Magic Lanthon

               

তাহ্‌সিন আহমেদ

প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

টালিগঞ্জের ‘নতুন’ সিনেমা ‘উজান স্রোতের ডিঙি’

তাহ্‌সিন আহমেদ


‘ফিল্মকে আর্টিস্টিক করতে হইলে সর্বাগ্রে চাই গল্পের সুসমঞ্জস বিকাশ ও তার অভিনয় মনস্তত্ত্বেও নিখুঁত লীলা।’ ‘এখানে আদর্শ হিসেবে ধরা হচ্ছে গ্রিফিথের চলচ্চিত্রকে, জোর দেয়া হচ্ছে ‘মানবতা’ ও ‘স্বাভাবিকতা’র উপর, যেখানে গল্প বলার কাজটি ‘Natural chain ধরিয়া চলিবে; train of events স্বাভাবিক হইবে।’’

১৯২৪ সালে ‘নাচঘর’ পত্রিকার সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের ‘ফিল্মের আর্ট’ প্রবন্ধের উক্তি-১ ও তা ধরে সন্দিপন চক্রবর্তীর যে-উক্তি-২ তা ধরেই আলোচনা শুরু করছি। চলচ্চিত্র ইতিহাসের শুরুতে এর ‘শৈল্পিক’ মর্যাদার জন্য বিভিন্ন দেশে যে-আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো, তার একটু হাওয়া লেগেছিলো ভারতিয় উপমহাদেশেও। এখানে চলচ্চিত্র ইতিহাসের শুরু থেকেই সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের মতো, যাদের সাহস থাকলেও হয়তো পুঁজি ছিলো না, তাদের কেউ তুলে নিয়েছিলেন কলম; আর যাদের সুযোগ ঘটেছে, তারা সরাসরি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে এই ‘আন্দোলনের’ ভাগিদার হয়েছিলেন। ওই সময়ে বাংলার ‘প্রবাসী’, ‘নাচঘর’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘চিত্রলেখা’, ‘চিত্রপঞ্জী’ প্রভৃতি পত্রিকায় চলচ্চিত্রের এ-রকম নানা বিশ্লেষণমূলক সমালোচনা দেখা যেতো। বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র-কর্মীদের এ-রকম নানা আন্দোলনের ফলে, ইতিহাসের ৩৫ বছরের মধ্যেই একটি পরিপূর্ণ শিল্পমাধ্যম হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র।

ভারতের কলকাতা, মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র স্টুডিওগুলো গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকেই গড়ে উঠেছিলো। অবশ্য তার আগেই দাদা সাহেব ফালকের হাত ধরে গোড়াপত্তন হয় ভারতিয় চলচ্চিত্রের। তখনকার বেশিরভাগ চলচ্চিত্র ছিলো উপমহাদেশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন মিথ বা পুরাণ নির্ভর; অনেক সমালোচক এটিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশও বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। অন্যদিকে, এই মিথ থেকে বের হয়ে আসা টালিগঞ্জের অন্যান্য চলচ্চিত্রকারদের মধ্যেও এক ধরনের বাণিজ্যিক অভিপ্রায় কাজ করছিলো।

উপকরণের বিশেষত্ব অনুসারে কলারূপের বিশেষত্ব ঘটে। ছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ। এই দৃশ্যমান রূপের সৌন্দর্য বা মহিমা এমন করে পরিস্ফুট করা উচিত যা কোনো বাক্যের সাহায্য ব্যতীত আপনাকে সম্পূর্ণ সার্থক করতে পারে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথা ঠিক রাখতে পারেনি সত্যজিৎ-পূর্ব মূলধারার বাংলা চলচ্চিত্রকাররা। সত্যজিৎ-পূর্ব ভারতিয় বাংলা চলচ্চিত্রের শৈল্পিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে কারও নাম বলতে গেলে, আসে পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়া। স্বয়ং ঋত্বিক ঘটক খেয়াল করেছিলেন, কীভাবে প্রমথেশের গৃহদাহ (১৯৩৬) ও মুক্তি (১৯৩৭)-তে অসাধারণ সাবজেক্টিভ ক্যামেরার ব্যবহার হয়েছিলো; যার মধ্যে ছিলো শিল্পিত চলচ্চিত্রের উপাদান। তবে সে-সময়ে দু-একটি ছাড়া বেশিরভাগ ছিলো শিল্পমানহীন হালকা, চটুল বৈশিষ্ট্যের সিনেমা।

ভারতিয় বাংলা চলচ্চিত্রের মিথ, পুরাণ ও বাণিজ্যিক ধারার পাশাপাশি একটি শৈল্পিক যাত্রা শুরুর পিছনে কিছু বিষয় কাজ করেছিলো-

১৯১৪ সাল থেকে যাত্রা করা ভারতিয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সমালোচনা।

১৯৪৭ (৫ অক্টোবর)-ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি স্থাপন।

১৯৫০-জঁ রেনোয়ার কলকাতায় আগমন। ফিল্ম সোসাইটির সভ্যদের তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ। সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ রায়, কমলকুমার মজুমদার, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, নরেশ গুহ ও সুভাস সেনের চলচ্চিত্র (প্রথম পর্যায়) সংকলন প্রকাশ।

১৯৫১-পুদোভকিন ও চেরকাসভের কলকাতায় আগমন। ফিল্ম সোসাইটিতে তাঁর বক্তৃতা প্রদান।

১৯৫২-ভারতে প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অনুষ্ঠান।

১৯৫৫-সত্যজিতের পথের পাঁচালীর মুক্তি লাভ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে শিরোপা লাভ।

১৯৫৬-ফিল্ম সোসাইটির দ্বিতীয় পর্যায়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সংস্থার সঙ্গে এই ফিল্ম সোসাইটির যোগাযোগ স্থাপন। এই সব ঘটনার মধ্যে দিয়ে আর্টফিল্ম ও কর্মাশিয়াল ফিল্মের পার্থক্য একটা নির্দিষ্ট চেহারা তৈরি করে নিতে শুরু করে।

টালিগঞ্জের ইতিহাসে লক্ষণীয় বিষয়, মূলধারার সবচেয়ে সম্ভাবনা ছিলো দর্শককে শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র উপহার দেওয়া। কারণ, গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে গড়ে উঠেছিলো কলকাতার ফিল্ম স্টুডিও। তারপরেও সেই ইন্ডাস্ট্রির একটি মানে দাঁড়াতে পেরিয়ে গিয়েছিলো ৩০ বছরেরও বেশি সময়। সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋত্বিক, বিমল সেন-এর মতো অনেক বিখ্যাত পরিচালক ভারতিয় বাংলা চলচ্চিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেও এরা ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়মিত ছিলেন না। তাই একরকম বলা চলে, টালিগঞ্জের মূলধারা থেকে আর্টিস্টিক ধারা একটু দূরেই ছিলো। তবে ইদানিং এই অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে, এখন টালিগঞ্জে নিয়মিত এক ধরনের আর্টিস্টিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

দ্বান্দ্বিক জীবন আর এই সত্যকে সঙ্গে নিয়ে মানব সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপোড়েনের কাহিনী উঠে এসেছে এ-ধারার চলচ্চিত্রে। আর এই টানাপোড়েনে রয়েছে মনঃসমীক্ষণ, সিমিওলজি, উত্তর-আধুনিকতাবাদ, ডিসকোর্স ইত্যাদি জ্ঞানকাণ্ডের প্রভাব। মানবজীবন ও সিনেমাকে একই সুতায় গেঁথে এক নতুন আর্টিস্টিক চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন নতুন নির্মাতারা। আজকাল দেব, কোয়েল, জিৎ, শ্রাবন্তী কিংবা সোহমদের নিয়ে টালিগঞ্জের নায়ক-নায়িকা নির্ভর মূলধারার ট্রেন্ডকে পিছনে ফেলে কাহিনী বিন্যাসের মাধ্যমে শুধু নিজের দেশে নয়, বিদেশি বাজারে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে নতুন এই চলচ্চিত্র। নতুন শ্রেণির দর্শক নিয়ে গড়ে ওঠা দ্বান্দ্বিক-কাহিনীনির্ভর এই চলচ্চিত্রগুলোকে বলা হচ্ছে আর্ট ফিল্ম; যা বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে খুবই পরিচিত একটি প্রপঞ্চ। কয়েক বছর আগেও টালিগঞ্জের ক্ষেত্রে ভারতিয় বাংলা কিংবা বলিউডের ক্ষেত্রে হিন্দি সিনেমা আর হলিউডের সিনেমাকে ইংরেজি সিনেমা বলার প্রচলন ছিলো। এখন টালিগঞ্জের ক্ষেত্রে আর্ট ফিল্ম নামে আরেকটি ভাগ করতে হয়েছে।

পাঠক, মূল আলোচনার পূর্বে ইতিহাসের বয়ানে কিংবা বলতে পারেন তত্ত্বের কচকচানিতে এই নামটির যৌক্তিকতা নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই। তারপর কথা বলবো নব্য গড়ে ওঠা হাল আমলের টালিগঞ্জের আর্ট ফিল্ম নিয়ে; বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে এগুলো কী-বা দিচ্ছে দর্শককে; আর কেনোই-বা একটি শ্রেণির দর্শক এই সব চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকছে? সঙ্গে সঙ্গে এই ধারার সম্ভাবনা ও সঙ্কট নিয়েও কিছু আলোচনা করবো।

 

ইতিহাসের পরম্পরায় আর্ট আর ফিল্ম

ইংরেজি ‘Art Film’ শব্দটির বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় শৈল্পিক চলচ্চিত্র। এই আর্ট ফিল্ম আবার আর্ট হাউস ফিল্ম কিংবা আর্ট মুভি নামেও পরিচিত। এই শব্দগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মাথায় কাজ করে-একটু জটিল কাহিনী, ধীর তাল, লয় ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের চলচ্চিত্র। আর্ট শব্দটির সঙ্গে চলচ্চিত্রের যোগাযোগ ছিলো শুরু থেকেই। ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে চলচ্চিত্রের যে-যাত্রার শুরু, তা ছিলো বাস্তবতার যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন, যাকে বেশিরভাগ বোদ্ধারা শিল্প বলতে নারাজ ছিলেন। তাই লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় সিনেমা শুরু করলেও তাদের চলচ্চিত্রের সঙ্গে আর্টের তকমা লাগাতে পারেনি। মূলত লুমিয়েরদের পরে জজ মেঁলিয়ের, এডুইন এস পোর্টার, ডব্লিউ ডি গ্রিফিথ, পুদভকিন, কুলেশভ, সের্গেই আইজেনস্টাইন, চার্লি চ্যাপলিন প্রমুখের হাত ধরে শিল্প মাধ্যম হিসেবে যাত্রা শুরু করে চলচ্চিত্র। বলা হয়ে থাকে, ১৮৯৫ সালে যাত্রা শুরু করা চলচ্চিত্র ১৯৩০ সালের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে বিকশিত হয়েছিলো। তবে এই কাজটি সহজ ছিলো না; পৃথিবী জুড়ে চলচ্চিত্র-কর্মীদের নানা আন্দোলনের ফসল নবীনতম এই শিল্পটি। চলচ্চিত্র বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছিলো, তখন দেশে দেশে কালে কালে পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী সূচনা হয় নানা আন্দোলনের। জার্মানিতে এক্সপ্রেশনিজম, ফ্রান্সে সুররিয়ালিজম, ইতালিতে নিওরিয়ালিজম, ফ্রান্সে নিউওয়েভ, আমেরিকায় ডিরেক্ট সিনেমা কিংবা বৃটেনের ফ্রি সিনেমার মতো অসংখ্য আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলো ছিলো মূলত আর্ট যুদ্ধ। অথচ কোনো কালেই শিল্পের কোনো গৎবাঁধা নিয়ম ছিলো না, শিল্প সৃষ্টি হয়েছে দেশ-কাল-পাত্র ভেদে, মানুষের কল্যাণে, আর তাই পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী ঠিক হয়েছে শিল্পের ধরন। চলচ্চিত্রের ১০০ বছর নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে পেরিয়ে যে-গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভ দাঁড়িয়েছে, তা সূত্রবদ্ধ করলে দাঁড়ায়-

১. চলচ্চিত্র ব্যয়বহুল-অতএব, শিল্প ও বাণিজ্যের সমঝোতা এক্ষেত্রে অনিবার্য।

২. চলচ্চিত্র পুরুষ-দৃষ্টিসর্বস্ব দৃশ্যমাধ্যম।

৩. চলচ্চিত্র শাসক-শ্রেণির ভিসুয়াল মনস্তত্ত্বের অভিব্যক্তি (রাজনীতি, ধর্মবোধ, ভোগ্যপণ্য বিপণন এবং সামাজিক প্রোপাগান্ডা- যেমন: জন্মনিয়ন্ত্রণ অথবা উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার)।

৪. চলচ্চিত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা প্রবল এবং নতুনতর প্রযুক্তির সম্ভাবনা নির্মাতা শিল্পীর জন্যে বাড়তি চাপ এবং বৈষয়িক উত্তেজনার এক বিভ্রান্তিকর জটিলতা সৃষ্টি করে।

তবে ১০০ বছরে গড়ে ওঠা এই গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভ শুধু মূলধারাকে বর্ণনা করতেই বেশি প্রযোজ্য। কারণ, চলচ্চিত্রের এই ন্যারেটিভের বাইরে যুগে যুগে অনেককে বিকল্প চিন্তা করতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে তারকোভস্কি, লুই বুনুয়েল, ঋত্বিক ঘটক, ফারনান্দ সোলানাস প্রমুখ অন্যতম। বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়িক চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে এ-রকম চলচ্চিত্রকারদের শৈল্পিক দর্শক তৈরি ও চলচ্চিত্র সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন আর্ট হাউস ও ফিল্ম আর্কাইভ। যেমন : আমেরিকায় George Eastman House, The Library of Congress, Museum of Modern Art; বৃটেনে National Film Library। বাণিজ্যের সঙ্গে অসমঝোতাকারী চলচ্চিত্রকারদের সিনেমা আর্টিস্টিক হলেও কনটেন্ট-এর বিচারে এ-ধরনের চলচ্চিত্রের নাম ছিলো বিকল্প চলচ্চিত্র। পাঠক, একটি পয়েন্ট বলে রাখছি-দেখুন, একদল চলচ্চিত্রকার কনটেন্ট এর বিচারে চলচ্চিত্রের ধরন নির্ণয় করছেন। আর্টিস্টিক ফিল্ম বানিয়েও তারা কিন্তু আর্ট ফিল্ম নামকরণ করেননি। তার মানে সিনেমাকে আর্ট হিসেবে মেনে নিয়ে তারপর এর ধরন নির্ণয় করতে হয়েছে।

ফিল্মকে আলাদা করে আর্ট ফিল্ম বলার ট্রেন্ডটি ৭০-এর দশকে ফিল্ম স্টাডিজ বিষয়টি গড়ে ওঠার পর পরই দেখা যায়। ফিল্ম স্টাডিজ চর্চায় চলচ্চিত্রকে শুধু একটি নান্দনিক শিল্পবস্তু হিসেবে না দেখে, এর সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি ও বিভিন্ন তত্ত্ব যেমন : প্রতীকীবাদ, মনঃসমীক্ষণ, মার্কসবাদ, নারীবাদ, নৈরাজ্যবাদ, উত্তরাধুনিকতাবাদসহ নানা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিচার শুরু হয়। সিনেমাকে টেক্সট ধরে স্টাডির অভ্যাসটি আজ যেমন আছে, তেমনি চলচ্চিত্র ইতিহাসের গোড়ার দিকেও ছিলো। আর যদি আমরা সেটিকেই ফিল্ম স্টাডিজ ধরি; সে-ক্ষেত্রে প্রথম দিককার কাজ বলতে কিনো-প্রাভদা কিংবা ১৯৬৮ সালের কাইয়ে দ্যু সিনেমা, সিনেথিক বা স্ক্রিন পত্রিকার লেখালেখির কথাই আসবে। ৭০র দশকে পাশ্চাত্যে গড়ে ওঠা ফিল্ম স্টাডিজে টেক্সট অধ্যয়ন টার্মটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ও অন্যান্য ঘরানার চলচ্চিত্রের মানদণ্ডের ক্ষেত্রে অর্থাৎ আর্ট হিসেবে কোনো একটি চলচ্চিত্র কতোটুকু দর্শককে দিতে পেরেছে, সেই চিন্তা থেকে আর্ট ফিল্ম ধারণাটি এসেছে; যাতে করে সিনেমার শৈল্পিক পার্থক্য নির্ধারণ করা যায়।

ফিল্ম নিয়ে কাজ করে, একটু স্টাডি করে যে-জানাশোনা হয়েছে, তাতে বলা যায়, চলচ্চিত্রবোদ্ধারা আর্ট ছাড়া এই মাধ্যমটির কথা ভাবতে পারেননি। ইতিহাসের বয়ান-আর্ট নামে কখনই চলচ্চিত্রের আলাদা কোনো ধরন তৈরি হয়নি; তবে চলচ্চিত্রকে আর্ট হিসেবে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য দানের জন্য নানা আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন চলচ্চিত্র-কর্মীরা। আগেই বলেছি, চলচ্চিত্র-কর্মীদের প্রচেষ্টায় ১৮৯৫ থেকে ১৯৩০ এর মধ্যে চলচ্চিত্র একটি স্বতন্ত্র আর্ট হিসেবে বিশ্বব্যাপী দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। যাদের প্রচেষ্টায় এই কাজটি হয়; সেই গ্রিফিথ, আইজেনস্টাইন কিংবা চ্যাপলিনের চলচ্চিত্রকে আর্টিস্টিক ফিল্ম হিসেবে কেউ অস্বীকার করতে না পারলেও কখনও এভাবে বলা হয়নি কিংবা তারা নিজেরাও বলেননি ব্যাটেলশিপ পটেমকিন আর্ট ফিল্ম কিংবা চ্যাপলিনের আর্ট ফিল্ম দ্য কিড। যদি আর্ট ফিল্ম নামে কোনো কথা আসে, তবে তাদের চলচ্চিত্রের নামের সঙ্গেই প্রথম আসতো সে-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। চলচ্চিত্র-শিল্প-যোদ্ধারা কখনই চাননি আলাদা করে চলচ্চিত্রকে আর্ট বলতে।

চিত্রকর্মে নানা রঙের ব্যবহার হয়ে থাকে, এই রঙ ওই শিল্পটির একেকটি উপাদান। যদি কেউ চিত্রকর্মের বিভিন্ন উপাদানকে এক একটি শিল্প বলে, তবে নিশ্চয় ভুল হবে। আর চলচ্চিত্র পৃথিবীতে যখন শিল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, সেই সময়ে কোনো বিশেষ চলচ্চিত্রকে আর্ট ফিল্ম নামকরণ ওই চিত্রশিল্পটির বিষয়ের মতোই হবে। একদিক দিয়ে এটি আইজেনস্টাইন, গ্রিফিথ কিংবা চ্যাপলিনের মতো হাজারো চলচ্চিত্র-শিল্প-যোদ্ধাদের অপমান করা! কারণ নতুন প্রজন্মের সাধারণ দর্শক যে-ইতিহাস নিয়ে এগিয়ে যাবে, তাতে হয়তো আর্ট ফিল্ম বলতে শুধু এক সময় টালিগঞ্জের এই নতুন সিনেমার কথাই আসবে। একটি স্বতন্ত্র শিল্প-মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র যখন দাঁড়িয়ে গিয়েছে, সেই সময়ে আর্টের জন্য কোনো ফিল্ম নয়, বরঞ্চ ফিল্মের ভিতরের আর্টটা বেশি জরুরি হয়ে পড়ে।

যৌগিক মাধ্যম হিসেবে পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণে শিল্প ও বাণিজ্যের মধ্যে সমঝোতা করতেই হচ্ছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগে কিংবা এখনও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বড়োজোর বলতে শোনা গিয়েছে কমার্শিয়াল ফিল্ম আর অন্যান্য চলচ্চিত্রকে ফিল্ম নামেই বলার প্রচলনটা বেশি ছিলো। বাণিজ্যিক ফিল্ম হিসেবে নামকরণের যে-ট্রেন্ড, তাতে কিন্তু সমস্যা থেকেই যায়। আমরা অনেকেই ভুলে যাই, ফর্মুলা নির্ভর চলচ্চিত্রগুলোতেও কিছুটা হলেও জীবন সংশ্লিষ্টতা আছে। আবার বলিউডের আইটেম সঙে নায়িকার পেট কিংবা বুক সব কিছুতেই চলচ্চিত্রকারের নিজস্ব সৃজনশীলতার পরিচয়ও আছে। কেউ সমাজের ভালো বা মন্দের দিকটি বিবেচনায় এনে আর্টের সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারেন; তাহলে দাঁড়াবে-মানুষের সৃজনশীল যে-কোনো সৃষ্টি যা মানুষের জন্য কল্যাণকর তাই শিল্প। কিন্তু কেউ পাল্টা জবাব হিসেবে যদি বলে-আমার এই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে অনেক কিছু আছে যা মানুষের জন্য কল্যাণকর। তাহলে তখন কি এগুলোকে স্বল্প আর্টের ফিল্ম বলবো আমরা! এতোক্ষণের আলোচনায় আমি আসলে একটি জিনিস পরিষ্কার করতে চেয়েছি, তাহলো-আর্ট ফিল্ম ডিসকোর্সটির নানা সমস্যা রয়েছে। যার সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে, দেশভেদে তৈরি হয়েছে নানা পার্থক্য। চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রই; এটিকে শিল্পমাধ্যম মেনে নিয়ে সেটি আর্ট কি আর্ট না, না ব্যবসা-তার চেয়ে ভালো, মন্দর বিভাজন করাটাই মনে হয় শ্রেয়!

অনেকে আছেন যারা ফিল্মকে ব্যবসার সঙ্গে জড়াতে চান না, তারা বাণিজ্যিক ছবির ক্ষেত্রে মুভিজ শব্দটি ব্যবহার করার পক্ষপাতী। তাদের মতে, ‘‘মুভির সঙ্গে ব্যাপক আবেদনময়ী ও বাণিজ্যিক পণ্যর বিষয়টি জড়িত। আর ফিল্ম হলো স্বল্প খরচে নির্মিত, প্রযোজনা ব্যয় কম ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে অনেক চ্যালেঞ্জিং ছবি।

জার্মানিতে ৬০ ও ৭০ এর দশকে একদল তরুণ নির্মাতা সরাসরি ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিলেন নতুন জার্মান সিনেমার। ১৯৬২ সালে জার্মানির ওভারহাউজেন শহরে চলচ্চিত্র উৎসবে তারা ঘোষণা দিলো পুরোনো জার্মান সিনেমা মৃত...নতুন এক জার্মান সিনেমা তৈরি করতে হবে। অথচ টালিগঞ্জের নতুন নির্মাতারা মূলধারার সিনেমার বিরুদ্ধে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে কিন্তু মাঠে নামেননি। সে-ক্ষেত্রে একটি পরম্পরা দেখা যায়। টালিগঞ্জের নতুন এই আর্ট ফিল্ম ধারার শুরু খুঁজতে গেলে বলতে হয় ঋত্বিক, মৃণালের পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব, গৌতম, ঋতুপর্ণ, বাপ্পাদিত্যদের হাত ধরেই এর বিকাশ ঘটতে থাকে।

তবে নতুন সিনেমার কাঠামোটি শুরু থেকেই এই পরিচালকদের ভিতরে ছিলো এমনটি নয়। তাদের প্রথমদিককার চলচ্চিত্রে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের উপস্থিতি দেখা গেলেও পরবর্তীকালে উচ্চবিত্ত-শ্রেণি প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। আর এই শ্রেণিকে নিয়েই গড়ে উঠেছে আর্ট ফিল্মর সেলুলয়েড। তবে এদের মধ্যে একেবারে শুরু থেকে এই শ্রেণিকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। পরবর্তীকালে নতুন নতুন নির্মাতাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া টালিগঞ্জের ইতিহাসে এই ধারা সত্যিই এক নতুন পর্বের সূচনা করেছে। কিন্তু এই নতুন পর্বে ১০০ কোটির উপর জনসংখ্যাবহুল দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে দেখা যায় না।  তবে অন্য শ্রেণিকে না দেখা গেলেও তারা যে-একেবারেই আসবে না, তা কিন্তু বলছি না। মানুষ মানেই যেহেতু দ্বন্দ্ব আর সম্পর্কের টানাপোড়েন, সেই সত্যের শ্রেণিগত পার্থক্য নিয়ে নতুন আঙ্গিকে, নতুন শ্রেণিই আবার হতে পারে নতুন এই চলচ্চিত্রের প্রধান উপজীব্য।

আমরা যদি চলচ্চিত্রের বিকল্পধারাস্বাধীনধারার সঙ্গে আর্ট ফিল্মের তুলনা করি; তবে এই চলচ্চিত্রগুলোকে একদিক থেকে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র বললে খুব একটা সমস্যা হবে না। বিকল্পধারার চলচ্চিত্র সম্পর্কে এক কথায় বলতে গেলে, প্রতিষ্ঠানবিরোধী চলচ্চিত্রগুলো হলো বিকল্প চলচ্চিত্র। আসলে যা আর আইডিয়া নয়, যা আর আদর্শের দ্যুতি ছড়ায় না, নিয়ম ভেঙে নতুন নিয়মের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে না-যা স্থির, মীমাংসিত, যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তিতে নিরত-লোভ, মুনাফা এবং সুবিধাবাদের কোটারি-তা-ই প্রতিষ্ঠান। 

আমি আগেই একবার বলেছি, একজন প্রযোজক একই সঙ্গে দুই ধারার ছবিতে বিনিয়োগ করছেন। কিন্তু কনটেন্টের ক্ষেত্রে এ-ধরনের বেশিরভাগ সিনেমাতে দেখা যায় বিকল্প ভাবনা। যে-কারণে ঋতুপর্ণের চিত্রাঙ্গদা চলচ্চিত্রের বিষয় হয় সমকামিতা, সুব্রত সেনের কয়েকটি মেয়ের গল্প-এ উঠে আসে কয়েক নারীর অন্য এক জীবনের চিত্র।

 

রোম টু কলকাতা ভায়া প্যারিস

টালিগঞ্জের আর্ট ফিল্মগুলোর সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া যায় ৬০র দশকে ফ্রান্সে গড়ে ওঠা ফ্রেন্স নিউওয়েভ বা নবতরঙ্গ তত্ত্বের সঙ্গে। এই ধারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতালির নিওরিয়ালিজম বা নব্যবাস্তববাদী তত্ত্বের দ্বারা। আর তাই এই দুইটি ধারার মধ্যেও অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ইতালি ছিলো অন্যতম। বোমার আঘাতে রোমের কয়েকশ চলচ্চিত্র স্টুডিও ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে ইতালির চলচ্চিত্র তখন ধ্বংসের মুখে। এই শেষ থেকে কয়েকজন নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন। কারণ, পরাজিত হয়ে বসে থাকার স্বভাব মানুষের কখনই ছিলো না।

চিত্রনাট্যকার জাভাত্তিরি স্লোগান তুললেন, স্টুডিওর অন্দরমহল থেকে ক্যামেরাকে রাস্তায় নামাও। ক্যামেরা পথ চলুক রাস্তায়, শ্রমিকের বস্তিতে, ক্যাফেতে, মানুষ যেখানে থাকে সেখানে-অবশ্য জুম করুক গরিব মানুষের দিকে, না, মার্সিডিজের দিকে নয়, বাইসাইকেলের দিকে।১০ আর এই কথার আঙ্গিকে গড়ে ওঠে নিওরিয়ালিজম। অবশ্য তার আগেই নিওরিয়ালিজম ধারার প্রথম চলচ্চিত্র রোম ওপেন সিটি প্রদর্শনী শেষ হয়েছে। একদম সাদামাটাভাবে কোনো কৃত্রিমতার মধ্যে না গিয়ে অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দ্বারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তারা। তখন রঙিন চলচ্চিত্র তৈরি হলেও এ-ধারার পরিচালকরা সাদা-কালো চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেন। আজ প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে গেলেও নতুন ধারার পরিচালকদের অনেকেই এখনও সাদা-কালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। এই যুগে এসে সেই সাহস জোগাতে যে-নিওরিয়ালিজমের একটু প্রভাব আছে একথা নির্দ্বিধায় বলাই যায়। টালিগঞ্জের এই নতুন ধারার চলচ্চিত্রের লোকেশন, সেট কিংবা আর্টিস্ট দেখলে বোঝা যায়-এই চলচ্চিত্রগুলো খুব বড়ো বাজেটের নয়। ইচ্ছা আর মেধা থাকলে কম বাজেটে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব, টালিগঞ্জের নতুন চলচ্চিত্রকারদের এই অনুপ্রেরণা হয়তো নিওরিয়ালিজম থেকেই পাওয়া।

ইতালিতে গড়ে ওঠা এই ধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ফ্রান্সের নবতরঙ্গ ধারাটি গড়ে উঠেছিলো। এই নব্যবাস্তববাদী ধারণার প্রভাব নবতরঙ্গ ধারায় লক্ষ করা গেলেও ধারাটি সৃষ্টি করতে মূল ভূমিকা পালন করেছিলো কাইয়ে দ্যু সিনেমা পত্রিকা। এই ধারার বিখ্যাত পরিচালক ক্রুফো, গদার, লুই মাল প্রমুখ মূলত এই পত্রিকার চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক। পরবর্তীকালে তাদের হাত ধরেই নির্মিত ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ, মাসকুলিন ফেমেনিন, মেড ইন ইউএসএ ইত্যাদির মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। যদি আমরা ফ্রেন্স নিউওয়েভ ধারার বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে চাই, তাহলে দাঁড়ায়-. এই ধারার চলচ্চিত্রগুলোর কাহিনী মূলত মানবীয় সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপড়েন নিয়ে নির্মিত। . এসব সিনেমা ছিলো সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকেন্দ্রিক। . নবতরঙ্গ ধারার সিনেমা কোনো নৈতিক মানদণ্ড গ্রহণ না করে বরঞ্চ সমস্তটাই ছেড়ে দিয়েছিলো দর্শকের ওপরে। . খুব সাদামাটাভাবে সেটের ব্যবহার ছিলো অসাধারণ। . অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী দিয়ে অভিনয় করানোও ছিলো এইসব চলচ্চিত্রের একটি বিষয়। . বাইরের জগতের চেয়ে মনোজগতকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলো চলচ্চিত্রগুলো। . সবচেয়ে কম খরচে নির্মাণ করার চেষ্টা করা হতো এই চলচ্চিত্র। . বিষয়বস্তু হিসেবে উচ্চ মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চ শ্রেণিকে বেছে নেওয়া হতো। এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে টালিগঞ্জের আর্ট ফিল্মর সঙ্গে মিলিয়ে এবার আলোচনায় আসা যাক।

. টালিগঞ্জের নতুন এই চলচ্চিত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে-মানবীয় সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপড়েন। কখনও ব্যক্তি নিজের সঙ্গে নিজের, আবার কখনও সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলে চলচ্চিত্রের কাহিনী। কোনো কোনো পরিচালককে আবার চ্যালেঞ্জ ছুড়তে দেখা যায়, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তবে এই চলচ্চিত্রগুলোর শ্রেণি চরিত্রকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্চ মধ্যবিত্ত কিংবা ধনিক শ্রেণিকে নিয়ে বেশিরভাগ কাহিনী। বাজারি সমাজের নানা প্রপঞ্চগুলো এই শ্রেণিকে সদা কীভাবে ব্যস্ত রাখছে, সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যস্ততা সম্পর্কের গণ্ডিকে কীভাবে জটিল করে তুলছে-তাই মুখ্য হয়ে উঠেছে এই চলচ্চিত্রগুলোতে। অতুনু ঘোষের অংশুমানের ছবির কাহিনীতে দেখা যায়, সাতটি চরিত্রের নানা টানাপড়েন। আবার একইভাবে সাম্প্রতিক সৃজিত মুখার্জির হেমলক সোসাইটি-তে উঠে এসেছে, আধুনিক ধনী সংসারের টানাপোড়েন কীভাবে একটি মেয়েকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। আবার আত্মহত্যার পথ থেকে মেয়েটিকে জীবনের পথে নিয়ে এসে সেই সমস্যা সমাধানেরও চেষ্টা করা হয়। অঞ্জন দত্তের রঞ্জনা আমি আর আসব নার কাহিনী গড়ে উঠেছে সঙ্গীতকে ঘিরে, একজন শিল্পীর জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর্ব। অপর্ণা সেনের ইতি মৃণালিনী চলচ্চিত্রে আধুনিক এক অভিনেত্রী ও কয়েকজন পুরুষকে ঘিরে জীবনের নানা পর্ব। অন্যদিকে পিনাকী চৌধুরির বালিগঞ্জ কোর্ট চলচ্চিত্রটিতে আধুনিক উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর সন্তান ও মা-বাবার সম্পর্কের বিভিন্ন দিকগুলো উঠে এসেছে।

. লিভিং, পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, পরকীয়া, মদ্যপান পাশ্চাত্য সমাজে খুব একটা অন্যরকম দৃষ্টিতে দেখা হয় না। সেখানে সবাই কোনো না কোনোভাবে এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি অনৈতিক বলে সাধারণত তা মেনে নেয় না। যদিও লোকচক্ষুর আড়ালে কিংবা আমাদের শহুরে ভদ্র সমাজে এ-রকম ঘটনা নেহাত কম নয়। আর ভারতের কথা একটু আলাদাই। টালিগঞ্জের এসব চলচ্চিত্র যেহেতু শহুরে সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছে, তাই আধেয় হিসেবে হরহামেশাই লিভিং, পরকীয়া, মদ্যপান ইত্যাদি অনৈতিক বিষয়গুলো উঠে আসে। বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায়ের কাল-এর কাহিনী গড়ে উঠেছে গ্রাম থেকে শহরে আসা চার নারীর জীবন নিয়ে। আট-দশটি মেয়ের মতো এই নারীরাও সমাজের কাছে সুন্দর জীবন প্রত্যাশা করেছিলো। কিন্তু তারা বাধ্য হয় পতিতাবৃত্তির জীবন বেছে নিতে। তাদের এই জীবনের নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে কাল এগোতে থাকে। কাগজের বউ-এ বাপ্পাদিত্য এক বেকার যুবককে ঘিরে উচ্চবিত্ত শ্রেণির বৈবাহিক সম্পর্কের নানা অধ্যায় গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন; সঙ্গে ছিলো বিবাহবহির্ভূত নানা শারীরিক সম্পর্ক। অগ্নিদেব চ্যাটার্জির প্রভু নষ্ট হয়ে যাই-এ আছে উচ্চবিত্ত পরিবারে বাবা-মেয়ে ও তাদের বৈচিত্র্যময় নানা সম্পর্কের টানাপড়েন। তিন জনের সংসারে মা বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে লিভিং করে। আর মেয়েকে দেখা যায়, বাবার সঙ্গে নিজের বান্ধবীর প্রেম করিয়ে দিতে। অনেকের কাছে এসব চলচ্চিত্রের কাহিনী মস্তিষ্ক বিকৃতি-এর উপস্থাপন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এ-কথা ভুলে গেলে হবে না, গত অর্ধ শতকে সমাজের গড়ন আর আগের মতো নেই, মানুষ হিসেবে সামষ্টিক পরিচয় খোঁজার বদলে এখন অধিকাংশই নিজেকে নিয়ে ভাবতেই বেশি ব্যস্ত।

যারা এই চলচ্চিত্রগুলো এখনও দেখেননি, তারা আমার লেখাটি পড়ে বলতে পারেন-নতুন প্রজন্মের দর্শক যদি চলচ্চিত্রের ওই সমাজ বাস্তবতার দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তা দেশ-সংস্কৃতি সবকিছুকেই ধ্বংস করে ফেলবে। তবে এতো দ্রুত এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে চলচ্চিত্রের আধেয়তে যা যা আসছে সেটা মোটেও সমাজবিচ্ছিন্ন নয়। তবে প্রশ্ন আছে এর শ্রেণিগত অবস্থান নিয়ে। চলচ্চিত্রগুলোর এ-ধরনের বৈশিষ্ট্য নবতরঙ্গ ধারায়ও দেখা গিয়েছিলো।

এই চলচ্চিত্রগুলো একই সঙ্গে প্রাধান্য দেয় আপাত ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদকে। এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ শুধু পুরুষের ক্ষেত্রে নয়, তা একজন মানুষ হিসেবে নারীর বেলায়ও প্রযোজ্য। অনেকগুলো চলচ্চিত্রে নারী ও পুরুষকে নিজেদের ইচ্ছায় লিভিং করতে দেখা যায়। যতোদিন বনিবনা হচ্ছে, ততোদিন তারা একসঙ্গে থাকছে। অনেকে এক স্বাধীন জীবন-যাপন করছে। সৃজিত মুখার্জির অটোগ্রাফ, মৈনাক ভৌমিকের বেডরুম কিংবা সন্দিপন রায়ের একলা আকাশ চলচ্চিত্র এমনি কিছু বিষয় নিয়ে গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নারীর যৌন-স্বাধীনতায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে কনডমের সহজলভ্যতার ফলে। আর সেদিনের স্বাধীনতা নবতরঙ্গ ধারার চলচ্চিত্রের প্রধান উপজীব্য ছিলো।

আপাত দৃষ্টিতে এসব চলচ্চিত্রে নারীর জীবনধারণের জন্য পুরুষ নির্ভরশীলতার জায়গাটি দেখা যায় না। তবে সত্যিকার অর্থে নারী প্রচলিত কাঠামোর বাইরে আসতে পেরেছে কি না, সে-প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। অপর্ণা সেনের ইতি মৃণালিনী এমনি প্রেক্ষাপটের একটি চলচ্চিত্র। মৃণালিনী শিক্ষিতা, আধুনিকা। ধূমপান করছেন, মদ্যপ হচ্ছেন, পার্টিতে যাচ্ছেন, বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর আড্ডা মারছেন। একইসঙ্গে ভাল লাগার মানুষটিকে সঙ্গ দিচ্ছেন শারীরিক-মানসিকভাবে। এভাবে মৃণালিনীর আপাত স্বাধীন জীবন চলতে থাকে। কিন্তু যে স্বাধীনতার ধুয়া তুলে মৃণালিনীর এই এগিয়ে যাওয়া তা পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে নারীর প্রকৃত স্বাধীনতাকে ছুঁতে পারে নি।১১

. অর্থ সঙ্কট পরিচালকদের; সুযোগ নেই স্টার অভিনেতা-অভিনেত্রী দিয়ে অভিনয় করানোর। তাই বাধ্য হয়ে নতুন-ধারার পরিচালকরা অপরিচিত কিংবা কম পরিচিত অভিনয়শিল্পীদের দিয়ে অভিনয় করাচ্ছেন। তারপরও সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রগুলোতে পাওলি দাম, সব্যসাচী কিংবা পরমব্রতদের মতো স্টারদের উপস্থিতি আছে বারবার। তবে তাদের এই উপস্থিতি মোটেও স্টার-ইজমের বদৌলতে নয়; এসব চলচ্চিত্রের মূল ফোকাসের জায়গায় থাকে কাহিনী; এই কাহিনী পাওলি, পরমব্রতদের স্টার-ইজমকে ছাড়িয়ে যায়। আর্ট ফিল্মগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চার্বাক মতের বস্তুবাদী ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যেখানে সবকিছুর ঊর্ধ্বে পার্থিব জীবনকেই সমধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফরাসি নবতরঙ্গ ধারার চলচ্চিত্রেও এ-বিষয়টি লক্ষ করা যায়। টালিগঞ্জের মূলধারার চলচ্চিত্রগুলোর বড়ো অংশ-যেখানে এখনও পূজা-অর্চনার উপস্থিতি, সেখানে এ-সব চলচ্চিত্রে ধর্মের দিকটি প্রায় অনুপস্থিত।

. এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্যর মধ্যে সঙ্গীত নির্ভরতা অন্যতম। এখানে সঙ্গীত ছাড়া চলচ্চিত্র প্রায় কল্পনা করা অসম্ভব। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্রেও সঙ্গীতের ব্যবহার হয়। আর এইসব সঙ্গীত নির্ভর চলচ্চিত্র মূলত মিউজিক্যাল ফিল্ম ও অপেরা নামে পরিচিত। তবে এ-দুটোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান। মিউজিক্যাল ফিল্মগুলোতে গানের সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্লটের কোনো সম্পর্ক থাকে না; কাহিনী ও গান এগিয়ে চলে স্বতন্ত্রভাবে। কিন্তু অপেরা চলচ্চিত্রে গানের সঙ্গে কাহিনীর প্লট এগিয়ে চলে। আমাদের চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই মিউজিক্যাল ফিল্মের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে সরাসরি মিউজিক্যাল কিংবা অপেরা কারো সঙ্গেই এর প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই দুই ধারা থেকে নিয়ে এরা চলচ্চিত্রের সঙ্গীতে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। যা শুধু স্বতন্ত্রভাবে গান নয়, আবার সরাসরি কাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিতও নয়। মূলধারার এসব চলচ্চিত্রে সঙ্গীত ব্যবহারের প্রধান সমস্যা হলো এর প্রেজেন্টেশন। ন্যারেটিভের এক পর্যায়ে হঠাৎ দেখা যায়, প্রেমিক-প্রেমিকা রাস্তায়, পার্কে কিংবা অন্য কোথাও তুমুল নাচ-গান শুরু করে দিয়েছে। আবার এখনতো আইটেম সঙ্ নামে নতুন এক প্রপঞ্চ এসেছে, যার সঙ্গে চলচ্চিত্রের কাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই। এমতাবস্থায় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের ব্যবহার দর্শককে এমন অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে-এখন এটা ছাড়া কোনো চলচ্চিত্র বেশিরভাগ দর্শক ভাবতে পারে না।

টালিগঞ্জের নতুন চলচ্চিত্রে কিন্তু সঙ্গীতের সেই সাবেকি ব্যবহার নেই। মূলধারার চলচ্চিত্রের মতো প্রেমিক-প্রেমিকা হঠাৎ রাস্তায় হাই-বিটের গানের সঙ্গে নাচতে শুরু করে না। কাহিনীর প্রয়োজনে কখনও গান আছে, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নায়ক-নায়িকার লিপে নয়; আবার কখনও মূল শিল্পীই গানের দৃশ্যের অভিনয়ে অংশ নেন। ভূতের ভবিষ্যৎ, কাটাকুটি, হেমলক সোসাইটিসহ প্রায় সব চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের এ-রকমের প্রেজেন্টেশন লক্ষ করা গেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব গানকে চলচ্চিত্র থেকে বিছিন্ন কিছু মনে হয় না। এটিই হয়তো সৃজনশীলতা, এটিই আর্ট


বুদ্ধিজীবীদের পাল্লাভারী

টালিগঞ্জের এই নতুন ধারার বয়স ১২-১৩ বছর হলেও, দর্শক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ঘটার-কাল বছর দুয়েকের বেশি হবে না। কিন্তু খেয়াল করার বিষয়, সব শ্রেণির দর্শককে কিন্তু এই চলচ্চিত্র টানতে পারেনি। টালিগঞ্জের এই চলচ্চিত্রের রয়েছে একটি বিশেষ শ্রেণি। বাংলা চলচ্চিত্রে নাক সিটকানো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, না-যুবক না-প্রৌঢ় শিক্ষিত মহল-এই চলচ্চিত্রের মূল দর্শক। যারা এক সময় বস্তাপঁচা ফর্মুলানির্ভর বাংলা চলচ্চিত্রের নাম মুখে আনতো না, তাদের কাছে এ-চলচ্চিত্রগুলো একরকম স্ট্যাটাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগের পাতায় এর প্রমাণ অসংখ্য।

আমার পরিচিত অনেকের মুখেই এ-রকম কথা শুনেছি দোস্ত, এই আর্ট ফিল্মটা দেখিস নাই! দেখিস, হেব্বি করছে। আমি এতোটুকু হলফ করে বলতে পারি, তারা কেবলই চলচ্চিত্রের সাধারণ দর্শক। এই দর্শকরাই আজকাল আর্ট ফিল্মের ডিসকোর্স নিয়ে সমস্যায় পড়ে যায়। টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র দেখে অনেক দর্শককেরই মাঝে মাঝে এর নামকরণ নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। কয়েক মাস আগে চায়ের স্টলে বসেছিলাম। আমার পাশে বসা দুই শিক্ষার্থীর কথোপকথন ছিলো এমন-ভূতের ভবিষ্যৎ আর্ট ফিল্ম; অন্যজন বলছে, না এটা আর্ট ফিল্ম না। এই বিতর্ক অবশ্য শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধানে পৌঁছায়নি। এখন প্রশ্ন, কেনো এ-তর্কের সমাধান আসে না? আর্ট ফিল্ম ডিসকোর্সটি গড়ে ওঠার জন্য যে-তিনটি (ঐতিহাসিক অবস্থা, ভাষা ও তার চর্চা এবং উৎপন্ন জ্ঞানের রিপ্রেজেন্টেশন) উপাদানের সমন্বয় দরকার, তা হয়নি। শিল্পমাধ্যম হিসেবে ফিল্মের সঙ্গে আর্টের (শিল্প) সম্পর্ক চিরদিনের। তবে চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিকতায় আর্ট ফিল্ম-এর যে-চর্চা, তা আলাদাভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে ডিসকোর্সটি মাঝে মাঝে বিভ্রান্তিতে ফেলে।

আজ থেকে দুই মাস আগে আমার পরিচিত বেশ কয়েকজন আর্ট ফিল্ম দর্শকের কথা শুনে শঙ্কা হলো। তারা বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের কাহিনী বর্ণনা করে ছাঁচিকরণের অভিযোগ তুলছিলো। তখন আশঙ্কা হলো, অদূর ভবিষ্যতে নতুন সিনেমা কি তাহলে আবার ফর্মুলার দিকে যাচ্ছে; বিষয়-বৈচিত্র্য কি কমে যাচ্ছে?

একটু ভেবে দেখা

পাঠক এতোক্ষণের আলোচনায় হয়তো একটি জিনিস পরিষ্কার, টালিগঞ্জের আর্ট ফিল্ম আসলে একক ধারা হিসেবে প্রকাশ লাভ করতে পারেনি। একটি ধারা হতে গেলে তার যে-সার্বজনীন প্রয়োগ ও গ্রহণযোগ্যতার দরকার তা হয়তো এই সিনেমার রয়েছে; কিন্তু সবচেয়ে বড়ো সীমাবদ্ধতার জায়গা হলো চলচ্চিত্র তত্ত্বে এই ধারা নতুন কোনো চিন্তা যুক্ত করতে পারেনি। তবে এ-কথাও ঠিক, এ-উপমহাদেশে অনন্য কোনো চলচ্চিত্রতত্ত্বের বা ধারার উদ্ভব না হলেও বিভিন্ন সময় এখানকার চলচ্চিত্রকাররা নানা তত্ত্বের ঘষামাজা করে, নতুন করে তাদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। সত্যজিৎ, ঋত্বিক কিংবা মৃণালরা বিভিন্ন তত্ত্বের সমন্বয়ে আর্টিস্টিক ধারা সৃষ্টি করে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে তাদের চলচ্চিত্রকে কিন্তু কখনই আর্ট ফিল্ম বলা হয় না। তবে একজন বলেছিলেন, তিনি সুসান হেওয়ার্ড (Susan Hayward)। সত্যজিতের পথের পাঁচালীর দ্বারা যে-ধারার সূচনা হয় তাকে তিনি আর্ট সিনেমা১২ বলার পক্ষপাতী ছিলেন। এটাতো একজনের কথা, কিন্তু সার্বজনীনভাবে সত্যজিতের চলচ্চিত্র স্বীকৃত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র নামেই। প্রথম চলচ্চিত্রের নাটকীয়তা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, পারিবারিক মেলোড্রামা, মিলনাত্মক সমাপ্তি ইত্যাদির অনুপস্থিতিই দ্বিতীয় চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য। আর ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রগুলোকে ফেলা হয়েছে তৃতীয় চলচ্চিত্রের মধ্যে।

১৯৬৪ সালে ব্রাজিলের ক্ষমতা দখল করে সামরিক জান্তা। নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে আঘাত করেন চলচ্চিত্রের ওপর। ভেস্তে যায় কিছুদিন আগে গড়ে ওঠা সিনেমা নোভো আন্দোলন। ৭০র পরবর্তীকালে কিছু চলচ্চিত্রকর্মীর হাত ধরে তৈরি হয় এই তৃতীয় চলচ্চিত্র। ‘‘তৃতীয় চলচ্চিত্র একদিকে যেমন জনগণকে সমাজ পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজন অনুভব করে, অন্যদিকে বিষয় হিসেবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেছে নেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় চলচ্চিত্রের যে-নন্দন পরিকাঠামো, তাকেও পুনঃসংজ্ঞায়িত করে। এদিক দিয়ে তৃতীয় চলচ্চিত্র কিছুটা আঁভগার্দ, কিছুটা ফার্মালিস্ট, কিছুটা কাউন্টার সিনেমা বলে চিহ্নিত হতে পারে।১৩

ভারতের চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে আমরা তাহলে মোটা দাগে তিনটি কালপর্বে বিভক্ত করতে পারছি। সত্যজিৎ-পূর্ব প্রথম চলচ্চিত্র, সত্যজিতের হাত ধরে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র, পরবর্তীকালে ঋত্বিক ঘটক, বিমল রায়, বারীণ সাহা, মৃণাল সেনের মাধ্যমে তৃতীয় সিনেমা। আর যদি আমরা সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাই, তাহলে আজকের চলচ্চিত্রকে একটি নতুন নামে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। আমার মতে, অবশ্যই তা আর্ট ফিল্ম না হয়ে, অন্য কিছু। কিছুদিন আগে বলিউডের আর্ট ডিরেক্টর সাদেক আলীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো। আর্ট ফিল্ম নিয়ে কথা বলার এক প্রসঙ্গে তিনি বললেন, আরে এখনতো ভারতিয়রা এসব চলচ্চিত্রকে আর আর্ট ফিল্ম বলে না। এখন কেউ বললে, সেটা বরঞ্চ একটু ভর্ৎসনাই মনে করা হয়। আসলে চলচ্চিত্রতো চলচ্চিত্রই। তার এ-কথা নতুন করে ভাবায়।

সত্যি কথা বলতে কী, আমার এই লেখাটি নতুন কোনো জ্ঞানভাষ্য রচনা কিংবা যুক্তিপূর্ণ নীতিমালার দ্বারা যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ নয়। যা করেছি সেটা সত্যবাস্তব ঘটনাকে একাধিক তত্ত্বের মাধ্যমে উদ্ঘাটনের প্রয়াস মাত্র। আর এই চেষ্টা থেকে নির্মিত সত্যবাস্তবের পার্থক্য কতোখানি দাঁড়িয়েছে তা আমি বলতে পারবো না; তবে তা আপনাকে-আমাকে নতুন কোনো চিন্তায় সহায়তা করলে খুশি হবো।

লেখক : তাহ্‌সিন আহমেদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করেছেন। চাকরি-বাকরি না খুঁজে, তিনি এখন পুরোদমে চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করবেন বলে ভাবছেন।

tahsin_mcj@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. চক্রবর্তী, সন্দীপন (২০১০ : ৫৯); আর্ট ফিল্ম ও কমার্শিয়াল ফিল্ম; বুদ্ধিজীবির নোটবই; সম্পাদনা-সুধীর চক্রবর্তী; নবযুগ, ঢাকা।

২. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী, সন্দীপন (২০১০ : ৫৯)।

৩. আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ১৫); চলচ্চিত্র সংজ্ঞা ও স্বরূপ; চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্য প্রকাশ, ঢাকা।

৪. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী, সন্দীপন (২০১০ : ৬০)।

৫. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী, সন্দীপন (২০১০ : ৫৯)।

৬. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৪-৮৫); চলচ্চিত্রের মতানৈক্যের কণ্ঠস্বর : বিকল্প চলচ্চিত্র; সিনেমা; ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।

৭. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী, সন্দীপন (২০১০ : ৫৯)।

৮. মোকাম্মেল, তানভীর (২০০৩ : ৫৯); ওভারহাউজেন ঘোষণা ও নতুন জার্মান সিনেমা; চলচ্চিত্র কথা; প্যাপিরাস, ঢাকা।

৯. প্রাগুক্ত; হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৮)।

১০.http://en.wikipedia.org/wiki/cesare_zavattini

১১.ঊর্মি, জান্নাত ও তাহ্সিন আহমেদ; ইতি মৃণালিনী : সাধারণ নারীর অসাধারণ বয়ান; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা-কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ-১, জানুয়ারি-২০১২, পৃষ্ঠা-১২৪, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

১২.Roberge, Gaston (1990 : 9-10); The subject of cinema; seagull Books, Calcutta.

১৩.রবার্জ গেসটন, উদ্ধৃত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৯০); চলচ্চিত্রের ধারা সমূহের অন্তর্গত পাঠ;  চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্য প্রকাশ, ঢাকা।

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন