Magic Lanthon

               

রুবেল পারভেজ

প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আব্বা হুজুরের দেশে চলচ্চিত্র পরিবেশন ও প্রদর্শন ব্যবস্থার হালচাল : উত্তরণে প্রজা সকলের ঘুমন্তচিন্তা

রুবেল পারভেজ


সদ্য প্রসূত নবজাতককে পৃথিবী যেমন আলো-বাতাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক অবিকলভাবেই চলচ্চিত্র তার অস্তিত্ব প্রকাশ করে প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। এরপর নবজাতকের বেড়ে উঠতে যেমন পৃথিবীটাকে দরকার হয়, তেমনই চলচ্চিত্রের উন্নয়নেও দরকার প্রেক্ষাগৃহের। তাই চলচ্চিত্র নির্মাণচিন্তার সঙ্গে সঙ্গে এটি কীভাবে সবার নিকট পৌঁছে দেওয়া যায়, সে-চিন্তাও মাথায় গেঁথে রাখা প্রয়োজন সিনেমাকরিয়েদের। এ-প্রসঙ্গে বলতে হয় কেউ কেউ ধর্মাচারের সঙ্গে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মিল খুঁজে পান। ধর্মেরও দুটো দিক আছে-অনুশাসন ও সংস্কৃতির দিক। তেমনই চলচ্চিত্র মাধ্যমেরও আছে আকার, আকৃতি ও প্রকার, প্রকৃতির দিক। অর্থাৎ কারিগরি ও সংস্কৃতির দিক। সিনেমার সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি, তুলনামূলকভাবে একটি বড় আকারের অন্ধকার ঘরে অনেকে একত্রে অথচ নিঃশব্দে একাকিত্বের সঙ্গে বড় পর্দার কাছে আত্মসমর্পণ করা।’ আর এভাবেই দর্শককে বড়ো পর্দায় আত্মসমর্পণ করাতে গিয়ে চলচ্চিত্র নিজেকেই সমর্পণ করলো তার আয়োজকদের (প্রদর্শক ও পরিবেশক) কাছে।

যখন হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয় নির্মাতার চলচ্চিত্র ঘেটুপুত্র কমলা দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী-দর্শকরা দেখবে বলে আশায় বুক বাঁধে, তখন প্রযোজক-পরিবেশকদের ব্যক্তিগত চিন্তায় তা ভেস্তে যায়। আবার মেহেরজান মুক্তি দিয়েও কোনো কারণ ছাড়া তা যখন প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়, তখনই তাদের ক্ষমতার দাপট বুঝতে আর কালক্ষেপণ হয় না। মানুষ যেভাবে কর্তৃত্ব, ক্ষমতা আর রাষ্ট্র দ্বারা নিষ্পেষিত হতে হতে আজ এই বন্দিদশায় এসে পড়েছে; ঠিক সেভাবেই চলচ্চিত্রও ক্ষমতাবানদের হাতে হয়েছে কুক্ষিগত। ফলে চলচ্চিত্র আজ গুটিকতক মানুষের ননীর-পুতুল। এ-জন্য চলচ্চিত্র উদ্ভাবন থেকে শুরু করে এর প্রদর্শনব্যবস্থা, সেই সঙ্গে এটি কীভাবে গুটিকতক মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়লো তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

 

বিশ্ব চলচ্চিত্রের পরিবেশন ও প্রদর্শন ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ

মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে চোখ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয়। এই চোখই আবেগ অনুভূতিকে উস্কে দেয়। তবে চোখের সবচেয়ে বড়ো সীমাবদ্ধতা হলো, সম্ভবত সে-একবার যা দেখে তা পুনরায় চাইলেও আর দেখতে পারে না। কিন্তু মানুষতো বড়োই আশ্চর্য জীব। অক্ষমতা বলে কোনো শব্দ তার অভিধানে নেই। আর সেখান থেকেই চোখের এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে যেকোনোভাবেই সে এমন কিছু সৃষ্টি করতে চাইলো, যা দ্বারা কোনোকিছুর অবিকল প্রতিচ্ছবি ধরে রাখা যায়। আর এই বৈজ্ঞানিক-ভাবনার-চিন্তা শুরু তখন থেকেই।

বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস সর্বপ্রথম তার গবেষণার জন্য লেন্স ও আয়নার ব্যবহার শুরু করেন। এরপর আর্কিমিডিসের সূত্রটি অনুসরণ করে গণিতশাস্ত্রের অধ্যাপক ইউক্লিড দেখালেন, আলো সরলরেখা বরাবর চলে। পরবর্তীকালে এ-সূত্র ধরেই ক্যামেরায় ছবি তোলার পদ্ধতির সন্ধান পেলেন আগ্রহীরা। এমনকি বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী ইতালির লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিও এ-বিষয়টির প্রতি আগ্রহী হয়ে ক্যামেরা অবসকিউরার সম্পর্কে ধারণা নেন। সেই সময় অবশ্য জন ব্যাপতিতা পোর্টা নামে এক বিজ্ঞানীর ক্যামেরা অবসকিউরার নিয়ে চূড়ান্ত গবেষণার দরুণ ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে ক্যামেরা সার্থক রূপ পায়। এর ফলে মানুষ তার ইচ্ছেমতো যেকোনো দৃশ্য ধারণ করার সক্ষমতা পেলো। যার মধ্য দিয়ে দৃশ্যকে গতিশীল করার চিন্তা, আরও একধাপ এগিয়ে যায়। আরব দার্শনিক আল হাজেন প্রমাণ করলেন, চোখ দিয়ে আমরা যা দেখি, চোখের দেখা শেষ হলেও আমাদের মস্তিষ্কে তা কিছুটা সময় স্থায়ী হয়। ইন্দ্রিয়গত এই বিষয়টিই পরবর্তীতে দৃষ্টির স্থায়িত্ব বা পারসিসটেন্স অব ভিশন নামে পরিচিতি পায়। তারপর ১৬৪৬ সালে জার্মান গণিত বিশেষজ্ঞ কারচার ক্যামেরা অবসকিউরারকে উন্নত করলেন এবং বর্ণনা করলেন ম্যাজিক লণ্ঠনের কথা। পর্দার উপর ছবি প্রক্ষেপ করার উপযোগী এই ম্যাজিক লণ্ঠন যন্ত্রটিই পরবর্তীতে ছবি প্রদর্শনের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় বলে বিবেচিত হওয়া শুরু করে। পরবর্তীকালে এটিকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের ঘেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জোসেফ আঁতোয়া প্লেটো আর ভিয়েনার সাইমন রিডার ভন স্টাম্ফার প্রায় একই সময়ে কিছু খেলনা তৈরি করেন।

তারপরে ১৮৩৩ সালে জনপ্রিয় হতে থাকে জুট্রুপ বা হুইল অব লাইফ নামের খেলনাটি। যন্ত্রটির বিশেষত্ব ছিলো, এতে ছিদ্রযুক্ত ঘুরন্ত চোঙার ভিতর দিয়ে জীবজন্তুর স্থির ছবিকে জীবন্ত দেখা যেতো। যদিও স্থিরচিত্রকে সচল করে দেখানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলো প্যারিসের এমিল রেনোর তৈরি প্রাক্সিনোস্কোপ (১৮৮৯)। এরপর কিছু অনুসন্ধানী ব্যক্তি এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করতে চাইলেন, যা দ্বারা কোনো চিত্রকে সরাসরি গতিশীল করে ধারণ করা যায়। এই চিন্তার বাস্তবায়ন হওয়া শুরু হয় কোলম্যান স্যান্ডার্স নামে ফিলাডেলফিয়ার এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের হাত ধরে। তিনি ফটোগ্রাফি ও জুট্রুপ পদ্ধতির সমন্বয়ে ১৮৬১ সালে তৈরি করলেন কিনেমাটোস্কোপ। পরবর্তীকালে এই পদ্ধতিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন হেনরি রেনো। তিনি জুট্রুপ থেকে সরাসরি পর্দায় ছবি প্রক্ষেপের ব্যবস্থা করলেন। ১৮৭০-এর ৫ ফেব্রুয়ারি তার আবিষ্কৃত ফ্যাসমাট্রুপের মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করলেন ফিলাডেলফিয়া অ্যাকাডেমি অব মিউজিক সেন্টারে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলো প্রায় ১৬০০ দর্শক।

চলচ্চিত্র-উন্নয়নের সঙ্গে বাড়তে থাকা দর্শক-আগ্রহ এসব কিছুই লক্ষ রাখছিলেন উদ্ভাবন-ব্যবসায়ী টমাস আলভা এডিসন। ১৮৮৮ সালে এডিসন ও উইলিয়াম কে লড়ি ডিকসন মিলে তৈরি করলেন কিনেটোস্কোপ নামের যন্ত্র। তার কিছুদিন যেতে না যেতেই ১৮৮৯ সালে সেলুলয়েড ফিল্ম তৈরি করলেন ইস্টম্যান। আর এর মধ্য দিয়েই ১৮৯৩ সালে দর্শক দেখতে পেলো প্রথম চলচ্চিত্র। তবে এডিসনের কিনেটোস্কোপের বড়ো সীমাবদ্ধতা ছিলো একসঙ্গে একাধিক দর্শক এটি দেখতে পেতো না।

এরপর আসলো ১৮৯৫ সাল। চলচ্চিত্র সবার সামনে প্রদর্শন করার জন্য সিনেমাটোস্কোপ নামক যন্ত্র আবিষ্কার করলেন লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়। শুরুতেই তারা বিশ্বব্যাপী এর বাণিজ্যিক প্রদর্শন শুরু করেন। আর এজন্য তাদের বেতনভুক্ত কর্মচারীরা মাত্র পাঁচ কেজি ওজনের সিনেমাটোগ্রাফ যন্ত্র স্যুটকেসে ভরে পৌঁছে দিতে লাগলেন পুরো বিশ্বে। এ-কারণেই চলচ্চিত্র পরবর্তীকালে আর দুই ভাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইলো না। আর এই বিস্তৃতিতে রাশিয়াকে সবচাইতে এগিয়ে যাওয়া দেশ বললে, খুব একটা অত্যুক্তি হবে না। কারণ ১৯১৭র অক্টোবর বিপ্লবের পর মহামতি লেনিন তার শাসনের শুরুতেই চলচ্চিত্রকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম হিসেবে ঘোষণা দিলেন। এ ধারাবাহিকতায় ১৯১৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন বিশ্বের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্র-অল ইউনিয়ন স্টেট ইন্সটিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি

ঠিক এই সময়ে পৃথিবীর আরেকটি ইন্ড্রাস্ট্রি তাদের আগমনী বার্তা দিয়েছিলো; যা আজকের হলিউড। গত শতাব্দীর ২০ থেকে ৩০-এর দশকটিই ছিলো হলিউডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় হলিউডের চলচ্চিত্র বিরাট এক শিল্প-ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়াতেও শুরু করলো। ফক্র, ওয়ার্নার ব্রাদার্স, প্যারামাউন্ট, কলম্বিয়া ইউনিভার্সাল চলচ্চিত্র কোম্পানিগুলো বানিয়ে চললো একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ালো, শিল্প কারখানা গড়ে উঠলো, প্রচুর লোক শহরমুখি হলো। ততোদিনে নতুন বিনোদন মাধ্যমটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। এভাবে ক্রমাগত দর্শক বৃদ্ধি ও তাদের চাহিদা অনুযায়ী বাড়তে থাকলো নতুন এই চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা। আর এর মধ্য দিয়ে হলিউড এখনও চলচ্চিত্র-বিশ্বকে শাসন করছে।

 

প্রদর্শন দিয়েই উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের যাত্রা

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের আবিষ্কৃত সিনেমাটোস্কোপ গণমানুষের কাছাকাছি আসার যে-সম্ভাবনা তৈরি করেছিলো, তার বিকাশের অন্যতম তীর্থস্থান হয়ে ওঠে ভারতিয় উপমহাদেশ। এ-অঞ্চলে চলচ্চিত্র নির্মাণ কিংবা প্রযোজনা নয় বরং এর যাত্রা শুরু হয়েছিলো পরিবেশন ও প্রদর্শনের হাত ধরেই। ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই লুমিয়ের ভাইয়েরা তৎকালীন বোম্বাইয়ের ওয়াটসন হোটেলে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেছিলেন। আর সেখান থেকেই হীরালাল সেন, দাদা সাহেব ফালকেসহ অনেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসেন। এদের মধ্যে হীরালাল সেন উপমহাদেশের প্রথম প্রদর্শক তো বটেই, প্রথম চলচ্চিত্রনির্মাতাও ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতিয় চলচ্চিত্রের প্রথম সিনে-কোম্পানি রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি প্রতিষ্ঠাসহ এর উৎপাদন, পরিবেশন ও প্রদর্শন  তিনটি প্রধান ক্ষেত্রের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার পথ অনুসরণ করেই পরবর্তীকালে নারায়ন বসাক লন্ডন বায়োস্কোপ, অনীল চট্টোপাধ্যায় ইম্পারিয়াল, প্রমথ নাথ ওরিয়েন্টাল বায়োস্কোপ, সত্যচরণ ঘোষ বেঙ্গল বায়োস্কোপ প্রভৃতি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা ভারতে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবস্থার স্থায়ী ভিত্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা চালান।

পূর্ববঙ্গের প্রথম চলচ্চিত্র ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল ভোলায় প্রদর্শন করেন হীরালাল সেন। একই বছরের ১৭ এপ্রিল ঢাকার সদরঘাটের কাছে ক্রাউন থিয়েটার-এ আরও একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই ঢাকায় নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়। পাঠক জেনে আশ্চর্য হবেন, এই প্রদর্শন কোনো প্রেক্ষাগৃহে নয়; হয়েছিলো একটি পাটের গুদামে। তবে পূর্ববঙ্গের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে পিকচার হাউস সর্বজন স্বীকৃত। এভাবেই এ-অঞ্চলে চলচ্চিত্র বিকাশের পথ আরেকটু প্রশস্ত হয়। এ-প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র-গবেষক জাকির হোসেন রাজু বলেন, পূর্ববঙ্গে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন কিংবা প্রথম প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের ঘটনাকেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরু বলা যেতে পারে।

এরপর ১৯০৪ সালে এমভি শেঠনার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ছবি প্রদর্শন আরম্ভ করেন তার টুরিং সিনেমা কোম্পানির মাধ্যমে। কলকাতায় সর্বপ্রথম প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করে দি এশিয়াটিক সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি। তবে লক্ষ করার বিষয়, এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্র-আগ্রহীরা চলচ্চিত্র নির্মাণ নয় বরং বেশি মনোযোগী হয়েছিলো ভিন-দেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের দিকে। চলচ্চিত্রের সেই শুরুর দিকের আমদানিকৃত চলচ্চিত্রের দর্শকপ্রিয়তাই মূলত ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে এ-দেশে স্থায়ীভাবে দাঁড়ানোর ভিত্তি পায়। পরে যা কিনা চলচ্চিত্রকে এ-দেশের মানুষের নিকটও শক্তিশালী চলচ্চিত্রিক-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

 

তারাই যখন আব্বা-হুজুর

চলচ্চিত্র শুরুর পর থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, পরিবেশন ও প্রদর্শন এই তিনটি আলাদা আলাদা বর্গ বাজারি যুগে তাল মিলিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলো। এভাবে হলিউড-রাশিয়া থেকে বিভাজিত বর্গগুলোর এই কৌশল পরবর্তীকালে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লো। এই কৌশল শুধু নির্মাতার মন-মতো আর রইলো না। প্রদর্শক ও পরিবেশক, দর্শক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর তাদের মাথা খাটানো শুরু করলো। চলচ্চিত্রের গল্প কী হবে, কোন্ নায়ক, কোন্ নায়িকা রাখতে হবে এবং চলচ্চিত্র কোথায় কোথায় মুক্তি দিতে হবে ইত্যাদি সবকিছুতেই তারা নাক গলানো শুরু করলো; একই সঙ্গে সুযোগ হলো মানুষকে প্রভাবিত করার। এ-ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র। ক্ষমতা বাড়াবার আকাঙ্ক্ষায় প্রযোজনা পরিবেশনা প্রদর্শন এই তিনটে স্তরেই এরা সংঘ তৈরি করতে চাইল। ...বড় সংস্থারা ছোট সংস্থাদের কিনে নিল। ক্ষমতাবান সব সংস্থা তৈরি হল। এভাবে দিন দিন শক্তি বৃদ্ধি করে হলিউড চলচ্চিত্র নিয়ে এক ধরনের স্বৈরাচারী-মনোভাব পোষণ করতে থাকে। বিশ্বব্যাপী এ-রকম কর্মকাণ্ডের ফলে চলচ্চিত্র আর স্বাধীন শিল্প মাধ্যম রইলো না; ব্যবসার দাপটে কমতে থাকলো শৈল্পিক চলচ্চিত্রের সংখ্যা।

 

বাংলা সিনেমার আমি নায়ক, আমিই ভিলেন

রূপবান সূর্য দীঘল বাড়ী ৭০-এর দশকে নির্মিত আলোচিত দুটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া রূপবান-এর সাফল্য ছিলো চোখে পড়ার মতো। এর বিপরীতে সূর্য দীঘল বাড়ী তেমন কেউই দেখতে পায়নি, এমনকি ঢাকার কোনো প্রেক্ষাগৃহেও মুক্তি দেওয়া হয়নি। ফলে ব্যবসায়িকভাবেও মারাত্মক লোকসানের শিকার হয় চলচ্চিত্রটি। তবে মজার বিষয় হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অনুদানপ্রাপ্ত সূর্য দীঘল বাড়ী বিদেশের মাটিতে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলো। পাঠক, আপনারা যারা চলচ্চিত্র দুটি দেখেছেন তারা হয়তো জানেন, শিল্পমানের দিক থেকে রূপবান-এর চেয়ে সূর্য দীঘল বাড়ীর তফাত আকাশ-পাতালই বলা চলে। শুধু সূর্য দীঘল বাড়ী-ই নয়, বেবি ইসলামের চরিত্রহীন, কবির আনোয়ারের সুপ্রভাত, সত্য সাহার পুরস্কার, খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ হ, আলমগীর কবীরের ধীরে বহে মেঘনা, সুভাষ দত্তের অরুণোদয়ের অগ্নি সাক্ষীও মুক্তি পাওয়ার পর তেমনভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

এমনকি জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র মেঘের অনেক রং ছবিটি একদিন প্রদর্শনের পরই প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়; অজ্ঞাত কারণবশত অন্যান্য প্রদর্শকরাও একই পথ অনুসরণ করে। সম্ভবত, এদেশের প্রদর্শক ও পরিবেশকরা শুধু টাকা কামাতেই এই রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। ঋত্বিক ঘটকের ভাষায়, বাংলাদেশের ছবি আসলে পরিচালনা করেন প্রদর্শকরা; তাঁদের কথা ভেবেই ছবি এবং তাদের হুকুমেই ছবি বন্ধ হয়। এরাই সর্বাগ্রে টাকা তোলেন; তারপরে এরা সুবিধামত পরিবেশকদের টাকা দেন। তারপর পরিবেশক যখন ভাল বোঝেন তখন প্রযোজককে টাকা দেন। অথচ তাকেই মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় শেষ পর্যন্ত। এই ঘটনাটা সমস্ত ছবির জগতকে গলা টিপে মারছে।

এমনকি অনেক সময় এখানে প্রযোজকের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে প্রদর্শকরা বেআইনিভাবে বেশি মুনাফা লাভের চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। ফলে প্রযোজক-পরিচালক বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে প্রদর্শকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। আগেই বলেছি, প্রদর্শকদের এই আচরণকে আরও উৎসাহিত করা অর্থাৎ প্রদর্শকের একক রমরমা ব্যবসার জন্য পরিবেশক সংস্থা নামে আরেকটি গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছিলো। প্রেক্ষাগৃহের অবস্থান, ধারণ-ক্ষমতা, দর্শকদের রুচি ও ছবির গুণাগুণ বিচার করে পরিবেশকরা বাজার পরিচালনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এদের মূল লক্ষ্যই হলো-চলচ্চিত্রের চাহিদা বা বাজারমূল্য ধরে দীর্ঘদিন যাবৎ সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শক প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে আসা। এ-কাজে তাদের চরম সাফল্য নির্ভর করে, মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো একটি চলচ্চিত্র কতোজন দর্শককে দেখাতে পারলো তার ওপর; এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ নিশ্চিত করা। আর এই দায়িত্ববলেই পরিবেশকরাও চলচ্চিত্র-অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেদের সবচেয়ে লাভবান ও ক্ষমতাশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। দেখা গেলো, একটি চলচ্চিত্র তৈরি হওয়া থেকে দর্শক পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রদর্শকরাই অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে।

ব্যবস্থাটা এই রকম। একজন প্রদর্শক একটি নির্মাণ সংস্থার কাছ থেকে একটি ছবির প্রিন্ট কিনলো। নির্মাতা প্রিন্টটার দাম পেল। একটি ছবির প্রদর্শন যত বাড়তে লাগল, নির্মাতা তত অনুভব করল প্রিন্ট বিক্রি করে লাভ নেই। অবশ্য পরে একটি নিয়ম চালু হলো, চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য পরিবেশকরা প্রযোজকদের সঙ্গে চুক্তি করতে থাকলো। আর পরিবেশক নিজেই যদি প্রযোজক হয়ে থাকেন, সে-ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের জন্য তিনি সরাসরি প্রদর্শকদের সঙ্গে চুক্তি করেন। এবার আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের আগমন এবং তা কীভাবে প্রদর্শক-পরিবশকদের হস্তগত হলো তা জানা দরকার।

 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সীমানা, পরিধি ও পরিবেশন ব্যবস্থার প্রাগুক্তিক ইতিহাস

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সীমানা, পরিধি ও পরিবেশন ব্যবস্থার পুরো বিষয়টিকে দুটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে। এক. স্বাধীনতাযুদ্ধের পূর্বকাল ও দুই. স্বাধীনতা পরবর্তী থেকে বর্তমান সময়। এই ভূখণ্ডের চলচ্চিত্রশিল্পের গোড়াপত্তন হয় মূলত কলকাতার প্রযোজনা সংস্থাগুলোর দ্বারা। ৪৭-এ দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পূর্বে এই অঞ্চলের চলচ্চিত্র ব্যবসা পুরোপুরিই নিয়ন্ত্রণ করতো কলকাতার বায়োস্কোপ কোম্পানিগুলো। স্থায়ী বাজার সম্প্রসারণে সেখানকার পরিবেশক সংস্থাগুলি ওই সময়ে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ব্যবসায়ের সুবিধার জন্য কলকাতার পরিবেশক সংস্থাসমূহ ১৯৪৯ সালে ঢাকায় অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। পরিবেশনার বিষয়ে ইতোমধ্যে ভারতিয় পরিবেশক সংস্থাসমূহের মধ্যে দুরকমের চিন্তাধারা দেখা দেয়। একটি চিন্তাধারা ছিলো শাখা অফিসের মারফত পূর্ব পাকিস্তানে ছবির পরিবেশনা নিয়ন্ত্রণ এবং আরেকটি চিন্তাধারা ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে পরিবেশনার দায়িত্ব দেওয়া।

ধীরে ধীরে এ-ব্যবস্থা আরও বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। এ-দেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের জন্য কলকাতা থেকে তাদের নিযুক্ত এজেন্টদের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের প্রিন্ট পাঠাতো, আবার প্রদর্শন শেষ হলে তা পুনরায় সেখানেই ফেরত নিয়ে যাওয়া হতো। ওপার বাংলার ইচ্ছেমতো চলতে থাকা এই নীতি রুষ্টপুষ্টের একমাত্র কারণ ছিলো এপারে চলচ্চিত্রের নিজস্ব কোনো পরিবেশন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। এই সঙ্কট নিরসনে দেশভাগের পর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

দেশভাগের পরপরই এপার বাংলায় নিজস্ব প্রদর্শক-পরিবেশক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র সমিতি নামে একটি আলাদা সংগঠন গড়ে ওঠে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রেক্ষাগৃহে পাকিস্তানি নাকি ভারতিয় চলচ্চিত্র চলবে এই বিষয়ে তারা নিজেরাই মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে সংগঠনটি ভেঙে আরেকটি নতুন সংগঠন হলো, নাম-পূর্ব বাংলা চলচ্চিত্র সমিতি। এদিকে ১৯৫৩ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ইকবাল ফিল্মস সেখানকার কার্যক্রম গুটিয়ে চলে আসে ঢাকায়।

১৯৫৬ সালে আবদুল জব্বার খান নির্মাণ করলেন মুখ ও মুখোশ; যা পূর্ববঙ্গের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। দুর্বল নির্মাণশৈলীর হলেও চলচ্চিত্রটি দর্শক আনুকূল্য পেয়ে স্থানীয় চলচ্চিত্রের একটি নির্ভরযোগ্য বাজারের নিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিলো, একই সঙ্গে এ-অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ স্টুডিও প্রতিষ্ঠারও প্রয়োজন বোধ হয়। কিন্তু চলচ্চিত্রখাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ছিটেফোঁটাও বরাদ্দ জুটতো না। বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র বরাদ্দ পেতো কোটি কোটি টাকা। এ-অবস্থায় তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের চলচ্চিত্রবিভাগের প্রধান নাজির আহমদ পূর্ব পাকিস্তানে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা নির্মাণের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের সমান অর্থ বরাদ্দের দাবি জানান। এরপর ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বর্তমানে যা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বা এফডিসি নামে পরিচিত)। প্রকৃত অর্থে এই প্রতিষ্ঠানটিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভিত্তি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

১৯৫৯ সালে অবাঙালি চলচ্চিত্রনির্মাতা এজে কারদার পূর্ববঙ্গে নির্মাণ করলেন অসাধারণ শিল্পমণ্ডিত চলচ্চিত্র জাগো হুয়া সাভেরা। আর এর মধ্য দিয়ে আরেকবার প্রমাণ হয় এ-দেশ চলচ্চিত্রের অনুর্বর ভূমি নয়; এখানে যেমন চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব, তেমনই সম্ভব দর্শকেরও ব্যাপক সাড়া। পূর্ববঙ্গে দর্শকের ব্যাপক সাড়া পেয়ে এই জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতা রক্ষায় নতুন-মাত্রা যোগ করেন জহির রায়হান, সালাউদ্দিনের মতো তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতারা। তাদের হাতে নির্মিত হতে থাকে একের পর এক দর্শকপ্রিয় ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। যেমন-জহির রায়হানের কখনো আসেনি (১৯৬১), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০); সালাউদ্দিনের সূর্যস্নান (১৯৬২); সুভাষ দত্তের সুতরাং (১৯৬৪) এর মতো চলচ্চিত্রগুলো। যদিও এর মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু চলচ্চিত্র এদেশের বিকাশমান চলচ্চিত্র শিল্পকে বাধাগ্রস্ত করেছিলো। এতোকিছুর পরও দর্শক কিন্তু ঠিকই প্রেক্ষাগৃহমুখি হয়েছে। তবে এ-অঞ্চলের অনেক মানুষ ধর্মভীরু হওয়ায় একটা সময় পর্যন্ত চলচ্চিত্র দেখাকে নাজায়েজপাপ মনে করতো। আস্তে আস্তে কুসংস্কার দুরীভূত হয়ে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেল। ফলে বাংলা চলচ্চিত্রের ভিত্তি যেমন সুদৃঢ় হয়, তেমনি চলচ্চিত্রে নতুন ধারাও গড়ে ওঠে।

প্রদর্শক-পরিবেশকের স্বার্থগত দিকটি মুখ্য হয়ে ওঠায় ৭০ দশকে নির্মিত রূপবান, ৮০র দশকে নির্মিত বেদের মেয়ে জোসনার মতো শিল্পবর্জিত চলচ্চিত্র অর্থনৈতিকভাবে প্রবল সাফল্যের মুখ দেখেছে। এই সফলতা অর্জনের পরই চলচ্চিত্র হয়ে উঠলো সংস্কৃতি-ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রধান বিনোদন পণ্য; যা শুধু মুনাফার দিকেই চোখকে নিয়ে যায়। সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রির কার্যক্রম প্রসঙ্গে ডেভিড হেল্ড এমনটাই বলেন, সংস্কৃতি-ইন্ডাস্ট্রি নিজে পুঁজিবাদের ভেতরে সমন্বিত, এবং বিনিময়ে ভোক্তা শ্রেণীকে পুঁজিবাদের সাথে সম্পৃক্ত করে। এ-জন্যই হয়তোবা এই শতাব্দীর শুরুতেই আবার নতুন করে টাকা কামানোর ক্ষুধা পেয়ে বসলো এ-দেশের সিনেমাওয়ালাদের। সেই তৃষ্ণা নিবারণে পরিচালকরাও বাধ্য হলো অশ্লীল-কাটপিস্ ঘরানার চলচ্চিত্র বানাতে। পুঁজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে লাগলো আলু-বেগুনের মতো শুধুই একটি পণ্য। এতে আপাতদৃষ্টিতে তারা নিম্ন আয়ের দর্শকদের হলমুখি করে লাভের মুখ দেখলেও, বিরাট সংখ্যক মধ্যবিত্ত ও রুচিশীল দর্শকশ্রেণি হারালো; যারা অন্তত সপ্তাহে একদিন হলেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে যেতো। এভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের প্রেক্ষাগৃহ-বিমুখতার কারণেই দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলো ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে ধারণা করা হয়।

 

একদিকে ভাঙন আরেক দিকে ভাবনা : দেশে পরিবর্তিত

নয়া পরিবেশন ব্যবস্থা; ডিজিটাল চলচ্চিত্র

একটি পরিসংখ্যানের সাহায্যে দেশের প্রেক্ষাগৃহের দশা জানিয়ে আলোচ্য বিষয়টি শুরু করা সমীচীন মনে করছি। ২০০৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে প্রেক্ষাগৃহ ছিল এক হাজার ২০০টি। বিভিন্ন কারণে অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহ দর্শকশূন্য হওয়ায় অনেক মালিক তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। গত কয়েক বছরে সারা দেশে বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য প্রেক্ষাগৃহ। প্রদর্শক সমিতির হিসাব অনুযায়ী ১৯৯০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বন্ধ প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা প্রায় ৫৫২টি। কারণ হিসেবে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, স্যাটেলাইট চ্যানেলের দৌরাত্ম্যের কারণে বেশিরভাগ দর্শকই এখন আর কষ্ট করে প্রেক্ষাগৃহে যেতে চান না। তবে অনেকেই এর উল্টো কথাও বলছেন। তাদের যুক্তি,স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে চলচ্চিত্র কোনোভাবেই ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। সরকার, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট লোকজন সবাই চলচ্চিত্রের কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়েছেন ঠিকই বিনিময়ে কিছুই দেননি। ...দেশের একমাত্র স্টুডিও এফডিসির কোনো উন্নতি হয়নি। সেটা এখন চলচ্চিত্রের জাদুঘর১০ এই সমস্ত কারণে ধারাবাহিকভাবে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ যেমন আস্তে আস্তে কমে গিয়েছে, তেমনইভাবে দর্শকও প্রেক্ষাগৃহের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

যদিও এই সমস্যার সমাধানে ৮০র দশকে বিকল্পধারা বা স্বাধীনধারা নামে একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে যা এফডিসি থেকে বাইরে এসে সম্পূর্ণ নিজেদের প্রচেষ্টায় নির্মাণ করতে থাকে বেশকিছু ভালো ছবি। তবে গুণগতমান ভালো হলেও ছবিগুলো কিন্তু গণমানুষের কাছে তেমনভাবে পৌঁছাতে পারেনি। একটি চলচ্চিত্রকে যখন মুক্তি দেওয়া হয়, তখন কিন্তু প্রযোজক-পরিচালককেই তা প্রেক্ষাগৃহ পর্যন্ত অর্থাৎ দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হয়। আগেই বলেছি, এ-ক্ষেত্রে নির্মাতাকে প্রদর্শক-পরিবেশকদের সঙ্গে অনেক দেন-দরবার করতে হয়। কিন্তু একজন স্বাধীননির্মাতা কখনও তা করতে চান না। ফলে যা হবার তাই হয়। তার ওপর ৩৫ মিমি ফরমেটে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য প্রিন্ট করার খরচতো আছেই; যা ওই নির্মাতার পক্ষে এক-রকম দুঃসাধ্যই হয়ে ওঠে।

এই শতাব্দিতে এসে প্রাযুক্তিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে যায় বিশ্ব-চলচ্চিত্র। নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে ৩৫ মিমি ক্যামেরার হাজার হাজার ফুট রিলের ব্যবহার কিংবা জটিল সম্পাদনাসহ যাবতীয় ঝামেলার অবসান ঘটেছে; যাতে চলচ্চিত্রের কাজ এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে। আমেরিকার একজন স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতা জানান, ৪৫ মিনিটের শুটিং-এর জন্য উন্নত মানের ডিজিটাল ভিডিও টেপের দাম ২২ ডলার আর এইটুকু সময়ের ৩৫ মিলিমিটার নেগেটিভের দাম প্রায় ২২০০ ডলার পরবর্তী প্রসেসিং-এর কথা বাদ-ই গেল!১১ শুধু তাই নয়, এই ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর প্রদর্শক-পরিবেশকদের কাছে জিম্মি হয়েও থাকতে হচ্ছে না।

ডিজিটাল ব্যবস্থায় ইন্টারনেটের বদৌলতে যতোগুলো প্রেক্ষাগৃহে প্রয়োজন, ততোগুলোতেই একসঙ্গে পাইরেসির দুশ্চিন্তা ছাড়াই চলচ্চিত্র পরিবেশন সম্ভব। ৩৫ মিমি চলচ্চিত্রের একটি মাত্র কপিতে যেখানে লাখ টাকার ওপরে খরচ হতো, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বর্তমানে আমাদের দেশে তা বহনের জন্য ৫০০ টাকার একটি পেনড্রাইভই যথেষ্ট। এই প্রযুক্তি পূর্বের সম্পাদনার জটিল পদ্ধতিকে একদম সহজ করে দিয়েছে। এখন কারও সঙ্গে একটি কম্পিউটার আর এডিটিং সফটওয়্যার থাকলে, ঘরে বসেই মোটামুটি একটি চলচ্চিত্রের যাবতীয় সম্পাদনার কাজ করা সম্ভব।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের চেয়ে একটু দেরিতেই এদেশের চলচ্চিত্রসংশ্লিটরা প্রযুক্তিটির সুবিধা-সম্ভাবনা সম্পর্কে  অনুধাবন করতে পেরেছে । বর্তমানে এ-দেশের অনেকে এগিয়েও এসেছেন এই প্রযুক্তিতে ছবি নির্মাণ, প্রদর্শন ও পরিবেশনে। ইতোমধ্যে দেশের ৫০০ প্রেক্ষাগৃহকে ডিজিটালাইজড করার পরিকল্পনা করেছে জাজ মাল্টিমিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শীশ মনোয়ার জানান, এরই মধ্যে ২০০ প্রজেক্টর বুকিং দিয়েছি, যা দিয়ে ২০০ প্রেক্ষাগৃহে ডিজিটাল প্রজেকশন করতে পারব। আমাদের প্রযুক্তিতে আছে অনলাইন ইউপিএস, যা শো চলাকালে বিদ্যুৎ চলে গেলে তাৎক্ষণিক ৩০ মিনিট ব্যাকআপ দিতে পারবে। জেএক্সডি সফটওয়্যারের মাধ্যমে আমরা ঢাকায় বসে একযোগে ২০০ প্রেক্ষাগৃহে ছবি মুক্তি দিতে পারব। তাছাড়া প্রেক্ষাগৃহগুলোতে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা থাকবে, যার মাধ্যমে প্রযোজক ঢাকায় বসে সর্বক্ষণ দর্শকের পরিমাণ, প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ, পর্দা-সব বিষয়ে নজর রাখতে পারবেন।১২ এই তথ্য দিয়ে আপাতত এতোটুকু বোঝা গেলো, ডিজিটাল মাধ্যম নিয়ে তাদের পরিকল্পনা, আগ্রহ, পুঁজির অভাব নেই। বিষয়টি আমাদের কাছেও ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে। কিন্তু তাদের বক্তব্যে কিছু বিষয় উঠে এসেছে, যা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার যথেষ্ট কারণও আছে। দেখা যাচ্ছে, তাদের আগ্রহ বেশি সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহের দিকে। এছাড়া তারা ঢাকাতে বসেই সবরকম সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে। এখন যদি একটি প্রতিষ্ঠান এককভাবে প্রেক্ষাগৃহ নিয়ন্ত্রণ ও ছবি নির্মাণে ডিজিটাল সহায়তা দেয় তাহলে তা নিয়ে নতুন করে কোনো সমস্যার তৈরি হবে কি না তাও এখনই ভেবে দেখতে হবে।

কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে চলচ্চিত্রের নিয়ন্ত্রণ বৃহৎ কয়েকটি সংস্থার হাতে যাওয়ায়-চলচ্চিত্র তার নিজস্ব-স্বাধীনতা হারায়। ৭০ ও ৮০র দশকে সমস্ত ছবি পরিবেশনার একচেটিয়া কারবার দখল করে নিয়েছিলো ছয়টি বড় মার্কিন সংস্থা। আর সিনেমা হলগুলো ছিলো দুটি বৃহৎ বিদেশী সংস্থার মালিকানায়। একটি আমেরিকার ফেমাস প্লেয়ার্স আর অন্যটি ইংল্যান্ডের ওডিয়ান থিয়েটার্স১৩ ভিন দেশের তিক্ত এই অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের এখনই ভাবা দরকার।

 

আর আমারে মারিস নে মা

গণমাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা টেলিভিশনের আবির্ভাব জন বেয়ার্ডের হাত ধরে, সেই ১৯২৬ সালে। এরপর নতুন মাধ্যমটি ধীরে ধীরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলো চলচ্চিত্রের ওপর। ফলে আগের চলচ্চিত্রের বড়োপর্দার সমাজকে ঢুকে যেতে হলো ছোট একটি বাক্সের মধ্যে। ৪০ দশকের শেষভাগে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে হলিউডের স্টুডিও সিস্টেমও প্রবলভাবে ধসে পড়ে। এ-কারণে খানিকটা বাধ্য হয়েই হলিউড টেলিভিশনের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসে ৫০-এর দশকের শেষের দিকে। এ-সময় একের পর এক হলিউডের বড়ো কোম্পানিগুলো বিভিন্ন টেলিভিশন নেটওয়ার্কের জন্য নিজেদের উদ্যোগে ধারাবাহিক ছবি তৈরি করতে থাকে। এভাবে ওয়েস্টার্ন এবং কমেডি সিরিয়াল তৈরির পাশাপাশি ধীরে ধীরে বড় কোম্পানিগুলি তাদের এতদিনের ক্যানবন্দি ছবিগুলিও টেলিভিশনের প্রদর্শনের অনুমতি দেয়। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি টেলিভিশনের ৮০ ভাগ অনুষ্ঠানই ছিল সরাসরি সম্প্রচার, ষাটের দশকে এই ধারা পুরোপুরি বদলে গিয়ে প্রধানত চলচ্চিত্র-নির্ভর হয়ে ওঠে। টেলিভিশন কোম্পানিগুলির সঙ্গে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে হলিউড হয়ে ওঠে টেলিভিশন শিল্পের অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র।১৩

তবে হলিউডের টেলিভিশন-নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ ছিলো-ব্যয়বহুল ছবি নির্মাণের পরও এগুলোর বাণিজ্যিক-ব্যর্থতা। আর এই সুযোগ কাজে লাগায় বহুজাতিক বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো। ৬০-এর দশকের শুরুতে গালফ্ ওয়েস্টার্ন বহুজাতিক কোম্পানিটি কিনে নেয় সুবিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ কোম্পানি প্যারামাউন্টকে। আর  কলম্বিয়া চলচ্চিত্র নির্মাণ কোম্পানিকে কিনে নেয় কোকাকোলা কোম্পানি। মূলত এর সঙ্গে সঙ্গেই চলচ্চিত্র-প্রযোজক, পরিবেশক এবং প্রদর্শক কোম্পানিগুলোও চলে যায় এই বহুজাতিক কোম্পানির নখদর্পণে। এই পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্র শিল্পও বহুজাতিক সংস্থার নানা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পূরণে নিয়োজিত। কেবল টিভি, স্যাটেলাইট চ্যানেল, এমনকি ডিজনিল্যান্ড ধাঁচের প্রমোদ উদ্যানের ব্যবসাতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্র। মিকিমাউস লোগো বা কমিক স্ট্রিপ অথবা স্টার ওয়ারস্ ছবির (জর্জ লুকাস, ১৯৭৭) চরিত্রদের নিয়ে খেলনা ও ভিডিও গেম বিক্রি করে বহুজাতিক সংস্থাগুলি উপার্জন করেছে প্রচুর অর্থ। বস্তুত স্টার ওয়ারস্ ছবির ক্ষেত্রে খেলনা ও ভিডিও গেম-এর ব্যবসায় মূল ছবির চেয়েও বেশি আয় হয়েছে প্রযোজক সংস্থার।১৪ এই ছিলো টেলিভিশনকে ব্যবহার করে চলচ্চিত্রকে পণ্য বিক্রির হাতিয়ার করে তোলার প্রথম দিককার প্রয়াস।

শুধু আমেরিকায় নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টেলিভিশনের সঙ্গে চলচ্চিত্রের এই সংশ্লিষ্টতা লক্ষ করা যায়। যেমন, যুক্তরাজ্যের চ্যানেল ফোর, ফ্রান্সের কানাল প্লুস, জাপানের এনএইচকে, অস্ট্রেলিয়ার এবিসি, জার্মানির জিডিএফ, কানাডার সিবিসি ইত্যাদি।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। এখানকার অনেকেই বলছিলেন, টিভি-চ্যানেলের চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রযোজনা ও প্রদর্শন চলচ্চিত্রের জন্য যুগান্তকারী কিছু একটা বয়ে আনবে। তারা বোঝানোর চেষ্টা করলেন-চলচ্চিত্র নির্মাণের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার দরজা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, চলচ্চিত্রের কাহিনীর মান খুবই খারাপ, এজন্য ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। প্রেক্ষাগৃহের যে-করুণ দশা তাতে সভ্য কোনো দর্শক চলচ্চিত্র দেখবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাগুলো যে-একেবারেই অমূলক তাও কিন্তু নয়।

কিন্তু একটি পাল্টা প্রশ্ন থেকেই যায়, তাহলো-আসলেই টেলিভিশন কি চলচ্চিত্রে যুগান্তকারী কিছু বয়ে নিয়ে এসেছে? চলচ্চিত্র তো শুরুতেই কব্জাবন্দি হয়েছে, পুঁজির বাক্স টেলিভিশনের কাছে। টেলিভিশন এতোদিন যাবৎ তো কম-বেশি অনেক চলচ্চিত্রই নির্মাণ করেছে, তাতে আম-দর্শক কিংবা চলচ্চিত্রের কী-বা উন্নয়ন হয়েছে।

শূন্য দশকের শুরুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যখন মৃতপ্রায়, ঠিক তখনই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসে। ...বাংলাদেশে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় যুক্ত হয়েছে। তাদের প্রযোজিত চলচ্চিত্র একাধারে টেলিভিশন ও প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে।১৫ এছাড়াও এটিএন বাংলা, এনটিভিসহ বর্তমানে বেশ কয়েকটি নতুন টিভি-চ্যানেল চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও প্রদর্শন ব্যবসা শুরু করেছে। যার মধ্যে মাছরাঙা, চ্যানেল নাইন অন্যতম।

একটি টিভি চ্যানেল-একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করছে, এ-ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, এ-নিয়ে আবার কথা বলার দরকার কি? হ্যাঁ, আমি মনে করি দরকার আছে; সার্বিক চলচ্চিত্রের উন্নয়নে এই মাধ্যমটি আপাত ভালো মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তা একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ যে প্রক্রিয়ায় এই চলচ্চিত্রগুলো নির্মিত হচ্ছে এবং যেভাবে এর প্রদর্শন-পরিবেশন হচ্ছে তা থেকে সার্বিক চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে কোনো বড়ো ভূমিকা চ্যানেলগুলো রাখতে পারছে না। কারণ এই চলচ্চিত্রগুলো দর্শকনির্ভর নয়, কর্পোরেট পুঁজিনির্ভর। এই চলচ্চিত্রগুলোর প্রথম প্রিমিয়ার হয় টেলিভিশনে। সেই প্রিমিয়ারে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রদত্ত অর্থ পুঁজি ফেরত ও মুনাফাকে নিশ্চিত করে।১৬ এইভাবে চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে ঘিরে তৈরি হয় পুঁজিভিত্তিক একটি বলয়। ফলে চলচ্চিত্র আর চলচ্চিত্রের পথে হাঁটতে পারে না; হয়ে পড়ে পুঁজি, বিজ্ঞাপনের করুণার পাত্র। কিছুদিন আগে হুমায়ূন আহমেদের নির্মিত ছবি ঘেটুপুত্র কমলা নিয়েও ঠিক একই অবস্থার তৈরি হয়েছিলো। একে তো বিপুল সংখ্যক দর্শক প্রেক্ষাগৃহে বসে ছবিটি দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে টেলিভিশনে যখন তা সম্প্রচার করা হয়, তখনও বিজ্ঞাপনের আধিক্যে দর্শকের মনোযোগ বা ভালো লাগাটুকু নষ্ট হয়ে যায়। মূলত এইভাবেই খাদক টেলিভিশন চলচ্চিত্রকে গিলে ফেলে।

 

লালন বলে, ...তাই মানিলে পাপ-পুণ্যের আর নাই বালাই

আমরা বলছি, একটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ডিজিটাল মাধ্যমের সম্প্রসারণ, টেলিভিশনে চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রদর্শন ইত্যাদি চলচ্চিত্রকে ভয়ানক অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা বলছি, সারা দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলো বিভিন্ন কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার এ-ও বলছি, প্রদর্শক-পরিবেশক মিলে চলচ্চিত্রের স্রোতধারাকে অবরুদ্ধ করে দিচ্ছে। সবই কম-বেশি সত্য ও প্রমাণিত। কিন্তু এখন আর বিশেষ কাউকে কিংবা কোনো বিশেষ মহলকে দায়ী করলে চলবে না। এতোদিনে আমরা নিশ্চিত জেনে গেছি, আসলেই চলচ্চিত্রের জন্য কোন্ বিষয়গুলো অন্তরায়। আমরা যারা চলচ্চিত্রকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, এর উন্নতি দেখতে চাই, এখন তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে চলচ্চিত্রের জন্য মঙ্গলকর বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার একটি রূপকল্প তৈরি করা।

প্রথমত, মনে রাখতে হবে-প্রাযুক্তিক কল্যাণের এই সময়ে দাঁড়িয়ে সেকেলে ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে থাকলে আর হবে না। এ-ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র নির্মাণ, পরিবেশন ও প্রদর্শন ব্যবস্থার বিদ্যমান পদ্ধতিকে অবশ্যই বিদায় জানাতে হবে। কারণ, অর্থনৈতিক দিকসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার কারণে ইতোমধ্যেই ডিজিটাল মাধ্যমের জয়ধ্বনি শুনতে পাওয়া গেছে। তাছাড়া এই একটি বিষয়ই মাথায় রাখার মাধ্যমে আমরা এতোদিনকার সমস্যায় জর্জরিত প্রদর্শন ও পরিবেশন ব্যবস্থাকে বিদায় জানাতে পারবো। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের সবচেয়ে বড়ো বাধা এই প্রদর্শক আর পরিবেশকদের একচেটিয়া রাজত্বের অবসান ঘটাতে, তাই এ-মুহূর্তেই ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এজন্য যে-সমস্ত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান স্ব-উদ্যোগে এর উন্নয়নে কাজ করতে চান, তাদেরকে অবশ্যই একটি বিশদ পরিকল্পনা হাতে নিয়ে এগোতে হবে। এছাড়া একটি সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরি করতে হবে; যাতে পরবর্তীকালে তারা কীভাবে, কোন্ পথে এগোবেন সে-সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে। তবে শুধু ব্যক্তিনির্ভর চলচ্চিত্র চিন্তাই যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে সরকারকেও মাথায় রাখতে হবে, রাষ্ট্রের চলচ্চিত্রকে সবার সামনে কীভাবে, কতো ভালোভাবে ও কতো সহজে পরিবেশন করা যায়। এ-ক্ষেত্রে বিপ্লবোত্তর ইরানের কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশের চাইতে ২৫ বছর পর ইরানের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা হলেও তারা আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রে অনন্য কীর্তির স্বাক্ষর রেখে চলেছে। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর ইরান সরকার নিজ উদ্যোগে সারা দেশে ৫০০টি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করে। যা কোনো না কোনোভাবে ইরানের বর্তমান চলচ্চিত্রের অবস্থায় দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে রেখেছিলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সুতরাং চলচ্চিত্র-সাফল্যের ধারাবাহিকতা যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য সরকারকে অবশ্যই পুরনো আইনের সংস্কার করতে হবে; সংস্কার করতে হবে প্রদর্শন-পরিবেশন ব্যবস্থার বিধিবদ্ধ কঠিন সব আইনকে; সেই সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সুযোগ দিতে হবে আলাদা তহবিল গঠনের। কারণ সবাইকে এটা মনে রাখতে হবে, চলচ্চিত্র আর আগের জায়গায় নেই। ককতোর (ভূবনজয়ী ফরাসি চলচ্চিত্রকার) স্বপ্ন পূরণ হয়েছে; কালি ও কলমের মতোই হয়ে গেছে আজকের ডিজিটাল মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া; সঙ্গে সহজ হয়ে উঠেছে প্রদর্শনের বিষয়টিও।

লেখক : রুবেল পারভেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

rubelmcj@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. মাসুদ, তারেক (২০১২ : ১২৫); ডিজিটাল মাধ্যম ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র; চলচ্চিত্রযাত্রা; প্রথমা, ঢাকা।

২. নাসরীন, গীতি আরা, ফাহমিদুল হক (২০০৮ : ৩১); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প : সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ, ঢাকা।

৩. দাশগুপ্ত, শুভেন্দু (২০০৯ : ১৪০); চলচ্চিত্র অর্থনীতি : হলিউড; শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা-আচার্য নির্মাল্য ও দিব্যেন্দু পালিত;  আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

৪. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৩৯১); চলচ্চিত্র প্রযোজনা, পরিবেশনা ও প্রদর্শন; বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।   

৫. কাদের, মির্জা তারেকুল; (২০০৯ : ৩৭৯); শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা-আচার্য নির্মাল্য ও দিব্যেন্দু পালিত, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

৬. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, শুভেন্দু (২০০৯ : ১৩৯)।

৭. শুভ, শাতিল সিরাজ, শামীম আল মাহমুদ (২০০৬ : ৯৫); চলচ্চিত্র যখন নেহায়েতই সংস্কৃতি-ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদ: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ; চলচ্চিত্রের সময় সময়ের চলচ্চিত্র; ঐতিহ্য, ঢাকা।

৮. প্রাগুক্ত; শুভ, শাতিল সিরাজ, শামীম আল মাহমুদ (২০০৬ : ৯৫)।

৯. হায়দার, কাজী মামুন; প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের মিছিল : নতুন প্রদর্শনী, ভিন্ন চিন্তা; ম্যাজিক লণ্ঠন, সম্পাদনা-কাজী মামুন হায়দার, বর্ষ-১ম, সংখ্যা-২, জানুয়ারি-২০১২, পৃষ্ঠা-২৭, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

১০. প্রাগুক্ত; হায়দার, কাজী মামুন (২০১২ : ৪০)।

১১. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ১০২); প্রসঙ্গ : ডিজিটাল সিনেমা; সিনেমা; ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।

১২. গোলটেবিল বৈঠক-বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র : নির্মাণ, প্রদর্শন ও সম্ভাবনার নানা দিক; কালের কণ্ঠ, ২১ জুন ২০১২।

১৩. দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩০); চলচ্চিত্র অর্থনীতি : হলিউড; শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা-আচার্য নির্মাল্য ও দিব্যেন্দু পালিত ; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

১৪. প্রাগুক্ত; দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩২)।

১৫. প্রাগুক্ত; নাসরীন, গীতি আরা, ফাহমিদুল হক (২০০৮ : ৭৯)।

১৬. প্রাগুক্ত; নাসরীন, গীতি আরা, ফাহমিদুল হক (২০০৮ : ৭৯-৮০)।


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন