ইমরান ফিরদাউস
প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
উজ্জ্বল আঁধারের মাঝে কায়াহীন ছায়া নতুন চলচ্চিত্রের দিকে তাকায়া যা দেখি
ইমরান ফিরদাউস

‘ছবি শুরু হতে দেরী আছে।মামা চা কিনলেন।আমার জন্য দু’পয়সার বাদাম এবং চানাভাজা কেনা হলো।মামা বললেন,এখন না।ছবি শুরু হলে খাবে।আমি ছবির শুরুর জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।চারদিকে লোকজন,হৈ চৈ কোলাহল নেশার মত লাগছে।বুক ধক্ ধক্ করছে না জানি কি দেখবো।ছবি শুরুর প্রথম ঘণ্টা পড়লো।সেই ঘণ্টাও অন্যরকম।বেজেই যাচ্ছে,থামছে না।লোকজন হলে ঢুকতে শুরু করছে-মামা ঢুকলেন না।আমাকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলেন।গম্ভীর গলায় বললেন,‘হিসু কর। ছবি শুরু হবে, আর বলবে হিসু, তাহলে কান ছিঁড়ে ফেলবো’ (প্রিয় পাঠক,মামা অন্য কিছু ছেঁড়ার কথা বলেছিলেন।সুরুচির কারণে তা উল্লেখ করছি না।)’১
মর্ত্যের কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ শৈশবে প্রথমবার সিনেমাহল দর্শনের অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই বর্ণনা করেছেন।এ রকম অভিজ্ঞতা আমরা আরো শুনে থাকবো বয়োজ্যেষ্ঠ বা পরিবারের বর্ষীয়ান সদস্যদের কাছে।আচ্ছা,এইটা কি শুধুই অভিজ্ঞতা নাকি একটা রিচুয়ালের বর্ণনা? চলচ্চিত্র দেখার এই যে প্রস্তুতি বা নিজেকে পর্দায় সম্পূর্ণভাবে সমর্পিত করে দেওয়ার আয়োজন তা একটা ‘তন্ত্রের’ মতোই শোনায়,না!
সারি সারি আসন , বড়োপর্দা, আঁধারে মোড়া বিশাল হলঘর আর এক কাপ নিস্তব্ধতা হাতে নিয়ে চুপচাপ সিনেমাতন্ত্রের আরশীনগরে প্রবেশ করার যে শাস্ত্রীয় আচার পালন তা-ই বোধ হয় চলচ্চিত্রকে নিয়ে যায় ‘লার্জার দ্যান লাইফের’ উচ্চতায়। এই ‘অনুভূতি’কেঘরে বসে ডিভিডি বা টরেন্ট বা সার্ভার থেকে ডাউনলোড করে দেখার সঙ্গে তুলনা করা কি জায়েজ হবে শুধুমাত্র হাতটা বাড়ালেই হার্ডড্রাইভে বন্দি করা যাচ্ছে এই দোহাই দিয়ে-পাঠক-পাঠিকা বাকিটা আপনার বিবেচনা।
এখন প্রশ্ন হলো,আপনি/আমি তো সিনেমাহলে গিয়েই ছবি দেখতে চান/চাই।কিন্তু সেইরকম ঝাঁ-চকচকে,বিনোদনে ঠাসা,ইক্টু চিন্তা জাগানিয়া আপনার ধরনের চলচ্চিত্র কই? তাকে তো উপর্যুপরি কল দিয়েও ধরা যায় না,সব কল-ই কেবলি হয়ে যায় মিসড্ কল,সেই নতুন চলচ্চিত্রের তরে।তাহলে, কোথায় পাই তারে!
চিন্তার কিছু নাই,হালফিলে আপনার টাইপের এইরকম অনেক চলচ্চিত্রের ‘আওয়াজ’ আমরা পাচ্ছি গণমাধ্যমের কল্যাণে।কিছু ছবি তো অলরেডি আমরা দেখেও ফেলেছি।অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগের বদৌলতে এই চলচ্চিত্রগুলোর আগমনী বার্তা আমরা যতোটা আড়ম্বরভাবে পেয়েছি,ঠিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর ওইসব চলচ্চিত্রের অর্জন নিয়ে ততোটা কি আহ্লাদ করতে পেরেছি-তা ভেবে দেখা যেতে পারে।
এইসব দিন-রাত্রির দুরবিনে চোখ লাগিয়ে আমরা যদি পিছন পানে তাকাই তবে দেখতে পাবো বিএফডিসি,যেটি একসময় বছরান্তে ৭০-৯০টি চলচ্চিত্র উৎপাদন করতো,তার সংখ্যা বর্তমানে ঠেকেছে ৪০-৫০টিতে।সংখ্যার অবনমনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের অধঃগতি ঘটেছে তা বলাই বাহুল্য।তবে,এইটাও হলফ করে বলা সম্ভব নয়,সংখ্যার আধিক্য থাকলেই বিএফডিসি গুণমানে অসাধারণ চলচ্চিত্রমালা উপহার দিয়ে দর্শকদের ব্যস্ত রাখিতো।
তো,ইদানীং এফডিসি নির্মিত যেসব চলচ্চিত্র আমাদের নজরকে বন্দি করেছে সেগুলোর মধ্যে এম এ জলিল প্রযোজিত দ্য স্পিড ও মোস্ট ওয়েলকাম দুইমাত্র ইন্ডাস্ট্রি প্রোডাক্ট;যা কিনা গ্রামীণ ও আর্বান দর্শকগোষ্ঠী তথা আমাদেরকে হলমুখী করেছে,যারা আর কী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইদানীং ভেবে থাকি বাংলাদেশ মানে ঢাকা!বাংলাদেশ তো আর ভ্যাটিকেন নয় যে, এক্টাই শহর আর ওইটাই দেশ;কিন্তু আমাদের মিডিয়া-কথিত নতুন চলচ্চিত্রের মিথস্ক্রিয়া দেখে মনে হয় ঢাকাতেই সব,ঢাকার বাইরে আরো যে ক্রোশের পর ক্রোশ গাঁও-গেরাম বিস্তৃত রয়েছে তাদের কথা কি ভাবছি আমরা? তাদের কি নতুন চলচ্চিত্রের ভোক্তা হওয়ার অধিকার থাকতে নেই!
গত বছর কয়েকের মধ্যে আরো যে চলচ্চিত্রগুলো শহুরেদের সিনেমাহল পর্যন্ত টেনে এনেছে, তার মধ্যে বলা যায়-গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মনপুরা,নোমান রবিনের কমন জেন্ডার,হুমায়ূন আহমেদের ঘেটুপুত্র কমলা,নাসিরউদ্দীন ইউসুফের গেরিলা,রেদওয়ান রনির চোরাবালি,মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার,টেলিভিশন-এই চলচ্চিত্রগুলো কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির সুবিধায় বানানো ইন্ডাস্ট্রির বাইরের চলচ্চিত্র বা আরো সুশীল জায়গা থেকে বলা যেতে পারে-স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমা।আমাদের রুচির (?) চাহিদা অনুযায়ী যাবতীয় উপকরণ নিয়ে হাজির আছে এই চলচ্চিত্রগুলো।গণমাধ্যমের বরাতে বলা যায়,এই চলচ্চিত্রগুলোর আলোয় লিখিত হতে যাচ্ছে বা হচ্ছে নতুন বাংলা চলচ্চিত্রের বয়ান।আর নির্মাতারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে বলতে চাইছেন তারা আর থাকবেন না চলচ্চিত্র ‘আর্ট না বাণিজ্য’-এই দোলাচলের বদ্ধঘরে।তারা নির্মাণ করতে চান একটা ‘ভালো ছবি’ যা ছবিঘরে আসা দর্শকদের ফেরত দিবে বিনোদনে পরিতৃপ্ত ক্লোজআপ হাসি।
এখন প্রশ্ন আসে,নতুন চলচ্চিত্র আসলে কী বস্তু? নতুন চলচ্চিত্র মানে কী অর্থে নতুন চলচ্চিত্র,এই অর্থে কি যে এখানে তথাকথিত ‘আর্ট-ফিল্মের’ মতো একটু জটিল কাহিনী ও ধীর তাল-লয়ের প্রোডাকশন হবে না,আবার মূলধারার বা ‘বাণিজ্যিক’ চলচ্চিত্রের মতন স্বল্প বাস্তবতায় মোড়ানো মারদাঙ্গা কোনো চলচ্চিত্রিক পরিবেশনাও নয়;নাকি আসলে তারা চাইছেন আর্ট ও বাণিজ্যের যৌগিক মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশে ছায়াচিত্র নির্মাণের নতুন সড়ক উন্মোচন করতে? আচ্ছা,যদি বাংলায় আর্ট ও ইন্ডাস্ট্রি দুইটার জন্য একটি শব্দ ‘শিল্প’ ব্যবহার না হতো, তাহলে চলচ্চিত্র ‘আর্ট’ না ‘বাণিজ্য’ এই তর্কের সম্যক সুরাহা হইতো কি? হয়তো ব্রহ্মা কইতে পারেন!
আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, যৌগিক মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় চলচ্চিত্রনির্মাণে ‘শিল্প’ ও ‘বাণিজ্যে’র মধ্যে সমঝোতার প্রশ্নে বিকল্প কোনো পথে না হেঁটে বরং তারা সমঝোতায় আসতে চাইছেন;যেনোবা আর্টের মধ্যে বাণিজ্যটারে ‘কালচার’ করা যায় নিরাপদভাবে,সেই ফিকির-ই করছেন।
পাঠক সমঝোতা শব্দে আপনার আপত্তি থাকলে আমার দুইটা কথা আছে।
তো,এতে কি বলা সম্ভব বাংলা চলচ্চিত্র নতুন ভাষা বা অভিমুখ খুঁজে পেয়েছে বা পাচ্ছে বা পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই,আছে সময়ের কাছে;তবে আমরা এইটা বলতেই পারি,আর কিছু না হোক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ব্যবসায় নতুনমাত্রা যোগ হয়েছে। এই চলচ্চিত্রগুলোর প্রকাশ আমাদের মনে এই প্রণোদনাই জাগায় যে চলচ্চিত্র বানালেই একদম মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে যাওয়ার মতো লসের সম্মুখীন হতে হবে না বা মেকিংয়ের কালে পকেটের লালবাত্তি জ্বলার অবস্থা হলেও কুচ পরোয়া নেহি,পরিবেশবান্ধব এনার্জি সেভিং বিজ্ঞাপন ঠিক ঠিক ঘর আলোয় ভাসিয়ে দেবে।অর্থ যা দাঁড়াইলো তা হলো একটা মূর্তিমান ইন্ডাস্ট্রি থাকা সত্ত্বেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বিকল্প আরেকটি ইন্ডাস্ট্রির দিকে।যার রিংমাস্টার লোকাল টিভি চ্যানেলগুলোর নির্মাণ সংস্থা।
ওকে,ফাইন!
এইটা কোনো সমস্যা না।ভালো তো!চলচ্চিত্র করে যদি কোনো টাকাই না আসে তাহলে নতুন চলচ্চিত্রের টাকা গৌরীসেন জোগাবে কোত্থেকে? হক কথা।
এও প্রকাশ থাকুক-নতুনদের চলচ্চিত্রের পোস্টার থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের কাহিনী এবং নির্মাণেও রয়েছে নতুনত্ব।
এই নতুনত্ব যতোটা না স্পষ্ট নির্মাণশৈলীর প্রযুক্তিগত দিক থেকে,তার চেয়ে অধিক স্পষ্ট নয় আঙ্গিক বা গল্প বলার ঢঙয়ের দিক থেকে এবং ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজের যথাযথ ব্যবহারের প্রশ্নে। যেভাবে আমরা সাদেক খানের নদী ও নারী,একটা জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া সেই সময়ের পটে নতুন ও সাহসী চলচ্চিত্র বলে ট্যাগ করতে পারি,এখন কি তা বলতে পারছি সহজেই!
ধরা যাক,জহির রায়হান যিনি বুঝতে পেরেছিলেন নতুন দিন আসছে,তাই নতুন ভোরের আগেই তিনি তৈরি হয়ে গেলেন জীবন থেকে নেয়া নিয়ে ১৯৭০-এ; ৭১-এর আগেই তিনি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ব্যবহার করে ফেললেন তার চলচ্চিত্রে।সাংঘাতিক এক দূরদর্শী ঘটনা!আবার এই জহির রায়হান-ই বানিয়ে ফেলেন তৎকালীন পাকিস্তানের ব্যবসা-সফল বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র বাহানা (১৯৬৫)।জীবন থেকে নেয়াকে যদি নতুন চলচ্চিত্র হিসেবে ভাবা যায়,তবে এইটা স্পষ্ট যে-নতুন ‘চলচ্চিত্রের ভাষা’ হতে হবে নয়া জার্গন ঋদ্ধ।উল্লেখ্য এই ভাষা চলচ্চিত্রের কুশীলবদের মুখের বুলি নয়।
জহিরকে দেখে আমাদের বুঝতে হবে,যদি সিস্টেম পাল্টাতে/নাড়া দিতে চাই,যদি নিজের কণ্ঠস্বরকে সময়ের লাউডস্পিকারে এলান করতে হয়,তবে সিস্টেমে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোনের দম থাকা চাই কলিজায়।সিস্টেমের সঙ্গে সমঝোতা করে বা এফডিসি'র সড়ক দ্বীপের উপর অভিমান নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে গলা ফাটানোতে সময়ের প্রয়োজনে নতুন চলচ্চিত্রের আবির্ভাব হবে না।
সর্বোপরি,জহির রায়হানের উপস্থিতি আমাদের বলে যায় লড়াইটা নিজের,প্রযোজক এই ফাইট দিবে না বরঞ্চ তাকে বাধ্য করা যেতে পারে এই ফাইটে শামিল হওয়ার জন্য।তাকে বাধ্য করার সমূহ অস্ত্র নির্মাতার তূণে যখন প্রস্তুত আছে সেখানে নির্মাতা কেনো আপোসকামী ভূমিকা নেবেন;তবেই না প্রতিবাদের নতুন ভাষা তৈরি হবে,প্রাণ পাবে নতুন চলচ্চিত্র।
আর যদি বলেন পাল্টাপাল্টির মধ্যে আমি নাই,আমি দিন বদলে বিশ্বাসী-তাহলে আর কী ‘দুপুরের খাবারের’ বদলে তবে ‘লাঞ্চটা’ সেরে ফেলুন চট করে...জানবেন-বদলে দেবার মধ্যে দিয়ে সমাজে ডিনামিক্স বা ডায়ালেক্ট তৈরি করা যায় না,তথাপি কোনো নহলী (নব) এনার্জির উদ্গীরণ হয় না।সমাজের তলে তলে তল্লাটে তল্লাটে তখনই সামাজিক গতিশক্তির সঞ্চার হয়,যখন একটি পোক্ত ফেনোমেনার হাজিরা থাকে প্রচলিত চলের বিপরীতে।
মহামান্য ওং কার ওয়াই মনে করেন,'একজন ফিল্মমেকার তো বটেই শিল্পী মাত্রই তাকে ‘সময়ের’ প্রতি এবং নিজের সাথে সৎ থাকতে হয় অর্থাৎ সিনেমা বা কাজটা একটা দায় নিয়ে করতে পারতে হয়।এই দায় ঈশপের দায় নয় যা আমাদের নির্মাতারা হরহামেশাই নিয়ে থাকেন;এই দায় মূলতঃ নির্মাতার 'নিজ'কে উদ্ধারের দায় বৈ ভিন্ন কিছু নয়।’২
পরবর্তী প্রশ্নের ঘরটা ফাঁকা আছে পাঠক-পাঠিকা আপনাদের তরে...
আপনি কি টের পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীদের লগ্নি ফেরত আনার দায়ে নির্মাতাদের ঝুঁকতে হচ্ছে ‘নব ফর্মুলা চলচ্চিত্র’ বা মিডিয়া-কথিত ‘নতুন চলচ্চিত্র’র পানে। এবং এই চলচ্চিত্রগুলো আদতে নতুন কোনো তরিকায় গল্প বলে উঠতে পারছে না,যেমতি সুরাহি বদল করলেই সুরার চরিত্র পুনর্বিন্যস্ত হয় না।আমরা তো জানি, দু’কলম লিখলেই যেমন তা কবিতা হয়ে যায় না,তেমনি কিছু অমায়িক বা ‘দুর্ধর্ষ’ মুহূর্ত ঘটনার বিনি সুতোয় গাঁথলেই তা চলচ্চিত্র হয়ে যায় না-চলচ্চিত্রটাকে দিনান্তে চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারতে হয়।আর এইটা তখনই সম্ভব হয় যখন নির্মাতার শিল্পকৌশল ও নৈপুণ্যের মেলবন্ধন ঘটে।নতুবা দেখা যাবে,দর্শকবৃন্দের আড্ডা একটা আস্ত চলচ্চিত্রের অজস্র ফ্রেমের বদলে শুধু ‘ওই ফ্রেমটা খেয়াল করছেন’-এর মধ্যে সীমায়িত রবে।
আপনার কী মনে হয়,ওই একটা ফ্রেমের জন্যই প্রযোজক/নির্মাতার এন্তেজাম বা উপভোগের নিমিত্তে আমাদের এতো আমোদ করে ছবিঘরে যাওয়ার চল রয়েছে!
দর্শক হিসেবে আমরা কিন্তু সাংঘাতিক বুভুক্ষু দশায় দিনাতিপাত করছি এবং এটাও সত্য বাঙালির ক্ষুধার রাজ্য বরাবরই গদ্যময়;তাই সামান্যতেই আমাদের উদরপূর্তি না হলেও মনটা কিন্তু ভরে যায় ভরপুরভাবে।আমরা বারংবার দেখেছি আমাদের দর্শকদের উচ্ছ্বসিত হতে সামান্য সিনেমাটিক মোমেন্টের ছোঁয়ায়,তা থেকে ধারণা করার স্পর্ধা পাই,পুরো চলচ্চিত্রটাই যদি সিনেমাটিক মোমেন্টে ডুবুডুবু হতো তাহলে নির্ঘাত ধুন্ধুমার বেঁধে যেতো!বহুজাতিক কোম্পানির মোড়কে পরিবেশিত ‘নতুন চলচ্চিত্র’-এর এই বৈশিষ্ট্যটি চোখে বালির মতন খচখচ করে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো-‘নতুন চলচ্চিত্র’-এর কারিগরগণ একদিকে যেমন সরাসরি আসছেন চলচ্চিত্র বানাতে আবার আরেকদিকে আছেন অডিও-ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার অন্যান্য শাখার মাঠকর্মে অভিজ্ঞ নির্মাতারা।অন্যান্য বলতে বলছি টিভি-নাটক,টিভিসি'র কথা।
তবে একজন নতুন নির্মাতার চাইতে বিনিয়োগকারীদের অধিক মনোযোগ থাকে এদের ওপর। শহুরে চাওয়া-পাওয়ার নিম্নচাপে ভোগা ‘শিক্ষিত মধ্যবিত্ত’ও ওই সব ইমেজ-কারিগরের ওপর ঈমান রাখতে চায়;কারণ তাদের চলচ্চিত্রগন্ধি টেলিভিশন প্রোডাকশনগুলো আমাদের ভাববার আহ্লাদ জাগায়,ঠিকঠাক সুযোগ পেলে তারা [হয়তো] পর্দা কাঁপানো চলচ্চিত্র পয়দা করতে পারেন!এ রূপ উত্তেজনা আর কাঁপা-কাঁপা হিয়া নিয়ে দর্শক যখন ছবিঘরে বসে,তখন...একি!কা-!!এবার চলচ্চিত্রের মতন চ-ল-চ্চি-ত্রে-র বদলে যেনো নাটকগন্ধি ছায়াচিত্রের অবতারণা পর্দাজুড়ে,সঙ্গে তিন আঙ্গুল পরিমাণ এক চিমটি সিনেমাটিক মোমেন্টের ফোড়ন।তখন মনে হয় ঘরের রিমোট কন্ট্রোলওয়ালা টেলিভিশনটাই ভালো।আর ভাবনার ফ্রিকোয়েন্সি মড্যুলার (এফএম )-এ যুগপৎ বেজে ওঠে পিট সিগারের ফুলগুলো সব গেলো কোথায়ের সুরে ‘আমাদের ছবি নাই বলেই গুলিস্তাঁগুলি সব বহুতল বিপণীবিতানে ধর্মান্তরিত হয়ে গেলো।’
নাটক-চলচ্চিত্র-বিজ্ঞাপন নিয়ে মুখরোচক বিতর্কের এই দেশে কর্পোরেট নিবেদিত চলচ্চিত্রগুলো হতে পারে এই সময়ে নির্মিত, হতে পারে সেখানে হাল আমলের গল্প হাজির থাকে-কিন্তু সার্বিক বিচারে তা কোনো নয়া ভূয়োদর্শন দিয়ে আমাদের অভিজ্ঞানের জগতে জায়গা করে নিতে পারছে না।‘নতুন চলচ্চিত্র’ না বলে আসলে এই রকমের চলচ্চিত্রগুলোকে পরিচিত করা হোক চলচ্চিত্র ব্যবসার নব ফর্মুলার প্রোডাক্ট হিসেবে,যা ‘নতুন চলচ্চিত্র’ নয় কোনোভাবেই।
‘যাই হোক,নতুন সিনেমায় যেন থাকে এই দেশের মানুষের সামাজিক,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।আর তা হোক শয়নভঙ্গির মতো সহজ স্বাভাবিক।বিশ্বগ্রামের মধ্যে আবহমান বাংলার গ্রামটুকুও জেগে থাকুক।জেগে জেগে ঘুমানোর দিন শেষ হোক।নতুন সিনেমায় বাংলাদেশের মুখ জলের সারল্যে মুদ্রিত হোক।অন্ধকার পর্দায় ফুটে উঠুক আলোর গান,প্রাণের কথা, মননের ভাষা।’৩
পাঠক-পাঠিকা,বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল আঁধারের মাঝে নতুন চলচ্চিত্রের সন্ধানে আপনার যাত্রা স্বাস্থ্যকর হোক!
লেখক : ইমরান ফিরদাউস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে একটি বেসরকারি নিউজ চ্যানেলে কর্মরত; সঙ্গে ফ্রিল্যান্স গবেষণা ও চলচ্চিত্রনির্মাণের ঝোঁকতো আছেই।
imranfirdaus17@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. আহমেদ,হুমায়ূন (১৯৯৬:১৩); ছবি বানানোর গল্প; সুবর্ণ, ঢাকা।
২. তিরার্দ,লরেন্তঁ (২০০২:১৯১); মুভিমেকার্স মাস্টার ক্লাস/প্রাইভেট লেসনস্ ফ্রম দ্য ওয়ার্ল্ড ফোরমোস্ট ডিরেক্টরস; ফেবার অ্যান্ড ফেবার,লন্ডন।
৩. আতিক,নূরুল আলম (২০০৯:৪০); নতুন সিনেমা,সময়ের প্রয়োজন; পান্ডুলিপি কারখানা,ঢাকা।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন