কাওসার বকুল ও ইব্রাহীম খলিল
প্রকাশিত ১২ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
কর্পোরেটিয় স্লোগানের কারিশমায় মাতাল জনগণ
কাওসার বকুল ও ইব্রাহীম খলিল

১.
‘ভাষা কোনো অলৌকিক এশ্বরিক ব্যাপার নয়,একটি প্রযুক্তি বা হাতিয়ার মাত্র;আকাশের শব্দশক্তিকে ব্যবহার করবার হাতিয়ার। তাপশক্তি,বিদ্যুৎশক্তি প্রভৃতি শক্তিগুলোকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যেমন নানারকম প্রযুক্তি বা হাতিয়ার করা হয়,এও অনেকটা সেরকম।’১ এখানে হাতিয়ার শব্দটির কারণেই কলিম খানের উল্লিখিত বাক্যটি আমাদের পছন্দ। একই বস্তুর নানাবিধ ব্যবহার আছে। অর্থাৎ,নানা হাতিয়ার হিসেবে সেটা ব্যবহার হয়।মনোযোগ দিলে উপলব্ধিতে আসে,‘হাতিয়ার’ শব্দের সঙ্গে ‘অস্ত্র’ শব্দটির একধরনের সম্পর্ক আছে। পৃথিবীতে পাল্টা প্রশ্ন ছাড়া স্বার্থ আদায় করতে গেলেই প্রয়োজন পড়ে অস্ত্রের কিংবা সর্বজনের স্বীকৃতি। ভাষা দিয়েও আপনি স্বার্থ আদায় করতে পারবেন! সেক্ষেত্রে ভাষাকে অস্ত্র বানাতে হলে ভাষা এমন হতে হবে যেনো, শব্দগুচ্ছ নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন না আসে; একই সঙ্গে যেনো হয় সর্বজনগৃহীত। আবার প্রশ্ন তৈরি হলেও তা যেনো আপনার কাছে না পৌঁছাতে পারে-সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আজকের আলোচনায় এসব বিষয়-ই আসবে ঘুরেফিরে।
পাঠক, আপনার কি কখনো এমন হয়েছে যে, মনের মধ্যে ইচ্ছা থাকার পরও কাজটি করেননি? ভাবুনতো কেনো কাজটি করা থেকে বিরত থাকলেন? এর কারণ কি অনুশাসন!আমরা সবাই অনুশাসনের মধ্যেই বেড়ে উঠছি। জন্মের পর থেকেই একধরনের অনুশাসন আমাদের মধ্যে ঢুকে গেছে। এটি হতে পারে পারিবারিক, সামাজিক,রাষ্ট্রীয় কিংবা ধর্মীয়। অনুশাসন টিকিয়ে রাখতে সবাই একধরনের নজরবন্দির কাঠামো তৈরি করেছে। যার ফলে আমরা রাষ্ট্রের নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে সাধারণত বিরত থাকি। ধর্মীয়,রাষ্ট্রীয়,পারিবারিক অনুশাসনের ফলে এই বিষয়গুলো যেভাবে মেনে নিচ্ছি,ঠিক একইভাবে মেনে নিচ্ছি পুঁজিপতিদের অনুশাসন। তাদের বানানো চরকিতে যখন যেভাবে খুশি আমাদের ঘোরাচ্ছে,আমরাও ঘুরছি। তারা একেক সময় আমাদের সামনে ‘প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়’ একেক পণ্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে পণ্যগুলো একান্তই আমাদের স্বার্থে;এগুলোর ব্যবহারে আমরা যেমন যুগোপযোগী হতে পারবো,ঠিক তেমনি ব্যবহার না করলে ছিটকে পড়বো চলমান সমাজ থেকে। আভিজাত্য,ভদ্রতা,দেশপ্রেম,সৌন্দর্য,ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি এখন নির্ভর করছে আপনি কোন্ পণ্য ব্যবহার করছেন তার ওপর।
আর ব্যক্তির এসব পরিচয় গড়ে দেওয়ার অন্যতম দায়িত্ব পালন করে পণ্যের স্লোগান। আমরাও আবার ‘শিক্ষিত-আধুনিক’ হওয়ার পরও স্লোগানের রায়কে মেনে নিই এবং সেই মোতাবেক চলি। কিভাবে-সেই আলোচনা এবার শুরু করা যাক। আলোচনায় যাবার আগে স্লোগান সম্পর্কে কিছু বলা জরুরি মনে করছি। স্লোগান শব্দটি স্কটিশ slaugh এবং ghairm শব্দ থেকে এসেছে। slaugh অর্থ সোলজার বা সৈন্য। আর ghairm অর্থ আহ্বান করা, দুটো মিলে slogan এর অর্থ দাঁড়িয়েছে,‘পণ্য ক্রয়ে আহ্বান করা’। চার্লস জে ড্রিক্সেন ও আরথার ক্রয়েগার বলেন,স্লোগান হচ্ছে কোনো সংক্ষিপ্ত বার্তা,যা পণ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য বা পণ্য ক্রয়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরে। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ শব্দের মধ্যে বিজ্ঞাপনের স্লোগান হয়ে থাকে। বিজ্ঞাপনের তথ্য মানুষের মনকে জোরালোভাবে স্পর্শ করাই স্লোগানের উদ্দেশ্য থাকে। ভালো স্লোগান মানুষের মস্তিষ্কে পণ্য সম্পর্কে একধরনের ইমেজ তৈরি করে। যেমন :দীর্ঘদিন পর্যন্ত ‘কাছে থাকুন’ স্লোগানটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মুঠোফোন অপারেটর গ্রামীণফোন-এর কথা আমাদের মাথায় আসতো। এমনকি এসব স্লোগান আমাদের ভিতরে ওই পণ্য সম্পর্কে একধরনের কৃত্রিম বাস্তবতা নির্মাণ করে। এ লেখায় কিছু পণ্যের বহুল প্রচারিত বিজ্ঞাপনের স্লোগানকে নমুনা হিসেবে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
২.
ফ্রয়েডের মতানুসারে একজন মানুষের ভিতরে চেতন,প্রাক-চেতন ও অচেতন নামে তিনটি স্তর রয়েছে। চেতন স্তরটি মনের উপরিভাগে অবস্থিত। একটি বিশেষ মুহূর্তে ব্যক্তি যে আবেগ-অনুভূতি,চিন্তা-ভাবনা,কামনা-বাসনা,স্মৃতি সম্পর্কে সচেতন থাকে,সেগুলো নিয়েই চেতন মন গঠিত। চেতন মনের পরিধি সীমিত বলে ব্যক্তি একসঙ্গে খুব বেশি বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারে না। যদিও এই স্তরের মাধ্যমেই ব্যক্তি বস্তুজগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। চেতন স্তরের নিচেই থাকে প্রাক-চেতন স্তর।এ স্তরে সেই বিষয়গুলো বিরাজ করে,যেগুলো সম্পর্কে ব্যক্তি এই মুহূর্তে সচেতন নয়।কিন্তু ভবিষ্যতে যেকোনো সময় সে এ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারে। যেমন :প্রিয়জন হারানোর বিরহে আমরা ২৪ ঘণ্টাই কাতর থাকি না। চেতন মন ও প্রাক-চেতন মনের মধ্যে পরস্পর সংযোগ আছে। প্রাক-চেতন মনের বিষয়গুলো চেতন মনে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করে। চেতন মন প্রয়োজন অনুসারে ওগুলোকে ব্যবহার করে কার্য সমাধা হলেই আবার প্রাক-চেতন স্তরে ফেরত পাঠায়। আগেই বলেছি,চেতন স্তরের পরিধি সীমিত,এজন্য স্তরটিতে একসঙ্গে অনেক বিষয় ঢুকে পড়লে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং চেতনার পক্ষে সুনিপুণভাবে কার্য সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। ফলত বাকি বিষয়গুলো প্রাক-চেতনে থাকে।
প্রাক-চেতন মনের নিচেই অচেতন মনের অবস্থান। মনের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়েই থাকে অচেতন মন।ব্যক্তির কামনা,বাসনা ও প্রবৃত্তিসমূহ এই অচেতন স্তরে বিরাজ করে। এছাড়া ব্যক্তির লজ্জা,ঘৃণা,কষ্ট,আনন্দ ও অভিজ্ঞতা থাকে এ স্তরে। এখানকার বিষয়গুলো এতোই অসামাজিক,পাপপূর্ণ,পীড়াদায়ক ও জঘন্য প্রকৃতির যে,ব্যক্তির নিজের কাছেই তা গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে অচেতন মনের বিষয়গুলো সাধারণভাবে কোনো সময়ই চেতন স্তরে প্রবেশ লাভ করতে পারে না;অর্থাৎ,প্রথম দুই স্তরের সঙ্গে এর কোনো যোগাযোগ নেই। মনের এই তিন স্তরের প্রবণতা ভিন্ন ভিন্ন;পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে ব্যক্তিত্বের চূড়ান্ত রূপ নেয়। আবার মানুষের প্রাত্যহিক কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য আদিসত্তা কাজ করে। এই আদিসত্তা সবসময় সুখ ভোগ করতে চায় এবং দুঃখকে এড়িয়ে চলে। আদিসত্তা যুক্তিহীন হওয়ায় ভালো-মন্দ,ন্যায়-অন্যায় বা পাপ-পুণ্য বিচারের ক্ষমতা নেই। এমনকি সুখ ভোগের পরিণাম শুভ কি অশুভ হবে তা বিচারের ক্ষমতাও নেই।২ ফলে ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে যেমন ভালো খাবারের ছবি ভাসে তেমনি আদিসত্তা ভালো-মন্দ বিচার না করে বিভিন্ন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
মানুষের অচেতন মনের এ দুর্বলতাকে সুকৌশলে কাজে লাগাচ্ছে এ সমাজের পুঁজিপতিরা। মানুষের মনে আশা,স্বপ্ন ও চাওয়া থাকে;এ চাহিদাগুলো ব্যক্তিকে সবসময় তাড়া করে। পুঁজিপতিরা এগুলোকে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করতে চায়। বাস্তবে থাকুক আর না-ই থাকুক,অচেতন সত্তার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে রাখে ঘেরাটোপে। বর্তমানে গণমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান;তাছাড়া সামাজিক রীতি-নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,সেখানে বিকল্প চিন্তার জায়গা নেই। উপস্থাপন কৌশলে বোঝা যায় না,এটি আসল নাকি অন্যকিছুর বিকল্প। সেখানে প্রাকৃতিক জিনিসকে ছাপিয়ে কৃত্রিমতা প্রাধান্য পায়। এজন্য পণ্যের বিজ্ঞাপনগুলোয় আকর্ষণীয়ভাবে এমনসব স্লোগান ব্যবহার হয়,তা কৃত্রিম হলেও মানুষের আদিসত্তার রোষে উত্তম হয়ে ওঠে। তবে,স্লোগানদাতাদের উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন;তারা মানুষের প্রাক-চেতনে রাখতে চায় এটি। সফলও হচ্ছে;কেননা,একটি পণ্যের স্লোগান দেখার পর ওই পণ্যের কথা আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায়। প্রয়োজন থাকুক আর না-ই থাকুক স্লোগানের ফাঁদে পড়ে পণ্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা জন্মে;অনেক সময় হয়তো কষ্ট করে হলেও পণ্যটি আমরা পেতে চাই।
৩.
পৃথিবীতে চিন্তা-ভাবনার নিখুঁত গণনায় প্রত্যেকটি মানুষ-ই ভিন্ন। মোটাদাগে কিছু কিছু জায়গায় মানুষ একমত। তারা সমাজ তথা দেশের ভালো চায়,কল্যাণ চায়;সর্বোপরি নিজের সুখ চায়। চিরসত্য কিছু বিষয়কে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়,তুলনামূলক খারাপ অবস্থার উন্নয়ন সাধন করে এগিয়ে যেতে চায়। সাধারণ মানুষ ভাবতে পছন্দ করে,‘এখনতো সমাজ জাহাজের এ যাত্রা শেষ হতে চলেছে,এখনতো মিষ্টি জলে অর্থাৎ ‘একবিশ্ব একজাতি এক সংস্কৃতি’তে ওঠার পালা...সেদিন যে সাম্য ছিল,সে সাম্য কেবল অর্থনীতিক্ষেত্রে ছিল না,জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাম্য ছিল।’৩‘কেবল অর্থনৈতিকভাবে পিটিয়ে সমান করা যে অসম্ভব,সেকথা আজ সম্পূর্নভাবে প্রমাণিত। জগৎ কোনও তত্ত্বের অপেক্ষা না করে মধ্যবিত্ত সমাজের বাড়বাড়ন্ত ঘটিয়ে ক্যাপিট্যালিস্টকে মধ্যবিত্তের উচ্চতম ধাপে নামানোর ও প্রলেতারিয়েতকে মধ্যবিত্তের নিম্নতম ধাপে তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।’৪‘লাস্ট কাম ফার্স্ট গো’৫ যখন এমন বিশুদ্ধিবাদ-এর ‘আশার আলো’ দেখে সাধারণ শোষিত-শ্রেণি,ঠিক তখনই আবার নতুন ফর্মুলায় শোষণ করার জন্য প্রস্তুতি নেয় রাষ্ট্রসহ পুঁজিপতি সমাজ।
চিরসত্য কিছু বিষয়, নীতিকথা কিংবা ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে বিভোর করে রাখে প্রতিনিয়ত। এদিকে সাধারণ জনগণ ‘উত্তরাধুনিক’ হতে পার করছে ব্যস্ত সময়। ‘উত্তরাধুনিকতা যেন কস্তুরীমৃগ, আপন গন্ধে আপনি মাতোয়ারা; নিজের মানে খুঁজতে নিজেই হয়রান। হয়রানি থেকে ছটফটানি। অস্থিরতা তার সমগ্র ভাবনায়।’৬ তবে মানুষের সামগ্রিক অস্থিরতার অনেকটা দায়ভার গণমাধ্যমকে নিতেই হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ মেনে নেয় কেনো? তাদের কি বোঝার মতো জ্ঞান নেই, নাকি জ্ঞানোদয় হচ্ছে না? ‘এই ধরনের জ্ঞানোদয় হয় মাঝসমুদ্রে,ঝড়ে পড়লে। ব্যক্তিমানুষের ও তার সভ্যতার জীবনযাত্রাপথে ঠিক এরকমই হতে দেখা যায়। সামাজিক ঝড়ের মুখোমুখি হয়েই সভ্যতার যত জ্ঞানোদয় হয়,সাহিত্য দর্শন সবকিছুর।’৭ ‘পরবর্তী ঝড়ের মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত সেই সকল জ্ঞান পানসে হতে থাকে।’৮‘ঝড়’ পরবর্তী সময়ে সমান্তরালভাবে চিন্তার দ্বার রুদ্ধ হলেও লোনা পানি থেকে মিঠা পানিতে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যস্তানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। কিন্তু মিঠা পানিতে ওঠার জন্য তারা বিশ্বাস করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিশ্বাস করে তাদের স্লোগানকে। চোখ,কান খোলা রেখে স্লোগানগুলোর প্রতি খেয়াল করলে এগুলো চোখে পড়বে।
৪.
উপরের দুই ও তিন নম্বর আলোচনা ধরে এবারের আলোচনা এগোবে। ধরুন,আপনার কানের কাছে একটি পণ্যের স্লোগান সবসময় বাজতে লাগলো। বিজ্ঞাপনটির কথা আপনার মনে না থাকলেও দেখবেন স্লোগানটি আপনার ভিতরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঢুকে গেছে। ‘গ্রামীণফোন’-এর স্লোগান ‘কাছে থাকুন’।এটা শুনতে আমাদের ভালোই লাগে। কিন্তু আমরা প্রশ্ন করি না ‘গ্রামীণফোন’ না বলে ‘কাছে থাকুন-কাছে থাকুন’ করে তারা চিল্লাচিল্লি করছে কেনো!এর কারণ হতে পারে এমন-‘কাছে থাকুন’ শব্দগুচ্ছটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মাথায় আসে,তাহলে ‘কেউ দূরে আছে’।তার মানে আপনাকে আর বলতে হয় না,দূরের সেই লোকটির সঙ্গে আপনাকে ঠিক কী করতে হবে। আপনি তখন সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে ফেলেন,কাছে থাকার। এই যখন মনের অবস্থা,ঠিক সেই সময় আপনার সামনে নানা ‘প্যাকেজ অফার’ নিয়ে হাজির হয় গ্রামীণফোন। আপনাকে এমনভাবে দিশেহারা করে ফেলে যে,আদিসত্তার চাপে আপনি এর যেকোনো একটি অফার নিতে বাধ্য হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে,যে চাহিদার বিপরীতেই আপনাকে অফার পছন্দ করতে দেওয়া হোক না কেনো, শেষাবধি কিন্তু তা আপনার অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনে। অথচ অনেক অফার থেকে নির্দিষ্ট একটি গ্রহণ করে আপনি কিন্তু স্বস্তিতেই থাকেন। এটি মানুষের আদি-বর্তমান স্বভাব। গ্রামীণফোন কিন্তু এ স্বভাবকে নিয়েই ‘ব্যবসা’ করে। মানুষ যতো বিচ্ছিন্ন হয় ততো তার ‘কাছে থাকার’ প্রয়োজন বাড়তে থাকে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে,প্রেমিকাকে বিশ্ববিদ্যালয় হলে পৌঁছে দিয়ে প্রধান ফটক পার না হতেই প্রেমিক-পুরুষটি তাকে ফোন দেয়-কারণ সে তার থেকে দূরত্ব অনুভব করে।
আবার দেখুন, স্লোগান কিভাবে পাল্টে যায়। এই গ্রামীণফোনেরই এখন স্লোগান হলো,‘চলো বহুদূর’।কাছে না থেকে তারা এখন ‘বহুদূরে’ যেতে বলছেন। তাহলে কি কাছে থাকার টোপ আর খাটছে না? নাকি কাছে থাকার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে! মানুষকে কাছে আনতে আনতে গ্রামীণফোন চার কোটি ৩২ লাখ (মে ২০১৩ পর্যন্ত)৯ মানুষকে কাছে এনেছে;১৬ কোটি মানুষের দেশের চার কোটি ৩২ লাখ মানুষকে কাছে আনা কিন্তু কম কথা নয়।মনে হয় বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। গ্রামীণফোন এমন এক সময় এ বিজ্ঞাপন দিচ্ছে যখন সারাদেশ টুজি প্রযুক্তি ছেড়ে থ্রিজি নামের অপেক্ষাকৃত আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রবেশ করছে। এই থ্রিজি প্রযুক্তি এখন মানুষের দোরগোড়ায়,তাই জনগণকে নির্দিষ্ট বৃত্তের বাইরে বিশালতা বোঝাতে হবে। যাতে করে তাদের নতুন এ প্রযুক্তিতে আগ্রহ তৈরি হয়। তারা যেহেতু টুজি দিয়ে সবাইকে ‘কাছে আনতে’ পেরেছিলো,তৈরি করেছিলো ‘আস্থা’-একইভাবে থ্রিজি দিয়েও পুরো পৃথিবীকে মানে ‘বহুদূর’কে কাছে আনতে পারবে। কিন্তু এটা ঠিক,এই বহুদূরকে কাছে আনতে আপনাকে ‘প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে’ গুণতে হবে আগের চেয়ে বেশি টাকা। আর এই টাকার বিনিময়ে মুহূর্তেই আপনি প্রবেশ করবেন তথ্য-দুনিয়ায়,সেই তথ্যের প্রয়োজন থাক বা না-থাক। আর তথ্য মানেই অস্থিরতা,অস্থিরতা থেকে বিচ্ছিন্নতা;আবার সেই শোষণ,তবে পদ্ধতিটা নতুন।
এতো গেলো গ্রামীণফোনের কথা। এবার এর ‘সহোদর’‘রবি’র স্লোগান নিয়ে দু-একটি কথা বলবো। রবি’র স্লোগান ‘জ্বলে উঠুন আপন শক্তিতে’ সেটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। এখানে দেখার বিষয় হলো,‘জ্বলে উঠুন’ এর বাস্তবতা কী? রবি’র সিম,নেটওয়ার্কের সঙ্গে এর মিল কোথায়? স্লোগানের রহস্য কী? বোঝা গেলো,স্লোগানের সম্পর্ক হতে পারে কোম্পানির নামের সঙ্গে। রবি হলো সূর্য। সূর্য আপন শক্তিতে জ্বলে;সেই জায়গা থেকেই মনে হয় এই স্লোগান। আবার,‘জ্বলে উঠুন আপন শক্তিতে’ অর্থাৎ আপনি আপনার শক্তি দিয়ে জ্বলে উঠুন। আপনি বলুনতো রবি’র সিম কিনলেই কি কেউ জ্বলে উঠতে পারবে? জ্বলে উঠুক আর না-ই উঠুক এই স্লোগান কিন্তু ব্যক্তির ‘বিশুদ্ধিবাদের’ জায়গায় আঘাত করেছে। কারণ,কোনো মানুষই পরনির্ভরশীল হতে চায় না। অথচ আমরা কিন্তু অগোচরে সবাই রবি’কে নিয়েই নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই,অনেকটা লর্ড ক্লাইভের হাত ধরে মীরজাফরের বাংলার মসনদে বসার মতো।
শুধু রবি বা গ্রামীণফোনই নয়; স্বপ্ন দেখাতে পিছিয়ে নেই ‘টেলিটক’ও। ‘আমাদের ফোন’ বলে জনমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ব্যস্ত টেলিটক এখন সময়ের পরিক্রমায় ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও’ স্লোগান দিচ্ছে। বাঁধ ‘ভেঙ্গে দিতে’ সেই কারণে আমজনতার হাতে,পকেটে শোভা পাচ্ছে টেলিটক থ্রিজি। স্লোগানের খপ্পরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে থ্রিজি ছাড়া সাধারণ ফোন ব্যবহার করতে বাধ সাধে। অথচ খেয়াল করলে দেখা যাবে,যারা থ্রিজি কিনছে তাদের হয়তো ফোনেরই কোনো প্রয়োজন নেই। তাহলে কিনছে কেনো? ওই যে স্লোগান। আগেই বলেছি,মানুষের মনে লোভ,কাম লুক্কায়িত থাকে। এরপরই পণ্যটির প্রতি একধরনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে রবি, টেলিটক ও গ্রামীণফোনের মতো কোম্পানিগুলো।
৫.
আপনার কি হারতে ভালো লাগে? উত্তরে নিশ্চয়ই না বলবেন। তাহলে জয়ী হলে নিশ্চয়ই ভালো লাগে। আমরা সবাই জয়ী হতে চাই। সবকিছু জয় করাই যেনো আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। যদিও জয়-পরাজয় মিলিয়েই মানুষের জীবন। তারপরও চরম ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ জয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কখনো অতি মানবীয় শক্তির মাধ্যমে,আবার কখনো বস্তু জগতের কোনো শক্তির মাধ্যমে। জয়ী তাকে হতেই হবে।
বাল্যকাল থেকেই মানুষ এই বোঝাপড়ার মধ্যে বেড়ে উঠেছে,তাকে সফলতার উচ্চ শিখরে আরোহণ করতে হবে। তাক লাগিয়ে দিতে হবে পৃথিবীকে। যদি পারে,তবেই মানুষ হিসেবে তার সফলতা। সামাজিক এ ‘অনুশাসন’ প্রতিষ্ঠিত। আর এই সুপ্রতিষ্ঠিত ‘অনুশাসন’কে পুঁজি করে ‘জয়ী হওয়ার কতোগুলো কৌশল’ নিয়ে হাজির হচ্ছে একশ্রেণির পুঁজিপিপাসু। কী সেই কৌশল? হ্যাঁ বলছি। আপনাকে মানতেই হবে পৃথিবীর আদিম ‘খেলা’ জৈবিক ক্রিয়া। আদিমকালে সঙ্গমের যেরকম ‘মূল্য’ ছিলো বর্তমানে এর কদর বেড়েছে বৈ কমেনি।
আমাদের সমাজে ‘সত্যিকার’ পুরুষের ‘বিচার’ হয় শৌর্য,বীর্যে মানে যৌন ক্ষমতায়। সঙ্গমে যৌনসঙ্গীর কাছে ‘হেরে’ যাওয়া চরম লজ্জার। ব্যর্থ এই পুরুষ সমাজে ‘কাপুরুষ’ নামে আখ্যায়িত। এ ধরনের অনুশাসন যখন আমাদের মধ্যে শিকড় গেড়ে বসেছে;ঠিক তখনই ‘প্যানথার’ নামের কনডম ‘সত্যিকারের আসল পুরুষ’ স্লোগান নিয়ে আমাদের কাছে হাজির হচ্ছে। সেই আদিসত্তার বদৌলতে ‘আসল পুরুষ’ হওয়ার সাধ আমার-আপনার সবার মনেই আছে। আবার অনেকের মনে নিজের অশিক্ষা-কুসংস্কারের ফলে ‘পুরুষত্ব’ নিয়েও সংশয় থাকে। ফলে স্লোগান শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যক্তির অচেতন মনে প্যানথারের প্রতি একধরনের দুর্বলতা কাজ করে। স্লোগানের সঙ্গে নিজের তৃষ্ণাকে মেলানোর চেষ্টা করে। ভাবতে থাকে সঙ্গমের সময় প্যানথার ব্যবহার করলেই বুঝি যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। সে ‘সত্যিকারের’ পুরুষ হবে।
পাঠক,একটু ভেবে দেখুনতো যৌনক্ষমতা না থাকলে একজন মানুষের পক্ষে প্যানথারের মাধ্যমে তা অর্জন সম্ভব কি না? কিংবা যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর মতো কোনো উপাদান কনডমে আছে কি না? অথচ প্যানথারের ভাষ্যমতে,এ কনডম ব্যবহার করে সফলভাবে যৌন সুখ দেওয়া সম্ভব। বিনিময়ে প্রতিবারই যৌনসঙ্গীর কাছ থেকে জয়ী হওয়ার সার্টিফিকেট হিসেবে পাবে ‘আসল পুরুষ’ সম্বলিত মেডেল।
রাষ্ট্রীয়,ধর্মীয় ও নানা বিষয়কে পুঁজি করে বিভিন্ন কোম্পানি যখন ভোক্তা সমাজের কাছে হাজির হচ্ছে;ঠিক তখনই অ্যাটোম চকলেট মেতেছে আরেক খেলায়। সেই খেলাটা কী-সেটা দেখার আগে আমাদের জীবনাচরণের ফর্দটা একটু ঘেঁটে দেখি। প্রাত্যহিক জীবনে আমরা কারণে-অকারণে মিথ্যার আশ্রয় নিই,হারতে চাই না। যুক্তির কাছে হারতেও আমাদের যেনো লজ্জা। এটার অবশ্য কারণও আছে,কর্পোরেট গণমাধ্যম প্রতিদিন আপনাকে যেভাবে শুধু জেতার কথা বলে,সেখানে পথ আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। এই দেখে ক্ষোভে নচিকেতা বলেন,‘কেনো পথ নিয়ে মাথাব্যাথা/জেতাটাই বড়ো কথা/হেরে গেলেই শেম শেম।’ আসলেই আমরা হারতে চাই না সত্যের কাছে,বাস্তবের কাছে।
যা বলছিলাম-অ্যাটোম চকলেটের কথা। ‘অ্যাটোম খাও! চাপার জোর বাড়াও!!’ এই স্লোগান নিয়ে রেডিও,টেলিভিশন কিংবা সংবাদপত্রের মাধ্যমে অ্যাটোম চকলেট হাজির হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকার সুবাদে টেলিভিশন রুমে বিজ্ঞাপনের স্লোগান শোনার সময় অন্যদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছি। বিজ্ঞাপনের হাজারো স্লোগানের ভিড়ে অ্যাটোমের স্লোগান শুনলেই অনেকে ‘ঝাঁকি’ দিয়ে ওঠেন। স্লোগানটির ব্যাখ্যা দু-ভাবে দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত,চাপার জোর না-হারার প্রথম শর্ত। সুতরাং নিজের সঙ্গে স্লোগান মিলে একধরনের সেতুবন্ধন তৈরি হয় অ্যাটোমের (পণ্যটির) সঙ্গে। তাই হয়তো নিজেকে বিকিয়ে এই শরীরের ‘ঝাঁকুনি’ মানে দুলুনি। দ্বিতীয়ত,চাপার জোরের সঙ্গে চাপামারার একটা সম্পর্ক আছে। আর ‘চাপা’র পুরোটা জুড়েই থাকে মিথ্যা। অথচ এই মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে অ্যাটোমের কতোই না চাপ।
৬.
স্লোগান নিয়ে আলোচনার সময় একটি বিষয় বারবার মাথায় আসছিলো। উদ্দেশ্যের কথা কিন্তু কেউ মুখ ফুটে বলে না। পণ্যের তুলনায় মোড়ক যেমন আকর্ষণীয় হয়,উদ্দেশ্যের তুলনায় স্লোগানও তেমনই আকর্ষণীয়। স্লোগানে কখনো নেপথ্যের মূল বিষয় উঠে আসে না। কর্পোরেট হাউজগুলো ‘নিমফলে’ সুগন্ধি মেখে ‘কস্তুরি’ নামে বাজারজাত করছে। সেই সঙ্গে এর ভোক্তাও তৈরি করছে,রাখছে ধরেও। যাক সেসব কথা,এতোক্ষণ এ বয়ান অনেকভাবেই দেওয়া আছে। আলোচনা শেষ করবো। তবে তার আগে পাঠকদের মাধ্যমে আমজনতার উদ্দেশে বলতে চাই-
আজকের দিনে ফোন কোম্পানি থেকে শুরু করে প্রসাধনী বলুন আর প্রিন্ট-ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াই বলুন,সবাই আমার-আপনার ‘কল্যাণে’ নিয়োজিত;আর ‘উন্নতিতে’ এভারেস্টের চূড়ায় নিয়ে যেতে পার করছে ব্যস্ত সময়। তাদের দেওয়া স্লোগানে এমনটিই মনে হয়। আমরাও ‘এভারেস্ট জয়ী’ হওয়ার দীপ্ত আকাঙ্ক্ষায় উন্মাদ। পাঠক,ঘোর কাটিয়ে চেতনায় ফিরে আসুন। জগতটাকে নতুন করে দেখুন,ভাবুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, কেনো ‘কাছে নিয়ে আসতে’ ব্যস্ত গ্রামীণফোন,সময়ের পরিক্রমায় নিয়ে যেতে চাইছে ‘দূরে’? আর প্যানথারকেই কেনোবা সত্যিকারের ‘আসল পুরুষ’ হতে হয়? উত্তর একটাই ব্যবসা,পুঁজি।
লেখক : কাওসার বকুল ও ইব্রাহীম খলিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
bokulmcj71@gmail.com
ibrahimrumcj@gmail
তথ্যসূত্র
১. চক্রবর্তী,রবি ও কলিম খান (২০০৮:১৩৭); ‘বাংলাভাষা ও ভাষার উৎপত্তি-রহস্য’; বাংলাভাষা : প্রাচ্যের সম্পদ ও রবীন্দ্রনাথ; ভাষাবিন্যাস,কলকাতা।
২. ফ্রয়েড,সিগমুন্ড (২০০৫ : ১২-১৩); মনোসমীক্ষণ মতধারা; অনুবাদ-মঞ্জুর আহমেদ;জ্ঞানকোষ প্রকাশনী,৩৮/২ক বাংলাবাজার,ঢাকা ১১০০।
৩. খান,কলিম (বাংলা ১৪০৬ : ১০৮); ‘বিশুদ্ধিবাদ ও পোস্টমডার্নিজ’; দিশা থেকে বিদিশায় নতুন সহস্রাব্দের প্রবেশবার্তা; হাওয়া ঊণপঞ্চাশ প্রকাশনী,কলকাতা।
৪. প্রাগুক্ত; খান,কলিম (১৪০৬ : ১০৮-১০৯)।
৫. প্রাগুক্ত; খান,কলিম (১৪০৬ : ১০৯)।
৬. প্রাগুক্ত; খান,কলিম (১৪০৬ : ১০৬)।
৭. প্রাগুক্ত; খান,কলিম (১৪০৬ : ১০৮)।
৮. প্রাগুক্ত; খান,কলিম (১৪০৬ : ১০৮)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন