Magic Lanthon

               

আরিফ রেজা মাহ্‌মুদ

প্রকাশিত ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

কর্তৃত্ব-ইতিহাস-মুক্তি

গেরিলা : মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের কুলীন সম্পদ নাকি সর্বগ্রাসী জাতীয়তাবাদের নয়া টোপ?

আরিফ রেজা মাহ্‌মুদ

ইতিহাসের লক্ষণ হচ্ছে পরিপ্রেক্ষিত বিচার। তার শুরু বর্তমান থেকেই। বর্তমানে উত্থাপিত প্রশ্নের মীমাংসার সূত্র ধরেই। বর্তমান থেকে অতীতে যাওয়া তখনই, যখন অতীত সম্পর্ক-অতীত পরিপ্রেক্ষিত, বর্তমান সম্পর্ক-বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতকে ব্যাখ্যা করে। ধারাবাহিকতা নির্মাণ করে। নির্দেশ করে ভবিষ্যতের। তাই ইতিহাস হলো পরিপ্রেক্ষিতায়ন।

ইতিহাসচেতনা ক্ষমতা-নিরপেক্ষ কোনো বিষয় নয়। জ্ঞানকাণ্ডে ক্ষমতা-ক্ষমতার বিন্যাসে অসমতার বাড়বাড়ন্ত যেমন প্রবাহমান, ইতিহাস চেতনার নির্মাণেও তেমনি তার নড়চড় হয়নি এতোটুকু। এ পর্যন্ত বিদ্যাজীবীর জবানে লিখিত পৃথিবীর ইতিহাস, কর্তৃত্বের ইতিহাস; ক্ষমতাধর এলিট আধিপত্যের ইতিহাস। রাজশক্তির উত্থান-পতন, রাজশাসনের ভাবদর্শিক বৈধতা উৎপাদন তার প্রসঙ্গ। ইতিহাস রচনা থেকে তাই বাদ পড়ে প্রান্তজনের কথা। নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের অস্তিত্ব, তার চেতনা, তার প্রতিরোধ, দৈনন্দিন জীবনে তার টানাপোড়েন সবকিছুই তাই মুছে যায় বিদ্বৎসমাজের বয়ানে। এমন ঘটনা আমাদের সামনে উদ্রেক করে বেশ কিছু প্রশ্নের। জ্ঞান কী? কে বা কারা জ্ঞান উৎপাদন করে? জ্ঞানের ভোক্তা কারা? ভোক্তা সম্পর্কে জ্ঞান উৎপাদকের নজর-আন্দাজ কী? ভোক্তা কি সক্রিয় নাকি নিষ্ক্রিয়? পশ্চিমে একাডেমিতে এ-নিয়ে মূলধারার ইতিহাসকে প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে দেখা গেলেও আমাদের দেশের হকিকত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব কিছুরই দুর্দান্ত ইশারা পাচ্ছি রেহনুমা আহমেদের কাছে-‘শাস্ত্রীয় জ্ঞান হিসেবে চর্চিত এযাবৎকাল অবধি এদেশের ইতিহাস-চর্চায় ইতিহাসের কোন্‌ সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়েছে-ইতিহাস হচ্ছে ‘অতীত’ (ফেলে আসা দিনগুলি), নাকি ইতিহাস হচ্ছে ‘বর্তমান’? ইতিহাসের ভিন্ন সংজ্ঞা ব্যবহার করলে ইতিহাসবিদরা কি একই বিষয়ে গবেষণা করেও ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেন? এদেশের ইতিহাস-রচনা মূলত কোন পক্ষের স্বার্থ অবলম্বন করেছে, শাসকের নাকি শোষিতের? বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাস-রচনা বাঙালিদের মঞ্চের প্রধান নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে অন্যান্য জাতিদের কী উপায়ে-কোন্‌ ধরনের যুক্তি-তর্ক কোন্‌ ধরনের ঐতিহাসিক নজিরের সাহায্যে-ইতিহাসের পাতা থেকে বাদ দিয়েছে? দুঃখজনক হলেও সত্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত ইতিহাসবিদরা এ ধরনের জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হননি।’

আমাদের দেশের ইতিহাস চর্চার সঙ্কটের একবারে মোদ্দা জায়গাটাকে চিহ্নিত করেছেন রেহনুমা। প্রশ্ন তুলেছেন আমাদের ইতিহাস চর্চার অধিপতি ধারা জাতীয়তাবাদের সংকট নিয়ে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে প্রান্তজনের চেতনা, প্রান্তজনের অংশীদারিত্বকে গায়েব করে, যে-জাতীয়তাবাদ শাসক-শোষক-নিপীড়ক-নিপীড়িত-প্রবল-প্রান্তিক সবাইকে এক ছাঁচে তৈয়ার করে-আধিপত্য-শোষণ-বঞ্চনাকে আড়াল করে ইতিহাস চর্চায় তৎপর, তার গোড়ার গলদটা কোথায়? এই প্রবন্ধের  মূলসূত্র বা কেন্দ্রীয় প্রশ্ন সেটাই। জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চায় মৌলবাদ তথা ঘুরপাকের যে সঙ্কট তা থেকে উত্তরণে কী কী নতুন টোপ হাজির হয়েছে তা তদন্ত করাও এই প্রবন্ধের আরেকটি উদ্দেশ্য। স্বাধীনতার  ৪০ বছর পূর্তিতে ঢাকঢোল পিটিয়ে গেরিলা চলচ্চিত্রের ভূমিষ্ঠ হওয়া সেই নতুন টোপেরই একটি কিনা তাও দেখা হবে এই প্রবন্ধে।         

ভারতবর্ষে ইতিহাসবিদ্যার আদিকল্প : উচ্চকোটির ইতিহাসের আঁতুড়ঘর নিরীক্ষণ

ভারতবর্ষে ইতহাস চর্চাকে নতুন প্রশ্ন তথা তত্ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন নিম্নবর্গের ইতিহাস রচয়িতারা। রনজিৎ গুহ-গৌতম ভদ্র-পার্থ চট্টপাধ্যায় প্রমুখের হাত ধরে উন্মোচিত হয়েছে ভারতবর্ষের কর্তৃত্বপরায়ন ইতিহাস চর্চার আকর। ঐতিহাসিকভাবে কেমন করে ভারতের ইতিহাস চর্চা স্রেফ জাতীয়তাবাদের ঘেরাটোপে আটকে পড়েছে তা স্পষ্ট করেছেন তারা। নিম্নবর্গের ইতিহাস প্রবন্ধে রনজিৎ গুহ দেখিয়েছেন, ভারতবর্ষে আধুনিক ইতিহাস চর্চার শুরু ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন থেকে নয়, ইংরেজ শাসন ব্যবস্থা থেকে। রনজিতের অভিমত, ইংরেজরা পাশ্চাত্য শিক্ষার আদলে আমাদের দীক্ষিত করতে ইতিহাসবিদ্যার আমদানি ঘটায়নি, ভারতবর্ষে ইতিহাস ইংরেজ শাসনের হাতিয়ার হয়েছে আরও আগে। ১৭৬৫-তে যখন কোম্পানি দেওয়ানি পেলো কিংবা তারও কিছু আগে নবাব যখন তাদের তিনটা জেলা দিয়ে দিলেন তখন থেকে। রনজিৎ গুহের মতে,‘এদেশে পাশ্চাত্য ইতিহাসচেতনাকে প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ‘লিবারল’ আদর্শের উৎসাহে নয়, রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে ও তাগিদে। দেওয়ানি হাতে নিয়েই ইংরেজ টের পায় যে এদেশের কৃষিব্যবস্থা অতি প্রাচীন, জমির সঙ্গে রাজা-প্রজার সম্পর্ক এখানে নানা সনাতন প্রথায় নিয়ন্ত্রিত, এবং জমির মালিকানা, ফসলবোনার কায়দা ইত্যাদি সব কিছুই এক সাবেক সংস্কারের অঙ্গ। অতীতকে উপেক্ষা করে এখানে রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাই সে যুগের সরকারি কাগজপত্রে ঐতিহাসিক বিবৃতির অভাব নেই। ...প্রাক-বৃটিশ, বিশেষ করে মুঘল আমলের রাজ্যশাসন, ভূসম্পত্তির অধিকার, কৃষিব্যবস্থা, বাণিজ্য-ব্যাপার ইত্যাদি, সংক্ষেপে বলতে গেলে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের বহু প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা এইসব সরকারি কাগজপত্রে হামেশায় পাওয়া যায়। ...এইসব রচনায় তথ্য ও যুক্তির সমন্বয় এবং কার্যকারণ সূত্রে সাজানোর বিশ্লেষণ পদ্ধতির মধ্যে আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার প্রধান গুণগুলি সবই বর্তমান।’

আধিপত্যশীল চেতনা থেকেই যে ভারতবর্ষে ইতিহাসবিদ্যার শুরুয়াদ তা রণজিৎ গুহের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।  ইতিহাস চর্চার এই আদিকল্পটির আদল বিশ্লেষণ করে রনজিৎ গুহ দেখিয়েছেন, জন্মলগ্ন থেকে কেমন করে  ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনায় উপনিবেশিক উচ্চবর্গ এবং বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী উচ্চবর্গেরই আধিপত্য প্রবাহমান।

প্রথমত এই ইতিহাসবিদ্যার আদিকল্পের দুটো জন্মলক্ষণ চিহ্নিত করেছেন রনজিৎ। রনজিতের বক্তব্যই সংক্ষেপে তুলে ধরছি :

১. এই ইতিহাসবিদ্যার জন্ম এ দেশে ইংরেজ রাজশক্তির ঔরসে এবং ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই তা ঔপনিবেশিক শাসনদণ্ডকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে। যাঁরা এ ধারায় প্রথম ইতিহাস লেখেন তাঁরা সকলেই হয় সরকারি কর্মচারী কিংবা সরকারের প্রসাদপুষ্ট ও ইংরেজ শাসনের সমর্থক...। তাঁরা যে ইতিহাস লেখেন, তার উদ্দেশ্য হয় একেবারে সরাসরি শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন সিদ্ধ করা কিংবা বেসরকারি রচনা হলেও কার্যত তার সাহায্যে ব্রিটিশ প্রভুশক্তি ও প্রভু সংস্কৃতিকে আরও জোরদার করা।

২. এই ইতিহাসবিদ্যার আর-একটি জন্মলক্ষণ হচ্ছে উচ্চবর্গের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। এই পক্ষপাতিত্ব শাসকদেরই মনোভাবের প্রতিফলন। ...তবে আঠারো শতকের ব্রিটিশ সমাজের আদর্শ অনুযায়ী, কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ধারণা হয় যে, এদেশেও সমাজের প্রধান স্তম্ভ সেইসব সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যারা বেশ বড় বড় ভূসম্পত্তির মালিক, এবং তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া হলেই রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনের সমস্যা মিটে যায়। ...এরই ফলে এতদ্দেশীয় উচ্চবর্গের স্বার্থ ও সুবিধা একই সঙ্গে স্বীকৃতি পায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রনীতিতে ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদ্যায়।

ইংরেজ আমলের রাজনৈতিক জীবন বিশেষ করে জাতীয় আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের সমস্যা নিয়ে যে বিরাট সাহিত্য গড়ে উঠেছে তা দুটো প্রতিকল্পকে আশ্রয় করে লেখা। দুটিই উচ্চবর্গের দৃষ্টিভঙ্গির বাহন। উভয়ের প্রতিপাদ্য এই যে, সে যুগের রাজনীতি বলতে প্রধানত এমনকি কেবলমাত্র উচ্চবর্গের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, আদর্শ ও কর্মকাণ্ডকেই বোঝায়। এবং জাতীয়তাবাদ সেই রাজনীতিরই মুখ্য প্রকাশ।

১. প্রথম ধারাটির বৈশিষ্ট্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রশক্তি এবং তারই সহায় ও ফলগত ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আলোকে ভারতবর্ষের ইতিহাস বিচার করা। ...এ ধারাটির মূল কথা হচ্ছে এই যে ভারতবাসীর একজাতীয়তা বলতে যা বোঝায়, তার বাস্তব সংগঠন ও চৈতন্যরূপ ইংরেজ শাসন, তৎসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক আদর্শ এবং ব্যক্তিগতভাবে কোনও কোনও শাসকের ও সমষ্টিগতভাবে শাসকগোষ্ঠীরই প্রতিভার ফল।

২. অপরপক্ষে দ্বিতীয় প্রতিকল্পটির ছাঁচে সাজানো ইতিহাসবিদ্যায় জাতীয় আন্দোলনকে উচ্চবর্গের নেতৃত্ব-উদ্বুদ্ধ ও চালিত নির্ভেজাল আদর্শবাদী সংগ্রামের চেহারা দেওয়া হয়। এই ধরনের ব্যাখ্যা প্রধানত ভারতীয় ঐতিহাসিকদের কাজ, তবে বিদেশে ‘লিবারল’ চিন্তাধারায়ও এর প্রকাশ বিরল নয়। এই ব্যাখ্যায়ও তারতম্য ঘটে। জাতীয় সংগ্রামের নায়ক রূপে উচ্চবর্গের অবদান এতে সর্বস্বীকৃত...। ...আমাদের জাতীয় সংগ্রাম উচ্চবর্গের মাহাত্ম্য ও আদর্শনিষ্ঠার কাহিনীমাত্র, এবং এই প্রতিপাদ্যটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ইংরেজদের সঙ্গে তাদের সহযোগিতার চেয়ে বিরোধিতার দিকটাই বাড়িয়ে দেখা হয়, শোষক ও উৎপীড়ক হিসেবে তাদের সামাজিক ভূমিকা প্রায় অস্বীকার করেই জনসেবায় তাদের অগ্রণী ভূমিকার কথা বলা হয়, জাতীয় আন্দোলনের রাজনীতি ব্যবহার করে তারা যে রাজদত্ত ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা গৌণ ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি মারামারিতে লিপ্ত ছিল সেকথা চেপে গিয়ে শোনানো হয় স্বার্থলেশহীন আত্মত্যাগের অলীক রূপকথা। এভাবেই বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী-ইতিহাসের জনগণের বিশাল আন্দোলনগুলি পরিণত হয়েছে উচ্চবর্গের সংকীর্ণ জীবনবৃত্তান্তে।

ভারতবর্ষে ইতিহাস চর্চার এই আধিপত্যশীল চেতনা আজও প্রবল প্রতাপে টিকে আছে। খোলনলচে এতোটুকু বদলায়নি। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের বহুত্ববাদী চরিত্র সবকিছুই জাতীয়তাবাদী আধিপত্যের দাপটে উচ্চকোটির সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্রান্তজনের স্বর, প্রান্তজনের চেতনা এই ঐতিহাসিক বয়ানে তাই একবারেই অনুপস্থিত।

একাত্তর-পাবলিক-রিপাবলিক : জাতীয়তাবাদী আধিপত্যের সাতকাহন

কিংবা ইতিহাস কারখানায় প্রান্তজনের বিতাড়ন

একাত্তর শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন নয়-উপনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যায্য অগণতান্ত্রিক শাসনের স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙ্গে একটি স্বাধীন রিপাবলিক গঠনের সোচ্চার উচ্চারণও বটে। দীর্ঘ রাজনৈতিক গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামের যে-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো, তা কী করে ক্ষমতার দিক থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রেরই প্রেতাত্মা হয়ে দেখা দিলো, তা একটি বড়ো প্রশ্ন। এই প্রশ্ন মোকাবেলা না করলে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের বহুত্ববাদী চরিত্রটি কী করে লোপাট হয়ে গেলো তা টের পাবো না। তবে তার আগে কীসের ভিত্তিতে কীভাবে একটি রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা হয় সেই আলোচনাই ঢুকবো আমরা।  

রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে রিপাবলিক ধারণাটিকে দাসত্ব মুক্তির হাতিয়ারে রূপান্তর করেছেন ফরাসি চিন্তাবিদ রুশো (১৭৭২-১৭৭৮)। রাজশাসনের হাত থেকে ক্ষমতাকে জনগণের হাতে ন্যস্ত করার তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করেছেন তিনি। রুশোর কাছে রাষ্ট্র হচ্ছে একটা সামাজিক চুক্তি, যে সামাজিক চুক্তির ভিত্তি হচ্ছে জনগণের সাধারণ ইচ্ছা। ‘আমাদের এমন একটা সংস্থা তৈরি করতে হবে যার মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রত্যেকের অস্তিত্ব ও সম্পদকে রক্ষার জন্য সমগ্র সংস্থার শক্তিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে পারি যাতে আমরা যখন সমগ্রর সাথে মিলিত হই তখন আমার নিজেদের সম্মতিতে নিজেদের ইচ্ছারই মাত্র অনুগত হই এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতা এবং শক্তি পূর্বের মতোই অক্ষত থাকে। ...সম্মতির ভিত্তিতে সমাজ সংস্থা যখনই বাস্তব রূপ লাভ করে তখনই এই সংস্থা প্রত্যেকটি সদস্যের জন্য সমগ্র সংস্থার নৈতিক এবং যৌথ শক্তি সহকারে প্রতিটি সদস্যের পাশে এসে বিত্রস্ত শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে উপস্থিত হয়। এবং এরই পরিণামে সমাজ সংস্থার নবতর অস্তিত্ব এবং ইচ্ছার শক্তিপ্রাপ্ত হয়। নাগরিকদের সমবায়ে গঠিত এমন সমাজ সংস্থাকে প্রাচীনকালে একটা নগর বা নগররাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করা হতো। পুরাতন সেই অভিধার স্থলে আজ আমরা তাকে একটা রিপাবলিক বা রাজনৈতিক সংস্থা হিসেবে অভিহিত করে থাকি। এবং এই সংস্থাকে মানুষ তার নিস্ক্রিয় অবস্থায় ‘রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করে; ক্রিয়াশীল অবস্থায় এই সংস্থাই সার্বভৌম জনশক্তিতে পরিণত হয়।’

সুতরাং রিপাবলিক গঠনে, আগে জনগণের সাধারণ ইচ্ছাটা সংজ্ঞায়িত হওয়া দরকার। এই সংজ্ঞায়নের ওপরই নির্ভর করে রাষ্ট্র বিশেষের ইচ্ছা থেকে কতো দূরে বা সবার ইচ্ছার কতোটা কাছাকাছি। ১৯৭১ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রিপাবলিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনগণের এই সাধারণ ইচ্ছাটি সংজ্ঞায়িত হয় কেমন করে? 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একেবারে গোড়ার গলদটাই হলো-সাধারণ ইচ্ছাকে ব্যতিরেকে বিশেষের ইচ্ছায় রাজনৈতিক সংস্থা গঠন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধি হিসেবে ম্যানডেটপ্রাপ্তরাই এই রাষ্ট্রের সাধারণ ইচ্ছাকে সংজ্ঞায়িত করেছে। একটি গণবিপ্লবের পর সমাজে ত্রিয়াশীল গণসংগঠনগুলোকে বাদ দিয়েই রচিত হয়েছে জনগণের সামাজিক চুক্তির দলিল-বাংলাদেশের সংবিধান। এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশীদারিত্বও পোক্ত হয়নি এই সংবিধান রচনায়। গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদের লেবেল এঁটে কেমন করে একটি স্বৈরতন্ত্রী সংবিধান রচনা করা যায় তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশের সংবিধান। কিন্তু এই সঙ্কটের জড়তা কোথায়?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি লিপিবদ্ধ করেছেন তৎকালীন বামপন্থি রাজনৈতিক চিন্তক রণেশ দাশগুপ্ত। রণেশ দাশগুপ্তের মতে, যে-বৈপ্লবিক ঘটনার ধারায় পূর্ব-বাংলার মুক্তি সংগ্রাম সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা পূর্ব-বাংলার সর্বস্তরের নিপীড়িত ও বঞ্চিত

মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ঘটেছে। এই মুক্তি সংগ্রামে ক্রিয়াশীল সামাজিক বর্গগুলোকে চিহ্নিত করেছেন রণেশ।

১. কৃষক

২. জাতীয় বুর্জোয়া বা উদীয়মান শিল্প উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী

৩. শ্রমিক

৪. মধ্যবিত্ত

’৭১-এ স্বাধীন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠায় এই প্রধান চারটি সামাজিক বর্গের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে, অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলে হাজির হয় সমন্বয়বাদের কুইনিন-যার প্রধান ভারকেন্দ্র জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদী কর্তৃত্ব আর ইতিহাসচেতনা হেঁটেছে হাতে হাত ধরে। মূলত স্বাধীন দেশের শাসক-শোষকগোষ্ঠীকে আশ্রয় করে।     

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধোত্তর রিপাবলিক গঠনের গলদগুলো ধরা পড়ে খোদ ৭২-এর সংবিধানেই। ৭২-এর সংবিধানের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের তকমা থাকলেও সংবিধানের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিলো স্বৈরতান্ত্রিক সব উপাদান। ৭২-এ একটি সত্যিকারের গণ অংশগ্রহণ মূল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলে গড়ে তোলায় হয় স্বৈরতান্ত্রিকপার্টিস্টেট বা দলরাষ্ট্র, যার সমস্ত ক্ষমতা প্রায় ন্যস্ত প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়-

কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন তা হইলে সংসদে তাহার আসন শুন্য হইবে।

ব্যাখ্যা।-যদি কোন সংসদ সদস্য যে দল তাহাকে প্রার্থীরূপে মনোনীত করিয়াছেন, সেই দলের নির্দেশ অম্যান্য করিয়া-

ক. সংসদে উপস্থিত থাকিয়া ভোটদানে বিরত থাকেন; অথবা

খ. সংসদের কোন বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তিনি উক্ত দলের বিপরীতে ভোটদানে করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।

এমনিতেই রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিত্ব একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ৭২-এর সংবিধান সেই ব্যবস্থাকে শুধু আত্তীকৃতই করেনি, একই সঙ্গে তার সবচেয়ে স্বৈরতান্ত্রী রূপটিকে হাজির করেছে জনগণকে শাসনের জন্য। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিত্বকে পুরোপুরি পর্যবসিত করেছে পার্টি প্রতিনিধিত্বে। একজন জনপ্রতিনিধি চাইলেও তার নিজ আসনের নির্বাচকগণের মতমাফিক চলতে বাধ্য নন-তার সমস্ত বাধ্যবাধকতা পার্টির কাছে। এ-ধরনের দলতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্র আরও তীব্র হয় যখন প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীসভার সর্বেসর্বা। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী-

 

(১) প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাঙলাদেশের একটি মন্ত্রীসভা থাকিবে। এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন সেরূপ অন্যান্যমন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রীসভা গঠিত হইবে।

(২) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।

(৩) মন্ত্রীসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকবেন।

 

তাহলে কী দাঁড়ালো? প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীসভার কাছে দায়বদ্ধ নন। এমনকি মন্ত্রীসভা পরিচালিত হবে তার হুকুমেই। কোনো যৌথতার দাবি অবান্তর। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহিতা কার কাছে? সংসদের কাছে। কিন্তু সংসদ সদস্যরা তো পার্টির সিদ্ধান্তের বাইরে গেলেই লক্ষণ রেখা পার করবেন! সুতরাং সাংবিধানিকভাবে এখানে প্রধানমন্ত্রী একনায়ক। তিনি যেমন করে ক্ষমতা চালাবেন তেমন করেই চলবে। একই সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে জনবিচ্ছিন্ন এই রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিত্ব যদি সংসদে তার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির বাইরে বা বিরুদ্ধে কোনো আইন পাস করেন বা কোনো পলিসি সমর্থন করেন তবে তা অসাংবিধানিক হবে না। আদালতে চ্যালেঞ্জ করেও তাই কোনো লাভ নাই। তাহলে একবারে মৌলিক প্রশ্নটা দাঁড়িয়ে যায়, এই রিপাবলিকের সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নিয়ে; যেখানে শাসনের কোনো দায় জনগণের কাছে নেই-এমন চুক্তি হয় কেমন করে? হ্যাঁ, আর ঠিক এই জন্যই লাগে সাইনবোর্ড। সংবিধানে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদের তকমা। মুক্তির সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সামাজিক বর্গের চেতনার বাইরে রাজনৈতিক দলগুলোর দর্শনের খিচুড়ি পাকিয়ে রচিত হয়েছে এই রিপাবলিকের ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক উচ্চকোটি তথা পলিটিক্যাল এলিটের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতেই দরকার ছিলো এমন একটি স্বৈরতন্ত্রী ক্ষমতা। আর এমন একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নিরঙ্কুশ করতে দরকার ছিলো ভিন্নমত ও অন্য রাজনৈতিক দলকে ‘সাইজ’ করা। জনগণকে একটা ইমাজিনড দীক্ষিত রাজনৈতিক কমিউনিটি হিসেবে নির্মাণ করা। আর তাই হাজির হয়েছে জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় ঐতিহ্য, জাতীয় মহত্ত্বের বুলি। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি নিপীড়ক জাতিরাষ্ট্রে। একটি মুক্ত স্বাধীন রিপাবলিকের বদলে বাংলাদেশকে একটি নিপীড়ক জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি খুব জটিল কিছু নয়। এই রূপান্তর প্রক্রিয়া আর ইতিহাস-চেতনার সংযোগ একই সূত্রে বাঁধা।   

পূর্ব-বাংলার মুক্তি আন্দোলনে বৈপ্লবিক গতিবেগ সৃষ্টির ব্যাপারে কৃষক-মূলত দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকই ছিলো গ্রামাঞ্চলের মূল রাজনৈতিক শক্তি। পূর্ব-বাংলার প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের রপ্তানি-ব্যবসা এমনকি শিল্পোউদ্যোগে সমস্তটাই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে। এর ন্যূনতম সুবিধা কখনও পায়নি উৎপাদক  কৃষক। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গণবিরোধী ভূমিনীতি ও  কৃষিনীতি তাদের অসন্তুষ্ট করে তোলে। কৃষকের চেতনা তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির প্রশ্ন কখনই উচ্চারিত হয়নি এই জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চায়। তার গায়ে স্রেফ হাজার বছরের বাঙালিত্বের তকমা এঁটে সাঙ্গ হয়েছে জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার কুলজি। 

পূর্ব-বাংলার উঠতি জাতীয় বুর্জোয়া বা স্থানীয় শিল্পপতি ব্যবসায়ী অথবা সম্ভাব্য শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা পূর্ব-বাংলার মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে কমবেশি উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছে। পূর্ব-বাংলার তথা বাংলাদেশের শিল্পায়নকে স্তব্ধ করে রাওয়ালপিন্ডি, করাচি, লাহোরের উপনিবেশিক শোষক ও শাসক চক্র পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে তোলে আধুনিক শিল্পব্যবস্থা। শিল্পনীতির বৈষম্য তাকে অসন্তুষ্ট করে তোলে। শিল্পের রাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে পাল্টে যায় ‘জাতীয় বুর্জোয়ার’ চরিত্র। রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র আর ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সীমাহীন লুটপাটের সংস্কৃতিতে গা ভাসানোই ছিলো তার সামনে একমাত্র পথ। লুটপাটের মধ্য দিয়েই জোটে ক্ষমতা আর শাসনের অংশীদারিত্ব। জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচেতনা গড়ে উঠেছে মূলত এই শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থকে আশ্রয় করে।

তৃতীয় পূর্ব-বাংলার মুক্তি সংগ্রামে অন্যতম মূলশক্তি  শ্রমিক। উদ্বৃত্ত শোষণের বিরুদ্ধে শুধু উপনিবেশিক শাসককের বিরুদ্ধে সংগ্রাম নয়; একই সঙ্গে স্বাধীন দেশে নূন্যতম অর্থনেতিক সামাজিক ন্যায়বিচার ছিলো তার আন্দোলনের মুখ্য প্রশ্ন। শ্রমিকের এই চেতনা থেকে আমাদের রাষ্ট্র-আমাদের সংবিধান যোজন যোজন দূরে।    

মধ্যবিত্তর মধ্যে ফেলা যেতে পারে কৃষক-শ্রমিক এবং জাতীয় বুর্জোয়া ছাড়া সমাজের বাকি অংশের মধ্যকার শহর ও গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত ও মাঝারি ধরনের বিভিন্ন বৃত্তিজীবীদের এবং প্রধানত বুদ্ধিজীবীদের। এই শ্রেণীটিই উচ্চকোটির কাছে সবচেয়ে আস্থাভাজন ও কম বিপজ্জনক।  

জাতীয়তাবাদী ইতিহাস-চেতনার প্রধান লক্ষণ :

১. পাকিস্তান বনাম পূর্ব-বাংলা বৈষম্যের প্রশ্নটিকে হাজির করা কিন্তু একই সঙ্গে পূর্ব-বাংলার প্রবাহমান সামাজিক বৈষম্যে ধরনটিকে আড়াল করা।

২. পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর শ্রেণী চরিত্র বিচার করা, কিন্তু একই সঙ্গে পূর্ব-বাংলার সামাজিক উচ্চবর্গের চরিত্র বিশ্লেষণ না করা।

৩. পাকিস্তান রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক শাসনের সমালোচনা করা, কিন্তু একটি দীর্ঘ রাজনেতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন রিপাবলিক গঠনের প্রশ্নে ক্রিয়াশীল শ্রেণী গোষ্ঠী-দলের সাধারণ ইচ্ছাটিকে কখনই সংজ্ঞায়িত না করা।

৪. পাকিস্তানি শাসনের অভিঘাতে বিপন্ন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষার তাগিদ বোধ করা। কিন্তু একই সঙ্গে এই জনপদের অন্যান্য জাতিসত্তার ভাষা সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানি কায়দার আক্রমণ।

৫. ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে জাতীয়তার নিরুপণ এবং শাসনযন্ত্রে তার কর্তৃত্ব দাবি।

চলচ্চিত্র সমালোচনা : গেরিলা

তিন দাগে ঘেরা বাংলাদেশ। ৫২, ৬৯ ও ৭১। বাঙালি জাতীয়তা যাদের হাত ধরে বিকশিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় প্রাধান্যশীল বৈশিষ্ট্যের মূলকথাই এটি। ইতিহাস মানেই ক্ষমতার উত্থান-পতন। রাজরাজড়ার কাহিনী অতীতকে নির্মাণের প্রচেষ্টা। মূলত এমন একটা স্বর একটা রীতি এই ইতিহাস চর্চার মধ্যে প্রবাহমান। এই প্রবাহমানতা সে শুধু ইতিহাস চর্চাতেই প্রবল প্রতাপে হাজির তা নয়, একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্য-বাংলাদেশের সংস্কৃতির চিত্রায়ণ তথা যেকোনো সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতেও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রও এই চেতনা-ভাব চিন্তার বাইরে নয়।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নামে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইতিহাস চর্চা বা ইতিহাসগত চেতনা নির্মাণের মাধ্যমে রাজনীতি ও সংস্কৃতিগত চেতনার নবায়ন এবং তার জারি রাখার একটা চল আছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর গেরিলা। গেরিলা সিনেমার ইতিহাসগত আলোচনাই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। আলোচনার পদ্ধতি তাই ডিসকার্সিভ অ্যানালাইসিস। তবে সিনেমার সিকোয়েন্স ধরে অর্থ উৎপাদনের রহস্য উন্মোচনের সিমিওটিক্‌সের ব্যবহারও অল্পবিস্তর থাকছে। তবে পলিটিক্যাল ইকোনমি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুধু এর প্রসারের দিকটি আলোচিত হবে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ-জাতিরাষ্ট্র  গেরিলা সমগ্রতা নির্মাণ

গেরিলার ক্যানভাস সুবিশাল। এই সুবিশাল ক্যানভাসের মধ্যে পৃথক পৃথক গল্প হয়ে ওঠার মতো অনেকগুলো ঘটনারই সঞ্চালনের প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু এই পৃথকতা তথা ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র কাহিনীর প্রয়োজনে একীভূত করে নির্মিত হয়েছে এক সমগ্র। সমগ্র নির্মাণের জন্য তাই চরিত্রের অবতারণা হয়েছে অনেক বেশি। তবে চরিত্রগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই পরিণতি পায়নি। অনেকে হারিয়ে গেছে। এই আসা আর হারিয়ে যাওয়ায় মূলত সমগ্র নির্মাণকে করে তুলেছে দুর্বল। নায়িকা বিলকিস বানুর সঙ্গে সঙ্গেই আসলে কাহিনীটা এগিয়েছে। দুটো প্রধান বিভাজনতো কাবেরী গায়েন গেরিলার সমালোচনাতে দেখালেন-শহরের যুদ্ধ বা দৃশ্যায়ন এবং গ্রামের দৃশ্যায়ন। তার মতে, এ-দুটো আলাদা চলচ্চিত্রেই হতে পারতো। কিন্তু কেনো এক করা হলো? কেনো এতোবড়ো ক্যানভাসে বানানোর চেষ্টা নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর। তা স্পষ্ট করলেন না কাবেরী গায়েন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার সবচেয়ে বড়ো সঙ্কট হলো এতে প্রান্তজনের স্বর নেই। প্রান্তজন কী কথা কইতে পারে? এমন প্রশ্ন মোকাবিলারও কোনো চল নেই অন্তত মুক্তিযুদ্ধের লিখিত ও পঠিত ইতিহাসে। মুক্তিযদ্ধের ইতিহাস মাত্রই তা শুধু রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাস। জীবন জনযুদ্ধের ইতিহাস নয়। এতে অবিসম্ভাবীভাবে তাই ‘জনগণ’কে নির্মাণ করতে হয়। কেননা ক্ষমতার ইতিহাসও মানবশূন্য ইতিহাস নয়। তাই সংগঠিত করতে হয় মুক্তিযুদ্ধের একটি ইমাজিনড কমিউনিটি।

বাঙালিত্ব এই ইমাজিনড কমিউনিটির প্রতীক। একজন মানুষের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য তার জীবনযাপন প্রণালী, পদ্ধতি, তার সংস্কৃতি-অভিব্যক্তি এই নিয়েই গড়ে ওঠে আত্মপরিচয়। কিন্তু ইমাজিনড কমিউনিটি হিসেবে যে-আত্মপরিচয় গড়ে উঠে তাতে এই জিনিস থাকে না। তাই আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে হয়। এই নির্মাণে বাঙালি পরিণত একটি রাজনৈতিক ‘ঐক্যে’-একটি রাজনৈতিক শ্রেণী-গোষ্ঠী দলে, যেখানে সে রাষ্ট্রক্ষমতা চায়। রাষ্ট্রক্ষমতার নির্মাণ-বিনির্মাণে বা নতুন রাষ্ট্র ধারণা নয়, অনেকটা পুরানো রাষ্ট্র্রেই নতুন ক্ষমতাধর। ইমাজিনড কমিউনিটি হিসেবে, জাতি হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় তার কর্তৃত্ব-এই হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল কথা।

যেহেতু ইমাজিনড তাই এর বাস্তবায়নে ক্রমাগতভাবে ‘জনগণ’কে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অনুগামী করে তোলার সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান। এই প্রক্রিয়ায় যে ইতিহাস রচনা হয় তার পরতে পরতে থাকে এক স্বর, একক কেন্দ্র ও একক অখণ্ড ‘জাতিসত্তা’। যে জাতিসত্তা আত্মপরিচয়ের মর্যাদা নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে আন্দোলন করে।

গেরিলা চলচ্চিত্রে এই সঙ্কট উত্তরণের চেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আবার সেখানেই ঘুরপাক খায়। এক স্বরের স্থানে বহুস্বর আনতে গিয়ে তার ক্যানভাস বড়ো হয়। পৃথক পৃথক কাহিনীর সংযুক্তি ঘটে। যদিও স্বরগুলো খুবই মনোটোনাস, তাই বৈচিত্র্য ধরা পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধের জনযুদ্ধময়ী রূপটিতে বহুত্ত্বাবাদী দেখা যায়নি, চাপা পড়ে প্রান্তজনের ইতিহাস। সমগ্র বানানোর চেষ্টা শেষমেশ সফল হতে পারে না গেরিলা

নারীর কেন্দ্রীয় চরিত্রায়ন : পরিবেশনার রাজনীতি  মনোসমীক্ষণ

বাংলাদেশে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের মধ্যে গেরিলায় প্রথম যেখানে নারীর চরিত্রটি প্রধান ও অংশগ্রহণ সক্রিয়। ধরা যাক, বিলকিস বানু চরিত্রের কথা। এতোদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীর যে-নির্মাণ তা কেমন? মুক্তিযুদ্ধের নারী মাত্রই ধর্ষিতা, স্বামীহারা কিংবা মুক্তিযোদ্ধার মা। নারীর মুক্তির কোনো প্রশ্ন নেই, সে নিষ্ক্রিয়। গেরিলায় প্রথম যা এই নিষ্ক্রিয়তার অচলায়তন ভাঙার চেষ্টা করে, নারীকে করে তোলে গেরিলা যোদ্ধা। নারীর এই নতুন নির্মাণ বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী কুলস্নাত, একেবারে ভিজেটিজে একাকার। গণমাধ্যম সমালোচক কাবেরী গায়েনও ভিজেছেন এই নতুন নির্মাণে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো নারী মুক্তির কোন্‌ এজেন্ডা গেরিলা সামনে আনলো; আনলো পুরুষতন্ত্রের কোন্‌ ফোকর?

নারী অপর গণ্য করার যে-ঐতিহাসিক চল তা থেকে গেরিলা বেরোতে পারেনি। ধর্ষিতা বা স্বামী সন্তান উৎসর্গকারী নিষ্ক্রিয় ভূমিকার বাইরে উঁকি দিলেও নারী মুক্তি প্রশ্ন সেখানে হাজির হয় না? উপরন্তু নারী নির্মিত হয় পুরুষ হিসেবে। গেরিলা চরিত্রে বিলকিস বানুর পুরো চরিত্রটাই পুরুষমূর্তি। তাই নারীর পুরুষায়নের উন্নত উদাহরণ গেরিলা। কিন্তু কেনো এমন হয়? আসলে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাস পুরুষের ইতিহাস, এখানে নারী ততোটাই সক্রিয় যতোটা সে ওই পুরুষ ইতিহাসের ছাঁচে আটে।

মুক্তিযুদ্ধের নারী যোদ্ধারা যেমন : সেতারা পারভীন, তারামন বিবি, নুসি বেগম কিংবা জোহরা নামী কেউতো কর্পোরেট স্টেরিওটাইপের সুন্দরী না। মুখ নাক এবড়ো-থেবড়ো দাত বের হওয়া নিম্নবর্গ। কিন্তু এমন একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা গেরিলায় প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না কেনো সঙ্গত প্রশ্ন? খোদ একেবারে ইউসুফ বাচ্চুর নারী ধারণার বুকেই আঘাত করেছেন কল্লোল। নারী সুন্দরী ইমেজ নির্মাণ বাচ্চু গ্ল্যামারাইজ চরিত্রকেই গুরুত্ব দিয়েছেন স্রেফ বাণিজ্যের কারণেই নয়, বাচ্চু নারী ধারণায় নারী মাত্রই পুরুষের কাঙ্খিত। যে-নারী স্রেফ পুংদণ্ডহীন অপর হলেই চলে না, তাকে কথা কইতে পারতে হয়; অর্জন করতে হয় আধুনিকতার গতি। ফলে পুরুষতন্ত্রকে এড়িয়ে বাচ্চু সাংস্কৃতিক নারী নির্মাণের চেষ্টা করলেও তাতে পুরুষতন্ত্রের গন্ধ থাকে।

সহিংসতা মতাদর্শ  বর্ণবাদী যুদ্ধের ফিরিস্তি

পকিস্তানি বাহিনীর নিপীড়ন নির্যাতন গণহত্যা গেরিলাতে ফ্রেমে বেঁধেছেন বাচ্চু। পাল্টা প্রতিরোধের ময়দানটাও কিন্তু কম নয়। সহিংসতার একটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আছে। সহিংসতা যখন প্রামাণ্য, তখন তা যুদ্ধপরাধের দলিল তাই সহিংসতা সব সময়ই যতো না মানসিক মনোসসীক্ষণজনিত কারণে পীড়ন তৈরি করুক না কেনো তা কিন্তু গ্রহণযোগ্য। কিন্তু গেরিলা কোনো প্রামাণ্যচিত্র নয়। তাহলে যুদ্ধ সহিংসতার, গণহত্যার নির্মাণ সেখানে জরুরি কেনো? তাহলে এর মাধ্যমে কী প্রমাণ করতে চান পরিচালক? গণহত্যা, পাকিস্তানি বাহিনীর সহিংসতা একজন গেরিলাকে, একজন বিলকিস বানুকে যুদ্ধ করার কৈফিয়ত সরবরাহ করে। ফলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় পাকিস্তানি কিংবা রাজাকার সহিংসতা না চালালে কি মুক্তিযুদ্ধ অযৌক্তিক? এই প্রশ্নের মোকাবিলা গেরিলা করতে পারে না।

যুদ্ধ একটি রাজনৈতিক ঘটনা। নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের ঘটনা। এক সঙ্গে নতুন রাষ্ট্র ধারণার নির্মাণের ঘটনা। সহিংসতার প্রাসঙ্গিকতা সেখানে নেই, আছে চেতনাগত নির্মাণের প্রশ্ন। গেরিলার এই রাষ্ট্রধারণার যুদ্ধ নতুন অধিকারে যুদ্ধকে চিত্রিত করতে পারে না, পারে না বলে তাকে আশ্রয় নিতে হয় সহিংসতার। কিন্তু এই সহিংসতা আবার রাজনীতি নিরপেক্ষ নয়। একেবারে বর্ণবাদী, যেখানে পাকিস্তানি বনাম বাঙালি এই সহিংসতা নির্মিত হয়। ফলে যুদ্ধটা পাকিস্তানি অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বশীল রাষ্ট্র কাঠামো যা সামরিক আমলা ভূ-স্বামী নিয়ন্ত্রিত তার বিরুদ্ধে নয়, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। এই অর্থ উৎপাদন বর্ণবাদী। বাঙালি  জাতীয়তাবাদের বর্ণবাদী রূপটি তাই গেরিলা অতিক্রম করতে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধে ৪০ বছর : বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী

চিন্তা-চর্চারই নতুন শপথ

ইতিহাসের অধিপতি বা মহাবয়ান বা ন্যারেটিভের বাইরে গেরিলা যেতে পারেনি। সে হয়ে উঠে ওই ডিসকোর্সেরই নির্মাণ। ছবিটি মুক্তি পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ৪০তম বার্ষিকীতে। এই ৪০ বছরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হাজির হয়েছে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডতে একক অধিপতিশ্বর হিসেবে। ৭১-এ যে-টুকু শ্রেণী সংগ্রামের, সমাজতন্ত্রের বয়ান হাজির ছিলো এখন তা ক্ষীণ। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের কোনো সক্ষমতা না থাকায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ আগেই পরাভূত হয়েছে তার ধর্ম ব্যবসায়ী ভিত্তির কারণে। এক ও অদ্বিতীয় মতাদর্শ হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ডিসকোর্সে গেরিলার নির্মাণ শুধু অধিপতি বয়ানের পক্ষেই ওকালতি নয়, একটা ফসল। আগামী দিনে ইতিহাস চর্চার একটা সিগন্যাল।

উপসংহার

ইতিহাস বর্তমান। ইতিহাস বর্তমানের রচনার মধ্যে ভবিষ্যৎ রচনা করবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ এই ভবিষ্যৎ ইতিহাস রচনায় কনসেপ্টচুয়ালি ব্যর্থ। গেরিলার হাত ধরে তাই ফাঁকা শপথ নেওয়াটা কুজো নীতিরই শামিল। মুক্তি সংগ্রাম নিয়ে তা কোনো যোগসূত্র স্থাপন করতে পারে না। তাই প্রান্তজনের ইতিহাস রচনার মধ্যে দিয়ে আমাদের বের করতে হবে আমাদের নতুন ইতিহাস রচনার সূত্র। নির্মাণ করতে হবে ওই ইতিহাসের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি। 

লেখক : আরিফ রেজা মাহ্‌মুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ  সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল একুশে টেলিভিশ-এ সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। এছাড়া তিনি কর্তৃত্ববিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী।

arifrezamahmud@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. আহমেদ, রেহনুমা (২০১২ : ১২); ‘অবতরণিকা’, বিক্ষোভ সংকলন : জরুরি অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৭, সম্পাদনা-উদিসা ইসলাম; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা। 

২. গুহ, রনজিৎ (২০০৪ : ২৪); ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা-গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টপ্যাধায়; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩. প্রাগুক্ত; গুহ, রনজিৎ (২০০৪ : ২৪-২৫)।

৪. প্রাগুক্ত; গুহ, রনজিৎ (২০০৪ : ২৭-২৯)।

৫. করিম, সরদার ফজলুল (২০০০ : ৩৬-৩৮); রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট; মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।

৬. দাশগুপ্ত, রণেশ (১৯৭১);‘মুক্তি সংগ্রামের গতিপ্রকৃতি’; বেহাত বিপ্লব : ১৯৭১; সম্পাদনা-সলিমুল্লাহ খান; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৭. মাহমুদ, আরিফ রেজা ( ২০১২) একাত্তুর পাবলিক রিপাবলিক; পুস্তকটি প্রকাশের অপেক্ষায়।

৮. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।

৯. প্রাগুক্ত; গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।

 


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জুলাইয়ের ম্যাজিক লণ্ঠনের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।



এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন