রুম্পা রায় ও হালিমা খুশি
প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সতী, অন্তর্জলী যাত্রা ও ওয়াটার : দাহ নারীর সেকাল একাল
রুম্পা রায় ও হালিমা খুশি
আমরা খুঁজছিলাম অন্য একটি শব্দের মানে, অভিধানে হঠাৎই চোখে পড়লো শব্দটি; মনে হলো দেখিনা, এর অর্থ কী আছে! দেখলাম, পুরুষ শব্দটির অর্থ করা হয়েছে-নর, মানুষ (মহাপুরুষ), ঈশ্বর।১ তৎক্ষনাৎ আমাদের কেনো জানি মনে হলো-দেখিতো নারীর সমার্থক কী করা হয়েছে? কৌতূহল পূরণ হয়ে সেখানে জায়গা করে নিলো হতাশা, অতঃপর ক্ষোভ। কারণ, সেখানে নারীর সমার্থক করা হয়েছে-রমণী, স্ত্রীলোক (নর-নারী), পত্নী (পরনারী)।২ নারীর অর্থ নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকলে আরও দু-একটি বই খোঁজার চেষ্টা করলাম। সেখানে খুঁজে পেলাম আরও বেশ কিছু অর্থ, নারী-‘ললনা, অঙ্গনা, কামিনী, বনিতা, মহিলা, বামা, নিতম্বিনী, সুন্দরী প্রভৃতি। নারী সুন্দর তাই সে সুন্দরী, রমণী; নারী কাম জাগায় তাই সে কামিনী, নিতম্বিনী; নারী মহলে থাকে তাই সে মহিলা।’৩ আবার শুধু স্ত্রী নয় স্ত্রীলোক অর্থাৎ নারীর একক কোনো সত্তা নেই; নারী মানুষ নয়, ঠিক মানুষের মতো।
অথচ কবি বলছেন, ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ কিন্তু কবি, আপনার এই স্বঘোষিত সত্যটি কি আজও সমাজ মেনে নিয়েছে? আজও নারী বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনী (মনের দিক থেকে); সে কেবল পণ্য নারী; চলচ্চিত্রের সর্বংসহা মমতাময়ী মাতা, সতী ও পতিব্রতা স্ত্রী, প্রেয়সী-যার প্রেম করা ছাড়া জগতে কোনো কাজ নেই।
এবারে বর্তমানের হাত ধরে অতীতে পাড়ি জমাই; দেখে আসি সেকালের নারীকে। ১৮২৯ সালের আগ পর্যন্ত একজন নারী, না ঠিক নারী হয়ে ওঠার আগেই তাকে পাঠানো হতো সম্পূর্ণ অপরিচিত কঠিন এক বাস্তব জগতে। বিদ্যাসাগরের মতে, তখন মনে করা হতো ‘অষ্টমবর্ষীয়া কন্যা দান করিলে পিতা-মাতার গৌরিদানের জন্য পূণ্যোদয় হয়; নবম-বর্ষীয়াকে দান করিলে পৃথ্বীদানের ফল লাভ হয়; দশমবর্ষীয়াকে পাত্রসাৎ করিলে পরত্র পবিত্রলোকপ্রাপ্তি হয়।’৪ পিতা-মাতার পূণ্য লাভের এই লোভের জুড়ি মেলা ভার। তাইতো জামাতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সব থেকে প্রিয় বস্তুটিকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে এতোটুকু বুকটা কেঁপে ওঠে না।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নারীকে সহ্য করতে হয়েছে চিতার এই দাহন। অমানবিকতাকে মানবিকতায় রূপ দিতে এগিয়ে আসেন রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এতে যেনো নারী পেলো আরও ক’টা দিন বেঁচে থাকার অধিকার। কিন্তু এক সময় এই বেঁচে থাকাকে মনে হতে লাগলো জীবন্মৃত। কেননা সেই জীবনে ছিলো না কোনো রঙের ছোঁয়া, নতুন কোনো প্রাণের ছোঁয়া। একদিন রঙহীন জীবনেও এলো রঙিন স্বপ্ন দেখার সুযোগ, যে-জীবন নতুন নাম পেলো পুনর্ভু (বিধবা নারীর পুনরায় বিবাহ দেওয়ার প্রথা)। একের পর এক নামের অলংকারে অলংকৃত নারীকে কিন্তু একটিবারের জন্যও ডাকা হলো না মানুষ বলে। নারী আজ প্রায় ২০০ বছর পরে এসে ‘আধুনিক’,‘উত্তরাধুনিক’ সমাজে গণমাধ্যম, রাষ্ট্র, ক্ষমতা কাঠামোর গ্যাঁড়াকলে পড়ে দৃশ্যত এগোলেও দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের জায়গাতেই। নারীর মানুষ হওয়ার চাওয়াটা আজও অধরাই থেকেছে। আমাদের আয়োজন নারীর এই অধরা চাওয়াকে নিয়ে।
পৌরাণিক থেকে প্রথাগত সতী
সনাতন সমাজের এক বর্বরোচিত প্রথা হিসেবে গণ্য হয়েছে সতীদাহ। হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে বা আত্মাহুতি দেবার এক ঐতিহাসিক প্রথা ছিলো এই সতীদাহ। সতীদাহের আগে বিধবাকে ধুতুরা খাইয়ে মাতাল করে নেওয়া হতো। তারপর চিতায় বসিয়ে দেওয়া হতো আগুন। চারিদিকে বাদ্যযন্ত্র বাজতো আর সতীকে ঢেকে দিতে সৃষ্টি করা হতো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। আগুনের তাপে যখনই বিধবার জ্ঞান আসতো সে চিৎকার করে নেমে আসতে চাইতো চিতা থেকে। আর তখনই লাঠির আঘাতে তাকে নির্মমভাবে হত্যার পর পোড়ানো হতো। বাদ্যযন্ত্রের তীব্র শব্দে সতীর আর্তনাদ আর কারো কানে পৌঁছাতো না। এই প্রথা সমাজে প্রচলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক-সনাতন ধর্মের শাস্ত্র তবে কি বর্বরতায় ভরপুর? এখন তাহলে আমরা দেখার চেষ্টা করি সনাতন ধর্মশাস্ত্র কী বলে?
আশ্চর্যের বিষয় হিন্দু শাস্ত্রের কোথাও কিন্তু উল্লেখ নেই-সদ্য বিধবা স্ত্রীকে স্বামীর সঙ্গে জোরপূর্বক ভস্ম করতে হবে। বরঞ্চ মনুসংহিতা ও অর্থশাস্ত্রের মতো স্মৃতিশাস্ত্রে বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদের বিধান দেওয়া আছে। তাহলে এখন আমরা একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই। গুপ্ত সাম্রাজ্যের (খৃষ্টাব্দ ৪০০) পূর্ব হতেই এ-প্রথার প্রচলন সম্পর্কে ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়। গ্রিক দিগ্বিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারতে এসেছিলেন ক্যাসান্ডিয়ার ঐতিহাসিক এরিস্টোবুলুস। তিনি টাক্সিলা (তক্ষশীলা) শহরে সতীদাহ প্রথার ঘটনা তার লেখনিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। গ্রিক জেনারেল ইউমেনেস এর এক ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায়; এ-ঘটনা ৩১৬ খৃষ্ট পূর্বাব্দের।
এ-তো গেলো ইতিহাসের দিক। এখন দেখি পৌরাণিক কাহিনী কী বলে? মূলত সতীদাহ শব্দটি এসেছে সতীর আত্মাহুতি থেকে। দক্ষরাজের কন্যা সতীর সঙ্গে কৈলাস অধিপতি শিবের বিবাহ হয়। সতী স্বামীগৃহ কৈলাসে বসবাস শুরু করেন। সতীর পিতা একবার আয়োজন করেন বিশাল যজ্ঞানুষ্ঠানের। যজ্ঞে নিমন্ত্রণ করা থেকে তিনি বাদ দেন কেবল জামাতাকে। সতীর কাছে পিতৃগৃহের খবর আসে। তিনি পিতৃগৃহে এসে বিশাল আয়োজন দেখতে পান। যজ্ঞ-মঞ্চে সতী দক্ষরাজের নিকট জানতে চান, কেনো তার স্বামীকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়নি? দক্ষরাজ তখন তার জামাতাকে উদ্দেশ করে অপমানকর কথা বলেন; যা স্বামী অনুগতা সতী সহ্য করতে পারেননি। ক্রোধে-অপমানে তিনি যজ্ঞের আহুতি-কুণ্ডে আত্মাহুতি দেন। এটিই ছিলো সতীদাহের শুরুর ইতিহাস। সেই সতীদাহের সঙ্গে স্বামীর মৃত্যুর কোনো সম্পর্কই ছিলো না।
পৌরাণিক কাহিনীর আরও কিছু ঘটনার দিকে আলোকপাত করা যাক। রামায়ণ-এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে রাম ও সীতা চরিত্রকে কেন্দ্র করে। অযোধ্যার রাজা হিসেবে অভিষেক হওয়ার মুহূর্তে পিতার কথা রক্ষার জন্য রামকে যেতে হয় ১৪ বছরের বনবাসে। তার সঙ্গে সহধর্মিনী সীতাও বনবাসী হন। রামের গৃহত্যাগের পরপরই পুত্র-শোকে রাজা দশরথ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তার তিন স্ত্রী কিন্তু বিধবা হিসেবেই বেঁচেছিলেন। শাস্ত্রে যদি কোনো নিয়ম থাকতো তাহলে তাদেরকেও ভস্ম হতে হতো। যেখানে অবতার রামচন্দ্রের জীবন সব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অনুকরণীয় সেখানে রামের পরিবারেও কিন্তু এমন ঘটনা ঘটেনি! বনবাসে গিয়ে রাবণের হাতে অপহৃত হন সীতা। তাকে উদ্ধার করতে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ বাধে রামের। যুদ্ধে জয়ী হয়ে ১৪ বছর পর তিনি সীতাসহ ফিরে আসেন নিজ রাজ্যে। সীতার অপহরণের কথাটি রাজ্যের সবাই জানতে পেরেই বাধলো বিপত্তি। প্রশ্ন উঠলো তার সতীত্ব নিয়ে। সতীত্ব প্রমাণের জন্য অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিলো সীতাকে। এটি কিন্তু কোনোক্রমেই স্বামীর সঙ্গে সহমরণের ঘটনা নয়।
শ্রীকৃষ্ণের যুগে ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজবংশ ছিলো হস্তিনাপুরের কুরু রাজবংশ। কুরু রাজবংশের ইতিহাসে অনেক বিধবা স্ত্রী পাওয়া যায়, যারা বহাল তবিয়তে বেঁচেছিলেন। প্রথমেই আসা যাক কুরু বংশের রাজা শান্তনুর দিকে। রাজা শান্তনু বিয়ে করেন সত্যবতীকে। সত্যবতীর গর্ভে শান্তনুর দুই পুত্র জন্মে। হঠাৎ করে জরাগ্রস্থ হয়ে শান্তনু মারা যান। তার মৃত্যুর পর সত্যবতী বিধবা হয়েই বেঁচেছিলেন। শান্তনুর পুত্র বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রী ছিলো। দুর্ভাগ্যক্রমে বিয়ের কিছুদিন পরে বিচিত্রবীর্য মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পরও দুই স্ত্রী বিধবা হিসেবেই বেঁচেছিলেন। বিচিত্রবীর্যের পরে কুরু রাজবংশের রাজা হন মহারাজ পাণ্ডু। পাণ্ডু প্রথমে কুন্তি এবং পরে মাদ্রীকে বিয়ে করেন। পাণ্ডুর মৃত্যুর পর মাদ্রী স্বামীর চিতায় স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দেন। মাদ্রী স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিলেও কুন্তি কিন্তু বিধবা হিসেবেই বেঁচেছিলেন। ইতিহাসের বয়ানে, স্বামীর মৃত্যুর পর আত্মাহুতির ঘটনা ঘটেছে-তবে তা ছিলো হাতেগোনা, সম্পূর্ণ স্ত্রীর ইচ্ছায়। সব সমাজেই ত্যাগকে সবসময় বড়ো করে দেখা হয়। তাই এই স্ত্রীরা সমাজে কালজয়ী ও পতি-অনুগতা হিসেবে মর্যাদা পেয়ে এসেছে।
বর্তমানে ফিরে আসি, আমরা দেখি ভালোবাসার জন্য, সম্ভ্রম হারিয়ে অনেকে আত্মহত্যা করে; আবার অনেকে চরম দুঃখে-কষ্টে আত্মহত্যা করে। বর্তমানে যখন এসব ঘটনা ঘটে, তেমনি অতীতেও এমন ঘটনা আশ্চর্যজনক কিছু ছিলো না। বর্তমানের এই আত্মহত্যাই ছিলো আগের আত্মাহুতি। এটি ছিলো নারীর ‘ইচ্ছার ওপর’, বলপ্রয়োগে নয়। নারীর এই যে ‘ইচ্ছা’ সেটিও কিন্তু তার নয়, নির্মিত। হাজার বছর ধরে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য থাকায় তার যে-একক কোনো সত্তা আছে-এই বোধটি গড়ে ওঠেনি। ফলে এক প্রকার ‘স্বশাসিত’ হয়েই নারী আত্মাহুতি দিয়েছে। তবে শাস্ত্র এটিকে কোনোভাবেই অবশ্য পালনীয় রীতি হিসেবে আদেশ দেয়নি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে শাস্ত্রে যেখানে কোথাও সতীদাহের কথা বলা হয়নি, তাহলে এই প্রথাটি এলো কোথা থেকে? এখন আসি সে-প্রসঙ্গে।
সতীদাহ প্রথার ব্যাপকতা শুরু হয় অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে। তবে ভারতের সব জায়গাতেই এ-প্রথার প্রচলন ছিলো না। আবার সব বিধবাকেও সতী হতে হয়নি। সতীদাহ প্রথা সর্বাধিক প্রচলিত ছিলো বঙ্গদেশে ও রাজপুতদের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আগ্রাসী শক্তি সে-সময় ভারত আক্রমণ করে। এই আগ্রাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিলো ধন-রত্ন লুটপাট করা। আর সঙ্গে নারীর প্রতি নির্মম আচরণতো ছিলোই। যেমনটি আমরা দেখি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও। সে-সময় অন্তঃপুরের নারীরা শত্রুর হাতে নির্যাতিত হওয়ার চেয়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণকে বেছে নিতো। এ-ধরনের আত্মাহুতিকে ‘জহর’ বলা হতো। সমাজও এমন দৃশ্য দেখার আগে নারীদের মৃত্যুর ব্যবস্থাই করে দিতো। যেমনটি দেখা যায় শেষ রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের প্রেমিকা ও স্ত্রী সংযুগিতার পরিণতিতে। এক যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহান পরাজিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কারও কারও মতে, চৌহানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছিলেন, আবার কেউ বলেন-তিনি সতী হয়েছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদ সতীদাহ প্রথা প্রচলনের পিছনে যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী ফলাফলকে দায়ী করেছেন।
আবার বলা হয়-সতীদাহ প্রথা এসেছে ব্রাহ্মণদের হাত ধরে। এই প্রথা বেশি প্রচলিত ছিলো সমাজের প্রাধান্যশীল মানুষের (ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়) মধ্যে। সে-সময় ব্রাহ্মণরাই ছিলো সমাজের রীতিনীতি নির্ধারক। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ-প্রথা অল্প অল্প করে এগিয়েছে। তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতো। কেননা সে-সময় রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে সমাজের নিম্নশ্রেণি পর্যন্ত ব্রাহ্মণদের প্রতিপত্তি ছিলো। তারা যা বলতো সবাই সেটিই বিশ্বাস করতো এবং তাদের নির্দেশিত পথেই চলতো সবাই। যেমনটি আমরা দেখতে পাই, ইউরোপে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে চার্চের প্রবল ভূমিকায়। সনাতন ধর্মের এসব বিষয়ের সঙ্গে আরও জড়িত ছিলো মান-সম্মান, প্রতিপত্তির বিষয়। উচ্চবর্ণের ধনী পরিবারগুলোতে মৃত্যুর পর সম্পত্তি অধিকার করার লোভে তার আত্মীয়রা সদ্য বিধবা স্ত্রীকে সহমরণে যেতে বাধ্য করতো।
সতীদাহ প্রথার আরও কারণ খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো হিন্দু পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কথা। যে-পিতৃতন্ত্রের রোষে হিন্দু নারীর অবস্থা হয়েছে আরও শোচনীয়। অন্যান্য পিতৃতন্ত্র নারীকে করেছে দাসী ও ভোগ্যসামগ্রী, সেখানে হিন্দু পিতৃতন্ত্র নারীকে গণ্য করেছে বলির পশু হিসেবে পুরুষের যূপকাষ্ঠে। তাইতো বিদ্যাসাগর গভীর ক্ষোভে বলেছিলেন,‘যে দেশের পুরুষজাতির দয়া নাই, ধর্ম নাই, ন্যায়-অন্যায় নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদসদ্বিবেচনা নাই, ...আর যেন সে দেশে হতভাগা অবলাজাতি জন্মগ্রহণ না করে।’৫
সতীদাহ রদ ও রাষ্ট্র-ক্ষমতার টানাপোড়েন
পুরুষ নির্মিত সতীদাহ প্রথা যেনো একেবারেই পাকাপোক্তভাবে সমাজে জাঁকিয়ে বসেছিলো। যাকে ভক্তি করেছে মানুষ ধর্ম বলে। তবে যেখানে ধর্মহীনতা বেশি সেখানেই জন্ম নেয় ধর্মপ্রবর্তকেরা, আর যেখানে পীড়ন বেশি সেখানেই ঘটে ত্রাতাদের আবির্ভাব। হয়তো সেই সময় নারী সবচেয়ে পীড়িত ছিলো ভারতে, তাই এখানেই প্রথম নারীত্রাতা হিসেবে দেখা দেন রাজা রামমোহন রায়। কোনো নারীকে নয় বরং এই অনাচারকে চিতায় দাহ করতে প্রথম এগিয়ে এলেন তিনি। মধ্যযুগের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পুরুষ তার পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে একজন মানুষ (পুরুষ) হিসেবে অন্য এক মানুষের পাশে দাঁড়ালো। ‘পৃথিবীর আর কোথাও রামমোহনের আগে নারীর পক্ষে কোনো পুরুষ কিছু লেখে নি, লড়াইয়ে নামে নি।’৬ এর আগে বিলেতে নারীর পক্ষে প্রথম যে পুরুষ বই লেখেন, তিনি হলেন দার্শনিক উইলিয়ম টমসন। তার বই ১৮২৫ সালে ‘মানবজাতির অর্ধেক, নারীদের আবেদন মানবজাতির অপর অর্ধেক, পুরুষদের দুরহঙ্কারের বিরুদ্ধে’ বেরোয়। কিন্তু তিনি হন শুধুই উপহাসের পাত্র।৭
যদিও ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে ১৮০৫ সালে পণ্ডিত ঘনশ্যাম শর্মা এবং ১৮১৭ সালে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার বিধান দেন যে,‘স্বামীর মৃত্যুতে তার চিতায় প্রাণ বিসর্জন দেওয়া বিধবা স্ত্রীর পক্ষে বাধ্যতামূলক নয়।’৮ কিন্তু এই কুপ্রথার যে-শিকড় মাটির গভীরে চলে গিয়েছিলো তা উপড়ে ফেলার শক্তি কিংবা সাহস কোনোটিই তাদের ছিলো না। তাই শুধু বিধান দিয়েই তারা দায়িত্বটুকু পালন করেছেন।
রামমোহনই সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে সেই শিকড় উপড়ে ফেলার বিদ্রোহী ঘোষণা দেন। সেটি ছিলো ১৮১২ সাল। আন্দোলনের অংশ হিসেবে জনমত গঠনের জন্য তিনি রচনা করেন সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ। এছাড়াও তার প্রকাশিত পত্রিকাতেও এ-বিষয়ক লেখা ছাপা হয়। এক সময় তিনি আর একা রইলেন না, একে একে তার সঙ্গী হলেন কলকাতার কিছু উদারপন্থি মানুষ। তাদেরকে নিয়ে ১৮১৮ সালে রামমোহন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এর কাছে দরখাস্ত দেন। কিন্তু এই প্রথাকে নিষিদ্ধ করতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকার দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়, পাছে জনসাধারণের রোষানলে পড়তে হয় এই ভয়ে। কিন্তু অবিচার অনাচারেরও তো একটা সীমা আছে। সেই গন্তব্যক্ষণটি হলো ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর, রামমোহনের তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার এই দিনে সতীদাহ উচ্ছেদ আইন প্রবর্তন করতে বাধ্য হন।
এতে হাতের পাঁচ আঙ্গুলের মতো কিছু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর উদয় হয়, যারা সতীদাহ প্রথাকে শাস্ত্রসম্মত মনে করে এই আদেশের বিরোধিতায় ইংল্যান্ডে প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন করে। কিন্তু ভয়ে থেমে থাকবার মানুষ নন রামমোহন। তাই তিনি নিজে ইংল্যান্ডে গিয়ে সতীদাহের সমর্থকের বিরুদ্ধে আবেদন করেন এবং সেখানেও জনমত তৈরির জন্য বই প্রকাশ করেন। অবশেষে প্রিভি কাউন্সিল ১৮৩২-এ সতীদাহ রদ বিরোধী আবেদন খারিজ করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত রামমোহন এতোগুলো মানুষ, তাদের বিশ্বাস, দেশাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সফলতার জয়ধ্বনি তোলেন। এতে করে নারী পায় আরেকবার ‘মানুষ’ হবার সুযোগ। কিন্তু আদতে কী নারীকে মানুষ হবার সুযোগ দেওয়া হলো নাকি শুধু অবস্থান্তর! আজ রাষ্ট্র বলছে সে-নারীকে দিয়েছে বাহিরে বের হওয়ার স্বাধীনতা, শিক্ষার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিন্তু এটা কি স্বাধীনতা নাকি স্বাধীনতার মোড়কে অনুশাসন! আজও নারী রাষ্ট্র বা পুরুষশাসিত সমাজের ঘেরাটোপে বন্দি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমগুলো বলে চলেছে নারীর ক্ষমতায়নের কথা, কিন্তু তারাই প্রতিদিন প্রতিক্ষণ নারীকে নির্মাণ করছে তার মতো করে। ১৯৪৫ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র আদর্শ নারী (নরমা) শরীর নির্মাণ করে। সেখানে নারীর উচ্চতা নির্ধারিত হয় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি এবং কোমর ৩১ ইঞ্চি। এই শরীর ছিলো ‘ফিট’, শক্তিশালী এবং সন্তান পুনরুৎপাদনক্ষম।
আর যুদ্ধবিধ্বস্ত আমেরিকার একান্ত কাম্য ছিলো এই আদর্শ শরীর। কিন্তু যখন টেলিভিশন আবিষ্কৃত হলো এবং যুদ্ধোত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পণ্য বেচার বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলো-পরিবর্তন হলো নারী শরীর। তখন নারী শরীর আর সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্র নয়, বিবেচিত হতে থাকলো সৌন্দর্য, যৌনতা আর ফ্যাশনের মাপকাঠি। চিকন-দুবলা-পলকা শরীর হতে থাকলো আদর্শ নারী শরীর।
এই যে-নারীর শরীর নির্মাণ, এতে তার স্বকীয়তা কোথায়? এখানে কি নারীর কোনো সৃজনশীলতা, মানুষ হিসেবে তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কোনো প্রক্রিয়া রয়েছে? যদি নাই থাকে তাহলে কী করে বলি নারী আজ মুক্ত? সৃজনশীলতার বদলে উদ্দেশ্যমুখিনতার একটি উদাহরণ দিই। শরীর সর্বস্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজকরা সুন্দর করে দুইটি কথা বলেন, ১. তারা নারীর ক্ষমতায়ন চান; ২. দৈহিক সৌন্দর্যই মূলকথা নয়, বুদ্ধিমত্তা বা ট্যালেন্টই হলো আসল বিষয়।৯ তাই যদি হবে তবে ১৯৬৬ সালে ভারত থেকে বিশ্বসুন্দরী নির্বাচিত করার ২৭ বছর পর ১৯৯৪ সালে সুস্মিতা সেন মিস ইউনিভার্স এবং ঐশ্বরিয়া রায়কে মিস ওয়ার্ল্ড নির্বাচন করা হলো কেনো?১০ এই ২৭ বছরে কি ভারতে কোনো সুন্দর মেয়ে জন্ম নেয়নি? আবার তার পরবর্তী ছয় বছরে নির্বাচিত হলো আরও ছয় জন। তার কারণ কি আসলেই ক্ষমতায়ন বা বুদ্ধিমত্তা যাচাই? মোটেও তা নয়, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো ভারতের বাজারে প্রবেশ। আর তারা খুব ভালো করেই জানতো-এখানে প্রবেশ করতে পারলেই পুরো এশিয়াতে তাদের বাজার সম্প্রসারণ করতে পারবে। তাহলে কী দাঁড়ালো, তাদের স্লোগান শুধুই কথার কথা-আসল উদ্দেশ্য নারীকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করা। সেই সতীদাহে নারীর যে-‘ইচ্ছা’র নির্মাণ করা হয়েছিলো, ২০০ বছর পরে এসেও নারীর গতিপথে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি? সেই নারী এখনও দাহ হচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন মাধ্যমে।
সতী ও অন্তর্জলী যাত্রা : বাদ্যের শব্দে ম্রিয়মাণ সতীর কান্না
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও দাস প্রথার উদ্ভব থেকে সৃষ্ট শ্রেণি-দ্বন্দ্বের সঙ্গে সঙ্গে নারী জাতির শোষণ-নিপীড়ন এবং পরাধীনতার যে-যুগ শুরু হয়েছিলো তা আজও বিদ্যমান। সময়ের সঙ্গে এই শোষণ-নিপীড়ন এবং পুরুষাধিপত্যের রূপ পরিবর্তিত হলেও তা আরও ভিন্ন মাত্রায় বিকশিত হয়েছে। শ্রেণি-দ্বন্দ্বের হাত ধরে যে-পিতৃতন্ত্র গড়ে উঠেছিলো তা রাষ্ট্রের বৈধতায় হয়ে উঠেছে আরও শক্তিশালী। পিতৃতন্ত্র সৃষ্টি করেছে নানা রকম প্রতিষ্ঠান, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে পরিবার। তবে সমাজ ও রাষ্ট্র সরাসরি নর-নারীদের ওপর তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এক্ষেত্রে পিতৃতন্ত্র পরিবারের আশ্রয়ে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করে প্রত্যেক ব্যক্তিকে; তাদের বাধ্য করে পিতৃতন্ত্রের বিধি মেনে চলতে। পরিবার তার সদস্যদের খাপ খাওয়ায় পিতৃতন্ত্রের আদর্শের সঙ্গে। ‘পরিবার অনেকটা পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র; আর পরিবার-রাষ্ট্রের পতি হচ্ছে পরিবারের প্রধান পুরুষটি। রাষ্ট্র পরিবারের প্রধান পুরুষটির মাধ্যমে শাসন করে নাগরিকদের। এ-শাসনের বিশেষ শিকার নারীরা।’১১
এর বাইরে পুরুষতন্ত্রের কবলে পড়ে নারী হয়ে উঠেছে কখনও দেবী, কখনও সতী, আবার কখনওবা সেবাদাসী। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো-সে মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি আজও। কালে কালে নারী হয়েছে বঞ্চিত, উপেক্ষিত, অবহেলিত। সমাজের কাছে সে নিগ্রহের পাত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। নারীর এই চিত্র নিয়ে নানা সময়ে নির্মাণ হয়েছে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু সিনেমা। এই আলোচনাটি এগিয়ে যাবে গৌতম ঘোষের অন্তর্জলী যাত্রা এবং অপর্ণা সেনের সতীর হাত ধরে। নারীর যে-চিরন্তন রূপ সেটি এই সিনেমা দুটিতে কীভাবে উঠে এসেছে তা দেখার চেষ্টা করবো।
ক. সতী পোড়ে, ঠাকুরের চোখ সোনা চিকচিকে
শশ্মান ঘাট। মৃত্যুপথযাত্রী এক বৃদ্ধ। তার পাশে চলছে হরি নাম। এমন অবস্থায় গণক ঠাকুর গণনায় দেখলেন-‘সীতারাম (বৃদ্ধ) একা যাবে না, দোসর নেবে’, অর্থাৎ বিবাহ। গণকের গণনা তো আর মিথ্যা হতে পারে না! তার ওপর আবার প্রজাপতি ব্রহ্মার দেখা। ব্রাহ্মণ বললেন, চাই কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যা; অলংকারে সজ্জিতা। বিবাহ দেওয়া, সতী পোড়ানো-সবই যে-তার দায়িত্ব। সেখানে প্রয়োজন পড়ে না কোনো ডোমের। এমনকি তাদের আশেপাশেও থাকতে দেওয়া হয় না। ডোম চিতা ছুঁলেই নাকি অপবিত্র হয়ে যাবে! একি শুধুই অপবিত্রতা নাকি তাদের চোখে যে-সোনার ঘোর লেগে আছে সেটি হাসিল করার এক ফন্দি? কারণ, সতীর চিতা খুঁজলেই পাওয়া যাবে তার গায়ের গহনাগুলি। এই চিত্র অন্তর্জলী যাত্রার।
সমাজ বদলায়। অন্তর্জলী যাত্রার এই সমাজও বদলেছে-সতীদাহ রদ হয়েছে, এসেছে বিধবা বিবাহ, তারপর ধীরে ধীরে আজকের বর্তমান। কিন্তু নারী যেনো ঘুরপাক খাচ্ছে সেই একই বৃত্তে। এই সমাজে সেই গণক ঠাকুর আর নেই, কিন্তু অন্য মোড়কে সে সর্বদা দৃশ্যমান। গণক ঠাকুর যেমন নিজেদের স্বার্থে নারীদের ব্যবহার করেছে তেমনই আজকের কথিত সভ্য সমাজে এসেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে এখন নারীকে ব্যবহার করা হচ্ছে একটু ভিন্নভাবে। বর্তমানের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর চোখেও লেগে আছে অন্য এক সোনার ঘোর। তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় পুরো বিশ্ব, চায় আরও আরও মুনাফা। আর এই সোনারূপী মুনাফা হাসিল করতে প্রতিনিয়ত তারা পুরুষের চোখে নারীকে দাহ করে চলেছে। মুনাফা লাভের আশায় ব্যবহার করছে একদল ‘সুন্দর দেহের’ নারী।
নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে এক মিথ্যে মায়াজালে আচ্ছন্ন রাখছে তাদের। এই ‘ক্ষমতায়ন’ তারা করতে চায় সুন্দরী-রাঁধুনী-আচার তৈরির প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। সেখানে নারীকে ভেঙে-চুরে নির্মাণ করা হয় তাদের মতো করে। আর তাইতো মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সুসান রাঙ্কল্ বলছেন,‘মিস ওয়ার্ল্ড হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাতে প্রতিযোগিনী নিজে অবদান রাখেন সামান্যই। বরং ‘এক্সপার্টরাই’ হচ্ছেন আসল লোক যারা মোট কাজের বেশিরভাগটা সম্পাদন করেন। খোদাই করে করে তারা তাকে একজন মিস ওয়ার্ল্ড-এর যেরকম হওয়া উচিৎ সেরকম আদর্শ বস্তুতে রূপান্তরিত করে ফেলেন।’১২ নারীর এই যে-রূপ তার পিছনে কাজ করে সমাজ, রাষ্ট্র ও পুরুষতন্ত্র। যেখানে পুরুষ হয়ে ওঠে নারীর বিধাতা। তাদের হাতে প্রতিনিয়ত জন্ম হয় নতুন এক নারীর। এই নির্মাণ চলে ততোক্ষণ, যতোক্ষণ থাকে তাদের প্রয়োজন। পণ্য বিক্রির হাটে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নারী মুখ এর প্রমাণ দেয়। একই সঙ্গে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে পুরুষের হাতে নারী নিজেই হয়ে উঠছে ‘পণ্য’। সমাজ, রাষ্ট্র ও পিতৃতন্ত্র তাদের সম্পর্কের পরিপূরকতায় উপভোগ করে এই রূপকে।
খ.ব্রাহ্মণের ইহকাল-পরকাল ‘সতীর হাতে’
স্বামীর সঙ্গে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিলে স্ত্রী যেমন স্বর্গবাসী হয়, পাশাপাশি মা-বাবার স্বর্গের রাস্তাটিও প্রশস্ত হয়। তাইতো অন্তর্জলী যাত্রায় ব্রাহ্মণ তার কন্যাকে সতী করার জন্য এতো ব্যাকুল। কন্যার হাতেই নাকি তার স্বর্গে যাওয়ার চাবিকাঠি। কন্যাকে চিতায় দাহ করেই যে, স্বর্গে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে! তাদের ইহকাল পরকাল সবই তার হাতে। বংশে কেউ সতী হলেই নাকি মুছে যাবে সব পাপ। তাইতো বলতে শোনা যায় ‘জয় সতী মায়ের জয়’। অন্যভাবে বললে ‘জয় পুরুষতন্ত্রের জয়’।
পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রে নারীকে নিয়োগ করা হয় কখনও মা, কখনও মেয়ে, কখনওবা গৃহিণীর ভূমিকায়; শুধু নারীরূপে তার মর্যাদা হয় না। নারী মর্যাদা লাভ করে কোনো পুরুষের মা, মেয়ে বা স্ত্রী হিসেবে। পিতৃতন্ত্রের সূচনা থেকে নারীকে দাসীরূপে প্রতিষ্ঠিত করার যে-প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিলো তার ক্রমপরিণতিতে নারীকে শুধু মর্যাদাহীনই করা হয়নি, তাকে করা হয়েছে শৃঙ্খলিত। নারীর জন্য পুরুষ তৈরি করেছে এমন এক ঘেরাটোপ-যার মধ্যেই তার বিচরণ। নারী যখন এই ঘেরাটোপ থেকে বের হতে চায় তখনই যেনো দেখা দেয় মহাবিপত্তি। নারীর শিক্ষা, বিয়ে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই; যতো চিন্তা নারীকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা নিয়ে। অন্তর্জলী যাত্রায় বাবা তার মেয়েকে স্বর্গে যাবার লোভে জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারতেও পিছপা হয় না। আবার মেয়েটিও তার এই পরিণতি মেনে নেয় অবলীলায়। বিষয়টিকে অনেকখানি ব্যাখ্যা করা যায়-মিশেল ফুকোর অনুশাসন-এর ধারণা দিয়ে। আধুনিক রাষ্ট্রে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যেখানে মানুষ কোনো ধরনের বল প্রয়োগ ছাড়াই নিজেকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সমর্পণ করে। এই অনুশাসন নারী ও পুরুষ সবার ক্ষেত্রে চলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। যে-কারণে পুরুষ যে-চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যের অধিকারীই হোক না কেনো নারীকে হতে হয় সতী নয়তো পতিব্রতা। না হলে দেশ-জাতি-রাষ্ট্র সব রসাতলে যায়! সমাজ নিয়ন্ত্রণ বা রক্ষার দায়িত্ব নারীকে অর্পণ করা না হলেও সমাজ ধ্বংসের দায়ভার যে-পুরোটাই নারীর, সেই জ্ঞান স্ব-শাসন প্রক্রিয়ায় সবার চিন্তা কাঠামোতে স্থান করে নেয় সহজেই।
এ প্রসঙ্গে এঙ্গেল্স-এর এই উক্তি অনেকখানিই প্রণিধানযোগ্য,‘অষ্টাদশ শতাব্দীর আলোকপ্রাপ্তির সময় থেকে যে সব অসম্ভব ধ্যান-ধারণা আমাদের সময় পর্যন্ত চলে এসেছে, তার মধ্যে একটা হলো এই যে, নারী যেন সমাজের সূচনা থেকেই পুরুষের দাস ছিল।’১৩ একদিকে পুরুষরা নিজেদের মনে করে এসেছে নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও তাদের প্রভু। বিপরীতে নারীরাও নিজেদেরকে পুরুষদের চেয়ে হেয় ও তাদের দাসী হিসেবেই মেনে নিয়েছে। এমনকি কখনও কখনও গৌরবও বোধ করেছে!
গ. অর্ধাঙ্গীর মোড়কে সেবাদাসী-কামরূপী
সনাতন ধর্মানুযায়ী মেয়ে, বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত; তাই বিয়ের সময় মেয়েকে অন্য অনেক অনুষঙ্গের সঙ্গে নগদ অর্থ দিয়ে পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। অর্থ দিতে না পারলে অনেক সময় বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যায়। মেয়ে যেনো শুধুই অর্থ পাওয়ার এক যন্ত্র! সতীতে দেখি হরির স্ত্রী-পুত্র থাকা সত্ত্বেও শুধু অর্থের লালসায় সে পুনরায় বিয়ে করে। তার বর্তমান স্ত্রীর কোনো মতামতও নেওয়া হয় না। স্ত্রী, সেতো কেবলই গৃহিণী-গৃহ পরিচর্যা, সন্তান উৎপাদন, লালন-পালন, আর পতিসেবাই যার কাজ। এতোগুলো কর্মে সে প্রধান ভূমিকায় থাকলেও, ভূমিকা নেই কেবল মতামত দেওয়ায়! পারিবারিক কোনো সিদ্ধান্তে সে কেবল নীরব দর্শক। তাই নিজের মতের সঙ্গে না মিললেও পরিবারের প্রধান পুরুষটির সিদ্ধান্তই মুখ বুঁজে মেনে নিতে হয়। তাইতো হরির স্ত্রীও নিশ্চুপ। অথচ এই নারী/স্ত্রীকে বলা হয় অর্ধাঙ্গী।
অন্যদিকে, নানা সম্পর্কের বাইরে ওই নারীই পুরুষের কাছে অনেকক্ষেত্রে হাজির থাকে কাম মেটাবার যন্ত্র হিসেবে। অনেকটাই ভোগ্যপণ্যের মতো। পণ্য ব্যবহারের পর খালি প্যাকেটটা যেমন ছুড়ে ফেলা হয়, ঠিক তেমনই পুরুষও যৌনক্ষুধা মিটিয়ে নারীকে ছুড়ে ফেলে আস্তাকুঁড়ে। পুরুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কর্মটি করে অতি কৌশলে। ভোগ করলেও তা প্রকাশে তার যতো বাধা। আবার প্রকাশ হলেও তার সব দায় ওই নারীরই; সেই নারীই হয় চরিত্রহীন! নাহলে পিতৃতন্ত্রের অস্তিত্বেই যে-টান পড়ে। নারীর গায়ে দোররা পড়ে, পুরুষ ঘোরে বুক ফুলিয়ে ভালো মানুষের বেশে। পুরুষের কামের কাছে সামাজিক সম্পর্কগুলোও অনেকক্ষেত্রেই ঠুনকো হয়ে যায়। সতীতে ভাইরূপী নবীনের বোবা উমাকে একা পেয়ে যৌনক্ষুধা মেটাতে কোনো সংশয় কাজ করে না। অথচ কাউকে যেনো না জানায়, সেজন্য উমাকে নিষেধ করতে সে ভোলে না। যার ফলে উমাকে শেষ পর্যন্ত দিতে হয় চরম মূল্য।
ঘ. অসাড়, অনড়ে নতুন জীবনের যাত্রা
কন্যাদায় বড় দায়! অবিবাহিত কন্যা ঘরে থাকলে সমাজে মুখ দেখানোই কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজের চোখে এরা এক প্রকার বোঝা। আর এ-বোঝার ভার লঘু করার জন্যই বুঝি কন্যাকে বিয়ে দেওয়া যায় মৃত্যুপথযাত্রী কোনো বৃদ্ধের সঙ্গে। অন্তর্জলী যাত্রায় ব্রাহ্মণ কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা এ-দায় থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছায় মেয়েকে অশীতিপর মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের হাতে তুলে দিতে পিছপা হয় না। কন্যাদায় থেকে বাঁচতে আবার অনড় কোনো বৃক্ষের সঙ্গে বিয়েকেও বৈধতা দেয় সমাজ। সতীতে বোবা উমার পাত্র খুঁজে ব্যর্থ বাবা যান পুরুতের কাছে। তিনি সমাধান দেন, লোকাচার অনুযায়ী বৃক্ষের সঙ্গে মনুষ্যের বিবাহের। এক্ষেত্রে বট-অশ্বত্থই শ্রেয়। কারণ, এ-বৃক্ষ নাকি সাক্ষাৎ নারায়ণ। পুরুতের কথা তো আর অমান্য করা যায় না। অতঃপর বৃক্ষের সঙ্গেই হয় বিয়ে। অথচ পুরুতের শিষ্য যখন প্রশ্ন তোলে লোকাচার অনুযায়ী শাস্ত্রে কোথায় আছে এই নিয়ম-তখন থাকে সে নিরুত্তর।
এই পুরুতের ন্যায় ইমাম, যাজকরা আজও অনেক সমাজের কর্তা। মনে করা হয়, তাদের যোগসাজশ স্বয়ং ঈশ্বরের সঙ্গে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর এই শ্রেণিটির থাকে একাধিপত্য। তারা যা বলে সাধারণ মানুষ তা অনেকক্ষেত্রেই বিশ্বাস করে, মেনে নেয়। তাদের মনগড়া কথা, যেটি কখনই শাস্ত্রে খুঁজলে পাওয়া যাবে না তা মেনে নেয় মঙ্গলকর মনে করে। বিধানটি আদৌ কোনো শাস্ত্রে আছে কি না তা খতিয়ে দেখার দুঃসাহস পর্যন্ত কেউ করে না। যেমনটি দুইশো বছর আগে করেনি সতীদাহ নামক ভয়ঙ্কর ওই প্রথাটির ক্ষেত্রে।
ওয়াটার : ক্রন্দিত নারী ও মায়াহীন সমাজ
পরনে একহারা সাদা রঙের শাড়ি, মাথায় ছোট ছোট চুল-এসবই বলে দেয় তারা আর ১০ জন সাধারণ নারীর মতো নয়, তারা স্বামীহারা;‘অর্ধমৃত’ বিধবা (শাস্ত্রমতে, স্ত্রী স্বামীর অংশ তাই স্বামীর মৃত্যু মানে স্ত্রীর অর্ধেক জীবন বিনাশ)। বাবার পরিবার, স্বামীর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সব বিধবাদের নিয়ে তাদের পরিবার। তাদের বাড়ি বিধবা-আশ্রম। এই আশ্রমে তাদের ঠাঁই হয় আমৃত্যু। তারা একঘরে নারীর দল; নিষিদ্ধ পল্লির বাসিন্দা, ওদের ছায়া মাড়ালে অমঙ্গল হয়, গায়ে ছোঁয়ালে পবিত্র হতে হয়; কোনো শুভ কাজে তাদের উপস্থিতি ঘোরতর অশুভ। কেবল বিধবা হয়েছে বলেই কি তারা মানুষ নামের প্রাণী থেকে নিকৃষ্টতায় রূপ নিয়েছে?
খাবারের বেলাতে কতোশত নিয়ম। সূর্যদেবতার মুখদর্শন বিনা খাওয়া নিষেধ। আমিষ খেতে মানা, তরকারি হবে রসুন, পেঁয়াজ মুক্ত। সেই আমিষের মধ্যেও পঞ্চ-শস্য (যব, সরিষার তেল, তিল, ডাল, আতপ চাল) খেতে বারণ, কারণ এসব খাবার উত্তেজক। বিধবাদেরতো মনের সঙ্গে শরীরের চাহিদাকেও গলা চেপে মেরে ফেলতে হয়। সমাজ এটিকে ধর্মীয় মোড়কে চাপিয়ে দেয়। একদিকে সমাজ বলছে বিধবা হয়েছো আত্মসংযম করো, অন্যদিকে কানে কানে বলছে-খেয়ে পড়ে বাঁচতে চাও, পতিতাবৃত্তি করো। নারীর এই রূপ দীপা মেহতার ওয়াটার-এর।
ক. সবকিছু যেনো লাড্ডুর মতো ঘোরে
গরুর গাড়ির পিছনে বসে আট বছরের মেয়েটি পা দুলিয়ে মনের আনন্দে আখ চিবোয়, পাশে শোয়ানো তার মৃত্যুপথযাত্রী স্বামী। বুঝতে কষ্ট হয় না, মরণাপন্ন স্বামীর প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ, সেতো বুঝতেই পারছে না স্বামীর মত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে সবটুকু। এমনটিই ওয়াটার-এর প্রথম দৃশ্যে। স্বামীর দেহত্যাগের পর ছোট্ট মেয়ে চুইয়ার আশ্রয় হয় নানা বয়সী ১৪ বিধবার সঙ্গে। সেখানে থাকে না তার কোনো আপনজন, নেই কোনো সহানুভূতি। তাই বড়োদের মতোই তাকেও উপবাস করতে হয়।
ইচ্ছে থাকলেও খেতে পায় না ভাজা-পোড়া, গায়ে চড়াতে পারে না রঙিন কাপড়। সঙ্গে শিখতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি। সিনেমাটিতে বুয়া চরিত্রের বৃদ্ধা স্বপ্নে, এমনকি জেগেও কেবল লাড্ডু দেখতে পান। তার জগতটা লাড্ডুর মধ্যে লাড্ডুর মতোই ঘুরপাক খায়। আসলে এখানে তাদের বেঁচে থাকাটাই অনেকটা দিল্লির লাড্ডুর মতো। ব্যাপারটা এমন যে, স্বামীর মৃত্যুর পর তাদের দাহ যেমন বেদনাদায়ক, তেমনই আশ্রম জীবনও। একইভাবে আমরা যদি আজকের এই সতীদাহ প্রথাহীন, আশ্রমহীন সমাজের কথা বলি, সেখানে কী দেখি? আজকের নারীরা কি সেই লাড্ডুওয়ালা বুয়া, চুইয়া কিংবা অন্যদের চেয়ে খুব বেশি ভালো আছে?
বিয়ের ১৫-২০ বছর পার করা একজন গৃহবাসী নারীর কাছে বিবাহিত প্রথম জীবনের সুখকর দু-একটি স্মৃতি অনেকটা লাড্ডুর মতোই ধরা দেয়। স্ত্রী, মা কিংবা বোনের যে-ডিসকোর্স তা তাকে লাড্ডুর গোল বৃত্তের মধ্যেই আবদ্ধ করে রাখে। জীবনের অল্পক্ষণের রঙিন সময়গুলো কেনো যেনো আজ তাদের কাছে সঙ্গীন মনে হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নারীর মনও কি তাহলে বুড়ো হয়ে যায়? আর যদি তাই হয়, তাহলে ৬০ বছরের পুরুষ জমিদার দ্বারকানাথের জন্য কেনো তরুণীর সঙ্গের দরকার পড়ে? আসলে বিষয়টি অনেকটা সিগারেটের ফিল্টারের মতো। নতুন একটি সিগারেটে টান যেমন তৃপ্তি দেয়, আবার যখন সেটা ফিল্টারের কাছাকাছি আসে সেটাকে ফেলে দেওয়া হয়, পিষে ফেলা হয় পা দিয়ে। আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যখন নারীকে দলিত হতে দেখি, তখন কবির মতো জানতে ইচ্ছে হয়, মুক্ত হবার কতো দেরি?
খ. রদবদলে হলো না পদবদল
বিধবা নারীর আশ্রমে যাওয়ার ব্যাপারটা অনেকটা শুকনো পাতার মতো। গাছ যেমন তার শুকনো পাতা ফেলে দেয়, ঠিক তেমনই স্বামীর মৃত্যুর পর সমাজ তাদের ফেলে দেয় আশ্রমে। মানুষ যেমন পাতাগুলো জ্বালিয়ে মেটায় তাদের খাদ্য আকাক্সক্ষা, তেমনই সমাজ বিশেষ করে পুরুষ মেটায় ভোগ। অথচ রামমোহন ১৭ বছর সংগ্রাম করেছেন সতীর সততার মোহজাল থেকে এই নারীকে মুক্ত করতে। কিন্তু যে-মুক্তির জন্য এতোটা পথ পাড়ি দেওয়া তা কেবল বন্দিত্বেরই নামান্তর। আশ্রমে তাদের ব্রহ্মচর্যের নামে কতোশত নিয়মের বালাই। অথচ টাকার জন্য লম্বা চুলে নদীর ওপারে যেতে ব্রহ্মচর্যের এতোটুকু বাধে না। তাইতো ওয়াটার-এর আট বছরের কল্যাণী তরুণী হলে তাকে পাঠানো হয় ব্রাহ্মণের মনোরঞ্জনের জন্য। তাকে বোঝানো হয় সে আশ্রমের রত্ন। এখন একটু পিছনে তাকাই, সতীদাহের সময় তাদের বলা হতো পূণ্যবতী, ভাগ্যবতী, স্বর্গবাসী। তাহলে দেখুন, ছলে বলে কৌশলে ‘আশ্রমের রত্ন বলে সমাজ কার্যসিদ্ধি করছে ঠিকই।
বিষয়টি অনেকটা নারীর ক্ষমতায়নের নামে সুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনের মতো। কিন্তু প্রশ্ন, কোথায় সেই ক্ষমতায়ন-নারীকে বিশাল বিলবোর্ডে অর্ধনগ্ন করে আটকে রেখে কীভাবে এগোবে সেই ক্ষমতায়ন? ব্যাপারগুলো এমন যে, চিতা থেকে আশ্রম আর আজ ঘর থেকে স্বল্প বসনে চলচ্চিত্রে, নাটকে, বিজ্ঞাপনে, বহুজাতিক কোম্পানিতে। অথচ অধিকারের বেলায়? যদি মিডিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কথাই বলি একজন নারী অভিনেতাকে টিকে থাকতে হলে পুরুষ-ক্যামেরাম্যান থেকে শুরু করে পুরুষ-পরিচালক পর্যন্ত কতোজনেরই না মনোরঞ্জনের বলি হতে হয়। তবে হ্যাঁ, এখানে অনেকে বলতে পারেন-নারীরা না গেলেইতো পারেন।
অন্যদিকে, তারাই আবার বুক ফুলিয়ে বলছেন-যদি নিজেকে সুন্দর মনে করো, তাহলে নিজের মেধা যাচাই করো,ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করো; তোমার নিজেকে চেনাতে আমরা বদ্ধপরিকর। বিষয়টি অনেকটা ‘চোরেরে কও (বলো) চুরি করো, গেরস্থে কও (বলো) ধরো ধরো’ গানটির মতো। আর এই নিজেকে চেনানো মানে কিন্তু ক্ষমতা যাচাই নয়/ক্ষমতায়ন নয়, বরং নারীর শরীরকে চেনানো। আর একটি বিষয় খেয়াল করুন, এই নারী যদি একবার তার ক্ষমতা বুঝেই ফেলে তাহলে তো সে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলবে; আর তখনই ব্যবসা উঠবে লাটে। তাই নারীকে পুরুষ ঘুড়ি বানিয়ে উড়িয়ে দিয়ে নাটাইখানা নিজের হাতে রাখতেই বেশি পছন্দ করে। আর নারী আজও নাটাই থেকে নিজেকে ছাড়ানোর শক্তি-সাহস কোনোটিই সঞ্চার করতে পারেনি, অন্যভাবে বললে-করতে দেওয়া হয়নি। তাই আজও সেই নারী চিতার সতী হয়েই আছে, তবে একটু অন্যভাবে, অন্যরূপে।
গ. আশ্রম টিকে থাকে পুরুষের ভোগে
হিন্দু শাস্ত্রমতে, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী ব্রহ্মচারী হতে পারে, চাইলে বিয়েও করতে পারে। শাস্ত্র যখন নারীকে এই স্বাধীনতা দিয়েছে তখন আলাদা করে আশ্রমের দরকার পড়লো কেনো, প্রশ্নটা এখানে? কেউ না কেউতো অবশ্যই লাভবান হচ্ছে। আসুন, আমরা ওয়াটার চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করি-এই কেউটা আসলে কে? আশ্রমের প্রধান ৭০ বয়সী মধুমতি যিনি বিধবাদের দিয়ে বেশ্যাবৃত্তি করান। আবার তিনি মনে করেন, যেভাবে তারা পবিত্র হয়ে বেঁচে আছেন সেভাবেই তারা মরবেন। অথচ কল্যাণী যখন জানতে চাইলো, কেনো তাকে নদীর ওপারে পাঠানো হয়েছিলো-উত্তরে তিনি বললেন ‘বেঁচে থাকার জন্য’।
যেখানে কল্যাণীর বেশ্যাবৃত্তির টাকায় কেনা খাবার খেতে পাপ নেই, সেখানে তার সঙ্গে বসে খেলে নাকি খাবার অপবিত্র হয়ে যায়। আবার ব্রাহ্মণের সঙ্গে রাত কাটালে নাকি পাপ নয় বরং পূণ্য হয়। এই যে, তাদের ভিতরে দ্বান্দ্বিক বিশ্বাস তৈরি করা, এটা কেনো? এর কারণ একদিকে যেমন পুরুষের যৌন তৃষ্ণা নিবারণ, অন্যদিকে তাদের সামাজিক মর্যাদা। সামাজিক মর্যাদা এই জন্য বলছি যে, ওই আশ্রম কোনো না কোনো ব্রাহ্মণেরই।
আজ হয়তো আশ্রমের এতোটা পাড়াপাড়ি নেই, কিন্তু অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূলমন্ত্রটি আজও রয়েছে অমলিন। ঠিক যেনো পুরনো গাড়িতে রঙ করে নতুন বলে চালিয়ে দেওয়া। হ্যাঁ, আমরা পতিতালয়ের কথা বলছি। এটাও এক ধরনের আশ্রম, তবে বিধবাদের নয়, সম্ভ্রমহীন হত দরিদ্রের আশ্রম-শরীরই যার একমাত্র মূলধন। ওয়াটার-এর আশ্রমের মতো এখানেও রয়েছে গোলাপীর মতো দালাল, আছে মধুমতির মতো দিদি আর রয়েছে দ্বারকানাথ এর মতো সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ। ১৯৩৮ সালের সেই আশ্রম আর আজকের পতিতালয়ের কোনো অমিল আছে কি?
ঘ. বিধবাবিবাহ আইন অতঃপর পরিণতির পুনরাবৃত্তি
ওয়াটার-এ পথ হারিয়ে ফেলা চুইয়াকে পৌঁছে দিতে এসে নারায়ণের সঙ্গে পরিচয় হয় কল্যাণীর। কল্যাণীকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় নারায়ণের। এক সময় তাদের প্রণয়ও হয়। কল্যাণী যেনো মনে মনে বলতে থাকে আমি যে আঁধারের বন্দিনী, আমারে আলোতে ডেকে নাও। কিন্তু যখনই নারায়ণ প্রচলিত সংস্কারের বাইরে এসে আলো দেখাতে চায়, তাদের সম্পর্কের একটা নাম দিতে চায়-তখনই বাধ সাধে সমাজ। কারণ, কল্যাণী যখন জানতে পারে দ্বারকানাথের ছেলে নারায়ণ; যে দ্বারকানাথ তারই শয্যাসঙ্গী, তখন সে আশ্রমে ফিরে যায়। কিন্তু মধুমতি আবারও তাকে নদীর ওপারে যাবার কথা বললে সে পানিতে ডুবে মরাটাকেই শ্রেয় মনে করে। কারণ, সমাজ তার জালখানা এমনভাবে বিছিয়ে রেখেছে যে-তার ভারী অংশখানি ভেদ করে বেরিয়ে আসা সহজসাধ্য নয়। তাইতো কল্যাণীর শেষ পরিণতি সেই মৃত্যুই। পার্থক্য শুধু সতীদাহে স্বামীর সঙ্গে দাহ, আর এখানে ‘ইচ্ছে’র সঙ্গে।
আজকের এই সময়ে এসেও কি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন এসেছে? তখনও যেমন সমাজ নারীর দেবীত্বকে সরল নয়নে দেখেছে, আজও তার বিন্দুমাত্র হেরফের হয়নি। পুনর্বিবাহের প্রশ্নে বিধবার জন্য ঠিক করা হয়-এমন ঘর যেখানে পত্নী বিগত, নয়তো কোনো সন্তান রেখে গেছেন। কিন্তু পুরুষের বেলায়! আর হবেই বা না কেনো পুরুষ কি আর দেবীত্ব হারায়? শুধু বিধবা নয়, সংসার ভাঙা কোনো নারীরও মর্যাদা এই সমাজ দিতে শেখেনি। বরং সমাজে তাদের অবস্থান মর্যাদাহীন। কেননা সমাজ ধরেই নিয়েছে সংসার ভাঙার দায়ভারটুকু সম্পূর্ণই তার। সব অপরাধের ভাগিদার যেনো তারাই।
লেখক : রুম্পা রায় ও হালিমা খুশি যথাক্রমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। হালিমা খুশি লেখালেখির পাশাপাশি নিয়মিত গান ও বিতর্ক করেন।
brattomcj@gmail.com
khushimcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. বিশ্বাস, শৈলেন্দ্র সংকলিত (২০১১ : ৫২৭); সংসদ বাংলা অভিধান; শিশু সাহিত্য সংসদ প্রা. লি., ৩২এ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, কলকাতা ৭০০০০৯।
২. প্রাগুক্ত; বিশ্বাস, শৈলেন্দ্র সংকলিত (২০১১ : ৪৫৭)।
৩. রাখী, রাহনুমা; ‘নারী কেনো শুধুই নারী’; মুক্তান্বেষা; সম্পাদনা-অজয় রায়; বর্ষ-৫, সংখ্যা-১, জানুয়ারি-২০১২, পৃষ্ঠা-৯, ২৭/১১/১-ক, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
৪. বিদ্যাসাগর, ঈশ্বরচন্দ্র (১৯৯৭ : ৫২৪); ‘বাল্যবিবাহের দোষ’; বিদ্যাসাগর রচনাবলি-১; সম্পাদনা-তীর্থপতি দত্ত; তুলি-কলম, ১ কলেজ রোড, কলকাতা-৯।
৫. আজাদ, হুমায়ুন (২০১১ : ২৭০); ‘রামমোহন ও বিদ্যাসাগর : প্রাণদাতা ও জীবনদাতা’; নারী; আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।
৬. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০১১ : ২৭১)।
৭. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০১১ : ২৭১)।
৮. http://www.milansagar.com/kobi/kobi-rajarammohanroy_porichiti.html
৯. হক, ফাহমিদুল (২০১১ : ৫২); ‘‘আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী’ ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি’; অসম্মতি উৎপাদন; সংহতি প্রকাশন, ১৮৫ সি আর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ধানমন্ডি, ঢাকা ১২০৫।
১০. প্রাগুক্ত; হক, ফাহমিদুল (২০১১ : ৫২)।
১১. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০১১ : ৩০)।
১২. রাঙ্কল, সুসান;‘সৌন্দর্য উৎপাদন’; সেলিম রেজা নিউটন অনূদিত; চন্দ্রাবতী; সম্পাদনা-সুস্মিতা চক্রবর্তী, বর্ষ-১, সংখ্যা-১, ফেব্রুয়ারি-২০০৬, পৃষ্ঠা-১৪২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
১৩. মুখোপাধ্যায়, কনক (২০০১ : ৫); মার্কসবাদ ও নারীমুক্তি; পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি, কলকাতা।
পাঠ সহায়িকা
খন্দকার, নাসরীন (২০১১);‘পুতুল খেলার রাজনীতি/বারবি কাহিনী’; প্রবল ও প্রান্তিক-১; সিরিজ সম্পাদক-রেহনুমা আহমেদ; সন্ধি প্রকাশনী, ৩৮/৪ বাংলা বাজার ঢাকা-১১০০।
http://prothom-aloblog.com/posts/7/16729
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন