জাহিদুল ইসলাম জন
প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
রাজকীয় আইটেম সঙ, দৈন্য চলচ্চিত্র
জাহিদুল ইসলাম জন

ব্যবহৃত নানা জিনিসের সঙ্গে নিলামে তোলা হবে একটি স্কার্ট। অন্য জিনিসগুলো নিয়ে আগ্রহ থাকুক আর না-ই থাকুক স্কার্ট নিয়ে ধুন্ধুমার লাগবে-এমনটাই ধারণা নিলামকারীদের। তাদের প্রত্যাশা, বেশ ভালো দামে বিক্রিও হবে সেটি। নিলামের আগেই এই টাকা কীভাবে খরচ হবে তারও সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। নিলামকারীরা বলছেন, বিতর্ক (!) এড়াতে বিক্রিত অর্থ দান করা হবে মানবতার সেবায়। দৈনিক কালের কণ্ঠ ১৯ এপ্রিল ২০১১ তারিখে প্রকাশিত একটি খবর এটি। দম মারো দম এর ছবি
স্বভাবতই প্রশ্ন আসে কী এমন স্কার্ট এটি? আর তা নিয়ে এত আলোচনাই বা কেন? না, এটি কোন ফ্যাশন হাউজের সদ্য তৈরি দামি স্কার্ট নয়। কিংবা এটি ব্যবহৃত হয় নি ঐতিহাসিক কোনো কাজে। এটি একটি হিন্দি সিনেমার বিশেষ গানে নায়িকার ব্যবহৃত স্কার্ট। হাল আমলে ওই বিশেষ ধরনের গানকে অবশ্য চলচ্চিত্র বোদ্ধারা আইটেম সঙ বলে ডাকছেন। তবে এসব কারণে কেউ যদি ওই স্কার্টটির ঐতিহাসিক মূল্য(!) খুঁজে পান তাহলে অবশ্য বলার কিছু নেই।
তবে বর্তমান সময়ে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল কিংবা পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলে বা তরুণদের আলোচনায় একটু কান দিলে শুধু স্কার্ট নয়, আইটেম সঙ নিয়ে এরকম আরও নানা আলোচনা পাওয়া যায়। অবস্থা খানিকটা এরকম দাঁড়িয়েছে যে, ভারতীয় ছবির কথা আসলেই অবধারিতভাবে আসছে আইটেম সঙ-এর কথা। যেন ভারতীয় ছবির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে এটি। সদ্য মুক্তি পাওয়া নতুন কোনো সিনেমা নিয়ে দর্শকের মাথা-ব্যাথা না থাকলেও আইটেম সঙ নিয়ে মাতামাতি চোখে পড়ার মতো।
তাহলে কী এমন আছে এই আইটেম সঙে যে কারণে, ধ্রুপদী সঙ্গীতের তীর্থস্থান ও বিশাল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দেশ ভারতে বর্তমানে এটি প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠল? এরকম নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা থেকেই বর্তমান লেখাটি।
১.
ভারতীয় মূলধারার সিনেমা বলতে আমরা প্রধানত মুম্বাইয়ে নির্মিত সিনেমাকেই বুঝে থাকি। যাকে হাল-আমলে হলিউডের অনুকরণে বলিউড নামে ডাকা হয়। এই বলিউডি সিনেমার শুরুর দিকে গান ব্যবহার করা হয়েছে কখনও কাহিনীর প্রয়োজনে আবার কখনো দর্শকদের একটানা ছবি দেখার ক্লান্তি দূর করতে। লৌকিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে নির্মিত এসব সিনেমাগুলোতে বেশিরভাগ সময় গল্প বলার প্রয়োজনেই গান ব্যবহার করা হতো। নায়ক-নায়িকার প্রেম, বিরহ এসব বিষয় ছিল সিনেমার গানের মূল উপজীব্য। সেই সময়ে সিনেমায় ব্যবহৃত অনেক গানই সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের গান ভারতীয় সিনেমায় যে একেবারেই হচ্ছে না তা বলা ঠিক হবে না। এখনও হয়ত মাঝে মধ্যেই ভারতীয় সুরস্রষ্টারা অস্কার পান, দর্শক হৃদয়ে দাগ কাটেন। কিন্তু এ সবকিছুকে ছাপিয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তা হল আইটেম সঙ।
এখন প্রশ্ন, আইটেম সঙ্ আসলে কী? এ সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য উইকিপিডিয়া ঘেটে যা পাওয়া যায় তার সারমর্ম এমন- আইটেম সঙ হলো ভারতীয় সিনেমায় এক ধরনের সঙ্গীতনির্ভর উপস্থাপনা, যার সাথে দৃশ্যত সিনেমার কাহিনীর সংযোগ খুব কমই থাকে। এর বিপরীতে এসব গানের কথায় থাকে চটুলতা, আর অভিনেতা-অভিনেত্রীর শরীরে খোলামেলা পোশাক। উপস্থাপন কৌশলেই অপ্রাসঙ্গিকভাবেই সেখানে চলে আসে যৌনতা। সাধারণত এ ধারার গান কোনো সিনেমাকে ব্যবসায়িকভাবে সফল করতে সহায়তা করে। এ কারণেই নির্মাতারা এ গান নির্মাণে উৎসাহী হয়ে থাকেন।
২.
ভারতীয় সিনেমায় আইটেম সঙ নামে বিশেষ ধারার এ গানের প্রচলন যে হঠাৎই শুরু হয়েছে এমন নয়। এর ইতিহাস খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ১৯৪০ এর দশকে। সেসময় নির্মাতারা সিনেমার গতানুগতিক সব কাহিনী ও গানের বাইরে গিয়ে দর্শকদের একটু ভিন্ন ধরনের বিনোদন দেওয়ার কথা ভাবলেন। আর সে চিন্তা থেকেই আইটেম সঙের শুরু। তবে সে সময় বিশেষ ধরনের এ গানে পারফর্ম করার জন্য অভিনেতা-অভিনেত্রী পাওয়া সহজ ছিল না। তখন সাধারণ
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বাইরে এ ধরনের পারফরম্যান্সের জন্য বিশেষ ধরনের অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রয়োজন হয়ে পড়ল। তাদের জন্য সিনেমায় সৃষ্টি করা হলো নতুন ধরনের চরিত্র। যাদেরকে প্রচলিত ভাষায় বলা হলো ভ্যাম্প (vamp)| এসব চরিত্রের মূল কাজ ছিল সিনেমার খলনায়কের আস্তানায়, মদের দোকানে, পতিতালয়ে, ক্যাবারে যৌনাবেদনময়ী অঙ্গভঙ্গির উপস্থাপনে নাচ করা।
প্রথম দিককার ভ্যাম্প চরিত্রে পারফরমারদের অনুসন্ধান করলে যে কয়েক জনের নাম পাওয়া যায় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কাক্কা ও হেলেন। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে এবং ৫০এর দশকের গোড়ার দিকে কাক্কার আবির্ভাব ঘটে আইটেম গার্ল হিসেবে। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এ অভিনেত্রী প্রথম জীবন কাটিয়েছেন চরম অর্থকষ্টে। শুরুতে তিনি আইটেম গার্ল হিসেবে অভিনয় করেন আন ও শাবিস্তান ছবিতে। এরই ধারাবাহিকতায় অচিরেই তিনি কাটিয়ে উঠতে থাকেন অর্থকষ্ট। সঙ্গে খ্যাতি পান রাবার গার্ল১ হিসেবে। খ্যাতি ছাপিয়ে অর্থ-উপার্জনকেই যে কাক্কা বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় পারিবারিক বন্ধু হেলেনকে এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করতে দেখে।
(কাক্কা ও হেলেনের ছবি ইনসার্ট কর)
হেলেনের বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা যাবার পর তার সেবিকা মা বার্মা থেকে মুম্বাই এসেছিলেন জীবিকার তাগিদে। কিন্তু এতে পরিবারটির চরম অর্থকষ্টের কোনো সুরাহা হলো না। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে তাই এর অনেকখানি দায় বর্তায় ১৩ বছরের হেলেনের ওপর। অনেকটা নিরুপায় হয়েই হেলেন ভ্যাম্প হিসেবে কাক্কার সঙ্গে প্রথম পারফর্ম করেন শাবিস্তান সিনেমায়। প্রথম দিকে হেলেন দলীয় নাচে পারফর্ম করলেও ১৯৫৪ সালে আলিফ লায়লা ছবিতে তাকে দেখা যায় এককভাবে। এরপরে একটা দীর্ঘ সময় হিন্দি ছবিতে আইটেম গার্ল হিসেবে একক আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন হেলেন জয়রাগ রিচার্ডসন।
হাওড়া ব্রীজ ছবিতে মেরে নাম চিন চিন চু, বোম্বে টকি ছবিতে টিপ টিপ টিপ, ১৯৭৮ সালে অমিতাভ বচ্চনের সাথে ডন ছবিতে ইয়ে মেরে দিলসহ অসংখ্য গান শুধু হেলেনের নাচের কারণে দর্শকদের ব্যাপকভাবে মোহবিষ্ট করেছিল। ৭০ এর দশকে এসে অবশ্য হেলেনের একক আধিপত্যে ভাগ বসাতে শুরু করেন পারভীন ববি, জিনাত আমান, অরুনা ইরানী, বিন্দু, পদ্মা খান্না প্রমুখ। এদের সবাই মূলত আইটেম গার্ল হিসেবে হিন্দি ছবিতে পারফর্ম করেছেন। তবে জিনাত আমান ও পারভীন ববি কয়েকটি ছবিতে পার্শ্ব-নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করলেও মূলত এরা ছিলেন আইটেম গার্ল।
৩.
মূলধারার প্রতিষ্ঠিত নায়িকাদের মধ্যে আইটেম সঙ-এ প্রথম পারফর্ম করেন মাধুরী দীক্ষিত।২ ১৯৮৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তেজাব ছবিতে এক দো তিন শিরোনামের গানে পারফর্ম করার মধ্য দিয়ে এ যাত্রার শুরু। এর কয়েক বছর পরেই খলনায়ক (১৯৯২) ছবিতে চলিকে পিছে কিয়্যা হ্যায় (What's beneath the blouse) গানে পারফর্ম করেন তিনি। এ গান শুধু তাকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনে নি বরং খলনায়ক ছবির ব্যবসা বাড়িয়ে দিয়েছিল কয়েকগুণ। অত্যন্ত চটুল কথা ও নাচে ভরপুর এ গান নিষিদ্ধ করার জন্য সেসময় ভারতে জোর দাবি উঠেছিল। এমনকি এ গান নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল ভারতীয় পার্লামেন্টে। শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ না হলেও মাধুরীর নাচের মধু উপভোগ করতে দর্শক কয়েকবার করেই ছবিটি দেখতে সিনেমা হলে গিয়েছিলেন। আর তার বদৌলতেই ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল প্রযোজকের লাভের অংক।
মাধুরী দীক্ষিতের এই সাফল্য সেই সময়েই কারিশমা কাপুর, রাভিনা ট্যান্ডন, সোনালী বেন্দ্রের মত প্রতিষ্ঠিত নায়িকাদের আইটেম সঙে পারফর্ম করতে উৎসাহিত করে। এর কিছুদিন পর ঐশ্বরিয়া রাই, সুস্মিতা সেনরাও যোগ দেন এই দলে। আর হাল-আমলে এসে যুক্ত হয়েছেন ক্যাটরিনা কাইফ, মল্লিকা শেরওয়াতরা। অন্যদিকে কাক্কা, হেলেনের উত্তরসূরি হিসেবে শুধু আইটেম গানে পারফর্ম করার জন্যই এসেছেন মালাইকা অরোরা, ইয়ানা গুপ্তারা।
৪.
২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দাবাং ছবির মুন্নি বদনাম হুয়ি তে পারফর্ম করে মালাইকা অরোরা শুধু হিন্দি ছবিতে নয় সারা ভারতে, এমনকি ভারতের বাইরেও ঝড় তোলেন। যে কারণে গত (২০১০) থার্টি ফার্স্ট নাইটে স্টেজ পারফর্মের জন্য তিনি হেঁকেছিলেন বিশাল অংকের পারিশ্রমিক। আর অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এই গানের স্টেজ পারফর্মের সময় এক সাথে বারো শতাধিক দর্শককে একটানা তিন মিনিট নাচিয়ে নিজে নাম লেখান গিনেস বুকে।৩ মুন্নি বদনাম হুয়ির রেশ কাটতে না কাটতেই ক্যাটরিনা কাইফ হাজির হন শিলাকি জোয়ানি নিয়ে। তিসমার খান ছবিটি কত জন দর্শক দেখেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শিলাকি জোয়ানি গান শোনেন নি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দায়। এমনকি তরুণ সমাজে তো এ গান না শুনলে নিজেকে আপডেট (!)পর্যন্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না।৪
আরও সামপ্রতিক খবর হচ্ছে আইটেম গানে পারফর্ম করা নিয়ে ভারতের অভিনেত্রীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নীরব যুদ্ধ। বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন অনেকেই। বিপাশা নাকি ইয়ানা গুপ্তা, প্রযোজক কোন ছবিতে কাকে নেবেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে টানাটানি। অন্যদিকে দীপিকা পাডুকোন রিমিক্স দম মারো দম গানে জিনাত আমানকে ছাড়িয়ে যেতে পারছেন কি না তা নিয়েও চলছে তুমুল তর্ক। এমনি আরও নানা কৌশলে দর্শক এতে আকর্ষিত হচ্ছেন কিংবা তাদের আকর্ষিত করা হচ্ছে। আর এতে বাড়ছে প্রযোজকের ব্যবসা।
৫.
এখন প্রশ্ন ওঠে, কেন এই আইটেম সঙ? গত কয়েক দশকে আইটেম সঙ-নির্ভর সিনেমাগুলো বলিউডে বেশ ভালো অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসার দিক দিয়ে এ সিনেমাগুলো যেমন ইতিবাচক, পাশাপাশি জনপ্রিয়তাও পেয়েছেন এর পাত্র-পাত্রীরা। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বলিউডের বর্তমান ছবিগুলোতে আইটেম সঙ উপস্থাপনার কৌশল ও প্রয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে কোনো ছবিতে আইটেম সঙ না থাকাটা যেন অস্বাভাবিক| পরিচালকদের কাছে প্রযোজকদের প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে আপনি যে ছবি বানাতে চান, তাতে কি আইটেম সঙ আছে? কারণ প্রযোজক বা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকা ফিরে পাবার নিশ্চয়তা দিচ্ছে এটি।
বিনিয়োগ কম হলেও বর্তনে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে ভারতে। ২০০৪ সালের এক জরিপে৫ দেখা যায়, ভারত সে বছর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ৯৪৬টি সিনেমা মুক্তি দিয়েছে। দর্শক সংখ্যার দিক দিয়েও ভারতে চলচ্চিত্রের বৃহৎ বাজার। প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার চারশ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক সিনেমা হলে যাচ্ছেন। তবে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ঠিক কত জন আইটেম সঙ দেখার জন্য সিনেমা হলে যান তার হিসাব বা কোনো জরিপ পাওয়া যায় নি। তবে এ সংখ্যাটা যে খুব অল্প নয় তা উপরের আলোচনা থেকে পরিস্কার বোঝা যায়। কিন্তু একটা বিষয় আশ্চর্যজনক, সবকিছুর পরও ভারতে চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ কিন্তু কম। চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় ভারত নেই। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশ।৬ তাহলে কি অল্প বিনিয়োগে বিপুল দর্শক টানার জন্য ছবি ঘিরে এত খোলামেলা আইটেম সঙ? প্্রশ্নটা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে বলে মনে হয়।
ভারতীয় চলচ্চিত্রে আইটেম সঙের বয়স প্রায় ৭০ বছর হতে চলল। শুরু থেকেই এ নিয়ে কম-বেশি আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এটি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরত্ব পাচ্ছে । স্ববাবতই প্রশ্ন আসে, আইটেম সঙের এত গুরুত্ব কেন? আর পরিচালকরা, অভিনেত্রীরাই কেন মুখিয়ে আছেন এর দিকে? যদি উত্তর হয় ব্যবসার জন্য। সেক্ষেত্রে উল্টো প্রশ্নও আসা অস্বাভাবিক নয় যে, তাহলে কি আইটেম সঙ-বর্জিত সিনেমা ব্যবসা করছে না? হ্যাঁ, তাও করছে (এ সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত আলোচনা লেখাটির পরের অংশে রয়েছে)।
পরিচালকদের পক্ষ থেকে সিনেমায় আইটেম সঙের অপরিহার্যতার কারণ হিসেবে যুক্তি হয়তো এমন- দর্শকদের সিনেমা হলে নিয়ে আসতে হবে। তাইতো এত আয়োজন। কিন্তু সৃষ্টিশীল মনন যখন অনুপস্থিত, যখন কেবল নারীর শরীর উপজীব্য, তখন আইটেম সঙের বাইরে আর কোনো পথ তাদের সামনে খোলা থাকছে না। তাইতো গানের সস্তা কথার সাথে শরীর দেখানো উদ্দামতাকেই আঁকড়ে ধরছেন পরিচালক-প্রযোজকরা। সিনেমার এত বিশালতায় মাথা ঘামানোর বদলে ওই পাঁচ-সাত মিনিটেই মনযোগী হচ্ছেন তারা। আর দর্শকদের তো ভিরমি লাগার জোগাড়! তারা উদ্দীপ্ত হচ্ছেন, অভিনেত্রীর শরীর নেশাগ্রস্তের মতো বারবার তাদের নিয়ে যাচ্ছে সিনেমা হলে। এক চোলি ক্যা পিছে কিয়া গানটির জন্যই দর্শক খলনায়ক সিনেমা দেখতে বারবার ছুটে গেছেন সিনেমা হলে।
এখন অবশ্য সময় বদলেছে, প্রযুক্তির বিকাশ হয়ত তাৎপর্য কমিয়ে দিয়েছে সিনেমা হলের। কিন্তু তার বদলে স্থান করে নিয়েছে ড্রয়িং রুমের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো। তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপ রুখবে, কার সাধ্য? তাই আইটেম সঙের আকর্ষণে দর্শক ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকছেন টিভি সেটের সামনে। একই গান বারবার প্রচারিত হচ্ছে, বাড়ছে পণ্যের বেঁচাকেনা। সেইসাথে বাড়ছে চ্যানেলের দাম। এর ফলে সুযোগও নিচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলো। আর তাইতো সুযোগ বুঝে এমন সাহসী কথা বলছেন- ভারতের সিনেমা শিল্পকে তারাই (স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল) নাকি বাঁচিয়ে রেখেছেন।৭
এর কারণও আছে, ভারতে গত এক দশকে চলচ্চিত্রের চেয়ে টিভি চ্যানেলের বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে বেড়ে গেছে। গত দশ বছরে টেলিভিশন শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি রুপি। যেখানে চলচ্চিত্রে বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি রুপি।৮ আর বিনিয়োগের এই আধিক্য টেলিভিশন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে তৈরি করেছে এ ধরনের উন্মাসিক মনোভাবের। যার বদৌলতেই হয়ত তারা বলতে পারছেন ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পকে তারাই টিকিয়ে রেখেছেন।
৬.
পাঠক একটু তলিয়ে দেখা যাক, কীভাবে টিভি চ্যানেলগুলো টিকিয়ে রাখছে চলচ্চিত্র শিল্পকে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে মূলত সঙ্গীতনির্ভর চ্যানেলগুলোই জোর গলায় এ দাবি করছে। কারণ এ চ্যানেলগুলোর আধেয়ই হল মুক্তি প্রতীক্ষিত অথবা সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত ছবির মিউজিক সত্ত্ব কিনে নিয়ে তা বারবার দেখানো। যার মধ্যে মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইটেম সঙ। আর এই আইটেম সঙ দেখতেই দর্শক চোখ রাখছেন, হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন নাইনএক্সএম, জিঙ্ক, এমটিভি, ইটিসি ইত্যাদির পর্দায়। এতে বাড়ছে তাদের বিজ্ঞাপনের দাম। সেই সাথে দাম বাড়ছে চ্যানেলের। আর তাতেই চ্যানেলগুলোর এই স্পর্ধা। কিন্তু প্রশ্ন হলো এসব করে শিল্প মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের কি আদৌ কোন উন্নতি ঘটছে?
এবার চ্যানেলগুলোতে প্রদর্শিত সিনেমাগুলোর বিষয়ে কিছু কথা বলা যাক। সাধারণত ভারতীয় সিনেমাগুলো মুক্তি পাওয়ার দুই-তিন মাসের মধ্যে যা আয় করার করে ফেলে। তারপর হয়ত সেই সিনেমাটি প্রদর্শনের জন্য কিনে নেয় কোনো টিভি চ্যানেল। আর তাতে প্রযোজক খুব বেশি আর্থিকভাবে লাভবান হয় না। বরং টেলিভিশনে গান বিক্রি করেই প্রযোজকের মূল টাকাটা আসে। ফলে তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে আইটেম সঙ। আর তাই প্রযোজকরা বেশি আগ্রহী থাকেন আইটেম সঙের বিষয়ে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইনডোরে শুটিং হওয়া এসব গানে খরচ অপেক্ষাকৃত কম হয়। ফলে পুরো ছবির নির্মাণেও খরচ কমে, বাড়ে ব্যবসা। আর জনপ্রিয়তা? সেও আসে। এতগুলো ফলাফল যখন হাতের মুঠোয়, তখন খামোখা শিল্প শিল্প করে এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন আছে কি?
৭.
এবার দেখার চেষ্টা করা যাক, সিনেমার কাহিনীর সঙ্গে আইটেম সঙ কতটুকু সংগতিপূর্ণ? সিনেমার কোন পর্যায়ে এসে এধরনের গান ব্যবহার করা হয়? প্রথমেই দেখি শিলাকি জোয়ানি শিরোনামের গানটি তিসমার খান সিনেমার কাহিনীর কোন পর্যায়ে এসে ব্যবহার করা হয়েছে।
কাহিনীটি এরকম, ভারতের কিছু পুরাকীর্তি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়া হবে। কিন্তু তার নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত ভারতীয় পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে তিনজন চোর এটি চুরি করার ক্ষমতা রাখে। তার মধ্যে দুইজন ইতিমধ্যে পুলিশ হেফাজতে চলে এসেছে। বাকি আছে শুধু তিসমার খান। তাকে গ্রেপ্তার করার কৌশল ঠিক করতে বসেছে উচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের বৈঠক। এরই মধ্যে প্যারিস থেকে খবর আসে সেখানে তিসমার খান গ্রেপ্তার হয়েছে। বৈঠক থেকেই বলা হয়, তাকে ভারতে নিয়ে আসা হোক। দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা তিসমার খানকে নিয়ে প্লেনে করে রওনা দেয় প্যারিস থেকে। কিন্তু প্লেন ভারতে পৌঁছাবার পূর্বেই পুলিশ কর্মকর্তাদের ফাঁকি দেয় তিসমার খান। সেখান থেকে সে তার বান্ধবী আনিয়ার সাথে দেখা করার জন্য মুম্বাইয়ের একটা স্টুডিওতে যায়। কারণ নায়িকা হবার তীব্র ইচ্ছায় তখন সেখানে সে ব্যস্ত। এ পর্যন্ত কাহিনীতে এসে দেখা যায় আনিয়া আইটেম গানের মহড়া দিচ্ছে। আর এখানে যে গানটি দেখানো হয় তাই বক্স অফিস হিট করা গান শিলাকি জোয়ানি। এখন প্রশ্ন হলো যদি গানের মহড়াই দেখানো গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে তা দেখাতে ৫-৬ মিনিট ধরে উদ্দাম নাচ দেখনোর দরকার ছিল না। বরং এক দেড় মিনিটের মধ্যেই তা দেখানো সম্ভব। আর নায়িকা হতে চাওয়া কাউকে দেখাতে আইটেম গানের মাধ্যমেই কেন দেখাতে হবে? পুরো গান দেখানোতে গল্পের প্রয়োজন এখানে কতটুকু? আসলে প্রয়োজন গল্পের না বরং কোনো রকমে গোজামিল দিয়ে একটা আইটেম গান সিনেমায় ঢোকানো। আর তা দিয়ে দর্শককে টেনে এনে নিজের লাভের অংক বুঝে নেয়া।
এবারে দেখি আলোচিত দাবাং ছবিতে মুন্নি বদনাম হুয়ির যৌক্তিকতা কতটুকু। দাবাং সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয়েছে চুলবুল পান্ডে নামে এক বিকৃত চরিত্রের পুলিশ অফিসারকে কেন্দ্র করে। যিনি ব্যাংক ডাকাতির টাকা উদ্ধার করে আনেন ঠিকই কিন্তু সরকারি কোষাগারে জমা দেন না। বরং তা নিজের মায়ের কাছে জমা রাখেন। আর উদ্ধারের কৃতিত্ব দেখিয়ে কনস্টেবল প্রমোশন দাবি করলে তাকে নিজে গুলি করে আহত করে প্রমোশন পাবার ব্যবস্থা করে দেন। এমন এক পুলিশ অফিসার একবার জানতে পারেন, একটি বার এর মদ খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। পুলিশ অফিসার সেখানে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। বারে তখন ভিলেন এর দল মুন্নি বদনাম হুয়ির সাথে নেচে চলেছে। পুলিশ অফিসার সেখানে পৌঁছে নিজেই গানের সাথে নাচা শুরু করেন। আমার এ আলোচনার শুরুতে কোনো সিনেমায় আইটেম সঙ এর অবস্থান সংক্রান্ত যে আলোচনা করেছি তার সঙ্গে এটা পুরোপুরি মিলে যায়।
খলনায়ক সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। বহুল আলোচিত এই সিনেমায় ব্যবহার করা হয় চোলি কি পিছে কিয়্যা হ্যায় আইটেম সঙটি। ছবিটি নির্মিত একজন বিপথগামী তরুণ বিল্লু বলরামকে নিয়ে। সন্ত্রাসী বিল্লু জেলখানায় বন্দী। প্রতিশ্রুতিশীল পুলিশ কর্মকর্তা রাম কুমার ভার্মা তার মামলা পরিচালনা করছে। রামের প্রেমিকা আরেক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর গঙ্গা। একদিন গঙ্গার সাথে রাম দেখা করতে গেলে, জেল থেকে পালিয়ে যায় বিল্লু। সংবাদ-কর্মীরা এ বিষয়ে রামকে দোষারোপ করতে থাকে। তাকে এ দোষারোপের হাত থেকে বাঁচাতে গঙ্গা নিজেই গ্রেপ্তার করতে যায় বিল্লুকে। এদিকে বিল্লু পালিয়ে গিয়ে এক নেতার বাগান-বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করে। গঙ্গা ওই বাগান বাড়িতে নাচতে যায় বাইজি চম্পা দিদির সহায়তায়। এবং এই নাচই হয়ে যায় ভারতীয় সিনেমা ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত নাচ। এ পর্যন্ত কাহিনী শুনে মনে হতে পারে ঠিকই তো আছে, কাহিনীর প্রয়োজনেই তো এখানে গান ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করি তাহলে দেখা যাবে কাহিনীর প্রয়োজনে নাকি, গান ব্যবহার করতে হবে বলেই কাহিনীটি এভাবে সাজানো হয়েছে? অন্য আলোচনায় না গিয়ে যদি সাধারণভাবে প্রশ্ন করি, বিল্লুর সাথে গঙ্গার দেখা হওয়ার আর কি কোন উপায় ছিল না? সিনেমায় শেষ পর্যন্ত কিন্তু গঙ্গা বিল্লুকে গ্রেফতার করতে পারে নি বা গ্রেফতারে সহায়তাও করতে পারে নি। বরং একবার সে বিল্লুকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। (তখন তার মধ্যে সে নাকি মনুষত্ব দেখতে পেয়েছিল!) তাহলে গঙ্গার সেখানে যাবার প্রয়োজনটা কী? শুধুই কি রামের প্রতি তার ভালবাসা দেখানোর জন্য? নাকি সেই আইটেম সঙ?
ফির মিলেঙ্গি চলতে চলতে আইটেম সঙটি আছে রবনে বানাদে জোড়ি (২০০৮) সিনেমায়। পরিচালক আদিত্য চোপড়া এই গানে শাহরুখ খানের সাথে নাচার জন্য হাজির করেন কাজল, বিপাশা বসু, লারা দত্ত, প্রীতি জিন্তা, রানী মুখার্জিদেরকে। সাধারণ এক ছা-পোষা মানুষ সুরিন্দর (শাহরুখ খান)। ঘটনাক্রমে বিয়ে করেন নিজের শিক্ষকের আধুনিক ছটফটে মেয়ে তানিকে। তানিকে সুরিন্দর ভালবাসে, কিন্তু তানি ভালবাসতে পারে না একেবারে সাধারণ সুরিন্দরকে। সুরিন্দর তানিকে নাচের স্কুলে ভর্র্তি হবার অনুমতি দেয়, তাকে নিয়ে মাঝে-মধ্যে সিনেমাও দেখতে যায়। তাতেও না হলে একসময় আধুনিক যুবক রাজ সেজে তানির নাচের স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে তানির সাথে জুটি বেঁধে নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবার জন্য অনুশীলন করতে থাকে। মজার মজার কথা বলতে থাকা রাজকে একসময় পছন্দ করতে শুরু করে তানি। এমনি অবস্থায় সুরিন্দরের সাথে সিনেমা দেখার সময় পর্দায় রাজকে কল্পনা করতে থাকে তানি। আর পর্দায় হাজির হয় বলিউড রোমান্স স্টাইলে (রাজের ভাষ্যমতে) রাজ। একে একে আসতে থাকে নায়িকারা আর রাজ প্রত্যেকের সাথে রোমান্স করতে থাকে।
সিনেমার সাথে আইটেম সঙের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা বাড়ালেও এই অসামঞ্জস্যতার বাইরে আর কিছুই পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। প্রায় সবকটিতেই দেখা যাবে কাহিনীকে যেকোনভাবে ঘুরিয়ে আইটেম সঙের দিকে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা। মোটামুটিভাবে সিনেমায় আইটেম সঙ ব্যবহারের প্রবণতা এরকমই।
৮.
পাঠক এবার আসুন দেখার চেষ্টা করি একটি আইটেম সঙে আসলে কী থাকে? কী নিয়ে এত ব্যবসা, এত মাতামাতি করছেন নির্মাতারা? শিলাকি জোয়ানি গানটি সামপ্রতিক সময়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে । যা দেখে বিপুল দর্শকের মাথা খারাপ হবার জোগাড়। এ পর্বে ওই গানটির দৃশ্যায়নের একটি ব্যবচ্ছেদ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ধারণা করছি, এ থেকে আপনারা অন্যান্য আইটেম সঙ সম্পর্কেও সম্যক ধারণা পাবেন। শিলাকি জোয়ানি গানটির শৈল্পিক মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন এ আলোচনায় তুলছি না। আমাদের আলোচনা মূলত অন্য জায়গায়।
ফারাহ্ খান পরিচালিত তিসমার খান নামে সিনেমায় শিলাকি জোয়ানি শিরোনামের গানে অভিনয় করেছেন ক্যাটরিনা কাইফ ও অক্ষয় কুমার।
প্রথম দৃশ্য, বিছানায় আধ-শোয়া শিলা। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত। অস্থির ভাব। অবিন্যস্ত একখন্ড কাপড় যা সামলাতেই বুকের উপর রাখতে হয়েছে বাম হাত। যেন শয্যাসঙ্গীর ব্যাকুলতায় কাতর সে। এ দেখে পরিচালক নিজেই ধরে রাখতে পারছেন না নিজেকে। বুকে হাত ঘষছেন ক্রমাগত। বিছানার চারপাশ ঘিরে উঠে আসে একদল পুরুষ, চাহনিতে কামনার প্রকাশ। শিলা দুলছে, তারা এগুচ্ছে; শিলা দুলছে, তারা পিছাচ্ছে। শিলার অভিব্যক্তির আহ্বানেই সঙ্গীদের গতি নির্দিষ্ট। উত্তেজনায় পরিচালক খুলে ফেললেন সানগ্লাস, ছুড়ে দিলেন ফ্লাইং কিস।
দ্বিতীয় দৃশ্য, মঞ্চে জ্বলছে আগুন, তার সামনে শিলা। তার বুক ও কোমরের সর্বোচ্চ ব্যবহারে শরীরের সমতল অসমতলতায় নিজের হাতের সঞ্চারণেই নিয়ে যাচ্ছেন দর্শকের চোখ। উত্তেজনায় এমনই অবস্থা যে শিলা ভুলেই গেছে নিজের নাম। সঙ্গীদের প্রতি কামাতুর দৃষ্টি। শিলার জিজ্ঞাসা হোয়াট্স মাই নেম, হোয়াট্স মাই নেম? মনে পড়তেই উদ্বেলিত শিলা। তার শরীরের ঐশ্বর্য ঝরে পরতে লাগলো এক একটা পদক্ষেপে আর দোলায়।
তৃতীয় দৃশ্য, স্বচ্ছ-সাদা শার্ট। খোলা টাই ঝুলে আছে বুকের দুপাশে। উরু থেকে পায়ের মসৃণতায় ঝলসে পড়ছে আলো। কোমর দুলিয়ে পা ছড়িয়ে শিলা নেমে আসছেন ভূমিতে, আবার উঠে যাচ্ছেন। ঠোঁট আর চোখের ইশারার সাথে বেপরোয়া অঙ্গভঙ্গিতে যেন কাছে ডাকছেন সঙ্গীকে। আবার কপট বিদ্বেষে সরিয়েও দিচ্ছেন তাকে।
চতুর্থ দৃশ্য, শরীর প্রদর্শন কুশলতায় শিলার আবির্ভাব এবার মঞ্চের উর্ধ্ব থেকে। ঘূর্ণায়মান রিংয়ে বসে আছে শিলা। তা ঘুরছে ক্রমাগত। ঘুরছে দর্শকের চোখ, মাথা। কাছে পাবার ইচ্ছায় ব্যাকুল নায়ক। কিন্তু আরও যেন বাদ আছে অনেক কিছু। আর তা প্রদর্শন করতেই শাড়ীর ক্ষুদ্র সংস্করণ তার শরীরে। পরনে শাড়ীর এই আবরণ তাকে দেয় শরীর প্রদর্শনের অবাধ সুবিধা। আলো-ছায়া আর পানির সিক্ততায় শিলা যেন আরও বেপরোয়া। মঞ্চে উপস্থিত সবার হাতেই তৃষ্ণা মেটানোর মগ, আর সেই তৃষ্ণা মেটাতে দৃষ্টি নিবন্ধ শিলার দিকেই (উপমহাদেশের সিনেমায় নায়িকাকে যৌন-আবেদনময়ী করে তোলায় পানির এ ব্যবহার অবশ্য নতুন কিছু নয়।)
মোটামুটি এই হলো শিলাকি জোয়ানির ব্যবচ্ছেদ। এ গান ড্রয়িং রুমে বসে আমরা সবাই মিলে দেখছি। আর বাইরে সুযোগ পেলেই বড় বড় কথা বলছি অশ্লীলতা নিয়ে।
৯.
এতসব প্রশ্নের আঁকিবুকি যখন আইটেম সঙ ঘিরে তখন ভিন্ন চিত্রও কিন্তু খোদ ভারতেই আছে। আইটেম সঙ ছাড়াও ভারতে সিনেমা হচ্ছে। সেই সিনেমা ব্যবসাও করছে। তা শুধু ভারতেই নয়, বিদেশেও। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে জায়গার কথা আসে সেটা টালিগঞ্জের ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র। যদিও বর্তমান আর্ট ফিল্ম, ভিন্ন ধারার সিনেমা এই টার্মগুলো খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে আসলে আর্ট ফিল্ম, ভিন্ন ধারা বলে কিছু নেই। সিনেমা সিনেমাই। এটি নিজেই একটি শিল্প মাধ্যম। তাই এসব ছবির নির্মাতারাও একে মোটেও ভিন্নধারায় সিনেমা চিহ্নিত করতে উৎসাহী নন। তারা বরং একে তৃতীয় চলচ্চিত্র বা থার্ড-সিনেমা৯ বলতেই বেশি আগ্রহী।
পশ্চিম বাংলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর এবং দেশভাগোত্তর কাল থেকে শুরু করে ১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী নির্মিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাঙলা চলচ্চিত্র বিষয় ও আঙ্গিক- উভয় দিক থেকে যে বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছিল, তাকে প্রথম চলচ্চিত্র বলা যায়। এই ধারার চলচ্চিত্র এখনো আছে। এতে হলিউডের ফর্মূলা ফিল্মের কাঠামো, নাচ-গান-মারপিট-করুণরস সমৃদ্ধ হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রভাব বিদ্যমান। নির্মাণভাবনায় ফর্মুলা ফিল্মের কাঠামো তথা গল্প দেখানোর জন্য ক্যামেরাকে যতটুকু ব্যবহার করা দরকার, ততটুকু করা হয়েছে। স্টারপ্রথা, পারিবারিক মেলোড্রামা, মিলনাত্মক সমাপ্তি ইত্যাদি এই ধারার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।১০
আর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র হলো মূলত পরিচালকনির্ভর। এ ধারায় পরিচালক কাহিনীর মধ্য দিয়ে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। প্রচলিত স্টারপ্রথার বদলে এ ধারা গুরুত্ব দেয় পরিচালক প্রথাকে। চলচ্চিত্রকলা যে শুধু বিনোদন মাধ্যম নয়, বাণিজ্য করার উপায় নয়, একজন চলচ্চিত্রস্রষ্টার ভাব-বিভাব-বক্তব্য-ভাবনা উপস্থাপনের এক কলারূপ, তা দ্বিতীয় ধারার চলচ্চিত্রসমূহে প্রকাশিত। সত্যজিৎ রায় মূলত দ্বিতীয় চলচ্চিত্রের প্রবর্তক।১১ আর-এ দুই ধারার বাইরে গিয়ে বর্তমানে যে সব ছবি নির্মিত হচ্ছে তাকেই আমরা থার্ড-সিনেমা বা তৃতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে অভিহিত করছি। বস্তুত ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ এবং ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া ভারতীয় গণনাট্য সংঘ-এর যে সংস্কৃতিচেতনা অবিভক্ত বাংলায় ছড়িয়ে গিয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় চলচ্চিত্র-এর জন্ম হয়েছে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্রে।১২
লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র বিবর্তনে নয়া উপনিবেশবাদের প্রভাব থেকে সৃষ্ট এ ধারার সিনেমা ভারতে নির্মাণ শুরু হয়েছিল ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, নিমাই ঘোষ, বিমল রায়ের মতো পরিচালকদের হাত ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় এসেছেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তপন সিনহা, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, সন্দীপ রায়সহ অনেকেই। আর বর্তমানে তাদের সাথে পাল্লা দিতে এগিয়ে এসেছেন বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায়, অতনু ঘোষ, গৌরব পান্ডে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, হরনাথ চক্রবর্তী, অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী, অনিকেত রায় চৌধুরীর, শ্রীজিৎ মুখার্জীর এর মতো তরুণ নির্মাতারা। (বাংলাদেশেও থার্ড সিনেমার ধারায় বেশকিছু সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, তারেক মাসুদদের হাত দিয়ে শুরু হওয়া এই ধারা অবশ্য এখানে বিকল্প ধারা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।) তাদের নির্মিত এসব ছবি ব্যবসায়িক দিক দিয়ে এতটা সফল যা বাণিজ্যিক ধারার ছবিকেও অনেক সময় টপকে যাচ্ছে। খোদ আমেরিকা থেকেই এ বছরে এসব সিনেমা আয় করে এনেছে ৭২ হাজার মার্কিন ডলার। আর অনিকেত চট্টোপাধ্যয় পরিচালিত বাই বাই ব্যাংকক ছবিটি মুক্তির প্রথম সপ্তাহে দেশেই আয় করতে পেরেছে এক কোটি ১৭ লাখ টাকা।১৩
মজার ব্যাপার হলো এসব সিনেমাতে কিন্তু আইটেম সঙ নেই। নেই নারী দেহের উদ্দামতা। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, এসব সিনেমায় নেয়া হয় নি কোনো তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রী। এসব ছবির ব্যবসার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে গল্প ও নির্মাণ কুশলতা। পরকীয়া, সমকামিতা থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনের যে অধ্যায়গুলো সযতনে আড়াল করে রাখাই ভদ্রস্থ মনে করতেন সবাই, সেইগুলোই এখন এসব সিনেমার কাহিনী হয়ে উন্মোচিত হচ্ছে। এখনকার তরুণদের জীবনে যেন গোপনীয়তা নেই। যা বলার সবই সরাসরি বলছেন তারা। জেদ আর স্পর্ধাই আজ যেন ভাষা পাচ্ছে টালিউড ছবির চিত্রনাট্যে। বাঁধ ভেঙ্গেছে সংলাপের অযথা জড়তার। পর্দায় তারকারা এখন আর কেতাবি ভাষায় কথা বলেন না। একেবারেই কথ্য ভাষাতে উঠে আসছে সব। বাস্তব জীবনটাকেই যেন সবাই বাঁধতে চাইছেন সেলুলয়েডের ফিতায়। ড্রয়িং রুমে আইটেম সঙ দেখে অভ্যস্ত হওয়া কিছু লোক অবশ্য এসব দেখে বাংলা ছবির জাত গেল জাত গেল বলে চিৎকার করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ দর্শক কিন্তু ঠিকই গ্রহণ করছে ব্যতিক্রমি নির্মাণের এসব ছবি। এমনকি এসব ছবির সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এখন অভিনয়ের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। মিঠুন চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ, যীশু সেনগুপ্ত, রাহুল বোস, সহ বাণিজ্যিক ধারার প্রতিষ্ঠিত নায়কেরা এখন অভিনয় করছেন আবহমান, শুকনো লঙ্কা, অটোগ্রাফ, চলো পাল্টাই, কাগজের বউ, জিও কাকা, অংশুমানের ছবি, অন্তহীন-এর মত চলচ্চিত্রে।
১০.
ব্যান্ড দল, লিটল ম্যাগাজিন। বাঙালি তরুণদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘ সময় ছিল এ দুটি। আর সময়ের পরিক্রমায় এখন সে স্থান দখল করে নিয়েছে সিনেমা। বাঙালি তরুণদের আগ্রহ বিগত কয়েক প্রজন্ম ধরে এভাবেই ঘুরপাক খাচ্ছে। টালিগঞ্জের ভিন্ন ধারার সিনেমায় স্পষ্টভাবে কোনো কিছু বলতে পারার এ ধরন দারুনভাবে সফল। তার প্রমাণ কলকাতার তরুণদের নির্মিত এসব সিনেমা দেশে-বিদেশেও সফল। আইটেম সঙ নির্ভরতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এ সফলতার ঢেউ যদি একবার উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে হুজুগে বাঙালি অন্তত পক্ষে এই একটা জায়গায় বড় কিছু করে ফেলতে পারে।
লেখক: জাহিদুল ইসলাম জন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। তিনি নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি করেন।
তথ্যসূত্র
১. নাচের পারদর্শিতার জন্যই মূলত তাকে এ নামে ডাকা হত। ধারণা করা হয় তার শরীরের নমনীয়তা ছিল রাবারের মত।
২. www.wikipedia.com
৩. গিনেস বুকে মুন্নী; দৈনিক কালের কণ্ঠ; ১৬ মার্চ ২০১১।
৪. এটি একেবারেই আমার মানে লেখকের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। এক বনধুকে শিলাকি জোয়ানি গাইতে শুনে জিজ্ঞেস করেছিলাম কী গান এটা, আর কোন সিনেমার? উত্তরে সে আমাকে ব্যাকডেটেড আখ্যা দিয়েছিল।
৫. আপনি কি জানেন; দৈনিক প্রথম আলো; ৮ এপ্রিল ২০১১।
৬ . প্রাগুক্ত; প্রথম আলো; ৮ এপ্রিল ২০১১।
৭. এক ছবির প্রচার ব্যয় ১৫ কোটি রুপি; কালের কণ্ঠ; ২৬ wW‡m¤^i ২০১০।
৮. প্রাগুক্ত; কালের কণ্ঠ; ২৬ wW‡m¤^i ২০১০।
৯. বিস্তারিত দেখুন, আউয়াল, সাজেদুল (২০১১); চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্য প্রকাশ; ঢাকা।
১০. প্রাগুক্ত, আউয়াল (২০১১; ৯০)।
১১. প্রাগুক্ত, আউয়াল (২০১১; ৯০)।
১২. প্রাগুক্ত, আউয়াল (২০১১; ৯১)।
১৩. টালিউড লেগেছে নতুন বাতাস; কালের কণ্ঠ; ১৭ মার্চ ২০১১
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন