মাজিদ মিঠু ও মোহাম্মদ আলী মানিক
প্রকাশিত ১২ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
হুমায়ূনের চলচ্চিত্র : কাউন্টার-ডিসকোর্সে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
মাজিদ মিঠু ও মোহাম্মদ আলী মানিক

রাজা করে রণযাত্রা; বাজে ভেরি, বাজে করতাল;
কম্পমান বসুন্ধরা! মন্ত্রী ফেলি ষড়যন্ত্রজাল
রাজ্যে রাজ্যে বাধায় জটিল গ্রন্থি। বাণিজ্যের স্রোত
ধরণী বেষ্টন করে জোয়ার-ভাঁটায়। পণ্যপোত
ধায় সিন্ধু পারে-পারে। বীরকীর্তিস্তম্ভ হয় গাঁথা
লক্ষ লক্ষ মানবকঙ্কালস্তূপে: ঊর্ধ্বে তুলি মাথা
চূড়া তার স্বর্গ-পানে অট্টহাস। পণ্ডিতেরা
আক্রমণ করে বারম্বার পুঁথির-প্রাচীর-ঘেরা
দুর্ভেদ্য বিদ্যার দুর্গ; খ্যাতি তার ধায় দেশে দেশে ॥১
মানুষের যে-দিন থেকে গুহায় প্রতিকৃতি আঁকা শুরু; ইতিহাসের শুরুও সে-দিন থেকেই। গুহাবাসী ওই মানুষ জানতই না তারা কী সৃষ্টি শুরু করলো। কোনো চিহ্নের মাধ্যমে অতীত ঘটনা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাতেই ইতিহাসের আবির্ভাব। আজ, একটু পূর্বে-যা ঘটে গেলো তাই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। এই ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী যে-টুকু সংরক্ষণ করেছে বা করে, তাই আমাদের সামনে হাজির হয় ইতিহাস হিসেবে। পরবর্তী প্রজন্ম এখান থেকেই জানতে পারে তাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে। পৃথিবীর আদিমতম নিয়ম হলো ক্ষমতাবানের দাপট। তাদের হাত ধরেই ‘এগিয়ে’ চলে পৃথিবী। এই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে একজনের হাত থেকে আরেক জনের হাতে। ইতিহাসও এর বাইরে নয়। অতীত সম্পর্কে জানার এ-পদ্ধতি নির্মাণের পিছনে রয়েছে ক্ষমতার সম্পর্ক। যে-ক্ষমতাবান, তার হাত ধরেই ইতিহাস বয়ে চলে; রাজার রণযাত্রা ও মন্ত্রীর ফেলা ষড়যন্ত্রজালের ইতিহাস আমাদের সামনে আসে। বীরত্বের যে কীর্তিস্তম্ভ গাঁথা হয়, তার আড়ালে পড়ে হারিয়ে যায় সেই সব মানুষের কথা-যাদের লক্ষ্য কঙ্কালস্তূপে সেই স্তম্ভ দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের কথা সে-ইতিহাসে খুব কমই আসে। বলতে গেলে আসেই না।
ইতিহাসের রেপ্রিজেন্টেশন হয় বিভিন্নভাবে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে। এ-মাধ্যমগুলোর মধ্যে গণমাধ্যম অন্যতম। গণমাধ্যমের হাত ধরে ইতিহাস পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের কাছে। লিখিত কিংবা দৃশ্য-শ্রাব্য গণমাধ্যম ভিন্ন-ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে। দৃশ্য-শ্রাব্য হওয়ায় বিভিন্ন প্রকার গণমাধ্যমের মধ্যে চলচ্চিত্রের স্থান একটু আলাদা। চলচ্চিত্র আমাদের সামনে হাজির হয় এক ভিন্ন ইমেজ নিয়ে। একই সঙ্গে দেখা ও শোনার সুবিধা থাকায় এটি দর্শকের ওপর একটু বেশিই প্রভাব ফেলে। এই চলচ্চিত্রে ইতিহাসের যে-রেপ্রিজেন্টেশন তাই আমাদের আলোচনার বিষয়। এটি দেখতে গিয়ে আমরা বিশেষভাবে নজর দেবো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দিকে। কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা মায়ূন আহমেদ তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে ইতিহাসের রেপ্রিজেন্টেশন কীভাবে করেছেন তা দেখবো।
ইতিহাস, গণমাধ্যম ও রেপ্রিজেন্টেশন
এ-আলোচনায় তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি ইতিহাস। দ্বিতীয় এবং তৃতীয়টি যথাক্রমে গণমাধ্যম ও রেপ্রিজেন্টেশন। বলা হয়, আজকের দিনটিই আগামীর ইতিহাস। একটি ঘটনা ঘটার পর তা সময়ের গর্ভে হারিয়ে যায়, তখন তা হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ। ইতিহাস হলো আজকে দাঁড়িয়ে অতীতের বিষয়গুলোর পর্যবেক্ষণ। এ-ব্যাপারে রণজিৎ গুহ বলেন, ‘ইতিহাস বিদ্যা বলতে আমি বোঝাবো সেই স্মৃতি বা প্রতীতির কথা যার বিশদ প্রকাশ ওই যুগ প্রসঙ্গে আমাদের মৌখিক বা লিখিত বক্তব্যে।’২ তবে সময়ের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সব ঘটনাই ইতিহাস হয়ে ওঠে না। ঘটনাকে ইতিহাস হয়ে উঠতে হলে তাকে আপাত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হতে হয়। মানুষের প্রয়োজন মতো অবস্থান, পরিবেশ, পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে কোনো ঘটনা ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। এই বিবেচনায় ইতিহাস যখন গড়ে ওঠে তখনও কাজ করে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। যিনি এই অতীত ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন বা যে উৎস থেকে এগুলো আসে, আর যারা একে একত্রিত করেন, তাদের মনমতো তৈরি হয় এ-ইতিহাস।
সাধারণত আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইতিহাসের যে নির্মাণ দেখি তা ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস-যাকে বলা হয় জেনারেল হিস্ট্রি বা সাধারণ ইতিহাস। ‘যাকে এক কথায় রাজকাহিনীও বলা যায়। কাহিনীর নায়করা কখনও দিল্লিশ্বর, কখনও বা কোনও আঞ্চলিক ক্ষুদে ইশ্বর-কিন্তু ঐতিহাসিকের কাছে তার সকলেই জগদীশ্বর। তাদের বংশাবলী, দিগ্বিজয় ইত্যাদি ছাড়াও শাসনব্যবস্থা, রাজস্বের হার, ভৌগোলিক তথ্য এবং ওই ধরনের আরও কিছু সাম্প্রতিকতার ছাপ এই জাতীয় ইতিহাসে বিরল নয়।’৩
কিন্তু সাধারণ যে-মানুষ, সমাজের নিম্নস্তরে যাদের অবস্থান, সেটি আর্থিক বা সামাজিক যে-দিক দিয়েই হোক; তাদের কথা আমাদের ইতিহাসে নেই। প্রতিটি ঘটনায় বা জাতির সব পর্যায়ে এই নিম্নবর্গের যে অবদান তা অনস্বীকার্য। অথচ ইতিহাস নির্মাণের কারিগর কিন্তু এই সাধারণ মানুষ। কিন্তু ইতিহাস নির্মাণের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি, এর জন্মই ক্ষমতাবানের হাত ধরে। প্রাচীন সমাজে যে-গোত্রপতিরা থাকতেন তাদের কথাই হতো আইন। আর তারা ইচ্ছেমতো আইন তৈরি করতেন, যেনো প্রজা বা অধীনস্তদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
এবার আসি গণমাধ্যম প্রসঙ্গে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০ অব্দে প্রাচীন রোম ছিলো জুলিয়াস সিজারের অধীনে। এ-সময় এক ধরনের কর্মচারি ছিলো; যাদের কাজ ছিলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ থেকে খবর সংগ্রহ করা। সেই সংগৃহীত তথ্যাবলী লিখে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। এটা করা হতো সিজারের হুকুমেই। যার নাম ছিলো ‘এ্যকটা ডায়ারনা’। এই যে প্রক্রিয়া তার পুরোটাই একটা উদ্দেশ্য নিয়ে করা হতো-তা হলো জনগণকে জানানো। সাধারণকে জানানোর এই প্রক্রিয়া, এমন ধারণা থেকেই বর্তমান গণমাধ্যম ধারণার বিকাশ। আর এর আধুনিক সংস্করণ হলো আজকের গণমাধ্যম। তার মানে গণমাধ্যমের জন্মও ক্ষমতাবানের ক্ষমতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই হয়েছে। ক্ষমতাবানের বক্তব্য প্রকাশের জন্যই গণমাধ্যম ধারণা বিকাশ লাভ করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি এমন হয়েছে-গণমাধ্যমের মালিকানা, এর পরিচালনার ধরন ও বিষয়বস্তু প্রায় প্রতি ক্ষেত্রই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ক্ষমতাবানের মাধ্যমে। আর এই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় তাই ইতিহাসের মতো অতি সাধারণভাবেই বাদ পড়ে যায় সাধারণ মানুষের কথা। শাসকগোষ্ঠী তাদের মতামত, তাদের প্রচারণা সবকিছু চাপিয়ে দেয় তাদের ওপর। এই যে মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ, এর পিছনে প্রভাবক হিসেবে থাকে পুঁজি ও ক্ষমতার খেলা।
এখন কথা হতে পারে রেপ্রিজেন্টেশন নিয়ে। সাধারণভাবে রেপ্রিজেন্টেশন হলো, কোনো বিষয়কে উপস্থাপন করা। কিন্তু আমরা এখানে রেপ্রিজেন্টেশনকে এতো সাদামাটাভাবে দেখবো না। এখানে রেপ্রিজেন্টেশন হলো, ‘ভাষাকে ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের কাছে দুনিয়াকে অর্থপূর্ণভাবে বলা বা উপস্থাপন করা।’৪ ‘এই ভাষা হতে পারে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, পেইন্টিং ইত্যাদি। রেপ্রিজেন্টেশনের ধারণা সেই ভাষাকে এবং এর অর্থকে সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে। অর্থবহনকারী শব্দ, ধ্বনি ও ইমেজকে আমরা চিহ্ন নামক সাধারণ পরিভাষায় বর্ণনা করে থাকি। আমরা আমাদের মাথায় যেসব ধারণা ও সেগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ধারণাগত সম্পর্ক নিয়ে ঘুরি-ফিরি, চিহ্ন সেগুলোকে রেপ্রিজেন্ট করে অথবা প্রতিনিধিত্ব করে এবং এগুলো একত্রে আমাদের সংস্কৃতির অর্থ-পদ্ধতি তৈরী করে।’৫ অর্থাৎ, ভাষার মাধ্যমে কোনো ধারণার অর্থ উৎপাদনই হলো রেপ্রিজেন্টেশন। এটি ধারণা ও ভাষার সঙ্গে একান্তই সম্পর্কিত, যা আমাদের সামনে বাস্তব বা কল্পনার বস্তু, ঘটনা ও মানুষ নির্দেশ করার সামর্থ্য রাখে। এটি এমন একটি বিষয় যার সঙ্গে ভাষার ব্যবহার, ইমেজ এবং সাইন সম্পৃক্ত। যা কোনো বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে।
মোটকথা, ভাষার মাধ্যমে জনসাধারণের সামনে কোনোকিছু উপস্থাপন করা। এখানে ভাষা অর্থ শুধু ‘কথা’ নয়, অন্যান্য অনেক বিষয়-যার মাধ্যমে মানুষকে কোনো বিষয়ে বোঝানো সম্ভব। এই ভাষার মাধ্যমেই ইতিহাস নির্মিত হয় এবং বিভিন্ন বিষয় এই ভাষার মাধ্যমেই ইতিহাসে রেপ্রিজেন্ট হয়। ইতিহাসের সেই রেপ্রিজেন্টেশনকে গণমাধ্যম রেপ্রিজেন্ট করে তার মতো করে।
মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গণমাধ্যমে তার রেপ্রিজেন্টেশন
আপাত দৃষ্টিতে ১৯৭১ সালের ৯ মাস মুক্তিসংগ্রামের কাল মনে হলেও এর ইতিহাস কি কেবল নয় মাসের? মুক্তিসংগ্রামের শুরু সে-দিন থেকেই যে-দিন পলাশীতে ভারতবর্ষ উপনিবেশিকতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছিলো। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ৪৭-এ একটু মুক্তির আলো দেখতে পেলেও আরেক উপনিবেশিকতার কালোমেঘ আমাদের ঢেকে দেয়। যার নাম পাকিস্তান। ৪৭; এরপর ৫২-এর ভাষা-আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং এর পথ ধরেই ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। যার ফসল আমাদের স্বাধীনতা-আর এটি একটি ইতিহাস।
বাংলাদেশের যে ইতিহাস গড়ে উঠেছে তার একটি বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। এখন প্রশ্ন, কারা এবং কী আছে এই ইতিহাসে? নির্মিত এই ইতিহাসে উপনিবেশিক শাসনের প্রভাব স্পষ্ট। যেখানে কেবল ক্ষমতাবানদের কেন্দ্র করেই ইতিহাসের ধারা বয়ে চলেছে। এর বাইরে সাধারণ যে-মানুষ তার উপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নিষ্প্রভ। ইতিহাসে একজন তারামন বিবি, সেতারা পারভীন কিংবা নুসি বেগমের বন্দুকহাতে যুদ্ধের কথা থাকলেও যে-নারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তি সংগ্রামীদের খাবার-আশ্রয় জুগিয়েছেন, ক্লান্ত যোদ্ধাকে একটু ঘুমের সুযোগ দিয়ে তার বন্দুকটি সযত্নে মুছে দিয়েছেন অথবা অন্যের জীবন বাঁচাতে বুকে মুখ চেপে ধরে দুধের সন্তানকে চির নিদ্রায় শায়িত করেছেন-তাদের কথা ওই ইতিহাসে নেই। ধর্ষিত নারী থাকলেও তার রেপ্রিজেন্টেশন হয়েছে ভিন্নভাবে, ভিন্ন উদ্দেশ্যে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেনো বন্দি হয়ে গেছে কয়েকজন নেতা, সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা এবং ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও আড়াই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের’ মধ্যে। এর বাইরে ওই সাত কোটি মানুষের বেশিরভাগই যে কোনো না কোনোভাবে এই যুদ্ধ করেছে তা যেনো ইতিহাস ভুলেই গেছে। আর একে সেই শুরু থেকে সমর্থন দিয়ে এসেছে আমাদের গণমাধ্যম।
গণমাধ্যমে তার রেপ্রিজেন্টেশন হয়েছে বা হচ্ছে প্রথাগতভাবেই। ‘জাতি রাষ্ট্র যদি বেনেডিক্ট এন্ডারসনের ভাষায়, একটি ‘কল্পিত সমাজ’ (ইমাজিনড কমিউনিটি) অথবা গায়ত্রী স্পিভাকের ভাষায়, ‘কৃত্রিম নির্মাণ’ (আর্টিফিশিয়াল কনস্ট্রাক্ট) হয়ে থাকে, তবে তার ‘কল্পিত’ ঐক্য ও সংহতির জন্য লাগাতারভাবে একটি আদর্শ জাতীয়তার অবয়ব বা বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলতে হয় এবং কিছু ‘রেপ্রিজেন্টেশন পদ্ধতি’র (স্টুয়ার্ট হলের মতে) মাধ্যমে এই নির্মাণের কাজটি করতে হয়, সেই অবয়ব বা বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার জন্যও। সংবাদপত্র, সাহিত্য বা শিক্ষা সেই রেপ্রিজেন্টেশনের দায়িত্বটি বরাবর পালন করে এসেছে। অপেক্ষাকৃত অধুনামাধ্যম চলচ্চিত্রও বিশ্বব্যাপী জাতীয়তা, আত্মপরিচয় নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।’৬ কিন্তু আমাদের গণমাধ্যম কল্পিত ঐক্য ও সংহতির যে জাতীয়তার অবয়ব তুলে ধরে সেটি ক্ষমতা ও পুঁজির নিয়ন্ত্রকদের পক্ষে। তারা ইতিহাসের রেপ্রিজেন্টেশনে মুক্তিযুদ্ধের গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বাইরে যেতে পারছে না।
এখন প্রশ্ন, ‘সেই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভটা কী, আমরা সবাই জানি। এর একটা অংশ হলো স্বাধীনতাকামী বাঙালি জনগণের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে, হত্যা-ধর্ষণ-ধ্বংসের মতো যুদ্ধাপরাধ করে এবং বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলে দেশকে স্বাধীন করে। এই ন্যারেটিভের আরেকটি অংশ হলো, ইসলামপন্থী কয়েকটি দলের বাঙালি সদস্যরা ওই সব যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করেন অথবা ওই সব অপরাধে নিজেদের নিযুক্ত করেন।৭ গণমাধ্যমে যে বিষয়টি আরও সঙ্কটের সৃষ্টি করে তা হলো মুক্তিযুদ্ধে নারীর উপস্থাপন। ‘মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান বহুমাত্রিক হলেও বাংলাদেশের মূল ধারার ইতিহাসে নারীর মুক্তিযোদ্ধা ইমেজের পরিবর্তে তার ধর্ষিত ইমেজটিকেই কেবল প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।’৮ গণমাধ্যমে নারীর যোদ্ধা ইমেজের পরিবর্তে তাকে দুর্বল ও বেশিরভাগ সময় ধর্ষণসহ বিভিন্ন অবমাননাকর ভূমিকায় দেখা গেছে। মোট কথা, গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যে রেপ্রিজেন্টেশন তাতে উপনিবেশিক রীতির স্পষ্ট ছাপ বিদ্যমান। যার মধ্য দিয়ে উপেক্ষিত হয়েছে সাধারণ মানুষের অবদানের কথা; অথচ তারা ইতিহাস নির্মাণে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ
আগেই বলেছি দৃশ্য-শ্রাব্যতার কারণে গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের অবস্থান একটু আলাদা। সমাজ বাস্তবতা ও অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের এক মোহময় আবেশ নিয়ে এসেছিলো এই মাধ্যম। সৃষ্টিশীল মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের ওপর আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের গভীর ছায়া পড়ে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে নির্মিত হয় বেশকিছু চলচ্চিত্র। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা যেমন সংরক্ষিত হয়েছে গল্প, গান, কবিতা, নাটকের মাধ্যমে; তেমনি মুক্তিযুদ্ধও সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হয়ে আমাদের কাছে এসেছে।
যুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকার বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের গণহত্যা ও মানবতার লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার লক্ষ্যে কয়েকটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। এর মধ্যে জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড ও এ স্টেট ইজ বর্ন অন্যতম। পর পর নির্মিত হয় আলমগীর কবিরের লিবারেশন ফাইটার্স, বাবুল চৌধুরীর ইনোসেন্ট মিলিয়নস। চলচ্চিত্রগুলোতে ফুটে উঠেছে যুদ্ধকালীন এক ‘বাস্তব’ আবহাওয়া। যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশেও মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত হয়েছে বা হচ্ছে অনেক চলচ্চিত্র। লক্ষ্যণীয় যে, চলচ্চিত্রগুলোর বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। এসব চলচ্চিত্রে বেশি সংখ্যক দর্শককে সিনেমা হলে টানতে গিয়ে যোগ করা হয়েছে অতিমাত্রায় কাঁচা আবেগ। যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কয়েকটি বিষয়ে বেঁধে ফেলেছে।
গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভ দাঁড়িয়েছে এমন যে, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র মানেই শুরু ৭ মার্চের ভাষণ দিয়ে, তারপর ২৫ মার্চের কালো রাতের দৃশ্য, পাক হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতন, ধর্ষণ, কিছু দাড়ি-টুপিওয়ালা রাজাকার, মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র যুদ্ধ এবং শেষে পতাকা হাতে ‘জয়বাংলা শ্লোগান’। এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধের আর কোনো ধারা বা দিক বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি।
মোটাদাগে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাবো যে, চলচ্চিত্রগুলো নির্মিত হয়েছে মূলত মধ্যবিত্ত জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করলেও এবং মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষার কারণ ও প্রেরণার সূত্র থাকলেও তার যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে তেমন একটা লক্ষ করা যায় না। আরও দেখা যায়, ‘হত্যা, নারীধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও ইত্যাদি ঘটনা মানবতার লাঞ্ছনার জন্য কতোটা দায়ী তাকে গুরুত্ব দেওয়ার চেয়ে এসব দৃশ্য চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে বীভৎসতা আরোপ করে দর্শক টানার চেষ্টা করা হয়েছে।’৯ তবে কি এমন কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি যেগুলো গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভকে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছে? প্রচলিত ডিসকোর্সকে এড়িয়ে উন্মোচন করেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নতুন কোনো দিক? আশার কথা হলো সে-চলচ্চিত্রও যে একেবারে নির্মিত হয়নি-এমন নয়। কিন্তু তার সংখ্যা বড়োই নগণ্য। এসব চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিক দিক কিছুটা হলেও উঠে এসেছে।
হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের রেপ্রিজেন্টেশন
তাকে আমরা চিনি বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক হিসেবে। তার সাহিত্যকর্ম যেমন সুখপাঠ্য তেমনি জনপ্রিয়ও। সাহিত্যিকের বাইরেও হুমায়ূন আহমেদের একটি বড়ো পরিচয় হলো তিনি একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা। তার চলচ্চিত্র নির্মাণের হাতেখড়ি ১৯৯৫ সালে নিজের উপন্যাস আগুনের পরশমনিকে সেলুলয়েডে চিত্রায়ণের মাধ্যমে। এরপর তিনি নির্মাণ করেন ছয়টি চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মোটাদাগে তিনটিই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত। আগুনের পরশমনি (১৯৯৫), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯) ও শ্যামল ছায়া (২০০৪), এরমধ্যে প্রথম ও শেষ চলচ্চিত্র দুটি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হলেও মাঝের চলচ্চিত্রটির কাহিনী মুক্তিযুদ্ধের ছায়া অবলম্বনে গড়ে ওঠা। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে যখন প্রায় সবাই ঘুরেফিরে একই বিষয় নিয়ে উঠে-পড়ে লেগেছিলো, ঠিক তখন হুমায়ূন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কী করলেন সেটি দেখার বিষয়।
সাধারণভবে তার চলচ্চিত্রে আমরা যা দেখছি তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও প্রচলিত ইতিহাসের বয়ানে খুব স্বল্প পরিমাণেই তার স্থান হয়েছে। প্রচলিত ইতিহাসের বয়ান মূলত কিছু মত, কিছু পথের ঐক্যে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ইতিহাসের বয়ান সবসময় মতৈক্য অনুসরণ করে এগোয় না। একে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অবকাশ থাকে এবং সব দৃষ্টিভঙ্গিই ইতিহাসের ভিন্ন-ভিন্ন বয়ান প্রকাশের সুযোগ দেয়। ১৯৭১ নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় চেতনার সর্বোচ্চ শিখর। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এই ক্ষণটিতেই আমাদের উন্মেষ। আমাদের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক ও সঙ্গীতে মুক্তিযুদ্ধ তাই একটি পৌনঃপুনিক পরম্পরা। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি এতো ব্যাপক যে, একটি চলচ্চিত্রে তার সামগ্রিকতা ধারণ করা অসম্ভব। ‘কোনো সাহিত্য বা চলচ্চিত্রকর্ম ইতিহাসকে বড়জোর একটি বিশেষ কোণ থেকে আলোকপাত করতে সক্ষম। সেখানে তাই সত্যের ‘একমাত্র’ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ উপস্থিতি খোঁজা খুব যৌক্তিক নয়।’১০ তাহলে এখন প্রশ্ন আসতে পারে হুমায়ূন তাহলে কী করেছেন? রুবাইয়াতের ভাষায়, সত্যের ‘একমাত্র’ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ উপস্থিতি খোঁজার চেষ্টা করেছেন কি? অন্যভাবে বললে, ইতিহাসের গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বাইরে গিয়ে তিনি কি কিছু নির্মাণ করতে চেয়েছেন? নাকি অন্যকিছু?
হুমায়ূন এর চলচ্চিত্রে আমরা দেখি, গ্রামের হিন্দু যুবক, শহরের সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা, সহজ-সরল গৃহপরিচারিকা, ভিখারী, দোকানদার, গৃহবধু, স্বজনহারা মানুষ, বৃদ্ধ, শিশু, দাড়ি-টুপিওয়ালা খাঁটি মুসলমান, যে-কিনা রাজাকার নয়, অহংকারী জমিদার, জ্বলে ওঠা অসহায় নারী, কৃতজ্ঞ রাজাকার ইত্যাদি চরিত্র। যে মা নারী, একজন মুক্তিযোদ্ধার মা; সেই মায়ের সংগ্রাম, সেই মায়ের যুদ্ধ। একজন বোন, তার যুদ্ধ-নারী মানেই কেবল ধর্ষণ নয়। এর মধ্যে দিয়ে তিনি হয়তো প্রচলিত গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বাইরে ভিন্ন কিছু দেখাতে চেয়েছেন। হয়তো বলতে চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের যে গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভ এতোদিনে পাকাপোক্ত আসন তৈরি করেছে সেটিই একমাত্র ইতিহাস নয়।
নতুন সূর্যের আশায় যে যুদ্ধ
এবার আসি তার পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগুনের পরশমনিতে। ৭১-এর মে মাস; অবরুদ্ধ ঢাকা নগরী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই নগরীকে নিয়েছে হাতের মুঠোয়। মৃত্যু ভয়ে কাঁপছে মানুষ দিন-রাত। তবু নগরবাসী স্বাধীনতা নামের আশ্চর্য স্বপ্নটি গোপনে লালন করে। রাত জেগে শোনে বিবিসি, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র। শুনতে চায় আশার বাণী। শঙ্কায় কাটে নগরবাসীর রাত। এর মধ্যে যে-কটি মধ্যবিত্ত পরিবার তখনও ঢাকায় আছে তাদের মধ্যে মতিন উদ্দিন সাহেব একজন। অন্যান্য অনেক পরিবারের ছায়া নিয়ে এই মতিন উদ্দিন সাহেবের পরিবারকে ঘিরেই আগুনের পরশমনি।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মুত্তিযুদ্ধভিত্তিক যে-কটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। এই চলচ্চিত্রটিতে যুদ্ধকালীন ঢাকায় বসবাসরত মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনচিত্র, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তি-সংগ্রামের সৈনিকদের কার্যক্রম ফুটে উঠেছে। হুমায়ূন তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলার মধ্যবিত্ত ও নিম্নশ্রেণীর যে-যুদ্ধ তার স্বরূপ তুলে ধরেছেন। উপনিবেশিকতার শৃঙ্খলে যে-মধ্যবিত্তের জন্ম, সে-মধ্যবিত্ত জীবনে কোনোদিন বাধ ভাঙ্গতে চায়নি। সবসময় নিজের পিঠ বাঁচিয়ে কীভাবে চলা যায় সে-পথে হেঁটেছে। যে-মধ্যবিত্তের মুখে জি হুজুর ছাড়া প্রতিবাদী কোনো কথা কেউ শোনেনি; সবসময় মুখবুজে থেকেছে-স্বাধীনতা অর্জনে সেই মধ্যবিত্তের যে ভূমিকা তা আগুনের পরশমনিতে ফুটে উঠেছে। তার এ-চলচ্চিত্রে এমন কিছু মানুষের কথা উঠে এসেছে যাদের স্বীকৃতি গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভে নেই।
দেশের স্বাধীনতার পক্ষে এসব মধ্যবিত্তের অবস্থান হলেও অফিসে সহকর্মীর স্বাধীনতাবিরোধী কথার জবাবে মতিন সাহেবরা মনে-মনে গালি দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারেননি। আবার মনে ঘৃণা থাকলেও ঘরের দেয়ালে ফুলের মালা দিয়ে জিন্নাহ্র ছবি টাঙ্গিয়ে রেখেছেন। অনেকে গোপনে ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। তাদের দেখাশোনা করেছেন, করেছেন বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা। স্বাধীনতা অর্জনে তাদের এ-অংশগ্রহণ কী যুদ্ধ নয়?
হুমায়ূন আগুনের পরশমনিতে যুদ্ধে একজন মায়ের, একজন তরুণীর, একজন কাজের মেয়ের, একটি শিশুর ভূমিকা নির্মাণ করেছেন। ছেলেকে যুদ্ধে পাঠিয়ে রাত-দিন তার জন্য দোয়া করেছেন মা। আবার সেই ছেলেকে কাছে পেয়েও তার নিরাপত্তার জন্য পালিয়ে যাবার পথ পরিষ্কার করে তিনি বলেন, ‘তুই এক্ষুনি চলে যা। বাসার সামনে কে একজন ঘুরাঘুরি করছে। তাড়াতাড়ি কর। পিছনের পাইপ দিয়ে নামতে পারবি না?’ এই যে মা, তিনি কিন্তু ছেলের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলেননি, ‘তুই যাসনে’ কিংবা তাকে আলমিরার পিছনে লুকিয়ে রাখেননি। আবার সেই ছেলে যখন একজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে সেখানে মমতা দিয়ে আগলে রেখেছে আরেক মা। যিনি গুলিবিদ্ধ যোদ্ধাকে বাঁচাতে তার নিজের জীবনের বিনিময়ে তার জীবন ভিক্ষা চেয়েছেন; সেবা করেছেন মায়ের স্নেহে। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার মা এসময় তোমার পাশে থাকলে আল্লাহর কাছে নিজের জীবনের বিনিময়ে তোমার জীবন ভিক্ষা চাইতেন, তাই না? আমিও তাই করবো বাবা। তুমি কোনো চিন্তা করো না।’ যুদ্ধকালীন এমন হাজারো মায়ের প্রতিনিধিত্ব করে আগুনের পরশমনির এই দুই মা। মায়েদের এই ভূমিকাকে আমরা কী যুদ্ধ বলবো না?
একজন তরুণীর যুদ্ধ আমরা দেখি। যে একটু আকাশ দেখার জন্য ছটফট করে, কিন্তু বাইরে যেতে পারে না। যার স্বপ্ন একদিন দেশ স্বাধীন হবে। সে-দিন সে হারমোনিকা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় গাইবে, নাচবে। বন্ধ ঘড়িটিকে চালু করবে, খাঁচার পোষা পাখিকে করবে মুক্ত। বাড়িতে আশ্রিতের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার পর ওই তরুণী যখন জানতে পারে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, তখন তার অনুতাপ, ‘উনি মুক্তিবাহিনীর ছেলে! মা, উনি মুক্তিবাহিনীর ছেলে! আমার খুব খারাপ লাগছে মা, আমি উনার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছি। আমি বুঝতে পারিনি।’ মধ্যবিত্ত পরিবারের এই তরুণীর আবেগ, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, আকুতি, মুক্তিযোদ্ধার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান কী মুক্তিযুদ্ধ নয়? নাকি ওই বয়সী কোনো নারীর জন্য ধর্ষণই সর্বোৎকৃষ্ট পরিণতি?
চলচ্চিত্রটিতে মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি শিশুকে দেখি। যে ডিমের খোসায় ছবি আঁকতে ভালোবাসে। সেখানে সে আঁকে একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি। বাড়িতে আশ্রিত মুক্তিযোদ্ধাকে সে সঙ্গ দেয়। যুদ্ধে শহরে বের হয়ে ভয়ঙ্কর বিপদে পড়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কেঁদে ফেলে। একসময় মুক্তিযোদ্ধা বদি আহত হলে সে তার পাশে বসে থাকে, বদির বোনের লেখা চিঠি পড়ে শোনায়। বদির কষ্টে তার বুক ফেটে যায়! আগুনের পরশমনিতে এই একজন শিশুর যুদ্ধ!
একজন দিনমজুর, যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পেঁয়াজের ঝুড়িতে মুক্তিবাহিনীর জন্য বোমা নিয়ে আসে। একজন গাড়ি মেকানিক, মুক্তিবাহিনীকে আশ্রয় দেয়। আবার কয়েকজন জীর্ণ-শীর্ণ মানুষ হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত মানুষের কবর দেওয়ার জন্য মাটি খোঁড়ে। অসংখ্য মানুষের লাশ মাটিচাপা দিয়ে হানাদার বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে অশ্রু চোখে হাত তুলে মোনাজাত করে। অথচ তাদের এই ভূমিকাকে আমাদের যুদ্ধ মনে হয় না!
একজন মুদি দোকানদারকে মতিন সাহেবের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলতে শুনি, ‘ফাইট কিন্তু ছার ছুরু হইচে। ছহরে (শহরে) গরিলা লামছে। মিলিটারির পাতলা পায়খানা ছুরু হয়া গেচে। একেবারে পানির মতো পাতলা পায়খানা।’ মতিন সাহেব বলেন, ‘এসব নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো।’ জবাবে তিনি বলেন, ‘আলোচনা না করলে বালো লাগে না ছার। ইয়াহিয়া খান ছাবের ছবি টাঙ্গাইয়া থুইচি। রুজদিন (রোজদিন) একবার কইরা থুক দি। থুক দিয়া কাজটা ছাফা করি।’ যোদ্ধাদের প্রতি তার এই সমর্থন ও বিরোধীদের প্রতি ঘৃণাকে আমরা কী বলবো? কিংবা দোকানের পাশের সেই ভিখারি; যে ‘ঢাকা নগর শান্তি কমিটি’র মিছিলের দিকে থুথু দেয়, গালি দেয়, ‘যা ব্যাটা পাকিস্তানি’। তার এই অবস্থান কি যুদ্ধ নয়?
কাজের-মেয়ে বিন্তি। মানুষ হিসেবে সে আমাদের দৃষ্টিতে খুবই নগণ্য। গতানুগতিকভাবে তার চাওয়া ছিলো একটু সাজগোজ, একটা ভালো বর। প্রচলিত সমাজেও তার অবস্থান খুবই নিচে। আর দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তার অবদানের স্বীকৃতি তো প্রায় অসম্ভব। আর যদি দু-এক জায়গায় থাকেও সেটা চলচ্চিত্রের দর্শক টানার জন্য। হুমায়ূন সব গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভকে ভেঙ্গে ফেললেন, নগণ্য এক কাজের-মেয়ের যুদ্ধ দেখালেন। বিবাহকাতর ওই মেয়েটি হঠাৎ যেনো যোদ্ধা হয়ে উঠলো। আসলে এরা যোদ্ধা হয়ে ওঠে না, এরা আজীবন যোদ্ধাই থাকে; কেবল আমাদের চোখে পড়ে না। হুমায়ূন তার চোখ দিয়ে আমাদের দেখালেন।
গুলিবিদ্ধ বদি যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর, তখন নিম্নবর্গের ওই বিন্তি ছুটে এসে গৃহকর্ত্রীকে বলে, ‘আম্মা, উনি যেনি কেমন করতাছে। আম্মা বড়ো রাস্তার কোনাত এক ডাক্তার সাব আছে, আমি বাসা চিনি। এক দৌড় দিয়া নিয়া আহি?’ এরপর আমরা দেখলাম অকুতোভয় বিন্তি এক দৌড়ে বেরিয়ে গেলো কারফিউয়ের রাতে। সে আর ফিরে আসেনি। তার এই ত্যাগকে আমরা কী বলবো?
আগুনের পরশমনিতে হুমায়ূন আহমেদ এমন অনেক প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করেছেন। আমরা তার এ-চলচ্চিত্রে এমন কিছু মানুষকে উঠে আসতে দেখি, যাদের অবদান মুক্তিযুদ্ধে ঠিক তেমন, যেমন রুধি’র ধারা শরীরের অভ্যন্তরে নিরন্তর বয়ে চলে। যার জন্য বেঁচে থাকে প্রতিটি জীব। কিন্তু উপর থেকে তাকে দেখা যায় না। আগুনের পরশমনিতে সেই রুধি’র গুরুত্ব বোঝালেন হুমায়ূন। পাশাপাশি ধর্ষণের দৃশ্য, স্বাধীনতাবিরোধী দেশিয় দালালদের ফর্মুলা তাণ্ডব না দেখিয়েও যে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র হয়-হুমায়ূন আহমেদ তা করে দেখিয়ে দিলেন।
নতুন প্রজন্মের চাওয়া ও স্বাধীনতা বিরোধীরা
শ্রাবণ মেঘের দিন। গ্রামের মেয়ে কুসুম ও বয়াতি মতিকে ঘিরে আবর্তিত এর কাহিনী। চলচ্চিত্রটিতে প্রেমকাহিনীর অন্তরালে সমানভাবে ছায়ার মতো আরও একটি বিষয় এগিয়ে গেছে। সেটি মুক্তিযুদ্ধ। জমিদার চরিত্রের অভিনেতা গোলাম মোস্তফা যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিছু পাকসেনাকে সাহায্য করেছিলেন, আশ্রয় দিয়েছিলেন তার বাড়িতে। যেখান থেকে পাকবাহিনী সেই এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। জমিদার এতে কোনো অন্যায় খুঁজে পান না। তার মতে, ‘ক্ষমা চাইবার মতো কোনো অপরাধ আমি করিনি।’ কিন্তু তার ছেলে সে-কথা মানতে পারেননি। ফলে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গিয়েছিলেন।
স্বাধীনতার অনেক বছর পর দাদা বাড়ি বেড়াতে আসে জমিদার ইরতাজুদ্দিনের দুই নাতনি। একপর্যায়ে বড়ো নাতনি ডা. শাহানা ৭১-এ ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে বলেন দাদাকে। অহংকারী ইরতাজুদ্দিন ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘ইয়াং লেডি, কার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবো? একদল মিলিটারি গানবোট নিয়ে এখানে উঠেছিলো। তাদের এখানে থাকতে দিতে হয়েছে। আমার তো কোনো উপায় ছিল না। তারা যে ভয়াবহ অন্যায়গুলো করবে তা বুঝতে পারিনি। ভুল করেছিলাম। এটা ইচ্ছাকৃত ভুল নয়, অনিচ্ছাকৃত ভুল।’
শাহানা বলেন, ‘ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা যায়, যায় না?’ জমিদার বললেন, ‘না যায় না, ইরতাজুদ্দিন কারও কাছে ক্ষমা চায় না।’ কিন্তু নাতনির কথায় একসময় তিনি ভুল বুঝতে পারেন। ক্ষমতার দম্ভ ভুলে ইরতাজদুদ্দিন গ্রামবাসীর সামনে উপস্থিত হয়ে হাতজোড় করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি খুব বড়ো একটা অন্যায় করেছিলাম, সেই অন্যায়ের জন্য মহান আল্লাহপাকের কাছে, দেশের মানুষের কাছে, আপনাদের সকলের কাছে ক্ষমা চাই। হাতজোড় করে ক্ষমা চাই, হাতজোড় করে ক্ষমা চাই।’
হুমায়ূন আবারও ইরতাজদুদ্দিনকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান নিলেন। চলচ্চিত্রে একজন স্বাধীনতা বিরোধী প্রকাশ্যে দেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইলো। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নিয়মিত চলচ্চিত্রগুলোর গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভে আগে এমনটি দেখা যায়নি বললেই চলে। সাধারণত মুক্তিযোদ্ধা বা জনগণের হাতে এই বিরোধীরা শাস্তি পেয়েছে, না হয় বেঁচে গেছে। ডা. শাহানার মাধ্যমে নতুন এক বার্তা দিলেন হুমায়ূন। শাহানা তার দাদাকে বললেন, ‘বাবার সঙ্গে যা নিয়ে আপনার বিরোধ, সে বিরোধ মেটাবেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আপনি যে ভুল করেছিলেন সে-ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। দেশের কাছে, গ্রামের মানুষের কাছে, সবার কাছে।’ হুমায়ূন নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে নতুন এক পথের দিশা দিলেন স্বাধীনতাবিরোধীদের। তাদের বোঝাতে চাইলেন, ভুল ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃতই হোক, ভুল তো ভুলই। এর জন্য ক্ষমা চাওয়া যায়। নতুন প্রজন্মের দাবিও তাই, এজন্য ক্ষমা চাইতে হবে।
স্বাধীনতার চার দশক পরে এসেও কোনো স্বাধীনতাবিরোধী কিন্তু দাঁড়িয়ে বললেন না, ৭১-এ তার সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো, কিংবা এ-ভুল তার অনিচ্ছাকৃত। অথচ দেখুন, এই সংস্কৃতি চালু হতে পারতো। হুমায়ূন তাই চালু করে দেখালেন। সঙ্গে যোগ করলেন নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকে। বলা হয়, সাহিত্যিকদের আবেগ অনেক বেশি। পক্ষান্তরে একজন পরিচালক হন যুক্তিবাদী। যদিও আবেগের সঙ্গে যুক্তির সমন্বয় হয় না, তারপরও হুমায়ূন তা করার চেষ্টা করলেন। শাহানার আবেগ ও যুক্তির কাছে হার মানলো জমিদার ইরতাজুদ্দিনের যুক্তি। তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চাইলেন।
নৌকায় একটি ‘দেশ’-এর এগিয়ে চলা
একটি নৌকা এগিয়ে চলছে, যেনো একটি দেশ। অনেকগুলো পরিবার, প্রতিটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের। তাদের এ যাত্রা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙ্গার। তারা প্রতিক্ষণে মুখোমুখি হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতার। নৌকার প্রতিটি মানুষ যেনো মুক্তিযোদ্ধা। দেশকে বাঁচাতে তাদের এ সংগ্রাম নিরন্তর। এখানে হিন্দু-মুসলমান নেই, ধনী-গরিব নেই, নেই শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কিংবা নারী-পুরুষের ভেদাভেদ। তাদের এক লক্ষ্য-স্বাধীনতার ‘শ্যামলছায়া’ তীরের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
শ্যামলছায়ার অন্যতম প্রধান চরিত্র মাওলানা। দাড়ি, টুপি, জোব্বা পরা পুরোদস্তুর হুজুর। অনেকটা চলচ্চিত্রের গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের রাজাকারদের মতো। কিন্তু হুমায়ূনের এই মাওলানা উদার, ধর্মভীরু, পরোপকারী, অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল, দেশপ্রেমিক। হুমায়ূন এবারও সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটলেন। গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বাইরে গিয়ে মাওলানাকে নির্মাণ করলেন তিনি। শুধু তাই নয়, মাওলানাকে অসাম্প্রদায়িক করে তুললেন। নৌকার মালিক যখন হিন্দুদের নেমে যেতে বলে, তাদের ধর্মকর্মে বাধা দেয়; তখন মাওলানা বলেন, ‘জনাব, আমরা সবাই গজবের মধ্যে আছি। বিপদে একজন যদি আরেকজনকে সাহায্য না করি আল্লাহ পাক নারাজ হবেন।’
রাজাকাররা যখন হিন্দু বধূ আশালতাকে ধরে নিতে চেয়েছিলো তখন মাওলানাই প্রথম তার প্রতিবাদ করেন। রাজাকার তাকে চুপচাপ আল্লা-খোদার নাম নিতে বললে তিনি বলেন, ‘ভাইগো জিনিসপত্র নিতেছেন নেন। একটা মেয়েকে এভাবে নিতে পারেন না।’ ৪০ বছরে চলচ্চিত্রের গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের এই ‘মাওলানা’রা যখন হিন্দুদের জান-মালের লুটপাটকারী হিসেবে পরিচিত, ঠিক তখন হুমায়ূন দেখালেন-মাওলানা একটি হিন্দু মেয়ের জীবন বাঁচাচ্ছেন।
হুমায়ূন এবার আঘাত করলেন খোদ রাজাকার চরিত্রের ওপর। রাজাকার বললেই আমরা বুঝি ‘ইসলামপন্থী এবং যার চরিত্রে যাবতীয় বদ স্বভাব রয়েছে। এরা একটু বয়স্ক ও সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী-টুপি পরিহিত, এদের মুখে থাকে দাড়ি, অর্থাৎ রাজাকার ও মোল্লা এভাবে সমার্থক হয়ে ওঠে।’১১ কিন্তু হুমায়ূনের রাজাকার চরিত্রে আমরা তার কোনো চিহ্ন পেলাম না। রাজাকারের পোশাক, ভূমিকা, তার বিভিন্ন বদ স্বভাবকে গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বাইরে এনে তিনি উপস্থাপন করলেন। এ-সম্পর্কে ফাহমিদুল হকের কথাটি না বললেই নয়, ‘এ কথা ঠিক, ১৯৭১ সালে রাজাকারেরা কোন না কোন ইসলামপন্থী দলের সদস্য ছিল। কিন্তু তারা সবাই বয়স্ক-টুপি পরিহিত ছিল না। তাদের অনেকেই বয়সে তরুণ ও আমাদের মতই শার্ট-প্যান্ট পরিধান করতো।’১২ কিন্তু ৭১ পরবর্তী সব বাংলা চলচ্চিত্রে রাজাকারদের এভাবেই দেখানো হলো।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটা প্রধান অংশ হলো মানুষ মানুষকে মেরেছে। কিন্তু এটাও পরম সত্য, একাত্তরে মানুষ মানুষকে বাঁচিয়েছে। একজন বিহারিকে বাঙালি বাঁচিয়েছে, একজন বাঙালিকে একজন বিহারি বাঁচিয়েছে। একজন বাঙালি একজন নিরস্ত্র বন্দি পাকিস্তানি সেনাকে বাঁচিয়েছে। একজন পাকিস্তানি একজন বাঙালিকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এই বহুমাত্রিক দিকটি কিন্তু সাধারণত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে প্রথম পর্যায়ে খুব একটা দেখা যায়নি। ১৩ যার প্রতিচ্ছবি আমরা হুমায়ূনের চলচ্চিত্রে দেখতে পাই। রাজাকার কমান্ডার মজিদ যখন ধরা পড়ে, নৌকার মাঝি তাকে প্রথমে পুড়িয়ে ও পরে বস্তায় ভরে পানিতে ফেলে মারতে চায়। মাওলানা তার প্রতিবাদ করে বলেন, ‘অসম্ভব, একজন মানুষকে এভাবে মারতে পারেন না।’ এবং তিনি ও হিন্দু যুবক মিলে তাকে রক্ষা করেন ও ছেড়ে দেন। পরবর্তী সময়ে আরেকটি চেকপোস্টে সেই রাজাকার কমান্ডার মজিদই তাদের বাঁচিয়ে দেন। মজিদ বলেন, ‘আপনেরা যান, আপনেদের কোনো ভয় নাই।’ এই যে নির্মাণ, যেটি প্রচলিত ডিসকোর্সকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে দেয়। গেরিলায় যখন রাজাকারেরা আল্লাহু-আকবার বলে মানুষ জবাই করে, তখন হুমায়ূনের রাজাকার মানুষ বাঁচায়। তিনি রাজাকার চরিত্রে মানবিকতা আরোপ করেন। মজিদের সহকারীরা শিশুদের গায়ে হাত তুললে মজিদ বলেন, ‘এই বাচ্চার গায়ে হাত তুলবি না। এটা আমার পছন্দ না। একটু আদর কইরা দে।’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে এমন চরিত্র প্রথম তুলে ধরলেন হুমায়ূন।
চলচ্চিত্রটিতে আমরা বিভিন্ন ধরনের নারী চরিত্র দেখি। একজন নারী চিকিৎসক রাত্রি, মাওলানার গর্ভবতী স্ত্রী, নবপরিণীতা হিন্দু বধূ আশালতা, তার শাশুড়িসহ আরও কয়েক নারী। এরা সবাই ওই নৌকায় কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধ করেছে। একসময় আশালতা যুদ্ধে অংশ নেয় এবং গুলিবিদ্ধ হয়। হুমায়ূনের আশালতা, ডা. রাত্রিরা স্বীকৃতি পায়নি। তেমনি চাষী নজরুলের ওরা ১১ জন’র মুক্তিযোদ্ধাদের ভাত রান্না করে দেওয়া নারীরা, জয়যাত্রার অন্যের জীবন বাঁচাতে মুখ চেপে রেখে নিজের সন্তানের মৃত্যু ডেকে আনা নারীরাও স্বীকৃতি পায়নি। হুমায়ূন তাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদের যে-চলচ্চিত্র তাতে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে ফুঠে উঠেছে, তিনি গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভের বাইরে এসে প্রচলিত ডিসকোর্সগুলো ভেঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক দিক ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি এসব ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হয়েছেন এমন নয়, তবে তার চেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। একই সঙ্গে তা বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত ইতিহাস জানতে সাহায্য করেছে। এবং তার চলচ্চিত্রে স্বীকৃতি মিলেছে সাধারণের যুদ্ধের। কারণ একথা ঠিক গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া ৭১-এ সব মানুষই যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন কোনো না কোনোভাবে।
একটি সত্য ঘটনা ও একটি প্রশ্ন
একটি সত্য ঘটনা দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। লেখাটি নিয়ে যখন পড়াশুনা করছিলাম তখন একদিন আমাদের কথা হয় বিভাগের এক ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। সে আমাদের একজন মানুষের কথা বলে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী এবং দেশের মুক্তিকামী সাধারণ জনগণ দুপক্ষকেই সাহায্য করেছিলেন। সে বলছিলো, ‘লোকটি ৭১-এ মসজিদের ইমাম ছিলেন। ঈমানদার ও সৎ। যুদ্ধের সময় একদিন বাজার থেকে ফিরছিলেন তিনি। রাস্তায় দেখেন পাকসেনারা কজন বাঙালিকে চোখ বেঁধে গুলি করে মারছে। ভয়ে-ভয়ে তিনি কোনোমতে জায়গাটি পার হচ্ছিলেন, হঠাৎ পিছন থেকে পাকসেনারা বলে, ‘হল্ট, ইধার আও’। এরপর তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে তারা। তিনি ভালো উর্দু বলতে পারতেন। ফলে সে-যাত্রায় বেঁচে যান। কিন্তু পাকবাহিনী তাকে চিনে রাখে। পরবর্তী সময়ে তারা ওই এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করতে গেলে ডাক পড়ে সেই ইমাম সাহেবের। ইমাম সাহেবের কাজ ছিলো তাদের রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া। এভাবে পাকবাহিনীকে বিভিন্নভাবে তিনি সহায়তা দিতে থাকেন।
একসময় এমন হয়-পাকবাহিনী কোন্ গ্রাম পুড়িয়ে দেবে বা কোথায় কোন্ অপকর্ম করবে তার সমস্ত পরিকল্পনা ইমামের সামনেই করতে থাকে। ইমাম সাহেব সেই সুযোগ নেন। বাড়িতে ফিরে গ্রামের অন্য লোকদের তিনি ওইসব গ্রামে পাঠিয়ে আগেই পাকবাহিনীর হামলার খবর পাঠাতে থাকেন। তাদের সতর্ক করতে থাকেন আসন্ন বিপদ সম্পর্কে। এতে করে পাকবাহিনীর হাত থেকে বেঁচে যেতে থাকে এলাকার মানুষ। এভাবে পাকবাহিনী ও দেশের মানুষ উভয়কেই সাহায্য করেছেন তিনি।’ সে বলতে থাকে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাকে রাজাকার বলে তার শাস্তির জন্য অনেকেই কথা বলেছে। কিন্তু সেইসব গ্রামের মানুষ যারা তার থেকে উপকার পেয়েছিলো তারা তাকে রক্ষা করে এবং বলে তিনি আমাদের বাঁচিয়েছেন। তিনি তো পাকবাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন জীবনের ভয়ে। পরিবার পরিজনকে বাঁচানোর জন্য।’ আমরা তাকে বললাম এতো কথা তুমি কীভাবে জানো? সে বললো, ‘ভাই, তিনি আমার বাবা।’ মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তার কথাগুলো। একসময় সে হঠাৎ করে প্রশ্ন করলো, ‘তাকে আপনি কি বলবেন ভাই? রাজাকার না মুক্তিযোদ্ধা?’ আমরা অস্বস্তিতে পড়লাম। সত্যিইতো তাকে আমরা কী বলবো? আমরা এর উত্তর না জানলেও হুমায়ূন ঠিকই এর উত্তর দিয়েছেন তার চলচ্চিত্রে। এই উত্তর শুধু আমাদের নয়, নতুন প্রজন্মকেও ভাবতে শেখাবে।
লেখক : মাজিদ মিঠু ও মোহাম্মদ আলী মানিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
mazid.mithu@gmail.com
manikmcjru@gmail.com
তথ্য সূত্র
১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৮ : ৪১৮); ‘যাত্রা’; সঞ্চয়িতা; আজকাল প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।
২. গুহ, রণজিৎ (২০০৪ : ২২-২৩); ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদক-গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩. প্রাগুক্ত; গুহ, রণজিৎ (২০০৪ : ২২-২৩)।
৪. হল, স্টুয়ার্ট (২০০৭ : ০৯); ‘রেপ্রিজেন্টেশন’; অনুবাদ-হক, ফাহমিদুল; যোগাযোগ; সম্পাদক-ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; সংখ্যা-৮, ঢাকা।
৫. হক, ফাহমিদুল (২০১১ : ৩৯-৪০); রেপ্রিজেন্টেশন, প্যারিস ম্যাচ ও ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’; অসম্মতি উৎপাদন; সংহতি প্রকাশন, ঢাকা।
৬. হক, ফাহমিদুল, ‘মেহেরজান বিনির্মাণের বিপত্তি ও জাতীয়তাবাদী আবেগ’; প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি, ২০১১।
৭. প্রাগুক্ত; হক, ফাহমিদুল; প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি ২০১১।
৮. গায়েন, কাবেরী (২০১১ : ১০৬); ‘গেরিলা সেলুলয়েডে মুক্তিযোদ্ধা নারীর প্রথম স্বীকৃতি’; শিল্প ও শিল্পী; সম্পাদক-আবুল হাসনাত; প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ঢাকা।
৯. মাযহার, আহমদ; ‘মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র’ অনলাইন সংবাদ সংস্থা-bdnews24.com এর সাহিত্য বিভাগ ‘আর্টস’ থেকে নেওয়া, ২৭ মার্চ, ২০০৯।
১০. হোসেন, রুবাইয়াত (২০১১ : ৪৫); ‘চলচ্চিত্র মেহেরজান যা বলতে চেয়েছে’; মিডিয়াওয়াচ; ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-খালেদ মুহিউদ্দীন; সংখ্যা-৭, ঢাকা।
১১. প্রাগুক্ত; হক, ফাহমিদুল; প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি, ২০১১।
১২. প্রাগুক্ত; হক, ফাহমিদুল; প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি, ২০১১।
১৩. মাসুদ, তারেক (২০১২ : ১৬৬); ‘মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র: ব্যতিক্রম ও বিতর্ক’; চলচ্চিত্রযাত্রা; প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১২ সালের জুলাইয়ে ম্যাজিক লণ্ঠনের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন