Magic Lanthon

               

দেবাশীষ কে. রায়

প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলে গেলো, বলে গেলো না...

আধুনিক ‘রবীন্দ্র-প্যাকেজে’ ঋতুপর্ণের নৌকাডুবি

দেবাশীষ কে. রায়

 

১.

পৃথিবীর মায়া কিংবা বলা যায় চলচ্চিত্রের মায়া ত্যাগ করে অনেকটা আকস্মিকভাবেই চলে গেলেন ভুবনখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চলচ্চিত্রবোদ্ধার তালিকায় বোধহয় সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের পরের ঘরটিতে ঋতুপর্ণের নামই বসবে। চলচ্চিত্রে আসক্ত এই মানুষটি ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের শ্যাওলা পড়া হলুদ বাড়িটিতে জন্মেছিলেন। বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা আর মা ছিলেন চিত্রশিল্পী; তাই তার বেড়ে ওঠা অনেকটা চলচ্চিত্রিক আবহের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই আবহের মধ্য থেকে নতুন নতুন আবহ তৈরির জন্য এই মানুষটিকে পৃথিবী সময় দিয়েছিলো মাত্র ৪৯ বছর। বলাই যায়,দর্শকের সঙ্গে,মানুষের সঙ্গে,চলচ্চিত্রের সঙ্গে দেনা-পাওনার ন্যূনতম হিসাব মেলাতে এ সময় যথেষ্ট নয়।

শুরুটা সেই ১৯৯২-তে। ১৯৯২ থেকে ২০১৩।মাত্র ২০ বছরের ক্যারিয়ারে প্রতিভার স্বাক্ষর এঁকে দিয়েছেন ১৯টি সফল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে;সঙ্গে আদায় করে নিয়েছিলেন দর্শককূলের অকুণ্ঠ সমীহ। তার নির্মিত ১৯টি চলচ্চিত্রের ১২টি কোনো না কোনো শাখায় জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারটি তাকে মূল্যায়নের বিচারকে অনেক সহজ করে দেয়। শুরুটা ছিলো হীরের আংটি দিয়ে। একরকম সীমিত পরিসরেই সিনেজগতে আত্মপ্রকাশ তার। ওই একই বছরঋতুপর্ণ নির্মাণ করেন তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ঊনিশে এপ্রিল।এটির মধ্য দিয়ে ১৯৯৫ সালে কাহিনীচিত্র শাখায় শ্রেষ্ঠ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার জোটে তার কর্মের। এরপর বৌদ্ধিক মনন আর নান্দনিকতার সিগনেচার মার্ক হয়ে এগোতে থাকলেন সামনের দিকে। এরপর কেবলই এগোনো। কিন্তু মৃত্যু নামক প্রতিকারবিহীন এক সীমারেখা তার জীবনের ইতি টেনে দিলো। চলচ্চিত্রজগৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন হারালো ঋতুপর্ণকে;ঠিক যেভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো আমাদের তারেক মাসুদকে।

ঋতুপর্ণ ক্যামেরার পিছনের জাদুর সঙ্গে ক্যামেরার সামনেও নিজের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখিয়েছিলেন বেশ কটি চলচ্চিত্রে। প্রথম অভিনয় ২০০৩ সালে কাথা দেইথিলি মা কু নামের একটি উড়িয়া চলচ্চিত্রে। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১-তে এসে ঋতু দুটো ব্যতিক্রমী চরিত্রে রূপ দেন,কৌশিক গাঙ্গুলির আরেকটি প্রেমের গল্প এবং সঞ্জয় নাগের মেমোরিজ ইন মার্চ চলচ্চিত্রে। তারপর আবার ২০১২-তে নিজের সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত কাহিনীচিত্র চিত্রাঙ্গদাতেও তিনি নিজেই হাজিরা দিলেন জটিল মনোদৈহিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাওয়া কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে।

শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের অহমের পাশাপাশি তাদের মন ও সম্পর্কের সঙ্কট-স্বরূপ বরাবরই তার চলচ্চিত্রের গল্পের বাস্তুভিটে। অতি উচ্চকিত না করেও একটা চলচ্চিত্রের টাইটেল থেকে শুরু করে প্রতিটি শব্দ,প্রতিটি গান,প্রতিটি দৃশ্যের,প্রতিটি ক্ষণ আর কোণ কী করে কতোটা গভীর-সুচারুরূপে প্রকাশ করা যায়;তিনি আয়ত্ত করেছিলেন সেই মহামন্ত্র। চলচ্চিত্রায়ণে নিজেকে প্রখ্যাত সুইডিস পরিচালক ইঙ্গমার বার্গম্যান আর সত্যজিৎ রায়ের ভক্ত অনুসারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেছেন বিনম্র সততায়। আর বিষয়-অনুষঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তার অনুরাগ ছিলো দেদীপ্যমান। আর তাই বুঝি তিনি যত্ন আর সম্পূর্ণ নৈপুণ্যতা খাটিয়ে নির্মাণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে নৌকাডুবিচোখের বালির মতো খেতাবপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলো।

এই বিবিধতার মধ্য দিয়ে আমাদের বুঝে নিতে কষ্ট হয় না যে,সেলুলয়েডে গল্প বলা ঋতুপর্ণ সবার অলক্ষে নিজেই একটি গল্প হয়ে উঠেছেন। তার চলচ্চিত্রের চেয়ে যা কোনো অংশেই কম নয়।আমরা যারা তার চলচ্চিত্রের অকুণ্ঠ সমর্থনকারী;তারা অবিরাম সেই গল্পে মশগুল থাকি। আর তাই তার প্রয়াণের (৩০ মে ২০১৩) সংবাদে আমরা মর্মাহত হই।বিচলিত হয়ে ভাবতে থাকি,এমন হবে কেনো তার চলে যাওয়াটা (?);তা অবিশ্বাসের মতোই ঠেকে এখনো। হারিয়ে গেলো বাঙালির হীরের আংটিটি। স্তব্ধ হলো একটি ধারার,একটি প্রবাহের। যে প্রবাহ হয়তো বাঙালির জীবনে কিছুটা জরুরি-ই ছিলো বৈকি! এখন শুধু তার সৃষ্টিকর্মের আড়ালেই বারবার তাকে খুঁজে ফেরার চেষ্টা।

২.

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বা তার টেক্সট ধরে কাজ করার সময় ঋতু স্বাক্ষর রেখেছেন প্রজ্ঞার,এ কথা অস্বীকার তার শত্রুর জন্যও কঠিন। তিনি যথাসম্ভব নৈপুণ্যের তুলি এঁকে দিয়েছেন,তার সহজাত সৃজনশীলতায়। মধ্যবিত্তের কাছে কিঞ্চিৎ দুর্বোধ্য বলে যে রবীঠাকুর অভিযুক্ত,সেই রবীন্দ্রনাথকে তিনি সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে। আর এ চলচ্চিত্রগুলো বিশ্ব-চলচ্চিত্র ভাণ্ডারে স্থান করে নিয়েছে অনায়াসে। তার শৈল্পিক নৈপুণ্যে পূর্ণতা দিতে সচেষ্ট থেকেছেন সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে। দুটো চলচ্চিত্রের মধ্যে নৌকাডুবি নিয়ে আজ কিছু বলবার ইচ্ছেপোষণ করছি।

নৌকাডুবি উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশ হয় ১৯০৫ সালে। অর্থাৎ সেই বঙ্গভঙ্গ সময়কালের কথা। তার থেকে শত বছর পরে,একবিংশ শতকে এসে সেই কাহিনীকে চিত্রায়ণের মাধ্যমে দর্শকনন্দিত করবার যে প্রয়াস ঋতু দেখিয়েছেন,তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু,সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে যে কঠিনতর পথ অতিক্রম করতে হয়;সেই পথ ঋতু অনেকটা মাড়ালেও কিছু অংশ বাদ পড়ে গেছে তার বিনির্মাণে। বাদ পড়া অংশের কারণে যেটি দাঁড়িয়েছে,সেটি সম্পর্কে নেতিবাচক ঢঙে যেটা বলা যায় তাহলো,একবিংশ শতকে এসে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে দর্শকের কাছে তিনি তুলে দিয়েছেন রবীন্দ্র-প্যাকেজ-এর মধ্য দিয়ে। প্যাকেজ মানে অনেকটা নতুন রবীন্দ্রনাথ। যাকে বলা যায়,বিশ্বায়নের এই বাজারে অভ্যস্ত বাঙালির জন্য তৈরি করে যাওয়া এক মাপসই রবীন্দ্র-উপভোগ। যেখানে কিনা ঘটনার পরম্পরাকে গৌণ করে শুধু রাবীন্দ্রিক ঢঙটা প্রকটভাবে প্রস্ফুটিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ যেখানে ঘটনার গ্রন্থনকে দমিয়ে অনেক কিছু অসম্পূর্ণ রাখেন,চলচ্চিত্রে সেখানে তাকে পূর্ণতা দেওয়া হয় নাটকীয়তা আরোপের মাধ্যমে। গানের বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ব্যবহার করা হয় পুরোপুরি রিমেক করে। আর অভিনয় ও সাজসজ্জা হয়ে থাকে এ কালের গ্ল্যামারে সমৃদ্ধ-এই হলো আধুনিককালের রবীন্দ্র-প্যাকেজ

বলছিলাম,সাহিত্য আর রবীন্দ্রনাথকে নির্মাণের বিষয়ে। আদতে,হয়তো ঋতুর নৌকাডুবিতে রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবি উপন্যাসের বাইরে এসে কিছু ঘটনার গ্রন্থন অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। আর সেজন্যই একটি পারিবারিক কেচ্ছাকে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছিলো রাবীন্দ্রিক মোড়কে। ফলে নৌকাডুবি নির্মাণে সবদিক অনেকটাই ঠিকঠাক রাখার চেষ্টাটুকু থাকলেও,কিছু দিক একবারেই বাদ পড়ে গেছে ঋতুর সৃজনশীলতা এড়িয়ে।বিশেষ করে চলচ্চিত্রটির দৃশ্যায়নে;কাহিনীর প্রয়োজনেই যা প্রত্যেক নির্মাতার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে ধরা দেয়। উপন্যাসের নৌকাটি ডুবলেও চিত্রায়ণে ঋতুপর্ণ নৌকাকে ভাসমান অবস্থাতেই দেখিয়েছেন।

যাক সেসব কথা। এবার আসি চরিত্র বিশ্লেষণে। সমস্যাটা অন্যান্য চরিত্রগুলোতে যতোটা ছিলো না;ঠিক ততোটাই ছিলো রমেশকে নিয়ে। চিত্রায়ণেও যেমন নৌকাটিকে ভাসতেই দেখা গেছে;ঠিক তেমনি নায়ক রমেশকেও শেষতক ডুবতে বা হার মানতে হয়নি ঋতুপর্ণের হাতে। একশ বছরআগে রবীন্দ্রনাথের হাতে রমেশের সলিল সমাধি (কাহিনীর পরম্পরায়) ঘটলেও,ঋতুপর্ণ রমেশের সেই ট্র্যাজেডির নৌকা মিলনের ঘাটে ভিড়িয়ে দিয়েছেন সুনিপুণ হাতে। কারণ,উপন্যাসের সেই রমেশ আর ঋতুপর্ণের রমেশ যে একেবারেই আলাদা। কিন্তু উপন্যাসের সেই রমেশকে যদি একটি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করবার প্রয়াস চালানো হয়;তবে তার নাম হবে-দ্বিধা। রমেশের জীবনের শিকড় প্রোথিত গ্রামীণ সংস্কারাচ্ছন্ন এক পরিবারে। প্রতি মুহূর্তে সে এক অদ্ভুত টানাপড়েনের মধ্যে ভুগেছে। টানাপড়েনের সেই শিকড়কে মন থেকে উৎপাটনের শক্তিও রমেশের নেই;তা একেবারে গোড়ার অধ্যায়েই স্পষ্ট করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। হেমনলিনীর প্রতি অত্যুৎসাহী হয়েও সে গ্রামে রওনা হয়েছিলো। গ্রামে গিয়ে বাবার ঠিক করা বিয়েতে আপত্তি জানিয়েছে;তবে তা অতি মৃদু এবং দৈবের হাতে ছেড়ে দেওয়ার মতো।

কিন্তু ঋতুপর্ণের রমেশ তেমনটি নয়।গ্রামে সে যায় বাবার অসুস্থতার খবরে। শুধু তাই নয়।পিতৃভক্ত রমেশ হঠাৎ-ই তার বাবার সিদ্ধান্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তর্ক জুড়ে দেয় বাবার সঙ্গে। এমনকি তার মতের তোয়াক্কা না করে বিয়ে ঠিক করায়,বাবার সিদ্ধান্তকে সে ইংরেজি কপচিয়ে বলে ওঠে অ্যাবসার্ড।শহুরে ইংরেজি কপচানো রমেশের শিকড় ছিলো ওই গ্রামীণ জীবনে। আর তার ব্যবহারিক জীবনজুড়ে রয়েছে ঔপনিবেশিক আলোকপ্রাপ্ত নাগরিক জীবন। তার জীবনের এই দুই দ্যোতকের মতো উঠে আসে দুই নারী। একদিকে কমলা;যে তাকে সংস্কারের মধ্য দিয়ে গ্রহণ করতে চায়। অন্যদিকে হেমনলিনী;যে তাকে গ্রহণ করতে চায় আধুনিকতার ছায়াতলের ভিতর দিয়ে। এই তার দ্বিধাগ্রস্থতার মূল উৎস। আর মূল উপন্যাসের শেষে যেখানে ছিলো রমেশের অনির্দেশের পথে যাত্রা;চলচ্চিত্রে সেই রমেশ ফিরে এসেছে হেমনলিনীর কাছে। রমেশের দ্বিধাকে ঘিরে যে বড়ো সামাজিক দ্বিধার আখ্যানে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ;তা এখানে বিনষ্ট হয়েছে মাত্র। রমেশ এখানে হয়ে উঠেছে মিলনাত্মক নায়ক। কিন্তু উপন্যাসে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কিন্তু রমেশকে দেখিয়েছিলেন একটি ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে। যেখানে নৌকাডুবির ভূমিকাতেই সেই কথা উল্লেখ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই এভাবে,

 

ট্র্যাজেডির সর্বপ্রধান বাহন হয়ে রইলো হতভাগ্য রমেশ-তার দুঃখকাতরতা প্রতিমূখী মনোভাবের বিরুদ্ধতা নিয়ে তেমন নয় যেমন ঘটনা জালের দুর্মোচ্য জটিলতা নিয়ে। এই কারণে বিচারক যদি রচয়িতাকে অপরাধী করেন আমি উত্তর দেব না। কেবল বলব গল্পের মধ্যে যে অংশে বর্ণনায় এবং বেদনায় কবিত্বের স্পর্শ লেগেছে সেটাতে যদি রসের অপচয় না ঘটে থাকে তাহলে সমস্ত নৌকাডুবি থেকে সেই অংশে হয়তো কবির খ্যাতি কিছু কিছু বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

 

বলতে পারেন,ঋতুপর্ণ সম্পর্কে এতো নেতিবাচক কথা কেনো বলছি? আমার বোঝাবুঝির পাল্লায় এগুলো কিন্তু মোটেও নেতিবাচক কিছু নয়। কারণ এর চেয়ে বড়ো পরীক্ষা দিতে হয়,যখন কেউ সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে যান। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রনির্মাণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি,এখানে সবচেয়ে ঝুঁকির জায়গা হলো,এক জগতের পূর্ণাঙ্গ একটি কর্মকে আরেক জগতে এনে আরেকটি রূপে পরিপূর্ণতা দেওয়া। এখানে আপনি যদি বিনির্মাণ করতে যান,সেক্ষেত্রে হয়তো হুবহু অক্ষত রাখার দায় থেকে মুক্তি পাবেন!কিন্তু তখন মাতব্বরি করেছেন-এমন একটা দৃষ্টিতে আপনাকে দেখা হতে পারে। আর তখনি একটি চ্যালেঞ্জ এসে পড়বে আপনার ওপরে। আর যদি বিনির্মাণ না করে অনুরূপ করতে যান,তাহলেও আরেকটা মানদণ্ডে বিচার করা হবে আপনাকে;সেটি হলো যথার্থতার যথার্থতা। এই মাতব্বরিযথার্থতার পরীক্ষায় ঋতুপর্ণ সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র করার সময় বেশ বুদ্ধিমানের মতোই উত্তীর্ণ হয়েছেন। নৌকাডুবিতে আমরা তার মাতব্বরির মুন্সিয়ানা দেখেছি। কিছু না করে নির্ভুল থাকার চেয়ে সাহসিকতার মধ্যে ভুল করা অনেক ভালো।

৩.

চিত্রসমালোচক Roger Manvell বলেছিলেন,The film is a fictional medium, but is not novel; it is a dramatic medium, but is not a drama. সমালোচকের এই কথাটি অন্যান্য শিল্প শাখা সাহিত্যের সঙ্গে চলচ্চিত্রের মূলগত পার্থক্যটাকে স্পষ্ট ইঙ্গিত করে। ঔপন্যাসিক তার স্বকীয় অধিকারে নিজের অন্তর্দৃষ্টির মহৎ শক্তিতে তার সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে অবস্থান করতে পারেন।উপন্যাসের বিস্তৃত ক্রমবিকাশ হলো উপন্যাসের মধ্যকার অন্তর্দৃষ্টিজাত প্রণালীর বিবর্তন;যা চরিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণকে উপন্যাসের পৃষ্ঠায় তুলে ধরে। কিন্তু সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায়,সাহিত্যিক আচরণ পরিবর্তিত হয়ে তা চলচ্চিত্রিক আকার ধারণ করে। আর অনিবার্যবশত ছন্দপতন ঘটে যায় উপন্যাসের মূল সুরে। রূপ নেয় নতুন একটি অবয়ব;নতুন একটি চিত্র;একটি পূর্ণাঙ্গ কোনো শিল্পিত রূপ। আর এই কাজটিই পরম মমতায় নিজের সবটুকু দিয়ে গড়বার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।

৯০ দশকের পর সত্যজিৎ পরবর্তী সময়টাতে বাঙালি দর্শককূলে নাড়া দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। মধ্যবিত্ত বাঙালি সেখানে খুঁজে পেয়েছিলো তাদের চেনা চলচ্চিত্রের গল্প;এক অজানা আঙ্গিকে। তার সৃষ্টিকর্মগুলো দর্শকনন্দিত তো বটেই;একরকম সামাজিক স্বর হয়ে উঠছিলো। আর বাংলা চলচ্চিত্রের স্বরে নতুনমাত্রা যোগ করার দিকপালের সেই মুকুটটি নিশ্চয়ই শুধু ঋতুপর্ণের জন্যই। বাঙালির মননে তার সেলুলয়েডে বন্দি করা যে শিল্পকর্মগুলো তিনি রেখে গেলেন;তা বাঙালি আর যাই হোক,কখনো বিসর্জন দেবে না। কেননা,তিনি তো বাঙালিকে কিছু চাপিয়ে দেননি;বাঙালিকে বাধ্য করেননি মেনে নিতে। তবে,যা করেছিলেন তাহলো বাধ্য করেছিলেন মনে নিতে;আর এটাই তার কৃতিত্ব। মননআর সৃষ্টিশীলতা দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের ভিতটা আরো শক্ত করে গেলেন ঋতুপর্ণ। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন থেকে ছুটি নিয়ে আবহমান-এর পথে হেঁটে গেলেও দর্শকের অন্তরমহল-এ ঋতু বেঁচে রবে অনন্তকাল।

 

লেখক : দেবাশীষ কে. রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময়-এ প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

shish07ru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. ঠাকুর,রবীন্দ্রনাথ (২০১১:২০৩); রবীন্দ্র সমগ্র তৃতীয় খণ্ড; পাঠক সমাবেশ,ঢাকা।

২. ঘোষ,সোমেন (২০০৮:১২); সিনেমার ভাষা ও শিল্পতত্ত্ব; চলচ্চিত্রের ঘর বাহির; বাণীশিল্প, কলকাতা।

 

পাঠ সহায়িকা

১. অনুষ্টুপ; ৪৫ বর্ষ; ৩য় সংখ্যা ২০১১, কলকাতা।

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।  

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন