Magic Lanthon

               

আসাদুর রহমান ও তাহ্‌সিন আহমেদ

প্রকাশিত ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

খেলার সংবাদের খেলা

আসাদুর রহমান ও তাহ্‌সিন আহমেদ


ক্রীড়া সংবাদের বর্তমান ধরনের একটি ঢং হলো- গল্পে গল্পে বলে যাওয়া। যারা গল্প বলেন তারা সবসময় চান গল্পের শ্রোতা যেন বেশি হয়। এই বেশি শ্রোতা মাথায় রেখে গল্প লেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক তার সংবাদে মাঠ ও মাঠের বাইরের অনেক কিছু জুড়ে দেন। এই জুড়ে দেওয়া বা জোড়া দেওয়ার বিষয়টা অনেক সময় এমন পর্যায়ে যায় যে, সংবাদ আর সংবাদ থাকে না। যেটা থাকে, সেটা হয়ে যায় মন্তব্য।। আবার অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ বাছাইয়ের ব্যাপারেও আমলে আনা হয় না সংবাদমূল্যকে।

অনেক সংবাদ আছে যেগুলোর উপস্থাপনের ঢং-ই কথা বলার সুযোগ করে দেয়। সাধারণত এটাই হয়ে থাকে যে, সংবাদের শিরোনাম পড়েই পাঠক সিদ্ধান্ত নেন কোন সংবাদটি পড়বেন আর কোনটি পড়বেন না। কেননা, শিরোনামই পাঠককে বোঝানোর চেষ্টা করে যে এই সংবাদটিতে আসলে এই আছে। কিন্তু বাস্তবিক, পত্রিকার পাতায় এমন অনেক শিরোনাম পাওয়া যায় যেগুলো সংবাদ-বিবরণীর সংক্ষিপ্ত রূপ ধরে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ দাবি করে পাঠকের সামনে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ যে আসলে এক ধরনের ধোঁকাবাজি তা পাঠক বুঝতে পারে পুরো সংবাদটি পড়ে। আবার, হতাশ হতে হয় বিভিন্ন তারকাদের কলাম পড়ে। পত্রিকাগুলোতে প্রতিনিয়তই ইয়া বড় বড় তারকারা কলাম লিখে থাকেন। কিন্তু এই কলামগুলো পড়ে তেমন কোনো মাল-মশলাই খুঁজে পাওয়া যায় না। আর তখনই প্রশ্ন ওঠে, এসব নামমাত্র কলামের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না?

যাই হোক। যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে তৈরি না হয়েও সংবাদপত্রগুলো কিন্তু পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, আগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছে, এটা তো ভালো, সমস্যা কী? উত্তরে বলতে হয়, হাট-বাজারের হকাররাও দর্শক-শ্রোতার মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেন। যেখানে তারা পণ্য বিক্রির স্বার্থে যোগ করেন অলৌকিক সব গুণাবলী আর মনভুলানো কথার হাজারটা ডালপালা। অলৌকিক আর মনভুলানো বলার কারণ বিজ্ঞাপিত পণ্যের যে গুণকীর্তন তারা করেন, তা পরীক্ষালব্ধ নয় এবং বলা যায় অবিশ্বাস্য। এই সূত্র ধরেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি সংবাদপত্রগুলোও তাই করছে? কেবল ক্রেতা তৈরি করতে উঠে পড়ে লেগেছে গোবেচারা পাঠকের পেছনে? উত্তর খুঁজতে সংবাদপত্রগুলো একটু খতিয়ে দেখা দরকার।  

আর এই খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশের মূলধারার করপোরেট মিডিয়া হিসেবে প্রথম আলো ও সমকাল এ প্রকাশিত ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ সংক্রান্ত বেশকিছু সংবাদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।  

অনেকটা পাতানো খেলা প্রথম আলো ১৪ ফেব্রুয়ারি ১১ বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছে-

...সাকিব আল হাসানকেও যোগ করা যায় তাদের সঙ্গে।  প্রত্যাশার ফানুস যেভাবে উড়ছে, কোয়ার্টার ফাইনাল তো বটেই, ২ এপ্রিল ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ট্রফি হাতে সাকিবের ছবিটিও অনেকে কল্পনা করে ফেলেছেন।  

এর দুই দিন পর ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় শিশিরের একটি কার্টুন বেশ বড় করে ছাপানো হয়। কার্টুনটিতে সাকিব ঘুমাচ্ছেন, উপরে বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে সাকিবেরই হাস্যোজ্জল মুখ। তার মানে, সাকিব স্বপ্ন দেখছেন তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন। একইভাবে সমকাল ১৯ ফেব্রুয়ারি তাদের একটি শিরোনাম করেছে এমন- সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশরও।

অন্যদিকে এই দুটো সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার আগেই ৮ ফেব্রুয়ারি ১১ সাকিব নিজেই সংবাদ সম্মেলনে বলেন টার্গেট কোয়ার্টার ফাইনাল। কেবল সাকিব নয়, আমরা যারা ক্রিকেট অল্প-বিস্তর হলেও বুঝি তারাও কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নই দেখেছিলাম। কেন দেখেছিলাম তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার- বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ছিল বি গ্রুপে। এই গ্রুপের অন্য দলগুলো হলো- ভারত, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেদারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড। এই সাতটি দলের মধ্যে চারটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার কথা। শক্তির বিচারে এই গ্রুপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ চতুর্থ ও বাংলাদেশ পঞ্চম শক্তিশালী দল। আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টার্গেট করেছিলাম। কারণ এই নয় যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আমাদের চেয়ে দুর্বল। কারণ এই যে, গ্রুপের অন্য তিন দল অর্থাৎ ভারত, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী। একই সঙ্গে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম নেদারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডকে হারাবোই।  

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া না যাওয়ার স্বপ্ন যেখানে অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী একটি দলকে হারানোর ওপর দোল খায়। এবং নেদারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের সাথে হারার তিক্ত অভিজ্ঞতাও যেখানে আমাদের আছে; সেখানে সাকিবের হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি ধরিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?   পাঠক, প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, তাহলে গণমাধ্যম আমাদের কেন এমন স্বপ্ন দেখাচ্ছে? উত্তর খুঁজতে খুব বেশি বিশ্লেষণে যাওয়ার দরকার নেই।সাধারণ দর্শক হিসেবে আপনার মনে যদি খুব বেশি আগ্রহ না থাকে তাহলে কিন্তু আপনি ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে তেমন মাতামাতি করবেন না- এটাই স্বাভাবিক| কিন্তু তাদের (সংবাদপত্রের) কাছে দর্শকের আগ্রহ থাকা, না থাকা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, দর্শক হিসেবে আপনাকে আগ্রহী করে তুলতে হবে।  

ধরুন, আপনার এক বন্ধু আপনাকে এসে বললো, শোন্‌ এবার কিন্তু বাংলাদেশও বিশ্বকাপ জিততে পারে। আপনি বললেন, ধুর! কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারে কি না তাই দ্যাখ ।আপনার বন্ধু বললো, তুই বেটা জানিস-ই না। পেপার-পত্রিকা কিছু পড়িস? এই দেখ, প্রথম আলো, সমকাল কী লিখছে? যখন আপনি সংবাদপত্রগুলোতে সত্যি সত্যি এরকম সম্ভাবনা দেখবেন তখন আস্তে আস্তে ব্যাপারগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করবেন।অর্থাৎ আপনাকে একপর্যায়ে এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হবে। কারণ, একটি বিষয় যখন বারবার ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচকভাবে কারো সামনে উপস্থাপন করা হয়- এক পর্যায়ে তা নিয়ে ভালো লাগা বা খারাপ লাগার সৃষ্টি হয়। যেমনটি ঘটে স্যাটেলাইট চ্যানেলে একই হিন্দি গান বারবার দেখে।  

অন্যদিকে যে সামাজিক পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠি তাতে বই, সংবাদপত্র, ইন্টারনেট বা লিখিত কোনোকিছুকে কিন্তু খুব সহজে বিশ্বাস করি। আমরা ভাবি বারবার পত্রিকায় লিখছে, তার মানে ঘটনাতো ঠিক কিংবা ঠিক হতে পারে। আর বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের দেশের এমন ইতিবাচক সংবাদের ক্ষেত্রে এমনটা আরও বেশি ঘটে।   যাই হোক, আপনাকে বিশ্বাস করানো গেলো যে, বাংলাদেশেরও বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা আছে। আর এই বিশ্বাস থেকেই আপনার মধ্যে তৈরি হবে স্বপ্ন | তাই স্বপ্নর শেষ আপনি দেখতে চাইবেন। ফলে যা হবে, বিশ্বকাপ চলাকালীন প্রতিদিন সংবাদপত্র না পড়লে আর আপনার চলবে না। পারলে আপনি টেলিভিশনও দেখবেন।এখন কথা হলো, এভাবে আপনার কাছে সংবাদপত্র বিক্রি করে গণমাধ্যম মালিকরা কিন্তু প্রাথমিকভাবে সফল। তারা আপনাকে সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। এখন এমনিতেই বাকি উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। সেটা কেমন? আপনি নিয়মিত সংবাদপত্র পড়লে পত্রিকার সার্কুলেশন বাড়বে, আর সার্কুলেশন বাড়লে পত্রিকার দাম বাড়বে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে। এটা গেল একটা দিক। অন্যটা হলো, যারা এতো টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেবেন তারাও তো কিছু চাইবেন, নাকি? এখন তাদের পাওয়ার পালা। নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেখে আপনার কিন্তু পর্দায় জীবন্ত শচীনকে দেখতে ইচ্ছে করবে। আর তা দেখতে হলে বাড়ির পুরানো ২১ ইঞ্চি টিভির পরিবর্তে কিনতে হবে ৪২ ইঞ্চি এলসিডি কিংবা প্লাজমা টেলিভিশন। এসব টেলিভিশন কেনার জন্য একই সঙ্গে আছে আবার নানা মন ভোলানা অফার। তাহলে কী দাঁড়ালো? আপনি ছিলেন একজন সাধারণ পাঠক বা দর্শক, শেষমেষ হয়ে গেলেন একজন ক্রেতা। 

কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি   ২ মার্চ সমকাল এর একটি শিরোনাম এমন -বাংলাদেশকে রোচের হুঙ্কার। পুরো প্রতিবেদন পড়ে দেখা গেছে, সংবাদে বেশ কয়েকবার হুঙ্কার শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো রোচের কথায় হুঙ্কারের মতো কোনো কিছু সত্যি সত্যি কি ছিল? প্রতিবেদনটিতে রোচ[i] কেবল বলেছেন, তারা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো বাংলাদেশের চেয়ে ভালো দল-ই। এটা সর্বজনবিদিত। আর এ কথা রোচ বললে, সেটা হুঙ্কার হয় কীভাবে?

 

 


আর একটি বিষয়, খেলার আগে এক দল আরেক দল সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য হরহামেশাই করে থাকে। তাহলে প্রতিবেদকের কাছে এখন প্রশ্ন, তিনি যে বারবার হুঙ্কার শব্দটি লিখলেন সেটি কিসের উপর ভিত্তি করে?   বিশ্বকাপ শুরুর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশ হেরে যায়। পরদিন প্রথম আলো প্রথম পৃষ্ঠায় একটি সংবাদের শিরোনাম করে ৮৯ রানের পরাজয় সতর্ক সংকেতও। সংবাদ বিবরণীটি এমন-   'কানাডা ম্যাচটাতে অনেক পরীক্ষা দিতেই হয় নি।। আর কাল সব বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে মোটামুটি সবকটিতেই ফেল।। বোলিং-ফিল্ডিং-ব্যাটিং সবখানেই হতাশা ছড়িয়ে পাকিস্তানের কাছে ৮৯ রানে হার।। বিশ্বকাপের আগে একটা সতর্ক সংকেত দিল বাংলাদেশ দলকে।  

এই হল ঘটনা। বিষয়টা একটু বিশ্লেষণ করি, ৮৯ রানের পরাজয়কে যদি সব বিষয়ে ফেল ধরা যায়, তাহলে পাশ করা বলতে কী বোঝায়?  ৮৯ রানে না হেরে যদি ৮৯ রানে জিতলে তো সব বিষয়ে পাশ বলা যেত, নাকি? তাহলে কানাডাকে ১১২ রানে অলআউট করার পর ১৯.২ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে বড় জয় পাওয়াটা তো সব বিষয়ে পাশ-ই বলা যায়। কেননা, বোলিংয়ে পরীক্ষা দিয়ে ভালোভাবে পাশ করেছে বলেই তো ১১২ রানে অলআউট সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ফিল্ডিং-ও। আর ১৯ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে জয়ে পৌঁছানোকে কি ব্যাটিং পরীক্ষায় পাশ বলা যাবে না? কানাডার ম্যাচে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিনটাতেই পাশ হলো- কিন্তু প্রতিবেদক বললেন ওই ম্যাচে নাকি অনেক পরীক্ষা দিতেই হয়নি। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং এর বাইরে প্রতিবেদক তাহলে কোন পরীক্ষার কথা বলছেন? প্রশ্ন তোলা যায় এই সংবাদটি নিয়েও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের আগে ৪ মার্চ প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার আরেকটি সংবাদের শিরোনাম সামনে যখন গেইল-পোলার্ড। সংবাদে বলা হয়েছে-   'ক্রিস গেইলকে বল করার সময় কি দুরু দুরু কেঁপে উঠবে শফিউলের বুক? কিংবা স্লোগ ওভারে যদি রুবেল হোসেন মুখোমুখি হয়ে যান কিরণ পোলার্ডের!  

গেইল এবং পোলার্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দুই মারমুখী ব্যাটসম্যান সম্পর্কে বাংলাদেশের শফিউল এবং রুবেল হোসেন অবশ্যই ধারণা রাখেন।। ওই দুই ব্যাটসম্যানকে কীভাবে বল করতে হবে সে পরিকল্পনা অবশ্যই দলের আছে।কিন্তু দুরু দুরু কেঁপে উঠবে এটা কোন ধরনের কথা? ভালো খেলোয়াড়ের সামনে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোনো খেলোয়াড় দাঁড়ালে এক ধরনের দুশ্চিন্তা কাজ করে। এটাই স্বাভাবিক| কিন্তু তার মানে এই নয় যে বুক দুরু দুরু কেঁপে উঠবে।। শব্দগুচ্ছটি নিঃসন্দেহে কোনো দল বা খেলোয়াড়ের জন্য অবমাননাকর। আগেই বলেছি প্রতিবেদকরা গল্প বলেন। কখনো সেইসব গল্প এমন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায় যে, তা আর সংবাদই থাকে না; হয়ে যায় মতামত। তেমনি বাংলাদেশের খেলোয়াড় শফিউলের ব্যাপারে এমন মতামত দেওয়ার অধিকার ওই প্রতিবেদকে কে দিয়েছে? সাংবাদিকতার কোন নীতিমালা বলে সংবাদে তিনি এমন শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করতে পারেন?   বিষয়টা অন্যভাবেও দেখার অবকাশ আছে। শফিউল আর রুবেলের বুক যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথেই দুরু দুরু করে কেঁপে উঠে তাহলে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডের সাথে তাদের মাঠে নামার সাহসই তো থাকার কথা নয়। অথচ দেখুন, এই শফিউল আর রুবেলদের উপর ভর করেই কিন্তু সংবাদপত্রগুলো আমাদের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে! (এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আগে করা হয়েছে)  

পাঠকের সাথে থাকা, নাকি পাঠককে সাথে রাখা?   জীবনে যারা দু-একদিন হলেও ক্রিকেট খেলেছেন তারা বিষয়টি বুঝতে পারবেন। ধরুন, আপনার ওভারের প্রথম বলেই ব্যাটসম্যান ছক্কা মারলো। তখন বোলার হিসেবে আপনি সমর্থকদের কাছ থেকে কেমন ব্যবহার আশা করবেন? যদি আপনার কাছে এমন প্রতিক্রিয়া আসে যেন, এগুলো কোনো বল হলো? কীসব বল করছে তাহলে, নেতিবাচক এসব মন্তব্যের কারণে কিন্তু আপনি এক ধরনের বাড়তি চাপের মধ্যে পড়ে যাবেন। যার নেতিবাচক প্রভাব আপনার পরের বলগুলোতে পড়বে। ব্যটসম্যানদের বেলায়ও সাধারণত একই ঘটনা হয়।   কথাগুলো এ কারণে বললাম যে, সমকাল ৫ মার্চ ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে হারার পর প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম করেছে বাঘের গর্জন নয় বিড়ালের মিউমিউ। ক্রিকেটে জয় পরাজয় থাকবেই। থাকবে পরাজয়ের ছোট-বড় ব্যবধান। তাই, বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়া মানে বাঘ  বিড়াল হয়ে যাওয়া নয়।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবাদপত্র যাদের বাঘ বলছে তারা কিন্তু কোনোদিনই নিজেদের বাঘ বলে প্রচার করে নি। এই বাঘ কিন্তু গণমাধ্যমেরই সৃষ্টি।। এখন গণমাধ্যম তাদের প্রয়োজন মতো বাঘ বিড়াল সবই বানাচ্ছে। আর এই বাঘ-বিড়াল খেলায় গণমাধ্যমের লাভ হলেও যাদের নিয়ে এ খেলা তারা কিন্তু এটাকে মোটেও ভালভাবেই নিচ্ছে না। অন্যভাবে বললে, এর প্রভাব কিন্তু তাদের ওপর মোটেও ভালভাবে পড়ছে না। যে কারণে খেলোয়াড়রা কিন্তু গণমাধ্যমসহ দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করছেন এভাবে- শুধু ভালো নয়, মন্দেও যেন দেশবাসী তাদের পাশে থাকেন।[ii] বাঘ বিড়ালের কার্টুনের ছবি   ওই দিনই অর্থাৎ ৫ মার্চ সমকাল এ আরেকটি সংবাদের শিরোনাম এমন- তবুও সাকিবের মুখে হাসি। পুরো সংবাদ পড়লে অর্থ দাঁড়ায় এরকম- পরাজয়ের পর না হেসে সাকিবের মন খারাপ করে থাকা উচিত ছিল। এই কথাটিই প্রতিবেদক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে পাঠকদের বোঝাতে চেয়েছেন। এখন প্রশ্ন, হারার পর অধিনায়ক হিসেবে সাকিবের বিমর্ষ চেহারা কি দেশবাসীর প্রত্যাশার জায়গায় (একথা এজন্য বলছি যে, সাকিব নিজেই দেশবাসীর উদ্দেশ্য বলেছিলেন তাদের স্বপ্রœ কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত) ইতিবাচক প্রভাব ফেলত? কিংবা তার সহযাত্রীদের জন্য সুফল বয়ে আনত? কারণ তখন পর্যন্ত কিন্তু দেশের ক্রিকেট পাগল দর্শকদের হৃদয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন বেঁচে ছিল! ১৯৯২ এর বিশ্বকাপের একটা উদাহরণ এখানে টানা যেতে পারে। ওই বিশ্বকাপে যে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেই ইংল্যান্ডের সাথেই গ্রুপ পর্বে পাকিস্তান অলআউট হয় ৭৪ রানে। তখনকার পাকিস্তানি অধিনায়ক ইমরান খান ৭৪ রান প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কী হয়েছে তা বড় কথা নয়, সামনে কী করবো সেটিই বড় কথা। এটি নিয়ে পড়ে থাকলে তা সামনের ম্যাচগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।  

পাঠক, এত কথা বললাম কেবল সংবাদপত্রের খেল্‌টা বোঝানোর জন্য।। গণমাধ্যমের ইচ্ছে হলো আপনাকে চ্যাম্পিয়ন বানালো, বাঘ বানালো। আবার অল্প সময়ের ব্যবধানে বানালো বিড়াল। দেখুন, তারা কিন্তু খুব দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। প্রথমে আপনার স্বপ্নের মিটারের সূচক একদম উপরে তুলে দিচ্ছে। এই সূচক আবার ধপাস করে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। তার মানে গণমাধ্যমের খেলা কিন্তু ক্রিকেট খেলা নিয়ে নয়, সমর্থকদের আবেগ নিয়ে। তাদের বাঘ বানানো দেখে পাঠক যেমন উল্লসিত হয়, বিপরীতে বিড়াল পড়ে মনে মনে দাঁত খিঁচিয়ে বলে- টাইগার হইছে! টাইগার! ৫৮ রানে অলআউট হয়, আবার পিকপিক করে হাসে! এরাই নাকি বিশ্বকাপ জিতবে! বিষয়টা দাঁড়াচ্ছে এমন- প্রথমে একটা কৌশলে পাঠককে গণমাধ্যম সাথে নিল, পরে আরেকটি কৌশলে তাদের সাথে ধরে রাখলো। অর্থাৎ, যেভাবেই হোক সম্পর্ক নষ্ট করা যাবে না। সম্পর্ক নষ্ট করলে তো আপনি আর সংবাদপত্র পড়তে চাইবেন না! আর যে পত্রিকার পাঠক বেশি না, সেই পত্রিকায় কেউ লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপনও দেয় না। এখানে নোয়াম চমস্কির একটা কথা খুব মনে পড়ে যায়, তাদের (গণমাধ্যমসমূহের) প্রাথমিক কাজ হলো বিজ্ঞাপনদাতাদের নিকট অডিয়েন্সকে বিক্রি করা। তারা তাদের সাবস্ক্রিপশন থেকে মুনাফা অর্জন করে না। আপনি যখন টেলিভিশন খুলে বসেন সিবিএস-নিউজ নিশ্চয়ই আপনার কাছ থেকে টাকা নেয় না।[iii]  

যত দোষ সাকিব ঘোষ   ১৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বনাম ভারত ম্যাচ। ম্যাচে টসে জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় বাংলাদেশ। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ভারত চার উইকেটে ৩৭০ রান করে। জবাবে, বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেটে করে ২৮৩ রান।। প্রথম আলোর ভাষ্যমতে, ৮৭ রানের ওই পরাজয়ের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে টসে জিতে ব্যাটিং না নিয়ে ফিল্ডিং নেওয়া।এই কারণ তারা ব্যাখ্যা করেছে ২০ ফেব্রুয়ারির একটি সংবাদে। প্রতিবেদনের শুরুটা এমন- সবচেয়ে বড় ইশ তো সাকিব যদি টসে জিতে ফিল্ডিং না নিতেন! " একই প্রতিবেদনে টসের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে  আরও বলা হয়েছে- যুক্তি যা-ই হোক, সেটি অসার বলে প্রমাণিত। এখন আলোচনা করা যাক টসে জিতে ফিল্ডিং নেয়ার ক্ষেত্রে কী কী যুক্তি ছিল। প্রথমত, টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো রাতের শিশির। শিশির থাকার কারণে রাতে বোলারদের বল গ্রিপ করতে সমস্যা হয়।। এই সমস্যায় বেশি পড়েন স্পিনাররা। আর বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ মূলত স্পিননির্ভর। এসব বিবেচনায় এনেই বাংলাদেশ টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।   

দ্বিতীয়ত, পরিসংখ্যান বলে, এই মাঠে পরে ব্যাট করা দলগুলোই এ পর্যন্ত বেশি জিতেছে। প্রথম কারণটিকে আরও সংহত করে সব সমালোচকের মুখে নুন দিয়ে খেলার পরের দিনে বাংলাদেশ দলের কোচ জেমি সিডন্স বললেন, টসে জিতলে আবারও ফিল্ডিং।(বাংলাদেশের পরের ম্যাচটি মিরপুর স্টেডিয়ামেই ছিল) এমনকি ওই ম্যাচে যারা আগে ব্যাটিং করে জিতেছিল অর্থাৎ সেই ভারতীয় দলের অধিনায়কও ম্যাচ শেষে বললেন, টসে জিতলে আমরাও ফিল্ডিং নিতাম। আর একটি বিষয় হয়ত প্রতিবেদক ভুলেই গিয়েছিলেন, টসের সিদ্ধান্তটি কিন্তু সাকিবের নয়, পুরো টিম ম্যানেজমেন্টের। এছাড়া এই সিদ্ধান্ত টস হওয়ার অনেক আগেই নেওয়া।  

এখন প্রশ্ন গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা নিয়ে। খেলার পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ বলছে, সাকিব অর্থাৎ বাংলাদেশ দল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেটাই ঠিক ছিল। এ যুক্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতের অধিনায়ক এবং একই মাঠে পরবর্তী ম্যাচ সম্পর্কে জেমি সিডন্সের বক্তব্যে। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম প্রতিষ্ঠান প্রথম আলো নির্দ্বিধায় বলল, সাকিবের সিদ্ধান্ত ভুল।।   এখন মূল কথায় আসি, গণমাধ্যমের চারটি (অন্য তিনটি কাজ হলো to educate, to persuate, to entertain) প্রধান কাজের মধ্যে অন্যতম হল to inform অর্থাৎ জনগণকে সঠিক তথ্য দেয়া। সাধারণ আমজনতা না বুঝে তাদের আবেগ দিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতেই পারে। এমনকি তারা উত্তেজিত হয়ে গালমন্দ, ধিক্কার দিতে পারে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের। কারণ এ নিয়ে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু মূলধারার একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের এমন আচরণ কতখানি যুক্তিসঙ্গত? আর যদি তারা এ ধরনের বক্তব্য ছাপতেই চান, তাহলে সেটা সংবাদ আকারে কেনো? মন্তব্য আকারে সম্পাদকীয় পাতায় লিখলেই পারতেন!  

গদে আব্বাস কথাবার্তা   সংবাদের মধ্যে বাংলাদেশ শব্দটা থাকলেই সেই সংবাদের শিরোনাম বাংলাদেশকেন্দ্রিক হয়ে যায়; সংবাদের গুরুত্বের নানান প্রকারভেদের দোহাই দিয়ে তা না হয় মেনে নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু এমন অনেক শিরোনাম আছে, যেখানে পুরো সংবাদ পড়েও বোঝা যায় না কেনো এ শিরোনাম। পড়ার সময় সরিষার তেল দিয়ে নাক পরিস্কার করে নিলে কিছু গন্ধ হয়ত আপনি পাবেন। যেমন ধরুন, ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার একটি সংবাদের শিরোনাম অনেক বিস্ময় জমিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ। পুরো সংবাদই ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক। কেবল প্রতিবেদনের শেষের দিকে এক জায়গায় দুই লাইনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ অধিনায়কের সহজ-সরল-সাধারণ একটি মন্তব্য এমন-   বাংলাদেশ দারুণ বিপজ্জনক দল। বেশকিছু প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটার আছে দলে। ঘরের মাটিতে তাদের হারানো কঠিন হবে। কোনো দল তাদের হালকাভাবে নিতে পারবে না। বিশ্বকাপে তারা হতে পারে সারপ্রাইজ প্যাকেজ।  

বাংলাদেশ সম্পর্কে এই অতিসাধারণ বক্তব্য আমাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের প্রাগঐতিহাসিক যুগ থেকেই শুরু হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে কিন্তু বাংলাদেশ এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ, বাংলাদেশ ক্রিকেটে যে জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এখন তারা সেই জায়গায় নেই। এগিয়েছে অনেক দূর। কিন্তু তারপরও এই মন্তব্য নিয়েই তিনি শিরোনাম করে বসলেন অনেক বিস্ময় জমিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ। এখন পাঠক নাক দিয়ে প্রতিবেদনের ভেতর বাংলাদেশ দলের বিস্ময় খুঁজুন!  

১৯ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ খেলার আগের দিন সাকিবের একটা ¯^vfvweK কথাকে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথম আলো ওই কথাকে কেন্দ্র করে সংবাদের শিরোনাম করেছে, প্রোটিয়াস-বধের কৌশল জানেন সাকিব! সংবাদটির প্রথম অংশ ছিল এমন-  

খেলার আগে গেম প্ল্যান বলে দেওয়া ঠিক না। তবে বাংলাদেশ অধিনায়ক কাল সেটা ফাঁসই করে দিলেন একরকম। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আজ বাংলাদেশের ম্যাচ পরিকল্পনা জানলে গ্রায়েম স্মিথও ধাক্কা খাবেন নিশ্চিত। না চমকে ওঠার মতো কিছু নয়। ম্যাচ জিততে সাকিব আল হাসান যে সমীকরণটা দেখালেন, সেটা ক্রিকেট বোঝা কোনো ৭ বছরের বালকও জানে। আগে ব্যাট করলে ভালো একটা স্কোর করতে হবে। যেন দক্ষিণ আফ্রিকানরা সেটা টপকে যেতে না পারে। আগে বল করলে দক্ষিণ আফ্রিকানদের অল্প রানে বেঁধে ফেলতে হবে। যেন বাংলাদেশ সহজেই সেটা টপকে যেতে পারে। কপালে চিন্তার বলিরেখা ফুটিয়ে সাকিব সংবাদ সম্মেলনে আরও বোঝাতে চাইলেন, ১৫০, ২০০, ২৫০ যাই করুক, জিততে হলে বাংলাদেশকে তার বেশি করতে হবে। আর যদি বাংলাদেশ ২৫০, ২০০ এমনকি ১৫০-ও করে বসে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সেই রানের আগে আটকাতে হবে। যেন সূর্য উঠলে দিন হয় আর চাঁদ উঠলে রাত হওয়ার খবর জানালেন সাকিব। ক্রিকেট কি এত সরল পথে হাটে!   পাঠক লক্ষ্য করুন, ক্রিকেট কিন্তু এর বাইরে থাকা কোনো জটিল পথেও হাটে না।

একথা মানতেই হবে যে, ক্রিকেটে জয়-পরাজয় নির্ধারণে এই পথই সাধারণ, এই পথই সার্বজনীন। ক্রিকেট ইতিহাস এখন পর্যন্ত এই সরল পথের বাইরে যায় নি। তো একথাগুলো এত গুরুত্ব দিয়ে লেখার কী আছে? কিন্তু তারপরও সংবাদপত্রগুলো এসব সাধারণ কথাবার্তা টেনে j¤^v করে। আসলে ঘটনা হচ্ছে, বাংলাদেশের খেলা তো প্রতিদিন থাকে না। আপনি যদি প্রতিদিন পত্রিকা না পড়েন তাই আপনাকে ধরে রাখতে একটু কিছু পেলেই বাংলাদেশকে টেনে আনা। টেনে আনতে গিয়ে সাকিবদের গায়ের চামড়া ছিলে গেল কি না বা হাত-পা ভেঙ্গে গেল কি না তা নিয়ে মাথাব্যাথা প্রতিবেদকের নেই। আরও একটি বিষয় এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, বিশ্বকাপ উপলক্ষে পত্রিকার পাতা বাড়ানো হয়। সেই পাতাগুলোতে বিজ্ঞাপনকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার পরও বেশকিছু জায়গা ফাঁকা থেকে যায়। সেই জায়গা পূরণেরও একটা ব্যাপার-স্যাপার থাকে। কেননা, খালি বিজ্ঞাপন দিয়ে তো পত্রিকা বের করা যায় না। সেটি দেখতে খারাপ লাগবে, পাঠকও পড়বে না। তাই একটা বাহানা দরকার, একটা উছিলা দরকার। বাহানা হিসেবেই নানান রঙের বিজ্ঞাপনের মাঝে থাকে সাদা-কালো এসব গুরুত্বহীন (গদে আব্বাস!) সংবাদ।

মশা মারতে কামান দাগা   বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালীন প্রথম সারির সব পত্রিকাতেই তারকারা কলাম লিখে থাকেন। খেয়াল করলে দেখা যায়, বিশ্বকাপের আগ থেকেই পত্রিকাগুলো তারকাদের ছবিসহ নিজেদের পত্রিকার মাধ্যমেই বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করে। এমনকি, রাস্তাঘাটেও দেখা যায় এ সংক্রান্ত বিলবোর্ড। প্রথম আলো ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম পৃষ্ঠায় বিশ্বসেরারাও প্রথম আলোয় শিরোনামে একটি বিজ্ঞাপন ছাপে। বিজ্ঞাপনের টেক্সট ছিল এমন- ইয়ান বোথাম, ওয়াসিম আকরাম, রবি শাস্ত্রী, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ক্রিস গেইল, জ্যাক ক্যালিস, মুত্তিয়া মুরালিধরন এই বিশ্বকাপে সবাই প্রথম আলোর কলামিস্ট। বিজ্ঞাপনের ছবি  

১৩ ফেব্রুয়ারি সমকাল প্রথম পাতায় তাদের নিজেদের একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছে। বিশ্ববরেণ্য ক্রিকেটাররা লিখছেন শুধুই সমকালে।এই 'বিশ্ববরেণ্য' মধ্যে আছেন, রিকি পন্টিং, কুমার সাঙ্গাকারা, গ্রায়েম স্মিথ, কেভিন পিটারসেন, কিরন পোলার্ড, স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস, জিওফ বয়কট, স্টিভ ওয়াহ, ইমরান খান, ডেইল স্টেইন, আকরাম খান, গাজী আশরাফ হোসেন ও মোহাম্মদ রফিক। দুটি বিজ্ঞাপনে এসব তারকার ছবিও ছিল।  

পাঠক আসুন, এবার বিশ্বসেরা আর বিশ্ববরেণ্য এই ক্রিকেটারদের এসব কলামের কয়েকটি শিরোনামের নমুনা দেখি। ৮ মার্চ প্রথম আলোতে ওয়াসিম আকরাম, আত্মবিশ্বাসী পাকিস্তানকে দেখতে চাই।। ১৭ মার্চ গেইল, ইংল্যান্ডকে বিদায় করে দিতে চাই। সমকালএ ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ রফিক, জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। ২৪ ফেব্রুয়ারি গ্রায়েম স্মিথ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ খুবই বিপজ্জনক দল, ২৬ ফেব্রুয়ারি সাঙ্গাকারা ,পাকিস্তানকে হারানো মোটেই সহজ হবে না। (কেউ ইচ্ছে করলে পুরো মাসের পত্রিকা পড়ে দেখতে পারেন, এরকম সব সাদামাটা শিরোনামই পাবেন) শুরুতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যান গেইলের কলাম নিয়ে কথা বলি। পাঠক আপনার হয়ত মনে আছে, যে ম্যাচ নিয়ে গেইলের এ মন্তব্য সেই ম্যাচটি ছিল ইংল্যান্ডের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। অর্থাৎ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতলেই ইংল্যান্ড বাদ। তার মানে দাঁড়ালো, গেইল জিততে চেয়েছিলেন।

কলামের ভিতরে কী আছে নির্দিষ্ট করে একটু দেখা যাক,   'আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরেছি, সামনে কঠিন দুটি ম্যাচ। তবে আমার মনে হয় তিনটি ম্যাচ জিতে আমরা খুব ভালো অবস্থানেই আছি। ইংল্যান্ড আর ভারত ম্যাচের যেকোনো একটি জিতলেই আমাদের চলবে। নিশ্চিত হয়ে যাবে কোয়ার্টার ফাইনাল। দক্ষিণ আফ্রিকা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে। বাকি তিনটি জায়গার জন্য চারটি দলের সমান সুযোগ আছে। চার দলের যেকোনোটি কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারে, যেকোনোটিই বাদ পড়ে যেতে পারে। রোমাঞ্চকর এক পরিস্থিতি।   লক্ষ্য করুন গেইল যা বলেছেন, তা এত আয়োজন করে উপস্থাপনের কী আছে? এখানে গেইল নতনি কী বলেছেন? এত বিজ্ঞাপন দিয়ে যে লেখা আপনি পাঠককে পড়াচ্ছেন তাতে এইসব কথা লেখা আছে। একজন পাঠক বিজ্ঞাপন দেখে এত আগ্রহ নিয়ে পত্রিকা  কিনছেন, আর পড়ছেন এসব ছাইভস্ম। এটা কি এক ধরনের প্রতারণা নয়?   এবার রফিকের একটা কলাম পড়ে দেখা যাক। তিনি লিখেছেন,জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে।আচ্ছা, বোঝা গেলো। তারপর? তিনি কলামের ভিতরে লিখেছেন,   'বিশ্বকাপের আগে বিশ্বকাপেরই দলের সঙ্গে সুযোগ বড় ব্যাপারই বলব আমি। আরও আমাদের সামনে সুযোগ আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। কানাডার বিপক্ষের ম্যাচটি প্রস্তুতির হলেও আমি মনে করি এই ম্যাচ দিয়েই তো শুরু হয়ে যাবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ। দেশের মানুষের নজর থাকবে আজ চট্টগ্রামে ক্রিকেটাররা কী করবে তা দেখার। আমি প্রথমেই বলব, আজকের এই প্র্যাকটিস ম্যাচটি বাংলাদেশকে গুরুত্ব সহকারে খেলতে হবে।  

এই যে কথা-বার্তা, এগুলো কি কারও অজানা? নাকি সাকিবরা এগুলো ভুলে গিয়ে বলেছেন, এই ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ না? তাহলে এ কলাম কিসের জন্য? এ লেখায় একজন জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে রফিক দিক নির্দেশনা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এসব কী লিখলেন? প্রথম দিকে পত্রিকার এমন বিজ্ঞাপন দেখে মনে হয়েছিল, এই লেখা না পড়লেতো জীবন বৃথা! তারকাদের ছবিসহ এসব বিজ্ঞাপনের ভাবখানা এমন- কলামিস্টদের এসব লেখায় বিশ্বকাপের বিভিন্ন ম্যাচ নিয়ে এমন কিছু থাকবে, যা দিক নির্দেশনা দেবে। বিশেষ বিশ্লেষণ থাকবে। কিন্তু আদতে আপনি কী পেলেন? বাইরে ফিটফাট কিন্তু ভিতরে গিয়ে দেখলেন সদরঘাট। তারা কলামের নামে যে সমস্ত কথাবার্তা লেখে তা পড়তে অলি-গলির বাচ্চা-বাচ্চা ক্রিকেটারদেরও আগ্রহ থাকার কথা নয়। কেননা, বাচ্চারাও এই ধরনের কথা-বার্তা নিজেরা-নিজেরাই আলোচনা করে।  

আগ্রহী পাঠক, ভুল বুঝবেন না; দৈনিক পত্রিকার পাতায় খেলার সংবাদের এই বৃহৎ কলেবর আমাদের প্রতিক্রিয়াশীল করে নি। আমরা মূলত এই সংবাদ-বিপুলত্বের কারণ অনুসন্ধান করতে চেয়েছি। পত্রিকায় কেন খেলার সংবাদের অপরিহার্যতা? আর কেনইবা সংবাদমূল্য না মেপে ক্রমাগত অর্থহীন কথাকে সংবাদের আদলে উপস্থাপন করা? কিংবা টার্গেট অডিয়েন্সকে সামর্থ্যের বাইরে স্বপ্ন দেখানো? এ সবগুলো প্রশ্নের উত্তর হয়ত একটাই আর তা হল, ধারাবাহিকভাবে পাঠককে সংবাদপত্রে ধরে রাখা, প্রচার সংখ্যা বাড়ানো। এর সাথে নিজেদের কাঙ্খিত মুনাফা কয়েকগুণ বাড়ানোর চিন্তা থাকলেও সামগ্রিকতার বিচারে আমাদের ক্রিকেট খেলায় যে তা কোনো ইতিবাচকতা বয়ে আনেনি তা পাঠক-মাত্রই অবগত।  

লেখক: আসাদুর রহমান ও তাহ্‌সিন আহমেদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। আসাদুর রহমান লেখাপড়ার পাশাপাশি কালের কণ্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

তথ্যসূত্র

১. পুরো নাম কেমার রোচ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলার।

২. বিস্তারিত দেখুন: সমকাল, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১১।

৩. চমস্কি, নোম (১৯৯৬)। Media and Globalization: an interview with Noam Chaomsky, http//:corpwatch.org

সহায়ক গ্রন্থ

১. হক, ফাহমিদুল ও মামুন, আ-আল (সম্পাদিত, ২০০৭); যোগযোগ, সংখ্যা-৮।

২. হক, ফাহমিদুল (২০১১); অসম্মতি উৎপাদন; সংহতি প্রকাশনী, ঢাকা।

৩. আহমেদ, মুসতাক (সম্পাদিত, ২০০৭); গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি: নয়া তথ্যযুগে পুঁজিবাদ আর গণতন্ত্র ; এ এইচ ডেভেলপমেন্ট পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা।

 

                       

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন