদা-কালোয় খুবই কম বাজেট,মাত্র সাত লক্ষ সাত হাজার টাকায় নির্মিত এ চলচ্চিত্র। স্বাধীনতা-উত্তর একমাত্র শিল্পোত্তীর্ণ চলচ্চিত্র ৮০ সাল পর্যন্ত।
১৯৮০ সালে দুইটি ঘটনা খুব পরিষ্কার হয়ে গেলো। প্রথমত,এদেশে চলচ্চিত্রনির্মাতারাই তখন পরিবেশক,সুতরাং মুনাফার লোভে চলচ্চিত্র মানেই অশ্লীল আর কুরুচিপূর্ণ মাধ্যম-তা প্রমাণিত। পুঁজি বিনিয়োগকারীরা হয়ে উঠলো চরম মুনাফাখোর সুতরাং একদিকে অশ্লীল আর নকল চলচ্চিত্র,অন্যদিকে এই শিল্প মানেই অবাধ যৌনাচারের অভয়াশ্রম। দ্বিতীয়ত,সামরিকজান্তা চলচ্চিত্র সংসদগুলোকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য জারজ আমলাদের নিয়ে তৈরি করলো ‘চলচ্চিত্র সংসদ রেজিষ্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৮০’।
৮০’র দশকের এই সঙ্কট কাটাতে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর চলে গেছে। আর্ট কলেজের ছাত্র,তাই সহজেই পরিচয় হয়েছিলো চলচ্চিত্র-আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে। তিনি আজও ভীষণ স্নেহ করেন আর কথা বলবার সময় মনে করেন,আমি নেহাৎ শৈশব শেষ করেছি। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে তৈরি হয়েছিলো জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ;সেই আর্কাইভে কিউরেটর চেয়ারে এক আমলাকে এনে বসিয়েছিলো সরকার। সেই আমলা সীমাহীন অজ্ঞতা নিয়ে বসেছিলেন ওই সরকারি মসনদে;সুতরাং সব প্রদীপ একেবারে নিভে গেলো। সুস্থ চলচ্চিত্র নির্বাসিত হলো,আর জয়ী হলো নির্মাতা,পরিবেশক আর মুক্তিদাতা-ত্রিশুল চরিত্রের অশুরেরা।
চলচ্চিত্রের গল্প আর আলোচনা দূরে সরে যেতে থাকে। একটা পরিচিত জায়গা ছিলো-হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরির পাশে মেথরপট্টিতে নন্দের বাংলা মদের দোকান, সেখানে মাঝে মধ্যে সেই দুঃসময়েও একঘরে ফাসবাইন্ডার তো অন্যঘরে প্যারালাল সিনেমার আলাপ শুনেছি। মনে আছে,খসরু ভাই একসন্ধ্যায় ধমক দিয়ে বলেছিলেন, প্যারালাল সিনেমা-প্যারালাল সিনেমা করবি না তো, ইন্ডিয়াতে প্যারালাল সিনেমার উদ্যোক্তা তো খোদ ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট। এনএফডিসি-এর কাজ চিত্রনাট্য সিলেকশন করা, বিনোদন চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সুস্থ চলচ্চিত্রের আবহ তৈরি করা। আমাদের এফডিসি কী করবে? যতোসব তেলবাজ মানুষের দল। শুনেছি ১৯৩০ সালের দিকে চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারটা ছিলো একদম রাজ্য জয় করবার মতো, ঢাকার সিনেমাহলে চলতো বোম্বে-মাদ্রাজ-কলকাতা-ইউরোপ-আমেরিকার চলচ্চিত্র। দর্শকরা এমনই উৎসবে মেতে যেতো যে, গায়ে আতর ছাড়া চলচ্চিত্র দেখতেন না, যদি কোনো নায়িকা ভালোবেসে ফেলে-এই স্বচেতনায়।
এই দীর্ঘ চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞ শহরে এ সময়ের চলচ্চিত্রকাররা কী নির্মাণ করছেন! অশ্লীলতার যুগ শেষ, তারপর এসেছে এফডিসির অর্থহীন উদ্ভট গল্পের যুগ, সেই সময়ও শেষ; সুতরাং এখন নতুন প্রজন্ম। ডিজিটাল ছোঁয়া লেগেছে। এই প্রজন্ম মার্কেটিং বোঝে, চলচ্চিত্রকে গর্ভবতী করতে না পারলেও, গর্ভ আছে এই বিজ্ঞাপনে আগাম গর্ভ বিক্রি করে। চলচ্চিত্রের পোস্টারে লেখা থাকে, অত্যাধুনিক রেড ডিজিটাল ক্যামেরায় নির্মিত। দীনতার সরল স্বীকারোক্তি, বেশিরভাগ অশিক্ষিতরা এই পেশায় যুক্ত। নাটক-চলচ্চিত্রে কাজ করা মানুষগুলোর কোনো পূর্ব-প্রস্তুতি নাই, কোনো পড়াশোনার প্রয়োজন নাই; কারণ, নাটক দেখতে দেখতেই তো নাটক বানানো যায়! একটা মাস্টার শট্, একটা ক্লোজ আর গল্প তো বোঝাই যাচ্ছে। এমন ডিরেক্টর দেখে ততোধিক অজ্ঞ ফটোগ্রাফার (নিজেদের ডিওপি বলে পরিচিত করে) ট্রলিতে হাত-পা গোল করে শুয়ে একটা ঝাক্কাস ফ্রেম ধরে। এভাবেই কি হবে? অনেকেই অনেক কথা বলছে; আমি বলি, স্থবিরতা বন্ধ্যাকাল।
ফিল্ম সোসাইটির আন্দোলন মূলত পরিচিতির সময় আর বাকিটা প্রদর্শন-এর কার্যকাল। পাশাপাশি চলছে হিন্দু আর ইসলামি বোমার বিক্রি। এখন সময়টা ইসলামকে খাটো করার-সে রাজনীতি অথবা চলচ্চিত্রে। আমাদের চারপাশের সাদা চামড়ার মানুষগুলো উদগ্রীব-একটা আইকন চাই চলচ্চিত্রে, সুপারম্যান-স্পাইডারম্যানদের মতো জঙ্গি মারদাঙ্গা মুসলমান; তাই কালো চলচ্চিত্রনির্মাতারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু জাতির বিবেক বেঁচে থাকে, সাধারণ মানুষের চেষ্টা থাকে ইতিহাসের চকচকে পাথরগুলোর নাম মনে রাখতে। সুতরাং মন্দ সময়ে কিছু আলো থাকে, আবার সুসময়কে কালো অন্ধকার ঢেকে ফেলে, যেমন-
প্রথমত, বিপ্লব বিদ্রোহের পরিণতি কী? ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আর্ট ইন্সটিটিউট-এর শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো; বিদ্রোহের শিক্ষা আর্ট ইন্সটিটিউট-এর শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের চেতনে ছিলো। বিপ্লব এভাবে দীর্ঘজীবী হয়। ৮০’র দশকে কোনো এক রাজাধিরাজের সংস্কৃতির ভুল ব্যাখার রক্তচোখকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে আর্ট ইন্সটিটিউট-এর শিক্ষার্থী আর শিক্ষকেরা। আজও তাই ২১ ফেব্রুয়ারি আর আলপনা একসঙ্গে পথ হাঁটে।
দ্বিতীয়ত, হীরালাল সেন (জন্ম ১৮৬৬, ঢাকা; মৃত্যু ১৯১৭, কলকাতা) এই উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রনির্মাতা ও প্রদর্শক। অবহেলিত হীরালাল সেন আমাদের গল্পে নাই, তাকে আমরা স্মরণ করি না। আমরা ভুলে যাই স্বাধীনতা-উত্তর ধীরে বহে মেঘনা,সূর্যকন্যা,সীমানা পেরিয়ে, রূপালী সৈকত,শ্লোগান, সুপ্রভাত, মেঘের অনেক রং, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ঘুড্ডি, সূর্যদীঘল বাড়ি,মাটির ময়না নবচলচ্চিত্রের উজ্জ্বল তারা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দেলন তো বৃথা যায় নাই।
তৃতীয়ত, দেশভাগ হয়েছে কিন্তু সেই জটিল সমস্যার সমাধান হয় নাই; হিন্দু ও ইসলামি বোমা প্রায় ফাটাফাটির অবস্থা। আর কিছু সুযোগ সন্ধানী মানুষের মতো দেখতে জন্তুরা রুচি, প্রগতি, সংস্কৃতি আর ধর্মের যেনোতেনো ব্যাখ্যা তৈরি করছেন। এ সম্প্রদায় সাতশ বছরের মুসলিম শাসনে ল্যাজ নাড়াতো, ব্রিটিশদের দুইশ বছর অর্থনৈতিক লুটপাটের সময়ও একই কাজ করেছে। এরা চরিত্রহীন বুদ্ধিজীবী, এইসব পেটি-বুর্জোয়া সমাজের বড়ো চেয়ারে আসন পেয়ে যান। দায়বদ্ধতাহীন সুবিধাভোগীর দল। এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় মানুষ হয়ে আঘাত হানে। সাবধান।
এফডিসির বাইরে তৈরি হচ্ছে, নতুন নতুন সিন্ডিকেট নতুন ধরনের ছবির নাম। এই দল, সেই দল-শুধু দলবাজি। সেই দলবাজ জেনারেশনের একজন চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ইংরেজি নামে চলচ্চিত্র তৈরি করেন-ব্যাচেলর,মেড ইন বাংলাদেশ,থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার,টেলিভিশন।টেলিভিশন সম্ভবত মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর চতুর্থ চলচ্চিত্র। রচনা : আনিসুল হক ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। পরিচালনা : মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন :নুসরাত ইমরোজ তিশা, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী যথাক্রমে কোহিনূর, মজনু, সোলায়মান-এর ভূমিকায়।
রচয়িতা যুগল যা তৈরি করেন-তাই সম্প্রচার হয়, পত্রিকায় ছাপা হয়। কর্পোরেট কালচারে এই একটা সুবিধা-টাই পরা সংস্কৃতিহীন যুবক বিপণন বোঝে; সুতরাং সে ঠিক বললেই ঠিক। দর্শক আলুর দম। এই যুগল টেলিভিশন নাটকে বাংলাভাষাকে একটা চুদুরবুদুর অবস্থায় নিয়ে এসেছেন, সুচতুরভাবে সংস্কৃতিবিরোধী কর্ম সকলের জনপ্রিয়তায়, সকলের নাকের ডগায় সমাধা করছেন। কেউ কিছুই বলছে না।
একটা গ্রামের প্লট, নায়ক একটু দুর্বল চিত্তের, সঙ্গে সহকারী ভাড় আর নায়িকা ফাটাফাটি স্মার্ট। নায়ক-নায়িকার প্রেমে দিওয়ানা, ভাড়ও দিওয়ানা সেই নায়িকার প্রেমে-ফর্মুলা অসমবাহু ত্রিভুজ। ফাটাফাটি কয়টা শট্, ক্যামেরা এমন কাঁপবে যে দর্শক চলচ্চিত্রের শেষে পেইন কিলার খাবে-মানে তুমুল মাথাব্যাথা। চিত্রগ্রাহকের পারকিনসন রোগ আছে কি না জানা যায় নাই।
শিল্প-নির্দেশনা আর কস্টিউম-এর জন্য প্রোডাকশন বয় হলেই চলে, নায়িকার বাড়ি-বামদিকের বেড়া সবুজ রঙ আর ডানদিকের বেড়া হলুদ রঙ। একটা ফিল দিলাম, আর কী। পুরো চলচ্চিত্রের শিল্প-নির্দেশনার বেহাল দশা আর বিশাল আকৃতির এক টেলিভিশন তৈরি হয়েছে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের আদলে, পয়েন্ট টু পয়েন্ট এনলার্জ ভার্সন। মনে হয়, ভিন গ্রহের উন্নত জীব শুধু টেলিভিশন তৈরি করে নোয়াখালীর ওই দ্বীপ থেকে সসারে দূর আকাশে মিলিয়ে গেছে। আহা রে! আর একটু সময় দিলে ভালো হইতো।
সেই অবান্তর জনপদে টেলিভিশন যন্ত্রটা আসে হিন্দু মাস্টারের কল্যাণে, প্রথমেই একদম স্লিম একটা সেক্সি যন্ত্র। ভাগ্যবানরা ফ্ল্যাট স্ক্রিনেই প্রথম টেলিভিশন দেখে, সে এক দারুণ উত্তেজনা; যদিও গঞ্জে গেলেই চলচ্চিত্র দেখতে পায়। তবুও গল্পের জন্য গোল হয়ে ঘিরে থাকা আমের মাছির মতো। এখানে একটা বিদ্রোহ দেখা যায়, এখানে ব্যক্তি মানুষের আশা-আকাক্ষার প্রতিনিধি মাস্টার-মশাই। তারপর চেয়ারম্যানের নির্দেশে টেলিভিশনের সলিল সমাধি-তা আবার মা দূর্গা বিসর্জনের কায়দায়; বাহ্! অনেক ভাব-গম্ভীর দৃশ্য রচনা।
পর্দার রঙ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালের রঙ, নায়কের মাফলারের রঙ-সমকামিদের প্রিয় ম্যাজেন্টা। এই রঙ ভীষণ দৃশ্যমান। চলচ্চিত্রে সামান্য কিছু দেখিয়ে অসামান্য কিছু বোঝানোর চেষ্টা থাকে; জানি না কোনো গুপ্ত ভাষা এই রঙ বহন করে কি না? দরজা খুলে বাইরে আসা মানেই তো প্রগতি; প্রথমে প্রমাণ করা, ধর্ম একটা সেকেলে ব্যাপার আর যৌন স্বাধীনতা দরকার। আধুনিক ধারণায় সমকামিদের প্রতি একটা সমর্থনের কথা বলা, চিয়ার আপ।
যাই হোক গল্পের ক্যারেক্টরগুলো কী, খুবই চিন্তার বিষয়! ওস্তাদ একটা চেয়ারম্যান রাখেন, জোস্ ক্যারেক্টার। দ্বীপের মতো গেরামে হেই মাস্তান, যা কইবো তাই অলরাইট। মাগার, ওই চেয়ারম্যানের পোলা চেয়ারম্যানরে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাইজ কইরা দিবো, হিরোর ক্যারেক্টার কেডায় জানি করতাছে? ও আপনি? একটা মোবাইল লইয়া ক্যাঁচাল, বুঝছেন। মানে, আপনারে আপনার বাপজান মোবাইল কিনবার দেয় না। বুঝছেন না? লোকজন আছে হেরা আপনার বাপরে অহনই গুটি কইরা দিবো, ডায়ালগ নাই তো একটু ইম্প্রভাইজ মাইরা দিয়েন, বস। হালকার ওপর ঝাপসা আর কী। চলেন শটে যাই।
এইভাবে গল্প তৈরি হতে থাকে, ক্যামেরায়। আর ঠাণ্ডা ঘরে তৈরি হয় আর এক চলচ্চিত্রের গল্প। মুসলমান জঙ্গিবাদ, মুসলমানদের ফতোয়াবাজি পোর্ট্রেট করতে পারলে সাদা চামড়ারা উষ্ণ আলিঙ্গন করে, টাকা-ডলার দেয়; প্রয়োজনে একটা আইএসও সার্টিফিকেটও দিতে পারে। ভাই, এই দেশে একটা গ্রাম আছে-যা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় সেখানকার মানুষ কথা বলে। সেই গ্রামে এক চেয়ারম্যান আছে, যে টেলিভিশন দেখা হারাম-এই মর্মে বাণী দেয়, গ্রামবাসীকে ওই আদেশ পালন করতে বাধ্য করে। এটা কোন্ সময়ের গল্প? এই যে টাইম জিগান ক্যা? দেইক্যা আলোচনা করেন, আগে দ্যাখতে দ্যান।
সমসাময়িক গল্প। চেয়ারম্যান সাহেব জীবনে কোনোদিন ফটো তুলেন নাই। তিনি বাংলাদেশের কোন্ ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান-এই চলচ্চিত্রের দাপুটে লেখকদ্বয়ের বিশেষ নির্দেশে সরকারি নিয়ম অমান্য করে ফটোগ্রাফ ছাড়াই বিবিধ নির্বাচনী বৈতরণী অতিক্রম করেছেন এবং চেয়ারম্যানগিরি চালাচ্ছেন? ভাই, এইটা কী ডকুফিকশন যে আপনি ভুল দেহান?
ভাই টুইস্ট দ্যান। আচ্ছা, এই চেয়ারম্যানের আর একটা ফটোকপি ভাই আছে। সে বাচ্চু রাজাকারের মতো জনপ্রিয় ইসলামি অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। আরো টুইস্ট দ্যান। আচ্ছা, মোবাইলের চিন্তা বাদ। আইডিবি থেকে দুইটা ল্যাপটপ নিয়া আসবা আর চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের কথা বললে ফোন কোম্পানি মডেম দিবো, নায়ক-নায়িকা ল্যাপটপে ভিডিও চ্যাট করবো-কেমন দিলাম টুইস্ট? আপনি হইলেন গুরু।
গুরু আরো টুইস্ট দ্যান। আচ্ছা, একটা ফাটাফাটি মাল খাওয়ার সিকোয়েন্স দিতাছি। হল ভইরা লোকে মজা লইবো, নিজেরটা খাইবো আরেকজনেরটা খাইবো, শুধু মাল খাইবো আর কহিনূর কইয়া চিক্কুর মারবো। ...গুরু ফাটায় দিছেন। কিন্তু একটু বেশি মেন্দা মেন্দা হইয়া যাইতাছে নাকি? একটু কালার দরকার, ইয়ো ইয়ো পোলাপান দেখবো না কিন্তু। ওই ব্যান্ড মিউজিক লাগা। মিউজিকে অহন কার নাম ফাটতাছে? হৃদয় খান? ডায়ালগ নোয়াখালীর, একটা দ্বীপ...ঠিক হইতাছে? আরে চলবো, আইয়ুব বাচ্চু মিউজিক ডিরেক্টর, আবার চিরকুট ব্যান্ডও থাকবো। চলচ্চিত্রের শটের লগে ওই মিউজিক যায়? দ্যাখ, সিনেমা হইলো ডিরেক্টরের জিনিস। সাবধান, হাত লাগাবি না।
প্রেম অপ্রতিরোধ্য; তাই মালিক আর চাকরের প্রেম চলে একসঙ্গে, নায়িকার একটা পার্সোনালিটি এস্টাবলিস্ট করা দরকার। একটা জিঘাংসা। গ্রামভর্তি মানুষের সামনে অপমান? চুক্তি আরোপ নায়কের প্রতি, তোমার বাপকে সাইজ করতে হবে, তবেই তোমাকে আমি গ্রহণ করবো। ওস্তাদ মারামারির আগে একটু কমেডি কইরেন, কমেডিটা পাবলিক খায় ভালো।
ঠিক আছে, কল্পিত সময়ে একটা কল্পিত কাহিনী শুধু সাইজ কইরা মুসলমানদের একটা বাঁশ দিমু, বেশি নড়া-চড়া কইরেন না। চেয়ারম্যান রঙিন পত্রিকা পড়ে, তবে পর্দার ব্যবস্থা আছে; উনি ফেসবুকের কথা জানেন। খুবই জ্ঞানী মানুষ কিন্তু মুসলমান। মুসলমান মানেই অন্ধ, এই বিষয়টা আমাদের আলোচ্য। এইটা মাথায় রাইখা শেষ দৃশ্যটা কল্পনা করেন, একটা সার্কেল ট্রলি, খালি সার্কেল ট্রলি। একজন অন্ধ মুসলমান আর এক প্রতারক মুসলমানের প্রতারণায় সব হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। মুসলমান ফতোয়াবাজ, মুসলমান হজের ব্যাপারেও ধোঁকাবাজ, তালি-আরো জোরে তালি। সাহেবরা মুগ্ধ, হোয়াট এ ফিল্ম!
দক্ষিণ কোরিয়ার পুশান ফিল্ম ফেস্টিভালে এই চলচ্চিত্রের উত্তাপ বাংলাদেশে এসেছে। এক কান থেকে আরেক কান হয়ে কান শহর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, কিন্তু চলচ্চিত্র কোনো প্রোপাগান্ডা নয়। নিউজ কাভারেজে গরিব দেশে তারকা হয়ে ওঠা যায়, চলচ্চিত্রের দর্শক মুগ্ধ হয় না; চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না।
লেখক : সেলিম আহ্মেদ স্নাতক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে ভাস্কর্যে। দীর্ঘসময় হস্তশিল্প, ফ্যাশন ও গ্রাফিক্সে সঙ্গে তার বসবাস। বর্তমানে তৈরি হচ্ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য।
selim24march@yahoo.com
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন