Magic Lanthon

               

আব্দুল্লাহ আল  মুক্তাদির

প্রকাশিত ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

রাতের ফুল দিনে সূর্যমুখী

ফারুকীর টেলিভিশন : অজস্র ছবির বিভিন্ন গল্প

আব্দুল্লাহ আল  মুক্তাদির

 

Image does not illustrate text, it is the text which amplifies the connotative potential of the image.

The reader is thus free to enter a text from any direction; there is no correct route.

কোনো এক  গ্রাম,যমুনার দীর্ঘ কূল ঘেষে দাঁড়ায়ে আছে। এই পাড় আর ওই পাড়ের মাঝখানে কয়েকটা চর।সেখানেও মানুষ বাস করে। তাদেরও চোখ আছে। তারাও তাকায়,খেয়াল করে। সেই চর থেকে এক বালিকা বেড়াতে এলো পশ্চিম পাড়ের গাঁয়ে,মাসি-মেসোর বাড়ি। সালটা ১৯৮৭। বছর ছয়েক হলো এখানে বিদ্যুৎ এসেছে,গত মাসে টেলিভিশন। সন্ধ্যার পরে উঠোনজুড়ে সেই টেলিভিশন দেখার আসর  বসে রোজ। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো। টেলিভিশনের পর্দাটি দপ করে অন্ধকার। বালিকাটি দেখলো দল বেঁধে সব উঠে যাচ্ছে। মনে মনে (নয়তো উচ্চারণ করেই) সে বলে ...মাসি গো, হারিকেনডা ধরায়াইয়া আনো,আমি আরো টিবি দেখমু। শিগগির আনো,সব বোধকয় আন্ধারেই ফুরাইয়া যায়।

যেহেতু আগে বেতার তারপর টেলিভিশন,দূর থেকে ভেসে আসা শব্দের চমক ততোদিনে শেষ। টেলিভিশনে শব্দ আর  ছবি-দুইটা একসঙ্গে আসলেও প্রধান আকর্ষণের অজানা বিষয় ছিলো দূর থেকে ভেসে আসা ছবি (image)।ছবি মানেই তাতে রঙ আছে। সাদা-কালো রঙ বা লাল-নীল-সবুজ-মানুষের গায়ের রঙ-ছাই রঙ ইত্যাদি। সুতরাং,যেসব অসংখ্য ছবি টেলিভিশনে ভেসে আসে তারা বিচিত্র রকমের। অসংখ্য ছবি মিলেমিশে নানান সময় নানান গল্প তৈরি করে। হাজার-লক্ষ-বিলিয়ন ছবি মিলায়ে একেকটা গল্প। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালনায় সৃষ্ট,জমানো এমন অজস্র ছবি মিলায়ে টেলিভিশন (২০১৩) চলচ্চিত্রের গল্প।

এবং একেকটা ছবির সামনে ও পিছনে জমে ওঠে আরো অসংখ্য গল্প। একেকটা ছবি একেকজন একেকরকম করে বুঝে নেয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট,একক গল্প তৈরি করা বা হওয়া অসম্ভব। টেলিভিশন চলচ্চিত্রের শুরুতে যেমন বাজার থেকে নৌকায় দৈনিক পত্রিকা কিনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চরের এক  বিচ্ছিন্ন গ্রামে। পত্রিকায় স্বভাবতই বিনোদন পাতা থাকে। হিন্দি চলচ্চিত্রের এক অভিনেত্রীর ছবিসহ পত্রিকার সব ছবি সাদা কাগজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। পরের দৃশ্যে সাদা পর্দার আড়াল থেকে টেলিভিশনের জন্যে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন চেয়ারম্যান। তিনি তার মুখ ক্যামেরায় দেখাতে চান না।

ছবি ঢাকার বা এড়ায়ে চলার জন্যে যে সাদা রঙের ব্যবহার, এই রঙ একেকজনের চোখে একেকরকম হয়ে ভাসবে। একজন মুসলমান সাদা রঙের মধ্যে হয়তো কাফন, মৃতের নাকের-কানের সাদা তুলা খুঁজে পায়। হয়তো রঙটাকে পবিত্র আর ইসলামি মনে হয়।কারো কারো জন্যে সাদা রঙ আসলে রঙহীনতা আবার অন্য কারো চোখে সব রঙের সমাহার। অনেকেই বলবে, এখানে কোন্‌ রঙের কাগজ বা কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে-এটা কোনো ব্যাপার না, মুখ্য আসলে ওই কাগজ বা কাপড় দিয়ে কী আড়াল করা হচ্ছে।

এই আড়াল করার কাজটারও নানান রকম ব্যাখ্যা আসতে পারে। সহজ চোখে দেখতে গেলে মনে হবে, কেবল ধর্মীয় কারণে কাজটা করা হচ্ছে। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সমাজ-সংসারে বেড়ে ওঠা,বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান নিয়ে আসা চোখে বিভিন্ন আলো নানান রকম অনুভূতি তৈরি করতে বাধ্য। একজন সত্যিকারের কট্টর ধার্মিক-যদি সে মুসলমান হয়,কাজটাকে ধরে নেবে একধরনের অনুকরণীয় নজির হিসেবে। আবার সেই কট্টর ধার্মিক যদি হিন্দু ধর্মের (বা অন্য যেসব ধর্মে ছবি বা প্রতিকৃতি পূজনীয়) অনুসারী হয়,সে এই কাজটাকে মনে করতে পারে ইসলাম ধর্মের বাড়াবাড়ি,ত্রুটি বা পিছায়ে থাকার স্পষ্ট নজির। একজন উদারপন্থি মুসলমান ভাবতে পারে,কাজটা হয়তো হাদিস-কোরআন অনুসারে সঠিক। কিন্তু মানুষের তো যুগ অনুসারে চলতে হয়;সুতরাং এই যুগে এসে এই রকম ছবি এড়ায়ে চলা মোটামুটি অসম্ভব আর অনুচিত। ঢাকার মতো যেকোনো শহরের শিক্ষিত বাসিন্দা যখন চলচ্চিত্রের এই দৃশ্য দেখবে,তার চোখে মনে হতে পারে আধুনিক শিক্ষার অভাব এই ধরনের সংকীর্ণ মনের কার্যকলাপের জন্য দায়ী। আর  যদি এমন কেউ থেকে থাকে (অন্তত কল্পনায়) যে কোনোদিন টেলিভিশন বা পত্রিকা চোখে দেখে নাই,সে যদি প্রথম এই আড়াল করার দৃশ্য দেখে,তার কাছে কী মনে হবে? নিশ্চয়ই আগের সব অনুভূতি থেকে আলাদা, অন্যরকম কিছু।

এই রকম অনেক (অসীম) রকমে টেলিভিশন-এর ব্যাখ্যা সম্ভব। একসঙ্গে অনেকজনের মনে বিচিত্র ধরনের বা একজনের মনে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে, দৃশ্যগুলো দেখে।

আ.

জীবনে কোনোদিন টেলিভিশন দেখে নাই সে। জন্ম ৯০ দশকের একেবারে শেষে। অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না, কিন্তু সত্যই সে টেলিভিশনে কোনো অনুষ্ঠান কখনো দেখে নাই। বেশ কয়টা কারণ আছে এর পিছনে। যাই হোক, (ধরা যাক) জীবনের প্রথম সে চলচ্চিত্র দেখতে গেলো। যে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, নিশ্চয়ই সে তার বন্ধু না। বয়সে তার থেকে অন্তত বছর ছয়-সাতেকের বড়ো। চমকের বিষয় হলো, সেই চলচ্চিত্রের নাম টেলিভিশন

পোস্টারগুলো দেখেই নানান রকম চিন্তা মাথায় আসে। সাদা রঙের অক্ষরগুলো একের পর এক সাজানো। ট-এর সঙ্গে এ-কারটা লেজের মতন, নয়তো পাকানো দড়ির মতন;পাখির পাখা উড়ছে ট-এর মাথায়;আর ল-এর উপরে আরেকটা পাখনা কলার পাতার মতন ছেয়ে আছে;ভ-এ হ্রস্ব ই-কার;শ-এর মাথায় পিছনের পাগুলি রেখে,অন্য দুইখান পা তুলে এক পঙ্খীরাজ ঘোড়া যেনো এখনই উড়াল দেবে। লাল জমিনে তিনজন মানুষের মুখ। দুইজন-বাঁয়ের লোকটা আর মাঝখানের মহিলাটা মিষ্টি করে হাসছে। ডানদিকের লোকটা কালো গোঁফ,কালো চুল নিয়ে ভ্রু কুঁচকিয়ে তাকায়ে আছে,বেশ রাগ হয়তো তার মনে।

আসলে ভিতরে গিয়ে সে কী কী দেখবে? এই মানুষগুলান কথা বলবে,নানান রকমের কাজ করবে? টেলিভিশন-এ ওই পাখাওয়ালা ঘোড়ার মতন অবাক করা কিছু তো নিশ্চয়ই ঘটবে। তার কল্পনায়,স্বপ্নে সে যতোবার টেলিভিশনের মতন কিছু দেখেছে-গোলাপ-গাঁদা ফুল,টিয়া পাখি,যমুনা নদী,বাজারের মাথায় বসানো উঁচু টেলিফোনের টাওয়ারটা ছিলো সেখানে। ভিতরে বসার আরো খানিক পরে পাশের লোকটা বললো,ছবি শুরু হচ্ছে। ততোক্ষণে ও নানান ছবি দেখে ফেলেছে (যেমন :পতাকার সবুজ-লাল ছবি)। এরপর মনোযোগ দিয়ে সে সব শুনতে লাগলো। তার চেয়ে বেশি মন দিলো সঙ্গে ভেসে আসা নানান রঙের ছবির দিকে;বিশাল দেহের মানুষগুলান। আবছা আলোতে তখন নিজের হাতের দিকে তাকালে হাতগুলা দেখতে একেবারে ছোট্ট লাগে।

একজন গ্রামীণ চেয়ারম্যান। তার নাম আমিন পাটোয়ারি। দাড়িওয়ালা ধার্মিক লোকটা গ্রামে টেলিভিশন ঢুকতে দেবে না বলে জোরালো পণ করেছে। গ্রামটা একটা বিচ্ছিন্ন চরের মতন। বাইরের পোস্টারের সেই তিনজন মানুষকে সে চিনতে পারে। চেয়ারম্যানের ছেলে সোলায়মান পাটোয়ারির (পোস্টারের বাম দিকের ছেলেটা) সঙ্গে কালো বোরকা পরা-হলুদ ওড়না জড়ানো মেয়েটার (পোস্টারে দুজনের মধ্যে যে ছিলো) প্রেমের সম্পর্ক। নানান রঙ্গ-রসের কথা সে বলে মেয়েটাকে।

আই  চোখ বন্দ কইরলে আমার মনের টেলিভিশনে তোমারে দেহি।

মেয়েটা হেসে,নানান ঢঙে তার উত্তর করে। দর্শক-ছেলেটা এই রকম মনের টেলিভিশনে জীবনে নানান কিছু দেখেছে। আসলে মনটা এই রকম টেলিভিশনই তো,আর  অন্য কী? নানান জন-যাদের ধরা যায় না,ছোঁয়া যায় না,তারা সেই টেলিভিশনে আসে-যায়,কথা কয়। প্রেমিক ছেলেটা আসলে তারই মনের কথা বলছে। এমন মিলে গেলে একরকম অদ্ভুত আনন্দ সে পায়। লোকটাকে বড়ো আপনার লাগে। সে আরো মন ডুবায়ে দেখে বড়ো পর্দার মানুষ,গাছ,সবুজ মাঠ,লাল উড়ন্ত পর্দা,নদীর বিশাল লম্বা পাড় বেয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে কথা বলতে বলতে দুইজন যায়-সেই পোস্টারের দুই লোক। ডানদিকের রাগী লোকটাকে দেখে তার এখন অন্যরকম লাগা শুরু হয়।লোকটার ভীষণ কষ্ট। ওই এক মেয়েকেই (পোস্টারের মধ্যখানে যে ছিলো,নাম কোহিনূর)সে ভালোবাসে,কিন্তু সে তো চেয়ারম্যানের ছেলে না,তাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী। তাই সে ভালোবেসে কষ্ট পায়। আহা রে! তার চকচকে লাল শার্ট,ঘন গোঁফ,নীল লুঙ্গি-সবই যেনো বৃথা। সে কোহিনূরকে বলে,সেই অনেক আগে থেকে সে তার প্রেমে পড়ে আছে। কিন্তু সে গরিব,তাই জোর করতে পারে না। তার দম বন্ধ করা কষ্ট হয়।১৩-১৪ বছরের ছেলেটা এবার নিজের বুকের বামপাশটায় হালকা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে। তার সবচেয়ে প্রিয় বালিকার মুখটা ভেসে ওঠে যেনো পর্দায়। বড়ো টেলিভিশনটাকে তার হঠাৎ আরো বেশি আপনার লাগে,আরো বেশি স্বপ্নের মতন মনে হয়।

পর্দায় পুরনো লালচে ব্রিজটাকে দেখতে বেশ লাগছে। চেয়ারম্যান তার সঙ্গী-সাথি নিয়ে ব্রিজ পার হয়ে যাচ্ছে একমুখো,অন্যমুখো হয়ে সাইকেলে একটা বড়ো বাক্স মতন প্যাকেটে করে কিছু একটা নিয়ে ঘরে ফিরছে একটা লোক। পরে জানা যায়,সে আসলে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক কুমার মাস্টার। চেয়ারম্যান সাইকেলের বাক্সটার দিকে তাকায়;সন্দেহ করে বোধ হয়।

কী আইনচো?

-টেলিভিশন।

কুমার মাস্টারের মুখে এই অকল্পনীয় উত্তর পাওয়ার পর খানিকক্ষণ সবাই চুপ। চুপ। একদম চুপ। এখন কী হবে? এই টেলিভিশন নিয়ে নিশ্চয়ই তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে। আমিন চেয়ারম্যানকে তার (দর্শক-ছেলেটা) নিজের বাবার মতন বেশি,অতি বেশি কড়া মনে হয়। সে তার বাবাকে এই কারণে এখনো ঠিক ভালোবেসে উঠতে পারে নাই। ভয় করে,শুধু ভয়। চেয়ারম্যান লোকটাকে সে ঠিক ভালো বা খারাপ বলে বুঝে উঠতে পারে না। কারণ,জানালা কাটা,একেবারে নদী লাগোয়া মসজিদ ঘরটায় বসে খানিক পরেই চেয়ারম্যান শিশুর মতন কেঁদে ওঠে। সে খোদার কাছে বারবার আকুতি করে। গ্রামের মানুষের ধর্ম সে রক্ষা করতে পারছে না,এই ভেবে কাঁদে। কোনো একজন মানুষ অন্যসব মানুষকে পাপ থেকে বাঁচাতে পারবে,দর্শক-ছেলেটা বিশ্বাস করতে পারে না। কারণ,বাবার কড়া শাসনে থেকেও ভয়ানক কিছু পাপ সে করেছে এই অল্পদিনের জীবনেই। চেয়ারম্যানকে কি মানুষ পাপ থেকে বাঁচার জন্যে ভোট দেয়? মসজিদে সাদা পোশাকের যে ইমাম গম্ভীর হয়ে বসে আছে,তার দায়িত্ব আর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব্ব যেনো গুলিয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই চেয়ারম্যানকে আবার অন্যরকম মানবিক লাগে।

আই  যদি টেলিভিশন বন্দ করি তো বিধর্মীদের অধিকার ক্ষুন্ন অয়।

অতএব ঠিক করা হয়,কুমার মাস্টারের বাড়িতে টেলিভিশন থাকবে। কিন্তু কোনো মুসলমান সেই টেলিভিশন দেখতে পারবে না। কুমার স্যারের উঠোনে রক্ত-লাল জবাফুল। ঘরে টেলিভিশন,দেখতে দেখতে সারা গ্রাম থেকে মানুষেরা আসে। জানালা দিয়ে টেলিভিশনে চায়ক। দিনে দিনে অংক প্রাইভেটে ছাত্র-ছাত্রী বাড়তে বাড়তে কুমার স্যারের ঘর ভরে যায়;কোহিনূরও আসে। একবার সেখানে চেয়ারম্যান হঠাৎ আসলে সবাই ধরা পড়ে যায়। টেলিভিশনের দামের চেয়ে এক হাজার টাকা বেশি কুমার মাস্টারকে দিয়ে,টেলিভিশনটা সোজা ফেলে দেওয়া হয় নদীর জলে। তারও আগে হলদে পোশাক পরা কোহিনূরকে-চেয়ারম্যানের প্রশ্নের জবাব না দেওয়ায়-কান ধরে উঠবোস করানো হয়।তিনবারের নির্দেশ থাকলেও কোহিনূর রাগে-দুঃখে অনেক বেশিবার ওঠে আর বসে। সে শব্দ করে কাঁদতে থাকে। ধমক দিয়ে তার কান্না,উঠবোস কোনোটাই থামানো যায় না। চেয়ারম্যানের ছেলের দেওয়া মোবাইল সে পুকুরের জলে ছুড়ে মারে। চেয়ারম্যানের ছেলে মেয়েটার জন্যে পাগলপ্রায় হয়ে যায়। একপর্যায়ে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সে দলবল নিয়ে মাইকে গ্রামময় প্রচার করে,সে নিজেই এবার কোহিনূরের সঙ্গে নিজের বিবাহ ঠিক করেছে। শুধু তাই না,তার বাবা সারা গ্রামকে যে টেলিভিশন থেকে দূরে রেখেছে,ওই দিন গ্রামে সেই টেলিভিশন আসবে।

আপনেরা ব্যাকে মন ভরি হেই টেলিভিশন চাইবেন।

চেয়ারম্যান লোকজন নিয়ে গেলেও ব্যর্থ হয়ে,অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।তার ঘরে লাল পর্দা উড়ছে। বিদ্রোহের পর থেকে সে অসহায় হয়ে যায়। দর্শক-ছেলেটার মনে হয়,তার নিজের বাবার মতন কোনো বাঘকে কেউ একজন বিড়াল বানিয়ে ফেলেছে। এরপর চেয়ারম্যান চরিত্রটাই যেনো বদলে গেলো। তার হাঁকডাক,শৌর্য-বীর্যের বদলে চোখভরা মায়া,ছেলের জন্যে আকুতি আর মেনে নেওয়ার পালা। সোলায়মান পাটোয়ারির সঙ্গে কোহিনূরের বিয়ে দেবেন বলে মনস্থ করেন।

হজে যাওয়ার সময় যা ঘটে তা দেখে এই বিশাল,দাপুটে চেয়ারম্যানটার জন্যে তার (দর্শক-ছেলেটার) আরো মায়া লাগে। শেষে চোখে প্রায় জল চলে আসে। টাকা ভুলপথে দেওয়ায় হজে না যেতে পেরে,ঢাকার এক হোটেলে সে আশ্রয় নেয়। হজের দিন পাশের দালানের টেলিভিশন থেকে লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক শুনে সে বিচলিত হয়ে পড়ে। জীবনের প্রথম তার টেলিভিশন দেখার সাধ জাগে। হোটেলে নিজের ঘরের টেলিভিশনে যখন হজের দৃশ্য দেখে,তার কাছে আজীবন ঘৃণ্য,পরিত্যাজ্য টেলিভিশনটাকেই সবচেয়ে আপন লাগে। টেলিভিশনই হয় তার অকূল পাথারে একমাত্র কূলের দিশা,পরম সান্ত্বনা।

আমি ঢাকায় থাকি আর মক্কা থাকি,আল্লাহ,আমি তোমার কাছে পৌঁছাইয়া গেছি,আল্লাহ।

দর্শক-ছেলেটা যখন টেলিভিশন দেখে বের হয়ে আসে,কল্পনায় তার না-দেখা আরো অনেক টেলিভিশন সে দেখতে থাকে। তার কাছে মনে হয়,মানুষের কল্পনা টেলিভিশনের চেয়েও আরো অনেক দূরে যেতে পারে। টেলিভিশনে যদি পাপের জিনিস দেখানো হয়,কল্পনার টেলিভিশনে তার চেয়ে অনেক বড়ো বড়ো পাপ করা সম্ভব। সেই টেলিভিশন বন্ধ করার সাধ্যি কারো নাই;অবিরাম চলে। কিন্তু সমস্যা একটাই,এই টেলিভিশন আর  কারো সঙ্গে বসে দেখা যায় না। একেকজন একেক ছবি দেখে,তাই কেউ কারোটা বিশ্বাস করতে চায় না। বাস্তবের টেলিভিশন অনেক সময় নানানজনে মিলে দেখা যায়। সবাই মিলে একই ছবি দেখা। কিন্তু একেকজনের একেকরকম বাবার কথা মনে পড়ে,নানাজনের নানান রকম কল্পনা হয়।ওর দুই-তিন সিট পিছনে একজন বসেছিলো। সুন্দরী;বয়স ২৩-২৪ হবে। মনের টেলিভিশনে এখন সেই মেয়েটাকে নিয়ে রিকশায় করে ঘরে ফেরে। উপরে পাখি উড়ে যায়,সেই ছায়া পড়ে রিকশার উপর। তারপর...

ই.

The God of Small Things? The God of Goose Bumps and Sudden Smiles? Of Sourmetal Smells-like steel bus-rails and the smell of the bus conductor's hands from holding them?

একদম ছোটোবেলা থেকে কৈশোর,টেলিভিশন দেখার জন্যে মেয়েটা মোটামুটি পাগল ছিলো। টেলিভিশন নিয়ে অনেক ছোটোখাটো স্মৃতি তার ছবির মতন করে মনে আছে। এই চলচ্চিত্রটি দেখতে আসার কারণ তার অসম্ভব টেলিভিশনপ্রীতির সেই স্মৃতিগুলো। ছোটো ছোটো রঙের বিচিত্র সব স্মৃতি,টিভির পর্দায় উড়ে এসে বসা মাছির ডানার রঙ,টিভির নিচে মাটির মেঝেতে কারো পায়ের আবছা দাগ ইত্যাদি। সিনেমা হলে বসে এই টেলিভিশন দেখতে গিয়ে পুরো চলচ্চিত্রে এই চরিত্র,সেই চরিত্র করে করে তার নজরে এলো নীল শাড়ি জড়ানো,খানিক দম বন্ধ করা মায়ের চরিত্র। বেশ অদ্ভুত কিন্তু আবার কেমন জানি বাস্তবিক দৃশ্যখানা।

সাদা ফতুয়া পরে চেয়ারম্যান বাবা যথাসম্ভব পুরুষালি ভাব (?)নিয়ে বসে আছেন একপাশে। অন্যপাশে ছেলে ভয়-ভয় গলায় তার দাবি-দাওয়া পেশ করছে;কিন্তু সরাসরি বাবাকে না। মাঝখানের নীল শাড়ি পরা মা যখন ছেলের দিকে তাকান,ছেলে তার দাবি বা প্রয়োজনের কথা বলে। যেনো জবানহীন মা। তিনি কথা বলেন না। মুখে উদ্বেগ,আনন্দ কিছুই নাই। বন্ধ মুখখানা তিনি এবার বাবার দিকে ফেরান। বাবা তখন জবাব দেন;মা যেনো কেবল মাধ্যম। এখানে টেলিভিশন যেমন নিষিদ্ধ,তেমনি মায়ের কথাও বন্ধ। মুখে ভাষা নাই,তবু যখন মায়ের মুখ পর্দায় ভাসে,যেনো গমগম করে কানে এসে কিছু একটা বাজে। হয়তো মায়ের ভিতরে,বুকের গভীরে বারবার কিছুর বিস্ফোরণ ঘটছে। দর্শক-মেয়েটার নিজেরও কেমন জানি দম-বন্ধ,দম-বন্ধ লাগে। তারপর মায়ের মুখে একটা বাক্য শোনা যায় কেবল।

দেন না একটা মোবাইল কিনতে,কী অইব?

বাক্যটা শেষ না হতেই যেনো কেউ তার গলা টিপে দিলো। এই বার্তাবাহকের কাজ ছাড়া মায়ের যেনো তেমন কোনো প্রয়োজন নাই। কাহিনীতেও অনেকক্ষণ আর  তাকে লাগে না। কিন্তু অসহায়,স্বামী-সন্তান-মুখাপেক্ষী,আক্ষরিক অর্থেই অবলা,খানিক বুড়িয়ে যাওয়া,না-ফর্সা,না-সুন্দর মায়ের ছবি দর্শক-মেয়েটার দুই চোখে লেগে থাকে।

দুই প্রজন্মের দ্বন্দ্ব,ধর্মীয় বাড়াবাড়ি,যুগের প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে রচনা করা কাহিনীর চেয়ে,নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় তৈরি সংলাপের চেয়ে,নানান ছোটোখাটো জিনিস মেয়েটার নজরে আসে। যেমন :খানিক পরে যখন কোহিনূরের সঙ্গে মজনুর সংলাপ চলছে,পাশেই একটা প্লাস্টিকের সবুজ খেলনা গাড়ি সুতার টানে একবার সামনে আরেকবার পিছনে যাচ্ছে। এই খেলনা গাড়িটাকে হঠাৎ অনেক গুরুত্বপূর্ণ লাগে। মনে হয়,এই গ্রামের যতো সবুজ পাতা,ঘাস সবকিছু যেনো এই গাড়ির মতন। আর যে সমস্ত ঘটনা ঘটতে গিয়ে ঘটে না,নয়তো যেসব ঘটনা বারবার,অহেতুক ঘটতে থাকে-সবকিছু যেনো এই গাড়ি আর সুতার টানের সঙ্গে মিলে যায়। কোহিনূরের সঙ্গে যখন সোলায়মান পাটোয়ারির ফোনালাপ চলে,সোলায়মান লোকটা চোখ বন্ধ করে অবিরাম ফোন কানে ধরে বুঁদ হয়ে বসে থাকে। তার পিছনের লাল পর্দাটা দর্শকের চোখে এসে লাগে। লাল রঙটা ভালোবাসা,আবেগ;আর রক্ত,রক্তের ভিতরের সমস্ত কামনাকে স্পষ্ট করে তুলে নিয়ে আসে।

ফোনডা না কাটি ঘরের কোনায় রাখি দাও। আই তোমার শব্দ শুনি।

এরপর সোলায়মান যেনো কোহিনূরদের ঘরে। পর্দায় দেখানো হয়,তাদের ঘরে দিনের কাজ-কর্ম চলে। কোহিনূরের মা যেনো একদম মাত্রাহীন। যেখানে টেলিভিশন নিষিদ্ধ,এমন পাড়াগাঁয়ের কোনো মায়ের মতন লাগে না,আবার শহরেরও না। দুই মায়ের চরিত্রই যেনো ইচ্ছা করে খাটো করা। অথবা,দর্শক-মেয়েটার মনে হয়,চলচ্চিত্রের পুরো গল্পটা যেনো কেবলই একজন পুরুষের (বাবা,ছেলে আর প্রেমিকের)।পুরুষের জবানে বর্ণিত। তাই কেবল বাবার,ছেলের,অভাগা প্রেমিক মজনুর মনে ঢোকার চেষ্টা। অথবা পরিচালক,কাহিনীকার এভাবেই টেলিভিশন-এর গল্প বলেছেন যেনো টেলিভিশন নিষিদ্ধের গল্পের পাশাপাশি অধিকারহীন এই সব নারীর না-বলা গল্পও পাওয়া যায়।

আর সারা টেলিভিশন জুড়ে চকচকে সব রঙের ব্যবহার। রঙিন টেলিভিশনের যেসব প্রধান রঙ সব যেনো গ্রামের এখানে-ওখানে ছড়ায়ে দেওয়া। সারা গ্রামে রঙিন টেলিভিশনের অভাবে রঙগুলো যেনো আরো বেশি গাঢ়,উজ্জ্বল আর স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। ঘাটের কাউন্টারে ঘন নীল রঙ।কোহিনূরের ভাইয়ের আরো দুটো খেলনা গাড়ি,গাঢ় লাল রঙ।লাল জবা ফুল কুমার স্যারের বাড়ির উঠোন উজ্জ্বল করে যেনো চেয়ে আছে। মায়ের গায়ের কমলা চাদর থমথমে মন আর শরীরটাকে জাপটে ধরে আছে। কোহিনূরের চকচকে হলুদ জামা তার চঞ্চলতা আর বয়সসুলভ হালকা আবেগকে বুঝায়ে দিচ্ছে যেনো। হলুদ সরিষার ক্ষেতে মজনুর নীল লুঙ্গি,যার নানান রকম মানে হয়।মজনুর জন্যে নীল মানে নীল আসমান হতে পারে;বৃষ্টি নাই,মেঘ নাই। শুকনো চোখে চেয়ে থাকা,আশাহীন।

টেলিভিশন নাই বলে গ্রামে মনে হয়,সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আর আলোচনার বিষয় এই টেলিভিশন। টেলিভিশন নিয়ে একধরনের উন্মাদনাও চলে। নদীর পাড়ে খোলা মাঠ। মাঠে ইট-সিমেন্ট দিয়ে বিশাল একটা টিভি সেট বানানো হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে হালাল টেলিভিশন। ব্যাকগ্রাউন্ডে খোলা আকাশ,সাদা সাদা হালকা মেঘ। হালাল টেলিভিশন-এর ভিতরে যাত্রাপালার আয়োজনে কেউ একজন আকবর বাদশাহর চরিত্র করছিলো। চেয়ারম্যান তাকে চিনে ফেলে।

হ্যায়তো আকবর ন।

তাকে (চেয়ারম্যানকে) বোঝানো হয়,আকবরের চরিত্র কল্পনা করে নিয়ে অভিনয় চলছে। সে জবাব দেয়,

কল্পনা বহুত খারাপ জিনিস।

দর্শক-মেয়েটা এইবার আমিন পাটোয়ারির মূল সমস্যাটা ধরতে পেরেছে বলে মনে করে। চেয়ারম্যান কিছু অসম্ভব কাজ করতে চায়,যা কোনোভাবেই তার কর্তব্য না,যাতে তার কোনোই অধিকার নাই। সে মনে করে,এই কাজগুলো সম্পাদন তার দায়িত্ব। কিন্তু মানুষকে কল্পনাহীন করে রাখা অসম্ভব। কল্পনার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না বেশিরভাগ সময়ই।আবার মানুষ এই কল্পনা থেকে অনেক সময় বেঁচে থাকার শক্তি পায়,সান্ত্বনা,স্বস্তি পায়। কোহিনূর যখন সোলায়মান পাটোয়ারির সঙ্গে বিয়েতে জড়ায়,মজনুর কিছু করার থাকে না। মজনু হয়তো কোনো কাজই নিজের ইচ্ছায় করতে পারে না। কিন্তু কল্পনাটা নিজের মনের মতন করে,সে এক প্রকার সান্ত্বনা পায়। এবং সেই নিষিদ্ধ টেলিভিশনই হয়ে যায় তার প্রিয় কল্পনার প্রতিশব্দ। নিষিদ্ধ বস্তু বা বিষয় বরাবরই মানুষকে মোহের মতন দুর্নিবার আকর্ষণ করে।

মনের টেলিভিশন!কল্পনার টেলিভিশন!চোখ বন্ধ করে আই আপনেরে হেই টেলিভিশনে দেহি।

শেষমেশ কিন্তু চেয়ারম্যানকেও কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়।মক্কায় যেতে ব্যর্থ হলে,ঢাকায় বসে সে মক্কার হজের কল্পনা করে। তার চিরঘৃণ্য টেলিভিশন আর কল্পনার গুণেই সে বলতে পারে-

আমি ঢাকায় থাকি আর মক্কায় থাকি,আল্লাহ,আমি তোমার কাছে পৌঁছাইয়া গেছি,আল্লাহ।

সিনেমা দেখা শেষ করে মেয়েটা যখন বাইরে বের হলো,আরো একবার পোস্টারের দিকে চাইলো। টেলিভিশন লেখাটার উপর বসানো পাখা আর সোনালি ঘোড়াটা এইবার তার কাছে অন্যরকম লাগলো। পাখাওয়ালা ঘোড়াটা আসলে মানুষের কল্পনার প্রতীক। লাল রঙের পোস্টারে তিনজন মানুষের ছবি। মাঝখানে কোহিনূর নামের মেয়েটার ছবি। সবার চেয়ে বড়ো। কিন্তু চলচ্চিত্রে এই চরিত্রটা কি সবার চেয়ে বড়ো ছিলো? জানালা খোলা মসজিদে চেয়ারম্যানের মাথা নিচু করে বসে থাকার ছবিটা সে এখানে কল্পনা করে। কমলা চাদরে জড়ানো গম্ভীর মায়ের ছবি হয়তো পোস্টারের যোগ্য না,তবু সে মায়ের থমথমে,গম্ভীরমুখটা মাঝখানে বসায়। কল্পনায় সে দেখে,সবই সম্ভব। টেলিভিশন-এর বাবার জায়গায় সে মাকে বসায়। মা চেয়ারে বসে আছেন। অন্যপাশে ছেলে দাবি-দাওয়া নিয়ে এসেছে,মাঝখানে নীল পাঞ্জাবি পরা বাবা। তিনি যখন ছেলের দিকে তাকান ছেলে তার দাবি,প্রয়োজনের কথা বলে। বাবা কোনো কথা বলেন না। মুখে উদ্বেগ,আনন্দ কিছুই নাই। বন্ধ মুখখানা তিনি এবার মায়ের দিকে ফেরান। মা তখন কড়া গলায় জবাব দেন। বাবা যেনো কেবল মাধ্যম। মুখে ভাষা নাই,তবু যখন বাবার মুখ পর্দায় ভাসে,যেনো গমগম করে কানে এসে কিছু একটা বাজে। হয়তো বুকের গভীরে বারবার কোনো একটা কিছুর বিস্ফোরণ ঘটছে।

উ.

The friendly and flowing savage, who is he?

Is he waiting for civilization, or past it and mastering it?

আর আমার রেডিও,টেলিভিশনপ্রীতি সমান। টেলিভিশন দেখে আমার নানান কথা মনে পড়ে। রেডিওর কথা খানিক বেশি করে মনে আসে। তুর্কি একটা চলচ্চিত্র আছে,২০০১ সালে মুক্তি পায়,নাম ভিজনটেলি (Vizontele) অর্থাৎ টেলিভিশন। ছবিটার শেষদিকে টেলিভিশনটাকে কবর দেওয়া হয়।অনুন্নত এক  তুর্কি মফস্বলের কাহিনী। সেখানে মেয়রের বাড়িতে যখন টেলিভিশন প্রথম দেখা সম্ভব হয়,প্রথম খবরটাই আসে যুদ্ধে মেয়রের এক ছেলে মারা গেছে। মেয়রের স্ত্রী আবেগে,রাগে,ভয়ানক দুঃখে টেলিভিশনটাকে কবর দিতে নিয়ে যায়। সঙ্গে থাকে গ্রামের একমাত্র ইলেক্ট্রিশিয়ান,যে কিনা রেডিও মেরামতে সিদ্ধহস্ত। ফারুকীর টেলিভিশন-এও টেলিভিশন পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।কিন্তু পার্থক্য হলো প্রথমটায় ঘটনাটা ঘটে ছবির একদম শেষে। আর টেলিভিশন-এ মাঝামাঝি। কবর দেওয়া আর পানিতে ফেলার কারণও ভিন্ন। তুর্কি ছবিটার মূলকাহিনী ফারুকীর ছবির মতো টেলিভিশন ঘিরে তৈরি হলেও শেষ হয় রেডিও দিয়ে। সেই ইলেক্ট্রিশিয়ান মায়ের পছন্দের গান মাকে শোনানোর জন্যে তার ঘরের রেডিও থেকে মায়ের কবর অবধি সংযোগ তৈরি করে। কবরের পাশে থাকে একটা স্পিকার। আমার একটু অবাক লাগে ফারুকীর চলচ্চিত্র রেডিও নিয়ে কেউ কোনো কথাই বলে না। টেলিভিশন যেখানে নাই,সেখানে রেডিওর বহুল প্রচলন থাকার কথা।

ফারুকীর টেলিভিশন-এ বারবার কল্পনাশক্তির সঙ্গে টেলিভিশনের একটা তুলনা বা গাঢ় সম্পর্ক নির্দেশ করা হয়েছে। কিন্তু টেলিভিশন মানুষকে কল্পনা করতে যেমন সাহায্য করে,তেমনি কিছু ক্ষেত্রে কল্পনার প্রখরতা,ব্যাপ্তি কমায়ে দেয়। অন্তত আমাদের দেশে প্রাক-টেলিভিশন আর  টেলিভিশন পরবর্তী যুগের একটা স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। টেলিভিশনের আগে রমরমা ছিলো বেতারের যুগ। মানুষ শুধু শব্দ শুনতো। বাকিটুকু ছেড়ে দিতো কল্পনার হাতে। রেডিওতে গান শুনে মুগ্ধ শ্রোতার সংখ্যা টেলিভিশনের দর্শকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিলো,মনে হয়। কারণ যখন রেডিওতে কোনো গান চলে,গানটা শোনার সময় আমাদের চোখের সামনে মিউজিক-ভিডিও,অভিনেত্রী-অভিনেতা বা গায়িকা-গায়কের নির্দিষ্ট ছবি থাকে না। আমরা তাদের ছবি-যদি আগে দেখে না থাকি-কল্পনা করে নিই;বা দেখে থাকলেও তার নতুন একটা ধরন কল্পনা করে নেওয়া যায়। অথবা যখন আমরা গান শুনতে শুনতে নিজের ঘরের দিকে,প্রিয় মানুষের দিকে বা আসমান-গাছ-পাখি-ফুল-জানালার দিকে চাই;কল্পনার দৌড় যথেষ্ট বেড়ে যায়।

আমার আরো মনে হয়,ধর্মীয় অভিযোগ বাদেও আমাদের এখানে আরেকটা অভিযোগ আছে,টেলিভিশন অলস প্রজন্মের জন্ম দেয়;সময় নষ্ট করে। বই পড়ার অভ্যাস নষ্ট হয়ে গেছে এই জন্য। তবে এই অভিযোগ সব ক্ষেত্রে হয়তো সঠিক নয়।আবার টেলিভিশনকে সভ্যতার বাহক,অসভ্য জাতির জন্যে আলাকবর্তিকা হিসেবে ধরে নেওয়াও হয়তো ঠিক নয়।তবে এ কথা ঠিক,টেলিভিশন এক এলাকার সংস্কৃতি অন্য এলাকায় পৌঁছে দেয়। এতে অনেক সময় একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতির উপকার হয় বটে,অন্যদিকে অন্যকোনো একটার বিনাশ হয়।বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন ছোটো অথচ অনন্য ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়ে।

কিন্তু যদি টেলিভিশন নিষিদ্ধ রাখা হয়,সে ক্ষেত্রেও নানান নেতিবাচক ব্যাপার ঘটে। ধর্মীয় বা এলাকাভিত্তিক সংস্কারের ক্ষতিকর কিছু দিক থাকে। আমাদের দেশে প্রাক-টেলিভিশন যুগে নারী এখনকার চেয়ে বেশি অধিকার বঞ্চিত হতো। পুরনো বই-পুস্তকে,ধর্মীয় গ্রন্থে নারীকে যেভাবে দেখানো হয়েছে,আর বংশ পরম্পরায় চলে আসা নারী সম্পর্কিত বিভিন্ন ধারণা-বিশ্বাস অনুসারে নারীদের কেবল সন্তান-উৎপাদন,গৃহস্থালি কর্মসম্পাদনের কাজে ব্যবহারযোগ্য মনে করা হতো। টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানান পেশার নারীদের ছবি দেখে,বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা জেনে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখন বদলেছে। টেলিভিশন-এর গ্রামে আমিন পাটোয়ারির স্ত্রী স্বামীকে আপনি করে বলে,ভীষণ ভয় আর সমীহ করে চলে,সংসারের কোনো সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে না। গ্রামে যখন শহর থেকে একজন নারী সাংবাদিক আসে,আধুনিক পোশাকে অনভ্যস্ত গ্রামের ছেলেরা তাকে অপমান করে বলে,সে নারী,না পুরুষ-তা তারা বুঝতে পারছে না।

টেলিভিশন হয়তো সভ্যতার বাহক নয়;কিন্তু কোনো একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সংকীর্ণতাকে দূর করতে তার ভূমিকা অস্বীকার করার নয়।আবার এক সংস্কৃতির সংকীর্ণতাকে হয়তো আরেক সংস্কৃতিতে ঢুকায়েও দেয়।

ঊ.

কানামাছি মিথ্যা,কানামাছি সত্য।

কানামাছি তুমি-আমি যে যার মতো।

যেকোনো ছবি দেখার শেষ হলেও বহুদিন,এমনকি বহুবছর মানুষের চোখে তার রেশ থেকে যায়। সেই থেকে যাওয়া ছবির রঙ দিনে দিনে ফিকে হয় অথবা নতুন কোনো রঙে রেঙে ওঠে। তার মানে,একেকটা চলচ্চিত্র যুগ যুগ ধরে পড়া হয়।শুধু চলচ্চিত্রটি দেখার সময় না,চলচ্চিত্রটি থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েও তা সম্ভব। ফারুকীর এই চলচ্চিত্রের গল্পগুলো আমাদের দেশের একেক এলাকায় একেকভাবে পড়া হবে;বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারে। এই চলচ্চিত্রের ছবিগুলো অন্যকোনো দেশে অন্য কোনোভাবে দেখা হবে।

উপরে তিনজন মানুষের যে তিনটি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া দেওয়া হলো,এগুলোরও সময়ে সময়ে পরিবর্তন অবশ্যই ঘটবে।

এখন প্রশ্ন,চলচ্চিত্রটির গল্প এই যুগে কতোখানি বাস্তবসম্মত?

চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের গ্রাম বা ইসলামকে কিভাবে বাইরের দেশের কাছে উপস্থাপন করবে?

টেলিভিশন-এর প্রধান চরিত্র কতোখানি সার্থক?

এই ধরনের প্রশ্নতো আছেই,এসবের নানান উত্তরও আসছে,আসবে। তবে চলচ্চিত্রটির প্রধান শক্তি আলাদা আলাদা ছবিগুলো (image)। ছবিগুলোইতো থেকে যাবে,তাই না? এগুলোরইতো আরো হাজারটা গল্প সম্ভব। ফারুকী আসলে টেলিভিশন-এর কাহিনী শেষ করেননি। কোনো গল্পকার,চলচ্চিত্রনির্মাতা তা করতেও পারে না। ছবিগুলোর চারপাশে,উপরে-নিচে বিচিত্র গল্পগুলো খোঁজা উচিত;শুধু টেলিভিশন না,অন্যান্য সব চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। চলচ্চিত্র সমালোচনার বৃত্তাবদ্ধ ধরন তখন যেমন ভেঙে যাবে,তেমনি একেকটা চলচ্চিত্র আরো অনেকগুলো চলচ্চিত্রের জন্য প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। একটা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যদি কাহিনী রচনা হয়,চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়,তাহলে আমার ধারণা আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের যে দৈন্যদশা চলছে তাও কেটে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের আরো নানান ধরনের গল্প ছড়ায়ে আছে। আমরা যে এক প্রকারের গল্প শুনে আসছি আমাদের চলচ্চিত্রে,নতুন গল্পগুলোর কাছে তা আবেগী,একঘেয়ে বা খানিক অন্ধও মনে হতে পারে।

আমার দুই চোখের সামনে হলুদ সরিষা আর সূর্যমুখীর মাঠভরা ফুল পাশাপাশি;রাতের জোছনায় আমি সূর্যমুখী ক্ষেত থেকে সরিষার দিকে তাকাই। ফুলগুলোকে ভীষণ ছোটো লাগে। ভোরের আলো ক্রমেই জোরালো হয়।ছোটো ছোটো সরিষার ফুলের মধ্যে দাঁড়ায়ে আমার মনে হয়,সূর্যমুখী ফুল অতি বেশি বড়ো। কোন্‌ সময় দুই চোখ ভুল দেখে? কোন্‌ ফুল আমার মনে মিথ্যার মতন মোহ জাগায়? আর কোন্‌ ফুলে আমার দুই চোখ সত্য?

 

লেখক : আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ফ্রিল্যান্স লেখালেখি করেন।

muktadir137@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. Storey,John (2001:69); Roland Barthes : Mythologies;Cultural theory and Popular Culture : an Introduction;Prentice Hall, Harlow.

২. Selden,Raman,Peter Widdowson & Peter Brooker (1997:163);Poststructuralist Theories : Roland Barthes; A Reader's Guide to Contemnporary Literary Theory;Prentice Hall,Harlow.

৩. Roy, Arundhati (1997:217);The God of Small Things; IndiaInk, New Delhi.

৪. Whitman, Walt (1998:71); Song of Myself; Norton Anthology of American Literature; Ed.-Nina Byam; W.W. Norton and Company, New York.

৫. Viziontele; Dir.  Yılmaz Erdogan  & Omer Faruk Sorak; Pref. Yılmaz Erdogan,  Demet Akbag, Altan Erkekli, & Cem Yılmaz;Warner Bros,2001.

৬. চিরকুট (২০১২); কানামাছি; টেলিভিশন; ফাহিম মিউজিক,ঢাকা।

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

 

 


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন