সেলিম আহমেদ সাইয়ীদ
প্রকাশিত ০৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বিভ্রম : সিনেমাটোগ্রাফার যখন ‘তথ্য-সাজনদার’
সেলিম আহমেদ সাইয়ীদ
ব্যবসার ক্ষেত্রে information exploiter (তথ্য-সাজনদার) বহুল ব্যবহৃত একটি প্রত্যয়। ব্যবসায় বাড়তি উপযোগিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তথ্য-উপাত্তের সন্নিবেশন কীভাবে করতে হয়, তা এই প্রত্যয়টি ব্যাখ্যা করে। একইভাবে একজন সিনেমাটোগ্রাফার চলচ্চিত্র-ব্যবসার সঙ্গে বাণিজ্যিক উপযোগিতা সৃষ্টির লক্ষ্যে, কীভাবে তার হাতিয়ার (যেমন-অ্যাপারচার, লেন্স, ফিল্ম-স্টক ও আলো) ব্যবহার করে দৃশ্যমান তথ্যকে ছড়িয়ে দেয়-মূলত সেটিই এই নিবন্ধের আলোচনার বিষয়।
বর্তমানে ডিজিটাল মাধ্যমের আধিক্য ও সহজলভ্যতার কারণে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে গেছে। যে-কারণে আজ, মানে এই সময়ে এসে প্রতিনিয়িত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে সিনেমাটোগ্রাফির শৈল্পিকতা। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এই পরিস্থিতি সিনেমাটোগ্রাফিতে কি কোনো পরিবর্তন আনবে? প্রশ্নটির উত্তরের জন্য আমি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ‘ইনফরমেশন এক্সপ্লোয়েটর’-এর ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো। সঙ্গে এটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে, বিভিন্ন উৎস থেকে বাছাই করা প্রাসঙ্গিক কিছু ব্যাখ্যা ব্যবহার করবো। এজন্য সিনেমাটোগ্রাফারকে সংজ্ঞায়িত করতে এই নিবন্ধে হাজির থাকবে কিছু ‘রূপক’ ও‘মন্তাজ’-এর ব্যবহার। আমি সিনেমাটোগ্রাফির কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি এই সীমাবদ্ধতা কীভাবে বাস্তবতার সৃজনশীল ব্যাখ্যা হাজির করে তাও আলোচনা করবো। পরিশেষে, ইমেজ সৃষ্টির প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানবীয় সংশ্লিষ্টতার মূল্যায়নের একটা চেষ্টা থাকবে।
তাহলে শুরুতেই ‘ইনফরমেশন এক্সপ্লোয়েটর’ এর অর্থ বুঝতে কিছু আলোচনা করা যাক। ‘গুরুত্ব অনুসারে তথ্য নির্ধারণ, বিন্যাস ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই।’১ তাছাড়া আমরা এও বুঝি, সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ হিসেবে, আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তথ্যকে বিন্যস্ত করে আসছি। যদি তাই হয়, তাহলে এই তথ্যযুগে অবস্থান করেও তথ্যের বিন্যাস নিয়ে ‘আমরা কেনো এতো বেশি চিন্তিত? এর সাধারণ উত্তরটা এমন যে-এখনও অসংখ্য কোম্পানি মনে করে, তাদের নিজেদের পরিচালনার জন্য তারা তথ্যের অন্তর্নিহিত জ্ঞান নিজেই ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখে।’২
‘For decades, IT and business leaders have watch-often powerlessly-as different business units, subsidiaries and departments independently defined their key data entities such as customer, product and supplier in contradictory within separate IT silos. thats makes any kind of high-level analysis of business performance difficult if not impossible, sapping confidence in underlying data and weakening decision-making’৩
উপরের এ-প্রশ্নের উত্তর হিসেবে যা যা আসতে পারে, তার মূল কথা হলো, তথ্য সন্নিবেশের ক্ষেত্রে মানুষের সংশ্লিষ্টতাকে আমরা উপরিতল থেকে দেখছি। এ-ক্ষেত্রে ড্যাভেনপোর্ট-এর তত্ত্বটি বেশ মানানসই; ‘শেষ পর্যন্ত বলা যায়, তথ্য বিন্যস্ত করার দক্ষতা মানুষের প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যেই পড়ে।’৪ কারণ সর্বোপরি যা হয়, মানুষ কোনো কিছুর পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে তার অর্থ ও উপযোগিতাকে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে উপাত্তকে তথ্যে রূপান্তরিত করে। আবার সেই মানুষই পরে ওই তথ্য থেকে লাভবান হতে চায়।৫ আমার উপলব্ধিতে যতোটা আসে, তাহলো ‘ইনফরমেশন এক্সপ্লোয়েটর’-এর কাজ শুধু তথ্য বিন্যস্তকরণই নয়, মানবীয় মূল্যবোধের উপস্থাপনে ছেদ ঘটানোর জন্যও এরা ভূমিকা রাখে। এ-ক্ষেত্রে সংজ্ঞাটি এমন হতে পারে, কোনো পণ্য সম্পর্কে তথ্য অথবা জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, এক ধরনের অবসেশন তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এই অবসেশন তৈরির মাধ্যমে তাদের মনে এক ধরনের বিভ্রম সৃষ্টি করা হয়; যারা উৎপাদন অথবা ভোক্তা তৈরিতে ও তাদের প্রভাবিত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে। ‘ইনফরমেশন এক্সপ্লোয়েটর’ হলো সেই বিভ্রম সৃষ্টিকারী; যিনি পণ্যের ভৌত অবস্থা তৈরির আগেই এর একটি চিত্রকল্প নির্মাণ করেন।
‘তথ্য-সাজনদার’ কী তাহলে ক্যামেরা-সঞ্চালক
একজন সিনেমাটোগ্রাফারের মূল কাজ হলো- ইমেজ তৈরি, তার প্রক্রিয়াজাত ও স্থানান্তর; এটা অনেকখানি তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকদের কাজের মতোই। ‘তথ্য-প্রযুক্তির মূল কাজগুলোর মধ্যেও রয়েছে-উপাত্ত সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও তার স্থানান্তর করা।’৬ ইমেজের গুণগত মান কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, ইমেজ অথবা ভিজ্যুয়াল গল্প তৈরির ক্ষেত্রে সিনেমাটোগ্রাফারের ব্যক্ত-অব্যক্ত বিষয়গুলোর শ্রেণিবদ্ধ উপস্থাপন; দ্বিতীয়ত, অধীনস্থ (fellow) কলাকুশলীদের সঙ্গে তার সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ। এছাড়া ফিল্ম-স্টক, লেন্স ও ক্যামেরার অ্যাপারচারের মতো প্রয়োজনীয় সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ওপরও সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
চিত্র-১ : সাধারণ চলচিত্র ক্যামেরা, অ্যারি-৪১৬
এই নিবন্ধে আমি শুধু লেন্স ও অ্যাপারচারের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করব। তবে তার আগে কিছু সংজ্ঞা দেখে নেওয়া যাক। সিনেমাটোগ্রাফার জন হোরা-এর মতে, ‘সিনেমাটোগ্রাফি কেবল স্বাভাবিক কোনো ঘটনার সাদামাটা রেকর্ডিং নয়, বরং এটি সৃজনশীল এবং ব্যাখ্যামূলক প্রক্রিয়া; যা এর স্রষ্টাকে কোনো মৌলিক কাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। একজন সিনেমাটোগ্রাফার তার শৈল্পিক দৃষ্টি ও কল্পনাশক্তির সমন্বয়ে ইমেজকে পর্দায় তুলে ধরেন; ঠিক যেমনভাবে তিনি নিজ দক্ষতা দিয়ে তার সহযোগী কলাকুশলীদের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন।’৭
প্রায়শই যেটা হয়, একজন পরিচালক চিত্রনাট্য নির্মাণ করলেও গল্পের দৃশ্যরূপটি কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফারই করেন। এ-প্রসঙ্গে বিলি উইলিয়াম (গান্ধী চলচ্চিত্রে, সেরা সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে অস্কার পুরস্কার পেয়েছেন) আমার সঙ্গে (লেখকের সঙ্গে) এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রথমত, মনে রাখতে হবে আপনি পরিচালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। তাই আপনাকে অবশ্যই তার মূল সুরটি বুঝে নিতে হবে; যাতে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে আপনি পরিচালকের সঙ্গে চিন্তার আদান-প্রদান করতে পারেন। এভাবে একে অন্যকে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে পরিচালক যখন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে এবং বিষয়টি আপনার সঙ্গে শেয়ার করবে, তখনই একটি কাজ সেরা হয়ে উঠবে। এবার আপনি এই বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এমন কিছু করার চেষ্টা করুন, যা আপনার চলচ্চিত্রটির রূপ কী নেবে ও কীভাবে আপনি গল্প বলতে চাচ্ছেন, সেই ধারণাকেই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
এ-ক্ষেত্রে যোগাযোগের প্রথম পর্যায়ে পরিচালক ও সিনেমাটোগ্রাফারের মধ্যে কথোপকথন হয়। পরে সেটাই তাদের ক্ষেত্রে লিখিত নথি আকারে রাখা হয়। কথা বলার সময় তা স্বরধ্বনি হয়, আর লিখিত রূপটি এক ধরনের চিত্রকল্প (ইমেজ) সৃষ্টি করে। কথোপকথন যা শব্দ আকারে প্রকাশ পায়, তা আগে শব্দ (সাউন্ড) হিসেবে শোনা যায়, তারপর ইমেজ দৃশ্যমান হয়। মানুষের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটে; শিশু জন্মাবার আগে সে কিন্তু মাতৃগর্ভ থেকেই বাইরের সবকিছুর শব্দ শুনতে পায়। এর ফলে যেটা হয়, সে এর মধ্যে দিয়ে পৃথিবী সম্পর্কে এক ধরনের চিত্রকল্প তার মনে তৈরি করে ফেলে। শব্দ আসলে সবসময় এক ধরনের ইমেজের ধারণা দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখন মুখে ‘পাখি’ শব্দটি বলি, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে পাখির একটা ইমেজ তৈরি হয়। এ-বিষয়টিকে এবার চলচ্চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিই- ফিল্ম ন্যারেটিভের সাধারণ প্রথা হিসেবে চলচ্চিত্রের শুরুতে শব্দ ও আধারের সমন্বিত ব্যবহার করা হয়। বিষয়টা অনেকটা মাতৃগর্ভের অন্ধকারের মধ্যে থেকেও একটি শিশুর বাইরের শব্দ শুনতে পাওয়ার মতো। এবারে আমি বিভ্রম ও উপযোগিতা সৃষ্টিতে শব্দের ক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
আলোচনা শুরু হতে পারে-একজন সিনেমাটোগ্রাফারের কাজ দিয়ে। বিলি উইলিয়াম বলেছেন, ‘প্রযুক্তি, সরঞ্জাম, আলো, ফিল্ম-স্টক, প্রিন্টিং ও প্রদর্শন প্রতিটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো আপনি কীভাবে ব্যবহার করবেন সেটি একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন, আলোর বৈশিষ্ট্যকে আপনি কীভাবে ব্যবহার করবেন; কীভাবে আপনার দেখা গুরুত্বপূর্ণ কিছুকে আপনি ছবির ফ্রেমে ধরে রাখবেন। যদিও বিলি উইলিয়াম তার এই আলোচনায় চলচ্চিত্র বানানোর পূর্বপ্রস্তুতি (preproduction), শুটিং চলাকালীন প্রস্তুতি (production) ও শুটিং পরবর্তী প্রস্তুতি (postproduction) বিশেষ করে সম্পাদনা ও প্রদর্শন নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আমি এই নিবন্ধে কেবল শুটিং চলাকালীন প্রস্তুতি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো।
চিত্র-২ : অ্যাপাচারের ডায়ামিটার
ক্যামেরার অ্যাপারচার মূলত ফিল্মের ওপর ঠিক কতোখানি আলো পড়বে তা নিয়ন্ত্রণ করে। একজন পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফার তার সৃজনশীলতার ভিত্তিতে আলো ঢোকার মাত্রাগত দিকটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে চিত্র-৩ এ আমরা দেখতে পাচ্ছি সেখানে বিভিন্ন ধরনের f-stop (ইমেজের উজ্জ্বলতা যে-সূচকের উপর নির্ভরশীল তাই f-stop । লেন্সের ফোকাল লেংথকে তারে ইফেক্টিভ অ্যাপারচার দিয়ে ভাগ করে এই সূচক পাওয়া যায়) ছবি ধারণ করা হয়েছে। এখানে সিনেমাটোগ্রাফারের পছন্দ ছিলো ১.৫ f-stop, অথচ এই সূচকটি (১.৫ f-stop) আদর্শ f-stop লেন্সে অনুপস্থিত। কিন্তু তারপরও সিনেমাটোগ্রাফার এটাই বাছাই করেছিলেন, কারণ যতোদূর সম্ভব তিনি এই ছবিতে অন্ধকার ও উজ্জ্বলতার মধ্যে বড়ো ধরনের একটা বৈপরীত্য ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। এ-কারণেই সাধারণ দর্শকের দেখার যে-অভ্যস্ততা সেখানে ছবিটি প্রভাব ফেলে। ছবিটির দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখুন, সামনে বেঞ্চে বসে থাকা মানুষটি ও পিছনের গ্লাসের খোলা জানালা দুটোর মধ্যে দ্রুত চোখ আসা-যাওয়া করছে। মানে চোখ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর ওপর স্থির থাকছে না। ছবিতে গল্প বলার ধরনের ওপর নির্ভর করে দর্শক কী পছন্দ করবেন। এ-ক্ষেত্রে সিনেমাটোগ্রাফারের মন ঠিক যেনো চিত্রশিল্পীর মতোই, আর এই বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে সিনেমাটোগ্রাফার মাইকেল চ্যাপম্যান বলেন, ‘সিনেমাটোগ্রাফি হলো আলোর সাহায্যে ছবি আঁকা।’৮
চিত্র-৩ : একই ছবিতে ভিন্ন f-stop
যেহেতু চলচ্চিত্র প্রধানত ইমেজ নির্ভর শিল্প মাধ্যম, তাই একজন সিনেমাটোগ্রাফার তার নিজের শিল্পকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য সহকর্মীদের শিল্পকর্ম কীভাবে দেখানো হবে তা নির্ধারণ করেন ইমেজ সৃষ্টির মাধ্যমে। এখানে সিনেমাটোগ্রাফিক ইমেজের উপস্থিতির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ইমেজেই যে-সবকিছু দৃশ্যমান হয়, তা অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। কারণ, দর্শকরা চোখের সামনের পর্দায় একজন কীভাবে বসে থাকে কিংবা তার চারপাশে কী আছে সেটাই শুধু দেখে-এর বাইরে সিনেমাটোগ্রাফির যে-গুরুত্ব তা কম সংখ্যক দর্শকের কাছেই সুস্পষ্ট দৃশ্যমান হয়। দর্শক ভুলে যায় যে, আলোর সৃষ্টিশীল ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দর্শক কেবল তাই পর্দায় দেখে যা আলোকিত থাকে, এর বাইরে অন্যান্য বিষয়কে তারা উপেক্ষা করে থাকে। সিনেমাটোগ্রাফার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন ঠিক এভাবেই।
চিত্র-৪
চিত্র-৫
৪-নং চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সিনেমাটোগ্রাফার এমন কিছু দেখছেন যা আপাত ক্যামেরার সামনে দৃশ্যত নয়। তার মানে ক্যামেরার আশেপাশে বা সামনে যা ঘটছে তা দেখছেন। একজন সিনেমাটোগ্রাফার অবচেতন মনের ইমেজ ও ক্যামেরার সামনে যা দেখেন এই দুটোর সমন্বয় করেন এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে তার ইমেজ তৈরির চেষ্টা করেন। ৫-নং চিত্রে দেখা যাচ্ছে, অন্য একজন সিনেমাটোগ্রাফার আলো ব্যবহার করে ইমেজকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করছেন।
প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা
সীমাবদ্ধতার ধারণাটি ‘Value creating and value leakage’ তত্ত্বের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। কারণ, সিনেমাটোগ্রাফাররা তাদের সহশিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করেন এবং কাঠামোহীনতার প্রাচুর্যে গল্প বলার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা পেয়ে থাকেন। তার মানে ‘তথ্যের অন্তর্নিহিত জ্ঞান বোঝার জন্য একটি কাঠামোর প্রয়োজন হয়, যা অগোছালো আধেয়ের ব্যবস্থাপনা করতে পারে।’৯
সেলুলয়েডে চলচ্চিত্র তৈরির সেটে একজন সিনেমাটোগ্রাফার অ্যাপাচার নিয়ন্ত্রণ করেন, যা কোনো বিষয়ের তাৎপর্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে পরিমাপক হিসেবে কাজ করে। এই অ্যাপাচার নিয়ন্ত্রণ করতে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে, তা সিনেমাটোগ্রাফার তার সহযোগী কলাকুশলীদের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে নিয়ন্ত্রণে নেন। তাই আপাতদৃষ্টিতে সিনেমাটোগ্রাফারে সহযোগী কলাকুশলীর সঙ্গে আলোচনাকে গণতান্ত্রিক মনে হলেও আমি বলতে চাই, এটি এক ধরনের স্বৈরাচারী কৌশল; তবে তুলনামূলকভাবে ডিজিটাল সিস্টেম এ-ক্ষেত্রে অনেকখানি গণতান্ত্রিক পরিবেশ এনেছে অথবা এমনও হতে পারে, এটা তারা হয়তো করছে ব্যবসায়িক বিচক্ষণতার ধারণা থেকে। এটা ‘তথাকথিত তথ্যের গণতন্ত্রায়ন, যা বিজনেস ইন্টিলিজেন্স কম্পিটেন্সি সেন্টারের (বিআইটিসি) কাজে যান্ত্রিক প্রাচুর্যতার নির্দিষ্ট মান প্রমিতকরণ করে, তাই তথাকথিত গণতন্ত্রকে মনে হয় একটি ভ্রম।’১০
চিত্র-৬: সনির সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরা
শুটিংয়ের সময় এলসিডি মনিটরে, রেকর্ড করা সবকিছুই সরাসরি দেখা যায়, এমনকি কলাকুশলীরাও দেখতে পান- সিনেমাটোগ্রাফার কী ইমেজ তৈরি করছেন; যা সিনেমাটোগ্রাফারের শিল্প সৃষ্টির পদ্ধতিকে গণতান্ত্রিক করে তোলে। কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফারের মাথায় আলোর ব্যবহার নিয়ে যে-বোঝাপড়া থাকে, তা নিতান্তই তার ব্যক্তিগত, সেজন্য তার সৃষ্ট ইমেজ তার নিজস্বতা বহন করে। তাই ডিজিটাল সিনেমাটোগ্রাফিতেও আসলে গণতন্ত্রায়ন হয়নি, কারণ এই পদ্ধতিতে একজন সিনেমাটোগ্রাফারের কাজের প্রক্রিয়ার গতি অনেকখানিই কমে গেছে। এনালগ সিস্টেমে শৈল্পিক কাজের যে-পরিসর, ডিজিটালে তা আর থাকছে না। যদিও আমি মনে করি জ্ঞানই শক্তি, তথ্য নয়।
চিত্র-৭ : অ্যারি-৪১৬ মডেলের ক্যামেরায় মানুষের চোখের দৃশ্য
যদিও অ্যাপারচারের পছন্দসই ব্যবহার বাস্তবতাকে চমকপ্রদ করে; তারপরও ইমেজ কখনও বাস্তব নয়, কিন্তু বাস্তবসম্মত। কারণ, অ্যাপারচারের কাজ চোখের আইরিশের মতো হলেও চোখের মতো নয়। তবুও ক্যামেরার এই সীমাবদ্ধতা, বার্তায় এক ধরনের সৃজনশীল চমকপ্রদভাব সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়, যা নিয়ে বাস্তবতার বিভ্রম তৈরি হয়। এই বিভ্রমই পর্দায় ইমেজ হিসেবে দেখা যায়, পরবর্তীতে যা আবার ব্যবসার মূল হিসেবে কাজ করে।
সুতরাং একটি বিষয় পরিষ্কার, ‘শব্দ’ ও ‘ইমেজ’ উপযোগিতা সৃষ্টির দুটি প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু আলো ও শব্দের ওপর সিনেমাটোগ্রাফারের যে-অপ্রকাশিত জ্ঞান, তা এই এটি সৃষ্টির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এটা খুবই সাধারণ কথা, আলো আছে বলেই আমরা পৃথিবীকে দেখতে পাই ।
চিত্র -৮ : আমার মায়ের বাগান (সেলিম সাইয়ীদ)
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকি, যেমন শৈশবে, সকালে আবার কখনও বিকেলে। আমাদের এই অভিজ্ঞতা নির্ভর করে, বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলোর ওপর। এই আলো, বস্তুটির বর্ণ, আকার ইত্যাদি বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করে। তার মানে প্রতিফলিত আলো তথ্য বহন করে। কিন্তু এই তথ্য তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন আমাদের মস্তিষ্ক এটি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। ব্যক্তি-মানুষের মস্তিষ্ক আগে থেকে কী ধরনের তথ্য বহন করে, তার ওপর নির্ভর করে এই ব্যাখ্যা কেমন হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা বৃক্ষের কথা বলতে পারি। বৃক্ষ হতে কোনো আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসলে আমরা বৃক্ষটি দেখতে পাই, চিনতে পারি; কারণ বৃক্ষের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে ছোটবেলা থেকেই আমি জানি অর্থাৎ মায়ের গর্ভ থেকেই আমরা শুনে আসি। কিন্তু এই বৃক্ষকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে অনুভব করি। আমার মতে, ‘অনুভূতির সচেতন বোঝাপড়াই হলো জ্ঞান।’ আবার, তথ্য ব্যবস্থাপনার গুরু ক্লাইভ-এর মতানুসারে, ‘আসলে কোনো রচনায় তথ্যের বোঝাপড়াই হলো জ্ঞান।’
যদিও আমরা জানি অনুভূতি হলো শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। এ-ক্ষেত্রে প্রথমত, অনুভূতি বিশেষভাবে নির্ভর করে অরগানের অবস্থার ওপর, যা কিনা দেখার জন্য চোখ এবং শোনার জন্য কানের জৈবিক সাড়ার ওপর নির্ভরশীল। আর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে হলো ‘ইনফরমেশন এক্সপ্লোয়েটর’। তাহলে আমরা বলতে পারি, চোখ ও কানের মাধ্যমে কোনো কিছু ধারণের পর দর্শকের বা মানবমস্তিষ্কে কী ধরনের ব্যাখ্যা দাঁড়াবে তা ‘ইনফরমেশন এক্সপ্লোয়েটর’ হিসেবে একজন সিনেমাটোগ্রাফারের ওপরই নির্ভরশীল।
সুতরাং, একজন সিনেমাটোগ্রাফারের কাজে তাৎপর্য সৃষ্টির জন্য আমি সে-সব দক্ষতাকে গুরুত্ব দিই সেগুলো হলো-
প্রথমত, আলো ও শব্দ সম্বন্ধে সংবেদনশীলতা
দ্বিতীয়ত, শোষণক্ষম ব্যক্তিত্ব
তৃতীয়ত, উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে সচেতনতা
নিজের সচেতন পর্যবেক্ষণ দ্বারাই একজন সিনেমাটোগ্রাফারের এ-গুণগুলো অর্জিত হতে পারে। এ-ক্ষেত্রে সেই সিনেমাটোগ্রাফারকে সবসময় দুটি প্রশ্ন সচেতনভাবে মনে রাখতে হবে, আমি ‘কী করি, কেনো করি’।
(ILLUSION : Cinematographer As Information Exploiter শিরোনামের প্রবন্ধটি লেখকের সহযোগিতায় বাংলায় ভাষান্তর করে প্রকাশ করা হলো)
লেখক : সেলিম আহমেদ সাইয়ীদ ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি ফর দ্য ক্রিয়েটিভ আর্ট থেকে ফিল্ম অ্যান্ড ভিডিও প্রোডাকশনে স্নাতক এবং লন্ডনের গোল্ডস্মিথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ক্রিন ডকুমেন্টারি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। পরবর্তীতে তিনি আল-জাজিরা টেলিভিশনের ‘পিপল অ্যান্ড পাওয়ার’ প্রোগ্রামের মূল ভাবনাকারী ছিলেন। বর্তমানে সাইয়ীদ ইংল্যান্ড-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় নির্মীয়মাণ ‘Tarot’নামের একটি চলচ্চিত্রে নির্বাহী প্রযোজকের দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডি বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে।
salimsyed19@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. Infoconomy (2007:38); The Effective IT Report. Infoconomy. (this informationage).
২. প্রাগুক্ত;Infoconomy (2007:38).
৩. প্রাগুক্ত; Infoconomy (2007:42).
৪. Marchand, Donald A., Thomas H Davenport (Ed.) (2000:9) Mastering information Management; Prentice Hall, Financial Times, Great Britain.
৫. প্রাগুক্ত; Marchand, Donald A., Thomas H Davenport (Ed.) (2000:9).
৬. G. Carr : IT Doesn't Matter:42৭. Hummel : 2001:1.
৮.Ettedgui, Peter (ed.) (1998:8); Cinematography Screen Craft; Roto Vision, Switzerland.
৯. প্রাগুক্ত; Infoconomy (2007:45).
১০. প্রাগুক্ত; Infoconomy (2007:41).
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন